অধ্যায় ১০
ঘামের দুর্গন্ধ কি আপনাকে সবার সামনে বিব্রত করে তুলছে? উবিক ডিওডোরেন্ট অথবা উবিক রোল-অন মাত্র দশ দিনেই আপনাকে এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি দেবে। আপনি হয়ে উঠবেন সকল আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু। নির্দেশনা মোতাবেক এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবহার করুন।
.
‘এখন আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি জিম হান্টারের কাছে, আজকের সংবাদ শোনার জন্য,’ টেলিভিশনের ঘোষক বললো।
পর্দায় ভেসে উঠলো টেকো সংবাদ পাঠকের হাস্যোজ্জ্বল মুখ। ‘গ্লেন রানসাইটার আজ ফিরলেন তার জন্মস্থানে। কিন্তু তার এই ফিরে আসা মোটেও আনন্দের নয়। এক ভয়ংকর দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে রানসাইটার অ্যাসোসিয়েটস, যা সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম সারির প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনগুলোর মধ্যে অন্যতম। চাঁদের অজানা এক গবেষণা কেন্দ্রে সন্ত্রাসবাদীদের বোমা হামলায় গ্লেন রানসাইটার শারীরিকভাবে আহত হন, এবং কোল্ড-প্যাকে তার দেহাবশেষ স্থানান্তরের আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে তাকে নিয়ে আসা হয় জুরিখের বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামে। সেখানে রানসাইটারকে অর্ধ-জীবনে পুনরুত্থিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় ডি মোয়েনে। এখানে তাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় সমাহিত করা হবে, সিম্পল শেফার্ড মরচুয়াবিতে।’
পর্দায় পুরোনো আমলের সাদা রঙের একটা ভবন দেখা গেল। ভবনটার বাইরে অনেক মানুষ ইতস্তত হাঁটাচলা করছে। তাকে ডি মোয়েন নিয়ে যাওয়ার অনুমতি কে দিলো, অবাক হয়ে ভাবলো জো।
‘…গ্লেন রানসাইটারের স্ত্রীর সিদ্ধান্তে তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে, যা ছিল তার স্ত্রীর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কিন্তু এছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না…’ সংবাদ পাঠক বলে যাচ্ছে, ‘…এখানেই হতে যাচ্ছে তার জীবনের শেষ অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং আমরা সেটাই অবলোকন করছি। মিসেস ইলা রানসাইটার, তিনি নিজেও আছেন কোল্ড-প্যাকে, আশা করা হয়েছিল যে স্বামীও তার সাথে মিলিত হবেন। ভয়াবহ শোকের মুখোমুখি হওয়ার জন্য পুনরুত্থিত করা হয়েছে তাকে। মিসেস রানসাইটার আজ সকালেই তার স্বামীর মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা জানতে পেরেছেন, এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেন, যেন রানসাইটারকে অর্ধ-জীবনে পুনরুত্থিত করার বিলম্বিত সকল প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করা হয়, যার সাথে তিনি মিলিত হওয়ার প্রত্যাশায় ছিলেন। সেই আশা এখন কঠিন বাস্তবতায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।’ ইলার একটা ছবি, সে বেঁচে থাকতে এই ছবি তোলা হয়েছিল, সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য টিভির পর্দায় দেখা গেল। ‘শোকাবহ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য,’ সংবাদ পাঠক এখনো বলে যাচ্ছে, ‘রানসাইটার অ্যাসোসিয়েটসের শোকার্ত কর্মীবৃন্দ সিম্পল শেফার্ড মরচুয়াবিব প্রার্থনা কক্ষে জড়ো হচ্ছেন এবং প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।’
পর্দায় এখন মরচুয়াবিব রুফ ফিল্ডের দৃশ্য দেখা গেল। সেখানে একটা মহাকাশযান মাথা উঁচু করে অবতরণ করে আছে। সেটার দরজা খুলে একদল নারী-পুরুষকে বের হতে দেখা গেল। সংবাদকর্মীর বাড়িয়ে ধরা একটা মাইক্রোফোন থামালো তাদের।
‘আমাদের কি একটু জানাবেন, স্যার,’ একজন সাংবাদিকের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘গ্লেন রানসাইটারের অধীনে কাজ করা ছাড়াও আপনি এবং এই যে আরো কর্মী এখানে এসেছেন, সবাই কি তাকে ব্যক্তিগতভাবেও চিনতেন? মালিক হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?’
চোখে আলো পড়ে অন্ধ হয়ে যাওয়া প্যাঁচার মতো চোখ পিটপিট করতে করতে ডন ড্যানি মাইক্রোফোনে বললো, ‘আমরা সবাই গ্লেন রানসাইটারকে একজন মানুষ হিসেবে চিনতাম। একজন সৎ মানুষ এবং সৎ নাগরিক। যার উপর ছিল আমাদের অগাধ আস্থা। আর আমি জানি যে আমি যা বলছি বাকি সকলেরও একই মত।’
‘মি. রানসাইটারের সকল কর্মী, বা আমার বলা উচিত প্রাক্তন কর্মী, সকলেই কি এখানে এসেছেন, মি. ড্যানি?’
‘আমরা অনেকেই এসেছি,’ ডন ড্যানি বললো। ‘প্রুডেন্স সোসাইটির চেয়ারম্যান মি. লেন নিগেলম্যান আমাদের নিউ ইয়র্ক অফিসে আসেন এবং বলেন যে মি. রানসাইটারের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছেন তিনি। তিনি আমাদেরকে বলেন মরদেহ এখানে ডি মোয়েনে নিয়ে আসতে হবে এবং আমাদের সকলেরই এখানে উপস্থিত থাকা উচিত। আমরা তার কথা মেনে নেই, আর তাই তিনি নিজের মহাকাশযানে করে আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছেন। এটাই তার মহাকাশযান।’ যে মহাকাশযান থেকে সে এবং বাকি সবাই বের হয়ে এসেছে সেটার দিকে ইশারা করে ডন ড্যানি বললো। ‘জুরিখের মোরাটোরিয়াম থেকে এই মরচুয়াবিতে আনার ব্যবস্থা করার জন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। যদিও আমাদের অনেকেই এখানে উপস্থিত নেই, কারণ ঐ সময় তারা নিউ ইয়র্ক অফিসে ছিল না। আমি বিশেষ করে বলতে চাই আমাদের ইনার্শিয়াল আল হ্যামন্ড, ওয়েন্ডি রাইট আর আমাদের মাঠ পরীক্ষক মি. চীপের কথা। এই তিনজন কোথায় আছে আমরা জানি না, কিন্তু আশা করি—’
‘হ্যাঁ, বলুন,’ মাইক্রোফোন হাতে সাংবাদিক বললো।
‘আশা করি এই সম্প্রচার তারা দেখছে, যা কিনা উপগ্রহের মাধ্যমে পুরো পৃথিবীতেই সম্প্রচারিত হচ্ছে। আশা করি তারা এখানে দ্রুত চলে আসবে। কারণ আমি জানি—এবং নিঃসন্দেহে আপনিও জানেন যে—মি. রানসাইটার এবং সেই সাথে মিসেস রানসাইটারও তাদের উপস্থিতি এখানে বিশেষভাবে আশা করতেন।’
‘আমরা এখন নিউজ রুমে জিম হান্টারের কাছে ফিরে যাচ্ছি।’
পর্দায় আবার জিম হান্টারকে দেখা গেল। ‘রে হোলিস, যার বিপজ্জনক কর্মীদের নিষ্ক্রিয় করার কাজ করতো ইনার্শিয়ালরা, এবং সে কারণেই সে ছিল সকল প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের লক্ষ্যবস্তু, এক বার্তায় গ্লেন রানসাইটারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তার অফিস থেকে পাঠানো এই বার্তায় আরো বলা হয়েছে যে সম্ভব হলে তিনি ডি মোয়েনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেবেন। যদিও এটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ লেন নিগেলম্যান, প্রুডেন্স সোসাইটির চেয়ারম্যান (আপনাদের আগেই জানানো হয়েছে), একাধিক প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রে হোলিসের উপস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের মুখপাত্রদের মতে, গ্লেন রানসাইটারের মৃত্যুতে রে হোলিসের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক, এবং সে আসলে এই মৃত্যুতে স্বস্তি পেয়েছে।’ সংবাদ পাঠক হান্টার একটু বিরতি নিয়ে আরেকটা কাগজ তুলে নিয়ে বললো, ‘এবার অন্যান্য সংবাদ—’
পায়ের পাতা দিয়ে টিভি সেট নিয়ন্ত্রণ করার প্যাডেল চাপলো জো চীপ; পর্দার আলো এবং শব্দ দুটোই বন্ধ হয়ে গেল। বাথরুমের দেয়ালে অঙ্কিত গ্রাফিটির সাথে ব্যাপারটা মিলছে না, ভাবছে জো। হয়তো রানসাইটার আসলেই মারা গেছে। সাংবাদিকরা সেরকমই ভাবছে। রে হোলিসের ভাবনাও একই রকম। এমনকি লেন নিগেলম্যানও তাই ভাবছে। তারা সবাই রানসাইটারকে মৃত ধরে নিয়েছে আর ওদের হাতে যা আছে তা হলো, ছন্দ মিলানো কয়েক লাইনের দুটো ছড়া, যা কিনা যে-কেউই তৈরি করতে পারে—আল যা-ই বলুক না কেন।
টিভির পর্দা আবার আলোকিত হয়ে উঠলো। ভীষণ অবাক হলো জো, প্যাডেল সুইচে চাপ দেয়নি সে। তার উপর নিজে নিজেই চ্যানেল পরিবর্তিত হচ্ছে, একটা দৃশ্য ফুটে উঠেই দ্রুত সেখানে আরেকটা দৃশ্য চলে আসছে। রহস্যময় চালক সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত দৃশ্য পরিবর্তিত হতেই লাগলো। অবশেষে স্থির হলো একটা দৃশ্যে এসে। পর্দায় দেখা যাচ্ছে রানসাইটারের মুখ।
“বিস্বাদ খাবার খেতে খেতে কি আপনি ক্লান্ত?’ চিরচেনা ধারালো কণ্ঠে বলছেন রানসাইটার। ‘প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় শুধু সেদ্ধ বাঁধাকপি? সোমবার সকালে স্টোভে যতই ডাইম ফেলুন না কেন সেই একই রকম, বাসি, বিস্বাদ গন্ধ? উবিক এসব কিছুই পালটে দেয়। উবিক খাবারের স্বাদ পুনরুজ্জীবিত করে। খাবারের স্বাদকে ফিরিয়ে আনে তার আগের স্থানে এবং খাবারের সূক্ষ্ম ঘ্রাণ ফিরিয়ে আনে আবার।’ রানসাইটারের মুখের বদলে এবার পর্দায় দেখা গেল উজ্জ্বল বর্ণের একটা স্প্রে ক্যান। ‘সাশ্রয়ী মূল্যের উবিকের অদৃশ্য এক পাফ নিমেষেই দূর করে দেয় সেই সব হতবুদ্ধিকর ভয়, যেমন পুরো পৃথিবী এখন রূপান্তরিত হচ্ছে জমাটবাঁধা পচা দুধে, বহু ব্যবহারে জীর্ণ টেপ রেকর্ডার, অথবা ভুলে যাওয়া অতীতের লোহার খাঁচার মতো এলিভেটর, এবং আরো অনেক অজানা ভয়, ক্রমবর্ধমান পশ্চাদগামিতার নিদর্শন হিসেবে যা এখনো দৃষ্টিগোচর হয়নি। তুমি জানো, পৃথিবীর এই ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদগামিতা অর্ধজীবিতদের জন্য অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। বিশেষ করে প্রাথমিক অবস্থায়, যখন জাগতিক বাস্তবতার সাথে যোগসূত্রটা অনেক সতেজ থাকে। তাদের অবশিষ্ট জীবনীশক্তি ভিন্ন রকম এক বিশ্বে দীর্ঘায়িত হতে থাকে, একধরনের ছদ্ম বাস্তবতা তারা অনুভব করে, যা কিনা অনেক বেশি অস্থিতিশীল এবং যেকোনো ধরনের মিশ্রিত উপকাঠামো দ্বারা অসমর্থিত। নির্দিষ্ট করে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের একাধিক স্মৃতিভান্ডার এলোমেলোভাবে যুক্ত হয়ে আছে, যেমন তোমাদের ক্ষেত্রে। কিন্তু নতুন এবং আরো শক্তিশালী উবিক এর সবকিছুই বদলে দিয়েছে।’
অদ্ভুত এক ঘোরে হাবুডুবু খাচ্ছে জো। ধপাস করে চেয়ারে বসলো, দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে টিভির পর্দায়। পরীর একটা কার্টুন সর্পিল গতিতে বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে, এখানে-সেখানে উবিক স্প্রে করছে। তারপর পরীর জায়গায় কঠিন দৃষ্টির এক গৃহবধূকে দেখা গেল, যার বড় বড় দাঁত আর ঘোড়ার মতো চোয়াল। ঝনঝনে কঠিন কণ্ঠে সে বললো, ‘অকার্যকর, দুর্বল আর মেয়াদোত্তীর্ণ রিয়ালিটি-সাপোর্ট ব্যবহার করে আমি কোনো ফলাফল পাইনি। তখন আমি উবিক ব্যবহার করা শুরু করি। আমার হাঁড়িপাতিলগুলো মরচে পড়া স্তূপে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আমার কোন-অ্যাপ্টের মেঝে ভেঙে যাচ্ছিল। আমার স্বামী চার্লি একদিন শোবার ঘরের দরজা না খুলেই সরাসরি তার পা বের করে দিতে পেরেছিল। কিন্তু এখন আমি ব্যবহার করি সাশ্রয়ী মূল্যের অধিক শক্তিশালী নতুন উবিক, যা কাজ করে জাদুর মতো। এই ফ্রিজটা দেখুন।’ পর্দায় জেনারেল ইলেকট্রিকের তৈরি করা একটা অ্যান্টিক টারেট-টপ রেফ্রিজারেটর দেখা গেল। ‘এটা আশি বছরের আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।’
‘বাষট্টি বছর,’ আনমনেই সংশোধন করে দিলো জো।
‘কিন্তু এখন দেখুন,’ কথা শেষ করে পুরোনো টারেট-টপ রেফ্রিজারেটরের উপর উবিক ক্যান থেকে স্প্রে করলো গৃহবধূ। পুরোনো টারেট-টপ ঘিরে ঝিকিমিকি জাদুর আলোর বলয় সৃষ্টি হলো, এরপর নিমেষেই দুর্দান্ত গৌরবের সাথে পুরোনোটার জায়গা দখল করলো অতি আধুনিক ছয় দরজার মুদ্রাচালিত একটা রেফ্রিজারেটর।
‘হ্যাঁ,’ রানসাইটারের গম্ভীর কণ্ঠস্বর আবার শোনা গেল, ‘আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে উন্নত কৌশল ব্যবহার করে বস্তুর আদি রূপে ফিরে যাওয়ার প্রবণতাকে আবার বিপরীত দিকে চালিত করা যায়। আর সাশ্রয়ী মূল্যে যেকোনো কোন-অ্যাপ্ট মালিক এটি ক্রয় করতে পারবে। পৃথিবী জুড়ে শীর্ষস্থানীয় সকল বিপণিবিতানে উবিক বিক্রয় করা হয়। মুখে সেবনযোগ্য নয়। আগুন থেকে দূরে রাখুন। ক্যানের গায়ে যুক্ত লেবেলের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবহার করুন। সুতরাং, উবিকের খোঁজ করো, জো। এখানে বসে থেকে সময় নষ্ট কোরো না। বের হও এখান থেকে, উবিকের একটা ক্যান কিনে দিন-রাত তোমার চারপাশে স্প্রে করতে থাকো।’
প্রচণ্ড বিস্ময়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো জো, চিৎকার করে বললো, ‘তুমি জানো আমি এখানে আছি? তার মানে তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছো এবং শুনতেও পাচ্ছো?’
‘মোটেও না, আমি তোমাকে দেখতেও পাচ্ছি না, শুনতেও পাচ্ছি না। বিজ্ঞাপনের এই মেসেজটা ভিডিওটেপে ধারণ করা। দুই সপ্তাহ আগে আমি এটা রেকর্ড করেছি। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, আমার মৃত্যুর ঠিক বারো দিন আগে। আমি জানতাম বোমা হামলা হবে; প্রিকগ ট্যালেন্টদের ব্যবহার করেছিলাম আমি।’
‘তাহলে তুমি সত্যি সত্যি মারা গেছ?’
‘অবশ্যই আমি মারা গেছি। ডি মোয়েন থেকে এইমাত্র প্রচারিত সংবাদটা তুমি দেখোনি? জানি তুমি দেখেছ, আমার প্রিকগ সেটাও আগেই দেখতে পেয়েছিল।’
‘পুরুষদের বাথরুমের দেয়ালে যে গ্রাফিতি ছিল সেটা তাহলে কী?’
টিভি সেটের অডিও সিস্টেমের ভেতর থেকে রানসাইটারের কণ্ঠ গমগম করে উঠলো, ‘পশ্চাদগামিতার আরেকটি নিদর্শন। দ্রুত উবিকের ক্যান ক্রয় করো। ওটা তোমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করবে। এই সবকিছুই তখন বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘আলের ধারণা আমরা মারা গেছি,’ জো বললো।
‘আলও পশ্চাদগামিতার শিকার।’ রানসাইটার হাসলো, গভীর, প্রতিধ্বনিময় স্পন্দিত হাসি। যার কারণে সম্মেলন কক্ষটা কেঁপে উঠলো। ‘শোনো, জো। এই হতচ্ছাড়া বিজ্ঞাপনটা আমি রেকর্ড করেছিলাম তোমাকে সাহায্য করার জন্য, তোমাকে পথ দেখানোর জন্য—বিশেষ করে তোমাকে, কারণ আমরা সব সময়ই বন্ধু ছিলাম। আমি জানি যে তুমি ভীষণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে তুমি ঠিক তাই, পুরোপুরি বিভ্রান্ত। অবশ্য, তোমার স্বাভাবিক অবস্থা বিবেচনা করলে খুব অবাক করার মতো কিছু নয় মোটেও। যাই হোক, নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করো। সম্ভবত ডি মোয়েনে গিয়ে আমার শায়িত দেহ দেখার পর তুমি শান্ত হবে।’
‘এই উবিক আসলে কী?’ জো জিজ্ঞেস করলো। ‘যদিও আমি মনে করি আলকে সাহায্য করার আর কোনো উপায় নেই।’
‘উবিক কী দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলো জো। ‘এটা কীভাবে কাজ করে?’
‘আসলে পুরুষ শৌচাগারের দেয়ালের লেখাটা সম্ভবত আলই তৈরি করেছিল। ও না দেখালে তুমি হয়তো কখনোই দেখতে না।’
‘তুমি আসলেই ভিডিওটেপে রেকর্ড করা, তাই না?’ জো জিজ্ঞেস করলো। ‘তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো না। এটাই সত্যি।’
রানসাইটার বলেই যাচ্ছে, ‘তাছাড়া, আল—’
‘ধ্যাৎ,’ ক্লান্তি আর প্রচণ্ড হতাশার সাথে বললো জো। কোনো লাভ নেই। হাল ছেড়ে দিলো সে।
ঘোড়ামুখো গৃহবধূকে আবার দেখা গেল টিভির পর্দায়, বিজ্ঞাপনের সমাপ্তি টানছে। তার কণ্ঠস্বর এখন আগের চেয়েও নরম। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে সে বললো, ‘আপনি যে বিপণিবিতানসমূহ থেকে কেনাকাটা করেন, মি. চীপ, তাদের কাছে যদি উবিক না থাকে, তাহলে আপনার কোন-অ্যাপ্টে ফিরে যান, সেখানে আপনি একটা উবিক ক্যান পাবেন। স্যাম্পল হিসেবে বিনামূল্যে আপনাকে পাঠানো হয়েছে। মি. চীপ, এই স্যাম্পল ক্যান আপনাকে উজ্জীবিত রাখবে, আপনি নিয়মিত মাপের উবিক ক্যান ক্রয় করার আগ পর্যন্ত।’ কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেল গৃহবধূর। টিভি সেটের আলো নিভে যেতেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। যেভাবে চালু হয়েছিল ঠিক সেই প্রক্রিয়াতেই বন্ধ হয়ে গেল টিভিটা।
তো আমার এখন আলকে দোষারোপ করা উচিত, জো ভাবলো। ধারণাটা তার মোটেও পছন্দ হলো না। যুক্তিগুলোর অসারতা অনুভব করতে পারছে সে। এটা সম্ভবত ইচ্ছাকৃত ভুল দিক নির্দেশনা। আল এখন খলনায়ক, আল সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে—এখন সবকিছুরই ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে আলকে জড়িয়ে। অর্থহীন, নিজেকেই বললো সে। রানসাইটার কি আসলেই তার কথা শুনতে পেয়েছিল? রানসাইটার কি শুধু অভিনয় করেছে যে সে ভিডিওটেপের অভ্যন্তরে আছে? বিজ্ঞাপন চলাকালীন একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল যেন রানসাইটার তার প্রশ্নের জবাব দিতে পারছে। যদিও একেবারে শেষ পর্যায়ে রানসাইটারের কথাগুলো অসংলগ্ন হয়ে যায়। হঠাৎ করেই নিজেকে তার মনে হলো অসহায় এক পতঙ্গ, বাস্তবতার জানালার শার্সিতে নিষ্ফলভাবে ডানা ঝাপটাচ্ছে। যে বাস্তবতা সে বাইরে থেকে দেখতে পাচ্ছে অস্পষ্টভাবে।
নতুন এক ভাবনা তাকে অস্থির করে তুললো, একটা উদ্ভট ধারণা। ধরা যাক, অনুমানের ভিত্তিতে রানসাইটার ভিডিওটেপ রেকর্ডিং তৈরি করেছিল, প্রিকগের ভুল তথ্যের ভিত্তিতে, যে বোমা বিস্ফোরণ শুধু তাকেই হত্যা করবে এবং বাকি সবাই বেঁচে থাকবে। ভিডিওটেপটা সততার সাথেই বানানো কিন্তু ভ্রান্ত ধারণার উপরে ভিত্তি করে তৈরি। রানসাইটার মারা যায়নি, বরং তারা সবাই মারা গেছে। পুরুষ শৌচাগারের দেয়ালে অঙ্কিত গ্রাফিতি যেমন বলছে, রানসাইটার এখনো বেঁচে আছে। রেকর্ড করা বিজ্ঞাপন যেন ঠিক এই সময়ে প্রচার করা হয় সেজন্য বোমা বিস্ফোরণের আগেই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে সে এবং নেটওয়ার্ক ঠিক সেটাই করেছে, যেহেতু রানসাইটার তার পূর্বাদেশ প্রত্যাহার করতে পারেনি। এটা থেকেই রানসাইটার ভিডিওটেপে যা বলেছে আর শৌচাগারের দেয়ালে যা লিখেছে, এই দুটোর মধ্যে পার্থক্যের কারণটা বোঝা যায়। সত্যি বলতে কী, এটা আসলে দুটোকেই পরিষ্কার ব্যাখ্যা করে। সে যতদূর বুঝতে পারছে, অন্য কোনোভাবে তা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হতো না।
অথবা রানসাইটার তাদের সাথে একটা প্রহসনমূলক খেলা খেলছে। নিষ্ঠুর রসিকতা করছে তাদের সাথে, তাদেরকে ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে একবার এদিকে, আবার ওদিকে। একটা অতিপ্রাকৃতিক ভয়াবহ শক্তি তাদের শিকার করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এই শক্তি নির্গত হচ্ছে জীবিতদের জগৎ থেকে অথবা অর্ধ-জীবিতদের জগৎ থেকে। অথবা, ভাবনাটা হঠাৎ করেই তার মাথায় এলো, সম্ভবত দুই জগৎ থেকেই। সে যাই হোক, তারা যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে সেটা অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এই শক্তি, পুরোটা না হলেও বেশিরভাগ অংশ। পশ্চাদগামিতা নয় সম্ভবত, সিদ্ধান্তে উপনীত হলো সে। অবশ্যই না। কিন্তু নয়ই বা কেন? হয়তো বা, অনুমান করে নিলো সে, পশ্চাদগামিতাও নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও রানসাইটার সেটা স্বীকার করবে না। রানসাইটার এবং উবিক। ইউবিকুইটি, হঠাৎ করেই বুঝতে পারলো সে। এর অর্থ সর্বব্যাপিতা, আর কল্পিত উবিক শব্দটার উৎপত্তি হয়েছে এখান থেকেই। এটাই রানসাইটারের কথিত স্প্রে ক্যান পণ্যটির নাম, আসলে যার হয়তো কোনো অস্তিত্বই নেই। এটা হয়তো আরো বড় ধরনের প্রতারণা, তাদেরকে আরো বিভ্রান্ত করার জন্য।
আরো কথা আছে, যদি রানসাইটার বেঁচেই থাকে, তাহলে এই মুহূর্তে দু-দুজন রানসাইটারের অস্তিত্ব লক্ষ করা যাচ্ছে; আসল রানসাইটার বাস্তব জগতে লড়াই করছে তাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য, আর কল্পনায় দেখা অলীক রানসাইটার অর্ধ-জীবিত জগতে শবদেহে পরিণত হয়েছে। তার দেহ রাজকীয় শয্যায় শায়িত আছে আইওয়ার ডি মোয়েনে। আর এই যুক্তিটিকে সম্পূর্ণ পরিসরে নিয়ে যেতে অন্যান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত। যেমন রে হোলিস এবং লেন নিগেলম্যান, তারাও কল্পনায় দৃষ্ট—আর তাদের আসল প্রতিরূপ রয়ে গেছে জীবিতদের বিশ্বে।
খুবই বিভ্রান্তিকর, জো চীপ নিজেকে বললো। ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ হচ্ছে না। এটা অনস্বীকার্য, পুরো ঘটনাতে একটা সন্তোষজনক প্রতিসাম্য বিদ্যমান, কিন্তু অন্যদিকে এটি তাকে পুরোপুরি এলোমেলো করে দিয়েছে।
আমি আমার কোন-অ্যাপ্টে ফিরে যাবো, সিদ্ধান্ত নিলো সে। উবিকের নমুনা সংগ্রহ করে ডি মোয়েনের পথে রওয়ানা দেবো। যত যাই হোক, টিভির বিজ্ঞাপনে আমাকে এই অনুরোধই করেছে। সাথে উবিকের একটা ক্যান থাকলেই আমি নিরাপদ, বিজ্ঞাপনে অত্যন্ত চতুরভাবে এই বিষয়টাই বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কাউকে না কাউকে তো এই পরামর্শগুলো মেনে চলতে হবে, বুঝতে পারছে সে, যদি সে জীবিত থাকতে চায়—অথবা অর্ধ-জীবিত সেটা যাই হোক।
***
ট্যাক্সি তাকে তার কোন-অ্যাপ্টের রুফ ফিল্ডে নামিয়ে দিলো। চলমান র্যাম্পের সাহায্যে নেমে নিজের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো সে। একটা কয়েন, যেটা তাকে কেউ একজন দিয়েছিল—আল অথবা প্যাট, সে মনে করতে পারছে না—সেটা ব্যবহার করে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো সে।
বসার ঘরের বাতাসে পোড়া তেলের হালকা গন্ধ, যে গন্ধটা শৈশবের পর আর কখনো অনুভব করেনি সে। রান্নাঘরে গিয়ে কারণটা বুঝতে পারলো। তার চুলা আদি রূপে প্রত্যাবর্তন করেছে। পরিণত হয়েছে প্রাচীন যুগের প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত মডেলে। যাতে আছে তেল-কালির দাগওয়ালা বার্নার, মরচে পড়া দরজাগুলো বন্ধও করা হয়নি ঠিকমতো। নিরাসক্ত দৃষ্টিতে প্রাচীন, বহু ব্যবহৃত চুলার দিকে তাকালো সে—তারপর আবিষ্কার করলো, রান্নাঘরের অন্যান্য জিনিসগুলোও একইভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। হোমিওপেপ যন্ত্রটা অদৃশ্য হয়ে গেছে পুরোপুরি। টোস্টারটা দিনের কোনো এক সময় অবলুপ্ত হয়ে পুনরায় পরিণত হয়েছে পুরোনো আমলের অদ্ভুত জঞ্জালে। ওটাকে নিস্পৃহভাবে খোঁচা মারার পর এমনকি কোনো শব্দও করলো না। যে বিশাল রেফ্রিজারেটরটা তাকে অভ্যর্থনা জানালো, সেটা ছিল বেল্টচালিত একটা মডেল, একটা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঈশ্বরই জানেন কোন সুদূর অতীত থেকে এসেছে। টিভির বিজ্ঞাপনে দেখানো জেনারেল ইলেকট্রিকের টারেট-টপ মডেলের চেয়েও প্রাচীন এই রেফ্রিজারেটর। কফিপটের রূপান্তর ছিল সবচেয়ে নগণ্য। সত্যি বলতে কী, একদিক দিয়ে ওটা বরং উন্নত হয়েছে। কারণ ওটাতে কোনো কয়েন স্লট নেই। পুরোপুরি বিনা মুদ্রায় চালিত। এই কথা অবশ্য সব জিনিসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, বুঝতে পারলো সে। হোমিওপেপ যন্ত্রের মতো আবর্জনা-অপসারণ যন্ত্রটাও পুরোপুরি বিলীন। মনে করার চেষ্টা করলো, আর কী কী জিনিসের মালিক ছিল সে। কিন্তু ইতোমধ্যেই স্মৃতি অস্পষ্ট হতে শুরু করেছে। হাল ছেড়ে দিয়ে আবারও লিভিং রুমে ফিরে এলো সে।
টিভি সেট ফিরে গেছে আরো সুদূর অতীতে; কালো, কাঠের তৈরি একটা ক্যাবিনেটে রক্ষিত বহু প্রাচীন অ্যাটওয়াটার-কেন্ট টিউনড এএম রেডিওর মুখোমুখি আবিষ্কার করলো নিজেকে, যাতে আছে অ্যান্টেনা আর মেঝেতে বিছানো অনেকগুলো বৈদ্যুতিক তার। হায় ঈশ্বর! বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে।
কিন্তু টিভি সেট আকৃতিবিহীন ধাতু আর প্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়নি কেন? যত যাই হোক, ধাতু আর প্লাস্টিক হচ্ছে টিভি তৈরির কাঁচামাল। তার টিভিটাও ওগুলো দিয়েই তৈরি। পুরোনো আমলের রেডিও থেকে বিবর্তিত হয়নি। সম্ভবত এটি অনেক আগে বাতিল হয়ে যাওয়া প্রাচীন এক দর্শনের সত্যতা নতুন করে প্রমাণ করছে। আর সেটা হচ্ছে প্লেটোর আদর্শ বস্তু, যা সর্বজনীন এবং প্রতিটি শ্রেণির ক্ষেত্রেই বাস্তব। টিভি সেটের অবয়ব ছিল একটা চাপিয়ে দেওয়া রূপ, অন্য আরেক বস্তুরূপের উত্তরসূরি। অনেকটা চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ফ্রেমের ধারাবাহিকতার মতো। তার ধারণা, প্রতিটি বস্তুর পূর্বের রূপ তার মধ্যে অবশিষ্ট জীবনীশক্তি সঞ্চারিত করে। অতীত সুপ্ত, নিমগ্ন। কিন্তু তারপরেও বিদ্যমান এবং দুর্ভাগ্যক্রমে আবারও ছাপিয়ে উঠতে সক্ষম, যদি বর্তমান কোনো কারণে—সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনায় বোঝার অতীত কোনো কারণে—অদৃশ্য হয়ে যায়। মানবের ভেতর সুপ্ত থাকে আদিমানবের অংশ—শিশুর ভেতর নয়। আর এই ইতিহাসের সূচনা হয়েছে অনেক অনেক দিন আগে।
ওয়েন্ডির শুষ্ক দেহের অবশিষ্টাংশ। রূপান্তরের যে সাধারণ প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়া থেমে গিয়েছিল। এবং সর্বশেষ রূপান্তরটিই ক্ষয় হতে শুরু করে, পরবর্তী রূপান্তরের কোনো সুযোগ না রেখেই। ছিল না নতুন রূপ ধারণের সুযোগ, অথবা পরবর্তী ধাপে উত্তরণের সুযোগ, যেটাকে আমরা বলে থাকি বিকাশ। হয়তো বা বৃদ্ধ বয়সে ঠিক এমন উপলব্ধিই হয়। আর এই শূন্যতা থেকেই সৃষ্টি হয় দৈহিক অবক্ষয় আর জরাগ্রস্ততা। পার্থক্য শুধু এইটুকুই যে ওয়েন্ডির ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটা ঘটেছিল আচমকা মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে।
কিন্তু সেই প্রাচীন তত্ত্ব… প্লেটো কি ভেবে দেখেননি যে কিছু একটা এই অবক্ষয় থেকে রক্ষা পায়, সুগভীর একটা কিছু যার কোনো ক্ষয় নেই? প্রাচীন দ্বৈতবাদ: দেহ আর আত্মা দুটো পৃথক সত্তা। নশ্বর দেহ থেমে গেছে, যেমন হয়েছে ওয়েন্ডির ক্ষেত্রে। আর আত্মা—বন্ধ খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া পাখির মতো মুক্ত—উড়ে গেছে কোন সুদূরে। হয়তো তাই, সে ভাবলো। পুনর্জন্ম লাভের জন্য, যার উল্লেখ রয়েছে টিবেটিয়ান বুক অব দ্য ডেড-এ। এটাই যেন হয়। যিশু! কায়মনোবাক্যে এই প্রার্থনাই করছি। কারণ তাহলেই আমরা আবার মিলিত হতে পারবো। ঠিক যেন উইনি-দ্য-পুহ, যেখানে জঙ্গলের অন্য প্রান্তে ছোট্ট একটা ছেলে আর তার ভালুক অবিরাম খেলে যায়। সে এমন এক শ্রেণিতে পড়ে, যার কোনো ধ্বংস নেই। আমাদের সবার মতোই। আমরা সবাই কোনো একদিন বর্তমানের চেয়েও সুন্দর, স্থায়ী একটা জায়গায় চলে যাবো, মিলিত হবো পুহ-এর সাথে।
***
কৌতূহলবশত প্রাগৈতিহাসিক রেডিও চালু করলো সে। আলোকিত হয়ে উঠলো সেলুলয়েডের হলদেটে ডায়াল, ষাট সাইকেলের জোরালো গুঞ্জন। তারপর কান ঝালাপালা করে দেওয়া ঘ্যারঘ্যার খ্যারখ্যার শব্দের মাঝেই একটা স্টেশনে এসে থামলো।
‘এখন শুরু হচ্ছে পেপারস ইয়ং ফ্যামিলি,’ ঘোষক বললো, সেই সাথে বেজে উঠলো যন্ত্রসংগীত। ‘পরিবেশিত হচ্ছে ক্যামেই সাবানের সৌজন্যে। মাইল্ড ক্যামেই, সুন্দরী নারীদের সাবান। গতকাল পেপার বুঝতে পারে যে মাসের পর মাস হাড়ভাঙা খাটুনি অপ্রত্যাশিতভাবেই শেষ হতে চলেছে, কারণ—’
রেডিওটা বন্ধ করে দিলো জো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সোপ অপেরা এটা, বিস্মিত হয়ে ভাবলো সে। এটা আসলে আদি রূপে ফিরে যাওয়ার যুক্তি অনুসরণ করছে, যা এই মুহূর্তে এখানে—এই মৃতপ্রায় জগতে বিদ্যমান—অথবা সেটা যাই হোক না কেন।
লিভিং রুমের চারপাশে তাকালো জো। পুরোনো আমলের নকশা করা বাঁকানো পায়ার একটা গ্লাস-টপ কফি টেবিল দেখতে পেল। ওটার উপর লিবার্টি ম্যাগাজিনের একটা কপি। এগুলোও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেকার নিদর্শন। এই পত্রিকায় মধ্যরাতের বজ্রপাত নামে একটা ধারাবাহিক কল্পকাহিনী ছাপা হতো। যেখানে দূর ভবিষ্যতের পারমাণবিক যুদ্ধের উল্লেখ আছে। অনুভূতিহীন জড় বস্তুর মতো পত্রিকার পাতা উলটে গেল সে। তারপর কামরার পুরোটাই নিরীক্ষণ করতে লাগলো। আরো কী কী পরিবর্তন হয়েছে সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।
বর্ণহীন, ঝকঝকে কঠিন মেঝে রূপান্তরিত হয়েছে প্রশস্ত, নরম কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো মেঝেতে। কামরার ঠিক মাঝখানে বহু পুরোনো বিবর্ণ একটা টার্কিশ কম্বল, তার উপর জমে আছে অনেক বছরের ধুলো। দেওয়ালে একটাই মাত্র ছবি ঝোলানো। কাচের ফ্রেমে বন্দি একরঙা ছবিটা ঘোড়ায় উপবিষ্ট একজন মৃতপ্রায় ইন্ডিয়ানের। ছবিটা আগে কখনো দেখেনি জো। এই ছবি দেখে তার স্মৃতিতেও কোনো টোকা পড়লো না। আর সে মোটেও মাথা ঘামালো না এটা নিয়ে।
ভিডফোনটা প্রতিস্থাপিত হয়েছে দেওয়ালে ঝোলানো কালো রঙের, সেকেলে একটা টেলিফোন দ্বারা। প্রি-ডায়াল। হুক থেকে নামিয়ে রিসিভার কানে তুলতেই শুনতে পেল একটা নারী কণ্ঠ বলছে, ‘নাম্বার দিন, প্লিজ।’ রিসিভার নামিয়ে রাখলো সে।
তাপ নিয়ন্ত্রিত হিটিং সিস্টেম পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে। তার বদলে লিভিং রুমের একপ্রান্তে একটা গ্যাস হিটার, সাথে আছে টিনের তৈরি বিশাল চিমনি। দেয়াল বেয়ে উঠে গেছে একেবারে ছাদ পর্যন্ত।
শোবার ঘরে গিয়ে আলমারি খুললো সে। তন্নতন্ন করে খুঁজে এক সেট পোশাক বের করে আনলো: কালো অক্সফোর্ড জুতো, উলের মোজা, নিকারস, নীল সুতি শার্ট, উটের পশমে তৈরি স্পোর্টস স্যুট এবং গলফ ক্যাপ। আরো বেশি সাদাসিধে পোশাক হিসেবে বিছানার উপর সাজিয়ে রাখলো কালচে নীলাভ, পিন স্ট্রাইপড ডাবল ব্রেস্টেড স্যুট, সাসপেন্ডারস, ফুলের ছাপ দেওয়া প্রশস্ত নেকটাই এবং সেলুলয়েড কলারের সাদা শার্ট। জঘন্য! আলমারিতে একটা গলফ ব্যাগভরতি গলফ স্টিক দেখে প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো সে। কী হাস্যকর পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন!
আবার বসার ঘরে ফিরে এলো সে। এবার সে ঐ জায়গাটি লক্ষ করলো যেখানে পূর্বে পলিফোনিক অডিও কম্পোনেন্টস স্থাপন করা ছিল। বহুমাত্রিক এফএম টিউনার, হাই-হিস্টেরিসিস টার্নটেবল, ওজনহীন ট্র্যাকিং আর্ম, স্পিকার, হর্ন, মাল্টিট্র্যাক অ্যাম্প্লিফায়ার, কোনো কিছুরই আর অস্তিত্ব নেই। ওগুলোর বদলে একটা লম্বা, তামাটে বর্ণের কাঠের কাঠামো তাকে অভ্যর্থনা জানালো। বাঁকানো হাতলটা চিনতে পারলো সে। তার এই সাউন্ড সিস্টেম এখন কোন রূপে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা জানার জন্য ঢাকনাটা তোলারও কোনো প্রয়োজন বোধ করলো না। ভিকট্রোলিব পাশেই বইয়ের আলমারিতে পুরো এক বাক্স বাঁশের শলাকা রয়েছে এবং রেনোবল অকেস্ট্রার টার্কিশ ডিলাইটের একটা দশ ইঞ্চি, ৭৮ গতির ব্ল্যাক-লেবেল ভিক্টর রেকর্ড। তার এলপি রেকর্ডের সংগ্রহটা বেশ ভালোই বলা যায়।
হয়তো আগামীকালই নিজেকে আবিষ্কার করবে হাতল ঘুরিয়ে চালানো হতো এমন বিশাল, চোঙা আকৃতির গ্রামোফোনের সামনে। সাথে আরো থাকবে তাতে বাজানোর জন্য একগাদা ঈশ্বরের বন্দনাগীতির রেকর্ড।
ভারী সোফার একপ্রান্তে পড়ে থাকা মোটামুটি নতুন সংবাদপত্রের দিকে তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। হাতে নিয়ে তারিখ দেখলো: মঙ্গলবার, ১২ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯। তারপর শিরোনামগুলোর উপর চোখ বোলাতে লাগলো।
বাহ, চমৎকার, নিজেকেই বললো সে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মাত্র হয়েছে এবং ফরাসিরা ভাবছে যে এই যুদ্ধে তারা জিততে চলেছে—আরেকটা শিরোনাম পড়লো সে।
> জার্মানদের প্রতিহত করার দাবি পোলিশদের। নতুন করে সৈন্য পাঠিয়েও পিছু হটছে জার্মানরা শুরু।
সংবাদপত্রের মূল্য মাত্র তিন সেন্ট। এটাও তাকে আগ্রহী করে তুললো। তিন সেন্টে তুমি এখন কী পাবে? নিজেকেই প্রশ্ন করলো সে। সংবাদপত্রটা ছুঁড়ে ফেললো আগের জায়গায়। এটার তরতাজা ভাব দেখে বিস্মিত হলো আবারও। মোটামুটি এক দিনের পুরোনো, অনুমান করলো জো। তার বেশি নয় মোটেও। তাহলে আমার হাতে এখন একটা সময়সীমা আছে। এখন আমি নিশ্চিত করে জানি এই পশ্চাদগমন প্রক্রিয়া ঠিক কতটা পিছিয়ে এসেছে।
আরো কী কী পরিবর্তন হয়েছে সেটা বোঝার জন্য কোন-অ্যাপ্টে ইতস্তত পায়চারি করার সময় শোবার ঘরে কাপড় রাখার একটা আলমারি খুঁজে পেল। তার উপর কাচে ঢাকা ফ্রেমে অনেকগুলো ছবি। সবগুলো ছবিই রানসাইটারের। কিন্তু যে রানসাইটারকে সে চিনতো, ছবিগুলো সেই রানসাইটার নয়। ছবিগুলো এক শিশুর, একজন বালকের এবং একজন তরুণের। যৌবনে রানসাইটার যেমন ছিল, যদিও তাকে চেনা যাচ্ছে।
ওয়ালেট বের করে রানসাইটারের ছোট একটা ছবি খুঁজে পেল সে। তার পরিবারের অন্য কারো ছবি নেই, নেই তার কোনো বন্ধুর ছবি। সবই রানসাইটারের! ওয়ালেটটা পকেটে রাখার সময় প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেলো এটা বুঝতে পেরে যে ওটা আসলে সত্যিকার গরুর খাঁটি চামড়ায় তৈরি, প্লাস্টিক না। তাই তো হওয়ার কথা। সেই পুরোনো দিনগুলোতে আসল আর খাঁটি চামড়ার পণ্য সুলভ ছিল। কী আসে যায় তাতে? নিজেকেই বললো সে। আবার বের করে আনলো ওয়ালেটটা, ভ্রু কুঁচকে খুঁটিয়ে দেখছে। গরুর চামড়ার উপর হাত ঘষে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো তার, আনন্দদায়ক অনুভূতি। নিঃসন্দেহে প্লাস্টিকের চেয়ে হাজারগুণ উন্নত মানের।
বসার ঘরে আবার ফিরে এলো জো, অলসভাবে হাঁটছে। আসলে পরিচিত মেইল স্লট খুঁজছে। দেয়ালের গায়ের ক্ষুদ্র সেই গহ্বর যেখানে আজকের মেইল থাকার কথা, অদৃশ্য হয়ে গেছে। ওটার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ভাবতে লাগলো সে, পুরোনো যুগের চিঠি-পত্র কীভাবে আদান-প্রদান করা হতো সেটা কল্পনা করার চেষ্টা করছে। কোন-অ্যাপ্টের দরজার বাইরের মেঝেতে? না। কোনো এক ধরনের বক্সে; মেইলবক্স বলে একটা শব্দ ছিল, মনে পড়লো তার। বেশ, তাহলে মেইলবক্সেই থাকার কথা, কিন্তু মেইলবক্সগুলো কোথায় রাখা হতো? ভবনের মূল প্রবেশপথের পাশে? অস্পষ্টভাবে তার মনে পড়লো, বক্সটা ওখানেই থাকারই কথা। কোন-অ্যাপ্টের বাইরে যেতে হবে তাকে। মেইলগুলো পাওয়া যেতে পারে একেবারে নিচ তলায়। বিশ তলা থেকে নামতে হবে তাকে।
‘পাঁচ সেন্ট দিন, প্লিজ,’ খোলার চেষ্টা করতেই তার সদর দরজা বলে উঠলো। যেকোনো কারণেই হোক এই একটা জিনিস মোটেও পরিবর্তিত হয়নি। এই মুদ্রাচালিত দরজার ভেতরে অস্বাভাবিক ধরনের গোঁয়ার প্রবৃত্তি আছে। হয়তো পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও সে তার জায়গা থেকে একচুলও নড়বে না। সবকিছু অতীতের দিকে ফিরে গেলেও এই দরজা এখনো বর্তমানেই রয়ে গেছে—আর পরিবর্তনটা পুরো পৃথিবীতে না হলেও অন্তত পুরো শহরে হয়েছে।
দরজায় একটা নিকেল ফেললো জো। হলের শেষ মাথায় চলমান র্যাম্পের দিকে দৌড়ালো, যা সে মাত্র কিছুক্ষণ আগেই ব্যবহার করেছে। কিন্তু চলমান র্যাম্প এখন রূপান্তরিত হয়ে গেছে ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া নিরেট কংক্রিটের সিঁড়িতে। বিশ তলা নিচে নামতে হবে এই সিঁড়ি বেয়ে, আতঙ্কিত হয়ে ভাবলো সে। নামতে হবে একটা একটা করে সিঁড়ি বেয়ে। অসম্ভব! এতগুলো সিঁড়ি বেয়ে নামা কারো পক্ষেই সম্ভব না। এলিভেটর। ওটার দিকে এগোতে শুরু করলো সে। তখনই মনে পড়লো আলের কী হয়েছিল। হয়তো আল যা দেখেছিল এবার আমিও তাই দেখবো। মোটা মোটা তারের সাহায্যে ঝুলিয়ে রাখা পুরোনো যুগের লোহার খাঁচা। বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া নির্বোধ এলিভেটর চালক, মাথায় এলিভেটর চালকের অফিশিয়াল টুপি, সেটা চালিয়ে যাচ্ছে প্রয়োজনমতো। দৃশ্যটা ১৯৩৯ সালের নয়, ১৯০৯ সালের। এখন পর্যন্ত যতগুলো পশ্চাদগমন দেখেছি তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। ঝুঁকি নেওয়ার দরকার নেই। সিঁড়ি বেয়ে নামাই ভালো। হাল ছেড়ে দিয়ে নামতে শুরু করলো সে।
প্রায় অর্ধেক পথ নামার পর ভয়ংকর চিন্তাটা তাকে বেসামাল করে দিলো। আবার উপরে উঠে আসার কোনো উপায় নেই—তার কোন-অ্যাপ্টে অথবা রুফ ফিল্ডে যেখানে তার ট্যাক্সি অপেক্ষা করছে। একেবারে নিচ তলায় নেমে যাওয়ার পর ওখানেই আটকা পড়বে সে, হয়তো সারা জীবনের জন্য। যদি-না উবিকের স্প্রে ক্যান আধুনিক এলিভেটর অথবা চলমান র্যাম্প পুনরায় ফিরিয়ে আনার মতো শক্তিশালী হয়। সড়ক পথে যাতায়াত, ভাবলো সে। ওখানে যখন পৌঁছাবো, আমার জন্য কী অপেক্ষা করবে? রেলগাড়ি? কভার্ড ওয়াগন? একসাথে দুই ধাপ লাফিয়ে নামার সময় আবার উপরে ফেরার ইচ্ছাটা দমন করলো নিজের উপর জোর খাটিয়ে। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
নিচের তলায় পৌঁছানোর পর বিশাল এক লবিতে আবিষ্কার করলো নিজেকে। মার্বেল পাথরের একটা টেবিল, অনেক লম্বা, টেবিলের উপর সিরামিকের দুটো ফুলদানি—এবং তাতে রাখা ফুলগুলো নিঃসন্দেহে আইরিস ফুল। প্রশস্ত চারটে ধাপ নেমে গেছে পর্দায় ঢাকা সদর দরজার দিকে। নকশা করা কাচের নব ঘুরিয়ে দরজাটা খুলে ফেললো সে এক ঝটকায়।
আরো কয়েকটি ধাপ। ডান দিকে তালা বন্ধ একসারি তামার মেইলবক্স, প্রতিটার গায়ে মালিকের নাম লেখা এবং ওগুলো খোলার জন্য চাবি প্রয়োজন। তার ধারণাই ঠিক ছিল; এখানেই চিঠি-পত্রগুলো সরবরাহ করা হয়। নিজের বক্সটা খুঁজে পেল সে। নিচে একটা কাগজ লাগানো এবং সেখানে লেখা জোসেফ চীপ ২০৭৫, সেই সাথে একটা বোতাম, নিঃসন্দেহে ওটা চাপলে উপরে তার কোন-অ্যাপ্টে ঘণ্টি বাজবে।
চাবি। তার কাছে কোনো চাবি নেই। নাকি ছিল? পকেট হাতড়ে একটা আংটা খুঁজে পেল সে। যেখানে বিভিন্ন আকৃতির ধাতব চাবি ঝুলছে। বিস্মিত হয়ে চাবিগুলো খুঁটিয়ে দেখলো। অবাক হয়ে ভাবছে ওগুলো কীসের চাবি। মেইলবক্সের তালাটা অস্বাভাবিক রকম ছোট; নিঃসন্দেহে ওটার জন্য ছোট একটা চাবিই থাকবে। আংটা থেকে সবচেয়ে ছোট চাবিটা বেছে নিয়ে মেইলবক্সের তালায় ঢুকিয়ে চাবি ঘোরালো। বাক্সের তামার দরজাটা পড়ে গেল নিচের দিকে। ভেতরে উঁকি দিলো সে।
বাক্সের ভেতরে দুটো চিঠি আর বাদামি কাগজে মোড়ানো চারকোনা একটা প্যাকেট, আঠালো বাদামি টেপ দিয়ে আটকানো। জর্জ ওয়াশিংটনের ছবিসংবলিত তিন সেন্ট মূল্যমানের গাঢ় বেগুনি রঙের ডাকটিকেট লাগানো প্যাকেটের গায়ে। পুরোনো দিনের এই সুন্দর স্মৃতি উপভোগ করার জন্য একটু থামলো সে। তারপর চিঠিগুলো উপেক্ষা করে চারকোনা প্যাকেটটা খুললো। অসম্ভব ভারী প্যাকেট। তারপর সহসাই অনুধাবন করলো স্প্রে ক্যানের জন্য প্যাকেটের মাপটা সঠিক নয়; এটা যথেষ্ট লম্বা না। ভয় গ্রাস করে নিলো তাকে। যদি এটা উবিকের বিনামূল্যের স্যাম্পল না হয়? হতেই হবে, অন্য কোনো বিকল্প নেই। নইলে আলের সাথে যা ঘটেছে সেটারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে। মৃত্যু অনিবার্য, শুধু মৃত্যুর সময়টা অনিশ্চিত, বাদামি কাগজের মোড়কটা ফেলার সময় নিজেকে আশ্বস্ত করার জন্য মনে মনে কথাগুলো বললো সে। প্যাকেটের ভেতরের পিচবোর্ডের তৈরি কন্টেইনারটা খুঁটিয়ে দেখলো।
কন্টেইনারের ভেতর উবিক যকৃত এবং বৃক্ক মলম লেখা নীল কাচের একটা জার আর তার মুখে বড় একটা ঢাকনা। গায়ে আটকানো লেবেলে লেখা:
> ব্যবহারবিধি : অনন্য প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত, ডক্টর এডওয়ার্ড সোন্ডারবারের দীর্ঘ চল্লিশ বছরের গবেষণালব্ধ বেদনানাশক ঔষধ। আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছে মাঝরাতে অস্বস্তিকর নিদ্রাভঙ্গের হাত থেকে চিরমুক্তির। প্রথমবারের মতো আপনি ঘুমাতে পারবেন শান্তিতে এবং দুর্দান্ত আরামের সাথে। এক গ্লাস উষ্ণ পানির সাথে এক টেবিল চামচ উবিক যকৃত এবং বৃক্ক মলম মিশিয়ে ঘুমানোর দেড় ঘণ্টা আগে সেবন করুন। ব্যথা এবং অস্বস্তি না কমলে সেবনমাত্রা এক টেবিল চামচ বৃদ্ধি করতে পারবেন। শিশুদের জন্য প্রযোজ্য নয়। উপাদানসমূহ: করবী ফুলের শুকনো পাতা, সল্টপিটার, গোলমরিচের তেল, এন-এসিটিল-পি অ্যামিনোফেনল, দস্তা, কাঠকয়লা, কোবাল্ট ক্লোরাইড, ক্যাফেইন, ডিজিটালিসের রস, নির্দিষ্ট মাত্রার স্টেরয়েড, সোডিয়াম সাইট্রেট, অ্যাসকরবিক এসিড, কৃত্রিম রং এবং স্বাদ বৃদ্ধিকারী উপাদান। সঠিক নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করলে উবিক যকৃত এবং বৃক্ক মলম অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কার্যকরী ঔষধ। অত্যন্ত দাহ্য, মিশ্রণের সময় হাতের নিরাপত্তার জন্য দস্তানা ব্যবহার করুন। চোখ থেকে দূরে রাখুন। ত্বকের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। লক্ষ রাখবেন যেন দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাসের সাথে দেহে প্রবেশ করতে না পারে। অতিরিক্ত সতর্কতা: দীর্ঘদিন নিয়মিত ব্যবহারের কারণে আসক্তি তৈরি হতে পারে।
পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না, আপনমনে বললো জো। উপাদানের তালিকাটা আবার পড়লো, বুঝতে পারলো বিস্ময়কর এক ক্রোধ জন্ম নিচ্ছে তার ভেতরে। ভয়াবহ অসহায়ত্বের এক অনুভূতি ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়লো তার প্রতিটি অংশে। আমি শেষ, নিজেকে বললো সে। রানসাইটার টিভির বিজ্ঞাপনে যে বস্তুর কথা বলেছিল এটা তা নয়। এটি পুরোনো যুগের গুপ্ত উপাদানের মিশ্রণে প্রস্তুত নিবন্ধিত ঔষধ। ত্বকের মলম, ব্যথানাশক, বিষাক্ত, কোনো কাজেরই না—সবচেয়ে বড় কথা, এটা কর্টিসোন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। নিঃসন্দেহে, রেকর্ড করা টিভি বিজ্ঞাপনে সে উবিকের যে বর্ণনা আমাকে দিয়েছিল, তার এই নমুনাটি যেকোনোভাবেই হোক অতীতের দিকে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। অত্যন্ত সহজ-সরল ভাগ্য বিড়ম্বনা; পশ্চাদগামী প্রক্রিয়া থামানোর জন্য যে উপাদান প্রস্তুত করা হয়েছে, সেই বস্তু নিজেই পশ্চাদগামী হয়ে গেছে। তিন সেন্ট মূল্যমানের ডাকটিকেট দেখামাত্রই এটা আমার বোঝা উচিত ছিল।
সড়কের ডানে-বামে দৃষ্টি বোলালো সে। দেখলো ফুটপাথের কিনারায় জাদুঘরে রাখার মতো এবং মাটিতে চলাচলকারী একটা ক্লাসিক মোটরগাড়ি। একটা লেসাল। ১৯৩৯ সালের লেসাল মোটরগাড়িতে চেপে আমি কি ডি মোয়েন পৌঁছাতে পারবো? নিজেকেই প্রশ্ন করলো সে। সন্দেহ নেই যে, যদি ওটার রূপান্তর স্থিতিশীল থাকে, তাহলে সম্ভবত এখন থেকে এক সপ্তাহ পর গিয়ে পৌঁছাবো। কিন্তু ততক্ষণে কোনো কিছুরই আর কোনো অর্থ থাকবে না। তবে যাই হোক না কেন, এই মোটরগাড়ির রূপান্তর স্থিতিশীল থাকবে না। কোনো রূপান্তরই স্থিতিশীল থাকবে না—একমাত্র আমার কোন-অ্যাপ্টের সদর দরজা ছাড়া—শুধু ওটাই চিরকাল একই রকম থাকবে।
লেসালটাকে কাছ থেকে ভালো করে দেখার জন্য এগিয়ে গেল সে। হয়তো এটা আমারই গাড়ি, নিজেকে বললো সে। হয়তো আমার চাবিগুলোর কোনো একটা এটার ইগনিশনে ঠিক ঠিক লাগবে। মাটিতে চলাচলকারী মোটরগাড়িগুলো তো ওভাবেই চালানো হতো, তাই না? কিন্তু কথা হচ্ছে, আমি এটা চালাবো কীভাবে? প্রাচীন যুগের মোটরগাড়ি কীভাবে চালাতে হয় সেটা আমি জানি না, বিশেষ করে যেটাতে—কী যেন বলতো ওরা? ম্যানুয়াল ট্রান্সমিশন। দরজা খুলে স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে চালকের আসনে বসলো সে। ওখানেই বসে রইলো। উদ্দেশ্যহীনভাবে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে পুরো পরিস্থিতিটা ভাবছে আগাগোড়া।
আমার হয়তো এক টেবিলচামচ উবিক যকৃত এবং বৃক্ক মলম পান করা উচিত, নিজেকে বললো সে। ওটাতে যে সকল উপাদান মিশ্রিত আছে সেগুলো নিঃসন্দেহে আমার মৃত্যু ত্বরান্বিত করবে। কিন্তু সে এটা ভাবলো না যে এই মৃত্যুকে সে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত কি না। কোবাল্ট ক্লোরাইডই আসল কাজটা করে দেবে, অত্যন্ত ধীরে আর যন্ত্রণাদায়কভাবে। যদি-না ডিজিটালিস উপাদান প্রথমে কাজ শুরু করতে পারে। আরো আছে, করবী ফুলের শুকনো পাতা। ওগুলোকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। পুরো মিশ্রণটি তার হাড়গুলোকে নরম জেলিতে পরিণত করবে, একটু একটু করে।
আরে তাইতো! হঠাৎ মনে পড়লো তার। ১৯৩৯ সালে আকাশপথে যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল। যদি আমি নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারি—হয়তো বা এই মোটরগাড়িতে করেই—তাহলে একটা চার্টার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে পারবো। পাইলটসহ ফোর্ডের একটা ট্রাইমোটর উড়োজাহাজ ভাড়া করা কোনো সমস্যাই হবে না। তারপর ওটাতে করেই যেতে পারবো ডি মোয়েন।
একটার পর একটা চাবি দিয়ে চেষ্টা করতে লাগলো সে। অবশেষে একটা চাবি দিয়ে চালু হলো গাড়ি। স্টার্টার মোটরটা প্রথমে ঘুরলো কয়েক পাক, তারপর ইঞ্জিন চালু হলো। গমগম শব্দের সাথে ইঞ্জিনের জোর আরো বাড়তে লাগলো, শব্দটা খুব আনন্দের অনুভূতি তৈরি করছে ওর ভেতর। ঠিক গরুর খাঁটি চামড়ার তৈরি ওয়ালেটের মতো। এই বিশেষ পশ্চাদগমন তার কাছে বরং মনে হলো একধরনের অগ্রগতি। যেহেতু পুরোপুরি শব্দহীন, তার যুগের পরিবহন ব্যবস্থায় এই অনুভবযোগ্য বাস্তবতার ছোঁয়া একেবারেই নেই।
এবার ক্লাচ, নিজেকে বললো সে। বাঁ দিকে থাকার কথা। পায়ের সাহায্যে ওটা সে খুঁজে পেল। ক্লাচ মেঝের সাথে চেপে ধরতে হবে, তারপর লিভারটাকে বদল করতে হবে গিয়ারে। সেভাবেই চেষ্টা করলো। মুহূর্তেই ভয়াবহ একটা সংঘর্ষের শব্দে আঁতকে উঠলো জো, এই শব্দ ধাতুর উপরে ধাতুর ঘূর্ণনের। তবে ক্লাচ ছাড়লো না সে, আবার চেষ্টা করলো। এবার গিয়ার বদলাতে সক্ষম হলো।
নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সামনে এগোল গাড়ি; হোঁচট খেলো, ঝাঁকুনি খেলো কিন্তু সামনে এগোনো থামলো না। খোঁড়াতে খোঁড়াতে মূল সড়কে গিয়ে উঠলো গাড়িটা। আবার নতুন করে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার হচ্ছে তার মধ্যে, বুঝতে পারছে জো। এবার দেখা যাক হতচ্ছাড়া এয়ারফিল্ড খুঁজে পাই কি না, নিজেকে বললো সে। খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই, বাইরে সংযুক্ত ঘূর্ণায়মান সিলিন্ডার আর ক্যাস্টর অয়েলে চালিত জিনোম রোটারি ইঞ্জিনের যুগে ফিরে যাওয়ার আগেই।
***
এক ঘণ্টা পর এয়ারফিল্ডে পৌঁছালো সে। গাড়ি পার্ক করে হ্যাংগারগুলোতে চোখ বোলালো। একটা উইন্ডসক—কয়েকটা পুরোনো বাইপ্লেন, যেগুলোতে কাঠের তৈরি বিশাল প্রপেলার থাকে। কী একটা দৃশ্য, স্বগতোক্তি করলো সে। যেন ইতিহাসের নির্দিষ্ট একটা পাতা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যেন অন্য এক সহস্রাব্দের ক্ষুদ্র অংশের পুনর্নির্মাণ, যার সাথে পরিচিত বাস্তব জগতের কোনো সম্পর্কই নেই। যেন একটা অলীক ছায়ামূর্তি, যা কেবল ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এটাও বিলীন হয়ে যাবে অচিরেই। সমসাময়িক বস্তুগুলোর মতো এটাও টিকতে পারবে না। পশ্চাদমুখী বিবর্তন এটাকেও মুছে দেবে। যেভাবে মুছে দিয়েছে অন্য সবকিছুকে।
আড়ষ্ট শরীরে লেসাল থেকে নামলো সে। সত্যি বলতে কী, ভীষণ অসুস্থ বোধ করছে। ক্লান্ত পায়ে এয়ারফিল্ডের মূল ভবনের দিকে হাঁটতে লাগলো জো।
‘এগুলো দিয়ে আমি কোনটা ভাড়া করতে পারবো?’ প্রথম দেখতে পাওয়া কর্মকর্তা গোছের এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলো সে। পকেটের অর্থগুলো বের করে আগেই কাউন্টারে রেখেছে। ‘যত দ্রুত সম্ভব ডি মোয়েন যেতে চাই আমি। আসলে ঠিক এই মুহূর্তেই রওয়ানা হতে চাই।’
বেঁটে, টেকো কর্মকর্তার চোখে গোল্ডরিমের চশমা। মোম ঘষায় চকচক করছে গোঁফ। কথা না বলে সামনে রাখা মুদ্রাগুলো দেখলো সে। ‘স্যাম, শুনছো,’ আপেলের মতো গোল মাথা ঘুরিয়ে হাঁক ছাড়লো সে। ‘এখানে এসে এই মুদ্রাগুলো একবার দেখে যাও তো।’ দ্বিতীয় আরেক কর্মকর্তা, পরনে হাতা গুটানো স্ট্রাইপড শার্ট, ঝলমলে শিয়ারসাকার ট্রাউজার এবং ক্যানভাসের জুতো, মুদ্রাগুলোর উপর ঝুঁকলো।
‘নকল মুদ্রা,’ দেখা শেষ করে বললো সে। ‘এগুলো কোনো কাজের না। জর্জ ওয়াশিংটন না, আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনও না।’ দুই কর্মকর্তা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো জোয়ের দিকে।
‘পার্কিং লটে আমার একটা ’৩৯ লেসাল পার্ক করা আছে,’ বললো জো। ‘ওটার বিনিময়ে আমি যেকোনো বিমানে ডি মোয়েনের জন্য একটা ওয়ান ওয়ে ফ্লাইট বুক করতে চাই। আপনারা কি আগ্রহী?’
গোল্ডরিমের চশমা পরা কর্মকর্তা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললো, ‘ওগি ব্র্যান্ট আগ্রহী হতে পারে।’
‘ব্র্যান্ট?’ ভ্রু উঁচু করে শিয়ারসাকার প্যান্ট পরা কর্মকর্তা প্রশ্ন করলো। ‘তুমি ওর সেই জেনির কথা বলছো? ঐ বিমানটা বিশ বছরেরও বেশি পুরোনো। ওটা ফিলাডেলফিয়া পর্যন্তই যেতে পারবে না।’
‘ম্যাকগি?’
‘হ্যাঁ, ও পারবে, কিন্তু সে তো এখন আছে নিউ ইয়র্কে।’
‘তাহলে স্যান্ডি জেসপারসেন ছাড়া গতি নেই। ওর সেই কার্টিস-রাইট আইওয়া পর্যন্ত যেতে পারবে। আজ হোক বা কাল।’ তারপর জোয়ের উদ্দেশে কর্মকর্তা বললো, ‘আপনি তিন নম্বর হ্যাংগারে গিয়ে লাল আর সাদা রঙের কার্টিস বাইপ্লেন খুঁজে বের করুন। ওটার পাশেই আপনি বেঁটে আর মোটা এক লোককে দেখতে পাবেন। সে যদি আপনাকে না নিয়ে যায়, তাহলে এখানের আর কেউই নিয়ে যাবে না। যদি-না আপনি আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন, আইকি ম্যাকগি তার ট্রাইমোটর ফকার নিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত।’
‘ধন্যবাদ,’ জো বললো, তারপর বেরিয়ে এলো ভবন ছেড়ে। দ্রুত এগোল তিন নাম্বার হ্যাংগারের দিকে। ইতোমধ্যেই সে যা দেখতে পেয়েছে সেটা লাল আর সাদা রঙের একটা কার্টিস বাইপ্লেনই হবে। আমাকে অন্তত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জেএন প্রশিক্ষণ বিমানে চড়তে হবে না, নিজেকে বললো সে। পর মুহূর্তেই চিন্তাটা এলো তার মাথায়। আমি কীভাবে জানলাম যে জেএন প্রশিক্ষণ বিমানের নিকনেম জেনি? হায় ঈশ্বর, সে ভাবলো, এই সময়ের উপাদানসমূহ আমার বোধগম্যতার সাথে অনুরূপ সংশ্লিষ্টতা তৈরি করছে! আমি যে লেসাল চালাতে পেরেছি তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাস্তবতার এই ধারাবাহিক পরিবর্তনশীলতার সাথে আমার চেতনা দ্রুত খাপ খাইয়ে নিচ্ছে!
লাল চুলো, বেঁটে আর মোটা মতন এক লোক তেল চিটচিটে একটা ন্যাকড়া দিয়ে তার বাইপ্লেনের চাকা পরিষ্কার করছে। জো কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখ তুলে তাকালো সে।
‘আপনি মি. জেসপারসেন?’ জিজ্ঞেস করলো জো।
‘ঠিকই ধরেছেন।’ লোকটা তাকে খুঁটিয়ে দেখছে, নিঃসন্দেহে জোয়ের পোশাক-আশাক দেখে বিস্মিত। ওগুলো অতীতের দিকে বিবর্তিত হয়নি। নিজের প্রয়োজনেব কথা তাকে জানালো জো।
‘আপনি একটা লেসাল বিনিময় করতে চান, নতুন একটা লেসাল, ডি মোয়েনে একটা ওয়ান ওয়ে ট্রিপের জন্যে?’ গভীরভাবে চিন্তা করছে জেসপারসেন, ভ্রুদুটো কুঁচকে লেগে আছে পরস্পরের সাথে। ‘এখানে কিন্তু যাওয়া-আসার ধকল আছে। আমাকে আবার এখানে ফিরে আসতে হবে। ঠিক আছে, গাড়িটা আমি একবার দেখতে চাই। কিন্তু আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। আমি এখনো মনস্থির করিনি।’
দুজন একসাথে পার্কিং লটের দিকে এগোল।
‘আমি কোনো ’৩৯ লেসাল দেখছি না,’ জেসপারসেন বললো সন্দেহের সুরে।
ঠিকই বলেছে লোকটা। লেসাল অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেটার জায়গায় জো দেখতে পাচ্ছে কাপড়ের ছাদওয়ালা একটা ফোর্ড কুপ, একেবারেই ছোট্ট একটা গাড়ি। অনেক পুরোনো, ১৯২৯ সালের, অনুমান করলো সে। কালো আর ১৯২৯ সালের মডেল-এ ফোর্ড। পুরোপুরি মূল্যহীন; জেসপারসেনের চেহারা দেখেই বুঝতে পারছে।
আর কোনো আশা নেই। সে কখনোই ডি মোয়েন যেতে পারবে না। আর টিভির বিজ্ঞাপনে রানসাইটার স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, এই যেতে না পারার অর্থ মৃত্যু—ঠিক যেভাবে ওয়েন্ডি আর আলের মৃত্যু হয়েছে। এটা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
তার চেয়ে বরং ভালো হবে অন্য কোনো উপায়ে মৃত্যুকে বেছে নেওয়া। উবিক, সিদ্ধান্ত নিলো সে। ফোর্ড গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। ঐ যে, তার আসনের পাশে, ডাকে যে বোতলটা পেয়েছিল সেটা পড়ে আছে অলস ভঙ্গিতে। বোতলটা হাতে নিয়ে এমন একটা বিষয় আবিষ্কার করলো যাতে সে মোটেও বিস্মিত হলো না। বোতলটাও গাড়ির মতোই পশ্চাদগামী হয়েছে। জোড়াবিহীন এবং পুরোপুরি চ্যাপ্টা, গায়ে অসংখ্য আঁচড়ের দাগ, কাঠের ছাঁচে তৈরি করা বোতল। নিঃসন্দেহে অনেক প্রাচীন; ঢাকনাটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে হাতে তৈরি। নরম টিন দ্বারা প্রস্তুত প্যাঁচকাটা ঢাকনা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই ধরনের বোতল দেখা যেত। বোতলের গায়ে লাগানো লেবেলটাও পালটে গেছে। বোতলটা হাতে নিয়ে লেবেলের লেখাগুলো পড়লো সে—
> এলিক্সার অব ইউবিক। হারানো যৌবন পুনরুদ্ধারের নিশ্চিত সমাধান এবং পাকস্থলীর জ্ঞাত সকল প্রকার বায়ু নিষ্কাশনসংক্রান্ত সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর দাওয়াই। সেই সাথে পুরুষ এবং নারীর প্রজননক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবহারে এটি সর্বরোগ নিরাময় করে।
তার নিচে ছোট ছোট অক্ষরে আরো কিছু লেখা আছে, সেটা পড়ার জন্য বোতলটা একেবারে চোখের কাছে তুলে আনতে হলো।
> হাল ছেড়ো না, জো। আরো অনেক উপায় আছে। চেষ্টা চালিয়ে যাও। পথ খুঁজে পাবে তুমি। সৌভাগ্য কামনা করছি।
রানসাইটার, বুঝতে পারছে জো। সে এখনো আমাদের সাথে তার নিষ্ঠুর ইঁদুর-বিড়াল খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাদেরকে। সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়াটাকে বিলম্বিত করছে। কারণটা একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারবেন। হয়তো আমাদের এই চরম যন্ত্রণা উপভোগ করছে রানসাইটার, ভাবলো সে। কিন্তু সেটা তো তার চরিত্র না। আমি যে রানসাইটারকে চিনি, এটা সে না। জো এলিক্সার অব ইউবিকের বোতলটা নামিয়ে রাখলো। ওটা ব্যবহার করার আর কোনো ইচ্ছা নেই। কেবল অবাক হয়ে ভাবছে, রানসাইটারের কৌশলী ইঙ্গিতগুলো কী হতে পারে।
