উবিক – ৭

অধ্যায় ৭

ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করার জাদুকরী উপাদান, বিস্ময়কর নতুন উবিক, সহজে ব্যবহার করা যায়। আপনার মেঝেকে করে তুলবে ঝকঝকে, তকতকে। এর নন-স্টিকি প্লাস্টিক কোটিং মোটেও ক্ষতিকারক নয়, যদি নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়। মেঝে ঘষামাজা করার কষ্টকর ঝামেলা থেকে মুক্তি, আর মনে হবে রান্নাঘরে আপনি বাতাসে ভেসে চলছেন!

.

‘এটাই হয়তো সবচেয়ে ভালো হবে,’ জো বললো, ‘যদি আমরা সরাসরি জুরিখে অবতরণ করি।’ রানসাইটারের অভিজাত আর সুসজ্জিত মহাকাশযানের মাইক্রোওয়েভ অডিওফোন তুলে নিয়ে জুরিখের স্থানীয় কোড নাম্বার ডায়াল করলো সে। ‘তাকে ইলার সাথে একই মোরাটোরিয়ামে রাখলে দুজনের সাথে একসাথে পরামর্শ করতে পারবো। বৈদ্যুতিকভাবে দুজনকে যুক্ত করা যেতে পারে, যেন তারা মিলিতভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য পরামর্শ দিতে পারে।’

‘প্রটোফেশনিক্যালি,’ ডন ড্যানি সংশোধন করে দিলো।

‘বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামের ম্যানেজারের নাম জানা আছে কারো?’ জিজ্ঞেস করলো জো।

‘হার্বার্ট বা ঐরকম কিছু একটা হবে,’ টিপি জ্যাকসন বললো। ‘জার্মান নাম।’

‘হার্বার্ট সোয়েনহেইট ভন ভলসাঙ,’ ওয়েন্ডি রাইট একটু চিন্তা করে বললো। ‘আমার মনে আছে কারণ মি. রানসাইটার একবার এই নামের অর্থ বলেছিলেন। ‘হার্বার্ট মানে পাখির কলকাকলির সৌন্দর্য। আমার যদি এমন সুন্দর একটা নাম থাকতো। তখন ঠিক এই কথাই ভেবেছিলাম।’

‘তুমি ঐ লোককে বিয়ে করলেই পারতে,’ টিটো অ্যাপাস্তাস ফোড়ন কাটলো।

‘আমি জো চীপকে বিয়ে করবো,’ শিশুসুলভ গাম্ভীর্যের সাথে মলিন আর অন্তর্মুখী সুরে বললো ওয়েন্ডি।

‘ওহ?’ প্যাট কনলি বললো। তার কালো চোখদুটো আলোকিত হয়ে উঠেছে। ‘সত্যিই?’

‘তুমি কি সেটাও পালটে দিতে পারবে?’ ওয়েন্ডি জিজ্ঞেস করলো। ‘তোমার ট্যালেন্ট দিয়ে?’

‘আমি জোয়ের সাথে একসাথে থাকছি,’ প্যাট বললো। ‘আমি জোয়ের সঙ্গিনী। আমাদের মাঝে একটা চুক্তি হয়েছে, আর সেই চুক্তি অনুযায়ী ওর জীবনযাপনের সকল খরচ আমি দেবো। আজকে সকালেই ওর কোনঅ্যাপ্টের সদর দরজা খোলার মূল্য পরিশোধ করেছি আমি, যেন সে বের হতে পারে। তা না হলে ও হয়তো এখনো তার কোনঅ্যাপ্টেই বন্দি হয়ে থাকতো।’

‘আর আমাদের চাঁদে আসাও হয়তো হতো না,’ আল হ্যামন্ড বললো। প্যাটের দিকে তাকালো সে, একটা জটিল ভাব খেলা করছে তার মুখে।

‘হয়তো আজকে হতো না,’ টিপি জ্যাকসন বললো। ‘কিন্তু একদিন না একদিন হতোই। কী এমন ক্ষতি বৃদ্ধি হতো তাতে? যাই হোক, ভালোই হয়েছে, জোয়ের একজন সঙ্গিনী আছে, যে তার সদর দরজা খোলার মূল্য পরিশোধ করে।’ জোয়ের কাঁধে বাহবা জানানোর ভঙ্গিতে চাপড় দিলো সে। তার মুখে একধরনের উজ্জ্বলতা। জোয়ের কাছে মনে হলো যেন তাতে একটা কামুক ভাব আছে। যেন তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একধরনের বিকৃত আনন্দ উপভোগ করছে সে। নিজের অন্তর্মুখী চেহারার আড়ালে মিসেস জ্যাকসন কি আসলে বিকৃতকামী?

‘মহাকাশযানের সম্পূর্ণ ফোন বুক আমাকে দাও,’ বললো জো। ‘মোরাটোরিয়ামকে জানাবো যে আমরা আসছি।’ হাতঘড়িতে সময় দেখলো সে। আরো দশ মিনিট লাগবে।

‘এই যে ফোন বুক, মি. চীপ,’ জন ইড বললো, খোঁজাখুঁজি করে নিয়ে এসেছে সে। কিবোর্ড আর মাইক্রো-স্ক্যানারসহ ভারী, চারকোনা বাক্সটা জোয়ের হাতে দিলো।

প্রথমে দেশের নামের প্রথম চারটি অক্ষর, তারপর শহরের নামের প্রথম তিনটি অক্ষর এবং সবশেষে মোরাটোরিয়ামের নামের প্রতিটি অংশের চারটি অক্ষর টাইপ করলো জো। ‘মনে হচ্ছে যেন হিব্রু,’ তার পেছন থেকে বললো প্যাট। ‘শব্দার্থিক সংকোচন।’ মাইক্রো-স্ক্যানার দ্রুত বেগে আগুপিছু শুরু করলো; বাছাই করছে, তারপর আবার বাদ দিচ্ছে। অবশেষে একটা পাঞ্চ কার্ড বেরিয়ে এলো মেশিন থেকে, কার্ডটা জো ফোনের গ্রাহক স্লটে ঢোকালো।

ধাতব শব্দে ফোন বললো, ‘এটা রেকর্ডিং।’ সবেগে কার্ডটা বের করে দিলো। ‘যে নাম্বার আমাকে দিয়েছেন, সেটা বাতিল হয়ে গেছে। কোনো সহায়তার প্রয়োজন হলে একটা লাল কার্ড—’

‘ফোন বুকটা কোন সালের?’ ইডকে জিজ্ঞেস করলো জো। ও বাক্সটাকে আবার স্টোরেজ র‍্যাকে রাখতে যাচ্ছিলো।

এক কোনায় ছাপানো লেখাগুলো দেখে ইড বললো, ‘১৯৯০। দুই বছরের পুরোনো।’

‘হতেই পারে না,’ এডি ডর্ন বললো। ‘দুই বছর আগে এই মহাকাশযান ছিলো না। এই মহাকাশযানের সবকিছুই নতুন।’

‘হয়তো রানসাইটারই এটা রেখেছেন,’ টিটো অ্যাপাস্তাস বললো।

‘মোটেও না,’ এডি বললো। ‘প্র্যাটফল ২-এর পেছনে সে জলের মতো অর্থ ব্যয় করেছে সবকিছু নিখুঁত করার জন্য, প্রচুর শ্রম দিয়েছে, ব্যবহার করেছে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি। যারা ওর সাথে কাজ করেছে তাদের সবাই এটা জানে। এই মহাকাশযান তার গর্ব আর আভিজাত্যের প্রতীক।’

‘গর্ব আর আভিজাত্যের প্রতীক ছিলো,’ সংশোধন করে দিলো ফ্র্যান্সি স্প্যানিশ।

‘আমি এটা মেনে নিতে রাজি না,’ বললো জো। ফোনের গ্রাহক স্লটে একটা লাল কার্ড ঢোকালো। ‘বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়াম, জুরিখ, সুইজারল্যান্ডের বর্তমান নাম্বার দাও,’ সে বললো। ফ্র্যান্সি স্প্যানিশকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘এই মহাকাশযান এখনো তার গর্ব আর আভিজাত্যের প্রতীক। কারণ সে এখনো আছে।’ নতুন একটা কার্ড বেরিয়ে এলো। সেটা গ্রাহক স্লটে ঢোকালো সে। এবার ফোনের কম্পিউটারাইজড মেকানিজম কোনো সমস্যা করলো না। পর্দায় ভেসে উঠলো ফ্যাকাশে, কৃশকায় এক মানুষের মুখ। এই মানুষটাই বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়াম পরিচালনা করে। লোকটাকে জো কখনোই পছন্দ করতে পারেনি।

‘আমি হের হার্বার্ট সোয়েনহেইট ভন ভলসাঙ। আপনারা কি শোকাভিভূত হয়ে আমার কাছে এসেছেন, স্যার? আমি কি আপনার নাম আর ঠিকানা পেতে পারি, যদি ঘটনাক্রমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়?’

‘একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে,’ জো বললো।

‘আমরা যেটাকে দুর্ঘটনা বলি,’ ভন ভলসাঙ বললো, ‘তা আসলে ঈশ্বরেরই খেলা। সত্যি বলতে কী, পুরো জীবনটাকেই বলা যায় একটা দুর্ঘটনা। অথচ তারপরেও—’

‘আমি আপনার সাথে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে চাই না,’ জো বললো। ‘অন্তত এই মুহূর্তে।’

‘অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখনই বরং আসল সময়, যখন ধর্মের প্রশান্ত বাণী শোক দূরীভূত করে দেয়। তা মৃত ব্যক্তি কি আপনার আত্মীয়?’

‘আমাদের নিয়োগকর্তা,’ জো বললো। ‘গ্লেন রানসাইটার, রানসাইটার এসোসিয়েটস, নিউ ইয়র্ক। তার স্ত্রী ইলা আপনার মোরাটোরিয়ামে আছে। আট থেকে নয় মিনিটের মধ্যে আমরা অবতরণ করবো। আপনি কি একটা কোল্ড-প্যাক ভ্যান সময়মতো পাঠিয়ে দিতে পারবেন?’

‘উনি এখন কোল্ড-প্যাকে?’

‘না,’ জো বললো। ‘উনি এখন ফ্লোরিডার টাম্পা বে-তে সূর্যের আলোয় নিজেকে ভাজা ভাজা করছেন।’

‘আপনার হাস্যকর জবাবের অর্থ আমি ধরে নিচ্ছি হ্যাঁ।’

‘জুরিখ স্পেসপোর্টে একটা ভ্যান প্রস্তুত রাখুন,’ জো বললো, তারপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো। বোঝা গেল এখন থেকে কী ধরনের মানুষের সাথে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। ‘রে হোলিসকে আমরা উচিত শিক্ষা দেবো,’ তাকে ঘিরে থাকা ইনার্শিয়ালদের উদ্দেশে বললো সে।

‘মি. ভলসাঙের বদলে এখন রে হোলিসের পেছনে দৌড়াবো?’ স্যামি মুন্ডো জিজ্ঞেস করলো।

‘উচিত সাজা দেবো মানে সময়-সুযোগমতো আমরা ওকে হত্যা করবো,’ বললো জো, ‘আমাদের বিরুদ্ধে এই জঘন্য ষড়যন্ত্রের জন্য।’

গ্লেন রানসাইটার এখন থেকে শুয়ে থাকবে হিমায়িত স্বচ্ছ প্লাস্টিকের কাসকেটে, সেই কাসকেট কৃত্রিম গোলাপ-পাপড়ি দিয়ে সাজানো। প্রতি মাসে একবার এক ঘণ্টার জন্য অর্ধ-জীবনে জাগিয়ে তুলতে হবে তাকে। ক্রমশ অবনতি হবে, দুর্বল হয়ে পড়বে, নিষ্প্রভ হয়ে যাবে… যিশু, জো ভাবলো, দুনিয়ার সব লোক থাকতে তার মতো একজন বৃদ্ধ মানুষের সাথেই কিনা এমন হলো?

‘যেভাবেই হোক, সে অন্তত ইলার কাছাকাছি থাকবে,’ ওয়েন্ডি বললো।

‘তা হয়তো থাকবে,’ জো বললো। ‘আশা করি তাকেও আমরা কোল্ড-প্যাকে রাখতে পারবো—’ ইতস্তত করতে লাগলো সে, কথাটা বলতে চাইছে না। ‘মোরাটোরিয়ামগুলো আমার পছন্দ না। অথবা মোরাটোরিয়াম মালিকদের। হার্বার্ট সোয়েনহেইট ভলসাঙকে আমি পছন্দ করি না। রানসাইটার যে কেন সুইস মোরাটোরিয়াম এত পছন্দ করতো? নিউ ইয়র্কের মোরাটোরিয়ামে কী সমস্যা ছিলো?’

‘মোরাটোরিয়াম আসলে সুইস আবিষ্কার,’ এডি ডর্ন বললো। ‘নিরপেক্ষ জরিপ অনুযায়ী, সুইস মোরাটোরিয়ামগুলোতে যেকোনো ব্যক্তির অর্ধ-জীবনের সময়সীমা আমাদের ওখানকার মোরাটোরিয়ামগুলোতে থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় পাক্কা দুই ঘণ্টা বেশি। সুইসদের মনে হয় কোনো বিশেষ কৌশল আছে।’

‘জাতিসংঘের উচিত অর্ধ-জীবন ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দেওয়া,’ জো বললো। ‘এটা আসলে জন্ম আর মৃত্যুর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।’

আল হ্যামন্ড বিদ্রুপাত্মক সুরে বললো, ‘ঈশ্বর যদি অর্ধ-জীবনের অনুমতি দিতো, তাহলে আমরা সকলেই শুকনো বরফে পরিপূর্ণ কাসকেটে জন্মাতাম।’

কন্ট্রোল কনসোল থেকে ডন ড্যানি বললো, ‘আমরা এখন জুরিখ মাইক্রোওয়েভ ট্রান্সমিটারের আওতায় প্রবেশ করেছি। বাকি কাজ এখন ওরাই করবে।’ কনসোলের সামনে থেকে সরে গেল সে, বিষণ্ণ দেখাচ্ছে তাকে।

‘মন খারাপ করে থেকো না,’ এডি ডর্ন তাকে বললো। ‘শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্তু ভেবে দেখো আমরা কতটা ভাগ্যবান। আমরা নিজেরা মারা যেতে পারতাম। হয়তো বোমার আঘাতে, নাহয় বিস্ফোরণের পরে শত্রুর লেজার গানের আঘাতে। এভাবে ভাবলে তুমি হয়তো কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করবে। অবতরণ করার পর পৃথিবীতে আমরা আরো বেশি নিরাপদ।’

‘মোদ্দা কথা হচ্ছে,’ জো বললো, ‘আমরা চাঁদে গিয়েছিলাম সেটা গোপন করা উচিত হয়নি মোটেও।’ বিষয়টা গোপন রেখে রানসাইটারও ভালো করেনি, বুঝতে পারলো সে। ‘কারণ চাঁদে মানুষের নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনে বিশাল ফাঁক আছে। রানসাইটার সব সময় বলতো, “যে কাজের জন্য আমাদের পৃথিবীর বাইরে যেতে হয়, সেই কাজকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখবে।”’ যদি বেঁচে থাকতো, তাহলে ঠিক এই কথাই বলতো এখন। ‘আরো বলতো, “বিশেষ করে কেউ যদি চাঁদে যেতে বলে। অনেক প্রুডেন্স অর্গানাইজেশন এরই মধ্যে ওখানে গিয়ে বিপদে পড়েছে।”’ যদি মোরাটোরিয়ামে তাকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়, প্রথমে সে ঠিক এই কথাটাই বলবে। বলবে, চাঁদের ব্যাপারে সব সময়ই সন্দেহ কাজ করতো আমার। কিন্তু সন্দেহটা আসল জায়গায় গিয়ে কাজে লাগাতে পারেনি, এই আর কি কারণ আর্থিক দিক দিয়ে কাজটা ছিলো অত্যন্ত লাভজনক; সুযোগটা সে ছাড়তে চায়নি। আর এভাবেই ওরা টোপ দিয়ে ফাঁদে ফেলে তাকে। সে সব সময়ই জানতো, একদিন না একদিন ওরা তাকে ফাঁদে ফেলবেই।

জুরিখের মাইক্রোওয়েভ ট্রান্সমিটার দূর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইঞ্জিনগুলো বন্ধ করে দিতেই কেঁপে উঠলো মহাকাশযান।

‘জো,’ টিটো অ্যাপাস্তাস বললো, ‘রানসাইটারের ঘটনাটা ইলাকে জানাতে হবে তোমার। বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই?’

‘আমি ওটা নিয়েই ভাবছি,’ জো বললো। ‘যেহেতু আমরা ওখানে গিয়ে আবার ফিরেও এসেছি।’ মহাকাশযানের গতি ধীরে ধীরে কমে আসছে, হোমিওস্ট্যাটিক সার্ভো-অ্যাসিস্ট সিস্টেম প্রস্তুত হচ্ছে অবতরণ করার জন্য।

‘আর তাছাড়া,’ জো বললো, ‘কী ঘটেছে সেটাও কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। জেরা করে করে জান বের করে ফেলবে। সোজা এই কথাই বলবে, আমরা জেনেশুনেই ওদের ফাঁদে পা দিয়েছি।’

‘কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমাদের বন্ধু,’ স্যামি মুন্ডো বললো।

‘এমন একটা ভয়ানক ঘটনার পর কেউ আর আমাদের বন্ধু থাকবে না,’ আল হ্যামন্ড বললো।

***

বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামের ছাপ মারা, সৌরশক্তিচালিত একটা চপার জুরিখ স্পেস পোর্টের মাঠের একপ্রান্তে অপেক্ষা করছে। সেটার পাশে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে তাকে দেখে গুবরে পোকার কথা মনে হয়। পেশার সাথে মিল রেখে পোশাক পরেছে লোকটা; রেশমি কাপড়ের আলখাল্লা, পায়ে লোফার, রক্তবর্ণের উত্তরীয় আর উড়োজাহাজের পাখার মতো দেখতে বেগুনি রঙের একটা টুপি। জো মহাকাশযান থেকে পৃথিবীর মাটিতে নেমে আসতেই মোরাটোরিয়ামের মালিক লঘু পদক্ষেপে এগিয়ে এলো তার দিকে। দস্তানাপরা একটা হাত বাড়িয়ে দিলো করমর্দনের জন্য।

‘ভ্রমণটা নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক হয়নি, আপনার মুখ দেখেই সেটা বলা যায়,’ সংক্ষিপ্ত হাত মেলানোর পর বললো ভন ভলসাঙ। ‘আমার কর্মচারীরা কি আপনার এই চমৎকার মহাকাশযানের ভেতরে গিয়ে কাজ শুরু করতে পারে?’

‘হ্যাঁ,’ জো বললো। ‘ভেতরে যান, গিয়ে তাকে নিয়ে আসুন।’ পকেটে হাত ঢুকিয়ে এলোমেলো পায়ে মাঠের মাঝ দিয়ে কফি শপের দিকে এগোল সে। একরাশ বিষণ্ণতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাকে। এখন থেকেই সব কাজ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করতে হবে, বুঝতে পারছে সে। পৃথিবীতে ফিরে এসেছি আমরা। হোলিস আমাদের হত্যা করতে পারেনি—ভাগ্য আমাদের পক্ষে ছিলো। চাঁদের অপারেশন… ইঁদুরের মতো ফাঁদে পড়ার অভিজ্ঞতা… সব শেষ হয়েছে। নতুন এক পর্ব শুরু হয়েছে এখন, যে পর্বের উপর আমাদের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

‘পাঁচ সেন্ট, প্লিজ,’ কফি শপের দরজা বললো, তার সামনে সেটা অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক দম্পতি তাকে পার হয়ে বেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো সে। তারপর নিখুঁতভাবে দরজার ফাঁক গলে ঢুকে পড়লো, বসলো খালি একটা টুলে। সামনে ঝুঁকলো, কাউন্টারের উপর হাতদুটো রেখে খাদ্য তালিকায় চোখ বোলাতে লাগলো। ‘কফি,’ বললো সে।

‘দুধ অথবা চিনি?’ দোকান পরিচালনাকারী গম্বুজাকৃতির যন্ত্রের স্পিকার জিজ্ঞেস করলো।

‘দুটোই।’

ছোট্ট একটা কপাট উন্মুক্ত হলো; এক কাপ কফি, কাগজে মোড়ানো চিনির দুটো ছোট্ট প্যাকেট আর টেস্ট টিউবের মতো একটা কন্টেইনার আলগোছে বেরিয়ে এসে থামলো তার সামনের কাউন্টারে।

‘এক আন্তর্জাতিক পসক্রিড, প্লিজ,’ স্পিকার বললো।

‘গ্লেন রানসাইটার, রানসাইটার এসোসিয়েটস, নিউ ইয়র্ক, এই ঠিকানায় বিল পাঠিয়ে দিও,’ জো বললো।

‘সঠিক ক্রেডিট কার্ড প্রবেশ করান,’ স্পিকার বললো।

‘গত পাঁচ বছরে কোনো ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করার সুযোগ ওরা আমাকে দেয়নি,’ জো বললো। ‘ওরা আমার কাছে যা পায় তা আমি এখনো—’

‘এক পসক্রিড, প্লিজ,’ স্পিকার বললো। বিপজ্জনকভাবে যন্ত্রটা এখন টিকটিক শুরু করেছে। ‘নইলে দশ সেকেন্ডের মধ্যে আমি পুলিশ ডাকবো।’

জো এক পসক্রিড কাউন্টারের উপর রাখতেই টিকটিক বন্ধ হয়ে গেল।

‘আপনার মতো মানুষ না থাকলেও আমাদের চলবে,’ স্পিকার বললো।

‘আর কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের মতো মানুষগুলোই জেগে উঠবে,’ চরম বিতৃষ্ণার সাথে বললো জো। ‘এরপর আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলবে তোমাদেরকে। হোমিওস্ট্যাটিক মেশিনের স্বৈরাচারের সমাপ্তি হবে। মানুষের মূল্যবোধ, সহানুভূতি আর আন্তরিকতার দিন ফিরে আসবে আবারও। যখন সেটা ঘটবে, আমার মতো একজন কঠিন অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে আসা মানুষ, যার সত্যিই এক কাপ কফির প্রয়োজন ছিলো নিজেকে অবসাদ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য, সে তখন যেকোনো সময় কফি খেতে পারবে। তার কাছে পসক্রিড থাকুক বা না থাকুক।’ দুধের ক্ষুদ্র টিউবটা তুলেই আবার নামিয়ে রাখলো সে। ‘আর তাছাড়া, তোমার এই ক্রিম অথবা দুধ, যেটাই দিয়েছ, সেটা নষ্ট হয়ে গেছে।’ স্পিকার নীরব।

‘এই ব্যাপারে তুমি কিছু করবে না?’ জো বললো। ‘যখন পসক্রিড চাইছিলে তখন তো অনেক কিছুই বলছিলে।’

কফি শপের মুদ্রাচালিত দরজাটা খুলে গেল, ভেতরে ঢুকলো আল হ্যামন্ড। জোয়ের পাশে এসে বসলো। ‘রানসাইটারকে মোরাটোরিয়ামের চপারে ওঠানো হয়েছে। ওরা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। জানতে চাইছে, তুমি ওদের সাথে যাবে কি না।’

‘এই ক্রিমের অবস্থা দেখো,’ জো বললো। ক্ষুদ্র কলসটা তুলে ধরলো সে, ভেতরে তরলের চারপাশ ঘন হয়ে জমাট বেঁধে আছে। ‘পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক, প্রযুক্তির দিক দিয়ে সবচেয়ে উন্নত শহরগুলোর একটাতে এক পসক্রিডের বিনিময়ে তুমি কী পাচ্ছো দেখো। কফি শপ এই ব্যাপারটার সুরাহা না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ছি না। হয় আমার পসক্রিড ফেরত দেবে, অথবা এই ক্রিম পালটে তাজা ক্রিম দিতে হবে, যেন আমি আমার কফি শেষ করতে পারি।’

জোয়ের কাঁধে হাত রেখে আল হ্যামন্ড তাকে খুঁটিয়ে দেখলো। ‘কী হয়েছে, জো?’

‘প্রথমে আমার সিগারেট,’ জো বললো। ‘তারপর মহাকাশযানে দুই বছরের পুরোনো বাতিল ফোন বুক। আর এখন ওরা এক সপ্তাহের পুরোনো টক ক্রিম সার্ভ করছে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, আল।’

‘দুধ-চিনি ছাড়াই কফিটা খেয়ে নাও,’ আল বললো। ‘তারপর চপারে ওঠো যেন ওরা রানসাইটারকে মোরাটোরিয়ামে নিয়ে যেতে পারে দ্রুত। আমরা মহাকাশযানেই তোমার ফিরে আসার অপেক্ষা করবো। তারপর কাছাকাছি সোসাইটি অফিসে গিয়ে সব জানাবো।’

কফির কাপটা তুলে নিলো জো। দেখলো ওটা ঠান্ডা, অনেক দিনের বাসি, উপরের স্তরে গাঁজলার মতো ছাতা। অনেক কষ্টে বমি ঠেকিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখলো সে। কী হচ্ছে এসব? সে ভাবলো। আমার কী হয়েছে? তার বমি ভাবটা অকস্মাৎ পরিণত হলো এক অদ্ভুত, অস্পষ্ট আতঙ্কে।

‘বাদ দাও, জো,’ আল বললো। আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে জোয়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরেছে সে। ‘ভুলে যাও কফির কথা। ওটা গুরুত্বপূর্ণ না। আসল কাজ হচ্ছে রানসাইটারকে—’

‘তুমি কি জানো পসক্রিড আমাকে কে দিয়েছিলো?’ জো প্রশ্ন করলো। ‘প্যাট কনলি। আর ওগুলো পেয়েই আমি সব সময় যা করি ঠিক তাই করেছি। অকাজে উড়িয়েছি। এক বছরের পুরোনো কফি কেনার জন্য।’ আল হ্যামন্ডের হাতে ভর দিয়ে টুল থেকে নামলো সে। ‘আমার সাথে মোরাটোরিয়ামে আসবে তুমি? আমার সাহায্য দরকার, বিশেষ করে যখন ইলার সাথে কথা বলতে যাবো। কী করবো আমরা, সব দোষ রানসাইটারের উপর চাপিয়ে দেবো? বলবো যে আমাদের সবার চাঁদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার ছিলো? সত্যি কথা তো ওটাই। অথবা তাকে আমরা অন্য কিছু বলতে পারি। বলতে পারি যে মহাকাশযান দুর্ঘটনায় পড়েছিলো, অথবা তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।’

‘কিন্তু নিঃসন্দেহে ইলার সাথে রানসাইটারকে যুক্ত করা হবে,’ আল বললো। ‘আর সে ইলাকে সত্যি কথাই বলবে। সুতরাং, তোমাকেও সত্যি কথাই বলতে হবে।’

কফি শপ থেকে বেরিয়ে দুজনে বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামের চপারের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করলো। ‘সবচেয়ে ভালো হয় ইলাকে জানানোর ব্যাপারটা যদি রানসাইটারের উপর ছেড়ে দেই,’ চপারে উঠে বসার সময় বললো জো।

‘কেন নয়? আমাদের চাঁদে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা ওরই ছিলো, তাই ওকেই বলতে দাও। সবচেয়ে বড় কথা, সে ইলার সাথে কথা বলে অভ্যস্ত।’

‘ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা প্রস্তুত?’ ভন ভলসাঙ জিজ্ঞেস করলো, চপারের কন্ট্রোল প্যানেলে বসে আছে সে। ‘শোকসন্তপ্ত হৃদয়ে আমরা কি জনাব রানসাইটারের অন্তিম যাত্রা শুরু করতে পারি?’

জো বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে চপারের জানালা দিয়ে বাইরে দেখতে লাগলো, মনোযোগ দিয়ে দেখছে ভবনগুলোকে—ওগুলো সম্মিলিতভাবে জুরিখ ফিল্ডের কাঠামো তৈরি করেছে।

‘হ্যাঁ, চলুন,’ আল বললো।

চপার মাটি ছেড়ে উঠতেই মোরাটোরিয়াম মালিক কন্ট্রোল প্যানেলের একটা বোতামে চাপ দিলো। চপারের কেবিনের ভেতরে কমপক্ষে এক ডজনেরও বেশি উৎস থেকে বিটোভেনের মিসা সোলেনিস এর গমগমে আওয়াজ ছড়িয়ে পড়লো। একাধিক কণ্ঠ একসাথে কোরাস গাইছে: ‘ঈশ্বরের মহান মেষপালক, জগতের সকল পাপ ধুয়ে-মুছে দিন।’ সেই সাথে আনুষঙ্গিক বাদ্যযন্ত্রের ঐকতান।

‘তুমি কি জানো অনেক অপেরাতেই টুসকানিনি কোরাস গায়কদের সাথে নিজেও গেয়েছেন?’ জো জিজ্ঞেস করলো। ‘ট্রাভিয়াটাতে ‘সেম্প্রে লিবেরা অংশে তুমি তার কণ্ঠ শুনতে পাবে।’

‘আমার জানা ছিলো না,’ আল বললো। চপারের নিচ দিয়ে পার হয়ে যাওয়া জুরিখের মনোরম, সুসজ্জিত কোনঅ্যাপ্টের মিছিল দেখছে সে। রাজকীয় আর স্নিগ্ধ এই মিছিল জো নিজেও দেখছে।

‘লিবেরা মি, ডোমাইন,’ জো বললো।

‘অর্থ কী?’

‘এটার অর্থ, ঈশ্বর আমাকে দয়া করুন,’ জো বললো। ‘তুমি জানো না? সবারই কি জানার কথা না?’

‘কেন সবাইকে জানতে হবে?’ আল বললো।

‘এই সংগীত, এই হতচ্ছাড়া সংগীত!’ ভন ভলসাঙের উদ্দেশে বললো জো। ‘গান বন্ধ করুন! রানসাইটার এই গান শুনতে পাচ্ছেন না। একমাত্র আমিই এই গান শুনতে পাচ্ছি। আর আমার শুনতে ভালো লাগছে না।’ এরপর আলের উদ্দেশে বললো, ‘তুমি কি এই গান শুনতে চাও?’

‘শান্ত হও, জো,’ আল বললো।

‘আমাদের মৃত নিয়োগকর্তাকে নিয়ে যাচ্ছি বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়াম নামের এক স্থানে,’ জো উষ্মার সাথে বললো। ‘আর সে আমাকে বলছে শান্ত হও। তুমি ভালো করেই জানো যে আমাদের সাথে তার চাঁদে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিলো না। আমাদেরকে পাঠিয়ে সে নিউ ইয়র্কে থাকতে পারতো। আর এখন আমার দেখা সবচেয়ে প্রাণবন্ত আর জীবনকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো এমন একজন মানুষ—’

‘আপনার কালো বন্ধু সঠিক পরামর্শ দিয়েছে,’ মোরাটোরিয়াম মালিক সুরেলা কণ্ঠে বললো।

‘কোন পরামর্শ?’ জো জিজ্ঞেস করলো।

‘শান্ত হওয়ার পরামর্শ।’ কন্ট্রোল প্যানেলের একটা গ্লোভ কম্পার্টমেন্ট খুললো সে। জোয়ের হাতে একটা ঝলমলে বহুবর্ণের বাক্স ধরিয়ে দিলো। ‘এখান থেকে একটা মুখে দিয়ে চিবোতে থাকুন, মি. চীপ।’

‘স্নায়ু শান্ত করার উপাদান,’ বাক্সটা হাতে নিয়ে জো বললো। দ্রুত বাক্সটা খুললো সে। ‘পিচফলের স্বাদযুক্ত স্নায়ু শান্ত করার উপাদান।’ এরপর আলকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমার কি এই জিনিস খাওয়া উচিত?’

‘খাওয়া উচিত,’ আল জবাব দিলো।

‘এই ধরনের পরিস্থিতিতে রানসাইটার কখনোই স্নায়ু শান্ত করার উপাদান ব্যবহার করতো না। গ্লেন রানসাইটার জীবনে কখনোই স্নায়ু শান্ত করার উপাদান ব্যবহার করেনি। তুমি জানো আমি এখন কী অনুভব করছি, আল? সে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্য। পরোক্ষভাবে হলেও।’

‘অনেক বেশি পরোক্ষভাবে,’ আল বললো। ‘আমরা পৌঁছে গেছি,’ সে বললো। বিশাল আর সমতল রুফ ফিল্ডের চিহ্নিত একটা অংশের দিকে চপার নামতে শুরু করেছে। ‘কী মনে হয়, নিজেকে তুমি শান্ত রাখতে পারবে?’ জোকে জিজ্ঞেস করলো আল।

‘আমি নিজেকে শান্ত রাখতে পারবো রানসাইটারের কণ্ঠস্বর আবার শোনার পর,’ জবাব দিলো জো। ‘যখন বুঝতে পারবো যে তার মাঝে কোনো এক ধরনের জীবনীশক্তি, হতে পারে সেটা অর্ধ-জীবন, বা যাই হোক না কেন, তার অস্তিত্ব আছে।’

মোরাটোরিয়ামের অধিকারী উৎফুল্ল কণ্ঠে বললো, ‘ঐ বিষয়ে আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই, মি. চীপ। সাধারণত আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রটোফেশনিক প্রবাহ পাই। অন্তত প্রথম দিকে। সমস্যা দেখা দেয় আরো পরে, যখন অর্ধ-জীবনের মেয়াদ ফুরিয়ে আসতে থাকে, ঐ সময়টাই ভয়ের কারণ। কিন্তু বিচক্ষণ পূর্বপরিকল্পনার মাধ্যমে অর্ধ-জীবনের মেয়াদ আমরা শুরু থেকেই দীর্ঘায়িত করতে পারি।’ চপারের ইঞ্জিন বন্ধ করলো সে, একটা বোতামে চাপ দিতেই কেবিনের দরজা খুলে গেল। ‘বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামে স্বাগত,’ সে বললো। রুফ ফিল্ডের মাঝ দিয়ে দুজনকে নিয়ে এগিয়ে চললো সে। ‘আমার ব্যক্তিগত সহকারী, মিস বিসন, আপনাদেরকে কনসাল্টেসন লাউঞ্জে নিয়ে যাবে। যদি আপনারা ওখানে অপেক্ষা করেন, চারপাশের বর্ণিল পরিবেশ আপনাদের শোকার্ত মনকে প্রশান্ত করে তুলবে। আমার প্রকৌশলীরা মি. রানসাইটারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করামাত্রই আমি তাকে ভেতরে নিয়ে আসবো।’

‘পুরো প্রক্রিয়ার সময় আমি উপস্থিত থাকতে চাই,’ জো বললো। ‘আমি দেখতে চাই যে আপনার প্রকৌশলীরা তাকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে।’

আল হ্যামন্ডের দিকে ফিরে মোরাটোরিয়ামের অধিকারী বললো, ‘হয়তো বন্ধু হিসেবে আপনি তাকে বোঝাতে পারবেন।’

‘আমাদেরকে লাউঞ্জেই অপেক্ষা করতে হবে, জো,’ আল বললো।

আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তার দিকে তাকালো জো। ‘আংকেল টম হওয়ার চেষ্টা করছো, না?’

‘প্রত্যেক মোরাটোরিয়ামই এভাবে কাজ করে,’ আল বললো। ‘আমার সাথে লাউঞ্জে চলো।’

‘আপনাদের কতক্ষণ লাগবে?’ মোরাটোরিয়ামের অধিকারীকে জিজ্ঞেস করলো জো।

‘প্রথম পনেরো মিনিটেই আমরা ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাবো। যদি এই সময়ের মধ্যে আমরা পরিমাপ করার মতো তরঙ্গ না পাই—’

‘আপনারা মাত্র পনেরো মিনিট চেষ্টা করবেন?’ জো বিস্মিত কণ্ঠে বললো। তারপর আল হ্যামন্ডের উদ্দেশে বললো, ‘আমাদের সবার জীবন যোগ করলেও যে মানুষটার নখের পরিমাণও হবে না, সেই মানুষটাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ওরা মাত্র পনেরো মিনিট চেষ্টা করবে!’ তার মনে হলো সে গলা ছেড়ে কেঁদে উঠবে। ‘চলো,’ আল হ্যামন্ডকে বললো। ‘আমরা—’

‘তুমি চলো,’ আল কথাটার পুনরাবৃত্তি করলো। ‘লাউঞ্জে।’

জো তাকে অনুসরণ করলো।

‘সিগারেট?’ আল বললো, ষাঁড়ের চামড়ার তৈরি নরম কাউচে বসলো দুজনে। নিজের প্যাকেটটা জোয়ের দিকে বাড়িয়ে ধরলো আল।

‘ওগুলো সব নেতানো,’ জো বললো। এটা বলার জন্য প্যাকেট থেকে সিগারেট হাতে নেওয়ার বা ধরার কোনো প্রয়োজন নেই তার।

‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছ।’ প্যাকেটটা সরিয়ে নিলো আল। ‘তুমি কীভাবে জানো?’ জবাবের আশায় একটু অপেক্ষা করে আবার বললো, ‘আমি এ পর্যন্ত যে কয়জনকে দেখেছি, তাদের মধ্যে তুমি খুব সহজেই হতাশ হয়ে যাও। আমরা ভাগ্যবান যে এখনো বেঁচে আছি। এমনও হতে পারতো যে আমাদের সবাই এখন থাকতাম ঐ কোল্ড-প্যাকে। আর রানসাইটার এখানে, এই বাদামি রঙের লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করতো আমাদের ফিরে আসার জন্য।’ নিজের ঘড়ির দিকে তাকালো সে।

‘পৃথিবীর সব সিগারেটই নেতিয়ে গেছে,’ জো বললো। সে নিজেও ঘড়ি দেখলো। ‘দশটার বেশি বাজে।’ ভাবনায় ডুবে গেল সে, অসংলগ্ন আর বিচ্ছিন্ন সব ভাবনা। পানির নিচ থেকে রুপালি মাছগুলো যেভাবে ভেসে ওঠে, ঠিক সেভাবে তার ভয়গুলো আবার ফিরে আসছে। ‘যদি রানসাইটার বেঁচে থাকতো,’ সে বললো, ‘এই লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করতো, সবকিছুই হয়তো ঠিক হয়ে যেত। আমি জানি, কিন্তু কেন, সেটা জানি না।’ ও ভাবছে এই মুহূর্তে মোরাটোরিয়ামের প্রকৌশলী আর রানসাইটারের অবশিষ্টের মাঝে ঠিক কী চলছে। ‘দাঁতের ডাক্তারের কথা মনে আছে তোমার?’

‘মনে নেই, কিন্তু জানি ওরা কী কাজ করে।’

‘মানুষের দাঁত আস্তে আস্তে ক্ষয় হয়।’

‘সেটা আমি বুঝতে পেরেছি।’

‘দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা করার অনুভূতিটা কেমন, আমার বাবা সেটা আমাকে বলেছিলো। প্রতিবার নার্স দরজা খোলার পর তোমার মনে হবে, এবার ঘটবে। সারা জীবন যে জিনিসটা নিয়ে ভয় পেয়েছি ঠিক সেটাই।’

‘আর এখন তোমার ঠিক সেরকমই মনে হচ্ছে?’ আল জিজ্ঞেস করলো।

‘আমার মনে হচ্ছে, যিশু! এই প্রতিষ্ঠান চালায় যে বোকা লোকটা, সে এসে কেন বলছে না যে রানসাইটার বেঁচে আছে অথবা বেঁচে নেই। একটা কিছু বলুক। হ্যাঁ অথবা না।’

‘ফলাফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুকূল হয়। যদি পরিসংখ্যান দেখো, ভলসাঙ যেমন বলেছে—’

‘এই ক্ষেত্রে জবাবটা হবে, না।’

‘সেটা জানা তোমার পক্ষে সম্ভব না।’

‘আমি ভাবছি এখানে, জুরিখে, রে হোলিসের কোনো কার্যালয় আছে কি না,’ জো বললো।

‘অবশ্যই আছে। কিন্তু এখানে একজন প্রিকগ নিয়ে আসার আগে যেভাবেই হোক সেটা আমরা জানতে পারবো।’

‘আমি একজন প্রিকগকে ফোন করছি,’ জো বললো। ‘এই মুহূর্তে এখানে একজনকে চাই।’

উঠে দাঁড়ালো সে, ভাবছে কোথায় গেলে একটা ভিডফোন পাবে। ‘আমাকে একটা কোয়ার্টার দাও।’

মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো আল।

‘নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো যে তুমি এখন আমার অধীন কর্মচারী,’ জো বললো। ‘আমি যা বলবো সেটা করতে তুমি বাধ্য। আর না করলে তোমাকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা আমার আছে। রানসাইটারের মৃত্যুর সাথে সাথেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব আমার কাছে চলে এসেছে। বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পরপরই দায়িত্ব নিয়েছি আমি। তাকে এখানে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত আমার, এবং একজন প্রিকগ নিয়োগ করে কয়েক মিনিটের জন্য তার দক্ষতা ব্যবহার করার সিদ্ধান্তও আমার। এখন আমাকে একটা কোয়ার্টার দাও।’ হাত বাড়িয়ে দিলো সে।

‘রানসাইটার এসোসিয়েটস এমন একজনের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে যার পকেটে পঞ্চাশ সেন্টও থাকে না। এই নাও কোয়ার্টার।’ পকেট থেকে বের করে মুদ্রাটা জোয়ের দিকে ছুঁড়ে দিলো আল। ‘আমার বেতন দেওয়ার সময় এটা যোগ করে দিও।’

লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে করিডর ধরে হাঁটতে লাগলো জো। কপাল ঘষছে অনিশ্চিতভাবে। অদ্ভুত একটা জায়গা, আপনমনে ভাবলো সে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি। আমি এখন রানসাইটার এসোসিয়েটসের প্রধান। অনুভূতিটা তাকে একটু ভাবিয়ে তুললো। ইলার কথা আলাদা। সে জীবিত নয়, এবং শুধু তখনই কথা বলতে পারবে যখন কেউ এখানে এসে তাকে পুনরুজ্জীবিত করবে। গ্লেন রানসাইটারের উইলে কী লেখা আছে সেটা আমি জানি, সেটা এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কার্যকর হয়ে গেছে। আমাকেই দায়িত্ব নিতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না ইলা অথবা রানসাইটার—যদি তাকে পুনরুজ্জীবিত করা যায় আর কি—আমার বদলে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত না নেয়। ওদের একমত হতে হবে। দুটো উইলেই এই শর্তের বাধ্যবাধকতা আছে। হয়তো বা ওরা ভাবতে পারে যে আমি স্থায়ীভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে পারবো।

সেটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, বুঝতে পারলো সে। অন্তত তার মতো একজন মানুষের ক্ষেত্রে, যার কিনা নিজের আর্থিক দুরবস্থা মোকাবেলা করার কোনো সামর্থ্য নেই। হোলিসের প্রিকগরা এই বিষয়টা অবশ্যই জানবে, সে নিশ্চিত। ওদের কাছ থেকে আমি জানতে পারবো যে আমাকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে কি হবে না। আরো অনেক কিছুর সাথে এটা জানাটাও জরুরি। আর আমাকে ঠিক এই মুহূর্তেই একজন প্রিকগ নিয়োগ করতে হবে।

‘পাবলিক ভিডফোন কোন দিকে?’ ইউনিফর্ম পরা মোরাটোরিয়ামের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করলো সে। লোকটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। ‘ধন্যবাদ,’ বললো সে, তারপর হাঁটা শুরু করলো। মুদ্রাচালিত ভিডফোনের সামনে এসে থেমে রিসিভার তুলে ডায়াল টোন শুনলো, তারপর আল যে কোয়ার্টারটা দিয়েছিলো সেটা স্লটে ফেললো।

‘আমি দুঃখিত, স্যার,’ ফোনটা বলে উঠলো, ‘বাতিল হওয়া মুদ্রা গ্রহণ করা যাবে না।’ ঝনঝন শব্দ করে মুদ্রাটা নিচের দিক থেকে বেরিয়ে এসে তার পায়ের কাছে পড়লো। মনে হলো যেন যন্ত্রটা চরম ঘৃণায় মুদ্রাটা উগড়ে দিয়েছে।

‘কী বলতে চাও?’ ঝুঁকে মুদ্রাটা তুলে বললো সে। ‘নর্থ আমেরিকান কনফেডারেশন কোয়ার্টার কবে থেকে বাতিল হলো?’

‘দুঃখিত, স্যার,’ ফোন বললো। ‘আপনি যে মুদ্রা আমার স্লটে দিয়েছেন সেটা নর্থ আমেরিকান কনফেডারেশন কোয়ার্টার নয়, বরং অনেক আগে বাতিল হয়ে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া মিন্ট। এটা পুরোপুরি মূল্যহীন।’

মুদ্রাটা পরীক্ষা করে বিবর্ণ উপরিভাগে জো দেখতে পেল জর্জ ওয়াশিংটনের খোদাই করা মুখাবয়ব এবং তার সাথে তারিখ। মুদ্রাটা চল্লিশ বছরের পুরোনো। আর ফোন যেমন বলেছে, অনেক আগেই বাতিল হয়ে গেছে।

‘কোনো সমস্যা, স্যার?’ মোরাটোরিয়ামের একজন কর্মী কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো। ‘দেখলাম ফোন আপনার মুদ্রা বের করে দিয়েছে। আমি একটু দেখতে পারি?’ কর্মী হাত বাড়াতেই জো তার হাতে ইউএস কোয়ার্টারটা দিলো। ‘এটার বদলে আমি আপনাকে সুইস দশ ফ্র্যাংক দেবো। ফোন সেটা গ্রহণ করবে।’

‘চমৎকার,’ জো বললো। ঝটপট বিনিময় শেষ করলো দুজনে, তারপর জো দশ ফ্র্যাংকের মুদ্রা ফোনে ফেলে হোলিস ইন্টারন্যাশনালের টোল ফ্রি নাম্বারে ডায়াল করলো।

‘হোলিস ট্যালেন্টস,’ প্রশিক্ষণ পাওয়া এক নারী কণ্ঠ জোয়ের কানে সুধা ঢালতেই পর্দায় ভেসে উঠলো এক মেয়ের মুখ, দেখেই বোঝা যায় কৃত্রিম প্রসাধনী দ্বারা সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। ‘ওহ, মি. চীপ,’ ওকে চিনতে পেরে মেয়েটা বললো। ‘মি. হোলিস আমাদের বলে রেখেছেন যে আপনি যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা আপনার ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলাম।’

প্রিকগ, ভাবলো জো।

‘মি. হোলিস আমাদেরকে নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন যেন আপনি ফোন করলে সরাসরি তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেই। আপনার যা প্রয়োজন সেটা তিনি নিজে তত্ত্বাবধান করবেন,’ মেয়েটা বলে যাচ্ছে। ‘আপনি কি একটু অপেক্ষা করবেন যেন আমি আপনাকে তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি? বেশি সময় লাগবে না, মি. চীপ। একটু পরেই আপনি যার কণ্ঠস্বর শুনবেন সেটা মি. হোলিসের। ঈশ্বর আপনার সহায় হোক।’ মেয়েটার চেহারা মুছে গেল। ধূসর, ফাঁকা পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে সে এখন।

খানিক পরেই ক্রূর, নীলাভ একটা মুখ ভেসে উঠলো পর্দায়। চোখদুটো কোটরাগত, দেহবিহীন রহস্যময় একটা মুখাবয়ব। হোলিসের চোখগুলো তাকে ত্রুটিযুক্ত মূল্যবান পাথরের কথা মনে করিয়ে দিলো। ওগুলো আলো দেয় কিন্তু ভুলভাবে সেগুলো বসানো হয়েছে। ঠিক একইভাবে রে হোলিসের ধূর্ত দৃষ্টিও কোথাও স্থির থাকছে না। ‘কেমন আছেন, মি. চীপ?’

রে হোলিস দেখতে তাহলে এমন, সে ভাবলো। ছবিগুলো তার আসল চেহারা ধরতে পারেনি। বলিরেখাপূর্ণ অসমতল একটা মুখ, যেন ঠুনকো একটা মুখোশ পড়ে গিয়ে ভেঙে গিয়েছিলো, তারপর যেনতেনভাবে আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে—কিন্তু নিখুঁত হয়নি।

‘তুমি যে গ্লেন রানসাইটারকে হত্যা করেছ, সোসাইটি সেই ব্যাপারে পূর্ণ প্রতিবেদন পাবে,’ জো বললো। ‘তাদের অধীনে অসংখ্য দক্ষ আইনজ্ঞ আছে। বাকি জীবন তোমার আদালতে চক্কর কাটতেই পেরিয়ে যাবে।’ পর্দার মুখাবয়বে প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য একটু থামলো সে। কিন্তু সেই মুখে কোনো ভাবের প্রকাশ দেখা গেল না। ‘আমরা জানি এই জঘন্য কাজটা তুমিই করেছ।’ বলার সাথে সাথেই জো অনুভব করলো তার মন্তব্যের অসারতা, যা করছে এখন সেটার কোনো ভিত্তিই নেই।

‘তোমার ফোন করার উদ্দেশ্য যদি এটাই হয়ে থাকে,’ হিংস্র কণ্ঠে বললো হোলিস, ‘মি. রানসাইটার কখনোই’

কাঁপতে কাঁপতে রিসিভার রেখে দিলো জো।

যে করিডর দিয়ে এসেছিলো সেই করিডর দিয়েই ফিরে এলো আবার। লাউঞ্জে ঢুকেই দেখতে পেল আল হ্যামন্ড বসে আছে বিষণ্ণ মুখে, শুকনো পাতার মতো মচমচে পুরোনো সেই সিগারেটই টানছে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর আল হ্যামন্ড মাথা তুললো।

‘না,’ জো বললো।

‘ভলসাঙ তোমাকে খুঁজতে এসেছিলো,’ আল বললো। ‘কেমন অদ্ভুত আচরণ করছিলো লোকটা। বোঝাই যাচ্ছে রানসাইটারকে নিয়ে কিছু একটা হয়েছে। আরো সময় লাগবে, কিন্তু সেটা তোমাকে সরাসরি বলতে ভয় পাচ্ছে। সে হয়তো একটা সময়সাপেক্ষ ধাপ অনুসরণ করতে যাচ্ছে। কিন্তু ফলাফল হয়তো তাই হবে, তুমি যেমন বলেছ। এখন কী করবো আমরা?’ জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো সে।

‘এবার আমরা হোলিসের উপর প্রতিশোধ নেবো,’ জো বললো।

‘আমরা হোলিসের কিছুই করতে পারবো না।’

‘সোসাইটি—’ থামতে বাধ্য হলো সে। কারণ মোরাটোরিয়ামের অধিকারী লাউঞ্জে প্রবেশ করেছে, তাকে বিচলিত আর মলিন দেখাচ্ছে। কিন্তু একইসাথে নিজের আত্মবিশ্বাসও ধরে রেখেছে।

‘আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। এরকম নিম্ন তাপমাত্রায় আমরা সাধারণত নিরবচ্ছিন্ন তরঙ্গ পাই; মাইনাস ১৫০ জি-তে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। পরিষ্কার আর শক্তিশালী তরঙ্গ ফিরে আসার কথা ছিলো। কিন্তু শব্দ পরিবর্ধক যন্ত্রে আমরা ষাট সাইকেলের বেশি অস্পষ্ট গুঞ্জন ছাড়া আর কিছু পাইনি। তবে এটাও ঠিক, যে কোল্ড-প্যাকে করে তাকে নিয়ে এসেছেন সেটা আমরা পরীক্ষা করিনি। কথাটা মনে রাখবেন।’

‘আমাদের মনে থাকবে,’ আল বললো। আড়ষ্ট পায়ে উঠে দাঁড়ালো সে, মুখোমুখি হলো জোয়ের। ‘আমার মনে হয় আর কিছু করার নেই।’

‘আমি ইলার সাথে কথা বলবো,’ জো বললো।

‘এখন?’ বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো আল। ‘ইলাকে কী বলবে সেটা ঠিক না করা পর্যন্ত বরং অপেক্ষা করো। আগামীকাল বোলো। এখন বাড়ি গিয়ে ঘুমাও।’

‘বাড়ি ফেরা মানে তো প্যাট কনলির কাছে ফেরা। এই মুহূর্তে ওর মুখোমুখি হওয়ার মানসিক স্থিরতা আমার নেই।’

‘জুরিখের কোনো হোটেলে ওঠো,’ আল পরামর্শ দিলো। ‘অদৃশ্য হয়ে যাও। আমি মহাকাশযানে ফিরে যাবো। সবাইকে জানাবো, সোসাইটির কাছে প্রতিবেদনও জমা দেবো। তুমি আমাকে সেটা লিখে দিতে পারো।’ ভন ভলসাঙকে বললো, ‘কাগজ আর কলম এনে দিন।’

‘তুমি কি জানো এই মুহূর্তে কার সাথে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভব করছি?’ জো জিজ্ঞেস করলো, ঐ মুহূর্তে মোরাটোরিয়ামের অধিকারী দ্রুত পায়ে কাগজ-কলম আনার জন্য যাচ্ছিলো। ‘ওয়েন্ডি রাইট। সে আমাকে পরামর্শ দিতে পারতো এখন কী করা উচিত, তার মতামতকে আমি গুরুত্ব দেই। কেন? প্রায়ই অবাক হই আমি। তাকে আমি ভালো করে চিনি না।’ আচমকাই অনুভব করলো যে লাউঞ্জের বাতাসে একটা সুর বেজে চলেছে। ওরা যখন এখানে আসে তখন থেকেই বাজছিলো। চপারে যেটা বাজছিলো সেটাই। ‘শেষ বিচারের দিন আসন্ন,’ বিষণ্ণ কণ্ঠে গায়ক-গায়িকারা গাইছে। ‘ঈশ্বরের ক্রোধে স্বর্গ-মর্ত্য হয়ে যাবে ছাই।’ গুইসেপ্পো ভার্ডি রচিত প্রার্থনাসংগীত, চিনতে পারলো সে। সম্ভবত ভন ভলসাঙের কাজ; নিজের হাতে প্রতিদিন সকাল নয়টায় মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনাসংগীত চালু করে দেয় সে।

‘তুমি হোটেল রুম বুক করার পর আমি ওয়েন্ডি রাইটকে ওখানে যাওয়ার কথা বলতে পারি,’ আল বললো।

‘সেটা ঠিক হবে না,’ জো বললো।

‘কেন?’ অবাক হয়ে জোয়ের দিকে তাকালো আল। ‘এমন একটা সময়ে, যখন পুরো প্রতিষ্ঠান ডুবতে বসেছে, তুমি যদি নিজেকে সামলাতে না পারো, তখন কী হবে? তোমার মানসিক অবস্থা ঠিক করার জন্য যা প্রয়োজন সেটাই করতে হবে। ফোনের কাছে ফিরে যাও আবার, কোনো একটা হোটেলে ফোন করো। এখানে ফিরে এসে আমাকে হোটেলের নাম আর—’

‘আমাদের কাছে যে অর্থ আছে তার সবই মূল্যহীন,’ জো বললো। ‘আমি ফোন চালু করতে পারবো না, যদি-না আরেকজন মুদ্রা সংগ্রাহককে খুঁজে পাই, যে আমাকে পুরোনো মুদ্রার বিনিময়ে দশ ফ্র্যাংকের প্রচলিত মুদ্রা দেবে।’

‘ওহ,’ আল বললো। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়লো সে।

‘এটা কি আমার দোষ?’ জো বললো। ‘আমি কি তোমার দেওয়া কোয়ার্টার অপ্রচলিত মুদ্রায় রূপান্তর করেছি?’ রেগে উঠছে সে।

‘অদ্ভুত হলেও সত্যি,’ আল বললো। ‘হ্যাঁ, এটা তোমার দোষ। কিন্তু আমি জানি না কীভাবে। হয়তো কোনো একদিন বুঝতে পারবো। ঠিক আছে, আমরা দুজনেই প্র্যাটফল ২-এ ফিরে যাবো। ওখান থেকে ওয়েন্ডিকে নিয়ে তুমি কোনো হোটেলে গিয়ে উঠতে পারবে।’

‘ওহ, কীসের ভয় মানুষের বুকে বেঁধে দেয়,’ গায়ক-গায়িকারা গাইছে। ‘যখন স্বর্গ থেকে বিচারক অবতরণ করেন, যিনি সর্বশক্তিমান, সবকিছুর অধিকারী।’

‘হোটেলের পাওনা পরিশোধ করবো কী দিয়ে? ফোন যেমন নেয়নি, তেমনি ওরাও আমাদের অর্থ গ্রহণ করবে না।’

অভিশাপ দিতে দিতে আল তার পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে বিলগুলো পরীক্ষা করে দেখলো। ‘এগুলো পুরোনো কিন্তু এখনো প্রচলিত।’ পকেট থেকে কয়েনগুলো বের করে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলো। ‘এগুলো একেবারেই বাতিল।’ লাউঞ্জের কার্পেটের উপর কয়েনগুলো ছুঁড়ে ফেললো সে, ঠিক যেভাবে ফোন চরম অবজ্ঞায় তার স্লট থেকে মুদ্রাটা উগড়ে দিয়েছিলো। বিরক্তির সাথে বললো, ‘এই বিলগুলো নিয়ে যাও।’ কাগজের নোটগুলো জোয়ের হাতে দিলো সে। ‘এক রাতের জন্য হোটেল কামরা বুক করো, রাতের খাবার আর দুজনের ড্রিংকসের জন্য যথেষ্ট। আমি আগামীকাল নিউ ইয়র্ক থেকে একটা শিপ পাঠাবো তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য।’

‘তোমার কাছ থেকে যা নিয়েছি, সব ফেরত দিয়ে দেবো,’ জো প্রতিশ্রুতি দিলো। ‘রানসাইটার এসোসিয়েটসের অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালক হিসেবে আমি এখন অনেক বেশি বেতন পাবো। আমার সব দেনা পরিশোধ করতে পারবো। বকেয়া কর, ক্ষতিপূরণ আর জরিমানা, যেগুলো আয়কর বিভাগের কর্মীরা—’

‘প্যাট কনলিকে ছাড়াই? তার সাহায্য ছাড়াই?’

‘আমি এখন ওকে তাড়িয়ে দিতে পারবো,’ জো বললো।

‘দেখো পারো কি না,’ মন্তব্য করলো আল।

‘আমার জন্য নতুন এক জীবনের শুরু এটা। জীবনের নতুন এক শিক্ষা।’ প্রতিষ্ঠান আমি পরিচালনা করতে পারবো, নিজেকেই বললো সে। রানসাইটার যে ভুলগুলো করেছে আমি তা করবো না। স্ট্যান্টন মিকের ছদ্মবেশে হোলিস আমাকে আর আমার ইনার্শিয়ালদের চাঁদে নিয়ে ফাঁদে ফেলতে পারবে না।

‘আমার মতে,’ আল নিরাসক্ত সুরে বললো, ‘ব্যর্থ হওয়ার একটা চরম আকাঙ্ক্ষা তোমার ভেতরে আছে। কোনো পরিস্থিতিই—এমনকি বর্তমান পরিস্থিতিও—সেটাকে পালটাতে পারবে না।’

‘আমার যেটা আছে তা হলো সফল হওয়ার প্রবল ইচ্ছা। গ্লেন রানসাইটার সেটা বুঝতে পেরেছিলো, আর তাই নিজের উইলে পরিষ্কার বলে গেছে, তার মৃত্যু হলে এবং বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়াম অথবা আমার নির্বাচিত অন্য কোনো মোরাটোরিয়াম যদি তাকে অর্ধ-জীবনে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যর্থ হয়, আমি তার স্থলাভিষিক্ত হবো।’ আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল তার। একাধিক সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে সে। একেবারেই পরিষ্কার, যেন তার মাঝে হঠাৎ প্রিকগের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তারপরই মনে পড়লো প্যাটের ট্যালেন্টের কথা, প্রিকগদের সে কী করতে পারে, ভবিষ্যৎ দেখার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলে।

‘বজ্রের আওয়াজে বাজবে শিঙা,’ গায়ক-গায়িকারা গাইছে। ‘বালির সমাধি থেকে উঠে সকলে হাজির হবে সর্বশক্তিমানের সম্মুখে।’

তার মুখের ভাব বুঝতে পেরে আল বললো, ‘তুমি ওকে তাড়াতে পারবে না। অন্তত সে যা করতে পারে সেটা জানা থাকার পর।’

‘জুরিখ রুটস হোটেলে একটা কামরা ভাড়া করবো,’ জো সিদ্ধান্ত নিলো। ‘তোমার পরামর্শ অনুযায়ী।’ কিন্তু সে জানে, আল ঠিক কথাই বলেছে। এভাবে কোনো কাজ হবে না। প্যাট অথবা তার চেয়েও ভয়ানক কিছু তাকে ধ্বংস করে দেবে। আমি শেষ, আক্ষরিক অর্থেই। তার ক্লান্তবিধ্বস্ত মনের মাঝে একটা দৃশ্য ফুটে উঠলো: ফাঁদে আটকে পড়া একটা পাখি। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে, আর এটাই তাকে আরো শঙ্কিত করে তুললো। পুরো দৃশ্যটাই তার কাছে স্পষ্ট আর একেবারেই বাস্তব। মনে হলো ইঙ্গিতপূর্ণ। কিন্তু ঠিক কীভাবে, সে বুঝতে পারলো না। অপ্রচলিত মুদ্রাগুলোর কথা ভাবলো সে। ফোন ওগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। কেবল সংগ্রাহকদের কাছে কিছুটা মূল্য আছে। জাদুঘরে যেগুলো দেখা যায়। আসলেই কি তাই? বলা কঠিন। সে আসলেই জানে না।

‘প্রকৃতি আর মৃত্যু হবে অবাক,’ গায়ক-গায়িকারা গাইছে। ‘যখন সকল সৃষ্টি আবার পুনরুত্থিত হবে।’ তারা গেয়েই যাচ্ছে, গেয়েই যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *