উবিক – ১

অধ্যায় ১

বন্ধুরা, স্টক ক্লিয়ারেন্সের জন্য শব্দহীন, বৈদ্যুতিক উবিক এখন পাওয়া যাচ্ছে বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, এই সুযোগ কেবল সীমিত সময়ের জন্য। এবং মনে রাখবেন: আমাদের প্রতিটি উবিক সংযুক্ত নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবহার করতে হবে।

.

৫ই জুন, ১৯৯২, রানসাইটার এসোসিয়েটসের সদর দফতর, নিউ ইয়র্ক। রাত ঠিক তিনটা ত্রিশ মিনিটে তাদের সোল সিস্টেম এর পর্দা থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিপ্যাথ এর অবস্থান মুছে যায়। ভিডফোন বাজতে শুরু করে সাথে সাথে। গত দুই মাসে হোলিসের অনেক পিএসআই—এর হদিস হারিয়ে ফেলেছে রানসাইটার কোম্পানি; কিন্তু আজ যাকে হারিয়েছে সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

‘মি. রানসাইটার? আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।’ ঐ রাতে পর্যবেক্ষণ কক্ষে দায়িত্বরত প্রকৌশলী ঘাবড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে খুক খুক করে কাশলো। কারণ গ্লেন রানসাইটারের চকচকে, বিশাল মাথা ধীরে ধীরে ভিডফোনের পর্দার পুরোটাই দখল করে নিয়েছে। ‘আমাদের একজন ইনার্শিয়াল খবরটা পাঠিয়েছে। একটু দেখে বলছি।’ দক্ষ হাতে ইনকামিং মেসেজ রেকর্ডার থেকে অগোছালো একগাদা টেপ বের করে আনলো সে। ‘মিস ডর্ন খবরটা পাঠিয়েছে। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, মিস ডর্ন তাকে অনুসরণ করে ইউটাহ—এর গ্রিন রিভার পর্যন্ত গিয়েছিলো যেখানে—’

ঘুম জড়ানো ক্লান্তিতে রানসাইটার কিছুটা বিরক্ত। ‘কে? কোন ইনার্শিয়াল কখন কোন টিপ অথবা কোন প্রিকগকে অনুসরণ করছে সেটা সব সময় আমার মনে থাকার কথা না,’ তারের মতো শক্ত, ধূসর আর এলোমেলো চুলগুলো এক হাতে একটু বিন্যস্ত করার চেষ্টা করতে করতে বললেন তিনি। ‘বাড়তি কথা না বলে সরাসরি বলো এবার হোলিসের কোন এজেন্ট নিখোঁজ হয়েছে।’

‘এস. ডোল মেলিপন,’ জবাব দিলো প্রকৌশলী।

‘কী? মেলিপন নিখোঁজ? তুমি ঠাট্টা করছো?’

‘আমি ঠাট্টা করছি না,’ প্রকৌশলী নিশ্চিত করলো তাকে। ‘এডি ডর্ন এবং আরো দুজন ইনার্শিয়াল তাকে বন্ডস অব ইরোটিক পলিমর্ফিক এক্সপেরিয়েন্স নামের একটা মোটেল পর্যন্ত অনুসরণ করে। ওটা আসলে ষাট ইউনিটের একটা সাব-সার্ফেস প্রমোদকেন্দ্র যেখানে বিত্তবান মানুষেরা সঙ্গী নিয়ে ফুর্তি করতে যায়। এডি এবং বাকি দুজন ভেবেছিলো যে মেলিপন ঐ মুহূর্তে সক্রিয় ছিলো না। তারপরেও অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে আমাদের নিজস্ব একজন টেলিপ্যাথকে পাঠাই, মি. জি. জি. অ্যাশউড। ভেতরে প্রবেশ করেই সে মেলিপনের মনক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পায় একাধিক শক্তিশালী নমুনা মেলিপনের মনক্ষেত্রকে ঘিরে আছে, আর তাই সে কিছু করতে পারেনি। তখন সে আবার ক্যানসাসের টপিকাতে ফিরে যায়। ওখানে নতুন একজনকে নিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে।’

রানসাইটার এখন পুরোপুরি সজাগ। সিগারেট ধরালেন একটা, হাতের উপর থুতনি রেখে গম্ভীর মুখে চুপচাপ বসে আছেন। তার সামনে দ্বিমুখী যোগাযোগ যন্ত্রের স্ক্যানার ঘিরে সিগারেটের ধোঁয়া পাক খেয়ে উঠে যাচ্ছে উপরে। ‘মেলিপনই যে ঐ টিপ, এই ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত? সে দেখতে কেমন সেটা কারো জানার কথা নয়। প্রতি মাসে নতুন নতুন ছদ্মবেশ নিয়ে চলাফেরা করতো সে। তার শক্তিক্ষেত্রের কী অবস্থা?’

‘বন্ডস অব ইরোটিক পলিমর্ফিক এক্সপেরিয়েন্স মোটেলে উৎপন্ন হওয়া শক্তিক্ষেত্রের অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ পরিমাপ করার জন্য জো চীপকে ওখানে পাঠিয়েছিলাম। চীপ আমাদের জানায় যে নমুনাটা তালিকাভুক্ত, সর্বোচ্চ মাত্রার ৬৮.২ বিএলআর ইউনিট টেলিপ্যাথিক তরঙ্গ, এবং আমাদের পরিচিত সকল টেলিপ্যাথদের মধ্যে একমাত্র মেলিপনই এমন সর্বোচ্চ মাত্রার শক্তিক্ষেত্র উৎপাদন করতে পারে,’ প্রকৌশলী তার কথা শেষ করলো। ‘অর্থাৎ, পর্দার ঠিক ঐ নির্দিষ্ট স্থানেই মেলিপনের পরিচয়বাহী নিশানা স্থবির হয়ে থাকে। আর এখন সে—ওটা—অদৃশ্য হয়ে গেছে পুরোপুরি।’

‘পর্দার চারদিকে খুঁজে দেখেছ ভালোমতো?’

‘ইলেকট্রনিক্যালি ওটা আর নেই। ওটা যে মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতো, সেই মানুষ আর পৃথিবীতে নেই, এবং যতদূর বুঝতে পারছি আমরা, পৃথিবীর বাইরের উপনিবেশগুলোর কোনোটাতেও নেই।’

‘আমার মৃত স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করতে হবে,’ বললেন রানসাইটার। ‘এখন মাঝরাত। মোরাটোরিয়াম এখন বন্ধ থাকবে।’

‘সুইজারল্যান্ডে থাকে না,’ বিদঘুটে হাসি দিয়ে বললেন রানসাইটার, যেন এই মাঝরাতে তার গলা দিয়ে তিক্ত তরল নামছে। ‘ঠিক আছে, বিদায়।’ বলেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলেন তিনি।

***

তিনি নিজেই যেহেতু বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামের মালিক, তাই নিজের গরজেই হার্বার্ট সোয়েনহেইট ভন ভলসাঙ কর্মচারীরা আসার আগেই অফিসে চলে আসেন। আর ঠিক এই মুহূর্তে হিমশীতল আড়মোড়া দিয়ে মোরাটোরিয়াম ভবনটা যখন সবেমাত্র জেগে উঠতে শুরু করেছে, তখন অভ্যর্থনা কক্ষের সামনে উদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে অপেক্ষা করছে কেরানি গোছের এক লোক। লোকটার চোখে প্রায় স্বচ্ছ চশমা, পরনে ট্যাবি ফার এর ডোরাকাটা পশমি কোট, পায়ে সুচালো ডগার হলুদ জুতো, হাতে একটা দাবিপত্র। সন্দেহ নেই, আজকের এই ছুটির দিনে সে তার স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছে। পুনরুত্থান দিবস একটা বিশেষ দিন, যে দিন অর্ধজীবিতদের অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে সম্মান জানানো হয়—যারা সারিবদ্ধভাবে শায়িত আছে ঠিক বিপরীত প্রান্তে; খানিক পরেই ভবনটা মুখর হয়ে উঠবে মানুষের পদচারণায়।

‘জি, স্যার,’ অমায়িক হাসি দিয়ে বললেন হার্বার্ট। ‘আমি নিজে আপনার বিষয়টা দেখছি।’

‘উনি একজন বয়স্ক মহিলা।’ নিশ্চিত হতে চাইলো গ্রাহক। ‘প্রায় আশি বছর, শুষ্ক আর রুগ্‌ণ, আমার দাদি।’

‘এখনই ব্যবস্থা হয়ে যাবে,’ বললেন হার্বার্ট। কোল্ড-প্যাক বিনগুলোর দিকে এগিয়ে গেলেন। খুঁজে বের করলেন ৩০৫৪০৩৯-বি ক্রমিক নাম্বার। তারপর বিনের সাথে যুক্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে চোখ বোলালেন। অর্ধ-জীবনের মাত্র পনেরো দিন বাকি আছে। খুবই অল্প সময়, আপনমনে বললেন তিনি। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা, তাই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিনের স্বচ্ছ কিন্তু হালকা প্লাস্টিক আবরণের সাথে যুক্ত বহনযোগ্য প্রোটোফেশন অ্যামপ্লিফায়ার চালু করলেন, বেছে নিলেন সঠিক তরঙ্গ, তারপর মনোযোগ দিয়ে অর্ধ-জীবিতের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বোঝার চেষ্টা করলেন।

স্পিকারে শোনা গেল অত্যন্ত ক্ষীণ একটা কণ্ঠস্বর, ‘…তখন টিলির পা মচকে গেল, আর আমরা ভেবেছিলাম সে আর কখনো সুস্থ হবে না। ব্যাপারটা সে মানতেই চাইছিলো না, বরং তখনই হাঁটা শুরু করতে চেয়েছিলো…’

সন্তুষ্ট হয়ে অ্যামপ্লিফায়ার খুলে রাখলেন তিনি। তারপর একজন ইউনিয়ন ম্যানকে দায়িত্ব দিলেন ৩০৫৪০৩৯-বি নাম্বারকে কনসাল্টেশন লাউঞ্জে নিয়ে যাওয়ার বাকি কাজটুকু সম্পন্ন করার জন্য, যেখানে গ্রাহককে তার বৃদ্ধা স্বজনের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হবে।

‘আপনি তাকে ভালো করে দেখেছেন, তাই না?’ বকেয়া পসক্রিড পরিশোধের সময় জিজ্ঞেস করলো গ্রাহক।

‘আমি ভালো করেই দেখেছি,’ জবাব দিলেন হার্বার্ট। ‘সবকিছু কাজ করছে নিখুঁতভাবে।’ দ্রুত কয়েকটা বোতাম চাপলেন তিনি, তারপর পিছিয়ে এলেন। ‘শুভ পুনরুত্থান দিবস, স্যার।’

‘ধন্যবাদ,’ কফিনের মুখোমুখি বসে জবাব দিলো গ্রাহক। কোল্ড প্যাকের অভ্যন্তরে বাষ্প ঘনীভূত হতে শুরু করেছে; কানে একটা ইয়ারফোন গুঁজে মাইক্রোফোনে কথা বলা শুরু করলো গ্রাহক। ‘ফ্লোরা, আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? সম্ভবত আমি শুনতে পাচ্ছি তোমাকে। ফ্লোরা?’

যখন আমার মৃত্যু হবে, হার্বার্ট সোয়েনহেইট ভন ভলসাঙ আপনমনে কথা বলছেন, আমাকে যেন প্রতি একশো বছরে একবার পুনরুজ্জীবিত করা হয়, এমন একটা নির্দেশনা বংশধরদের জন্য হয়তো রেখে যাওয়া উচিত আমার। আর এভাবে মানব জাতির ভাগ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় দেখতে পারবো আমি। কিন্তু তার অর্থ হচ্ছে, বংশধরদের উপর দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া আর সেটার ফলাফল কী হতে পারে তাও তিনি ভালো করেই জানেন। একসময় না একসময় বংশধরেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে, তার দেহ বের করে আনবে কোল্ড-প্যাক থেকে এবং—ঈশ্বর ক্ষমা করুন—তাকে মাটির নিচে সমাহিত করবে।

‘মাটির নিচে সমাহিত করা অত্যন্ত বর্বর একটা নিয়ম,’ সশব্দে বললেন হার্বার্ট। ‘বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সমাজ আর সংস্কৃতির অবশিষ্টাংশ।’

‘ঠিক বলেছেন, স্যার,’ টাইপরাইটারে কাজ করতে করতে তার সহকারী বললো।

কনসাল্টেশন লাউঞ্জে অনেক মানুষ তাদের অর্ধ-জীবিত স্বজনদের সাথে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। অর্ধ-জীবিতদের রাখা হয়েছে আলাদা আলাদা কাসকেটে, নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর। এই অনুগত মানুষগুলোর এখানে আসাটা খুবই প্রশান্ত আর পবিত্রতম একটা দৃশ্য। এবং এরা প্রায়ই আসে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। পরিবারের খবরাখবর নিয়ে আসে তারা, বাইরের দুনিয়ায় কী হচ্ছে, সেই সংবাদ পৌঁছে দেয় এদের কাছে; মস্তিষ্ক ক্রিয়াকলাপের নাতিদীর্ঘ সক্রিয়তার সময় জীবিতরা মনমরা আর বিষণ্ণ অর্ধ-জীবিতদের নানাভাবে আনন্দ দেওয়ার এবং উজ্জীবিত করার চেষ্টা করে। আর সেজন্য তারা হার্বার্ট সোয়েনহেইট ভন ভলসাঙকে বেশ ভালো পরিমাণের অর্থকড়িও দেয়। এই মোরাটোরিয়াম চালানোটা আসলে অত্যন্ত লাভজনক একটা ব্যবসা।

‘আমার বাবাকে কিছুটা দুর্বল মনে হচ্ছে,’ এক তরুণ হার্বার্টের মনোযোগ আকর্ষণ করে বললো। ‘দয়া করে একটু দেখবেন? ভীষণ উপকার হয় তাহলে।’

‘নিশ্চয়ই,’ বললেন হার্বার্ট, গ্রাহককে সাথে নিয়ে লাউঞ্জের অন্য পাশে তার পরলোকগত স্বজনের কাছে এসে দাঁড়ালেন। সংযুক্ত প্রতিবেদনে দেখলেন অর্ধ-জীবনের হাতে গোনা কয়েকটা দিন বাকি আছে মাত্র; আর তাতেই মস্তিষ্ক সক্রিয়তার দুর্বলতার কারণ বুঝে গেলেন তিনি। কিন্তু তারপরেও… প্রোটোফেশন অ্যামপ্লিফায়ার আরেকটু জোরালো করলেন, অনেকটাই স্পষ্ট হলো অর্ধ-জীবিতের কণ্ঠ। এই মানুষটি চূড়ান্ত সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে প্রায়, মনে মনে ভাবলেন হার্বার্ট। স্পষ্ট বুঝতে পারলেন যে প্রতিবেদনে কী লেখা আছে সেটা দেখার কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি সন্তান, পিতার সাথে যোগাযোগের যে চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে সেটা জানারও কোনো চেষ্টা করেনি। আর তাই হার্বার্ট কিছু বললেন না, অফিসের দিকে ফিরে চললেন, পুত্রকে রেখে গেলেন পিতার সাথে কথা বলার জন্য। আজকের সাক্ষাৎই যে পিতা-পুত্রের শেষ সাক্ষাৎ হতে পারে, এই কথা ওকে জানানোর কী দরকার? কয়েক দিন পর এমনিতেই জানতে পারবে।

মোরাটোরিয়ামের শেষ প্রান্তের লোডিং প্ল্যাটর্মে একটা ট্রাক উদিত হলো; দুজন লোক লাফ দিয়ে নামলো সেটা থেকে, পরিচিত ফ্যাকাশে নীল ইউনিফর্ম পরনে। অ্যাটলাস ইন্টারপ্ল্যান ভ্যান অ্যান্ড স্টোরেজ, হার্বার্ট ধারণা করলেন। এইমাত্র জীবনের আলো নিভে যাওয়া কোনো অর্ধ-জীবিতকে বয়ে নিয়ে এসেছে, অথবা এসেছে মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া কোনো অর্ধ-জীবিতকে শেষ যাত্রায় নিয়ে যেতে। অলস পায়ে সেদিকে হাঁটতে শুরু করলেন, যাই হোক সেটা তদারকির জন্য; আর ঠিক ঐ মুহূর্তেই ফোন করলো তার সহকারী। ‘হের সোয়েনহেইট ভন ভলসাঙ, দুঃখিত আপনাকে বিরক্ত করার জন্য, কিন্তু একজন গ্রাহক তার স্বজনকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আপনার সহযোগিতা চান।’ গ্রাহকের নাম বলার সময় মহিলার কণ্ঠে নাটকীয়তা ফুটে উঠলো। ‘গ্রাহকটি হলেন জনাব গ্লেন রানসাইটার, উত্তর আমেরিকা কনফেডারেশন থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন।’

দীর্ঘদেহী, বয়স্ক একজন মানুষ, হাতদুটো অসম্ভব লম্বা, দ্রুত কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন তার দিকে। পরনে বর্ণিল ডেক্রন ওয়াশ অ্যান্ড ওয়্যার স্যুট, হাতেবোনা কোমরবন্ধ এবং গলায় জালি কাপড়ের গাঢ় রঙের গলাবন্ধ। কাঁধের উপর অনেক বড় একটা মাথা, ঠিক যেন একটা হুলো বিড়াল—কিছুটা প্রসারিত, গোলাকার এবং উষ্ণ। তীক্ষ্ণ, সতর্ক দৃষ্টিতে কারো দিকে তাকানোর সময় একটু সামনে ঝুঁকে থাকেন। সকল অবস্থাতেই মুখে একটা পেশাদারি অভিবাদনের অভিব্যক্তি ধরে রাখেন রানসাইটার। হার্বার্টের দিকে দ্রুত একবার তাকালেন, পর মুহূর্তেই প্রায় চোখের পলকে সেই দৃষ্টি তাকে ছাড়িয়ে চলে গেল অন্য কোনো দিকে, যেন রানসাইটার ইতোমধ্যেই ভবিষ্যতের কাজকর্ম নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন।

‘ইলা কেমন আছে?’ গমগমে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, মনে হলো কণ্ঠস্বরটা যেন যান্ত্রিক কোনো উপায়ে জোরালো করা হয়েছে। ‘কথা বলার জন্য পাগল হয়ে আছে? মাত্র কুড়ি বছর বয়স ওর, আমার বা আপনার চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকার কথা।’ মৃদু হাসলেন তিনি, কিন্তু সেটা ছিলো দুর্বোধ্য এক হাসি। তিনি সব সময়ই হাসেন, বা মৃদু হাসি তার মুখে সব সময় লেগেই থাকে, কণ্ঠস্বর সব সময়ই গমগম করে। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, তিনি কখনোই কাউকে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করেন না, কোনো কিছুরই পরোয়া করেন না। আসলে শুধু তার শরীরটাই কেবল হাসে, অভিবাদনের জন্য মাথা নাড়ে বা করমর্দন করে, কিন্তু কোনো কিছুই তার মনকে স্পর্শ করে না, সেটা সব সময়ই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে; নির্লিপ্ত, কিন্তু অমায়িক লোকটা হার্বার্টকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়েই নিজের সাথে নিয়ে যাচ্ছেন, দীর্ঘ পদক্ষেপে আবার সেদিকেই যাচ্ছেন যেদিকে হিমায়িত বাক্সে অর্ধ-জীবিতরা—তার স্ত্রীসহ বাকি সবাই—শায়িত আছে।

‘আপনি অনেক দিন এদিকে আসেননি, জনাব রানসাইটার,’ মনে করিয়ে দিলেন হার্বার্ট। তিনি নিজেও স্মরণ করতে পারছেন না মিসেস রানসাইটারের সর্বশেষ প্রতিবেদনে কী লেখা ছিলো, তার অর্ধ-জীবনের আর কতটুকু বাকি আছে।

রানসাইটার তার বিশাল, প্রশস্ত থাবাদুটো দিয়ে জরুরি তাগাদা ভঙ্গিতে ঠেলা দিচ্ছেন হার্বার্টের পিঠে। ‘বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ভন ভলসাঙ। আমরা, আমার সহকর্মীবৃন্দ এবং আমি নিজে, এমন এক ব্যবসায়িক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি যা কোনো যুক্তি দিয়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে বিস্তারিত কিছু বলা অসম্ভব। আমরা ধারণা করছি বিষয়টা অত্যন্ত ভয়াবহ বিপদের ইঙ্গিত, যদিও তা প্রতিহত করা সম্ভব। আমরা আতঙ্ক ছড়াতে চাই না—কোনোভাবেই না। ইলা কোথায়?’ দ্রুত থেমে দাঁড়ালেন তিনি, তার অস্থির দৃষ্টি ঘুরে বেড়াচ্ছে।

‘আমি তাকে শীতলঘর থেকে কনসালটেশন লাউঞ্জে নিয়ে আসছি,’ বললেন হার্বার্ট। ‘গ্রাহকদের শীতলঘরে থাকার নিয়ম নেই। আপনি কি দাবিপত্রটা নিয়ে এসেছেন, মি. রানসাইটার? ওটাতে একটা ক্রমিক নাম্বার থাকে।’

‘হায় ঈশ্বর! না,’ রানসাইটার বললেন। ‘ওটা অনেক দিন আগেই হারিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি আমার স্ত্রীকে চেনেন, আপনি তাকে খুঁজে আনতে পারবেন। ইলা রানসাইটার, প্রায় কুড়ি বছর বয়স। বাদামি চুল, বাদামি চোখ।’ অধৈর্য হয়ে আবার চারপাশে তাকাতে লাগলেন তিনি। ‘লাউঞ্জটা আবার কোথায় গেল? যতদূর মনে আছে, সহজেই খুঁজে পাবো এমন জায়গাতেই ছিলো।’

‘মি. রানসাইটারকে লাউঞ্জটা দেখিয়ে দাও,’ পায়ে পায়ে এগিয়ে আসা এক কর্মচারীকে নির্দেশ দিলেন হার্বার্ট। বেচারা কৌতূহলবশত দেখতে এসেছিলো পৃথিবী-বিখ্যাত অ্যান্টি-পিএসআই সংস্থার মালিক দেখতে কেমন।

লাউঞ্জে উঁকি দিয়েই রানসাইটার বিরক্তির সাথে বললেন, “এখানে অনেক মানুষ। এখানে বসে ইলার সাথে কথা বলা যাবে না।’ হার্বার্টের কাছে ফিরে এলেন আবার, যে কিনা মোরাটোরিয়ামের ফাইলপত্র দেখছিলেন। ‘জনাব ভন ভলসাঙ,’ ভারী হাতদুটো আরো একবার তার কাঁধের উপর রেখে বললেন তিনি। হার্বার্ট স্পষ্ট অনুভব করলেন হাতদুটোর ওজন আর ঐ দুটোর ক্ষমতার পরিমাণ। ‘আপনার এখানে অত্যন্ত গোপন আর নিরিবিলি পরিবেশ, মানে স্যাংকটাম স্যাংকটোরাম নেই যেখানে নির্বিঘ্নে গোপনীয় আলাপ করা যায়? আমার স্ত্রীর সাথে যে বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, রানসাইটার অ্যাসোসিয়েটস এই মুহূর্তে জনসম্মুখে সেটা প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত নয়।’

রানসাইটারের কণ্ঠের জরুরি তাগাদা, সেই সাথে তার উপস্থিতি, এই দুইয়ের প্রভাবে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বললেন হার্বার্ট, ‘মিসেস রানসাইটারকে আমাদের কোনো এক অফিস কক্ষে নিয়ে আসতে পারি আমি।’ কী এমন ঘটেছে? অবাক হয়ে ভাবলেন হার্বার্ট। কীসের কারণে রানসাইটার তার দুর্গম দুর্গ থেকে বেরিয়ে বাধ্য হয়েছেন বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামে আসতে, যোগাযোগ করতে চাইছেন স্বামীর সাথে কথা বলার জন্য পাগল হয়ে থাকা মানে রানসাইটার যেভাবে বলেছেন আর কি—তার অর্ধ-জীবিত স্ত্রীর সাথে। হয়তো বড় ধরনের কোনো ব্যবসায়িক দুর্যোগ, সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন হার্বার্ট।

পিএসআই বিরোধী প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনগুলো অনেক দিন থেকেই টেলিভিশন আর হোমিওপেপগুলোতে বাগাড়ম্বরপূর্ণ বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছে। নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করুন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রচারিত এই বিজ্ঞাপনগুলো কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে, যা প্রচারিত হচ্ছে সব ধরনের প্রচারমাধ্যমে। অপরিচিত কেউ কি আপনার জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে? আপনি কি সত্যিই একা? এগুলো সবই টেলিপ্যাথদের বিরুদ্ধে… আর তারপরেই বিচলিত উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ করে প্রিকগদের বিরুদ্ধে। আপনার প্রতি মুহূর্তের আচার-আচরণ কি অলক্ষ্যে থেকে এমন কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে যার সাথে আপনার কোনোদিন দেখাই হয়নি? যার সাথে কখনো দেখা করার, অথবা কখনো বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানোর কোনো ইচ্ছাই আপনার নেই? সব উদ্বেগ ঝেড়ে ফেলুন; আপনার নিকটস্থ প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের সাথে যোগাযোগ করলেই জানতে পারবেন আপনি অননুমোদিত অনুপ্রবেশের শিকার হয়েছেন কি না। তারপর আপনার চাহিদা মোতাবেক এই অননুমোদিত অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারবেন—অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে।

‘প্রুডেন্স অর্গানাইজেশন।’ শব্দটা হার্বার্টের ভীষণ পছন্দ; একটা গাম্ভীর্য আছে, আর তাদের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করার জন্য এটাই উপযুক্ত শব্দ। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি সেটা বুঝতে পেয়েছেন। দুই বছর আগে একজন টেলিপ্যাথ তার মোরাটোরিয়াম কর্মচারীদের মস্তিষ্কে অনুপ্রবেশ করে। তবে কী উদ্দেশ্যে সেটা আজও জানতে পারেননি। হয়তো বা অর্ধ-জীবিত আর তাদের স্বজনদের মাঝে কী ধরনের আলোচনা হয় সেটা জানাই ছিলো মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেসব অর্ধ-জীবিতরা আছে, তাদের কথোপকথন। যাই হোক, অ্যান্টি-পিএসআই সংস্থার একজন স্কাউট এই টেলিপ্যাথিক ফিল্ড খুঁজে পায় এবং তাকে জানায়। তাদের সাথে চুক্তি করার পর একজন অ্যান্টি-টেলিপ্যাথকে পাঠায় তারা। মোরাটোরিয়ামে অবস্থান নেয় সে। ঐ টেলিপ্যাথকে চিহ্নিত করা যায়নি, কিন্তু তার কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়; ঠিক তেমনটাই হয়েছিলো, টিভির বিজ্ঞাপনে যেমন বলা হয়ে থাকে। পরাজিত টেলিপ্যাথ সম্ভবত পালিয়ে গিয়েছিলো। মোরাটোরিয়াম এখন পিএসআই-মুক্ত, আর যেন সেরকমই থাকে তা নিশ্চিত করার জন্য প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের একজন অ্যান্টি-পিএসআই নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে একবার মোরাটোরিয়াম আগাগোড়া পরীক্ষা করে যায়।

‘অসংখ্য ধন্যবাদ, মি. ভলসাঙ,’ হার্বার্টকে অনুসরণ করে ভেতরের ছোট একটা অফিস কামরায় প্রবেশ করতে করতে বললেন রানসাইটার। অফিস কামরাটা পুরোনো মাইক্রো-ডকুমেন্টসের সোঁদা গন্ধে ভরপুর।

আমি ওদের কথা বিশ্বাস করেছিলাম যে একজন টেলিপ্যাথ এখানে অনুপ্রবেশ করেছে, আপনমনে ভেবে যাচ্ছেন হার্বার্ট। ওদের সংগ্রহ করা একটা গ্রাফ আমাকে দেখিয়েছিলো। বলেছিলো এটাই প্রমাণ; হয়তো ওটা ছিলো জাল, ওরা নিজেরাই নিজেদের ল্যাবে তৈরি করে এনেছিলো। আর আমি তাদের এই কথাও বিশ্বাস করেছিলাম যে সেই টেলিপ্যাথ এখান থেকে পালিয়ে গেছে। সে এসেছিলো, আবার চলেও গেছে—আর আমি তাদেরকে দুই হাজার পসক্রিড দিয়েছি। এমন কি হতে পারে যে এই প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনগুলো প্রকৃতপক্ষে আসলে একটা সংঘবদ্ধ চক্র? সব সময় দাবি করে যে তাদের সেবা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যার কোনো প্রয়োজনই নেই?

এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ফাইলগুলোর দিকে এগোলেন তিনি এবার আর রানসাইটার তাকে অনুসরণ করলেন না, বরং দেহের তুলনায় আকারে ছোট চেয়ারে সশব্দে একটু আরামে বসার চেষ্টা করলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রানসাইটার। হার্বার্টের মনে হলো, বাহ্যিকভাবে যতই ক্ষমতাশালী আর দৃঢ় মনোবলের মুখোশ পরে থাকুক না কেন, ভেতরে ভেতরে মানুষটা আসলে ভীষণ ক্লান্ত।

সত্যি বলতে কী, তুমি যখন ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে যাবে, হার্বার্ট ভাবছেন, তোমাকে অবিরাম অভিনয় করে যেতে হবে। সাধারণ ত্রুটিবিচ্যুতি আর ব্যর্থতা গোপন রেখে নিজেকে একজন অতিমানব হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে সব সময়। নিঃসন্দেহে রানসাইটারের দেহে ডজনেরও বেশি কৃত্রিম অঙ্গ লাগানো আছে, যেগুলো এখন আর সঠিকভাবে কাজ করছে না। চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রাথমিক কাজটা করে দিলেও আসল কাজটা সম্পন্ন হয়েছে মূলত রানসাইটারের প্রচণ্ড শক্তিশালী আর দৃঢ় মনোবলের কারণে। বয়স কত লোকটার, অবাক হয়ে ভাবলেন তিনি। শুধু মুখ দেখে বলা অসম্ভব, বিশেষ করে বয়স নব্বই পেরোনোর পর।

‘মিস বিসন,’ সহকারীকে নির্দেশ দিলেন তিনি, ‘মিসেস রানসাইটারকে খুঁজে বের করুন এবং তার নিবন্ধন নাম্বারটা আমাকে এনে দিন। তাকে ২-এ অফিস কক্ষে নিয়ে যেতে হবে।’ উলটো দিকের চেয়ারে বসে এক টিপ ফ্রিবোর্গ অ্যান্ড ট্রায়ার প্রিন্সেস নস্যি নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। আর মিস বিসন ব্যস্ত হলেন গ্লেন রানসাইটারের স্ত্রীকে খুঁজে বের করার মামুলি কাজে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *