অধ্যায় ৮
আপনি কি আর্থিক দুরবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন? তাহলে উবিক সঞ্চয় এবং ঋণ প্রকল্পের প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করুন। তিনি আপনাকে ঋণ পরিশোধের দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেবেন। ধরুন, আপনি নির্দিষ্ট সুদে পঞ্চাশ পসক্রিড ঋণ নিলেন। এখন দেখা যাক, সুদে-আসলে আপনাকে—
.
সকালের মিষ্টি আলোতে হোটেলের অভিজাত কামরার আসবাবপত্রের অবয়বগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ঘুম জড়ানো চোখে কামরার সাজসজ্জা দেখছিলো জো চীপ; প্রতিটি দেয়াল মুড়ে দেওয়া হয়েছে নিও-সিল্কস্ক্রিন<sup>৬৪</sup> পদ্ধতিতে অঙ্কিত চিত্রকর্ম দ্বারা, যার বিষয়বস্তু হলো ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ—এর এককোষী প্রাণী থেকে মানবজাতির উত্তরণ এবং বিংশ শতাব্দীতে মহাকাশ অভিযান পর্যন্ত মানব জাতির চড়াই-উত্রাই। চমৎকার ডিজাইনের কৃত্রিম মেহগনি কাঠের ড্রেসার, ক্রোমিয়ামের আবরণ দেওয়া নানা বর্ণের আরামদায়ক চারটি চেয়ার… আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে হোটেল কামরার রাজকীয় সৌন্দর্য উপভোগ করছিলো সে। আর তখনই হতাশ হয়ে বুঝতে পারলো যে ওয়েন্ডি তার কামরায় আসেনি। অথবা হয়তো এসেছিলো কিন্তু দরজায় নক করার শব্দ শুনতে পায়নি সে। কারণ সে গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিলো।
সুতরাং, নতুন সাম্রাজ্যে তার আধিপত্য শুরু হওয়ার মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।
অর্থহীন এক বিষণ্ণতা—গতকালকের ক্লান্তির রেশ আর অবর্ণনীয় এক বিষাদ—এখনো তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। গড়ান দিয়ে বিশালাকৃতির বিছানা থেকে নামলো সে। হাতের কাছেই থাকা পোশাকগুলো পরে নিলো অসম্ভব ঠান্ডা, অস্বাভাবিক রকমের। কেন, সেটা ভাবতে ভাবতেই ফোনের রিসিভার তুলে নিলো রুম সার্ভিস ডাকার জন্য।
‘—তার পাওনা কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়ে দাও, যদি আদৌ সম্ভব হয়,’ রিসিভারে কে যেন কথা বলছে। ‘প্রথমে অবশ্যই এটা নিশ্চিত করতে হবে যে স্ট্যান্টন মিক নিজে এই ঘটনার সাথে জড়িত কি না। নাকি তার মতো দেখতে কোনো হোমোসিমুলাক্রিক আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এবং যদি তাই হয়, তাহলে কেন। আর যদি না হয়, তাহলে কীভাবে—’ কণ্ঠস্বরটা যেন বাতাসে ভাসছে, জোয়ের সাথে নয়, কথা বলছে নিজের সাথেই। মনে হলো, ও যে রিসিভার কানে ধরে দাঁড়িয়ে আছে কণ্ঠস্বরটা সেই ব্যাপারে মোটেও সচেতন নয়, যেন তার কোনো অস্তিত্বই নেই। ‘আমাদের আগের সব প্রতিবেদনে,’ কণ্ঠস্বর বলে যাচ্ছে, ‘এটা পরিষ্কার প্রতীয়মান যে মিক সব সময়ই এমন পদ্ধতিতে কাজ করে যা মহাবিশ্বে প্রচলিত সকল আইনি আর নৈতিকতার দ্বারা সমর্থিত। সুতরাং, সেক্ষেত্রে—’ রিসিভার নামিয়ে রাখলো জো, হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। মাথার ভেতরে পাকানো জটগুলো ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। রানসাইটারের কণ্ঠস্বর। বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আবার ফোন তুলে নিলো, শুনতে লাগলো মনোযোগ দিয়ে।
‘—মিকের বিরুদ্ধে মামলা, যে কিনা প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী এবং এই ধরনের মামলা-মোকদ্দমা যার কাছে ডাল-ভাত। সোসাইটির কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন দাখিল করার আগে আমাদের নিজেদের আইনবিদদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। যদি আমাদের ভুল হয় এবং ভুলের পরিপ্রেক্ষিতে কাউকে গ্রেফতার করা হয়, তবে সেটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। যদি—’
‘রানসাইটার!’ চিৎকার করে ডাক দিলো জো।
‘—নিশ্চিত করা কঠিন সম্ভবত এই কারণে—’
ফোন নামিয়ে রাখলো জো। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, নিজেকে বললো সে। বাথরুমে গিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিলো মুখে। চুল আঁচড়ালো হোটেল থেকে দেওয়া বিনামূল্যের চিরুনি দিয়ে। তারপর একটু সময় নিলো নিজেকে ধাতস্থ করার জন্য। দাড়ি কামালো হোটেল থেকে সরবরাহ করা একবার ব্যবহারযোগ্য বিনামূল্যের রেজর দিয়ে। হোটেল থেকে সরবরাহ করা বিনামূল্যের আফটার শেভ মাখলো; মুখে, ঘাড়ে, চিবুকে। একটা প্যাকেট খুললো, হোটেল থেকে সরবরাহ করা বিনামূল্যের গ্লাসে পান করলো। মোরাটোরিয়াম কি তাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পেরেছে কোনোভাবে? অবাক হয়ে ভাবলো সে। ফোনের মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে? রানসাইটার সচেতন হওয়ার সাথে সাথেই সম্ভবত অন্য কারো সাথে কথা বলার আগে আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছে। যদি তাই হয়, আমার কথা শুনতে পাচ্ছে না কেন সে? এটা কি শুধুই কারিগরি সমস্যা, যা পরে ঠিক হয়ে যাবে?
ফোনের কাছে ফিরে এসে রিসিভার তুলে নিলো আবার। উদ্দেশ্য বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামে ফোন করা।
‘—প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়, সে বিভ্রান্ত তার নানাবিধ ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে, বিশেষ করে—’
আমি ফোন করতে পারবো না, বুঝতে পারলো জো। রিসিভার নামিয়ে রাখলো। আমি এমনকি রুম সার্ভিসও ডাকতে পারবো না।
বিশাল কামরার একপ্রান্তে একটা সুরেলা শব্দ হতেই টুংটাং শব্দে একটা যান্ত্রিক কণ্ঠ বললো, ‘আমি আপনার বিনামূল্যের ঘরোয়া পেপ মেশিন। পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরে যত কলোনি আছে এবং সেখানে রুটস হোটেলের যত শাখা আছে তার সবগুলোতেই গ্রাহকদের জন্য এই সেবা বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। আপনার পছন্দের বিষয় অনুযায়ী ডায়াল করুন, আমি দ্রুত ঠিক এই মুহূর্তের তাজা খবর সরবরাহ করবো। আমি আবারও বলছি, এর জন্য আপনাকে কোনো মূল্য প্রদান করতে হবে না!’
‘ঠিক আছে।’ কামরার অপর প্রান্তে পেপ মেশিনের কাছে গেল জো। হয়তো এরই মধ্যে রানসাইটারকে হত্যার সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলো মোরাটোরিয়ামে আসা প্রতিটি মৃত্যুর খোঁজ রাখে নিয়মিত। আন্তঃগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ চিহ্নিত বোতামে চাপ দিলো সে। সাথে সাথেই যন্ত্রটা একটা শব্দ করে ছাপানো কাগজ বের করে দিতে লাগলো, যেগুলো আরো দ্রুততার সাথে গুছিয়ে নিলো সে। রানসাইটারকে নিয়ে কোনো সংবাদ নেই। খুব বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে গেল নাকি? নাকি সোসাইটি খবরটা ধামাচাপা দিয়েছে? অথবা আল, অনুমান করলো সে, আল হয়তো মোরাটোরিয়ামের অধিকারীর পকেটে কিছু পসক্রিড ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আলের কাছে যা অর্থ ছিলো, সবই এখন তার কাছে। আল কাউকে ঘুস দিয়ে কিছু করাতে পারবে না।
শব্দ হলো দরজায়।
হোমিওপেপ নামিয়ে রেখে দরজার দিকে সতর্ক পায়ে এগোল জো। সম্ভবত প্যাট কনলি। মেয়েটা এখানে ফাঁদে ফেলেছে আমাকে। অথবা নিউ ইয়র্ক থেকেও কেউ আসতে পারে, আমাকে ওখানে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। তবে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ওয়েন্ডির আসার। কিন্তু তার আসাটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। অন্তত এই মুহূর্তে নয়, এত দেরিতে। হতে পারে হোলিসের পাঠানো কোনো গুপ্তঘাতক। সে আমাদের প্রত্যেককে এক এক করে হত্যা করতে পারে।
দরজা খুললো জো।
বিব্রতভাবে নরম হাতদুটো কচলাতে কচলাতে হার্বার্ট সোয়েন হেইট ভলসাঙ দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। কথা বলছে বিড়বিড় করে। ‘আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, মি. চীপ। ফিরতি সংকেত পাওয়ার জন্য আমরা সারা রাত কাজ করেছি। ফলাফল শূন্য। তারপরেও আমরা বৈদ্যুতিক মস্তিষ্কলেখচিত্র প্রয়োগ করি এবং লেখচিত্রে অস্পষ্ট কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে মস্তিষ্ক ক্ৰিয়া দেখা গেছে। সুতরাং, পরজীবনের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু কোনো কারণে আমরা সেটা ধরতে পারছি না। আমরা এখন ত্বকের প্রতিটি অংশে প্রোব ব্যবহার করছি। এছাড়া আর কী করা যায়, আমার কোনো ধারণা নেই, স্যার।’
‘পরিমাপ করার মতো সজীব উপাদানের রাসায়নিক পরিবর্তন কি আছে মস্তিষ্কে?’ প্রশ্ন করলো জো।
‘জি, স্যার। অন্য মোরাটোরিয়াম থেকে একজন বিশেষজ্ঞকে এনেছিলাম। সেই লোকই এই পরিবর্তন চিহ্নিত করেছে, তার নিজের যন্ত্র দিয়ে। পরিমাণটা একেবারেই সূক্ষ্ম, একজন মানুষের মৃত্যুর পরপরই আপনি যতটুকু আশা করতে পারেন।’
‘আমার খোঁজ পেলেন কীভাবে?’ জিজ্ঞেস করলো জো।
‘নিউ ইয়র্কে মি. হ্যামন্ডকে ফোন করেছিলাম। তারপর আমি আপনাকে ফোন করি, হোটেলের এই নাম্বারে। কিন্তু আপনার ফোন পুরো সকাল ব্যস্ত ছিলো। আর তাই আমি নিজে এখানে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি।’
‘নষ্ট হয়ে গেছে,’ জো বললো। ‘ফোন। আমি নিজেও কোথাও ফোন করতে পারছি না।’
‘মি. হ্যামন্ডও আপনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন,’ মোরাটোরিয়ামের অধিকারী বললো। ‘তিনি আপনার জন্য একটা সংবাদ পাঠিয়েছেন। নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে রওয়ানা দেওয়ার আগে জুরিখে একটা বিশেষ কাজের কথা আপনাকে মনে করিয়ে দিতে অনুরোধ করেছেন আমাকে।’
‘ও আমাকে ইলার সাথে পরামর্শ করার বিষয়টা মনে করিয়ে দিতে চাইছে,’ জো বললো।
‘স্বামীর দুঃখজনক আর অকালমৃত্যুর কথা তাকে জানাতে বলেছেন।’
‘আপনি কি আমাকে কিছু পসক্রিড ধার দিতে পারবেন?’ জো বললো। ‘যেন সকালের নাস্তা করতে পারি?’
‘মি. হ্যামন্ড আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে আপনি আমার কাছে ধার চাইতে পারেন। এটাও বলেছেন যে তিনি আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে গেছেন, যা দিয়ে হোটেল ভাড়া, খাবার, আর কয়েক রাউন্ড ড্রিংকস—’
‘আল ধরে নিয়েছিলো যে আমি আরো কম বিলাসবহুল কোনো কামরা বেছে নেবো। কিন্তু এই হোটেলে এটার চেয়ে ছোট আর কম বিলাসবহুল কোনো কামরা খালি নেই যা আলের হিসাবে ছিলো না। মাস শেষে রানসাইটার এসোসিয়েটসে যে হিসাব বিবরণী পাঠাবেন সেখানে এই ধারের পরিমাণটা যোগ করে দেবেন। আল নিশ্চয়ই বলেছে যে আমি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছি। আপনি এখন ইতিবাচক চিন্তা করতে পারেন। ক্ষমতাশালী একজন মানুষের সাথে কাজ করছেন বলে ভাবুন। যে নিজের পরিশ্রম দ্বারা ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে এসেছে। আমি, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ভবিষ্যতে কোন মোরাটোরিয়ামকে নিয়োগ করবো সেটা পুনর্বিবেচনা করতে পারি। আমরা হয়তো, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নিউ ইয়র্কের কাছাকাছি কোনো একটা বেছে নিতে পারি।’
বিরক্ত হয়ে ভন ভলসাঙ খসখসে পশমি আলখাল্লার পকেট থেকে কুমিরের চামড়ায় তৈরি ওয়ালেট বের করে আনলো।
‘কঠিন এক পৃথিবীতে আমরা বাস করছি,’ মুদ্রাগুলো নেওয়ার সময় বললো জো। ‘এই পৃথিবীর নিয়ম হলো: কুকুর কুকুরের মাংস খায়।’
‘মি. হ্যামন্ড আরো কিছু তথ্য দিয়েছেন আপনাকে জানানোর জন্য। আপনাকে নিউ ইয়র্কে নেওয়ার জন্য মহাকাশযান আনুমানিক দুই ঘণ্টার মধ্যে জুরিখে পৌঁছাবে।’
‘চমৎকার,’ জো বললো।
‘ইলা রানসাইটারের সাথে আলোচনা করার পর্যাপ্ত সময় যেন পান, সেজন্য সরাসরি মোরাটোরিয়াম থেকে যেন মহাকাশযানে উঠতে পারেন সেই ব্যবস্থা করেছেন মি. হ্যামন্ড। আর তাই তিনি বলেছেন আমি যেন সাথে করে আপনাকে মোরাটোরিয়ামে নিয়ে যাই। আমার চপার হোটেলের ছাদে অপেক্ষা করছে।’
‘আল হ্যামন্ড এই কথা বলেছে? বলেছে যেন আমি আপনার সাথে মোরাটোরিয়ামে যাই?’
‘ঠিক,’ ভন ভলসাঙ মাথা নেড়ে বললো।
‘দীর্ঘদেহী, কাঁধদুটো সামনের দিকে ঝুঁকানো কৃষ্ণাঙ্গ এক পুরুষ, বয়স প্রায় ত্রিশ? সামনের তিনটি দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো, প্রত্যেকটা দাঁত বিভিন্ন রকম নক্সা করা, বাঁ দিকেরটায় হরতনের নক্সা করা, তারপরেরটা চিড়িতন এবং ডান দিকেরটা রুইতন?’
‘যে লোকটা গতকাল জুরিখ ফিল্ড থেকে আমাদের সাথে এসেছিলো যে লোকটা আপনার সাথে মোরাটোরিয়ামে অপেক্ষা করছিলো।’
‘যার পরনে ছিলো সবুজ ফেল্টের নিকার, ধূসর রঙের গলফ মোজা, ব্যাজারের চামড়ার বুক খোলা ছোট এবং নকল চামড়ার পাম্প সু?’
‘তার পরনে কী ছিলো সেটা দেখতে পারিনি। ভিডস্ক্রিনে শুধু তার মুখটা দেখেছি।’
‘ও কি এমন কোনো গুপ্তসংকেত বলেছে যা শুনে আমি নিশ্চিত হতে পারবো যে ও আসলেই সে?’
মোরাটোরিয়ামের অধিকারী বিরক্ত হয়ে বললো, ‘সমস্যাটা কোথায় আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, মি. চীপ। যে লোকটা ভিডফোনে নিউ ইয়র্ক থেকে আমার সাথে কথা বলেছে সেই একই লোক গতকাল আপনার সাথে এসেছিলো।’
‘আপনার সাথে যেতে বলছেন, আপনার চপারে উঠতে বলছেন, এত বেশি ঝুঁকি আমি নিতে পারবো না,’ জো বললো। হয়তো রে হোলিস আপনাকে পাঠিয়েছে। এই রে হোলিসই মি. রানসাইটারকে খুন করেছে।’
ভন ভলসাঙের চোখদুটো দেখে মনে হলো যেন কাচের বোতাম। ‘আপনি কি প্রুডেন্স সোসাইটির কাছে বিষয়টা জানিয়েছেন?’
‘জানাবো। সময়মতো সবই জানাবো। কিন্তু তার আগে হোলিস যেন আমাদের উপর আবার হামলা না করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদে সে আমাদের সবাইকে খুন করতে চেয়েছিলো।’
‘আপনার নিরাপত্তার প্রয়োজন,’ মোরাটোরিয়ামের অধিকারী বললো। ‘আমার পরামর্শ হলো, এই মুহূর্তে জুরিখ পুলিশকে ফোন করুন। ওরা আপনার সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে, আপনি নিউ ইয়র্কের পথে রওয়ানা না হওয়া পর্যন্ত। আর আপনি নিউ ইয়র্কে পৌঁছানোমাত্র—’
‘আগেই বলেছি, আমার ফোন নষ্ট। ঐ ফোন থেকে আমি শুধু গ্লেন রানসাইটারকে কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। আর তাই কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না।’
‘তাই নাকি? খুবই অস্বাভাবিক।’ মোরাটোরিয়াম অধিকারী কামরায় প্রবেশ করলো। ‘আমি একবার শুনতে পারি?’ প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফোনের রিসিভার তুলে নিলো সে।
‘এক পসক্রিড,’ জো বললো।
আলখাল্লার পকেট হাতড়ে অনেকগুলো ধাতব মুদ্রা বের করলো মোরাটোরিয়ামের অধিকারী। উড়োজাহাজের প্রপেলারের মতো টুপিটা বিরক্তিকরভাবে ঘুরছে মাথার উপর। জোয়ের হাতে তিনটা কয়েন দিলো সে।
‘এখানে এক কাপ কফির যে দাম, আমি শুধু সেটাই আপনার কাছ থেকে নিচ্ছি,’ জো বললো। ‘দামটা এর বেশি হওয়ার কথা না।’ এই কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়লো, সকালের নাস্তা করা হয়নি তার। আর এই অবস্থাতেই ইলার মুখোমুখি হতে হবে। তবে কফির বদলে সে একটা অ্যাম্ফিটামিন নিতে পারে; হোটেল কর্তৃপক্ষ হয়তো বিনামূল্যে সেটা দেবে, সৌজন্যতা হিসেবে।
রিসিভার শক্ত করে কানে ধরে ভন ভলসাঙ বললো, ‘আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না। এখন হালকা একটা স্থির শব্দ শোনা যাচ্ছে। যেন ভেসে আসছে অনেক দূর থেকে। ভীষণ অস্পষ্ট।’ রিসিভার জোয়ের দিকে বাড়িয়ে দিলো। সেটা কানে নিয়ে জো নিজেও শুনলো।
জো নিজেও শুনতে পাচ্ছে অনেক দূর থেকে ভেসে আসা স্থির শব্দ। তার মনে হলো যেন হাজার হাজার মাইল দূর থেকে ভেসে আসছে। অদ্ভুত! ব্যাপারটা রানসাইটারের কণ্ঠস্বর শোনার মতোই হতবুদ্ধিকর—যদি আসলেই সেটা রানসাইটারের কণ্ঠস্বর হয়ে থাকে আর কি। ‘আপনার পসক্রিড আমি ফিরিয়ে দেবো,’ রিসিভার নামিয়ে রাখার সময় বললো জো।
‘বাদ দিন,’ ভন ভলসাঙ বললো।
‘কিন্তু আপনি তো রানসাইটারের কণ্ঠস্বর শুনতে পাননি।’
‘চলুন মোরাটোরিয়ামে যাওয়া যাক। মি. হ্যামন্ড অনুরোধ করেছেন।’
‘আল হ্যামন্ড আমার কর্মচারী,’ জো বললো। ‘প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে সেটা নির্ধারণ করি আমি। ইলার সাথে কথা না বলেই নিউ ইয়র্কে ফিরে যাবো। আমার মতে, সোসাইটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সবকিছু জানানোই এখন আমাদের প্রথম দায়িত্ব। আমাদের সব ইনার্শিয়াল জুরিখ ছেড়ে চলে যেতে পেরেছে কি না সেটা কি আল হ্যামন্ড নিশ্চিত করেছে?’
‘যে মেয়েটা রাতে আপনার সাথে এই হোটেলে ছিলো সে বাদে সবাই।’ বিস্মিত হয়ে কামরার চারপাশে তাকালো মোরাটোরিয়াম অধিকারী। নিঃসন্দেহে অবাক হয়ে ভাবছে মেয়েটা গেল কোথায়। তার অদ্ভুত মুখে উদ্বেগের ছায়া। ‘ও এখানে নেই?’
‘কোন মেয়েটা?’ জো জিজ্ঞেস করলো। তার মনোবল এরই মধ্যে নিম্নতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। মনের একেবারে গভীরে বাসা বাঁধছে একটা ভয়।
‘মি. হ্যামন্ড সেটা বলেননি। ধরে নিয়েছেন আপনি জানেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তার নাম আমাকে জানানো হতো অদূরদর্শিতার পরিচয়। মেয়েটা কি—’
‘কেউ আসেনি।’ কে হতে পারে? প্যাট কনলি? নাকি ওয়েন্ডি? হোটেল কামরায় অস্থিরভাবে পায়চারি শুরু করলো সে, মনের ভয় তাড়ানোর চেষ্টা করছে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন প্যাটই হয়।
‘ক্লজেটে দেখুন,’ ভন ভলসাঙ বললো।
‘কী?’ পায়চারি থামালো সে।
‘হয়তো একবার ওখানে দেখা উচিত। এই ধরনের ব্যয়বহুল আর বিলাসবহুল কামরায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বড় ক্লজেট থাকে।’ ক্লজেটের বোতাম চাপলো জো; স্প্রিঙের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে গেল।
ক্লজেটের মেঝেতে গাদা করা একটা স্তূপ; শুষ্ক, প্রায় মমিতে পরিণত হয়েছে, শুয়ে আছে কোঁকড়ানো ভঙ্গিতে। ক্ষয়প্রাপ্ত ছিন্ন অংশগুলো, যা একসময় পোশাক ছিলো, বেশিরভাগ অংশ ঢেকে রেখেছে। যেন ধাপে ধাপে বহু বছর ধরে পোশাকের যা অবশিষ্ট আছে সেই রূপ ধারণ করেছে। সামনে ঝুঁকলো সে বস্তুটাকে ঘোরালো সে। ওজন মাত্র কয়েক পাউন্ড। তার হাতের ধাক্কায় ভাঁজ করা হাড়গুলো এক ঝটকায় সোজা হয়ে গেল পাতলা কাগজের মতো। চুল অস্বাভাবিক লম্বা; তারের মতো জট পাকানো, কালো চুলের মেঘ বস্তুটার মুখ আড়াল করে রেখেছে। উপুড় হয়ে বসে পড়লো জো, নড়ছে না। হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে এলো, দেখতে চাইছে না ওটা আসলে কে।
ভন ভলসাঙের গলা শুনে মনে হলো তার দম আটকে গেছে, ফ্যাঁসফ্যাঁসে কণ্ঠে বললো, ‘অনেক পুরোনো। একেবারে শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন শত শত বছর ধরে ওখানে পড়ে আছে। আমি নিচে যাচ্ছি, ম্যানেজারকে বলতে হবে।’
‘এটা পূর্ণ বয়স্ক কোনো মেয়ে হতে পারে না,’ জো বললো। হতে পারে কোনো শিশুর অবশিষ্টাংশ; কাঠামোটা অনেক ছোট। ‘প্যাট বা ওয়েন্ডি হতে পারে না,’ সে বললো, তারপর মুখের উপর থেকে চুল সরালো। ‘মনে হচ্ছে যেন জ্বলন্ত উনুনের মধ্যে ছিলো, দীর্ঘ সময় ধরে গনগনে আগুনের মাঝে ছিলো।’ বিস্ফোরণ, ভাবলো সে। বোমার তীব্র উত্তাপ।
তারপর কুঞ্চিত, আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ছোট মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলো চুপচাপ। সে জানে এই দেহটা কার। কষ্ট হলেও সে চিনতে পারলো।
ওয়েন্ডি রাইট।
রাতের কোনো এক সময় কামরায় আসে ওয়েন্ডি, যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে জো। আর ঐ সময়েই ওয়েন্ডির শরীরের ভেতর অথবা তার চারপাশে কিছু একটা ঘটতে শুরু করে। সেটা বুঝতে পেরে হামাগুড়ি দিয়ে ক্লজেটের ভেতরে গিয়ে লুকায় সে, সেজন্যই জো কিছুই জানতে পারেনি ওয়েন্ডির জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টায়—অথবা হয়তো কয়েক মিনিটে; সে আশা করলো কয়েক মিনিটই হবে—সেই রহস্যময় কিছু একটা তাকে গ্রাস করে নেয়। কিন্তু ওয়েন্ডি কোনো শব্দ করেনি। তার ঘুম ভাঙায়নি। অথবা চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু আমাকে জাগাতে পারেনি, আমার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি, জো ভাবলো। সম্ভবত ওয়েন্ডি আমাকে জাগানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ক্লজেটে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, ব্যাপারটা যেন খুব দ্রুত ঘটে থাকে।
‘আপনি কিছু করতে পারবেন না?’ ভন ভলসাঙকে জিজ্ঞেস করলো সে। ‘আপনার মোরাটোরিয়ামে…’
‘অনেক দেরি হয়ে গেছে। অর্ধ-জীবনের আর কিছু অবশিষ্ট নেই, এই রকম দীর্ঘদিন ধরে ক্ষয় হয়ে যাওয়া শুষ্ক দেহ নিয়ে কিছু করা যাবে না। ও… সেই মেয়েটা?’
‘হ্যাঁ,’ সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো জো।
‘আপনার হোটেল ত্যাগ করা উচিত। এই মুহূর্তে। আপনার নিরাপত্তার জন্য। হোলিস—এটা হোলিসের কাজ, তাই না?—আপনারও একই অবস্থা করবে।’
‘আমার সিগারেটগুলো একেবারে শুকিয়ে ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছিলো,’ জো বললো। ‘মহাকাশযানে দুই বছরের পুরোনো ফোন বুক। পচে টক হয়ে যাওয়া ক্রিম আর ছাতাপড়া কফি। অচল হয়ে যাওয়া মুদ্রা।’ সব একসূত্রে গাঁথা: সময়। ‘চাঁদে এই কথাটাই বলেছিলো ওয়েন্ডি, বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে মহাকাশযানে ফিরে আসার পর। সে বলেছিলো, “নিজেকে আমার বৃদ্ধ মনে হচ্ছে।”’ ভয় নিয়ন্ত্রণ করতে করতে জো ভাবছে, পুরো ব্যাপারটা এখন সত্যিই তীব্র আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ফোনে রানসাইটারের কন্ঠস্বর… সেটার অর্থ কী?
ঘটনাগুলোর মাঝে কোনো ধরনের যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছে না সে, সবকিছুই কেমন অর্থহীন। ভিডফোনে রানসাইটারের কণ্ঠস্বরের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই তার কাছে, এমনকি সে কিছু কল্পনাও করতে পারছে না।
‘বিকিরণ,’ ভন ভলসাঙ বললো। ‘মনে হচ্ছে সে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে ছিলো, সম্ভবত বেশ কয়েক দিন আগে। সত্যি বলতে কী, ব্যাপক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা।’
জো বললো, ‘আমার ধারণা, বিস্ফোরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। যে বিস্ফোরণ রানসাইটারকে হত্যা করেছে সেটাই।’ কোবাল্ট পার্টিক্যাল, আপনমনে বললো সে। উত্তপ্ত ধোঁয়া ওকে ঘিরে রেখেছিলো, আর নিঃশ্বাসের সাথে সেই ধোঁয়া ওর দেহে প্রবেশ করে। তার মানে, আমাদের সকলেরই এমন কষ্টদায়ক মৃত্যু হবে। এই উত্তপ্ত ধোঁয়া নিঃসন্দেহে আমাদের দেহেও প্রবেশ করেছে। আমার নিজের ফুসফুসেও সেটা আছে। আছে আলের দেহে, বাকি সব ইনার্শিয়ালদের দেহে। সুতরাং, আর কিছুই করার নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। বুঝতে পারলো, এমন কিছু যে হতে পারে সেটা তারা মোটেও ভাবেনি। আমরা চিন্তাও করিনি যে বিস্ফোরণে অতি ক্ষুদ্ৰ পারমাণবিক বিক্রিয়া থাকতে পারে।
অবাক হওয়ার কিছু নেই যে হোলিস আমাদের পালানোর সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু তারপরেও—
ওয়েন্ডির মৃত্যু আর শুকিয়ে মচমচে হয়ে যাওয়া সিগারেটের ব্যাখ্যা এটা হতে পারে। কিন্তু পুরোনো ফোন বুক, বাতিল হয়ে যাওয়া মুদ্রা, নষ্ট হয়ে যাওয়া কফির ব্যাখ্যা এটা হতে পারে না মোটেও।
এই তত্ত্বে রানসাইটারের কণ্ঠস্বরেরও কোনো ব্যাখ্যা নেই। হোটেল কামরার ভিডফোনে একটানা স্বগতোক্তি, ভন ভলসাঙ রিসিভার তোলার পর যা থেমে গিয়েছিলো। অন্য যে-কেউ শোনার চেষ্টা করলেই থেমে যাবে, এখন বুঝতে পারছে সে।
আমাকে নিউ ইয়র্কে ফিরতে হবে, নিজেকে বোঝালো সে। আমাদের সবাইকে যারা চাঁদে গিয়েছিলো। আমাদের সবাইকে যারা বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার সময় ওখানে ছিলো। আমাদের সবাইকে একজোট হয়ে এই বিপদের মোকাবেলা করতে হবে। সত্যি বলতে কী, এটাই হয়তো একমাত্র উপায় এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার। ওয়েন্ডির মতো করে আমাদের বাকি সবাই মারা যাওয়ার আগে। অথবা তার চেয়েও ভয়ংকরভাবে, যদি এর চেয়েও ভয়ংকর কিছু থেকে থাকে।
‘হোটেল ম্যানেজারকে বলুন একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ দিতে,’ মোরাটোরিয়াম মালিককে নির্দেশ দিলো সে। ‘ঐ ব্যাগে করে ওয়েন্ডির মৃতদেহ আমি নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাবো।’
‘এটা এখন পুলিশের বিষয়, তাই না? এই রকম বীভৎস হত্যাকাণ্ড, ওদেরকে জানানো উচিত।’
‘আমাকে ব্যাগটা এনে দিন,’ জো বললো।
‘ঠিক আছে। সে আপনার কর্মচারী।’ মোরাটোরিয়ামের অধিকারী ম্যানেজারের খোঁজে চলে গেল।
‘একসময় ছিলো,’ জো বললো। ‘এখন আর নেই।’ আমার অধীনে এটা তার প্রথম কাজ হওয়ার কথা ছিলো, আপনমনে বললো সে। হয়তো এটাই ভালো হয়েছে। ওয়েন্ডি, আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি আমার সাথে। তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু যেভাবে পরিকল্পনা করেছিলে সেভাবে কিছু হলো না।
***
খাঁটি ওক কাঠের তৈরি বিশাল কনফারেন্স টেবিলের চারপাশে নিশ্চুপ বসে আছে ইনার্শিয়ালরা। নীরবতা ছিন্ন করে আল হ্যামন্ড বললো, ‘আর কিছুক্ষণের মধ্যেই জোয়ের ফিরে আসার কথা।’ নিশ্চিত হওয়ার জন্য ঘড়ির দিকে তাকালো। দেখলো ঘড়ি বন্ধ হয়ে আছে।
‘এর মাঝে আমরা টিভিতে বিকালের সংবাদ দেখতে পারি এটা জানার জন্য যে রানসাইটারের মৃত্যুর সংবাদ হোলিস ফাঁস করেছে কি না,’ প্যাট কনলি বললো।
‘আজকের পেপ-এ সংবাদটা ছিলো না,’ এডি ডর্ন বললো।
‘টিভিতে সর্বশেষ সংবাদ পাওয়া যাবে,’ প্যাট বললো। আলের হাতে পঞ্চাশ সেন্টের একটা মুদ্রা দিলো যেটা দিয়ে টিভি চালু করা যাবে। বিশাল কনফারেন্স রুমের একপ্রান্তে পর্দার আড়ালে রাখা আছে টিভি সেট। চমৎকার একটা ত্রিমাত্রিক পলিফোনিক যন্ত্র, রানসাইটারের গর্বের বস্তু।
‘আমি কি স্লটে মুদ্রাটা ফেলবো, মি. হ্যামন্ড?’ স্যামি মুন্ডো আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করলো।
‘ঠিক আছে,’ বললো আল; গভীর চিন্তায় ডুবে ছিলো সে, ঐ অবস্থাতেই মুদ্রাটা মুন্ডোর দিকে ছুঁড়ে দিলো। লুফে নিয়ে টিভি সেটের দিকে এগোল মুন্ডো।
অস্বস্তির সাথে রানসাইটারের আইনজীবী ওয়াল্টার ডব্লিউ. ওয়েইলস চেয়ারে নড়েচড়ে বসলো। শিরা ওঠা সুগঠিত হাত দিয়ে তাল ঠুকলো ব্রিফকেসের উপর। ‘মি. চীপকে জুরিখে রেখে আসাটা আপনাদের ঠিক হয়নি। সে এখানে না আসা পর্যন্ত আমরা কিছুই করতে পারবো না, অথচ মি. রানসাইটারের উইল দ্রুত বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।’
‘উইল আপনি আমাদের পড়ে শুনিয়েছেন,’ আল বললো। ‘এবং জো চীপও আমাদের বলেছে। আমরা জানি, মি. রানসাইটার তার অবর্তমানে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য কাকে পছন্দ করে রেখেছেন।’
‘কিন্তু আইনগত দিক দিয়ে—’ ওয়েইলস বলার চেষ্টা করলো।
‘বেশি সময় লাগবে না,’ অনেকটা রুক্ষ সুরেই বললো আল। নিজের তৈরি করা তালিকার পাশে কলম দিয়ে দ্রুত কয়েকটা টান দিলো। অনেকটা অবচেতনভাবেই এই তালিকা তৈরি করেছে সে। তারপর আবার একবার পড়ে শোনালো।
> শুকিয়ে মুচমুচে হয়ে যাওয়া সিগারেট
> মেয়াদোত্তীর্ণ ফোন বুক
> অপ্রচলিত মুদ্রা
> পচে যাওয়া খাবার
> দিয়াশলাইয়ের বাক্সে বিজ্ঞাপন
‘এই তালিকাটা আবার তোমাদের কাছে দিচ্ছি,’ সবাইকে শুনিয়ে বললো সে। ‘দেখা যাক, এবার তোমরা এই পাঁচটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র বের করতে পারো কি না… অথবা এগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারো কি না। এই পাঁচটি বিষয়, যেগুলো—’ হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ নাড়লো সে।
‘অবাস্তব,’ জন ইড বললো।
প্যাট কনলি বললো, ‘প্রথম চারটার সাথে যোগসূত্র সহজেই লক্ষণীয়। কিন্তু দিয়াশলাইয়ের বাক্সের বিষয়টার সাথে বাকিগুলোর কোনো যোগসূত্র নেই। ওটা পুরোপুরিই খাপছাড়া।’
‘দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা আবার দেখি তো,’ হাত বাড়িয়ে বললো আল। প্যাট তার হাতে দিয়াশলাই বাক্সটা দিলো। বিজ্ঞাপনটা আরেকবার পড়লো আল।
> যোগ্যতা অর্জনকারীদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ!
> সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামের জনাব গ্লেন রানসাইটার আমাদের সরবরাহকৃত বিনামূল্যের সু কিটের মাধ্যমে এক সপ্তাহে দ্বিগুণ আয় করেছেন। আমাদের এই সু কিটে বিস্তারিতভাবে বলা আছে কীভাবে আপনি আপনার বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন এবং ব্যবসায়িক সহযোগীদের কাছে আমাদের প্রস্তুতকৃত খাঁটি চামড়ার অনুরূপ উপাদান দ্বারা বানানো লোফার বিক্রয় করতে পারবেন। জনাব রানসাইটার, যদিও তিনি অসহায়ের মতো হিমায়িত হয়ে আছেন কোল্ড-প্যাকে, আয় করেছেন চারশত—
পড়া থামালো আল; গভীর চিন্তায় ডুবে গেল, একইসাথে বুড়ো আঙ্গুলের নখ দিয়ে নিচের পাটির দাঁতে টোকা দিচ্ছে। হ্যাঁ, বিজ্ঞাপনটা আসলেই অন্য রকম। অন্যগুলো সব বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আর ক্ষয় হয়ে যাওয়ার সাথে জড়িত, কিন্তু এটা তা নয়।
‘আমি ভাবছি,’ সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো সে, ‘দিয়াশলাইয়ের বাক্সের এই বিজ্ঞাপনে যদি আমরা সাড়া দেই তাহলে কী হবে। এখানে ডি মোয়েন, আইওয়ার একটা বক্স নাম্বার দেওয়া আছে।’
‘বিনামূল্যে একটা সু কিট পাবো আমরা,’ প্যাট কনলি বললো। ‘বিস্তারিত তথ্যসংবলিত, যে কীভাবে আমরাও—’
‘হয়তো গ্লেন রানসাইটারের সাথে আমাদের যোগাযোগ হবে,’ আল বাধা দিয়ে বললো। ওয়াল্টার ডব্লিউ. ওয়েইলস-সহ টেবিলের সবাই তার দিকে ফিরে তাকালো। ‘আমি সত্যি কথাই বলছি। এই নাও,’ দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা টিপি জ্যাকসনের হাতে দিলো সে। ‘ওদেরকে এখনই একটা মেইল পাঠাও।’
‘কী বলবো?’ টিপি জ্যাকসন জিজ্ঞেস করলো।
‘শুধু কুপনটা পূরণ করে পাঠাও,’ আল বললো। এডি ডনকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি পুরোপুরি নিশ্চিত যে এই দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা গত সপ্তাহ থেকেই তোমার হাত ব্যাগে ছিলো? এমনও হতে পারে যে আজকেই ব্যাগে ঢুকিয়েছ তুমি?’
‘আমার ব্যাগে বুধবারেই অনেকগুলো দিয়াশলাইয়ের বাক্স রেখেছিলাম,’ এডি ডর্ন বললো। ‘তোমাকে তো বললামই যে আজকে এখানে আসার পথে সিগারেট ধরানোর সময় বিজ্ঞাপনটা আমার চোখে পড়ে। কোনো সন্দেহ নেই যে এই দিয়াশলাইয়ের বাক্স আমার ব্যাগে আমরা চাঁদে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই ছিলো। অনেক দিন আগে থেকে।’
‘এই বিজ্ঞাপনসহ?’ জন ইড জিজ্ঞেস করলো।
‘দিয়াশলাইয়ের বাক্সে কী লেখা থাকে সেটা আগে কখনো লক্ষ করিনি, শুধু আজকেই খেয়াল করলাম। একটা দিয়াশলাইয়ের বাক্সে কী লেখা থাকে সেদিকে আসলে কেউই কখনো খেয়াল করে না, তাই না?’
‘আসলেই কেউ লক্ষ করে না,’ ডন ড্যানি বললো। ‘তোমার কী মনে হয়, আল? রানসাইটারের কোনো ঠাট্টা? তার মৃত্যুর আগেই হয়তো ওগুলো ছাপিয়ে রেখেছিলো? অথবা হোলিস? একটা নির্মম রসিকতা—রানসাইটারকে সে হত্যা করবে এটা যেহেতু সে জানতোই? বিশেষ করে বিজ্ঞাপনটা যখন আমাদের চোখে পড়বে, রানসাইটার তখন কোল্ড-প্যাকে থাকবে, জুরিখে। ঠিক দিয়াশলাইয়ের বাক্সের বিজ্ঞাপনে যেমন বলা হয়েছে।’
টিটো অ্যাপাস্তাস বললো, ‘হোলিস কীভাবে জানবে যে রানসাইটারকে আমরা জুরিখেই নিয়ে যাবো, নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসবো না?’
‘কারণ ইলা ওখানেই আছে,’ ডন ড্যানি জবাব দিলো।
টিভি সেটের সামনে আলের দেওয়া পঞ্চাশ সেন্টের মুদ্রার দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে স্যামি মুন্ডো। তার অপরিপক্ব, ফ্যাকাশে কপাল কুঁচকে আছে বিস্ময়ে।
‘কী ব্যাপার, স্যাম?’ আল জিজ্ঞেস করলো। উদ্বেগে সোজা হয়ে বসলো সে। বুঝতে পারছে, নতুন কিছু একটা ঘটেছে।
‘পঞ্চাশ সেন্টের মুদ্রায় ওয়াল্ট ডিজনির ছবি থাকার কথা, তাই না?’ স্যামি জিজ্ঞেস করলো।
‘হয় ডিজনি,’ আল বললো, ‘অথবা যদি তার চেয়ে পুরোনো হয়, তাহলে ফিদেল ক্যাস্ট্রো। দেখি, আমাকে দেখতে দাও।’
‘আরেকটা অপ্রচলিত মুদ্রা,’ প্যাট বললো। স্যামি তখন পঞ্চাশ সেন্টের মুদ্রা নিয়ে আলের কাছে ফিরে আসছিলো।
‘না,’ মুদ্রাটা উলটে-পালটে দেখে আল বললো। ‘এটা গত বছরের। তারিখ অনুযায়ী কোনো সমস্যা নেই। পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য, যেকোনো যন্ত্রই এই মুদ্রা গ্রহণ করবে। এই টিভি সেটও গ্রহণ করবে।’
‘তাহলে সমস্যাটা কোথায়?’ এডি ডর্ন ত্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
‘স্যাম যা বলেছে ঠিক তাই,’ জবাব দিলো আল। ‘এটার গায়ে ভুল মাথা খোদাই করা।’ উঠে দাঁড়ালো সে। এডির কাছে গিয়ে মেয়েটার ঘামে ভেজা হাতে মুদ্রাটা দিলো। ‘তোমার কাছে চেহারাটা কার মতো মনে হচ্ছে?’
একটু সময় নিয়ে এডি বললো, ‘আমি—জানি না।’
‘অবশ্যই তুমি জানো,’ আল বললো।
‘ঠিক আছে, জানি,’ এডি কর্কশ সুরে বললো। ইচ্ছার বিরুদ্ধে জবাব দিতে গিয়ে আরো বেশি ভয় পাচ্ছে মেয়েটা। মুদ্রাটা আবার ফিরিয়ে দিলো, যেন কাঁপুনী দিয়ে ভয়ানক কিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করলো সে।
‘এটা রানসাইটারের ছবি,’ বিশাল টেবিল ঘিরে বসে থাকা সবার উদ্দেশে বললো আল।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর শোনা যায় কি যায় না এমন সুরে টিপি জ্যাকসন বললো, ‘তোমার তালিকায় এটাও যুক্ত করো।’
‘আমার কাছে মনে হচ্ছে দুটো প্রক্রিয়া সমান্তরালভাবে কাজ করছে,’ ধ্যানমগ্ন সুরে বললো প্যাট। এদিকে আল আবার নিজের চেয়ারে বসে কাগজের টুকরোয় লেখা তালিকায় নতুন ঘটনাটা যুক্ত করছে। ‘একটা হলো অধোগমন প্রক্রিয়া, আর এটাই সবচেয়ে অবশ্যম্ভাবী মনে হয়। এই ব্যাপারে আমরা একমত।’
‘অন্যটা কী?’ লেখা থেকে মাথা তুলে জিজ্ঞেস করলো আল।
‘আমি ঠিক নিশ্চিত না।’ প্যাটকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো। ‘তবে সেটার সাথে কোনো না কোনোভাবে রানসাইটারের যোগাযোগ আছে। আমার মনে হয় আমাদের কাছে যে মুদ্রা আছে সেগুলোও একবার দেখা দরকার, কাগজের নোটগুলোও। আমাকে আরো ভাবতে হবে।’
সবাই তাদের ওয়ালেট, হাতব্যাগ আর পকেট থেকে কয়েন আর কাগজের মুদ্রা বের করে আনলো।
‘আমার কাছে পাঁচ পসক্রিডের একটা নোট আছে,’ জন ইড বললো, ‘তাতে ইস্পাতে খোদাই করা মি. রানসাইটারের মুখমণ্ডলের চমৎকার অবয়ব। বাকিগুলো—’ হাতের মুদ্রাগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ‘ওগুলো স্বাভাবিক; সব ঠিক আছে। পাঁচ পসক্রিডের নোটটা কি দেখতে চান, মি. হ্যামন্ড?’
‘এরই মধ্যে আমি ওরকম দুটো পেয়েছি,’ আল বললো। ‘আর কেউ?’ টেবিলের চারপাশে দৃষ্টি বোলালো সে। ছয়টা হাত উপরে উঠলো। ‘আমাদের আটজনের কাছে তাহলে… কী বলা যায় এদের… রানসাইটার মানি আছে। অন্তত এখন পর্যন্ত। হয়তো বা দিনের শেষে সব অর্থই রানসাইটার মানিতে পরিণত হবে। খুব বেশি হলে দুই দিন লাগবে। যাই হোক, রানসাইটার মানি কাজ করবে। এটা দিয়ে যন্ত্রপাতি চালু করা যাবে এবং এটা দিয়ে আমরা আমাদের পাওনা পরিশোধ করতে পারবো।’
‘মনে হয় না,’ ডন ড্যানি বললো। ‘তোমার কেন মনে হচ্ছে এই অর্থ কাজ করবে? এটা, যেটাকে তুমি বলছো রানসাইটার মানি—’ হাতে ধরা একটা কাগজের নোটে টোকা দিলো সে। ‘এই মুদ্রা গ্রহণ করার কোনো বাধ্যবাধকতা কি ব্যাংকের আছে? এই মুদ্রা আইনসম্মতভাবে প্রচলিত কোনো মুদ্রা না; সরকার এটা প্রচলন করেনি। এটা হাস্যকর একটা মুদ্রা, মোটেও বাস্তব না।’
‘ঠিক আছে,’ যুক্তি দিয়ে বোঝানোর সুরে বললো আল। ‘হয়তো এটা বাস্তব না, হয়তো ব্যাংক এই মুদ্রা নিতে অস্বীকৃতি জানাবে। কিন্তু প্রশ্ন সেটা না।’
‘আসল প্রশ্ন হলো,’ বললো প্যাট কনলি, ‘দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটা, অর্থাৎ রানসাইটারের চেহারার এই প্রদর্শনী, সেটা কোন উপাদানের সমন্বয়ে সৃষ্ট?’
‘ঠিক তাই,’ ডন ড্যানি বললো। ‘অধোগমনের পাশাপাশি রানসাইটারের প্রদর্শনী হলো দ্বিতীয় প্রক্রিয়া। কিছু মুদ্রা একেবারেই অপ্রচলিত হয়ে গেল, আবার অনেক মুদ্রায় দেখা যাচ্ছে রানসাইটারের ছবি কিংবা আবক্ষ মূর্তি। তুমি জানো আমি কী ভাবছি? আমার ধারণা দুটো প্রক্রিয়া একে অপরের বিপরীত দিকে চলেছে। একটা যাচ্ছে হারিয়ে যাওয়ার দিকে, আক্ষরিক অর্থে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার দিকে। ওটা হলো প্রথম প্রক্রিয়া। দ্বিতীয়টা হলো অস্তিত্বে ফিরে আসা। কিন্তু এমন এক অস্তিত্বে যার কোনো অস্তিত্ব পূর্বে ছিলোই না।’
‘ইচ্ছাপূরণ,’ এডি ডর্ন অস্পষ্ট সুরে বললো।
‘হয়তো রানসাইটারের এরকম কোনো ইচ্ছা ছিলো,’ এডি বললো। ‘বৈধ মুদ্রার উপর নিজের চেহারা ছাপানো, আমাদের সকল ধরনের অর্থের উপর, এমনকি ধাতব মুদ্রার উপরও। কিন্তু কথা হচ্ছে… এটা একটু বেশিই হয়ে গেল না?’
‘আর দিয়াশলাইয়ের বক্সেরটাও, কী বলো?’ টিটো অ্যাপাস্তাস বললো।
‘উঁহু।’ মাথা ঝাঁকালো এডি। ‘ওটা মোটেও বাড়াবাড়ি না।’
‘আমাদের প্রতিষ্ঠান একাধিকবার দিয়াশলাইয়ের বাক্সে বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে,’ ডন ড্যানি বললো। ‘সেই সাথে টিভি, পত্রিকা আর ম্যাগাজিনে এবং ইমেইলের মাধ্যমে। আমাদের জনসংযোগ বিভাগ এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণত ব্যবসার এই দিকটা নিয়ে রানসাইটার মোটেও মাথা ঘামাতো না। আসলে দিয়াশলাইয়ের বাক্সে কী বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ ছিলো না তার। আর নিজের চেহারা দেখানোর খুব বেশি আগ্রহ যদি তার থাকতোই, তবে সেটা দেখাতো টিভিতে, কাগজের নোট কিংবা দিয়াশলাইয়ের বাক্সের উপরে নয়।’
‘হয়তো টিভিতে এই বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে,’ আল বললো।
‘ঠিক,’ প্যাট কনলি বললো। ‘আমরা চেষ্টা করেই দেখিনি। আমাদের কারোরই টিভি দেখার সময় ছিলো না।’
‘স্যামি,’ পঞ্চাশ সেন্টের মুদ্রাটা আবার ফিরিয়ে দিয়ে আল বললো, ‘টিভি চালু করো।’
‘বুঝতে পারছি না আমি আসলে দেখতে চাই কি না,’ এডি বললো। আর এদিকে স্যামি মুন্ডো স্লটে মুদ্রা ফেলে একপাশে দাঁড়িয়ে টিউনিং নব নিয়ে কসরত করছে।
কামরার দরজা খুলে গেল ঠিক ঐ মুহূর্তে। জো চীপ দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়। তার মুখ দেখে চমকে উঠলো আল।
‘টিভি বন্ধ করো,’ উঠে দাঁড়িয়ে বললো আল। সবাই তাকিয়ে দেখছে, আর সে জোয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। ‘কী হয়েছে, জো?’
কোনো জবাব দিলো না সে।
‘কী ব্যাপার?’
‘আমি একটা শিপ ভাড়া করে ফিরে এসেছি,’ খসখসে গলায় বললো জো।
‘তুমি আর ওয়েন্ডি?’
‘একটা চেক লিখে দাও,’ জো বললো। ‘শিপটা ছাদে আছে। ভাড়া দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় অর্থ আমার কাছে নেই।’
ওয়াল্টার ডব্লিউ. ওয়েইলসের উদ্দেশে আল বললো, ‘আপনি প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে দিতে পারবেন?’
‘এই ধরনের খরচের জন্য দিতে পারবো। আমি নিজে যাচ্ছি।’ ব্রিফকেস নিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল ওয়েইলস।
জো এখনো দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, নিশ্চুপ। আলের মনে হচ্ছে শেষবার দেখার পর থেকে জোয়ের বয়স একশো বছর বেড়ে গেছে। ‘আমার অফিসে চলো।’ টেবিলের দিক থেকে পেছন ফিরলো জো। চোখ পিটপিট করলো, দ্বিধাগ্রস্ত। ‘আমার… মনে হয় তোমার দেখা উচিত হবে না। ওকে যখন খুঁজে পাই, মোরাটোরিয়ামের লোকটাও তখন আমার সাথে ছিলো। সে বলে দিয়েছে কিছু করা সম্ভব না, অনেক দেরি হয়ে গেছে। পার হয়ে গেছে অনেকগুলো বছর।’
‘অনেকগুলো বছর?’ আল জিজ্ঞেস করলো। ভয়ের শীতল স্রোত কাঁপিয়ে দিলো তাকে।
‘নিচের তলায় আমার অফিসে এসো,’ জো বললো। পথ দেখিয়ে কামরা থেকে বের করে আনলো আলকে। তারপর হল পেরিয়ে এলিভেটরের কাছে। ‘ফিরে আসার সময় শিপ থেকে আমাকে স্নায়ু শান্ত করার ঔষধ দিয়েছে। ওটার দামও দিতে হবে। সত্যি বলতে কী, আমি এখন অনেক সতেজ বোধ করছি। বলা যায় যে আমি আসলে কিছুই অনুভব করছি না। ঔষধের প্রভাব কেটে গেলে হয়তো আবার আগের অনুভূতি ফিরে আসবে।’
এলিভেটর আসার পর দুজনেই একসাথে ভেতরে ঢুকলো। তিন তলায় জোয়ের অফিসে নেমে না আসা পর্যন্ত দুজনের কেউই কোনো কথা বললো না।
‘তোমাকে দেখার পরামর্শ আমি দেবো না,’ নিজের অফিসের দরজা খুলে জো বললো। আলকে নিয়ে ঢুকলো ভেতরে। ‘তোমার উপরই ছেড়ে দিলাম। যদি আমি সামলে নিতে পারি, হয়তো তুমিও পারবে।’ মাথার উপরে ঝুলে থাকা বাতি জ্বালালো সে।
হতবিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে কিছুক্ষণ পর আল বললো, ‘হে ঈশ্বর!’
‘খুলো না,’ জো বললো।
‘আমি খুলবো না! আজকে সকালে নাকি গতকাল রাতে?’
‘স্পষ্ট বোঝা যায়, ঘটনাটা অনেক আগেই ঘটেছে, এমনকি আমার কামরায় পৌঁছানোরও আগে। আমরা—মোরাটোরিয়ামের অধিকারী এবং আমি—করিডরে কাপড়ের টুকরো দেখেছিলাম। আমার কামরার দরজার দিকে এগিয়ে আসছিলো। কিন্তু সে তখনো জীবিত ছিলো নিঃসন্দেহে, অথবা প্রায় জীবিত, লবি পার হওয়ার সময়। যেভাবেই হোক, কেউ কিছু দেখেনি। অথচ ওরকম বড় একটা হোটেলে সবকিছুর উপর নজর রাখার জন্য আলাদা লোকবল থাকে। আসল কথা হচ্ছে, যেভাবেই হোক সে আমার কামরা পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলো—’
‘হ্যাঁ, তাতে বোঝা যাচ্ছে যে তার অন্তত হাঁটার ক্ষমতা ছিলো। যাই হোক, আমার সেরকমই মনে হচ্ছে।’
জো বললো, ‘আমি বাকি সবার কথা ভাবছি।’
‘কী ভাবছো?’
‘একই পরিণতি। আমাদেরও এই পরিণতি বরণ করতে হবে।’
‘কীভাবে?’
‘ওয়েন্ডির ক্ষেত্রে কীভাবে হয়েছে? বিস্ফোরণের কারণে। আমরা সবাই একজনের পর একজন একইভাবে মৃত্যুবরণ করবো। শেষ পর্যন্ত আমাদের কেউই আর অবশিষ্ট থাকবে না। আমরা পরিণত হবো প্লাস্টিক ব্যাগে ঢোকানো দশ পাউন্ড ওজনের চামড়া, পোশাক, চুল আর শুষ্ক হাড়ের একটা স্তূপে।’
‘ঠিক আছে,’ আল বললো। ‘কোনো এক অজানা শক্তি দ্রুততার সাথে অবক্ষয় ঘটিয়ে চলেছে। এই অশুভ শক্তি কাজ করছে ঠিক তখন থেকে—অথবা ঠিক ঐ মুহূর্তেই এর সূত্রপাত হয়েছিল—চাঁদে বিস্ফোরণের সাথে সাথে। সেটা আমরা ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছি। আমরা এটাও জানি যে, অন্তত ভাবছি যে আমরা জানি, আরেকটা শক্তি, একটা বিরোধী শক্তিও কাজ করে যাচ্ছে। ঘটনাপ্রবাহকে বিপরীত দিকে চালিত করছে। এমন একটা কিছু যা কোনো না কোনোভাবে রানসাইটারের সাথে জড়িত। হঠাৎ করেই আমাদের ওয়ালেট আর পকেটে থাকা মুদ্রায় তার ছবি দেখা যাচ্ছে। একটা দিয়াশলাইয়ের বাক্স—’
‘আমার ভিডফোনে ওর কণ্ঠস্বর শুনেছি,’ জো বললো। ‘হোটেলের কামরায়।’
‘ভিডফোনে? কীভাবে?’
‘আমি জানি না, কিন্তু ও ছিলো। পর্দায় নয়, দৃশ্যমান কোনো অংশেও নয়। ছিলো শুধুই তার কণ্ঠস্বর।’
‘কী বলেছে সে?’
‘নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি।’
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জোকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো আল। ‘তোমার কথা কি সে শুনতে পেয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলো অবশেষে।
‘না। আমি চেষ্টা করেছি। ওটা পুরোপুরি একমুখী ছিলো। আমি শুনছিলাম, ব্যস এইটুকুই।’
‘তার মানে সেজন্যই আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি।’
‘সেজন্যই।’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো জো।
‘তুমি যখন পৌঁছালে, আমরা তখন টিভি চালু করার চেষ্টা করছিলাম। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে কোনো পেপ-এ তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করা হয়নি। কী জঘন্য একটা অবস্থা।’ জো চীপের অবস্থা দেখে সন্তুষ্ট হতে পারলো না আল। তাকে মনে হচ্ছে আরো বয়স্ক, কৃশকায় আর অসম্ভব ক্লান্ত। এভাবেই কি শুরু হয়? রানসাইটারের সাথে আমাদের যোগাযোগ স্থাপন করতেই হবে, নিজেকে বোঝালো সে। শুধু তার কথা শুনতে পারাটাই যথেষ্ট নয়। বোঝাই যাচ্ছে সে আমাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু—
এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে বেঁচে থাকতে হলে আমাদেরকেই তার কাছে পৌঁছাতে হবে।
‘টিভিতে তার সংবাদ শুনে আমাদের কোনো লাভ হবে না,’ জো বললো। ‘ব্যাপারটা আবার ঠিক ফোনের মতোই হবে আগাগোড়া। যদি-না সে আমাদেরকে বলতে পারে পালটা যোগাযোগের উপায় কী। হয়তো সে আমাদেরকে বলতে পারবে, হয়তো সে জানে। হয়তো সে বুঝতে পারছে কী ঘটছে।’
‘তার নিজের কী ঘটেছে সেটা তাকে পরিষ্কার বুঝতে হবে। আর এই বিষয়টাই আমরা এখনো পরিষ্কার জানি না।’ কোনো না কোনোভাবে বেঁচে আছে সে, আল ভাবলো। যদিও মোরাটোরিয়াম তাকে জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই যে মোরাটোরিয়ামের অধিকারী আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকের জন্য। ‘ভন ভলসাঙ কি ফোনে তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলো?’ জোকে জিজ্ঞেস করলো সে।
‘ও শোনার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু প্রথমে লাইনে কোনো শব্দ ছিলো না। তারপর অস্পষ্ট গুঞ্জন, অনেক দূর থেকে ভেসে আসছিলো। আমি নিজেও শুনেছি। কিছুই না। পুরোপুরি অর্থহীন শব্দ। ভীষণ অদ্ভুত।’
‘আমার কাছে ভালো লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে না,’ আল বললো। সে নিজেও জানে না কেন। ‘যদি ভন ভলসাঙও ঐ কণ্ঠস্বর শুনতে পেতো, তাহলে আমি স্বস্তি পেতাম। তাহলে অন্তত নিশ্চিত হতে পারতাম যে ওখানে একটা কণ্ঠস্বর ছিলো, এবং ওটা তোমার অলীক কোনো কল্পনা ছিলো না।’ শুধু তোমার ক্ষেত্রেই না, আল ভাবলো, আমাদের ক্ষেত্রেও। যেমন ম্যাচবক্সের ঘটনা।
কিন্তু যা ঘটেছে তার সবকিছু নিঃসন্দেহে অলীক কল্পনা ছিলো না। যন্ত্রগুলো হঠাৎ প্রাচীন হয়ে যাওয়া মুদ্রা প্রত্যাখ্যান করেছে—বিভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি করা যন্ত্রসমূহ শুধু বাস্তব উপাদানেই সাড়া দেয়। মনস্তাত্ত্বিক উপাদানের কোনো ভূমিকা নেই এখানে। যন্ত্র কখনো কল্পনা করতে পারে না।
‘আমি এই ভবন ছেড়ে কিছুদিনের জন্য চলে যাচ্ছি,’ আল বললো। ‘এমন একটা শহরের কথা ভাবো, ছোট অথবা বড়, যার সাথে আমাদের কারোরই কোনো সম্পর্ক নেই, যেখানে আমরা কেউ কখনো যাইনি বা ভবিষ্যতে যাওয়ারও সম্ভাবনা নেই।’
‘বাল্টিমোর,’ ঝটপট বললো জো।
‘বেশ, আমি বাল্টিমোরে যাবো। দৈবচয়নে একটা দোকান বাছাই করে দেখবো সেখানে রানসাইটার মুদ্রা গ্রহণ করে কি না।’
‘আমাকে নতুন সিগারেট কিনে দিতে হবে,’ জো বললো।
‘ঠিক আছে। আমি সেটাও চেষ্টা করে দেখবো। এলোপাতাড়িভাবে পরীক্ষা করে দেখবো যে বাল্টিমোরের দোকানসমূহের সিগারেটগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে কি না। অন্যান্য পণ্যও পরীক্ষা করে দেখবো। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করবো আমি। তুমি কি আমার সাথে যেতে চাও, নাকি উপরে গিয়ে সবাইকে ওয়েন্ডির বিষয়টা জানাতে চাও?’
‘আমি তোমার সাথে যাবো,’ জো বললো।
‘ওয়েন্ডির ব্যাপারটা হয়তো তাদেরকে জানানোর প্রয়োজন নেই।’
‘আমার মনে হয় জানানো উচিত,’ জো বললো। ‘যেহেতু এই ঘটনা আবার ঘটবে। আমরা ফিরে আসার আগেই ঘটতে পারে। হয়তো এখনই ঘটছে।’
‘তাহলে বাল্টিমোরে আমাদের কাজ যত দ্রুত সম্ভব শেষ করে ফিরে আসতে হবে,’ আল বললো। অফিস কামরা থেকে বেরিয়ে এলো সে। তার পিছু নিলো জো।
