৯. নভেম্বর ১৯ রাত এগারোটা
হাত পা একটু টানটান করার চেষ্টা করছিলেন ডক্টর নাগ। অনেকটা সময় ধরে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সামান্য ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করে শরীরের রক্তচলাচল আবার স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিলেন তিনি। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন ব্যাগ থেকে একটা হ্যান্ডকাফ বের করে অর্জুনের হাত পিছমোড়া করে বাঁধছেন এজেন্ট বর্মা। অর্জুনের হাত পিছমোড়া করে বাঁধা হয়ে গেলে তিনি ফিরে তাকালেন ডক্টর নাগের দিকে, “হ্যাঁ তো ডক্টর, আপনার স্ট্রেচিং হয়ে গেলে আমরা বেরোই এবার? এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক হবে না। এমনিতেই এখানে সিভিলিয়ানদের আসা নিষেধ, জানেন তো?”
জানেন বইকি ডক্টর নাগ। প্রায় পাঁচ বছর আগে এই হাউজিং কমপ্লেক্স যখন তৈরি হয়েছিল তখন নিম্নমানের মালমশলা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, ফলস্বরূপ বেশিদিন এটি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। পাঁচটি পাঁচতলা বাড়ির মধ্যে দুটি ধসে পড়েছিল, কতজন সেবার আহত এবং নিহত হয়েছিল তার হিসেব সরকার দেয়নি, কোনোদিন আর দেবে বলে মনেও হয় না। এজেন্ট বর্মা আবার তাড়া দিলেন, “স্যার! ও স্যার! এবারে বেরোতে হবে যে। নইলে বিল্ডিং মাথার ওপরে ভেঙে পড়বে। তখন কিন্তু একটা মিনি প্রলয় আসবে, স্যার। ওই সিনেমার মতো না, সত্যি সত্যিই আসবে।”
ডক্টর নাগ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন একটু। তারপর তিনি শবনমের দিকে ইশারা করে বললেন, “এই মেয়েটির জন্য কিছু করা দরকার। ও কষ্টে আছে অনেক। বেশি না, পাঁচ মিনিট দিতে পারবেন?”
এজেন্ট বর্মা মাথা চুলকোতে-চুলকোতে বললেন, “ডাক্তারসাহেব, এই মেয়েটি কিন্তু আপনাকে মারতেই এসেছিল। এর ওপরেও আপনি দয়া দেখাবেন? বেশ বেশ! পাঁচ নয়, দুই মিনিট দিচ্ছি। তারপর দরকার হলে আপনাকে টেনে-হিঁচড়ে হলেও নিয়ে যাব এখান থেকে।”
স্থিরদৃষ্টিতে তাকালেন এজেন্ট বর্মার দিকে ডক্টর নাগ, “পারবেন?”
এজেন্ট বর্মা একটু ঢোঁক গিললেন, “ইয়ে… মানে, চেষ্টা… ওই যাকে বলে, চেষ্টা তো করাই যায়। তা-ই না? যা-ই হোক, আপনি কাজ শুরু করুন। আমি এই আধমনি লাশটাকে সরানোর ব্যবস্থা করি।” বলে তিনি হাঁক দিলেন, “এই যে বিগ বি, এদিকে এসো। এসে হাত লাগাও।”
এরপর ঘরে যে ঢুকে এল তাকে দেখে ডক্টর নাগ সত্যিই অবাক হলেন, সেদিনের ক্যাব ড্রাইভার, অমিতাভ গুপ্ত। একটু অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন ওর দিকে ডক্টর নাগ। সেই দৃষ্টি দেখে এজেন্ট বর্মা বললেন, “আমার বিশ্বাস আপনি আমাদের উঠতি জেমস বন্ড অমিতাভকে দেখেছেন?”
অস্ফুটে বলে উঠলেন ডক্টর নাগ, “ওকে আপনি পাঠিয়েছিলেন? বোঝা উচিত ছিল, এমনি এমনিই আমাকে কেন এই বুদ্ধের লকেটটা দেবে ও!”
তিনি জামার ভেতর থেকে লকেটটা বের করে দেখালেন, এজেন্ট বৰ্মা হেসে উঠলেন, “ওটা আসলে জিপিএস ট্র্যাকার। মানে, যখন মনে হয়েছে বিপদ আসতে পারে তখনই আপনাকে দেওয়া হয়েছে এটা। বুঝলেন কিনা?”
অমিতাভর দিকে তাকালেন ডক্টর নাগ। ছেলেটির মুখ চুপসে গেছে রীতিমতো, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ও। সেদিকে তাকিয়ে এজেন্ট বর্মা এবারে তাড়া দিয়ে বললেন, “তুমি তোমার স্যারের কাছে ছাত্র পরে সাজবে, আগে এই আধমনি লাশকে সরাতে সাহায্য করো।”
এজেন্ট বর্মার সঙ্গে অর্জুনকে চ্যাংদোলা করে তুলতে তুলতে অমিতাভ বলল, “পরে আপনাকে সব বলব, স্যার। শুধু একটু তাড়াতাড়ি করবেন। বেশি সময় নেই।”
সেটা ঠিক। ডক্টর নাগ তাকালেন শবনমের দিকে, মেয়েটি অজ্ঞান অবস্থায় রয়েছে। মায়া হল মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে, কম যন্ত্রণা সহ্য করেনি ও। তিনি বুড়ো আঙুলটা রাখলেন শবনমের কপালে, একটু চাপ দিলেন আজ্ঞাচক্রের স্থানে, তারপর চোখ বন্ধ করে মনঃসংযোগ করলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর চারপাশ অন্ধকার হয়ে এল, তারপর আস্তে-আস্তে সেই অন্ধকার কেটে গিয়ে তাঁর সামনে ফুটে উঠল একটা পুরোনো দোতলা বাড়ি। সেই বাড়ির চারপাশে রয়েছে এক মাঠ। কিন্তু সেই মাঠের ঘাসের রং ধূসর হয়ে গিয়েছে। এমনকি আকাশের রংও ধূসর। এভাবেই কি দেখে শবনম বাইরের জগৎটাকে? সব ধূসর? ওই দোতলা বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন ডক্টর নাগ, বাড়িটা বোধহয় শবনমেরই হবে, যেখানে ও জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়গুলো কাটিয়েছে। এক-এক করে সবক’টা ঘর তিনি দেখলেন। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। সিঁড়ি বেয়ে তিনি উঠে গেলেন ছাদে। আর সেখানে দেখলেন শবনম বসে রয়েছে, তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। এগিয়ে গিয়ে তিনি শবনমের কাঁধে হাত রাখলেন, শবনম একটু চমকে উঠে তাকাল ওর দিকে, তারপর অস্ফুটে বলে উঠল, “ডক্টরসাহাব? আপনি এখানে?”
“তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এলাম এখানে শবনম। দেখতে এলাম কেন তুমি এতটা কষ্টে থাক।” নরম স্বরে বললেন ডক্টর নাগ।
“কিন্তু আপনি এখানে কীভাবে এলেন?” অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করল শবনম। ডক্টর নাগ ওর পাশে বসে বললেন, “ধরে নাও এটা আমার এক ধরনের সুপারপাওয়ার!” বলেই তিনি হেসে ফেললেন, কেমন যেন বাচ্চাদেরকে ভোলানোর মতো শোনাল কথাটা।
শবনমের কোনো ভাবান্তর হল না, ও আবার তাকিয়ে রইল ধূসর আকাশের দিকে। ডক্টর নাগ কিছু বললেন না, তিনি অপেক্ষা করলেন শবনমের জন্য। এসব ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে কিছু হয় না এটা তিনি খুব ভালো করে জানেন। বেশ কিছুক্ষণ পর শবনম বলল, “জানেন, ডক্টরসাহাব, ছোটোবেলায় আম্মিজান বলত, যারা মরে যায় তারা নাকি আসমানের তারা হয়ে যায়! আপনি কি মানেন এটা?”
ডক্টর নাগ তাকিয়ে রইলেন ধূসর আকাশের দিকে, তারপর তিনি আস্তে আস্তে বললেন, “একটা কথা আছে জানো তো— বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। যদি তুমি বিশ্বাস কর যে মানুষ মৃত্যুর পর আকাশের তারা হয়ে যায় তাহলে তোমার বিশ্বাস তোমার কাছেই ঠিক। বাকি দুনিয়ার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু যায় আসে না।”
ডক্টর নাগ খেয়াল করলেন শবনমের চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে। ওর চোখের জল দেখে ডক্টর নাগের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল, তিনি টেনে নিলেন শবনমকে বুকে। পরম স্নেহের সঙ্গে ওর মাথায় হাত রাখলেন। আর তখনই শবনম চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ওর সারা জীবনের যন্ত্রণা যেন বেরিয়ে এল ওই চোখের জলের মধ্যে দিয়ে। সেইসঙ্গেই শুরু হল বৃষ্টি, মুষলধারে বৃষ্টি। ডক্টর নাগ নিজের মনেই বলে উঠলেন, ‘বৃষ্টি তখনই হয়, যখন দেবদূতেরা চোখের জল ফেলেন।’
খেয়াল করলেন ডক্টর নাগ, একটু-একটু করে আকাশের ধূসর ভাব কেটে যাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এখান থেকে বেরোতে চাও, শবনম?”
শবনম মুখ তুলে তাকাল, “কিন্তু ওরা আমাকে বেরোতে দেবে না। আমাকে এখানেই আটকে রেখে দেবে যে!”
ডক্টর নাগ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কারা?”
শবনম বলল, “ওই যে ওরা। নিচে সবসময় পাহারা দেয়।”
“আমি কিন্তু দেখিনি!” ডক্টর নাগ বললেন। শবনম থমথমে মুখে উত্তর দিল, “হয়তো ওরা দেখা দিতে চায়নি, কিন্তু এবারে হয়তো দেখা দেবে।”
ডক্টর নাগ উঠে দাঁড়ালেন আর তিনি দেখতে পেলেন বাড়ির সামনে ধূসর ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বিজাতীয় দেখতে এক অদ্ভুত প্রাণী, দেখতে মানুষের মতো, আবার মানুষের মতো নয়। নগ্ন শরীরে রয়েছে অজস্র ক্ষতচিহ্ন, আর বলিরেখাপূর্ণ মুখে ফুটে উঠছে একটা কদর্য অভিব্যক্তি! চার হাতে-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। আর সে একা নয়, ধূসর ঘাসের ওপর দিয়ে চার হাত-পায়ে এগিয়ে আসছে এরকম আরও অনেক প্রাণী। মনে হবে যেন এরা সবাই একে অপরের ক্লোন। ডক্টর নাগ জিজ্ঞেস করলেন শবনমকে, “তুমি কবে থেকে এদেরকে দেখতে পাও?”
শবনম উত্তর দিল, “যেদিন আমার শরীরে ওই ওষুধটা দেওয়া হয়েছিল, তার পর থেকেই।” ডক্টর নাগ মনে করলেন সেই বাদামি রঙের ভায়ালটার কথা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ওই ওষুধের নাম কি ‘টার্টারাস’ ছিল?” শবনম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এই নাম কী করে জানলেন?”
মাথা নাড়লেন ডক্টর নাগ, তার আগেই বোঝা উচিত ছিল যখন অর্জুন শবনমকে ‘সাবজেক্ট জিরো’ বলেছিল। “অনেক বড়ো গল্প, শবনম। পরে বলব কখনও। আগে তোমাকে এই টার্টারাসের বন্দিশালা থেকে মুক্ত করতে হবে।” বলে থমথমে মুখে তাকালেন চারপাশে ডক্টর নাগ। বাড়ির চারপাশে গিজগিজ করছে সেই অপার্থিব জন্তুতে, এদেরকেই বোধ হয় দ্রোণপুত্র তাঁর খণ্ডাংশ বলে অভিহিত করেছিলেন! এদের দিকে তাকিয়ে একটা জিনিস বুঝতে পারলেন ডক্টর নাগ, এদেরকে শেষ করা অসম্ভব। যদি না এদের উৎসস্থলকে সমূলে শেষ করা যায়। একটু ধন্দে পড়লেন ডক্টর নাগ— কীভাবে খুঁজবেন এদের উৎসস্থলকে? এদিকে তিনি খেয়াল করলেন ওই জীবগুলো এক-এক করে এগিয়ে আসছে বাড়ির দিকে। তিনি শবনমকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাকে একটা কথা বলতে হবে শবনম, প্রথমবার যখন এই জন্তুটাকে দেখতে পেয়েছিলে কোথায় দেখতে পেয়েছিলে তাকে?”
শবনম একটু অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিল, “এই বাড়িতেই।”
ডক্টর নাগ একটু মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এই বাড়ির কোথায় রয়েছে সে?”
শবনম বলল, “ভেতরে, একদম ভেতরে। মাটির তলায় একটা ঘর আছে, তার ভেতরে।”
“আমাকে নিয়ে যেতে পারবে সেখানে?” জিজ্ঞেস করলেন ডক্টর নাগ। শবনম মাথা নাড়ল, তারপর সে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে, ওর পিছু নিলেন ডক্টর নাগ। এদিকে ডক্টর নাগ শুনতে পেলেন একটা অদ্ভুত শব্দ, ঘরের দরজা জানালা আর দেয়ালে যেন ওই জীবগুলো তাদের নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে, তারা পাগলের মতো ধাক্কা দিচ্ছে সেখানে। শবনম একতলার একটা ঘরে ঢুকে একটা ট্র্যাপডোর খুলল, তারপর সেখান থেকে একটা মই বেয়ে নেমে গেল ও নিচে। জমাটবাঁধা অন্ধকার সেখানে, সেই অন্ধকারের মধ্যে তাঁরা নেমে যাচ্ছেন তো নেমেই যাচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ পর ডক্টর নাগ টের পেলেন নিচে একটা আলোর মতো কিছু দেখা যাচ্ছে। আরও কিছুক্ষণ পর যখন ডক্টর নাগ পায়ের তলায় শক্ত জমি খুঁজে পেলেন, তখন তিনি দেখলেন তাঁরা একটা বিরাট বড়ো বৃত্তাকার হলঘরের মধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছেন। সেই হলঘরে কোনো দরজা নেই, জানালা নেই, আছে শুধু একটা গর্ত, সেখান থেকে নেমে এসেছে একটা মই, এই হলঘরে আসার একমাত্র রাস্তা। হলঘরের চারপ্রান্তে জ্বলছে চারটি মশাল, আর সেই মশালের আলোয় ডক্টর নাগ দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। হলঘরের মাঝে রয়েছে একটা ধূসর রঙের অদ্ভুত আকৃতির গাছ। সেই গাছের শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে হলঘরের চতুর্দিকে, আর পাতার বদলে রয়েছে এমন এক শিকড়ের মতো দেখতে কিছু অংশ যা হলঘরের ছাদ অবধি চলে গেছে। অবাক হয়ে দেখছিলেন সেটির দিকে ডক্টর নাগ। কী হতে পারে এটা? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, তারপর তাঁর মনে হল, এটি দেখতে ঠিক যেন একটা নিউরনের মতো! নীচের শিকড়গুলো যেন দেখতে অ্যাক্সন-প্রান্তের মতো, আর ওপরের শিকড়টি ডেনড্রাইটের মতো! অবাক হয়ে চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন ডক্টর নাগ। এরকম দৃশ্য তিনি আগে দেখেননি। এর মানে একটাই— শবনম তাঁকে তার মনের গভীরতম স্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি জানেন না এর ব্যাখ্যা কীভাবে দেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি মন আলাদা, তার ধরন এবং গঠন আলাদা, তার স্তরও আলাদা। এ যেন বাস্তব আর পরাবাস্তব দুনিয়ার মাঝের কোনো স্থান, যেখানে স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি কাজ করে না, কাজ করে একমাত্র বিশ্বাস। নিজের মনেই সেই কথাটি আবার আউড়ে নিলেন ডক্টর নাগ, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।’
ঠিক সেইসময়ই তিনি খেয়াল করলেন ওই বিশালকায় নিউরনের গোড়ার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই বিজাতীয় দেখতে জীবটি। সে আকারে বাকিদের থেকে অনেক বড়ো, তার মুখের হিংস্রতাও বাকিদের থেকে বেশি। সে ওই নিউরনের মতো দেখতে বস্তুটির গোড়া থেকে কিছু একটা কামড়ে খাচ্ছিল যেন! ডক্টর নাগের মনে হল, এই জন্যই কি তাহলে শবনম কথায় কথায় রেগে যেত? চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলত? সেইসঙ্গে তার এটাও মনে হল সব মানুষের মনের ভেতরেই কি এরকম কিছু সত্তা থাকতে পারে? হয়তো হ্যাঁ! হয়তো না! সেটা অনুসন্ধানসাপেক্ষ। ‘ফোকাস বোধি, ফোকাস!’ নিজেই নিজেকে বললেন ডক্টর নাগ। তত্ত্বকথা আলোচনা করার সময় পরেও পাওয়া যাবে, আগে শবনমকে এই টার্টারাসের প্রহরী হেলহাউন্ডদের থেকে মুক্ত করতে হবে। বেশি কিছু না ভেবে এগিয়ে গেলেন সেদিকে ডক্টর নাগ।
সেই জন্তুটিও টের পেয়েছে ওর দিকে কেউ এগিয়ে আসছে, সে ডক্টর নাগের দিকে ছুটে এল। ডক্টর নাগকে লক্ষ করে সে যখন ঝাঁপ দেবে তখন একটা চাবুকের মতো কিছু সেই জীবের শরীর লক্ষ করে ছুটে এল। ডক্টর নাগ খেয়াল করলেন, শবনমের চুল আর আগে মতো পনিটেল করে বাঁধা নেই, ওর চুল যেন সহস্র নাগের ফণার মতো ফুঁসে উঠে সেই বিজাতীয় জন্তুর শরীরে আছড়ে পরে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলেছে। ডক্টর নাগের দিকে তাকিয়ে শবনম বলল, “বহুত শুক্রিয়া, ডক্টরসাহাব, আপনিই আমাকে বলেছিলেন আমার বিশ্বাস আমার কাছেই ঠিক। বাকি দুনিয়ার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু যায় আসে না। তাই না? আমি বিশ্বাস করা শুরু করলাম ডক্টর।”
আলতো করে হাসলেন ডক্টর নাগ— যাক, মেয়েটি বোধ হয় এবার ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখানেই কি তার কাজ শেষ? বোধহয় না। তিনি এগিয়ে গেলেন সেই জন্তুটির দিকে, সে ওই চুলের বাঁধনে তখন বিজাতীয় কণ্ঠস্বরে আর্তনাদ করে চলেছে। ডক্টর নাগ কাছে গেলেন সেই জন্তুটির, ওর রুক্ষ চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। শবনম পেছন থেকে চিৎকার করছে, “ডক্টরসাহাব, সরে যান, আমি এই জানোয়ারকে একটু-একটু করে ছিঁড়ে দেব। আর শুধু ওকেই না, বাইরে যতগুলো জাহান্নমের পিল্লা আছে, সবাইকে আমি শেষ করে দেব। সবাইকে! কাউকে ছাড়ব না আমি!”
ডক্টর নাগ শবনমের রাগে লাল হয়ে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “তুমি যদি রোজ সেটাই করো শবনম, তাহলে তুমিও কিন্তু একদিন ওর মতোই হয়ে যাবে। সেটাই কি তুমি চাও? এরকম হলে তোমার আম্মিজান কিন্তু কষ্ট পাবেন অনেক।”
শবনম বুঝতে পারল ডক্টর নাগ কী বলছেন, ও জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কী করা যায় এখন?”
ডক্টর নাগ বললেন, “ওকে একটু বেঁধে রাখো। বাকিটা আমি দেখে নিচ্ছি।” বলে তিনি হাত রাখলেন সেই প্রাণীটির মাথায়। চোখ বন্ধ করলেন তিনি, আর দেখতে-দেখতে প্রাণীটি শান্ত হয়ে গেল, আর ওর শরীর ছোটো হতে-হতে পরিণত হল এক বিন্দুতে। আর সেই বিন্দু যেন ক্রমে মিশে গেল ডক্টর নাগের হাতের তালুতে।
শবনম হাঁ করে দেখল সবটা, তারপর জিজ্ঞেস করল ডক্টর নাগকে, “এটা আপনি কীভাবে করলেন, ডক্টরসাহাব?”
ডক্টর নাগ মুচকি হেসে বললেন, “সত্যি বলতে, আমি নিজেও জানি না। আমি শুধু আমার মনের কথা শুনলাম। আর আমার মন বলছে এখানে সব ঠিক হয়ে গেছে। চলো, বাইরে গিয়ে দেখো সব ঠিক হয়ে গেছে এখন।”
মই বেয়ে তাঁরা ওপরে উঠে এলেন। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখলেন ডক্টর নাগ, বৃষ্টি থেমেছে, আকাশের রং ধূসরের বদলে নীল হয়ে গিয়েছে এখন। ঘাসের রং একটু-একটু করে বদলে যাচ্ছে সবুজে। শবনমের দিকে তাকিয়ে বললেন ডক্টর নাগ, “বলেছিলাম না, সব ঠিক হয়ে যাবে? এবার চলি, দেখা হবে বাইরে।”
দেখতে না দেখতে ডক্টর নাগকে টেনে নিল একটা অন্ধকার পোর্টাল। আর সেখান থেকে ডক্টর নাগ যখন বেরিয়ে এলেন তখন তিনি দেখলেন তার হাত শবনমের কপালে, তিনি ওই পুরোনো ঘরে বসে রয়েছেন, ঘরের মধ্যে একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। আর বাইরে এজেন্ট বর্মা বলছেন, “স্যার, এক মিনিট হয়েছে, আরও এক মিনিট বাকি আছে কিন্তু।”
শবনমের দিকে তাকালেন ডক্টর নাগ, ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে এতক্ষণে। আর এই প্রথমবার ওকে হাসতে দেখলেন। সেই হাসিতে কোনো ব্যথা নেই, যন্ত্রণা নেই। মেয়েটি হাসছে, মেয়েটি ভালো আছে এখন। ডক্টর নাগ ওর হাত ধরে ওকে দাঁড় করাতে করাতে বললেন, “চলো, এখান থেকে বেরোতে হবে।”
শবনম উঠে দাঁড়িয়ে ডক্টর নাগকে জড়িয়ে ধরল, তারপর আস্তে করে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, ডক্টরসাহাব। থ্যাঙ্ক ইউ!”
শবনমের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন ডক্টর নাগ, “লেটস গো। নাহলে বাইরের ওরা চিৎকার শুরু করে দেবে দেখো।”
আর বলতে না বলতেই এজেন্ট বর্মার গলা ভেসে এল, “দুই মিনিট হয়ে গেছে, চলুন চলুন! আর সময় নষ্ট করা যাবে না।” বলে যখন তিনি ঘরে ঢুকলেন তখন ডক্টর নাগ আর শবনমকে দেখে বললেন, “বাহ্ বাহ্, এই তো সবাই রেডি, চলুন চলুন, আর সময় নেই। এখান থেকে বেরোতে হবে। এমনিতে আমাকে সবাই খুঁজছে। বেশি বাইরে থাকাটা ঠিক না এখন।”
ওই ঘর থেকে বেরনোর সময় শবনম জিজ্ঞেস করল ডক্টর নাগকে, “ইনি দুই মিনিট হয়েছে কেন বলছেন? আমার তো মনে হয় আমরা যেন সেইখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছিলাম!”
হেঁটে ওই এসইউভি গাড়ির দিকে এগোতে-এগোতে বললেন ডক্টর নাগ, “আমি যেটুকু বুঝি, শবনম, ওই দুনিয়ার সময় অন্যভাবে চলে।”
“মানে, ওই দুনিয়াতে আমরা অনেক ক’টা জীবন বাঁচতে পারব?” শবনম জিজ্ঞেস করল। ডক্টর নাগ একটু চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, “হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না। এর কোনো সঠিক উত্তর আমার কাছে নেই শবনম। তবে হ্যাঁ, এটুকু বলতে পারি যদি তুমি বিশ্বাস করো তোমার দুনিয়ায় সেটা সম্ভব, তাহলে সম্ভব।”
“আপনি কী বিশ্বাস করেন, ডক্টরসাহাব?” শবনম জিজ্ঞেস করল। হাঁটতে হাঁটতে কালো আকাশের দিকে তাকালেন ডক্টর নাগ, তিনি উত্তর দিলেন, “অনেক কিছুই। আবার কিছুই না।”
গাড়ির পেছনের সিটে উঠে পড়লেন ডক্টর নাগ এবং শবনম। সামনের সিটে বসলেন এজেন্ট বর্মা, আর ড্রাইভারের সিটে বসে রয়েছে অমিতাভ। ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন ডক্টর নাগ, “ওটিপি নেবে না আজ?”
ছেলেটি কাষ্ঠহাসি হাসল, “স্যার, কী যে বলেন!”
হাততালি দিয়ে নিজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন এজেন্ট বর্মা, “অনেক গপ্পো হয়েছে, এবার এদিকে তাকান। আপনাদের পেছনের সিটে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে এক ছয় ফুটের আধমনি লাশকে। এখন ওকে চারটে স্লিপিং ডার্ট দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কতক্ষণ ও ঘুমোবে ভগবানই জানেন। ডক্টরের বাড়ি অনেকটা দূরে হয়ে যাবে, সেখানে নিয়ে যেতে-যেতে সময় লাগবে অনেক। আর রাস্তায় এই রাবণের চামচা জেগে গেলে কেস হয়ে যাবে পুরো! তাই আমাদের কাছাকাছি একটা সেফ লোকেশন দরকার।”
অমিতাভ বলল পাশ থেকে, “কাছাকাছি একটা জায়গা আছে, কিন্তু সেটা একটু রিস্কি হতে পারে। আমার এক বন্ধুর কাকুর বাড়ি আছে, ও সেখানেই থাকে। ওকে বললে একটা কিছু হলেও হতে পারে। আমি একবার ফোন করে দেখব?”
এজেন্ট বর্মা বললেন, “আমি ইনভিটেশন দিলে তারপর ফোন করবে, বাবা?”
জিভ কেটে মোবাইল ফোনটা বের করে একটা নম্বর ডায়াল করল অমিতাভ। স্পিকার অন করা আছে, রিং হচ্ছে, একটু পরই এক যুবকের গলা ভেসে এল, “কী হয়েছে বোক্সদ? এখন ফোন করছিস কেন?”
অমিতাভ বলল, “অন্তু, দরকার ছিল। এমারজেন্সি কেস। তুই কাকুর বাড়িতে আছিস তো?”
“তো আর কোথায় থাকব চাঁদ? তোর মাথায়?” ওপাশের ছেলেটি খেঁকিয়ে উঠল। অমিতাভ বলল, “কুড়ি মিনিটের মধ্যে আসছি। তুই কাকুকে একটু বলে রাখ। খুব দরকার না হলে বলতাম না তোকে। দেখা হচ্ছে, রাখছি।”
“একটা হুইস্কি….
কথাটা শেষ হল না আর। অমিতাভ রেখে দিয়েছে। গাড়ি স্টার্ট করতে করতে ও বলল, “চলুন, এবার যাওয়া যাক।” অন্ধকার রাস্তা ধরে গাড়ি এগিয়ে গেল। ডক্টর নাগ অবশ্য তাকিয়ে রইলেন জানালা দিয়ে। এক বছর আগের জার্নিটার কথা মনে পড়ে গেল আবার। সেবার রুদ্রকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, এবার অর্জুনকে। অমিতাভর বলা সেফ লোকেশনে পৌঁছনোর পর দেখা যাক কী হয়! নিজের মনেই গেয়ে উঠলেন তিনি,
“ওয়েল, আই সি ট্রাবল অ্যাট এভরি টার্ন
আই’ভ গট সো মেনি লেসনস টু লার্ন
হোয়াট অ্যাম আই ডুইং রং?
আই ডোন্ট নো!”
