উবিক – ১২

অধ্যায় ১২

আপনার টোস্টারে সুস্বাদু উবিক ঢালুন। তাজা ফল এবং অনেক রকম স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ নির্যাস থেকে প্রস্তুত। উবিক আপনার প্রাতরাশকে করে তোলে উৎসবমুখর, আপনার স্বাদে এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা! নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবহার করা নিরাপদ।

.

একজন একজন করে আমরা সবাই মারা যাচ্ছি, বিশাল গাড়িটা ব্যস্ত সড়কে চালাতে চালাতে আপনমনে কথা বলছে জো। যে যুক্তি আমি দাঁড় করিয়েছিলাম সেখানে বড় ধরনের কোনো ত্রুটি আছে। যেহেতু সবার সাথে একসাথে ছিল এডি, তার তো নিরাপদ থাকার কথা। আর আমি…বিপদ তো হওয়ার কথা ছিল আমার, ভাবলো সে। নিউ ইয়র্ক থেকে বিমানে করে এখানে আসার পথে যেকোনো সময়।

‘আমাদের সবাইকে এখন যা করতে হবে,’ ডন ড্যানির উদ্দেশে বললো সে, ‘নিশ্চিত করতে হবে যে আমাদের কেউ যদি হঠাৎ ক্লান্ত বোধ করে, তবে সাথে সাথেই বিষয়টা দলের সবাইকে জানাতে হবে। কারণ এটাই হলো প্রাথমিক লক্ষণ। আর সে কোনোভাবেই দল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না।’

ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে বসে থাকা সবার মুখোমুখি হয়ে ডন বললো, ‘তোমরা সবাই শুনেছ? যখনই কেউ ক্লান্ত বোধ করবে, সামান্য পরিমাণে হলেও, সাথে সাথে মি. চীপ অথবা আমাকে জানাবে।’ আবার জোয়ের দিকে ফিরলো। ‘তারপর?’

‘তারপর, জো?’ একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলো প্যাট কনলি। ‘তারপর আমরা কী করবো? কীভাবে করতে হবে, আমাদেরকে বলো। আমরা শুনছি।’

‘আমি অবাক হচ্ছি তোমার ট্যালেন্ট এখনো লাগাওনি দেখে,’ তাকে বললো জো। ‘আমার তো মনে হয় বর্তমান পরিস্থিতি তোমার ট্যালেন্ট প্রয়োগ করার জন্য একেবারে নিখুঁত। কেন তুমি পনেরো মিনিট অতীতে ফিরে গিয়ে এডি ডর্নকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধা দিচ্ছো না? তোমাকে রানসাইটারের সাথে যখন প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম, তখন যা করেছিলে ঠিক সেই কাজটাই করো।’

‘জি. জি. অ্যাশউড আমাকে মি. রানসাইটারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল,’ জবাব দিলো প্যাট।

‘অর্থাৎ, তুমি কিছু করবে না,’ মন্তব্য করলো জো।

মুখ টিপে হেসে স্যামি মুন্ডো বললো, ‘দুজনের মধ্যে একটু মনোমালিন্য হয়েছে গত রাতে। যখন আমরা ডিনার করছিলাম, মিস কনলি এবং মিস ডর্নের মধ্যে। মিস কনলি ওকে পছন্দ করে না। আর তাই সে কোনো সাহায্য করবে না।’

‘আমি ওকে পছন্দ করতাম,’ প্রতিবাদ করলো প্যাট।

‘তোমার ট্যালেন্ট ব্যবহার না করার পেছনে কি জোরালো কোনো কারণ আছে?’ ডন ড্যানি তাকে জিজ্ঞেস করলো। ‘ঠিকই বলেছে জো, এটা সত্যিই অদ্ভুত আর বোঝা কঠিন—অন্তত আমার জন্য—যে ঠিক কোন কারণে তুমি আমাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছো না।’

ক্ষণিকের নীরবতার পর প্যাট বললো, ‘আমার ট্যালেন্ট আর কাজ করছে না। সত্যি বলতে কী, কাজ করছে না চাঁদে বিস্ফোরণের পর থেকেই।’

‘আমাদের বলোনি কেন?’ জো প্রশ্ন করলো।

‘বলার মতো অবস্থা ছিল না আমার। কেন বুঝতে পারছো না,’ জবাব দিলো প্যাট। ‘এমন একটা তথ্য আমি স্বেচ্ছায় কেন তোমাদেরকে জানাবো, যে আমি আর কিছু করতে পারবো না? আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এরকম আগে কখনোই হয়নি। বলতে গেলে আমার পুরোটা জীবন আমি এই ট্যালেন্ট নিয়েই বেঁচে ছিলাম।’

‘ঠিক কখন—’ বলতে শুরু করলো জো।

‘রানসাইটারের সাথে চাঁদে ঘটনাটা ঘটার সাথে সাথেই। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করার আগে থেকেই।’

‘অর্থাৎ, তুমি অনেক আগে থেকেই জানো,’ জো বললো।

‘আমি নিউ ইয়র্কে আবার চেষ্টা করেছিলাম, তুমি জুরিখ থেকে ফিরে আসার পর। আমি এটাও বুঝতে পেরেছিলাম যে ওয়েন্ডির ভয়ংকর কিছু একটা হয়েছে। আর আমি ওই মুহূর্তেও চেষ্টা করছি। যে মুহূর্তে তুমি আমাদের জানালে যে এডি ডর্ন হয়তো মারা গেছে, ঠিক ঐ মুহূর্ত থেকেই। হয়তো বা এই কারণে কাজ করছে না যে আমরা এখন রয়েছি একটা প্রাচীন সময়ে। ১৯৩৯ সালে হয়তো সিওনিক ট্যালেন্ট কাজ করে না। কিন্তু চাঁদে কেন কাজ করেনি সেটার ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। যদি-না এমন হয়ে থাকে যে চাঁদ থেকে ফিরে আসার সময়েই আমরা অতীতে চলে এসেছিলাম, যদিও সেটা বুঝতে পারিনি।’ গভীর আর অন্তর্মুখী এক নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল সে। বিষণ্নভাবে ডি মোয়েনের রাস্তাগুলো দেখছে। তার আত্মবিশ্বাসী, বেপরোয়া মুখে ফুটে আছে নিদারুণ হতাশার ছাপ।

সবকিছু মিলে যাচ্ছে, আপনমনে ভাবছে জো। ওর সময় পরিভ্রমণ ট্যালেন্ট আর কাজ করছে না। এটা তো আসলে ১৯৩৯ সাল না, আর আমরাও সময়ের গণ্ডির পুরোপুরি বাইরে; এতেই প্রমাণিত হয় যে আলের ধারণা সঠিক ছিল। গ্রাফিতিগুলো সঠিক ছিল। এটাই অর্ধ-জীবন, দুটো ছড়াতে যেমন বলা হয়েছে ঠিক তেমন।

যদিও গাড়িতে ওর সাথে যারা আছে তাদের কাউকেই কিছু বললো না সে। কী লাভ ওদেরকে বলে যে আর কোনো আশা নেই? নিজেকেই বোঝালো সে। খুব শীঘ্রই ওরা নিজেরাই বুঝতে পারবে। সবচেয়ে বুদ্ধিমান যারা, যেমন ড্যানি, হয়তো ইতোমধ্যেই বুঝে ফেলেছে। আমি যা বলেছি এবং যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাদেরকে যেতে হয়েছে সেটার।

‘ব্যাপারটা কি তোমাকে সত্যিই ভাবাচ্ছে,’ ডন ড্যানি জিজ্ঞেস করলো। ‘ওর ট্যালেন্ট আর কাজ করছে না, এই বিষয়টা?’

‘অবশ্যই,’ মাথা নেড়ে বললো সে। ‘আমি আশা করেছিলাম হয়তো ওর সাহায্য নিয়ে পরিস্থিতি বদলানো যাবে।’

‘অন্য কোনো ব্যাপার আছে এখানে।’ ডন ড্যানি তার তীক্ষ্ণ, সহজাত বুদ্ধি দিয়ে ঠিকই বুঝে নিতে পেরেছে। হাত দিয়ে ইশারার একটা ভঙ্গি করলো সে। ‘আমি তোমার কণ্ঠস্বর শুনেই হয়তো বুঝেছি। তবে যেভাবেই হোক, আমি জানি এর অন্তর্নিহিত কোনো অর্থ আছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থ। আর এই অর্থ চিৎকার করে কিছু একটা বলছে।’

‘আমি কি সোজা যাবো?’ তিন রাস্তার মোড়ে গাড়ির গতি কমিয়ে বললো জো।

‘ডান দিকে মোড় নাও,’ টিপি জ্যাকসন বললো।

‘ইটের তৈরি একটা দালান দেখতে পাবে তুমি,’ প্যাট বললো। ‘একটা নিয়ন সাইন আছে যেটা কেবল উপরে আর নিচে ওঠানামা করছে। দ্য মেয়ারমন্ট হোটেল। জঘন্য একটা জায়গা। প্রতি দুই কামরার জন্য একটা শৌচাগার, গোসল করার জন্য শাওয়ারের বদলে রয়েছে টাব। আর খাবারের কথা কী বলবো। আরো জঘন্য। একমাত্র যে পানীয়টা ওরা বিক্রয় করে সেটার নাম নেহি বা ঐরকমই কিছু একটা।’

‘খাবার আমার পছন্দ হয়েছে,’ ডন ড্যানি বললো। ‘প্রোটিন সিনথেটিক্সের বদলে আসল গরুর মাংস। সত্যিকারের স্যালমন—’

‘তোমাদের মুদ্রাগুলো কি ঠিক আছে?’ জো জিজ্ঞেস করলো। পর মুহূর্তেই সে একটা জোরালো, তীক্ষ্ণ শব্দ শুনতে পেল। তার পেছনে সড়কে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি কমছে আর বাড়ছে।

‘কী হচ্ছে?’ ডন ড্যানিকে জিজ্ঞেস করলো সে।

‘আমি জানি না,’ ডন ড্যানি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো।

‘পুলিশের সাইরেন,’ স্যামি মুন্ডো বললো। ‘বাঁক নেওয়ার সময় তুমি কোনো সংকেত দাওনি।’

‘কীভাবে দেবো?’ জো বললো। ‘স্টিয়ারিঙের আশেপাশে তো কোনো হাতল নেই।’

‘হাত দিয়ে সংকেত দেওয়া উচিত ছিল তোমার,’ স্যামি বললো। সাইরেনের শব্দটা আরো কাছে চলে এসেছে; জো মাথা ঘুরিয়ে দেখলো একটা মোটরসাইকেল নাছোড়বান্দার মতো তাদের পেছন পেছন আসছে। গাড়ির গতি কমালো সে, বুঝতে পারছে না কী করবে। ‘ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড় করাও,’ স্যামি পরামর্শ দিলো তাকে।

একপাশে গাড়ি থামালো জো। মোটরসাইকেল থেকে নেমে এলো তরুণ, ছুঁচোমুখো এক পুলিশ। বড় বড় দুই চোখের কঠোর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো জোকে। ‘লাইসেন্স দেখান,’ বললো সে।

‘নেই,’ জো বললো। ‘একটা টিকেট ধরিয়ে দিয়ে আমাদের যেতে দিন।’ হোটেলটা এখন দেখতে পাচ্ছে সে। ডন ড্যানিকে বললো, ‘তুমি বরং ওখানে চলে যাও, তুমি আর বাকি সবাই।’ উইলিস-নাইট তাদেরকে পেরিয়ে হোটেলের দিকে এগোচ্ছে। ডন ড্যানি, প্যাট, স্যামি মুন্ডো এবং টিপি জ্যাকসন গাড়ি থেকে নামলো। উইলিস-নাইটের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলো ওরা। যেটা এখন হোটেলের উলটো পাশের ফুটপাথ ঘেঁষে থেমে দাঁড়াচ্ছে। জোকে রেখে গেল একা, পুলিশের মুখোমুখি।

‘আপনার কোনো পরিচয়পত্র আছে?’ পুলিশ জিজ্ঞেস করলো।

নিজের ওয়ালেটটা তার হাতে দিলো জো। বেগুনি রঙের অমোচনীয় একটা পেন্সিল দিয়ে টিকেট লিখলো পুলিশ। প্যাড থেকে সেটা ছিঁড়ে জোয়ের হাতে দিলো। ‘সংকেত অমান্য করা, লাইসেন্স নেই। কোথায় এবং কখন হাজিরা দিতে হবে ওখানে লেখা আছে।’ খটাস করে টিকেট বইটা বন্ধ করলো পুলিশ। জোয়ের ওয়ালেট ফিরিয়ে দিলো। তারপর ফিরে গেল মোটরসাইকেলের কাছে। সেটা চালু করে মিশে গেল ব্যস্ত সড়কে, একবারও পেছন ফিরে তাকালো না।

কোনো এক রহস্যময় কারণে টিকেটটা পকেটে রাখার আগে সেখানে কী লেখা আছে সেটা পড়ার জন্য তাকালো জো। তারপর আবার পড়লো—এবার ধীরে ধীরে। বেগুনি রঙের অমোচনীয় পেন্সিলে সেই পরিচিত হিজিবিজি হস্তাক্ষরে লেখা:

> আমি যা ভেবেছিলাম তুমি এখন তার চেয়েও বেশি বিপদে আছো। প্যাট কনলি যা বলেছে—

এরপরে আর কিছু নেই। বাক্যটা শেষ না করেই থেমে গেছে। সে অবাক হয়ে ভাবলো যে মেসেজটা কীভাবে শেষ হতে পারতো। এখানে কি আরো কিছু লেখা আছে? কাগজের টুকরোটা ঘুরিয়ে অন্য পাশটা দেখলো। কিছু লেখা নেই। আবার সোজা করলো। হাতে লেখা কিছু নেই, কিন্তু কাগজের একেবারে নিচে, পুরোনো যুগের প্যাঁচানো ছোট ছোট অক্ষরে নিচের কথাগুলো টাইপ করা:

> নির্ভরযোগ্য ঘরোয়া প্রতিকার আর পরীক্ষিত ঔষধের জন্য আর্চারের ঔষধের দোকানে খোঁজ করো। স্বল্প মূল্যে সব পাবে।

খুব একটা কাজের কিছু না, ভাবলো জো। কিন্তু তারপরেও, ডি মোয়েনের ট্রাফিক পুলিশের দেওয়া টিকেটে এমন কিছু লেখা থাকার কথা না। এটা নিঃসন্দেহে আরেকটা আত্মপ্রকাশ, ঠিক ওটার উপরের বেগুনি হস্তাক্ষরের মতো।

পিয়ার্স-অ্যারো থেকে নেমে সবচেয়ে কাছের ছোট দোকানটাতে ঢুকলো সে। পত্রিকা, ক্যান্ডি আর তামাকের দোকান। ‘আপনার ফোন বুক একটু ব্যবহার করা যাবে?’ প্রশস্ত মুখের হাস্যোজ্জ্বল দোকান মালিককে জিজ্ঞেস করলো সে।

‘পেছন দিকে,’ দোকান মালিক তার মোটা বুড়ো আঙুল দিয়ে ইশারা করে আন্তরিক সুরে বললো।

ফোন বুকটা হাতে নিয়ে ছোট দোকানের স্বল্প আলোতে আর্চারের ঔষধের দোকানের ঠিকানা খুঁজতে লাগলো জো। কিন্তু পেল না। ফোন বুকটা রেখে দোকান-মালিকের কাছে গেল জো। ঐ মুহূর্তে একটা ছোট ছেলের কাছে ন্যাকো ওয়েফার বিক্রয় করছিল সে। ‘আর্চারের ঔষধের দোকানটা কোথায় বলতে পারবেন?’ জিজ্ঞেস করলো জো।

‘কোথাও না,’ দোকান মালিক বললো। ‘অন্তত আর কখনো পাবেন না।’

‘কেন?’

‘বেশ কয়েক বছর আগেই দোকানটা বন্ধ হয়ে গেছে।’

‘দোকানটা কোথায় ছিল আমাকে বলুন,’ জো বললো। ‘আরো ভালো হয় পথের নিশানা একটা কাগজে যদি এঁকে দিতে পারেন।’

‘কাগজে আঁকতে হবে না। বলে দিচ্ছি ওটা কোথায় ছিল,’ বিশাল লোকটা সামনে ঝুঁকে তার দোকানের দরজা দিয়ে বাইরের দিকে ইশারা করলো। ‘ঐ যে বার্বারস পোলটা দেখতে পাচ্ছেন? ওটার কাছে গিয়ে উত্তর দিকে তাকাবেন। ওদিকটা হচ্ছে উত্তর দিক।’ দিক নির্দেশনাও দেখিয়ে দিলো সে। ‘ত্রিকোণ স্তম্ভ দিয়ে বানানো একটা প্রাচীন বাড়ি দেখতে পাবেন আপনি। হলুদ রঙের। উপরের তলার কিছু অ্যাপার্টমেন্ট এখনো বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু দোকানপাটগুলো সব নিচের তলায়, ওগুলোর সবই পরিত্যক্ত। যদিও সাইনবোর্ডটা ঠিকই দেখতে পাবেন: আর্চার ঔষধালয়। সাইনবোর্ডটা পেলেই আপনি দোকানটাও পেয়ে যাবেন। আসলে হয়েছিল কী, এড আর্চার হঠাৎ গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, এবং—’

‘ধন্যবাদ।’ দোকানের দরজার দিকে এগোল জো, বেরিয়ে এলো পড়ন্ত বিকেলের ম্রিয়মান আলোতে। দ্রুত হাঁটতে শুরু করলো বার্বার পোলের দিকে এবং ওখান থেকে উত্তর দিকে তাকালো।

লম্বা, রংচটা হলুদ ভবনটা দেখতে পেল সে দৃষ্টিসীমার ভেতরে। কিন্তু কিছু একটা অদ্ভুত মনে হলো তার কাছে। একটা আলোর ঝলক, একধরনের অস্থিরতা, যেন ভবনটা একটা স্থিরতার দিকে এগিয়ে এসে পরক্ষণেই আবার অলীক অনিশ্চয়তার দিকে ফিরে যাচ্ছে। এক দোদুল্যমানতা, প্রতিটি ধাপ স্থায়ী হচ্ছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড এবং তারপরেই ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ঠিক বিপরীত অবস্থায়। যেন কাঠামোর নিচে নিয়মিত ব্যবধানে জীবনের স্পন্দন নেচে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে ভবনটাই যেন জীবন্ত।

হয়তো বা আমি শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি, ভেবেই চলেছে সে। পরিত্যক্ত ঔষধের দোকানের দিকে এগোতে শুরু করলো সে, ওটার উপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই। ওটার স্পন্দন লক্ষ করছে জো, দেখছে ওটার দুই অবস্থার মধ্যে নিরন্তর রূপান্তর। যতই ওটার কাছে পৌঁছাচ্ছে, বিকল্প অবস্থার প্রকৃতি আরো ভালো করে উপলব্ধি করতে পারছে। স্থিতিশীলতার তীব্র আকর্ষণে এটি রূপান্তরিত হচ্ছে হোমিওস্ট্যাটিকভাবে পরিচালিত তার নিজস্ব সময়ের একটি রিটেইল হোম-আর্ট আউটলেটে। মানে যে সে সাভির্স প্রতিষ্ঠানে আধুনিক কোন-অ্যাপ্টের জন্য দশ হাজার পণ্য বিক্রয় করা হয়। পরিণত জীবনের একটা বড় সময় সে এই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত এবং অত্যন্ত সক্রিয় এই ছদ্ম ব্যবসায়ীদের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।

অন্যদিকে, অনিশ্চয়তার ব্যাপকতার কারণে এটি আবার রূপান্তরিত হলো সময়ের সাথে সঙ্গতিহীন এবং পুরোনো যুগের মতো সজ্জিত কাঠামোর ছোট এক ঔষধের দোকানে। অপ্রশস্ত শার্সিতে ঝুলছে হার্নিয়া বেল্ট, সাজানো রয়েছে সারি সারি চশমার কাচ, একটা হামানদিস্তা, নানা রঙের জড়িবুটির কৌটা, একটা বোর্ডে হাতে লেখা রয়েছে চিকিৎসক। কাচের ছিপিওয়ালা বড় বড় বোতলে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী প্যান্ডোরার প্যাটেন্ট ঔষধ আর দেখতে ঔষধের মতো তবে সক্রিয় উপাদানবিহীন প্লেসিবো…জানালাগুলোর ঠিক উপরেই সমতল কাঠের বোর্ডে লেখা, আর্চার ঔষধালয়। ফাঁকা, পরিত্যক্ত, অনেক দিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে এমন কোনো চিহ্ন নেই; এর ১৯৩৯ সালের পর্যায়টি কোনো না কোনোভাবে মুছে গেছে। তো এখানে প্রবেশ করলে আমি হয় আরো অতীতে চলে যাবো, অথবা আমার নিজস্ব সময়ের মোটামুটি কাছাকাছি ফিরতে পারবো। আরো অতীতে ফিরে যাওয়া, ১৯৩৯ সালের ঠিক পূর্বের পর্যায়ে, আমার ঠিক এটাই প্রয়োজন।

এই মুহূর্তে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে, বাস্তবিকই অনুভব করতে পারছে পরিবর্তনশীলতার টান। মনে হচ্ছে, কেউ যেন তাকে একবার পেছনে টেনে নিচ্ছে, পর মুহূর্তে সামনে এগোল, আবার পেছনে যাচ্ছে। পথচারীরা তাকে পার হয়ে যাচ্ছে, কোনো কিছু উপলব্ধি না করেই। নিঃসন্দেহে, সে যা দেখছে তাদের কেউই সেটা দেখছে না: তারা না পারছে আর্চার ঔষধালয় অনুভব করতে, না পারছে ১৯৯২ সালের হোম-আর্ট আউটলেট উপলব্ধি করতে। আর এটাই তাকে সবচেয়ে বেশি বিহ্বল করে দিলো।

কাঠামোটি তার পুরোনো ধাপে রূপান্তরিত হওয়ার সাথে সাথেই সামনে এগোল জো, চৌকাঠ পেরিয়ে প্রবেশ করলো আর্চার ঔষধালয়ে। ডান দিকে মার্বেল পাথরের বড় একটা কাউন্টার। তাকের উপর অসংখ্য বাক্স। সবগুলোই বিবর্ণ আর মলিন। পুরো দোকানটাতেই কালোর আধিক্য। তা শুধু আলোর স্বল্পতার কারণেই নয় বরং মনে হয় যেন আত্মরক্ষার প্রয়োজনে। যেন এটা তৈরিই হয়েছে ছায়ার সাথে মিশে থাকার জন্য, একত্র হওয়ার জন্য, যেন সব সময় আড়ালে থাকার একটা অভিপ্রায়। এই আঁধার ভাবটা অসম্ভব ভারী আর ঘন; তাকে প্রায় নুইয়ে দিচ্ছে। যেন তার পিঠে স্থায়ীভাবে একটা বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এটার স্পন্দন এখন পুরোপুরি থেমে গেছে। অন্তত তার জন্য, যেহেতু সে ভেতরে প্রবেশ করেছে। এখন সে ভাবছে ভেতরে আসার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল কি না। যদিও অনেক দেরি হয়ে গেছে, তারপরও তার হাতে কী কী বিকল্প আছে এবং ফলাফল কী হতে পারে, তা চিন্তা করলো। প্রত্যাবর্ত—হয়তো বা—তার নিজের সময়ে। ক্রমাগত পশ্চাদমুখী সময়কে ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়া এই বিকৃত পৃথিবী থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে, হয়তো বা চিরতরে। বেশ, সিদ্ধান্ত নিলো সে, দেখা যাক কী হয়। ঔষধের দোকানের ভেতরে সে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগলো। পিতল আর কাঠের কাঠামো পর্যবেক্ষণ করছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। কোনো সন্দেহ নেই এগুলো ওয়ালনাট কাঠ…অবশেষে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো সে।

নিঃশব্দে তার মুখোমুখি হলো এক যুবক। তার পরনে অনেকগুলো বোতাম লাগানো স্যুট আর ভেস্ট, চেহারায় বুদ্ধির ঝলক। কোনো কথা না বলেই দীর্ঘ একটা সময় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলো তারা। পুরো দোকানের ভেতর একমাত্র শব্দ হচ্ছে দেয়ালঘড়ির শব্দ, যার গোলাকার অবয়বে সময়ের হিসাবগুলো ল্যাটিন সংখ্যায় লেখা। ওটার পেন্ডুলাম টিক টিক করে আগুপিছু করছে অবিরাম। আশেপাশের সবকিছুই যেন ঘড়িটার পেণ্ডুলামের মত দোদুল্যমান। জো বললো, ‘আমি এক বোতল উবিক চাই।’

‘মলম?’ ঔষধওয়ালা জানতে চাইলো। ঠোঁটের সাথে তার শব্দের সঠিক সামঞ্জস্য আছে বলে মনে হলো না জোয়ের। প্রথমে তার মুখটা উন্মুক্ত হল, ঠোঁটগুলো নড়লো, এবং তার কিছুক্ষণ পরে তার কথা শুনতে পেল সে। ‘এটা কি মলম?’ জো বললো। ‘আমি ভেবেছিলাম এটা খাওয়ার ঔষধ।’

ঔষধওয়ালা অনেকক্ষণ কোনো সাড়া দিলো না। যেন দুজনের মাঝে সাগরসম ব্যবধান, বহু যুগের দূরত্ব। অবশেষে তার মুখ আবার উন্মুক্ত হলো। আবার ঠোঁট দুটো নড়তেই তার কথাগুলো শুনতে পেল জো। ‘উবিকের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, যেহেতু প্রস্তুতকারক এটি আরো অনেক উন্নত করেছেন। আপনি হয়তো নতুনটার বদলে পুরোনো উবিকের সাথে পরিচিত।’ একদিকে ঘুরলো ঔষধওয়ালা। তার হাঁটাচলার মধ্যে একটা বিভ্রান্তিকর ভাব। যেন নাচের ছন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে ধীর লয়ে। ভঙ্গিটা দৃষ্টিনন্দন হলেও অসম্ভব চাপ ফেলে মনের উপর। ‘আজকাল উবিক সংগ্রহ করতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়,’ ভেসে ভেসে আবার ফিরে আসার সময় বললো সে। তার ডান হাতে ঢাকনা লাগানো একটা টিনের বাক্স, যেটা জোয়ের সামনে কাউন্টারে রাখলো। ‘এখন উবিক পাওয়া যায় পাউডার আকারে আর এর সাথে আপনাকে কয়লার পেস্ট মেশাতে হবে। কয়লার পেস্ট কিন্তু আলাদাভাবে নিতে হবে। তবে তা আমি আপনাকে কম দামেই দিতে পারবো। কিন্তু উবিক পাউডারের দামটা একটু বেশিই। চল্লিশ ডলার।’

‘কী আছে এতে?’ জিজ্ঞেস করলো জো। দাম শুনে দমে গেছে।

‘সেটা উৎপাদনকারীর গোপন তথ্য।’

ঢাকনা লাগানো টিনের কৌটা হাতে নিয়ে আলোতে তুলে ধরলো জো। ‘লেবেলে কী লেখা আছে দেখতে পারি?’ ‘নিশ্চয়ই।’ রাস্তা থেকে আসা ম্লান আলোতে কৌটার গায়ে ছাপানো লেখাগুলো অবশেষে পড়তে পারলো সে। ট্রাফিক পুলিশের দেওয়া টিকেটের মেসেজটা যেখানে শেষ হয়েছিল তারপর থেকেই এই মেসেজ শুরু হয়েছে, ঠিক যেখানে রানসাইটারের হাতে লেখা মেসেজ আচমকা শেষ হয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে।

> পুরোপুরি মিথ্যা। সে মোটেও—আবারও বলছি—বোমা বিস্ফোরণের পর সে মোটেও তার ট্যালেন্ট কাজে লাগানোর চেষ্টা করেনি। ওয়েন্ডি রাইট বা আল হ্যামন্ড বা এডি ডর্নকে পুনরুদ্ধার করার কোনো চেষ্টাই করেনি সে। মেয়েটা তোমার সাথে অভিনয় করছে, জো। আর তাই পুরো বিষয়টা আমি নতুন আঙ্গিকে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি। একটা সমাধান পাওয়ামাত্রই আমি তোমাকে জানাবো। কিন্তু ততক্ষণ অত্যন্ত সতর্ক থাকবে। ভালো কথা, উবিক পাউডার রোগ নিরাময়ের সর্বজনবিদিত মহৌষধ, যদি এটি ব্যবহারের নির্দেশনাগুলি অক্ষরে অক্ষরে এবং আন্তরিকতার সাথে মেনে চলা হয়।

‘আমি যদি একটা চেক লিখে দেই কাজ হবে?’ ঔষধওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলো জো। ‘আমার কাছে এই মুহূর্তে চল্লিশ ডলার নেই। আর এই ঔষধের উপর আক্ষরিক অর্থেই বাঁচা-মরা নির্ভর করছে।’ জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢোকালো চেক বই বের করে আনার জন্য।

‘আপনি ডি মোয়েনের স্থায়ী বাসিন্দা নন, তাই না?’ ঔষধওয়ালা বললো। ‘আপনার কথা শুনেই বুঝতে পেরেছি। না, এত বড় চেক নেওয়ার জন্য আপনার সাথে আমার আরো ভালো পরিচয় থাকা উচিত। গত এক সপ্তাহে আমরা অসংখ্য বাতিল চেক পেয়েছি, আর তার সবগুলোই ছিল শহরের বাইরে থেকে আসা মানুষদের।

‘তাহলে ক্রেডিট কার্ড?’

‘ক্রেডিট কার্ড আবার কী জিনিস?’ ঔষধওয়ালা জিজ্ঞেস করলো।

উবিকের কৌটাটা নামিয়ে রেখে কোনো কথা না বলেই ঔষধের দোকান থেকে ফুটপাথে বেরিয়ে এলো জো। রাস্তা পেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলো হোটেলের দিকে। খানিক পরে থেমে দাঁড়ালো ঔষধের দোকানটা আবার দেখার জন্য। সে দেখতে পেল জরাজীর্ণ হলুদ রঙের একটি ভবন, উপর তলার জানালাগুলোতে পর্দা ঝুলছে, নিচের তলা পুরোপুরি পরিত্যক্ত এবং কাঠের তক্তা দিয়ে আটকানো; তক্তার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল নিকষ অন্ধকার, ভাঙা জানালার শূন্য গহ্বর। প্রাণহীন।

তাহলে এক টিন উবিক পাউডার কেনার শেষ সুযোগটাও হারিয়ে গেল। এমনকি এই মুহূর্তে ফুটপাতে চল্লিশ ডলার কুড়িয়ে পেলেও কোনো লাভ নেই। কিন্তু রানসাইটারের সতর্কবার্তার বাকি অংশটা পেয়েছে সে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সতর্কবাণী এমনকি সত্য না-ও হতে পারে। এটা হতে পারে মরণোন্মুখ মস্তিষ্কের বিকৃত এবং বিভ্রান্ত মতামত। অথবা ইতোমধ্যেই মৃত একটা মস্তিষ্ক—টিভির বিজ্ঞাপনে যেমনটা হয়েছিল। যিশু! প্রচণ্ড হতাশার সাথে নিজেকে বললো সে। যদি এটাই সত্য হয়ে থাকে?

ফুটপাথের উপর অনেক মানুষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আগ্রহের সাথে কী যেন দেখছে আকাশে। বিষয়টা লক্ষ করে জো নিজেও তাকালো আকাশের দিকে। হাত দিয়ে চোখ আড়াল করলো সূর্যের তীর্যক আলো থেকে বাঁচার জন্য। সাদা ধোঁয়ার মধ্যে একটা ছোট বিন্দু চিহ্নিত করতে পারলো সে; অনেক উঁচুতে একটা মনোপ্লেন ধোঁয়া ছড়িয়ে আকাশে কিছু একটা লিখছে। সে এবং অন্য পথচারীরা যখন দেখছিল ততক্ষণে নির্গত ধোঁয়া একটা বার্তা তৈরি করেছে।

> বিশ্বাস হারিও না, জো!

বলা সহজ, নিজেকেই শোনালো জো। লেখার মতোই সহজ। চরম হতাশা নিয়ে এবং পুরোনো আতঙ্কটা আবার ফিরে আসার লক্ষণ উপলব্ধি করে মেয়ারমন্ট হোটেলের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করলো সে।

***

ঔপনিবেশিক আমলের উঁচু ছাদওয়ালা হোটেলের গাঢ় লাল বর্ণের কার্পেটে মোড়ানো লবিতে ডন ড্যানির সাথে দেখা হলো তার। ‘আমরা ওকে পেয়েছি,’ সে বললো। ‘সব শেষ, অন্তত তার জন্য। দৃশ্যটা মোটেও সহ্য করার মতো ছিল না। এখন ফ্রেড জাফস্কিকেও পাওয়া যাচ্ছে না। আমি ভেবেছিলাম সে অন্য গাড়িটায় আছে, আর ওরা ভেবেছিল যে আমাদের সাথে আছে। এখন এটা পরিষ্কার যে সে দুই গাড়ির কোনোটাতেই ওঠেনি। সে নিশ্চয়ই মরচুয়াবিতে ফিরে গেছে।’

‘এখন সব দ্রুততার সাথে ঘটছে,’ জো বললো। ও ভাবছে উবিক কী পরিমাণ পার্থক্য তৈরি করতে পারতো—যে বস্তু বিভিন্ন রূপে তাদের সামনে বারবার দেখা দিয়েও থেকে যাচ্ছে অধরা। আমার ধারণা সেটা আর কখনোই আমাদের জানা হবে না, উপসংহারে পৌঁছালো সে। ‘এখানে ড্রিংকস পাওয়া যাবে? তোমার টাকা-পয়সার কী অবস্থা? আমার কাছে যা আছে তার সবই বাতিল।’

‘আমাদের সব খরচ মরচুয়াবি দিচ্ছে। রানসাইটার তেমন নির্দেশই দিয়ে গেছে ওদেরকে।’

‘হোটেলের খরচসহ?’ তার কাছে এই বিষয়টা অদ্ভুত মনে হলো। এত কিছুর ব্যবস্থা কীভাবে হলো? ‘এই মেসেজটা ভালো করে দেখো,’ ডন ড্যানিকে বললো সে। ‘যেহেতু আর কেউ নেই এখন আমাদের কাছাকাছি।’ কাগজের টুকরোটা ডন ড্যানির হাতে দিলো জো। ‘মেসেজের বাকি অংশটা আমার কাছে আছে। ওখানেই গিয়েছিলাম, বাকি অংশ সংগ্রহ করার জন্য।’

লেখাটা পড়লো ডন ড্যানি, তারপর আবার পড়লো। তারপর ধীরেসুস্থে কাগজের টুকরোটা ফিরিয়ে দিলো জোকে। ‘রানসাইটারের ধারণা প্যাট কনলি মিথ্যে কথা বলছে?’ সে জিজ্ঞেস করলো।

‘হ্যাঁ,’ জো বললো।

‘বুঝতে পারছো এই তথ্যের গুরুত্ব কতখানি?’ তীব্র কণ্ঠে বললো সে। ‘তার মানে সে চাইলেই সবকিছু প্রতিহত করতে পারতো। আমাদের সাথে যা কিছু ঘটেছে, রানসাইটারের মৃত্যু থেকে শুরু করে।’

‘এটার গুরুত্ব তার চেয়েও অনেক বেশি,’ জো বললো।

জোয়ের চোখে চোখ রেখে ড্যানি বললো, ‘ঠিক বলেছ। হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা বলেছ তুমি।’ চমকে উঠলো সে, তীব্র আঘাত পেয়েছে। সবকিছু উপলব্ধি করে চেহারায় বিষণ্ন, বিহ্বল একটা ভাব ফুটে উঠলো।

‘বিষয়টা ভাবতে আমার ভালো লাগছে না,’ জো বললো। ‘আমার আসলে কিছুই ভালো লাগছে না। পরিস্থিতি অনেক খারাপ। আগে যা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ। এমনকি আল হ্যামন্ড যা বিশ্বাস করেছিল পরিস্থিতি তার চেয়েও খারাপ।’

‘কিন্তু এটা একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা,’ ড্যানি বললো।

‘শুরু থেকেই বোঝার চেষ্টা করছি কেন এসব ঘটছে,’ বললো জো। ‘আমি নিশ্চিত ছিলাম যে যদি জানতে পারি কেন—’ কিন্তু আল এটা ভাবেনি, নিজেকেই বললো সে। আমরা দুজনেই এই সম্ভাবনাটা আমাদের মন থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। সঙ্গত কারণেই।

‘বাকিদের কিছু বলার দরকার নেই,’ ড্যানি বললো। ‘এটা সত্যি না-ও হতে পারে। আবার যদি সত্যি হয়ও, এটা জেনে তাদের কোনো লাভ হবে না।’

‘কী জানার কথা বলছো?’ তাদের পেছন থেকে প্যাট কনলি জিজ্ঞেস করলো। ‘কী তাদের উপকারে আসবে না?’ ও এখন তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার গভীর কালো চোখদুটোতে বুদ্ধির ছটা। সেই সাথে অসম্ভব রকমের শান্ত। ‘এডি ডর্নের ঘটনাটা অত্যন্ত মর্মান্তিক,’ ও বললো। ‘ফ্রেড জাফস্কি, আমার ধারণা সেও আর নেই। অর্থাৎ, আমরা মাত্র অল্প কয়েকজনই এখন পর্যন্ত টিকে আছি, তাই না? এর পরে কার পালা আসবে সেটাই ভাবছি আমি।’ ওকে মনে হলো পুরোপুরি নিরুদ্বেগ, পূর্ণ নিয়ন্ত্ৰণ আছে নিজের উপর। ‘টিপি তার নিজের কামরায় শুয়ে আছে। সে অবশ্য বলেনি যে সে ক্লান্ত বোধ করছে, কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের ধরে নেওয়া উচিত যে সে ক্লান্ত। তোমরা নিশ্চয়ই আমার সাথে একমত?’

খানিক বিরতির পর ডন ড্যানি বললো, ‘হ্যাঁ, আমি একমত।’

‘তোমার মেসেজটা কী বলছে, জো?’ প্যাট জিজ্ঞেস করলো। একটা হাত বাড়িয়ে দিলো। ‘আমি দেখতে পারি?’

কাগজের টুকরোটা ওর হাতে দিলো জো। সেই মুহূর্ত উপস্থিত, ভাবলো সে। এখন সবকিছুই বর্তমানে পরিবর্তিত হবে। এক নিমেষেই।

‘পুলিশ আমার নাম জানলো কীভাবে?’ কাগজের টুকরোটায় চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো প্যাট। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো প্রথমে জো, তারপর ডন ড্যানির দিকে। ‘এখানে আমার ব্যাপারে লেখা আছে কেন?’

হাতের লেখাটা সে চিনতে পারেনি, বুঝতে পারলো জো। কারণ এই হাতের লেখার সাথে আমাদের মতো পরিচিত নয় সে। ‘রানসাইটারের লেখা,’ জো বললো। ‘তুমিই সবকিছু করেছ, তাই না, প্যাট? তুমি, তোমার ট্যালেন্ট দিয়ে। তোমার কারণেই আমরা এই পশ্চাদগামী সময়ে চলে এসেছি।’

‘তুমিই আমাদের সবাইকে হত্যা করছো,’ প্যাটকে বললো ডন ড্যানি। ‘একজন একজন করে। কিন্তু কেন?’ জোয়ের উদ্দেশে বললো, ‘আমাদের ক্ষতি করার কী কারণ থাকতে পারে ওর? সে তো আমাদেরকে চিনেই না, একেবারেই না।’

‘এজন্যই কি তুমি রানসাইটার এসোসিয়েটসে এসেছিলে?’ জো জিজ্ঞেস করলো তাকে। চেষ্টা করছে কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখতে। কিন্তু কম্পিত কণ্ঠস্বর শুনে নিজের উপরই রেগে উঠলো। ‘জি. জি. অ্যাশউড তোমাকে খুঁজে বের করে এখানে নিয়ে আসে। সেও কি হোলিসের হয়ে কাজ করছে, এটাই কি তাহলে আসল ঘটনা? আমাদের সাথে কি তাহলে এটাই ঘটেছে—বোমা বিস্ফোরণ না, বরং তুমি?’

প্যাট শুধু হাসলো। ঠিক ঐ মুহূর্তে হোটেলের লবি বিস্ফোরিত হলো জো চীপের মুখের উপর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *