অধ্যায় ৫
ফ্রুগ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারছো না, হেলেন? পেটে সমস্যা, তাই না? আমি তোমার জন্য উবিক নিয়ে আসছি! উবিক তোমাকে প্রাণোচ্ছ্বাসে ফিরিয়ে আনবে দ্রুত। নির্দেশনা অনুযায়ী সেবন করুন, মাথাব্যথা এবং পেটের সমস্যার দ্রুত সমাধান উবিক। মনে রাখবেন: উবিক আপনার হাতের নাগালের মধ্যেই আছে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার পরিহার করুন।
.
বাধ্যতামূলক এবং অস্বাভাবিক অলসতার এই দীর্ঘ সময়টায় অ্যান্টি-টেলিপ্যাথ টিপি জ্যাকসন নিয়মিত দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটায়। তার মস্তিষ্কে স্থাপন করা ইলেকট্রোডের মাধ্যমে উদ্দীপিত করা হয় ইআরইএম নিদ্রা, মানে এক্সট্রিমলি র্যাপিড আই মুভমেন্ট নিদ্রা, আর তাই বিছানায় খসখসে চাদরের নিচে শুয়ে থেকেও অনেক কিছুই করার থাকে তার।
ঠিক এই মুহূর্তে তার কৃত্রিমভাবে আরোপিত স্বপ্ন আবর্তিত হচ্ছে রে হোলিসের সেই কিংবদন্তিতুল্য এজেন্টকে ঘিরে যার ছিলো অকল্পনীয় সিওনিক ক্ষমতা। সোল সিস্টেমের বাকি সব ইনার্শিয়ালরা হাল ছেড়ে দিয়েছিলো, অথবা পরিণত হয়েছিলো একতাল নরম কাদায়। এই অপার্থিব সত্তা যে ভয়াবহ শক্তিক্ষেত্র উৎপাদন করে, সেটাকে ধাপে ধাপে নিষ্ক্রিয় করার কাজে দক্ষ হয়ে উঠেছে সে।
‘তুমি আশেপাশে থাকলে আমি আর নিজ সত্তায় থাকতে পারি না,’ তার আবছা প্রতিদ্বন্দ্বী জানালো তাকে। তার মুখমণ্ডলে ফুটে উঠলো একটা পৈশাচিক আর প্রচণ্ড ঘৃণার অভিব্যক্তি। মনে হচ্ছিলো যেন সে মানসিক ভারসাম্যহীন একটা ক্রুদ্ধ বনবিড়াল।
স্বপ্নের মধ্যেই জবাব দেয় টিপি। ‘হয়তো নিজ সত্তার যে সংজ্ঞা তুমি তৈরি করেছ তা অসম্পূর্ণ। তুমি অচেতন উপাদানসমূহের উপর নিজ সত্তার এক অনিশ্চিত কাঠামো তৈরি করেছ, যার উপর তোমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আর তাই তুমি আমাকে ভয় পাও।’
‘তুমি কি প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের কর্মী?’ হোলিসের টেলিপ্যাথ জানতে চায়, চেহারায় অস্বস্তি নিয়ে তাকায় চারপাশে।
‘নিজেকে যেরকম শক্তিশালী দাবি করো, যদি আসলেই সেরকম হতে, আমার মাইন্ড রিড করেই বুঝতে পারতে তুমি,’ টিপি বলে।
‘আমি কারো মাইন্ড রিড করতে পারি না,’ টেলিপ্যাথ জবাব দেয়। ‘আমার ট্যালেন্ট ফুরিয়ে গেছে। আমার ভাই বিল এখন তোমার সাথে কথা বলবে। এই যে, বিল, এই মেয়েটার সাথে কথা বলো তো। ওকে তোমার পছন্দ হয়েছে?’
বিল দেখতে কমবেশি তার টেলিপ্যাথ ভাইয়ের মতোই। সে বললো, ‘অনেক পছন্দ হয়েছে কারণ আমি একজন প্রিকগ, আর তাই ও আমাকে প্রতিহত করতে পারবে না।’ এক পা থেকে আরেক পায়ের উপর দেহের ওজন বদল করে দাঁড়ায় সে, হাসে দাঁত বের করে। বড় বড়, নোংরা, ভোঁতা কোদালের মতো দাঁত। ‘আমি ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, প্রকৃতির বৈষম্যের শিকার…’ একটু বিরতি নেয় ছেলেটা, কপাল কুঁচকায়। ‘এরপর যেন কী?’ জিজ্ঞেস করে ভাইকে।
‘—বিকৃত, অসম্পূর্ণ, সময়ের আগেই যাকে পাঠানো হয়েছে এই নশ্বর পৃথিবীতে শ্বাস নেওয়ার জন্য,’ বনবিড়ালের মতো দেখতে টেলিপ্যাথটা ধ্যানমগ্ন সুরে বলে।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ,’ প্রিকগ বিল সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। ‘মনে পড়েছে আমার। এতটাই বিকৃত আর কুৎসিত রূপে পাঠানো হয় যে রাস্তার নেড়ি কুত্তাগুলো পর্যন্ত আমাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করতো। রিচার্ড দ্য থার্ড থেকে কোট করলাম,’ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েও দেয় টিপিকে। দাঁত বের করে হাসে দুই ভাই। তাদের সবগুলো দাঁতই ভোঁতা। দেখে মনে হয় যেন কাঁচা শস্যদানা খেয়ে বেঁচে থাকে।
‘কী বলতে চাও?’ জিজ্ঞেস করে টিপি।
‘বলতে চাই যে,’ একসাথে, একসুরে জবাব দেয় দুই ভাই, ‘আমরা তোমাকে এখন ধরবো।’
ভিডফোনের প্রচণ্ড শব্দে জেগে ওঠে টিপি।
অন্ধের মতো হাতড়াতে থাকে সে। তার মনে হলো যেন সে ডুবসাঁতার কাটছে, চারপাশে ভাসছে অসংখ্য রঙিন বুদবুদ। চোখ পিটপিট করতে করতে রিসিভার তুলে সাড়া দেয়। ‘হ্যালো।’ ঈশ্বর! অনেক বেলা হয়ে গেছে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবলো সে। আমি পুরোপুরি অকর্মণ্য হয়ে যাচ্ছি। পর্দায় দেখা যাচ্ছে গ্লেন রানসাইটারের মুখ। ‘হ্যালো, মি. রানসাইটার,’ ফোনের স্ক্যানার থেকে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বললো সে। ‘আমার জন্য নতুন কোনো কাজ আছে?’
‘আহ, মিসেস জ্যাকসন,’ রানসাইটার বললেন। ‘ভালো লাগছে তোমাকে দেখে। জো চীপ আর আমার অধীনে একটা দল তৈরি করছি আমরা, সব মিলিয়ে এগারো জন। যাদেরকে বাছাই করা হবে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্ব পালন করতে হবে তাদেরকে। সবার রেকর্ড খতিয়ে দেখছি। জোয়ের ধারণা তোমার রেকর্ড অনেক ভালো, আমারো তাতে কোনো দ্বিমত নেই। অফিসে আসতে কতক্ষণ লাগবে তোমার?’ গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছে তিনি ভীষণ আশাবাদী, কিন্তু পর্দায় তার মুখাবয়ব ঠিক বরাবরের মতোই ভাবলেশহীন, কঠোর।
টিপি জানতে চাইলো, ‘এটার জন্য কি আমাকে—’
‘হ্যাঁ, তোমাকে ব্যাগ গুছিয়ে আনতে হবে,’ কিছুটা ধমকের সুরে বললেন তিনি। ‘যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের। আর আমি চাই না এই নিয়মটা কেউ ভঙ্গ করুক। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই।’
‘আমার ব্যাগ গোছানোই আছে। ঠিক পনেরো মিনিটের মধ্যে নিউ ইয়র্কের অফিসে পৌঁছাচ্ছি। শুধু আমার স্বামীর জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে যেতে হবে, যেহেতু সে এরই মধ্যে কাজে চলে গেছে।’
‘বেশ, খুব ভালো,’ রানসাইটার বললেন, অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে তাকে। সম্ভবত তিনি এরই মধ্যে হাতে থাকা তালিকার পরবর্তী নাম নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছেন। ‘ঠিক আছে, অফিসে দেখা হচ্ছে, মিসেস জ্যাকসন।’ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন তিনি।
স্বপ্নটা অদ্ভুত ছিলো, পায়জামার বোতাম খুলতে খুলতে পোশাক পালটানোর জন্য শোবার ঘরের দিকে যাওয়ার সময় এই ভাবনাগুলোই তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। বিল আর ম্যাট যেন কথাগুলো কোন কবিতা থেকে নিয়েছে বললো? রিচার্ড দ্য থার্ড, মনে পড়লো তার। কল্পনায় আবারও দেখতে পায় দুই ভাইয়ের কোদালের মতো বড় বড় দাঁতগুলো তাদের বিদঘুটে দুটো মাথা যেন দরজার হাতল, সেখানে আগাছার মতো গজিয়ে উঠেছে কয়েক গোছা লালচে চুল। রিচার্ড দ্য থার্ড কখনো পড়েছি বলে মনে হচ্ছে না, অথবা পড়লেও নিশ্চয়ই বহুদিন আগে, একেবারে ছোটবেলায়।
যে কবিতা তুমি জানো না, সেই কবিতার ছত্রগুলো কীভাবে স্বপ্নে আসে তোমার? নিজেকেই প্রশ্ন করলো সে। হয়তো আমি যখন ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম, তখন হয়তো সত্যিকার একজন টেলিপ্যাথ আমাকে পর্যবেক্ষণ করছিলো। অথবা একজন টেলিপ্যাথ আর প্রিকগ একসাথে কাজ করছিলো, স্বপ্নে যেমন দেখেছি। আমাদের রিসার্চ ডিপার্টমেন্টকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো জানা যাবে যে হোলিস কখনো ম্যাট আর বিল নামের দুই ভাইয়ের একটা টিম নিয়োগ দিয়েছিলো কি না।
খানিকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আর খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে দ্রুত পোশাক পরতে লাগলো সে।
***
সবুজ রঙের কুয়েস্তা—রে পালমা—সুপ্রিম হাভানা চুরুট ধরিয়ে গ্লেন রানসাইটার তার রাজকীয় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ইন্টারকমের বোতাম চেপে বললেন, ‘মিসেস ফ্রিক, একটা বাউন্টি চেক তৈরি করুন, জি. জি. অ্যাশউডের নামে, একশো পসক্রিড।’
‘ঠিক আছে, মি. রানসাইটার।’
জি. জি. অ্যাশউডকে দেখছিলেন তিনি। এই মুহূর্তে বিশাল অফিস কামরায় অস্থিরভাবে পায়চারি করছে লোকটা, সত্যিকার কাঠের তৈরি মেঝেতে তার পায়ের ঘষায় বিরক্তিকর শব্দ হচ্ছে। ‘মেয়েটা আসলে কী করতে পারে জো চীপ সেটা আমাকে ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারেনি,’ রানসাইটার বললেন।
‘জো চীপ একটা পাঁড় মাতাল,’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো জি. জি.
‘মেয়েটা, মানে প্যাট কীভাবে অতীতে যেতে পারে, অথচ অন্য কেউ পারে না? আমি বাজি ধরে বলতে পারি এই ট্যালেন্ট নতুন কিছু না। প্যাটের আগে তোমরা স্কাউটরা হয়তো ধরতে পারোনি। যাই হোক, এই মেয়েটাকে কাজে লাগানো কোনো প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের জন্য যৌক্তিক হবে না। এটা একটা ট্যালেন্ট, কোনো অ্যান্টি-ট্যালেন্ট না। আমরা—’
‘আমি আপনাকে যেভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছি, এবং জো তার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে যেটা নিশ্চিত করেছে, সেটা সত্য হলে এই মেয়েটা প্রিকাগদের পুরোপুরি নির্মূল করে দিতে পারে।’
‘কিন্তু সেটা কেবল একটা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া,’ রানসাইটার গম্ভীরভাবে বললেন। ‘জো মনে করে মেয়েটা বিপজ্জনক। কেন, আমি জানি না।’
‘আপনি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন?’
‘বিড়বিড় করে কী যেন বলছিলো, সব সময় যেভাবে বলে আর কি। জোয়ের কাজের পেছনে কখনো কোনো যুক্তি থাকে না, বরং থাকে একধরনের অনুমান। আবার এদিকে মেয়েটাকে সে মিক অপারেশনে যুক্ত করেছে।’ মানবসম্পদ বিভাগ থেকে পাঠানো কাগজগুলো শাফল করলেন তিনি, তারপর আবার নতুন করে গুছিয়ে রাখলেন। ‘জোকে এখানে আসতে বলো, এগারো জনের দলটা তৈরি হয়েছে কি না দেখতে হবে।’ ঘড়ি দেখলেন তিনি। ‘এতক্ষণে সবার চলে আসার কথা। জোকে আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করবো যে এই প্যাট কনলিকে দলে অন্তর্ভুক্ত করার পাগলামি সে কেন করছে, যদি মেয়েটা এতটাই বিপজ্জনক হয়। তুমি কী বলো, জি. জি.?’
‘মেয়েটার সাথে তার বিশেষ একধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে,’ জি. জি. অ্যাশউড বললো।
‘কেমন সম্পর্ক?’
‘শারীরিক।’
‘মেয়েটার সাথে জোয়ের কোনো শারীরিক সম্পর্ক নেই। নিনা ফ্রিডি গতকাল তার মাইন্ড রিড করেছে। ও এতটাই দুর্বল যে—’ দরজা খোলার শব্দে কথা শেষ না করেই থেমে গেলেন তিনি; মিসেস ফ্রিক জি. জি.-র চেকটা নিয়ে এসেছে তার স্বাক্ষরের জন্য। ‘আমি জানি কেন সে মেয়েটাকে মিক অপারেশনে যুক্ত করেছে,’ চেকে স্বাক্ষর করতে করতে তিনি বললেন। ‘যেন সে ওর উপর নজর রাখতে পারে। সে নিজেও যাচ্ছে। গ্রাহকের কথার উপর ভরসা রাখা যায় না, তাই সে নিজে পিএসআই শক্তিক্ষেত্র পরিমাপ করবে। কোন ধরনের শক্তির বিপক্ষে লড়তে হবে সেই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন আমাদের। ধন্যবাদ, মিসেস ফ্রিক।’ হাত নেড়ে সেক্রেটারিকে চলে যেতে বললেন তিনি, এরপর চেকটা জি. জি. অ্যাশউডের হাতে তুলে দিলেন। ‘ধরো আমরা পিএসআই শক্তিক্ষেত্র পরিমাপ করলাম না, কিন্তু দেখা গেল সেটা আমাদের ইনার্শিয়ালদের জন্য অবিশ্বাস্য রকমের তীব্র, তখন দোষটা কার হবে?’
‘আমাদের,’ জি. জি. বললো।
‘ওদেরকে আমি বলেছিলাম এগারোজন যথেষ্ট নয়। আমরা আমাদের সেরা এজেন্টদের পাঠাচ্ছি। নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টাই করছি আমরা। হাজার হোক, স্ট্যান্টন মিকের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাবতেই অবাক লাগে যে মিকের মতো একজন ধনী, প্রভাবশালী মানুষ কীভাবে এত অদূরদর্শী আর কৃপণ হতে পারে। মিসেস ফ্রিক, জো কি বাইরে আছে? জো চীপ?’
‘মি. চীপ আউটার অফিসে আছেন। আরো অনেকেই আছে,’ মিসেস ফ্রিক বললো।
‘আরো কতজন আছে, মিসেস ফ্রিক? দশজন নাকি এগারোজন?’
‘ওরকমই হবে, মি. রানসাইটার। দুই-একজন কমবেশি হতে পারে।’
রানসাইটার জি. জি. অ্যাশউডের উদ্দেশে বললেন, ‘এই দলটার কথাই বলছিলাম। আমি নিজে ওদের সাথে কথা বলতে চাই, সবার সাথে, একসাথে। ওরা চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করার আগেই।’ এরপর মিসেস ফ্রিকের উদ্দেশে বললেন, ‘ওদেরকে ভেতরে আসতে বলুন।’ কথা শেষ করেই সবুজ মোড়কের সিগার টেনে গলগল করে ধোঁয়া ছাড়লেন তিনি মিসেস ফ্রিক বেরিয়ে গেল।
‘ব্যক্তিগতভাবে ওরা সবাই যার যার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ,’ জি. জি. কে বললেন রানসাইটার। ‘এই প্রতিবেদনগুলো দেখলেই সেটা নিয়ে সন্দেহের আর কোনো অবকাশ থাকে না।’ ডেস্কে রাখা কাগজের স্তূপটা ছড়ালেন তিনি। ‘কিন্তু সবাই একসাথে কেমন কাজ করবে? তারা সবাই মিলিতভাবে কী পরিমাণ শক্তিশালী পলিএনসেফালিক কাউন্টার-ফিল্ড সৃষ্টি করতে পারবে? নিজেকেই প্রশ্ন করো, জি. জি.। এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’
‘আমার বিশ্বাস, সময়ই সেটা বলে দেবে,’ জি. জি. অ্যাশউড বললো।
‘দীর্ঘ একটা সময় ধরে আমি এই পেশায় আছি,’ রানসাইটার বললেন। আউটার অফিস থেকে এক এক করে সবাই মূল অফিস কামরার ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। ‘বর্তমান সভ্যতায় এটাই আমার অবদান।’
‘চমৎকার বলেছেন,’ জি. জি. বললো। ‘আপনি এমন একজন প্রহরী যে মানুষের গোপনীয়তাকে চরম গোপনীয়তার সাথে পাহারা দিয়ে রেখেছে।’
‘রে হোলিস আমাদের ব্যাপারে কী বলে সেটা তুমি জানো?’ রানসাইটার জিজ্ঞেস করলেন। ‘সে বলে আমরা ঘড়ির কাঁটা উলটো দিকে চালানোর চেষ্টা করছি।’ তার অফিস কামরায় যারা জড়ো হতে শুরু করেছে তাদের সবাইকে এক এক করে পর্যবেক্ষণ করছেন; প্রত্যেকেই দাঁড়িয়ে আছে পরস্পরের কাছাকাছি, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না, অপেক্ষা করছে তার জন্য। কী অদ্ভুত সামঞ্জস্যহীন একটা দল, হতাশ হয়ে ভাবলেন তিনি। অল্পবয়সি এক মেয়ে, চোখে ভারী চশমা, হলদেটে সোজা চুল, মাথায় কাউবয় হ্যাট, পরনে কালো লেস লাগানো ম্যান্টিলা আর বারমুডা শর্টস; নিঃসন্দেহে এই মেয়েটা এডি ডর্ন। আকর্ষণীয় চেহারার আরেকটু বেশি বয়সের এক মহিলা, যার গায়ের রং শ্যামলা, চতুর আর উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, পরনে রেশমের শাড়ি এবং নাইলনের ওবি আর ববি সকস; ডাকনাম ফ্র্যান্সি, তবে পুরো নাম এই মুহূর্তে মনে আসছে না। কিছুটা সিজোফ্রেনিক, কল্পনা করে যে আর্দ্রা নক্ষত্র থেকে ভিনগ্রহবাসীরা মাঝে মাঝেই তার কোনস্যাপ্ট ভবনের ছাদে নেমে আসে। আরো আছে সদ্য কৈশোর পেরোনো এক তরুণ, মাথার চুলগুলো উলের মতো, অহংকারী আর হামবড়া একটা ভাব। এই ছেলেটা পরে আছে ফুলের ছাপওয়ালা মুমু আর স্প্যান্ডেক্স ব্লুমারস—এর সাথে রানসাইটারের আগে কখনো দেখা হয়নি। বাকি সবার অবস্থাও কমবেশি একই রকম অদ্ভুত; পাঁচজন মেয়ে আর—তিনি গুনে দেখলেন—পাঁচজন ছেলে। কেউ একজন অনুপস্থিত।
জো চীপের আগে আগে চোখ ধাঁধানো রূপের ঝলক নিয়ে প্যাট্রিসিয়া কনলি ভেতরে ঢুকলো; আর ওকে নিয়ে হলো এগারো জন। দলের সবাই এসে হাজির হয়েছে।
‘তোমার সময়জ্ঞানের প্রশংসা করতেই হবে, মিসেস জ্যাকসন,’ পুরুষালি চেহারার, ফ্যাকাশে গাত্রবর্ণের, ত্রিশোর্ধ্ব মহিলার উদ্দেশে বললেন তিনি। মহিলার পরনে ভিকুনা উটের কৃত্রিম পশম দিয়ে বানানো ট্রাউজার আর ধূসর রঙের সোয়েটার, যেটার বুকের উপর বার্ট্রান্ড লর্ড রাসেলের ছবি প্রিন্ট করা ছিলো এবং বহু ব্যবহারে যা এখন বিবর্ণ হয়ে গেছে। ‘তোমার হাতেই সবচেয়ে কম সময় ছিলো, যেহেতু সবার পরে জানানো হয়েছে তোমাকে।’
টিপি জ্যাকসনের মুখে নিষ্প্রাণ, বিবর্ণ একটা হাসি ফুটে উঠলো।
‘তোমাদের অনেকের সাথেই কোনো না কোনো কাজের সূত্রে আমার দেখা হয়েছে,’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন রানসাইটার। হাতের ইশারায় সবাইকে চেয়ার টেনে এনে আরাম করে বসার ইঙ্গিত করলেন, বুঝিয়ে দিলেন কেউ চাইলে ধূমপানও করতে পারে। ‘তুমি, মিস ডর্ন, আমি আর মি. চীপ সর্বপ্রথম তোমাকেই বাছাই করেছি কারণ এস. ডোল মেলিপনের বিরুদ্ধে একমাত্র তুমিই সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিতে পেরেছ সম্প্রতি। লোকটা তোমার নজরকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে যদিও, তবে সেটা মোটেও তোমার দোষ না।’
‘ধন্যবাদ, মি. রানসাইটার,’ এডি ডর্ন লাজুক কণ্ঠে বললো। গালদুটো লাল হয়ে উঠেছে তার, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে দূরের দেয়ালের দিকে। ‘এই দলের একজন হতে পেরে ভালো লাগছে আমার,’ দুর্বল আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো।
‘তোমাদের মধ্যে আল হ্যামন্ড কে?’ প্রতিবেদনগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে রানসাইটার জিজ্ঞেস করলেন।
অস্বাভাবিক লম্বা এক কৃষ্ণাঙ্গ হাত তুললো, তার কাঁধদুটো সামনের দিকে একটু ঝুঁকানো, প্রশস্ত মুখে একটা অমায়িক ভাব।
‘তোমার সাথে আগে দেখা হয়নি আমার,’ আল হ্যামন্ডের ফাইলের উপর চোখ বোলাতে বোলাতে রানসাইটার বললেন। ‘আমাদের অ্যান্টি-প্রিকগদের মধ্যে তোমার রেটিং সর্বোচ্চ। নিঃসন্দেহে তোমার সাথে অনেক আগেই দেখা করা উচিত ছিলো আমার। তোমাদের মাঝে আর কে কে অ্যান্টি-প্রিকগ?’ আরো তিনজন হাত তুললো। ‘তোমরা চারজন নিঃসন্দেহে জি. জি. অ্যাশউডের নতুন আবিষ্কারের সাথে পরিচিত হয়ে এবং তার সাথে কাজ করে আনন্দ পাবে, যে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী উপায়ে প্রিকগদের প্রতিহত করতে পারে। আমার মনে হয় মিস কনলি নিজেই আমাদেরকে ব্যাখ্যা করে বললে ভালো হয়।’ প্যাটের উদ্দেশে মাথা নাড়লেন তিনি।
সাথে সাথে দেখতে পেলেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের একটা দুর্লভ মুদ্রার দোকানের সামনে; কখনো প্রচলন করা হয়নি, স্বর্ণের তৈরি এমন একটা ইউএস ডলার খুঁটিয়ে দেখছিলেন এবং বিস্মিত হয়ে ভাবছিলেন এই মুদ্রাটা নিজের সংগ্রহের সাথে যুক্ত করা সামর্থ্য তার আছে কি না।
কীসের সংগ্রহ? নিজেকে প্রশ্ন করলেন তিনি, আচমকা সচকিত হয়ে উঠলেন। আমি মুদ্রা সংগ্রহ করি না। এখানে কী করছি আমি? আর, কতক্ষণ ধরে দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াচ্ছি? আমার তো এখন থাকার কথা অফিসে… যদিও অনেক চেষ্টা করেও তিনি মনে করতে পারলেন না অফিসে তিনি আসলে কী কাজ করেন। কোনো একটা ব্যবসা করেন, এমন মানুষদের নিয়ে কাজ করেন যাদের ক্ষমতা আছে, বিশেষ ধরনের ট্যালেন্ট। চোখ বন্ধ করলেন তিনি, চেষ্টা করছেন গভীরভাবে মনোনিবেশ করার। না, ঐ ব্যবসা ছেড়ে দিতে হয় আমাকে, মনে পড়লো তার। গত বছর হার্টের অসুখের কারণে অবসর নিতে হয় আমাকে। কিন্তু এইমাত্রই তো সেখানে ছিলাম! স্পষ্ট মনে আছে তার। মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে। আমার অফিসে। একদল মানুষের সাথে কথা বলছিলাম নতুন প্রজেক্ট নিয়ে। চোখ বন্ধ করলেন তিনি। সব শেষ, হতাশ হয়ে ভাবলেন। আমার নিজের হাতে গড়া সবকিছু…
আবার যখন চোখ খুললেন, নিজেকে ফিরে পেলেন পরিচিত অফিস কামরায়। দাঁড়িয়ে আছেন জি. জি. অ্যাশউড, জো চীপ আর শ্যামলা, ভয়াবহ রকম সুন্দরী এক মেয়ের মুখোমুখি, যার নাম তিনি কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। এছাড়া তার অফিস একেবারেই ফাঁকা। কারণটা তিনি বুঝতে পারছেন না, কিন্তু বিষয়টা তার কাছে পুরোপুরিই অস্বাভাবিক মনে হলো।
‘মি. রানসাইটার,’ জো চীপ বললো, ‘আপনার সাথে প্যাট্রিসিয়া কনলির পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।’
‘শেষ পর্যন্ত আপনার সাথে আমার পরিচয় হলো, মি. রানসাইটার,’ বললো মেয়েটা, তারপর হেসে ওঠার সাথে সাথে আনন্দে ঝলমল করে উঠলো তার দুটো চোখ। কেন, রানসাইটার জানেন না।
***
জো চীপ অনুভব করতে পারলো, কিছু একটা ঘটাচ্ছে মেয়েটা। ‘প্যাট,’ ধমকের সুরে বললো সে, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কিন্তু সবকিছু কেমন অন্য রকম লাগছে।’ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো অফিসের চারদিকে। মনে হলো সবকিছু আগের মতোই আছে; অস্বাভাবিক প্রশস্ত কার্পেট, প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিল্পকর্ম, দেয়ালে ঝোলানো আসল চিত্রকর্ম, যেগুলোর কোনো শৈল্পিক মান নেই। গ্লেন রানসাইটারের কোনো পরিবর্তন হয়নি; একই রকম রোমশ আর বৃদ্ধ, অসংখ্য বলিরেখাপূর্ণ কুঁচকানো মুখমণ্ডল। জোয়ের দৃষ্টি তিনি সমান তেজে ফিরিয়ে দিলেন—অথচ তাকেও যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনে হচ্ছে। জি. জি. অ্যাশউড দাঁড়িয়ে আছে জানালার কাছে, পরনে বার্চ গাছের বাকল দিয়ে তৈরি ফিটফাট ধরনের সেই চিরাচরিত প্যান্টালুন, পাকানো দড়ির বেল্ট, শরীর দেখা যায় এমন স্বচ্ছ জামা আর রেল প্রকৌশলীদের মতো লম্বা হ্যাট। নির্বিকারভাবে কাঁধ ঝাঁকালো সে। নিঃসন্দেহে, কোনোরকম পরিবর্তন অনুভব করছে না।
‘কিছুই পালটায়নি,’ প্যাট বললো।
‘সবকিছুই পালটে গেছে,’ তাকে বললো জো। ‘তুমি নির্ঘাত অতীতে ফিরে গিয়ে আমাদেরকে ভিন্ন পথে চালিত করেছ। প্রমাণ করতে পারবো না আমি, এবং ঠিক কী কী পরিবর্তন হয়েছে, সেটাও নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করতে পারবো না—’
‘আমার সামনে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া চলবে না,’ রানসাইটার বললেন, তার ভ্রু কুঁচকানো।
জো হতচকিত হয়ে বললো, ‘স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া?’ তারপর চোখে পড়লো তার; প্যাটের আঙুলে আংটি। পেটানো রুপার মাঝে একটা সবুজ জেড পাথর; মনে পড়লো, এই আংটিটা খুঁজে বের করার ব্যাপারে প্যাটকে সাহায্য করেছিলো সে। দুই দিন, জো ভাবলো, আমরা বিয়ে করার ঠিক আগে। সেটাও প্রায় এক বছর আগের কথা, আমার আর্থিক অবস্থা চরম খারাপ থাকার পরেও। যদিও সেই অবস্থা এখন আর নেই, প্যাটের বেতন আর তার অর্থ উপার্জনের নানাবিধ পন্থা সেই অবস্থা পালটে দিয়েছে চিরতরে।
‘যাই হোক, আলোচনায় ফিরে আসা যাক,’ রানসাইটার বললেন। ‘আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজেকেই প্রশ্ন করা; কেন স্ট্যান্টন মিক কাজটা আমাদেরকে না দিয়ে অন্য প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনকে দিলো। অথচ কাজটা আমাদেরই পাওয়ার কথা ছিলো। এই ব্যবসায় আমরাই সেরা, এবং আমাদের প্রধান কার্যালয় নিউ ইয়র্কে যেখানে মিক সব ধরনের ব্যবসায়িক চুক্তি করতে পছন্দ করে। তোমার কাছে কোনো ব্যাখ্যা আছে, মিসেস চীপ?’ দৃষ্টিতে আশা নিয়ে প্যাটের দিকে তাকালেন তিনি।
‘আপনি কি সত্যিই জানতে চান, মি. রানসাইটার?’ প্যাট জিজ্ঞেস করলো।
‘হ্যাঁ,’ প্রবল আগ্রহের সাথে জোরে জোরে মাথা নাড়লেন তিনি ‘আমি সত্যিই জানতে চাই।’
‘কাজটা আমি করেছি,’ বললো প্যাট।
‘কীভাবে?’
‘আমার ট্যালেন্ট দ্বারা।’
‘কীসের ট্যালেন্ট?’ রানসাইটার বললেন। ‘তোমার কোনো ট্যালেন্ট নেই। তুমি জো চীপের স্ত্রী।’
‘তুমি এখানে এসেছ জো আর আমার সাথে দেখা করার জন্য এবং একসাথে লাঞ্চ করার জন্য,’ জানালার কাছ থেকে জি. জি. অ্যাশউড বললো।
‘ওর ট্যালেন্ট আছে,’ জো বললো। মনে করার চেষ্টা করছে সে, কিন্তু এরই মধ্যে সব কেমন যেন ধোঁয়াটে হতে শুরু করেছে, যতই মনে করার চেষ্টা করছে ততই মলিন হয়ে যাচ্ছে স্মৃতিগুলো। ভিন্ন এক সময়ে, ভাবলো সে। অতীত। এছাড়া আর কিছুই মনে করতে পারলো না; তার স্মৃতি ওখানেই শেষ হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী সবার থেকে আলাদা, ভেবেই যাচ্ছে সে। ও এমন কিছু করতে পারে যা পৃথিবীর আর কেউ পারে না। সেক্ষেত্রে, কেন সে রানসাইটার অ্যাসোসিয়েটসের হয়ে কাজ করছে না? কোথাও একটা গোলমাল আছে।
‘তুমি পরিমাপ করেছিলে?’ রানসাইটার তাকে জিজ্ঞেস করলেন। ‘মানে ওটা তো তোমার দায়িত্ব। কথা শুনে তো মনে হচ্ছে করেছিলে। বেশ নিশ্চিত মনে হচ্ছে তোমাকে।’
‘আমি নিজেকে নিয়েই নিশ্চিত না,’ জো বললো। কিন্তু আমার স্ত্রীর ব্যাপারে নিশ্চিত, পরের কথাগুলো নিজেকে শোনালো। ‘আমার পরীক্ষণযন্ত্রগুলো নিয়ে আসছি,’ সে বললো। ‘তারপর দেখা যাবে কী পরিমাণ শক্তিক্ষেত্র উৎপাদন করতে পারে সে।’
‘কী বলছো, জো!’ রেগে গেলেন রানসাইটার। ‘যদি তোমার স্ত্রীর কোনো ট্যালেন্ট বা অ্যান্টি-ট্যালেন্ট থাকে, তুমি অবশ্যই সেটা অন্তত এক বছর আগেই পরিমাপ করে রেখেছ। ঠিক এই মুহূর্তেই সেটা তোমার আবিষ্কার করার কথা না।’ ডেস্কের উপর রাখা ইন্টারকমের বোতাম চাপলেন তিনি। ‘কে আছো ওখানে? মিসেস চীপকে নিয়ে কি কোনো প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম আমরা? প্যাট্রিসিয়া চীপ?’
খানিক নীরবতার পর ইন্টারকমে জবাব শোনা গেল। ‘মিসেস চীপকে নিয়ে কোনো প্রতিবেদন নেই। তার বিবাহ-পূর্ববর্তী নামে থাকতে পারে হয়তো।’
‘কনলি,’ জো বললো। ‘প্যাট্রিসিয়া কনলি।’
আবার নীরবতা। ‘মিস প্যাট্রিসিয়া কনলি নামে একজনকে নিয়ে দুটো প্রতিবেদন আছে: মি. অ্যাশউডের প্রাথমিক স্কাউট রিপোর্ট আর মি. চীপের পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট।’ ইন্টারকমের স্লট থেকে দুটো প্রতিবেদন বেরিয়ে এসে পড়লো ডেস্কের উপর।
জো চীপের প্রতিবেদনে চোখ বুলিয়ে রানসাইটার বললেন, ‘জো, তোমার এটা দেখা উচিত, এদিকে এসো।’ প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট একটা জায়গায় আঙুল রাখলেন তিনি। জো ততক্ষণে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। নিচে দাগ দেওয়া কাটা চিহ্ন দুটো দেখতে পেল সে। ও আর রানসাইটার পরস্পরের সাথে দৃষ্টিবিনিময় করে একযোগে তাকালো প্যাটের দিকে।
‘আমি জানি ওখানে কী লেখা আছে,’ নিরাবেগ কণ্ঠে বললো প্যাট। ‘অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের অ্যান্টি-পিএসআই ক্ষেত্র।’ গভীর মনোনিবেশের সাথে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিটি শব্দ মনে করার চেষ্টা করছে সে। ‘সম্ভবত—’
‘মিকের কাজটা আমরা পেয়েছিলাম,’ জো চীপের উদ্দেশে বললেন রানসাইটার। ‘এগারোজন ইনার্শিয়ালের সাথে এই কামরায় পরামর্শ করছিলাম আমি, আর তখন ওকে বলেছিলাম—’
‘আসলে সে কী করতে পারে সেটা যেন সবাইকে দেখায়,’ জো বললো। ‘ঠিক তাই করেছে সে। একদম সেটাই। আমার মূল্যায়ন পুরোপুরি ঠিক ছিলো।’ আঙুলের ডগা দিয়ে কাগজের একেবারে নিচে অঙ্কিত বিপদচিহ্নের উপর টোকা দিলো। ‘আমার নিজের স্ত্রী,’ ক্ষোভের সাথে বললো সে।
‘আমি তোমার স্ত্রী না,’ প্যাট বললো। ‘ওটাও পরিবর্তন করে দিয়েছি আমি। আগে যে অবস্থায় ছিলো ঠিক সেই অবস্থায় ফিরে আসুক আবার, সেটাই চাও তুমি? কোনো পরিবর্তন ছাড়া, এমনকি বিস্তারিত কোনো প্ৰমাণ ছাড়া? সেক্ষেত্রে, তোমাদের ইনার্শিয়ালরা মূল বিষয়টা বুঝতে ব্যর্থ হবে। অবশ্য, এই মুহূর্তে কী ঘটছে সেই বিষয়েও তারা পুরোপুরি অবগত না। যদি-না তাদের কারো মস্তিষ্কে স্মৃতির কিছু রেশ থেকে যায়, জোয়ের যেমন আছে। যদিও স্মৃতিটা হয়তো ইতোমধ্যেই মুছে যেতে শুরু করেছে।’
‘মিকের সাথে চুক্তিটা আমি ফিরে পেতে চাই,’ দাঁতে দাঁত চেপে বললেন রানসাইটার। ‘আপাতত ওটুকু হলেই চলবে আমার।’
‘আমি যখন কাউকে খুঁজে বের করি,’ জি. জি. অ্যাশউড বললো, ‘ওদেরকে স্রেফ খুঁজে বের করি।’ মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়ে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে তাকে।
‘হ্যাঁ, তুমি সত্যিই ট্যালেন্ট বের করে এনেছ,’ রানসাইটার বললেন।
ইন্টারকম গুঞ্জন করে উঠতেই শোনা গেল মিসেস ফ্রিকের কম্পিত, বয়স্ক কণ্ঠস্বর, ‘আমাদের ইনার্শিয়ালদের একটা দল আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, মি. রানসাইটার। ওরা বলছে আপনি নাকি ওদেরকে ডেকে এনেছেন একটা নতুন প্রজেক্টে একসাথে কাজ করার জন্য। আপনি কি এখন ওদের সাথে দেখা করবেন?’
‘ভেতরে পাঠান ওদের,’ রানসাইটার বললেন।
‘এই আংটিটা আমি রাখতে চাই,’ প্যাট বললো। রুপা আর জেড পাথরে তৈরি বিয়ের আংটিটা দেখালো সে, যেটা অন্য কোনো এক সময়স্রোতে সে আর জো পছন্দ করেছিলো। বিকল্প বাস্তবতার এই একটা চিহ্ন নিজের কাছে রাখতে চাইছে মেয়েটা। জো ভাবছে আর কী ধরনের—আদৌ যদি আরো কিছু সে রেখেই থাকে আর কি—আইনি কাগজপত্র সে নিজের কাছে রেখেছে। রাখেনি, এমনটাই আশা করলো সে। এই ব্যাপারে কোনো প্রশ্নও করলো না। বেশি প্রশ্ন না করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অফিস কক্ষের দরজা খুলে যেতেই জোড়ায় জোড়ায় ইনার্শিয়ালরা প্রবেশ করতে লাগলো। প্রথমে তারা দাঁড়িয়ে রইলো অনিশ্চিতভাবে, তারপর বসে পড়লো রানসাইটারের ডেস্কের মুখোমুখি চেয়ারগুলোতে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবাইকে দেখছেন রানসাইটার, তারপর ডেস্ক থেকে এলোমেলো কাগজের স্তূপটা তুলে নিলেন; বোঝার চেষ্টা করছেন যে প্যাট বাছাই করা দলের মাঝে কোনো পরিবর্তন করেছে কি না।
‘এডি ডর্ন,’ রানসাইটার বললেন। ‘হ্যাঁ, তুমি আছো।’ মেয়েটার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই তার পাশে দাঁড়ানো পুরুষের দিকে তাকালেন। ‘হ্যামন্ড। ঠিক আছে, হ্যামন্ড। টিপি জ্যাকসন।’ অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে সবার উপর নজর বোলালেন তিনি।
‘আমি যত দ্রুত সম্ভব চলে এসেছি,’ মিসেস জ্যাকসন বললো। ‘আপনি আমাকে মোটেও সময় দেননি, মি. রানসাইটার।’
‘জন ইড,’ রানসাইটার বললেন।
সদ্য কৈশোর পেরোনো, মাথাভরতি এলোমেলো পশমি চুলের ছেলেটা হাত তুলে নিজের উপস্থিতির জানান দিলো। তার স্বভাবসুলভ বেপরোয়া ভাব কোথায় যেন হারিয়ে গেছে; ছেলেটাকে এখন অনেক বেশি অন্তর্মুখী আর কেমন যেন শঙ্কিত মনে হচ্ছে। বিষয়টা সত্যিই উপভোগ্য হবে, ভাবলো জো। ইশ, যদি জানতে পারতাম কতটুকু মনে আছে ছেলেটার… জানতে পারতাম সবাই কতটুকু মনে রাখতে পেরেছে, এককভাবে এবং দলগতভাবে।
‘ফ্রান্সেসকা স্প্যানিশ,’ রানসাইটার বললেন।
দেখতে জিপসিদের মতো, উজ্জ্বল চোখের, গাঢ় বর্ণের এক মহিলা, যাকে দেখলেই মনে হয় যেন অদ্ভুত এক রুক্ষতা বিকিরণ করছে চারপাশে, কথা বললো, ‘আমরা যখন আউটার অফিসে অপেক্ষা করছিলাম, মি. রানসাইটার, শেষের কয়েক মিনিটে রহস্যময় কিছু কণ্ঠস্বর আবির্ভূত হয়ে অনেক কিছু বলছিলো আমাকে।’
‘তুমি ফ্রান্সেসকা স্প্যানিশ?’ রানসাইটার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, অনেক কষ্টে ধৈর্য ধরে রেখেছেন। বরাবরের চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্ত মনে হচ্ছে তাকে।
‘হ্যাঁ, আমি। তাই ছিলাম সব সময় এবং ভবিষ্যতেও তাই থাকবো,’ সুরেলা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলো মিস স্প্যানিশ। ‘রহস্যময় কণ্ঠস্বরগুলো কী বলছিলো আমাকে সেটা কি বলতে পারি?’
‘এখন না, পরে,’ রানসাইটার বললেন, চোখ বোলাচ্ছেন পরবর্তী প্রতিবেদনে।
‘এখনই বলতে হবে,’ জোরালো দাবির সাথে বললো মিস স্প্যানিশ।
‘ঠিক আছে,’ হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন রানসাইটার। ‘এখন আমরা কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নেবো।’ ডেস্কের একটা ড্রয়ার খুলে স্নায়ু প্রশান্তকারী ট্যাবলেট বের করে পানি ছাড়াই গিলে ফেললেন। ‘শোনা যাক রহস্যময় কণ্ঠস্বর তোমার কাছে কী প্রকাশ করেছে, মিস স্প্যানিশ।’ জোয়ের দিকে তাকিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ নাড়লেন তিনি।
‘কেউ একজন এইমাত্র আমাদের স্থানান্তরিত করেছে, আমাদের সবাইকে… অন্য এক বিশ্বে,’ মিস স্প্যানিশ শুরু করলো। ‘সেখানে আমরা বসতি স্থাপন করি, বসবাস করতে থাকি ঐ বিশ্বের নাগরিক হিসেবে। আর তারপর একটা প্রচণ্ড, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী অতিমানবিক সংস্থা আমাদেরকে আবার এখানে ফেরত পাঠিয়ে দেয়, আমাদের বৈধ মহাবিশ্বে।’
‘নিঃসন্দেহে প্যাট,’ জো চীপ বললো। ‘প্যাট কনলি। যে মাত্র আজকেই আমাদের প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছে।’
‘টিটো অ্যাপাস্তাস,’ রানসাইটার বললেন। ‘তুমি আছো এখানে?’ সারসের মতো গলা উঁচু করে সবার উপর চোখ বোলাতে লাগলেন তিনি।
টাকমাথার এক লোক নিজের দিকে ইশারা করলো। থুতনিতে পাতলা ছাগলদাড়ি, পরনে সোনালি রঙের পুরোনো ধাঁচের ট্রাউজার, যেটা কোমরে পেঁচিয়ে বাঁধা, কিন্তু তারপরেও বেশ কেতাদুরস্ত মনে হচ্ছে। সম্ভবত ডিম্বাকৃতির বোতাম লাগানো শ্যাওলা রঙের মিট্টি ব্লাউজ—এর কারণে। তবে যাই হোক না কেন, তাকে ঘিরে রেখেছে একধরনের আভিজাত্য, অন্য সবার থেকে যা একেবারে আলাদা। এটা দেখে জোয়ের ভালো লাগলো।
‘ডন ড্যানি,’ রানসাইটার বললেন।
‘আমি এখানে, স্যার,’ সিয়ামিজ বিড়ালের মতো আত্মবিশ্বাসী, সুরেলা কণ্ঠের একজন সাড়া দিলো; একহারা গড়ন আর মুখে ভালোমানুষির ছাপ নিয়ে একেবারে সোজা হয়ে বসে আছে চেয়ারে, ফিতে দিয়ে বাঁধা লম্বা চুল। তার পরনে পলিএস্টারের ডানডল, রুপার তারা বসানো কাউবয় চ্যাপস, পায়ে স্যান্ডেল।
‘তুমি একজন অ্যান্টি-এনিমেটর,’ সঠিক প্রতিবেদনটা দেখে বললেন রানসাইটার। ‘এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানের একমাত্র অ্যান্টি-এনিমেটর।’ এরপর জোয়ের উদ্দেশে বললেন, ‘ওকে কি আমাদের আসলেই প্রয়োজন হবে? ওর বদলে একজন অ্যান্টি-টেলিপ্যাথ নিলে ভালো হতো না? যত বেশি অ্যান্টি-টেলিপ্যাথ ততই আমাদের সুবিধা।’
‘সবকিছুই আমাদের বিবেচনা করতে হবে,’ জো বললো। ‘যেহেতু আমরা জানি না ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের।’
‘হুম, ঠিকই বলেছ,’ একমত হয়ে মাথা নাড়লেন রানসাইটার। ‘এখন স্যামি মুন্ডোর কাছে আসি।’
ভোঁতা নাকের এক যুবক, যার পরনে কোমরের কাছে কুঁচি দেওয়া, গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা কোট। দেহের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকমের ছোট আর গোল তরমুজের মতো দেখতে মাথাটা ঝট করে তুলে কম্পিত হাতে নিজের দিকে হাস্যকর রকম একটা ইশারা করলো। দেখে জোয়ের মনে হলো রক্তশূন্য দেহটা যেন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাফেরা করছে। এই লোকটাকে সে ব্যক্তিগতভাবে চেনে। প্রকৃত বয়সের চেয়ে মুন্ডোকে অনেক কমবয়সি দেখায়; তার শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি প্রক্রিয়া থেমে গেছে অনেক আগেই। সত্যি বলতে কী, মুন্ডোর বুদ্ধি একটা র্যাকুন—এর চেয়ে বেশি না। ও হাঁটতে পারে, খেতে পারে, নিজে নিজে গোসল করতে পারে, এমনকি—কিছুটা হলেও—কথা বলতে পারে। অথচ তার অ্যান্টি-টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা তুলনাহীন। একবার সে একাই এস. ডোল মেলিপনকে কোণঠাসা করে ফেলেছিলো; আর পরবর্তী কয়েক মাস প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্মারক গ্রন্থে অনেক কিছু লেখা হয়েছিলো এই বিষয়ে।
‘বেশ,’ রানসাইটার বললেন, ‘এবার ওয়েন্ডি রাইট।’
সব সময় যা হয়, সুযোগ পেলেই আড়চোখে মেয়েটাকে একনজর দেখার চেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না জো। সাধ্য থাকলে এই মেয়েকে নিজের সঙ্গিনী বানাতো, এমনকি সম্ভব হলে একেবারে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিতো। আর সকলের মতো যে ওয়েন্ডি রাইটও রক্ত-মাংসে তৈরি, এটা তার কাছে পুরোপুরি অসম্ভব মনে হয়। মেয়েটার আশেপাশে থাকলে নিজেকে তার মনে হয় বেঁটে, নোংরা, ঘর্মাক্ত, অশিক্ষিত আর বর্বর। যার পেটের ভেতর অবিরাম ভুটভাট শব্দ হয়, যে অবিরাম ভোঁস ভোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। মেয়েটার কাছাকাছি হলেই সে নিজ দেহের অভ্যন্তরের যে কলকবজাসমূহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে সেগুলোর ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে। তার দেহের অভ্যন্তরের সমস্ত কলকবজা, পাইপ আর ভাল্ব এবং গ্যাস কম্প্রেসর আর ফ্যান বেল্ট ভটভট শব্দে কাজ করে চলেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি সব বিকল হয়ে যাওয়া। মেয়েটার মুখ দেখে সে বুঝতে পারে যে নিজের মুখে চটকদার মুখোশ পরে রেখেছে। মেয়েটার দেহসৌষ্ঠব দেখে তার মনে হয়, সে নিজে একটা নিচু মানের ফাঁপানো খেলনা। মেয়েটার গায়ের রং অত্যন্ত সূক্ষ্ম, যেন বিচ্ছুরিত হচ্ছে অদৃশ্য এক আভা। তার মূল্যবান সবুজ পাথরের মতো চোখ নিরাসক্তভাবে সবকিছুই দেখে নেয়। ঐ চোখে জো কখনো ভয়ের ছায়া পর্যন্ত দেখেনি, কিংবা বিদ্বেষ অথবা অবজ্ঞা। যা দেখে সেটাই সহজভাবে গ্রহণ করে নেয় সে। সকল পরিস্থিতিতেই তাকে ধীর-স্থির আর শান্ত দেখায়। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, জোয়ের কাছে তাকে মনে হয় অবিনশ্বর, প্রশান্ত আর স্নিগ্ধ। ক্লান্তি, জরা, ব্যাধি অথবা শারীরিক কোনো অবক্ষয় যাকে ছুঁতে পারে না। বয়স সম্ভবত পঁচিশ বা ছাব্বিশ, কিন্তু জোয়ের কাছে তাকে আরো বেশি তরুণী মনে হয়। আর নিঃসন্দেহে তাকে কখনো এর চেয়ে বয়স্ক মনে হবে না। নিজের উপর তার অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ, সেই সাথে পারিপার্শ্বিকতার উপরও—
‘আমি এখানে,’ প্রশান্ত কণ্ঠে বললো ওয়েন্ডি।
মাথা নাড়লেন রানসাইটার। ‘ঠিক আছে। বাকি রইলো শুধু ফ্রেড জাফস্কি।’ পায়ের পাতাগুলো থ্যাবড়ানো, থলথলে দেহ, মধ্যবয়সি, অদ্ভুতদর্শন একজনের উপর রানসাইটারের দৃষ্টি স্থির হলো। লোকটার চুলগুলো একেবারে খুলি কামড়ানো। কাদাটে ত্বক, সেই সাথে বিকটভাবে বেরিয়ে থাকা কণ্ঠা, পরনে বেবুনের পাছার রঙের একটা পোশাক। ‘নিশ্চয়ই তুমি?’
‘ঠিক বলেছেন,’ জাফস্কি সম্মতি জানিয়ে চাপা হাসলো। ‘কী করতে হবে বলুন?’
‘যিশু,’ রানসাইটার বললেন, মাথা নাড়ছেন বিষণ্ন ভঙ্গিতে। ‘বেশ, বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে আমাদেরকে একজন অ্যান্টি-প্যারাকাইনেটিসিস্ট দলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর তুমি হলে সেই ব্যক্তি।’ প্রতিবেদনগুলো নামিয়ে রেখে নিজের সবুজ সিগার খুঁজতে লাগলেন তিনি। জোয়ের উদ্দেশে বললেন, ‘এই হলো আমাদের দল, সাথে তুমি আর আমি। শেষ মুহূর্তে তুমি কোনো পরিবর্তন করতে চাও?’
‘আমি সন্তুষ্ট,’ জো বললো।
‘তোমার ধারণা, ইনার্শিয়ালদের এই দলটাই সম্ভাব্য সেরা দল?’ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জোয়ের দিকে তাকালেন রানসাইটার।
‘হ্যাঁ,’ জো বললো।
‘এরা হোলিসের পিএসআইদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যথেষ্ট?’
‘হ্যাঁ,’ জো আগের মতোই জবাব দিলো।
কিন্তু তার মন বলছে অন্য কথা।
এটা এমন কিছু নয় যেখানে সে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। সেটা করাটাও যৌক্তিক হবে না। এগারোজন ইনার্শিয়ালের সম্মিলিত কাউন্টার-ফিল্ড অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার কথা। কিন্তু তারপরেও…
‘মি. চীপ, আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই। কয়েক মিনিট সময় হবে?’ মি. অ্যাপাস্তাস, টাকমাথা আর থুতনিতে কয়েক গোছা দাড়ি, আলো পড়ে চকচক করছে সোনালি ট্রাউজার, হাতে টোকা দিয়ে জো চীপের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ‘গত রাতে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার, সেটা নিয়ে আপনার সাথে কি একটু আলোচনা করা যাবে? অনেকটা সম্মোহিত অবস্থায় হোলিসের একজন, অথবা সম্ভবত দুইজন এজেন্টের সাথে আমার যোগাযোগ হয়—একজন টেলিপ্যাথ, যে কিনা তাদের নিজস্ব একজন প্রিকগের সাথে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। আপনার কি মনে হয় বিষয়টা মি. রানসাইটারকে আমার জানানো উচিত? বিষয়টা কি গুরুত্বপূর্ণ?’
দ্বিধাগ্রস্তভাবে রানসাইটারের দিকে তাকালো জো চীপ। নিজের প্রিয়, মহামূল্যবান চেয়ারে বসে আছেন তিনি। নিভে যাওয়া হাভানা চুরুটটা আবার জ্বালানোর চেষ্টা করছেন। রানসাইটারকে দেখে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে। তার মুখের ভাঁজগুলো ঝুলে পড়েছে দুপাশে। ‘না,’ জো বললো। ‘বাদ দাও, কিছু বলতে হবে না।’
‘প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ,’ সবার শোরগোল ছাপিয়ে উচ্চ স্বরে রানসাইটার বললেন। ‘আমরা এখন চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করবো। তোমরা এগারোজন ইনার্শিয়াল, জো চীপ আর আমি এবং আমাদের গ্রাহকের প্রতিনিধি জোয়ি ওয়ির্ট; সব মিলিয়ে চৌদ্দ জন। আমরা নিজেদের মহাকাশযান নিয়ে যাবো।’ পকেট থেকে স্বর্ণের তৈরি, গোলাকার রাজকীয় ঘড়ি বের করে সময় দেখলেন তিনি। ‘তিনটা ত্রিশ। মূলভবনের রুফ-ফিল্ড থেকে প্র্যাটফল ২ ঠিক চারটার সময় উড্ডয়ন করবে।’ ঘড়ির ডালা বন্ধ করে রেশমের পোশাকের পকেটে রেখে দিলেন আবার। ‘ঠিক আছে, জো,’ তিনি বললেন। ‘ঢিল ছোঁড়া হয়ে গেছে, ফলাফল খারাপ হবে নাকি ভালো সেটা আমার জানা নেই। আমাদের নিজস্ব একজন প্রিকগ থাকলে হয়তো ভবিষ্যতে কী ঘটবে সেটা আগাম জানিয়ে দিতে পারতো।’ উদ্বেগ আর সবার জন্য দুঃশ্চিন্তা, বয়স এবং দায়িত্বের বোঝা, সব মিলিয়ে তার চেহারা আর কণ্ঠস্বর দুটোই বিষণ্নতায় ভারী হয়ে উঠলো।
