উবিক – ১৫

অধ্যায় ১৫

নিঃশ্বাসে কি দুর্গন্ধ, টম? বেশ, মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে যদি তুমি দুঃশ্চিন্তায় থাকো, তাহলে ব্যবহার করতে পারো আধুনিক নতুন উবিক। এর অধিক ফেনা জীবাণু দূর করে শতভাগ। নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার দেয় দুর্গন্ধহীন মুখের নিশ্চয়তা।

.

প্রাচীন হোটেল কামরার দরজা এক ধাক্কায় খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করলো ডন ড্যানি, সাথে মাঝবয়সী, নিখুঁতভাবে ছাঁটা ধূসর চুলো এক লোক। দেখলেই মনে হয় অত্যন্ত দায়িত্বশীল। ড্যানির চেহারাটা শুকনো হয়ে আছে উদ্বেগে, বললো, ‘কেমন আছো, জো? বসে আছো কেন? যিশুর দোহাই, বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ো।’

‘দয়া করে শুয়ে পড়ুন, মি. চীপ,’ টেবিলের উপর মেডিক্যাল ব্যাগ রেখে ওটা খুলতে খুলতে বললো ডাক্তার। ‘এখনো ব্যথা, আচ্ছন্নতা আর শ্বাসকষ্ট আছে?’ বিছানার দিকে এগোলো সে, হাতে পুরোনো আমলের স্টেথোস্কোপ আর রক্তচাপ মাপার পেটমোটা একটা যন্ত্র। ‘হার্টের কোনো সমস্যা আছে, মি. চীপ? অথবা আপনার বাবা কিংবা মায়ের? দয়া করে শার্টের বোতামগুলো খুলুন।’

জবাব শোনার প্রত্যাশায় কাঠের ভারী চেয়ারটা বিছানার কাছে টেনে এনে বসলো সে। ‘আমি এখন সুস্থ আছি,’ জো বললো।

‘তোমাকে ভালোমতো পরীক্ষা করতে দাও,’ চাঁছাছোলা কণ্ঠে বললো ড্যানি।

‘ঠিক আছে।’ লম্বা হয়ে শুয়ে শার্ট খুলে ফেললো জো। ‘রানসাইটার আমার কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলো,’ ড্যানিকে বললো জো। ‘আমরা সবাই কোল্ড-প্যাকে আছি। আর সে আছে অন্য পাশে। আমাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, কেউ একজন চেষ্টা করছে আমাদের ক্ষতি করার। প্যাট কিছু করেনি, অন্তত সে একা কিছুই করেনি। সে অথবা রানসাইটার, দুজনের কেউই জানে না যে আসলে কী ঘটছে। তুমি যখন দরজা খুললে, তখন কি রানসাইটারকে দেখেছিলে?’

‘না,’ ড্যানি বললো।

‘কামরার ঐ পাশে বসে ছিলো সে, একদম আমার মুখোমুখি,’ জো বললো। ‘দু-তিন মিনিট আগেই। “দুঃখিত, জো,” ও বলেছিলো। ওটাই ছিলো আমাকে বলা তার শেষ কথা। তারপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় সে। স্রেফ নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। টেবিলের ড্রয়ারে দেখো উবিকের স্প্রে ক্যানটা সে রেখে গেছে কি না।’

খুঁজে দেখলো ড্যানি, তারপর একটা উজ্জ্বল আলোকিত ক্যান তুলে ধরলো। ‘পেয়েছি। কিন্তু খালি মনে হচ্ছে,’ ক্যানটা ঝাঁকিয়ে বললো ড্যানি। ‘প্রায় খালি,’ জো বললো। ‘যতটুকু আছে নিজের গায়ে স্প্রে করো। এখুনি।’ উৎসাহ দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত নাড়লো সে।

‘কথা বলবেন না, মি. চীপ,’ স্টেথোস্কোপ কানে গুঁজে ডাক্তার বললো। তারপর জোয়ের শার্টের আস্তিন গুটিয়ে ফাঁপানো রবারের কাপড় তার বাহুতে প্যাঁচালো রক্তচাপ মাপার জন্য।

‘আমার হার্টের কী অবস্থা?’ জিজ্ঞেস করলো জো।

‘স্বাভাবিক,’ ডাক্তার বললো। ‘যদিও একটু দ্রুত চলছে।’

‘দেখলে তো?’ ডন ড্যানিকে বললো জো। ‘আমি সুস্থ হয়ে গেছি।’

‘সবাই মারা যাচ্ছে, জো,’ ড্যানি বললো।

আধবসা হয়ে জো বললো, ‘সবাই?’

‘আমরা যে কয়জন বাকি ছিলাম।’ ক্যানটা হাতে ধরে রেখেছে ড্যানি কিন্তু ব্যবহার করছে না।

‘প্যাট?’ জিজ্ঞেস করলো জো।

‘দ্বিতীয় তলায় এলিভেটর থেকে নেমেই তাকে দেখতে পাই আমি। তার উপর প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল মাত্র। ভীষণ বিস্মিত মনে হয়েছিল তাকে। স্পষ্টতই, তার বিশ্বাস হচ্ছিলো না।’ ক্যানটা আবার নামিয়ে রাখলো ড্যানি। ‘আমার ধারণা, সে ধরেই নিয়েছিল যে এই সবকিছু সে ঘটাচ্ছে। তার ট্যালেন্ট দ্বারা।’

‘ঠিক বলেছ,’ জো বললো। ‘ওরকমই ভাবতো সে। তুমি উবিক ব্যবহার করছো না কেন?’

‘কী হবে, জো? আমরা মারা যাচ্ছি। তুমি সেটা জানো, আমিও জানি।’ শিঙের তৈরি চশমা খুলে চোখ রগড়ালো সে। ‘প্যাটের অবস্থা দেখার পর আমি অন্যদের কামরায় ছুটে যাই, এরপর আমি বাকি সবাইকে দেখতে পাই। আমাদের সবাইকে। সেজন্যই এখানে আসতে আমাদের এত সময় লেগেছে। ডাক্তার টেইলরকে দিয়ে ওদের সবাইকে পরীক্ষা করিয়েছি। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে ওরা এত দ্রুত বিলীন হয়ে যাবে। অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে, মাত্র এক ঘণ্টায়—’

‘উবিক ব্যবহার করো,’ জো বললো। ‘নাহলে আমি উঠে এসে তোমার গায়ে স্প্রে করবো।’

ক্যান আবার হাতে তুলে নিলো ডন ড্যানি, আবারও ঝাঁকালো, নজলের মুখ ঘোরালো নিজের দিকে। ‘ঠিক আছে,’ সে বললো। ‘তুমি যেহেতু জোর করছো। ব্যবহার না করারও কোনো কারণ নেই। সব শেষ হয়ে গেছে, তাই না? অর্থাৎ, ওরা সবাই মৃত; শুধু তুমি আর আমি বাকি আছি। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই উবিকের প্রভাব কেটে যাবে তোমার উপর থেকে। আর তুমি নতুন করে সংগ্রহ করতে পারবে না। যার ফলে বেঁচে থাকবো শুধু আমি।’ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো ড্যানি, স্প্রে ক্যানে চাপ দিলো। ধাতব আলোক কণিকায় পরিপূর্ণ বাষ্প চটুল ভঙ্গিতে নেচে বেড়াচ্ছে চারপাশে। এই ঝলমলে, স্পন্দিত বাষ্প জড়িয়ে নিলো তাকে, মুহূর্তের জন্য পরিণত হলো একটা আকৃতিতে। অদৃশ্য হয়ে গেল ডন ড্যানি, উজ্জ্বল এক মেঘবলয় গ্রাস করে নিলো তাকে।

রক্তচাপ মাপা বাদ দিয়ে ডাক্তার টেলর মাথা ঘোরালো, কী হচ্ছে সেটা দেখার জন্য। দুজনেই দেখছে যে ধোঁয়াশা এখন আরো ঘনীভূত হচ্ছে; ছোট ছোট কিছু অংশ জ্বলজ্বল করছে কার্পেটের উপর, আর ড্যানির পেছনের দেয়ালে ঝিরঝিরে আলোর রেখা স্ফীত হতে শুরু করেছে।

ড্যানিকে গ্রাস করে নেওয়া মেঘবলয় মিলিয়ে গেল।

মলিন, বিবর্ণ কার্পেটের উপর, উবিকের বাষ্পীভূত দাগের ঠিক মাঝখানে, যে মানুষটা ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, সে মোটেও ডন ড্যানি নয়।

সদ্য কৈশোর পেরোনো বালকটা অস্বাভাবিক রোগা-পাতলা। জটলা পাকানো ভ্রুর নিচে কালো বোতামের মতো অসঙ্গতিপূর্ণ দুটো চোখ। পরনে সময়ের সাথে বেমানান পোশাক; সাদা ড্রিপ-ড্রাই শার্ট, জিন্স আর ফিতা ছাড়া চামড়ার স্যান্ডেল। এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ ধরনের পোশাকের প্রচলন ছিলো। লম্বাটে মুখে হাসির রেখা দেখতে পেল জো, কিন্তু সেটা ছিলো বিকৃত হাসি, একটা ভাঁজ এখন পরিণত হয়েছে প্রায় বিদ্রুপাত্মক কটাক্ষে। তার দৈহিক কাঠামোর একটার সাথে আরেকটার কোনো সামঞ্জস্য নেই; তার কানে অসংখ্য ভাঁজ, যেটা তার ধূর্ত চোখের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যহীন। মাথার সোজা চুল তার ঘন বুনটের শক্ত ভ্রুর সাথে বিরোধপূর্ণ। তার নাক, জোয়ের মনে হলো, খুব বেশি পাতলা, খুব বেশি ধারালো, অনেক বেশি লম্বা। এমনকি তার চিবুকও মুখের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে একটা কাটা দাগ, একটা ফাটল, যা নিঃসন্দেহে হাড়ের গভীর পর্যন্ত গিয়েছে। জোয়ের কাছে সেরকমই মনে হলো। যেন প্রাণীটাকে যে বানিয়েছে সে সজোরে আঘাত করেছিলো ওটাকে শেষ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তার কায়িক উপাদান, দৈহিক কাঠামোর মূল ভিত্তি ছিলো অনেক বেশি নিবিড়। ছেলেটার দেহে কোনো ফাটল দেখা গেল না, এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়েও পড়লো না। এমনকি যে শক্তি তাকে তৈরি করেছিলো সেটাকেও অগ্রাহ্য করে নিজের অস্তিত্ব বিদ্যমান রাখলো সে। সবকিছুর প্রতি তার বিদ্রুপের ভাব প্রকটভাবে প্রকাশিত।

‘কে তুমি?’ জিজ্ঞেস করলো জো।

ছেলেটার হাতের আঙুল বেঁকে গেল। স্পষ্টতই, কথা বলার সময় যেন না তোতলায় সেই প্রচেষ্টা। ‘কখনো আমি নিজের পরিচয় দেই ম্যাট নামে কখনো বিল,’ সে বললো। ‘কিন্তু আমি জোরি নামেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ওটাই আমার আসল নাম—জোরি।’ কথা বলার সময় দেখা গেল তার হলুদ, ময়লা দাঁত আর নোংরা জিভ।

দীর্ঘ একটা বিরতির পর জো বললো, ‘ড্যানি কোথায়? এই কামরায় সে কখনো আসেইনি, তাই না?’ মারা গেছে, বুঝতে পারলো সে, বাকি সবার সাথে।

‘ড্যানিকে আমি খেয়েছি অনেক আগে,’ বললো জোরি। ‘একেবারে প্রথম দিকে, ওরা নিউ ইয়র্ক থেকে এখানে আসার আগেই। প্রথমে আমি খেয়েছি ওয়েন্ডি রাইটকে। ড্যানি ছিলো আমার দ্বিতীয় শিকার।’

‘খেয়েছ বলতে কী বোঝাতে চাও?’ আক্ষরিক অর্থেই? বিস্মিত হলো সে, একটা ঘিনঘিনে স্রোতে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত আন্দোলিত হলো, গ্রাস করে নিলো তাকে। যেন তার দেহ সংকুচিত হয়ে মিলিয়ে যেতে চাইছে। তবে এই অস্বস্তিকর অনুভূতিকে যেভাবেই হোক দমিয়ে রাখতে পারলো সে।

‘আমি যা করতে পারি সেটাই করেছি,’ জোরি বললো। ‘ব্যাখ্যা করা কঠিন, কিন্তু আমি এটা অনেক দিন থেকেই করে আসছি অর্ধ-জীবনে থাকা মানুষদের সাথে। আমি তাদের জীবনীশক্তি খাই, যতটুকু অবশিষ্ট থাকে। প্রতিটা ব্যক্তির মধ্যে সেটা খুব সামান্য পরিমাণেই থাকে। আর তাই আমার বেশি বেশি অর্ধ-জীবনের মানুষ দরকার। এতদিন কোনো মানুষ অর্ধ-জীবনে প্রবেশ করলে আমি কিছুদিন অপেক্ষা করতাম। কিন্তু এখন সাথে সাথেই তাদেরকে গ্রাস করে নিতে হয়, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। যদি তুমি আমার কাছে এসে কান পেতে শোনো, আমার খোলা মুখে তুমি ওদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে। সবার কণ্ঠস্বর না, কিন্তু শেষ আমি যাদের খেয়েছি তাদেরটা। যারা তোমার অতি পরিচিত।’ আঙুলের নখ দিয়ে সামনের পাটির একটা দাঁতে টোকা দিলো সে। মাথা সামান্য পেছনে হেলিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে জোকে। স্পষ্টতই, জোয়ের প্রতিক্রিয়া শোনার অপেক্ষা করছে। ‘তোমার কি কিছুই বলার নেই?’ সে জিজ্ঞেস করলো।

‘তুমিই সেই প্রাণী যে আমার মৃত্যুর প্রক্রিয়া শুরু করেছিলে, নিচের লবিতে?’

‘হ্যাঁ, আমি, প্যাট না। প্যাটকে আমি নিচের হলে এলিভেটরের কাছে খেয়েছি। তারপর খেয়েছি বাকি সবাইকে। আমি ভেবেছিলাম তুমি মারা গেছ।’ উবিকের ক্যান ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলো সে, ওটা তখনো তার হাতেই ছিলো। ‘এই ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছি না। কী আছে এটাতে, রানসাইটার এটা কোথায় পেল?’ ভ্রু কুঁচকালো সে। ‘কিন্তু রানসাইটারের পক্ষে এটা করা সম্ভব না। ঠিকই বলেছ তুমি। সে আছে বাইরের জগতে। এই বস্তুটা আমাদের জগতেই সৃষ্ট। হতেই হবে। কারণ বাইরের জগৎ থেকে আমাদের জগতে কিছুই প্রবেশ করতে পারে না। একমাত্র শব্দ ছাড়া।’

‘তার মানে তুমি আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না,’ জো বললো। ‘তুমি আমাকে খেতে পারবে না। কারণটা হলো উবিক।’

‘আপাতত আমি তোমাকে খেতে পারছি না। কিন্তু উবিকের প্রভাব একসময় শেষ হয়ে যাবে।’

‘সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারো না তুমি। কারণ তুমি জানোই না এটা আসলে কী অথবা কোত্থেকে এসেছে।’ আমি কি ওটাকে খুন করতে পারবো? মুহূর্তের জন্য ভাবলো সে। জোরি নামের এই ছেলেটাকে বেশ দুর্বল বলেই মনে হচ্ছে। আর এই বস্তুটা ওয়েন্ডি রাইটকে খেয়েছে, নিজেকে বললো সে। আমি এখন এই বস্তুটাকে সামনাসামনি দেখতে পাচ্ছি। আমি ঠিক জানতাম যে দেখা হবেই। ওয়েন্ডি, আল, আসল ডন ড্যানি—আর বাকি সবাই। এটা এমনকি রানসাইটারের মৃতদেহও খেয়ে ফেলেছে, যা মরচুয়ারির কফিনে শায়িত ছিলো। রানসাইটারের মৃতদেহে অথবা এর কাছাকাছি নিশ্চয়ই কোনো প্রটোফেসনিক ক্রিয়া সক্রিয় ছিলো যা জোরিকে আকৃষ্ট করেছে।

‘মি. চীপ,’ ডাক্তার বললো, ‘আমি আপনার রক্তচাপ মাপার কোনো সুযোগই পাইনি। শুয়ে পড়ুন দয়া করে।’

ডাক্তারের দিকে তাকালো জো, তারপর বললো, ‘ও কি তোমাকে রূপান্তরিত হতে দেখেনি, জোরি? তুমি যা বলেছ সেগুলো কি কিছুই শুনতে পায়নি?’

‘ডাক্তার টেইলর আমার কল্পনাপ্রসূত একটা বস্তু,’ জোরি বললো। ‘ঠিক এই কল্পিত জগতের কল্পিত উপাদানসমূহের মতো।’

‘আমি বিশ্বাস করি না,’ জো বললো। ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘ও কী বলছে সবই আপনি শুনছেন, তাই না?’

ফাঁপা বাঁশির মতো শব্দ করে অদৃশ্য হয়ে গেল ডাক্তার।

‘দেখেছ?’ জোরি বললো, ওকে বেশ আনন্দিত মনে হচ্ছে।

‘আমাকে হত্যা করার পর তুমি কী করবে?’ ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো জো। ‘তুমি কি ১৯৩৯ সালের এই পৃথিবীটাই ধরে রাখবে, এই কল্পিত জগত, তোমার বক্তব্য অনুযায়ী?’

‘অবশ্যই না। সেটা করার কোনো কারণও নেই।’

‘তাহলে এসব শুধুই আমার জন্য, এই পুরো জগত?’

‘খুব বেশি বড় না এটা,’ জোরি বললো। ‘ডি মোয়েনের একটা হোটেল। জানালার বাইরে একটা রাস্তা আর কিছু মানুষ আর গাড়ি। হয়তো আরো কয়েকটা বাড়ি-ঘর আছে, রাস্তার অপর পাশে কিছু দোকানও দেখবে।’

‘অর্থাৎ, তুমি নিউ ইয়র্ক অথবা জুরিখ অথবা অন্য কোনো শহর তৈরি করোনি—’

‘কেন করবো? ওখানে কেউ নেই। তুমি আর তোমার দলের অন্যরা যেখানে গেছ, সেখানেই আমি সবার ন্যূনতম প্রত্যাশার অনুরূপ বোধগম্য বাস্তবতা সৃষ্টি করেছি। তুমি যখন নিউ ইয়র্ক থেকে এখানে আসছিলে, আমি শত শত মাইল গ্রামাঞ্চল আর শহরের পর শহর সৃষ্টি করেছি—আর এই কাজটা ছিলো আমার জন্য ভীষণ ক্লান্তিকর। আমাকে প্রচুর পরিমাণে খেতে হয়েছিল এই কাজ করার জন্য। সত্যি বলতে কী, সেজন্যই তুমি এখানে আসার সাথে সাথেই সবাইকে খেয়ে ফেলতে হয় আমার। কারণ আমার শক্তির প্রয়োজন ছিলো।’

‘১৯৩৯ সাল কেন?’ জিজ্ঞেস করলো জো। ‘আমাদের সমসাময়িক ১৯৯২ সাল নয় কেন?’

‘চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি বস্তুর পশ্চাদগামিতা থামাতে পারিনি। সবকিছু একা একা করা আমার জন্য ছিলো অত্যন্ত কঠিন। প্রথমে আমি ১৯৯২ সাল তৈরি করি, কিন্তু তারপরেই সব এলোমেলো হতে শুরু করে। মুদ্রাগুলোর পরিবর্তন, নষ্ট হয়ে যাওয়া দুধ, সিগারেট—এই সবকিছুই তুমি প্রত্যক্ষ করেছ। তারপর রানসাইটার বাইরে থেকে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করতে থাকে, যা আমার কাজকে আরো কঠিন করে তুলে। আসলে, যদি সে হস্তক্ষেপ না করতো, তাহলে আরো ভালো হতো।’ ধূর্ত হাসি ফুটে উঠলো জোরির চেহারায়। ‘কিন্তু আদি রূপে প্রত্যাবর্তন নিয়ে আমি মোটেও চিন্তিত ছিলাম না। জানতাম তোমরা অনুমান করে নেবে যে এই কাজগুলো প্যাট কনলি করছে। ঘটনাগুলোই এমন যে মনে হতো সে তার ট্যালেন্ট দ্বারা করছে এগুলো। যেহেতু তার ট্যালেন্ট মোটামুটি এরকম কিছুই করতে পারতো। ভেবেছিলাম তোমরা ওকে মেরে ফেলবে। সেটা আমি উপভোগ করতাম।’ তার দন্তবিকশিত হাসি আরো প্রশস্ত হলো।

‘আমার জন্য এই হোটেল আর বাইরের রাস্তাগুলো এখনো রেখে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী?’ জিজ্ঞেস করলো জো। ‘আমি তো এখন সবই জানি।’

‘আমি সব সময় এভাবেই কাজ করি,’ চোখদুটো আরো প্রশস্ত করে বললো জোরি।

‘আমি তোমাকে খুন করবো।’ জোরির দিকে টলোমলো পায়ে হোঁচট খেতে খেতে এগোলো সে। হাতদুটো বাড়িয়ে ছেলেটাকে জাপটে ধরলো। ঘাড় ধরার চেষ্টা করছে, শ্বাসনালি খুঁজছে সবগুলো আঙুল দিয়ে চেপে ধরার জন্য।

দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তাকে আঘাত করলো জোরি। কোদালের মতো বিশাল দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরলো জোয়ের ডান হাত। মাংসের ভেতর ঢুকে গেল দাঁতগুলো। একইসাথে মাথা উঁচু করলো জোরি, কামড়ে ধরা হাত সাথে নিয়ে। জোরি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে, আরো শক্ত করে চোয়াল বন্ধ করার চেষ্টা করলো। দাঁতগুলো মাংসের আরো গভীরে ঢুকে যেতেই তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়লো জোয়ের পুরো দেহে। বদমাশটা আমাকে খেয়ে ফেলছে, বুঝতে পারলো সে।

‘তুমি পারবে না,’ সশব্দে বললো জো। জোরির নাকে আঘাত করলো সে, বিরতিহীনভাবে ঘুসি মারতেই থাকলো। ‘উবিক তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখবে,’ জোরির বিদ্রুপাত্মক চোখে আঘাত করে কথাগুলো বললো জো। ‘তুমি আমার কিছুই করতে পারবে না।’

হাত দাঁতের মাঝে ধরে রেখেই কিছু একটা বললো জোরি। ভেড়ার মতো চোয়াল ঘোরালো একপাশে। দাঁত দিয়ে এমনভাবে মাংস পিষছে যে তীব্র ব্যথায় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না জো। সজোরে লাথি হাঁকালো জোরির গায়ে। দাঁতের ফাঁক থেকে মুক্ত হলো তার হাত। হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে এলো সে। তাকিয়ে রইলো তীক্ষ্ণ দাঁতের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতস্থান থেকে বেরোনো রক্তের দিকে। যিশু!

‘তুমি ওদের সাথে যা করেছ, আমার সাথে তার কিছুই করতে পারবে না,’ বললো জো। উবিকের স্প্রে ক্যান হাতে নিয়ে নজলটা হাতের ক্ষতস্থানের দিকে ঘোরালো। প্লাস্টিকের লাল বোতামে চাপ দিতেই বস্তুকণার দুর্বল একটা স্রোত বেরিয়ে এসে চর্বিত, ছেঁড়া মাংসের উপর প্রলেপ তৈরি করলো। তীব্র ব্যথা উধাও হয়ে গেল নিমেষেই। চোখের সামনেই ক্ষতটা মিলিয়ে গেল।

‘আর তুমিও আমাকে খুন করতে পারবে না,’ জোরি বললো। ছেলেটা এখনো দাঁত বের করে হাসছে।

‘আমি নিচে যাচ্ছি,’ জো বললো। টলোমলো পায়ে কামরার দরজার কাছে গিয়ে খুললো সেটা। দরজার বাইরে অপরিচ্ছন্ন হল। সামনে এগোলো সে, এক পা দুই পা করে, সতর্কতার সাথে। তবে মেঝেটা মজবুত বলেই মনে হলো। মোটেও কল্পিত অথবা অবাস্তব জগত বলে মনে হচ্ছে না।

‘বেশি দূরে যেও না,’ জোরি পেছন থেকে বললো। ‘আমি অধিক বিস্তৃত এলাকা সৃষ্টি করতে পারি না। ধরো, ঐ গাড়িগুলোর কোনো একটা নিয়ে তুমি কয়েক মাইল দূরে চলে গেলে, তখন সেটা বিলীন হয়ে যাবে। আর সেটা আমার চেয়ে তোমারই বেশি অপছন্দ হবে।’

‘আমার আর কী হারানোর আছে সেটাই তো জানি না।’ এলিভেটরের কাছে এসে দাঁড়ালো জো। চাপ দিলো নিচে নামার বোতামে।

জোরি পেছন থেকে ডাক দিয়ে বললো, ‘এলিভেটর নিয়ে আমার সমস্যা হচ্ছে। ওগুলো ভীষণ জটিল। তোমার হয়তো সিঁড়ি বেয়ে নামা উচিত।’

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর হাল ছেড়ে দিলো জো। জোরির পরামর্শ অনুযায়ী সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলো। এই সিঁড়ি দিয়েই মাত্র কিছুক্ষণ আগে উঠে এসেছিলো উপরে, ধাপে ধাপে, ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক প্রচেষ্টায়। এ হচ্ছে দুই পক্ষের এক পক্ষ যারা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে, ভাবছে জো। জোরি হচ্ছে সেই পক্ষ, যেটা আমাদের ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। বলা ভালো, আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে, একমাত্র আমাকে ছাড়া। জোরির পেছনে আর কিছু নেই। সে-ই শেষ। অপর পক্ষের সাথে কি আমার দেখা হবে? হয়তো খুব শীঘ্রই হচ্ছে না। আরো একবার নিজের হাতের দিকে তাকালো সে। পুরোপুরি অক্ষত।

লবিতে পৌঁছানোর পর নিজের চারপাশে তাকালো, মানুষজনের দিকে, মাথার উপরের বিশাল ঝাড়বাতির দিকে। জোরি অনেক ক্ষেত্রেই চমৎকার কাজ করেছে, প্রাচীন রূপে প্রত্যাবর্তন সত্ত্বেও। সবই বাস্তব। পায়ের নিচের মেঝের কাঠিন্য অনুভব করলো সে। এটার ফাঁক গলে পাতালে চলে যেতে পারবো না আমি। তার ধারণা, নিশ্চয়ই জোরির পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। এই কাজটা পূর্বে সে অসংখ্যবার করেছে।

হোটেলের ডেস্কের কেরানিকে জিজ্ঞেস করলো জো, ‘আশেপাশে কোনো রেস্তোরাঁ আছে?’

‘রাস্তার শেষ মাথায়,’ কেরানি বললো, চিঠি বাছাইয়ের কাজ একপাশে সরিয়ে রেখেছে। ‘হাতের ডান দিকে পড়বে। দ্য মেটাডোর। নিঃসন্দেহে আপনার পছন্দ হবে, স্যার।’

‘আমি নিঃসঙ্গ,’ আকস্মিক উত্তেজনায় বললো জো। ‘এই হোটেলে কি কোনো ব্যবস্থা আছে? মেয়ে সঙ্গী জোগাড় করে দিতে পারবে?’

কেরানি কাটাকাটা, বিরক্তির সুরে বললো, ‘এই হোটেলে নেই, স্যার। এখানে কোনো অনৈতিক কাজ হয় না।’

‘অর্থাৎ, তোমাদের হোটেলটা অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পারিবারিক একটা হোটেল,’ জো বললো।

‘আমরা সেরকমই মনে করি, স্যার।’

‘আমি তোমাকে পরীক্ষা করে দেখছিলাম,’ জো বললো। ‘বুঝতে চাইছিলাম আমি কেমন হোটেলে আছি।’ কাউন্টারের কাছ থেকে সরে এলো সে। আবারও লবি পেরিয়ে হাঁটতে লাগলো মার্বেল পাথরের প্রশস্ত সিঁড়ির দিকে। ঘূর্ণায়মান দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো ফুটপাথে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *