অধ্যায় ৯
আপনার চুল এতই রুক্ষ আর শুষ্ক, মেয়েরা কেন আকৃষ্ট হবে? ব্যবহার করে দেখুন উবিক হেয়ার কন্ডিশনার ক্রিম। মাত্র পাঁচ দিনেই আপনার চুল ফিরে পাবে তার হারানো স্বাস্থ্য, দেখা যাবে নতুন ঔজ্জ্বল্য। আর উবিক হেয়ারস্প্রে নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবহার করলে সম্পূর্ণ নিরাপদ।
.
বাল্টিমোরের লাকি পিপল সুপারমার্কেট বেছে নিলো তারা।
‘আমাকে এক প্যাক পলমল দাও,’ কাউন্টারে গিয়ে কম্পিউটারচালিত স্বয়ংক্রিয় চেকারকে বললো আল।
‘উইংস আরো কম দামি,’ জো বললো।
বিরক্ত হয়ে আল বললো, ‘উইংস এখন আর তৈরি হয় না। অনেক বছর থেকেই।’
‘ওরা এখনো বানায়,’ জো বললো, ‘কিন্তু প্রচার করে না। এই একটা সিগারেট আছে যা কোনো কিছুই দাবি করে না।’ চেকারের উদ্দেশে বললো, ‘পলমলের বদলে উইংস দাও।’ সিগারেটের প্যাকেটটা কনভেয়র বেল্টের উপর দিয়ে গড়িয়ে এসে কাউন্টারে পড়লো।
‘পঁচানব্বই সেন্টস,’ চেকার বললো।
‘এই যে দশ পসক্রিডের একটা নোট।’ চেকারের স্লটে নোটটা ঢুকিয়ে দিলো আল, যন্ত্রটা দ্রুত সেটা গ্রাস করে নিয়ে হিসাব করতে লাগলো। ‘আপনার বাকি পয়সা, স্যার,’ চেকার বললো। আলের সামনে সুন্দর করে গোছানো নোট আর মুদ্রার একটা স্তূপ হাজির করলো যন্ত্রটা। ‘দয়া করে সামনে এগিয়ে যান।’
‘তার মানে রানসাইটার মানি গ্রহণযোগ্য,’ আল স্বগতোক্তি করলো। সে আর জো পরের ক্রেতাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য কাউন্টার থেকে সরে দাঁড়ালো। পরের ক্রেতা মোটাসোটা একজন বয়স্ক মহিলা। পরনে জাম রঙের কাপড়ের কোট। হাতে মেক্সিকান দড়ির তৈরি বাজারের থলে। সাবধানে সিগারেটের প্যাকেটটা খুললো সে।
সিগারেটগুলো তার আঙুলের ফাঁকে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল।
‘কিছু একটা প্রমাণ করা যেত, যদি এটা পলমলের প্যাকেট হতো,’ আল বললো। ‘আমি আবার লাইনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি।’ লাইনের শেষ মাথার দিকে এগোতে শুরু করলো সে, তখনই দেখতে পেল অস্বাভাবিক মোটা বয়স্ক সেই মহিলা স্বয়ংক্রিয় চেকারের সাথে কী নিয়ে যেন ভীষণ তর্ক করছে।
‘ওটা মৃত ছিলো,’ চিকন কিন্তু তীক্ষ্ণ সুরে মহিলা বললো। ‘আমি বাড়ি পৌঁছেই দেখি ওটা মৃত। এই যে, তুমি এটা ফিরিয়ে নাও।’ কাউন্টারের উপর একটা পট রাখলো সে। আল দেখলো, একটা প্রাণহীন উদ্ভিদ, সম্ভবত জবা ফুলের গাছ—মৃতপ্রায় অবস্থাতেও কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
‘বিক্রিত মাল ফেরত নিতে পারবো না,’ চেকার জবাব দিলো। ‘আমরা যে সকল উদ্ভিদ বিক্রয় করি, সেগুলোতে কোনো ওয়ারান্টি থাকে না। ভোক্তার সচেতনতাই আমাদের মূলনীতি। দয়া করে সামনে এগিয়ে যান।’
‘আর স্যাটারডে ইভনিং পোস্ট,’ বৃদ্ধা বললো, ‘যেটা আমি তোমাদের নিউজ স্ট্যান্ড থেকে নিয়েছিলাম, সেটা এক বছরের পুরোনো। তোমাদের হয়েছেটা কী? আর মার্শিয়ান গ্রুবওয়ার্ম টিভি ডিনার—’
‘পরের ক্রেতা,’ চেকার বললো, বৃদ্ধাকে উপেক্ষা করলো পুরোপুরি।
লাইন থেকে বেরিয়ে মলের ভেতর ঘুরে বেড়াতে লাগলো আল। থামলো সিগারেটের কার্টনগুলো যেখানে রাখা হয় সেখানে। সব ধরনের ব্র্যান্ডই সাজানো আছে আট ফুটেরও বেশি উঁচু সারিতে। ‘একটা কার্টন তোলো,’ জোকে বললো সে।
‘ডোমিনোস,’ জো বললো। ‘দাম উইংসের সমান।’
‘ঈশ্বর! অচেনা বা অপ্রচলিত কোনো ব্র্যান্ড নিও না। উইনস্টন বা কুল, এই ধরনের কোনো ব্র্যান্ড বেছে নাও।’ সে নিজেই একটা কার্টন বের করে আনলো। ‘এটা খালি।’ কার্টনটা ঝাঁকালো সে। ‘ওজন দেখেই বলা যায়।’ কিন্তু কিছু একটা কার্টনের ভেতর ঝাঁকি খেল, ওজনহীন আর ছোট্ট কোনো বস্তু। কার্টনের মুখ খুলে ভেতরে তাকালো সে।
হিজিবিজি লেখা একটা কাগজ। হাতের লেখা তার এবং জোয়ের পরিচিত। কাগজটা বের করে দুজন একসাথে পড়তে লাগলো।
> তোমাদের সাথে যোগাযোগ করা অত্যন্ত জরুরি। পরিস্থিতি ভয়াবহ এবং সময়ের সাথে সাথে আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। সম্ভাব্য অনেকগুলো ব্যাখ্যা আছে, সেগুলো তোমাদের সাথে আলোচনা করবো। যাই হোক, তোমরা হাল ছাড়বে না। ওয়েন্ডি রাইটের ব্যাপারে আমি দুঃখিত। ওর জন্য আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।
‘তাহলে ওয়েন্ডির কথা সে জানে,’ আল বললো। ‘বেশ, তার মানে, হয়তো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না আমাদের সাথে।’
‘যথেচ্ছভাবে বেছে নেওয়া সিগারেটের একটা কার্টন,’ জো বললো, ‘যথেচ্ছভাবে নির্বাচিত এক দোকান, এমনকি শহরটাও নির্বাচন করা হয়েছে যথেচ্ছভাবে। আর আমাদের উদ্দেশে লেখা গ্লেন রানসাইটারের চিঠি পেয়ে গেলাম এখানে। অন্য কার্টনগুলোর ভেতরে কী আছে? একই চিঠি?’ এল অ্যান্ড এম-এর একটা কার্টন নিলো সে। ঝাঁকালো, তারপর মুখ খুললো। দশ প্যাকেট সিগারেট এবং নিচের সারিতে আরো দশ প্যাকেট সিগারেট; পুরোপুরিই স্বাভাবিক।
আসলেই কি তাই? নিজেকে প্রশ্ন করলো আল। প্যাকগুলো থেকে একটা তুলে নিলো সে। ‘দেখতেই পাচ্ছো ওগুলো ঠিক আছে,’ জো বললো। স্তূপের মাঝখান থেকে একটা কার্টন বের করে আনলো সে। ‘এটাও পরিপূর্ণ।’ এটা খুললো না সে, বরং আরো একটা কার্টন তুলে নিলো। তারপর আরো একটা। সবগুলো কার্টনেই সিগারেটের প্যাক আছে।
এবং সবগুলোই আলের দুই আঙুলের ফাঁকে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল।
‘ভেবে অবাক হচ্ছি, সে জানলো কীভাবে যে আমরা এখানেই আসবো?’ আল বললো। ‘আর এটাই বা কীভাবে জানলো যে আমরা ঠিক নির্দিষ্ট এই কার্টনটাই বেছে নেবো?’ কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। এখানেও দুটো বিপরীতমুখী শক্তি কাজ করছে। অধোগমন বনাম রানসাইটার, আল নিজেকে বললো। পুরো পৃথিবী জুড়েই। হয়তো পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে। হয়তো সূর্যের আয়ু ফুরিয়ে যাবে, আর তার জায়গায় গ্লেন রানসাইটার একটা বিকল্প সূর্য প্রতিস্থাপন করবে। যদি সম্ভব হয় আর কি। হ্যাঁ, সে ভাবলো, এটাই আসল প্রশ্ন। রানসাইটার আসলে কতটুকু করতে পারবে? অন্যভাবে বলা যায়—এই অধোগমন কতদূর যাবে?
‘অন্য কিছু চেষ্টা করা যাক,’ আল বললো। দুপাশে সাজানো পণ্যের মাঝখানের পথ দিয়ে হাঁটতে লাগলো সে। ক্যান, প্যাকেট এবং বাক্সগুলো পেরিয়ে অবশেষে নিত্যপ্রয়োজনীয় যন্ত্রের অংশে এসে পৌঁছালো। কোনো কিছু না ভেবেই জার্মানির তৈরি দামি একটা টেপ রেকর্ডার তুলে নিলো ওখান থেকে। ‘দেখে তো ঠিকই মনে হচ্ছে,’ অনুসরণরত জোয়ের উদ্দেশে বললো সে। আরো একটা তুলে নিলো, এখনো কন্টেইনারের ভেতরেই আছে বস্তুটা। ‘চলো এটা কিনে ফেলি। তারপর সাথে করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাই।’
‘খুলে দেখবে না?’ জো জিজ্ঞেস করলো। ‘কেনার আগে চালিয়ে দেখবে না?’
‘আমার মনে হয় আমি ইতোমধ্যেই জানি কী পাওয়া যাবে,’ আল বললো। ‘আর সেটা এখানে পরীক্ষা করে দেখা যাবে না।’ টেপ রেকর্ডার হাতে নিয়ে চেকস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে শুরু করলো সে।
***
নিউ ইয়র্কে রানসাইটার এসোসিয়েটসে ফিরেই টেপ রেকর্ডারটা কোম্পানির রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পাঠিয়ে দিলো আল।
প্রতিটি যন্ত্রাংশ এক এক করে খুলে আলাদা করার পনেরো মিনিট পর রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের ফোরম্যান জানালো, ‘যে অংশ দিয়ে টেপ ঢোকাতে হয় সেই অংশের প্রতিটি চলমান যন্ত্রাংশ একেবারেই পুরোনো হয়ে গেছে। রবার-ড্রাইভ টায়ারে প্রচুর ময়লা জমে আছে। টেপ রেকর্ডারের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে রবারের ছেঁড়া অংশ। দ্রুত গতিতে রিওয়াইন্ড-ফরোয়ার্ড করার হাতলটা নেই। ভেতরটা পরিষ্কার করে তেল দিতে হবে। দেখে মনে হচ্ছে অনেক দিন ব্যবহার করা হয়েছে—সত্যি বলতে কী, আমার মতে এটাকে আগাগোড়া মেরামত করতে হবে এবং নতুন বেল্ট লাগাতে হবে।’
‘অনেক বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে?’ আল জিজ্ঞেস করলো। ‘সম্ভবত। তোমার কাছে কতদিন ধরে আছে?’
‘মাত্র আজই কিনেছি,’ আল বললো।
‘অসম্ভব!’ ফোরম্যান বললো। ‘যদি আজই কিনে থাকো, ওরা তোমাকে—’
‘আমি জানি ওরা আমার কাছে কী বিক্রয় করেছে,’ আল বললো। ‘কেনার সময় প্যাকেট খোলার আগেই আমি জানতাম কী আছে ভেতরে।’ এরপর জোয়ের উদ্দেশে বললো, ‘নতুন টেপ রেকর্ডার, কিন্তু বহু ব্যবহারে সম্পূর্ণ জরাজীর্ণ। হাস্যকর এক মুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করা হয়েছে। দোকান সেটা গ্রহণ করতে কোনো অস্বীকৃতি জানায়নি। মূল্যহীন মুদ্রা, বাতিল পণ্য ক্রয়। যুক্তি আছে অবশ্যই।’
‘আমার দিনটা আজ খারাপ,’ রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের ফোরম্যান বললো। ‘সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমার পোষা তোতা পাখিটা মারা গেছে।’
‘কীভাবে মারা গেল?’ জিজ্ঞেস করলো জো।
‘আমি জানি না, স্রেফ মারা গেছে। কাঠের মতো শক্ত হয়েছিলো।’ আলের দিকে হাড্ডিসার আঙুল তুলে ফোরম্যান বললো, ‘তোমার টেপ রেকর্ডার সম্পর্কে এখন যা বলবো, তুমি সেটা জানো না। এটা কেবল বহু ব্যবহারে জরাজীর্ণই নয়, বরং চল্লিশ বছরের পুরোনো। এখন আর কেউ রবার-ড্রাইভ টায়ার বা বেল্ট পুলি ব্যবহার করে না। কেউ যদি হাতে না বানিয়ে দেয়, তুমি যন্ত্রাংশগুলো পাবে না। তবে তাতেও লাভ হবে না, এই হতচ্ছাড়া জিনিসটা এখন অ্যান্টিক। ফেলে দাও। ভুলে যাও ওটার কথা।’
‘ঠিকই বলেছ তুমি,’ আল বললো। ‘আমি জানতাম না।’ জোকে নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ থেকে করিডরে বেরিয়ে এলো সে। ‘এখন অধোগমন ছাড়াও নতুন একটা বিপদ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এটা পুরোপুরি অন্য সমস্যা। খাওয়ার উপযোগী খাদ্য সমস্যার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা। সেটা যেখান থেকেই কিনি, কিংবা যেকোনো ধরনের খাবারই হোক। সুপারমার্কেটে বিক্রি করা পণ্য এত বছর পর কতটুকু ভালো থাকবে?’
‘ক্যানে সংরক্ষিত প্রক্রিয়াজাত পণ্যসমূহ,’ জো বললো। ‘বাল্টিমোরের সুপারমার্কেটে আমি প্রচুর পরিমাণে ঐ ধরনের পণ্য দেখেছি।’
‘তাহলে এখন আমরা জানি যে কেন চল্লিশ বছর আগে সুপারমাকের্টগুলো হিমায়িত পণ্যের বদলে অধিকাংশ পণ্য ক্যানে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করতো। ওটাই আমাদের একমাত্র উৎস হয়ে উঠতে পারে, ঠিকই বলেছ তুমি।’ তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে আল বললো, ‘কিন্তু মাত্র এক দিনের ব্যবধানে একলাফে দুই বছর থেকে চল্লিশ বছর হয়ে গেল। আগামীকাল ঠিক এই সময়ে এটা হতে পারে একশো বছর। আর কোনো খাদ্যই প্রক্রিয়াজাত করে প্যাকেট করা হলে একশো বছর পর আর খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না, সেটা ক্যানে সংরক্ষণ করা হোক বা অন্য যে উপায়েই রাখা হোক না কেন।’
‘চাইনিজ ডিম থাকে,’ জো বললো। ‘এই হাজার বছরের পুরোনো ডিমগুলোকে ওরা মাটিতে পুঁতে রাখে।’
‘শুধু আমরাই নই,’ ওকে পাত্তা না দিয়ে বললো আল। ‘বাল্টিমোরের ঐ বৃদ্ধ মহিলা, সে যা কিনেছিলো তাতেও একই প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—তার জবা ফুলের গাছ।’ চাঁদে একটা মাত্র বিস্ফোরণের কারণে কি এখন পুরো পৃথিবী না খেয়ে মরবে? নিজেকেই প্রশ্ন করলো সে। আমরা ছাড়াও বাকি সবাই কেন এই প্রক্রিয়ার শিকার হচ্ছে?
‘এখানে—’ জো কথা শুরু করতেই আল তাকে থামিয়ে দিলো।
‘দাঁড়াও, একটু ভাবতে দাও,’ বললো আল। ‘ঐ বাল্টিমোরের অস্তিত্ব হয়তো শুধু আমাদের জন্যই ছিলো। আর লাকি পিপল সুপারমাকের্ট… আমরা চলে আসামাত্রই অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে ওটা। হয়তো আমরা যারা চাঁদে গিয়েছিলাম, শুধু তারাই অনুভব করছি এই প্রক্রিয়া।’
‘অস্তিত্বহীনতার এমন এক সমস্যা যার না আছে কোনো গুরুত্ব না আছে কোনো অর্থ,’ জো বললো। ‘এবং প্রমাণ করারও কোনো উপায় নেই।’
আল তিক্ত সুরে বললো, ‘জামরঙা কোট পরা বৃদ্ধার জন্য ঠিকই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। বাকি সবার জন্যেও।’
‘ঐ যে ফোরম্যান আবার আসছে,’ জো বললো।
‘নির্দেশনা পুস্তিকাটা দেখলাম এই মাত্র,’ ফোরম্যান বললো। ‘তোমার টেপ রেকর্ডারের সাথে ছিলো।’ ছোট পুস্তিকাটা আলের দিকে এগিয়ে দিলো সে, চেহারায় হতবিহ্বল ভাব। ‘তুমি নিজেই দেখো।’ কথাটা বলেই পুস্তিকাটা আবার ফিরিয়ে নিলো সে। ‘কষ্ট করে তোমাকে পড়তে হবে না; শেষ পাতার এই অংশটুকু শুধু দেখো। এখানে বলা আছে এই বিদঘুটে বস্তুটা কে বানিয়েছে এবং এটা মেরামত করার জন্য কোথায় পাঠাতে হবে।’
‘প্রস্তুতকারক জুরিখের রানসাইটার,’ আল শব্দ করে পড়লো। ‘এবং নর্থ আমেরিকান কনফেডারেশনে একটা মেরামত কেন্দ্র—ডি মোয়েনে অবস্থিত। দিয়াশলাই বাক্সে যে ঠিকানা ছিলো ঠিক সেটাই।’ পুস্তিকাটা জোয়ের হাতে দিয়ে সে বললো, ‘আমরা ডি মোয়েন যাচ্ছি। এই পুস্তিকাই সর্বপ্রথম দুটো অবস্থানের মধ্যে একটা যোগসূত্র দেখাচ্ছে।’ ভাবছি ডি মোয়েনেই কেন, সে আপনমনে বললো। ‘তোমার কি কিছু মনে পড়ে,’ জোকে জিজ্ঞেস করলো সে। ‘রানসাইটার বেঁচে থাকতে ডি মোয়েনের সাথে তার কোনো যোগসূত্র ছিলো?’
‘রানসাইটারের জন্ম ওখানে,’ জো বললো। ‘জীবনের প্রথম পনেরো বছর তার ওখানেই কেটেছে। সুযোগ পেলেই কথাটা সে বলতো।’
‘তাই মৃত্যুর পরও সে ওখানেই ফিরে গেছে। এইভাবে না হয় অন্যভাবে।’
রানসাইটার এখন আছে জুরিখে, আবার ডি মোয়েনেও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। জুরিখে তার মস্তিষ্কের সজীব উপাদানের রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিমাপ করার মতো সক্রিয়; তার জৈবিক, অর্ধ-জীবিত দেহ ঝুলে আছে বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামের কোল্ড-প্যাকে, অথচ তার সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ডি মোয়েনে তার দৈহিক কোনো অস্তিত্ব নেই, অথচ তারপরেও ওখানে একটা যোগাযোগ তৈরি করা যাচ্ছে—কিছু অদ্ভুত উপায়ে, যেমন এই পুস্তিকা। আবার যোগাযোগ তৈরি করা যাচ্ছে ঠিকই, তবে তা একমুখী—কেবল তার দিক থেকে। আর এদিকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ওদের পৃথিবী, চলতে শুরু করেছে উলটো পথে, বাস্তবের অতীত ধাপসমূহ তুলে আনছে মাটি খুঁড়ে। হয়তো এই সপ্তাহের শেষেই ঘুম থেকে উঠে দেখবে যে ফিফথ অ্যাভিনিউতে প্রাচীন যুগের ঘণ্টিওয়ালা লক্করঝক্কর মার্কা গাড়ি চলছে। ট্রলি ডজারস, ভাবছে সে, এবং অবাক হয়ে শব্দটার অর্থ মনে করার চেষ্টা করছে। অনেক আগেই পরিত্যক্ত একটা শব্দ এইমাত্র উঠে এসেছে অতীতের অন্ধকার থেকে। শব্দটা তার মনের মাঝে সৃষ্ট কুয়াশাচ্ছন্ন, দূরাগত এক নিঃসরণ, যা বর্তমান বাস্তবতাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এমনকি এই অস্পষ্ট উপলব্ধি, যা তখনো ছিলো কেবলই ধারণা, তাকে উদ্বিগ্ন করে তুললো। ইতোমধ্যে বিষয়টা এতটাই বাস্তব হয়ে উঠেছে যে এক মুহূর্ত আগেও এই রূপান্তরিত সত্তার ব্যাপারে সচেতন ছিলো না সে।
‘ট্রলি ডজারস,’ বাকি দুজনকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো আল। কম করে হলেও একশো বছর আগের কথা। অবচেতন মন থেকে উঠে আসা শব্দটা ঘুরপাক খাচ্ছে মনের সচেতন স্তরে। ভুলতে পারছে না কিছুতেই।
‘তুমি এটার কথা কীভাবে জানলে?’ ফোরম্যান তাকে জিজ্ঞেস করলো। ‘এটার কথা এখন আর কেউ জানে না। এটা ব্রুকলিন ডজারসের পুরোনো নাম।’ আলের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো সে।
‘আমাদের উপরে যাওয়া উচিত,’ জো বললো। ‘নিশ্চিত হতে হবে যে সবাই নিরাপদে আছে। ডি মোয়েনে যাওয়ার আগেই।’
‘যদি ডি মোয়েনে দ্রুত না যাই,’ আল বললো, ‘তাহলে এটা হয়ে উঠতে পারে এক দিন কিংবা দুদিনের যাত্রাপথ।’ পরিবহন ব্যবস্থা যেভাবে আদি রূপে ফিরে যাচ্ছে, ভাবলো সে। রকেটচালিত থেকে জেটচালিত, জেটচালিত থেকে পিস্টনচালিত উড়োজাহাজ, তারপর সড়ক পথে যাতায়াত, যেমন কয়লাচালিত বাষ্পীয় ইঞ্জিনের রেলগাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি—অতটা পশ্চাদগমন হবে না হয়তো, নিজেকে আশ্বস্ত করলো সে। তারপরেও, ইতোমধ্যে আমাদের হাতে আছে চল্লিশ বছরের পুরোনো একটা টেপ রেকর্ডার, যেটা রবার-ড্রাইভ টায়ার আর বেল্ট দ্বারা চলে। সেক্ষেত্রে ঐরকম অধোগমন হলেও হতে পারে।
সে আর জো দ্রুত এলিভেটরের দিকে এগোল। জো বোতাম চাপার পর দুজনেই অপেক্ষা করতে লাগলো, উভয়েই উদ্বেগের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, কিছুই বলছে না। দুজনেই ডুবে আছে যার যার ভাবনায়।
ঝনঝন শব্দে এলিভেটর এসে পৌঁছালো; উৎকট শব্দটা গভীর ভাবনা থেকে জাগিয়ে তুললো আলকে। নিজের অজান্তেই লোহার গ্রিল দেওয়া নিরাপত্তা কপাট একপাশে সরালো।
তারপরেই নিজেকে আবিষ্কার করলো একটা উন্মুক্ত খাঁচার সামনে। পালিশ করা পিতলের ফিটিংস, মোটা ক্যাবলের মাধ্যমে ঝোলানো। ইউনিফর্মপরা, নিষ্প্রভ দৃষ্টির এক লোক হাতল পরিচালনার জন্য বসে আছে একটা টুলে। নিরাসক্ত দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকালো সে। এটা নিরাসক্ত দৃষ্টি না, মোটেও না, অন্তত আলের তাই মনে হলো। ‘ভেতরে যাওয়ার দরকার নেই,’ জোকে সতর্ক করে দিলো সে। হাতে টান দিয়ে সরিয়ে আনলো তাকে। ‘দেখো আর ভাবো। আজকেই কিছুক্ষণ আগে আমরা যে এলিভেটরে উঠেছিলাম সেটার কথা মনে করার চেষ্টা করো। হাইড্রলিক-পাওয়ার দ্বারা চালিত, চারপাশে বন্ধ, স্বয়ংক্রিয়, পুরোপুরি শব্দহীন—’
মাঝপথেই থামতে বাধ্য হলো সে। কারণ ঝনঝন শব্দ করা পুরোনো আমলের যন্ত্রটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে, তার বদলে সেই পরিচিত এলিভেটর আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। কিন্তু তারপরেও সে একটু আগে দেখা ঐ পুরোনো এলিভেটরের অস্তিত্ব অনুভব করছে। ওটা তার দৃষ্টির সীমানাতেই ওঁৎ পেতে আছে, যেন সে আর জো মনোযোগ একটু সরালেই সামনে এগিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত। ওটা ফিরে আসতে চায়, আলের অনুভূতি সেই কথাই বলছে। ওটা ফিরে আসবেই। ওটার ফিরে আসাটা আমরা সাময়িক বিলম্বিত করতে পারবো; হয়তো খুব বেশি হলে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। অধোগামী শক্তির গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত; আদি রূপগুলো আমরা যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করছে। প্রশ্ন হলো, একলাফে একশো বছর পিছিয়ে যায় কি না। কারণ এইমাত্র যে এলিভেটর আমরা দেখলাম সেটা নিঃসন্দেহে একশো বছরের পুরোনো।
তবে যাই হোক না কেন, ভাবছে আল, মনে হচ্ছে এই প্রক্রিয়ার উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছি আমরা। যেভাবেই হোক সমসাময়িক আসল এলিভেটরকে আবার অস্তিত্বে ফিরিয়ে আনার জন্য বল প্রয়োগ করতে পেরেছি। যদি আমরা সবাই একসাথে থাকি, যদি আমরা সবাই এক সত্তা হয়ে কাজ করি—দুজনের নয়, বরং বারোজনের মাইন্ড একত্রে—
‘কী দেখেছ তুমি?’ জো প্রশ্ন করলো। ‘যে কারণে তুমি আমাকে এলিভেটরে উঠতে না করলে?’
‘পুরোনো এলিভেটরটা তুমি দেখোনি?’ পালটা প্রশ্ন করলো আল। ‘উন্মুক্ত একটা খাঁচা, পিতলরঙা, সম্ভবত ১৯১০ সালের? চালক বসে ছিলো টুলের উপর?’
‘না,’ জবাব দিলো জো।
‘তবে কী দেখলে?’
‘এটাই দেখলাম।’ ইশারা করলো জো। ‘স্বাভাবিক এলিভেটর, যেটা প্রতিদিন অফিসে এসে দেখি। সব সময় যা দেখি তাই দেখেছি আমি, এখনও সেটাই দেখছি।’ এলিভেটরে প্রবেশ করলো সে, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো আলের জন্য।
নিজেদের উপলব্ধিও এখন ভিন্ন হতে শুরু করেছে, বুঝতে পারছে আল। এটার পরিণতি কী হতে পারে সেটাই ভাবছে এখন।
পরিণতি ভালো হবে না বলেই অনুমান করে নিলো সে। ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগছে না তার। ভয়াবহতা এবং অস্পষ্টতার কারণে রানসাইটারের মৃত্যুর পর এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা মনে হলো তার কাছে। এখন আর তাদের অধোগমন সমান তালে হচ্ছে না, এবং তার মনের তীব্র, সহজাত অনুভূতি তাকে বলছে যে মৃত্যুর আগে ওয়েন্ডি রাইট ঠিক একই রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলো।
তার নিজের হাতে কতটুকু সময় আছে সেটাই ভাবছে আল।
এখন সে সচেতন হয়ে উঠছে এক সুপ্ত, বিচ্ছিন্ন অনুভূতির বিষয়ে যা কোনো এক বিস্মৃত সময়ে তাকে গ্রাস করে নিয়েছিলো। বিশ্লেষণ করছে তাকে এবং তার চারপাশের জগৎটাকে। এটা তাকে চাঁদে তাদের অবস্থানের শেষ কয়েক মিনিটের কথা মনে করিয়ে দিলো। হিমশীতলতা দৃশ্যগুলোকে মাটি খুঁড়ে তুলে আনলো; দৃশ্যটা পাক খেতে লাগলো, প্রসারিত হলো, ফুলে উঠতে লাগলো বুদবুদের মতো, শোনা যায় এমনভাবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, তারপর মিলিয়ে গেল পুট শব্দ করে। ঠান্ডা প্রবাহ অসংখ্য উন্মুক্ত ক্ষতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো। ঢুকে গেল একেবারে সবকিছুর অন্তরে, একেবারে কেন্দ্রে, যা তাদেরকে জীবিত করে তুলেছিলো। এখন সে যে দৃশ্য দেখছে, মনে হলো সেটা বরফের মরুভূমি, যার এখানে-সেখানে কঠিন পাথরের চাঁই। সমতল ভূমির উপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেল, আর সেটাকে মনে হলো পুরোপুরি বাস্তব; ঝড়ো হাওয়া জমাট বেঁধে গেল বরফের মধ্যেই, আর পাথরের চাঁইগুলো অধিকাংশই অদৃশ্য হয়ে গেল। নিরেট অন্ধকার জমাট বাঁধছে তার দৃষ্টিসীমার প্রান্তে; দৃশ্যটার কিছু ঝলক শুধু দেখতে পেল সে।
কিন্তু এ কেবল আমার একার অনুভূতি। ঝড়ো হাওয়ার নিচে সমাধিস্থ হয়ে থাকা এই জগৎ মহাবিশ্ব নয়। যা ঘটছে সব আমার অভ্যন্তরে। কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছে যেন আমি বাইরে থেকে দর্শকের মতো দেখছি। অদ্ভুত, আবারও ভাবলো সে। পুরো পৃথিবীটাই কি আমার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বসে আছে? আমার এই নশ্বর দেহ তাকে গিলে নিয়েছে? কখন হলো সেটা?
এটা হয়তো মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ, নিজেকেই বললো সে। যে অনিশ্চয়তা আমি অনুভব করছি, যে বিশৃঙ্খলতার সাথে মিশে যাওয়া নিয়ে ভয় পাচ্ছি—এটাই চলমান প্রক্রিয়া, এবং যে বরফ আমি দেখছি, সেটা সেই প্রক্রিয়ারই ফলাফল। যখন চোখের পলক ফেলবো, পুরো মহাবিশ্ব অদৃশ্য হয়ে যাবে। কিন্তু আমি যে নতুন আলোগুলো দেখবো, সেগুলো কী? নতুন জীবনের প্রবেশদ্বার? বিশেষ করে ধোঁয়াটে লাল আলো কি মানব-মানবীর অবৈধ সম্পর্কের প্রতীক? আর নিষ্প্রভ আলোটা, ওটা কি পাশবিক লোভকে বোঝায়? আমি শুধু বুঝতে পারছি, ও ভাবছে, সূর্য কর্তৃক পরিত্যক্ত একটা সমভূমি ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। হারিয়ে যাচ্ছে সমস্ত উষ্ণতা, হিমশীতলতার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চরাচর। স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে না এটা, নিজেকে বোঝালো সে। এটা অস্বাভাবিক; সবকিছুর সাথে মিশে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে চাপিয়ে দেওয়া উপাদানের কারণে। হয়তো আমি বুঝতে পারবো, সে ভাবলো, যদি বিছানায় শুয়ে একটু বিশ্রাম নিতে পারি। যদি ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার মতো যথেষ্ট বল ফিরে পাই।
‘কী ভাবছো?’ জো জিজ্ঞেস করলো। দুজনেই এখন একসাথে এলিভেটরে করে উপরে উঠছে।
‘কিছু না,’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো আল। ওরা হয়তো এই যাত্রায় উদ্ধার পেয়ে যাবে, ও ভাবলো, কিন্তু আমি পারবো না। ও আর জো তখনো নিঃশব্দে উপরে উঠছে।
***
কনফারেন্স রুমে প্রবেশের সময় জো লক্ষ করলো, আল নেই তার সাথে। ঘুরে তাকাতেই দেখলো করিডরের মাথায় একা দাঁড়িয়ে আছে সে, অনড়।
‘কী হয়েছে?’ আবার জিজ্ঞেস করলো জো। আল নড়লো না একটুও। ‘তুমি ঠিক আছো?’ আলের দিকে এগোল সে।
‘ভীষণ ক্লান্ত লাগছে,’ আল বললো।
‘তোমাকে অসুস্থ দেখাচ্ছে,’ জো বললো, আকস্মিক এক অস্বস্তি গ্রাস করছে তাকে।
‘আমি বাথরুমে যাচ্ছি,’ আল বললো। ‘তুমি গিয়ে দেখ, বাকি সবাই ঠিক আছে কি না। একটু পরেই আসছি আমি।’ টলোমলো পায়ে এগোতে শুরু করলো সে। তাকে এখন দ্বিধাগ্রস্ত মনে হচ্ছে। ‘আমি ঠিক হয়ে যাবো,’ সে বললো। করিডর দিয়ে থেমে থেমে হাঁটছে সে, মনে হচ্ছে যেন দেখতে অসুবিধা হচ্ছে তার।
‘আমি আসছি তোমার সাথে,’ জো বললো। ‘তুমি বাথরুমে পৌঁছাতে পেরেছ, সেটা অন্তত নিশ্চিত করতে হবে।’
‘হয়তো চোখে-মুখে একটু উষ্ণ পানির ঝাপটা দিলে ভালো লাগতো,’ আল বললো। পুরুষ বাথরুমের টোল-ফ্রি দরজাটা খুঁজে পেল সে। জোয়ের সাহায্যে দরজা খুলে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। করিডরেই দাঁড়িয়ে রইলো জো। ওর কিছু একটা হয়েছে, নিজেকে বললো সে। প্রাচীন এলিভেটর দেখার পর তার মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। কেন, সেটাই ভাবছে জো।
আলকে দেখা গেল আবার।
‘কী হয়েছে?’ তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে জো জিজ্ঞেস করলো।
‘চলুন, দেখবে,’ আল বললো, জোকে নিয়ে পুরুষ বাথরুমে প্রবেশ করে দূরের দেয়ালের দিকে ইশারা করলো। ‘গ্রাফিটি,’ সে বললো। ‘জানো নিশ্চয়ই, হিজিবিজি করে শব্দগুলো লেখা হয়। সব পুরুষ বাথরুমেই গ্রাফিটি দেখতে পাবে তুমি। কী লেখা আছে সেটা পড়ো।’
পেন্সিল অথবা বেগুনি বল-পয়েন্ট কলম দিয়ে লেখা:
> মূত্রাধারে লাফ দাও, মাথা নিচে, পা উপরে করে।
> বেঁচে আছি আমি একা, মরে গেছ তোমরা সবাই।
‘এটা কি রানসাইটারের হাতের লেখা?’ জিজ্ঞেস করলো আল। ‘চিনতে পারছো তুমি?’
‘হ্যাঁ,’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো জো। ‘এটা রানসাইটারেরই হাতের লেখা।’
‘তাহলে আসল সত্যটা এখন আমরা জানি,’ আল বললো।
‘এটাই তাহলে আসল সত্য?’
‘হ্যাঁ। কোনো সন্দেহ নেই,’ আল বললো।
‘কী বিদঘুটে উপায়ে আমরা সেটা জানতে পারলাম। পুরুষ বাথরুমের দেয়ালের লেখা থেকে।’ ভীষণ তিক্ত একটা অনুভূতি হচ্ছে ওর।
‘গ্রাফিটি এরকমই হয়; কঠিন এবং সরাসরি। আমরা হয়তো টিভিতে সংবাদ দেখতাম, ভিডফোনে শুনতাম আর সংবাদপত্র পাঠ করতে থাকতাম মাসের পর মাস—অনন্তকাল, হয়তো বা—কোনো কিছু না জেনেই। এভাবে সুনির্দিষ্ট আর সোজা-সাপটাভাবে কেউই বলতো না।’
‘কিন্তু আমরা তো মারা যাইনি,’ জো বললো। ‘ওয়েন্ডি ছাড়া…’
‘আমরা অর্ধ-জীবিত অবস্থায় আছি। সম্ভবত এখনো প্র্যাটফল ২-এ। বোধহয় চাঁদ থেকে পৃথিবীতে ফেরার পথে আছি, সেই বিস্ফোরণের পর, যে বিস্ফোরণ আমাদের হত্যা করেছে—রানসাইটারকে নয়। এবং সে আমাদের প্রোটোফেশন প্রবাহ ধরার চেষ্টা করছে। বুঝতে পারছি, সফল হতে পারেনি সে; আমরা নিজেদের জগৎ থেকে তার কাছে পৌঁছাতে পারছি না। কিন্তু সে কোনো না কোনোভাবে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। আমরা তাকে সকল স্থানেই খুঁজে পাচ্ছি। এমনকি এলোমেলোভাবে বেছে নেওয়া স্থানগুলোতেও। তার উপস্থিতি আমাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে; তাকে আর একমাত্র তাকে। কারণ সে-ই একমাত্র ব্যক্তি যে চেষ্টা করছে—’
‘সে আর একমাত্র সে,’ জো বাধা দিয়ে বললো। ‘তাকে না হয়ে হবে সে। তুমি বলেছ তাকে।’
‘আমি অসুস্থ,’ আল বললো। কল ছাড়লো সে, চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে লাগলো। যদিও সেটা উষ্ণ পানি ছিলো না, পানির সাথে ছোট ছোট বরফের টুকরো ছিটকে আসছে—পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে জো। ‘তুমি কনফারেন্স রুমে ফিরে যাও। একটু ভালো বোধ করলেই আমি আসছি। যদি আদৌ ভালো বোধ করার অনুভূতি ফিরে আসে।’
‘মনে হয় তোমার সাথেই থাকা উচিত আমার,’ জো বললো।
‘না। কেন বুঝতে পারছো না—চলে যাও এখান থেকে!’ তার মুখটা বর্ণহীন, আতঙ্কের ছাপ সেখানে। আল তাকে টেনে পুরুষ বাথরুমের দরজার কাছে নিয়ে এলো; ঠেলে করিডরে বের করে দিলো জোকে। ‘যাও, বাকি সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করো!’ আল পুরুষ বাথরুমে ঢুকে গেল আবার, দুহাতে নিজের চোখ কচলাচ্ছে। বেসিনের উপর ঝুঁকলো সে, দরজাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল।
ইতস্তত করছে জো। ‘ঠিক আছে,’ সে বললো, ‘আমি কনফারেন্স রুমে যাচ্ছি।’ একটু অপেক্ষা করে কান পেতে শোনার চেষ্টা করলো। কোনো সাড়াশব্দ নেই। ‘আল?’ ডাকলো সে। হায় যিশু! ওর আসলেই ভয়ংকর কিছু একটা হয়েছে। ‘আমি নিজের চোখে দেখতে চাই—’ বললো সে, একইসাথে ঠেলা দিলো দরজায়—‘যে তুমি ঠিক আছো।’
অত্যন্ত নিচু, কিন্তু বিস্ময়কর রকম শান্ত কণ্ঠে আল বললো, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে, জো। তাকিও না এদিকে।’ বাথরুমের ভেতরটা অন্ধকার। কোনো সন্দেহ নেই, আল নিজেই আলোগুলো নিভিয়ে দিয়েছে। ‘তুমি আর আমাকে সাহায্য করতে পারবে না,’ দুর্বল কিন্তু অবিচল কণ্ঠে বললো সে। ‘বাকি সবার কাছ থেকে আমাদের আলাদা হওয়াটা উচিত হয়নি; সেজন্যই ওয়েন্ডির এমন মৃত্যু হয়েছে। তুমি অন্তত আরো কিছুক্ষণ বেঁচে থাকতে পারবে যদি ফিরে গিয়ে বাকি সবার সাথে থাকো। আর এই কথাটা তুমি ওদেরকে বুঝিয়ে বলবে। ওরা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে কি না সেটাও নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে তোমাকে। বুঝতে পেরেছ?’
আলো জ্বালানোর জন্য হাত বাড়ালো জো।
অকস্মাৎ একটা ধাক্কা। অন্ধকারে দুর্বল আর ওজনহীন একটা হাত তার হাত আঁকড়ে ধরলো। প্রচণ্ড আতঙ্কে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো সে। আলের হাতের দুর্বলতায় হতবাক। আর এই স্পৰ্শই সব বলে দিলো তাকে। চোখ দিয়ে দেখার আর দরকার নেই।
‘আমি বাকিদের কাছে ফিরে যাচ্ছি,’ সে বললো। ‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি আমি। খুব কষ্ট হচ্ছে?’
খানিকক্ষণ নীরবতা, তারপর প্রাণহীন একটা কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বললো, ‘না, মোটেও কষ্ট হচ্ছে না। আমি শুধু—’ কণ্ঠস্বরটা মিলিয়ে গেল। তারপর আবার নীরবতা।
‘হয়তো তোমার সাথে আমার আবার দেখা হবে,’ জো বললো। সে জানে এই মুহূর্তে এই কথা বলা একেবারেই অর্থহীন—নিজেকে এমন একটা মন্তব্য করতে শুনে নিজের ভেতরেই মরে গেল সে। কিন্তু আর কিছু তার মাথায় আসেনি। ‘আমাকে একটু অন্যভাবে বলতে দাও,’ সে বললো, কিন্তু জানে যে আল তার কথা আর শুনতে পাচ্ছে না। ‘আশা করি তুমি এখন ভালো বোধ করছো। আমি আবার তোমার কাছে ফিরে আসছি সবাইকে দেয়ালের কথাটা জানানোর পর। আমি ওদের বলবো, যেন ওরা এখানে না আসে লেখাটা দেখার জন্য। কারণ এটা—’ কী বলবে সেটা ভাবতে লাগলো সে। ‘ওরা তোমাকে বিরক্ত করতে পারে,’ অবশেষে বললো জো।
ওপাশে কোনো সাড়াশব্দ নেই।
‘তাহলে বিদায়।’ এইটুকু বলেই জো বেরিয়ে এলো পুরুষ বাথরুমের অন্ধকার ছেড়ে। তারপর বিচলিত ভঙ্গিতে করিডর ধরে এগোল কনফারেন্স রুমের দিকে। একটু থেমে লম্বা শ্বাস নিলো। তারপর কনফারেন্স রুমের দরজা ঠেলে প্রবেশ করলো ভেতরে।
শেষ মাথায় দেয়ালে ঝোলানো টিভিতে ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপন চলছে; বর্ণিল ত্রিমাত্রিক পর্দায় গভীর মনোযোগ দিয়ে কৃত্রিম চামড়ায় তৈরি তোয়ালে পর্যবেক্ষণ করছে এক গৃহিণী, তারপর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে ঘোষণা করলো, এই তোয়ালে তার বাথরুমে বেমানান। পর্দায় তার বাথরুমের দৃশ্য ফুটে উঠলো, সেই সাথে দেয়ালে আঁকা গ্রাফিটিও দৃশ্যমান হলো। সেই একই রকম হিজিবিজি হাতের লেখা। এবার যা লেখা আছে সেটা হলো:
> গামলার সামনে ঝুঁকে দাঁড়াও, তারপর ঝাঁপ দাও।
> বেঁচে আছি আমি একা, মরে গেছ তোমরা সবাই।
কনফারেন্স রুমে মাত্র একজনই টিভির বিজ্ঞাপন আর লেখাটা দেখছে; ফাঁকা কামরায় একা দাঁড়িয়ে থাকা জো নিজে। বাকি সবাই, পুরো দলটাই, চলে গেছে।
ওরা কোথায়? অবাক হয়ে ভাবলো সে। ওদের খোঁজ পাওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকবে কি সে? মনে হয় না।
