২. অক্টোবর ২১ রাত সাড়ে দশটা

২. অক্টোবর ২১ রাত সাড়ে দশটা

সিজিও কমপ্লেক্সের অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে প্রায়ই রাত হয় সাত্যকি দুবের। কিন্তু আজ একটু বেশিই রাত হল তাঁর। যে ডিপার্টমেন্টে তিনি কাজ করেন, সেখানকার দু’জন উচ্চপদস্থ পদাধিকারীর মুখোমুখি বসেছিলেন তিনি প্রায় ছয় ঘণ্টা! এই ছয় ঘণ্টা ধরে কী চলছিল? জেরা চলছিল সাত্যকি দুবের। চাকরিতে জয়েন করার পর থেকে তিনি কী কী কাজ করেছেন, কাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁর দিক থেকে কোনোরকম ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে কি না সব খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। এইসব সামলে তিনি যখন বেরোচ্ছিলেন তখন শরীর, মাথা কোনোটাই আর কাজ করছিল না। খাতায়-কলমে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর একটায় তিনি কাজ করেন। রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং-এর একজন অ্যানালিস্ট তিনি। বিগত দশ বছর ধরে এখানেই রয়েছেন, একটু একটু করে পদোন্নতি হয়েছে। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা সবাইকে নিয়ে দিব্যি সুখে রয়েছেন। কিন্তু ইদানীং চিত্তে নেই তাঁর সুখ! না থাকারই কথা, কারণ মাঝে- মাঝেই তাঁকে এই জেরার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কারণ, এই ডিপার্টমেন্টে তাঁর ঘনিষ্ঠ একজনকে হন্যে হয়ে খোঁজা চলছে। আর যাঁকে খোঁজা হচ্ছে, তিনি যে-সে ব্যক্তি নন, র-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্টদের একজন ছিলেন তিনি। বহুবার অ্যানালিস্ট হিসেবে তাঁকে সাহায্য করেছেন সাত্যকি। শুধু তা-ই নয়, কাজের ব্যাপারে অনেক কিছু শিখেছেন তিনি। ডিপার্টমেন্টের পদাধিকারীদের জেরায় সেই পুরোনো তথ্যগুলো বারবার খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছিলেন যে, সাত্যকির মাধ্যমে যদি কোনোভাবে সেই ব্যক্তির সম্পর্কে আর একটু বেশি জানা যায়। কিন্তু না, সেটা সম্ভব হয়নি। সেই ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে কাউকে আসতে দিতেন না। আর সাত্যকি যে আলাদা করে তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানেন তা-ও নয়। কাজের বাইরে তাঁরা সময় কাটিয়েছেন বলতে মাঝে-মাঝে একসঙ্গে ডিনার করা বা একটু-আধটু সুরাপান করা, ব্যস এই পর্যন্তই। আর ফুটবল খেলা নিয়ে ভদ্রলোকের বিশেষ উৎসাহ ছিল। এই খেলা নিয়ে তাঁরা কথা বলতেন প্রায়ই। এর বাইরে যা শুনেছেন সাত্যকি, সবটাই একরকম ধোঁয়াশার মতো। এই যেমন তিনি শুনেছেন গত বছর একজন রোগ এজেন্টকে খুঁজে বার করে এলিমিনেট করার পেছনে নাকি তাঁরই হাত ছিল। আরও বলা হয় যে, এই গত বছরই প্রাইম মিনিস্টার এবং সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এক বিরাট বড়ো ষড়যন্ত্রকে গোড়াতেই শেষ করার পেছনে এই ভদ্রলোকেরই হাত ছিল। সাত্যকি ভেবেছেন মাঝে- মাঝে জিজ্ঞেস করবেন এগুলোর ব্যাপারে, কিন্তু তিনি সাহস করে উঠতে পারেননি। ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকালে সেই সাহস নিমেষেই যেন উধাও হয়ে যেত। আর এই ভদ্রলোকই নাকি এবারে গিয়েছেন উধাও হয়ে আর তিনি শুধু একা উধাও হননি, তার সঙ্গে উধাও হয়েছে বেশ কিছু জরুরি নথির কপি! সত্যি বলতে, সাত্যকিই সেই নথিগুলোর কপিগুলো তাঁর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ছ’মাস আগে উধাও হবার পরে পরেই সাত্যকির কাছে সেই ভদ্রলোকের একটা ফোন এসেছিল, তিনি সদিবসা গলায় বলেছিলে ওই নথিগুলোর কপি যেন তিনি একটা মোটা খাম আর পলিথিনে মুড়ে বসন্ত বিহার বাস ডিপোর লাগোয়া একটা ডাস্টবিনে ফেলে দেন। সাত্যকি করেওছিলেন তা-ই, কারণ তিনি ওই ভদ্রলোকের কোনো কথাই অমান্য করতেন না। যদিও মনে হয়েছিল যে, গলাটা একটু অন্যরকম শোনাচ্ছে, আর নম্বরটাও অন্য। কিন্তু সাত্যকি বেশি কিছু ভাবেননি। নিজেকে বুঝিয়েছিলেন যে, না, ইনি সেই লোকই। ডিপার্টমেন্ট যদিও এর খবর ঘুণাক্ষরেও জানে না, কিন্তু যা-ই হোক, ওই ‘কাঁটা খচখচ’ ব্যাপারটা রয়েই গেছে। মাঝে-মাঝেই তিনি ভাবেন, একটা ডুবে যাওয়া কোম্পানির ডিটেলস নিয়ে ওই ভদ্রলোক কী করবেন?

যা-ই হোক, সাত্যকিকে এখন ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। স্বাভাবিক— বিগত দশ বছর ধরে যাঁর কাছে তিনি কাজ শিখেছেন এবং যাঁর সঙ্গে কিছুটা হলেও সময় কাটিয়েছেন, তাঁর খোঁজ নিতে হলে সাত্যকি বোধহয় নিজেও সেটাই করতেন যেটা ডিপার্টমেন্ট করছে এখন। শুধু তা-ই নয়, এই এনকোয়ারির ফলে তিনি এটাও জানতে পেরেছেন যে, বিগত এক বছরে যে বা যাঁরা ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের অনেকেই নাকি মৃত্যুবরণ করেছেন। সব স্বাভাবিক মৃত্যু, কিন্তু ডিপার্টমেন্ট এটাও ভাবছে যে হয়তো ওই ভদ্রলোকই তাঁর কোনো লুজ এন্ডকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই চক্করে ঘুম গিয়েছে উধাও হয়ে, শুধু মনে হচ্ছে, এবারে কি তাঁর পালা? স্ত্রী সীমা লক্ষ করেছেন ব্যাপারটা, কিন্তু তিনি আলাদা করে কিছু বলছেন না। পেশায় পোস্ট অফিসের ক্লার্ক সীমা খুব ভালো করেই জানেন তাঁর স্বামীর কাজের জায়গাটা কীরকম গোলমেলে। তাই তিনি জিজ্ঞেস করেন না। কিন্তু বিগত ছ’মাস ধরে তাঁর স্বামীর ব্যবহারে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, এমন কিছু একটা হয়েছে যেটা হাসিখুশি মানুষটাকে একদম দমিয়ে দিয়েছে। সাত্যকি নিজেও বুঝতে পারছেন পুরো ব্যাপারটা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলছে। স্ত্রীর সঙ্গে বেশ কয়েক বার হালকা ঝামেলা পর্যন্ত হয়ে গেছে তাঁর, যেখানে তিনি ঝগড়াঝাঁটি একদম পছন্দ করেন না। কিন্তু, কিছু করার নেই। মন ভালো না থাকলে, এরকম হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আর সত্যি কথা বলতে কী, এই ঝামেলা না মেটা অবধি তিনি শান্তিতে থাকতে পারবেন না। প্রতিদিন অফিস থেকে তাঁর পুরোনো নিসান গাড়িটা নিয়ে বেরনোর সময় এই কথাগুলো চিন্তা করেন সাত্যকি। রোজকার কাজের মাঝেও তাঁর মনে এই প্রশ্নটা মাথাচাড়া দেয়— কবে একটু শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন আবার? আর এর জন্য ওই লোকটাকে খুঁজে বের করা খুব দরকার। সত্যিই দরকার। অফিস থেকে প্রায় তিরিশ মিনিট ড্রাইভ করলে তিনি বাড়ি পৌঁছবেন, স্ত্রী সীমা ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আজ বাপের বাড়ি গেছেন সাহারানপুরে, দশেরার ছুটি আছে কিনা। কিন্তু সাত্যকি দুবের জীবনে এখন ছুটি নেই। মনে হয় এই ছুটি যেন তাঁর জীবনে তখনই আসবে যখন সেই ব্যক্তিটির খোঁজ পাওয়া যাবে। কিন্তু ওখানেই তো সমস্যা। গোটা ডিপার্টমেন্ট জানে, নিজে না দেখা দিতে চাইলে ওই লোকটির খোঁজ কেউ পাবে না। বলা হয়, প্রয়োজনে শয়তানের সঙ্গেও দিব্যি তাস খেলে শয়তানের পেটের খবর বের করে নিয়ে চলে আসবেন তিনি, আর শয়তান টেরও পাবে না। এরকম লোকের সংস্পর্শে থাকাটা একদিকে যেমন আশীর্বাদ আবার অন্যদিকে সেটা অভিশাপও।

গাড়ি চালাতে-চালাতে এরকমই আকাশ-পাতাল ভাবছিলেন সাত্যকি। সময় কখন পেরিয়ে গেছে তিনি টেরও পাননি। আর আজ কেন জানি না বাড়ির দিকে যেতে ইচ্ছে করছিল না। কী মনে হল, তিনি গাড়ি সোজা এগিয়ে নিয়ে গেলেন হাইওয়ের দিকে। একটু লং ড্রাইভে গেলে মনে হয় ভালো হবে। মাথাটা ঠান্ডা হবে। জানালার কাচ নামিয়ে দিলেন। আজ পরিবেশ একটু হলেও মনোরম হয়ে রয়েছে। গরম কম আছে আজ, বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর হাইওয়ের ধারে একটা ধাবা দেখতে পেলেন সাত্যকি। ধাবার নামটি বেশ অদ্ভুত— এরিয়া-৫১ ধাবা। মাঝে-মাঝেই এখানে আসেন তিনি, যখন একা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এখানকার মালিক, কর্মচারী সবাইকেই একরকম চিনে গেছেন তিনি। আর তাঁর মনে পড়ল, সারাদিন পেটে সেভাবে কিছুই পড়েনি। একটা ভেজ স্যান্ডউইচ ছাড়া কিছুই খেতে পারেননি তিনি। কিছু একটা না খেলেই নয়। ধাবার সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নামলেন তিনি। ভেতরে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসার সঙ্গে-সঙ্গে ধাবার সদাহাস্যময় মালিক সরতাজ সিংহ এসে বললেন, “কী দুবেজি, এতদিন পর?”

সাত্যকি স্মিত হেসে বললেন, “আর কী সিংজি, কাজের যা চাপ চলছে তাতে আর আসার টাইম পাচ্ছি কোথায়! এই যে দেখছেন, এখনও অফিস করতে হচ্ছে, যেখানে গোটা মুলুক উৎসব করছে।”

ধাবার মালিক সিংজি হেসে বলেন, “তা যা বলেছেন! এ-ই তো চলে আমাদের। আপনারও ছুটি নেই, আমারও ছুটি নেই। যা-ই হোক, রেগুলার অর্ডার নেবেন? না কি স্পেশাল?”

ধাবার মালিকের দিকে তাকিয়ে সাত্যকি বললেন, “আজ স্পেশাল লাগবে। সঙ্গে কড়া কিছু।”

সিংজি হাসলেন, “স্পেশাল অর্ডার? সঙ্গে কড়া জিনিস? ভাবিজি মনে হচ্ছে বাড়ি নেই?”

সিংজির হাস্যময় মুখের দিকে তাকিয়ে এতক্ষণে একটু হালকা লাগল সাত্যকির। ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি, স্ত্রীর সঙ্গে চলা একটা চাপা অশান্তি, কাজের চাপ— সবকিছুর থেকে যেন একটু বেরনোর রাস্তা পেলেন। তিনি হেসে বললেন, “শাদি তো করেননি, বুঝবেন না!”

“সহি বোলে, দুবেজি। একটা রুমালি রোটি, বাটার চিকেন উইথ এক্সট্রা বাটার, আর ওল্ড মঙ্ক এখনই আসছে আপনার জন্য। আর ওল্ড মংক আজ আমি খাওয়াচ্ছি ধরে নিন। আপনি এতদিনের পুরোনো কাস্টমার, এটুকু তো করতেই পারি। তা-ই না?” বলে সিংজি হেসে চলে গেলেন অন্যদিকে।

চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন সাত্যকি দুবে। বাড়িতে ঘোরতর নিয়মের মধ্যে থাকতে হয় তাঁকে। স্ত্রী নিরামিষাশী, বাড়িতে তাই আমিষ চলে না একদমই। কিন্তু কাজের প্রয়োজনে প্রায় গোটা দেশে ঘুরেছেন সাত্যকি, মাঝে-মাঝে দেশের বাইরেও যেতে হয়েছে। তাই খাবার নিয়ে তাঁর অন্তত ছুঁৎমার্গ নেই। আর আজ যা হল, তারপর এটা দরকার, ভীষণভাবেই দরকার। খাবার চলে এসেছে এর মধ্যেই, খিদে-পেটে এই গরম রুটি আর মাংস যেন অমৃতের মতো লাগছিল। সাত্যকি দুবে খেতে সত্যিই ভালোবাসেন, যদিও সেটা তাঁর মাঝারি রূপ থেকে বোঝার উপায় নেই। আর এই খাওয়ার অভ্যাসটাও সেই ভদ্রলোকই ধরিয়েছিলেন। রুমালি রুটি দুটো শেষ করে ওল্ড মঙ্কে একটু- একটু করে চুমুক দিতে লাগলেন সাত্যকি। আহ্, পরম শান্তি! এতক্ষণে মনে হয় সব যেন ঠিকঠাক হল। সারাদিনের কাজের ঝামেলা তো আছেই। পিএম পরের মাসে তাইওয়ান যাত্রা করবেন, সেটা নিয়ে এখন পড়শি দেশ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে পারে সেটাও চোখে রাখতে হচ্ছে। এমনিতেই দেশের উত্তর- পূর্বদিকে পড়শি দেশের তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক প্রভুদের ‘নেকনজর’ একটু বেশি পরিমাণেই থাকে। সেদিকে যাতে তারা বেশি বাড়াবাড়ি না শুরু করে সেজন্য আর্মি অফিশিয়ালদের সঙ্গেও মিটিং করতে হচ্ছে সাত্যকিদের গোটা টিমকে। এর ওপর এসে জুটেছে এই ডিপার্টমেন্টের এনকোয়ারি!

এমন সময় ধাবার কাউন্টারের ল্যান্ডলাইন টেলিফোনটি বেজে উঠল, সেটা ধরে সিংজি সাত্যকি দুবেকে ডাকলেন, “ও স্যারজি, আপকে লিয়ে কল হ্যায়।”

সাত্যকি একটু বিরক্ত হলেন। ওল্ড মঙ্ককে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। কোনোরকমে টলতে-টলতে কাউন্টারের কাছে গিয়ে, ফোনটা ধরতেই তিনি শুনতে পেলেন একটা চেনা কণ্ঠস্বর, “দুবে? আর ইউ অ্যালাইভ?”

আহ্! সেই ভদ্রলোক ফোন করেছেন।

“আরে, বর্মাস্যার! কী খব্বর? আপনি তো মশাই হাওয়া একদম, হ্যাঁ? আর আপনি এখানে কল করছেন? আমার নম্বর ভুলে গেলেন? দাঁড়ান দাঁড়ান, আমি এখানে আছি আপনি জানলেন কী করে? নজর রাখছেন, স্যার? হ্যাঁ? বিগ ব্রাদার ওয়াচিং?” বলে খিক-খিক করে হেসে উঠলেন সাত্যকি দুবে।”

“সে তুমি যা বুঝবে। তুমি বুদ্ধিমান লোক, দুবে। যাই হোক, খবর তো চাঙ্গা, কিন্তু তার আগে খবর তুমি দেবে। বলছি ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারিতে কী চলছে?”

“আরে স্যারজি, আপনি খবর পেয়ে গেছেন দেখছি! আজ তো আমারই এনকোয়ারি ছিল। বিশ্বাস করবেন না, কীভাবে গ্রিলিং করেছে আর কত কিছু বলেছে! কিন্তু আমি কিচ্ছু বলিনি। এই যে দশ বছর আমরা কাজ করেছি, কত ডেটা অ্যানালিসিস করেছি আপনার জন্য, ওরা জানতে পেরেছে? একদম না। কতবার আমরা একসঙ্গে মাল খেয়েছি। ওরা জানতে পেরেছে? একদম না। এই যে আপনি উধাও হওয়ার এক সপ্তাহ পরেই আমাকে দিয়ে ওই ডুবে যাওয়া গ্রিক নামের কোম্পানির কাগজপত্র চেয়ে পাঠালেন, আমি বসন্ত বিহার বাস ডিপোর ডাস্টবিনে রেখে দিয়ে এলাম। শুধু আপনার জন্য কিন্তু! জানতে পেরেছে? একদম না! আপনার জন্য জানও হাজির আছে, স্যার!” ওল্ড মঙ্কের সুরে সুর মিলিয়ে রীতিমতো বুক ঠুকে বলছেন সাত্যকি দুবে।

ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বরে একটা বিস্ময় ফুটে উঠল, “কী বললে? তুমি অলিম্পাসের নথি আমাকে দিয়েছ? আমি তো তোমাকে দিতে বলিনি এগুলো!”

“কিউঁ মজাক কর রহেঁ হ্যায়, স্যারজি? আরে আপনিই তো সদিবসা গলায় ফোন করে বললেন। আপনার গলা আমি চিনব না? হা হা হা, কী যে বলছেন না! আচ্ছা শুনুন, আই নিড টু সুসু নাউ। বাদ মে বাত করেঙ্গে। বাই বাই, স্যারজি।” ফোনটা রেখে তিনি এগিয়ে গেলেন বাথরুমের দিকে। সেখান থেকে ফিরে এসে আবার মনোনিবেশ করলেন ওল্ড মঙ্কে। ওটাই মুখ্য জিনিস এখন, বাকি সব গৌণ।

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর তিনি যখন উঠে দাঁড়ালেন, তখন টের পেলেন তার পা টলছে একটু-একটু। এখন ন্যাশনাল হাইওয়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। কোনোরকমে কাউন্টারে গিয়ে তিনি বিলটা মেটাতে-মেটাতে সিংজিকে বললেন, “ইয়ে… মানে, সিংজি, খাবারটা খুব ভালো ছিল। আর ইয়ে, মানে ওল্ড মঙ্কটাও। কিন্তু আমি তো এখন গাড়ি চালাতে পারব না। একটা ট্যাক্সি ডেকে দেবেন? বাড়ি যাব!”

সিংজি তাঁর দাড়ি চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “এখন তো কোনো ট্যাক্সি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না! ওই গাড়ি ভাড়া করার অ্যাপ না কীসব আছে না? সেগুলোতে দেখতে পারেন। অনেক ড্রাইভার তো এইদিকে আসেই। হয়তো আপনাকে নিয়ে যেতে পারবে। আর গাড়ি নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমাদের পার্কিং স্পটে রেখে দিন। কাল এসে নিয়ে যাবেন।”

একগাল হেসে বললেন সাত্যকি দুবে, “সিংজি, তুসসি গ্রেট হো! আপনার এখানে এলেই মনে হয় আমি মন খুলে হাসতে পারি।” বলে মানিব্যাগটা পকেটে ঢোকাতে-ঢোকাতে তিনি পকেট হাতড়াচ্ছিলেন, কিন্তু না, মোবাইল ফোনটা পকেটে ছিল না। কোথায় গেল ফোন? একটু মাথা ঘামাতেই মনে পড়ল, আরে, ফোনটা তো গাড়িতেই রয়ে গেছে! চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছিল, গাড়িতে পাওয়ার ব্যাঙ্কের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে এসেছিলেন। আবার একগাল হেসে বললেন, “মাথাটা গেছে। একদম বুরবক বনে গেছি। ফোন তো গাড়িতেই রয়ে গেছে! সেই গাড়িতেই যেতে হবে! গাড়িতে উঠেই গাড়ি বুক করব। বুঝলেন সিংজি?” বলে তিনি টলোমলো পায়ে শুরু করলেন হাঁটা।

পেছন থেকে সিংজি বললেন, “একটু সামলে চলুন, দুবেজি। নাহলে এক কাজ করুন, আমাদের এখানেই থেকে যান নাহয়।”

গাড়ির কাছে গিয়ে তিনি বামহাতের বুড়ো আঙুলটা তুলে দেখালেন। গাড়িতে বসে কোনোরকমে মোবাইলটা খুঁজে বার করে অ্যাপটা অন করে সেখানে দেখলেন কাছাকাছি কোনো গাড়ি আছে কি না! আর ভাগ্য ভালো ছিল সাত্যকি দুবের। গাড়ি সত্যিই ছিল একটা। গাড়িটাকে বুক করলেন তিনি। এবার অপেক্ষা করতে হবে। দেখা যাক মহানুভব আসেন কখন। কিন্তু না, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতেও হল না। দুই মিনিটের মধ্যেই সেই গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে গেল সাত্যকির নীল নিসান গাড়িটির পাশে। সাত্যকি চোখ কচলে দেখলেন পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো ইন্ডিকা গাড়ি। গাড়ি থেকে একজন মহিলা ড্রাইভার বেরিয়ে এসে বলছে, “গাড়ি বুক করেছিলেন, স্যার?”

অ্যাপের দিকে তাকিয়ে সাত্যকি বললেন, “হ্যাঁ, করে তো ছিলাম। কিন্তু, ইয়ে… মানে, এই অ্যাপ তো বলছে গাড়ি আসতে নাকি এখনও দশ মিনিট নেবে?”

কালো শার্ট আর নীল জিন্‌স পরা সেই মহিলা আলতো হেসে বলল, “ওটা নিয়ে ভাববেন না। অ্যাপ এ-রকম ভুলভাল জিনিস বলে। চলে আসুন, আমিই আপনার ড্রাইভার। যেখানে যাবেন সেখানেই নিয়ে যাব।”

সাত্যকি দুবের শরীরে যেন রক্তচলাচল হঠাৎ বেড়ে গেল। তিনি তাকিয়ে রইলেন সেই মহিলার দিকে। চুল পনিটেল করে বাঁধা, বয়স খুব বেশি হলে ত্রিশের মধ্যে হবে। আর শরীরের গঠন স্বয়ং বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভঙ্গ করাতে সক্ষম! আর সীমার সঙ্গেও আজকাল সেভাবে কিছু করা হয় না। সাত্যকি জিভ চেটে বললেন, “ইয়ে মানে যেখানে বলব সেখানেই?”

মহিলা ড্রাইভার মোহময়ী হাসি হেসে বলল, “যেখানে বলবেন সেখানেই!”

সাত্যকি কোনরকমে তাঁর ব্যাগটা নিয়ে বেরোলেন, তারপর মোবাইলটা পকেটে ঢোকানোর চেষ্টা করতে-করতে একগাল হেসে বললেন তিনি, “বেশ, চলো, আজ আমাকে জন্নতের সফর করাও।”

মহিলা গাড়ির দরজা খুলে বলল, “চলে আসুন, জাহাঁপনা। জন্নত থেকে জাহান্নম, সবখানের সফর করিয়ে দেব।”

দুবেজি সিটে গা এলিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “মাইসেল্ফ সাত্যকি দুবে।”

মহিলা ড্রাইভার হাতটা আলতো করে ধরে একটা মোহময়ী হাসি হেসে বলল, “মাইসেল্ফ শবনম।”

সাত্যকি দুবের শরীরে এবার রক্তচলাচল সত্যিই অনেকটা বেড়ে গেল। আহ্, দিনটা খারাপ গেলেও রাতটা খারাপ যাবে না মনে হচ্ছে। দেখতে না দেখতে গাড়িটা বেরিয়ে গেল। সিংজি লক্ষ করলেন সবটাই, মুচকি হেসে স্বগোতক্তি করলেন, “ঠারকি সালা!”

এর ঠিক দশ মিনিট পরই সেখানে এল একটি সুজুকি অলটো গাড়ি। সেখান থেকে ছোটোখাটো চেহারার ড্রাইভার বেরিয়ে এসে এদিক-ওদিক খুঁজছিল কাউকে। তারপর সে এসে ধাবার কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “গাড়ি ডেকেছিলেন আপনি বা আপনাদের কেউ?”

সিংজি সেই ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, “হ্যাঁ, একজন কাস্টমার গাড়ি ডাকবে বলেছিল। কিন্তু সে তো বেরিয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ! তাকে তো গাড়ি এসে নিয়ে চলে গেছে!”

ওই ড্রাইভার খেঁকিয়ে উঠল, “ধুর, আমি তো এই এলাম। আর এই দেখুন এখনও প্যাসেঞ্জারের লোকেশন এই ধাবাই দেখাচ্ছে!” বলে সে মোবাইলটা বের করে দেখাল। অ্যাপে দেখাচ্ছে সাত্যকি দুবে এই গাড়িটি বুক করেছিলেন। সিংজির কপালে একটা গভীর ভাঁজ দেখা দিল। কী হল ব্যাপারটা? তিনি দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন সাত্যকির গাড়ির দিকে। আর সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন, ধুলোর মধ্যে পড়ে রয়েছে ওঁর ফোন! সাত্যকি চলে গেছেন দূরে কোথাও। আর এমন সময় সেই ফোন ভাইব্রেট করে উঠল, সিংজি ফোনটা তুলে ধরতেই একটা গলা শুনতে পেলেন, “দুবে? আর ইউ দেয়ার? জবাব দাও, ইডিয়ট!”

সিংজি একটু ইতস্তত করে বললেন, “না স্যারজি, আমি তো সরতাজ সিং, এরিয়া-৫১ ধাবার মালিক। আপনি সাত্যকি দুবেকে খুঁজছেন? দুবেজি তো দশ মিনিট আগে একটা গাড়িতে করে বেরিয়ে গেছেন।”

ওপাশ থেকে গলাটা বলে উঠল, “শিট! গাড়িটা কী ছিল বা কে চালাচ্ছিল বলতে পারো?”

সিংজি বললেন, “তা তো জানি না। তবে একজন লেডিজ ড্রাইভার ছিল। আচ্ছা স্যারজি, আপনি কে? দুবেজির বন্ধু বলছেন কী?”

ওপাশের গলাটা চেঁচিয়ে উঠল, “আমি কে না জিজ্ঞেস করে গাড়ি যেদিকে গেছে সেদিকে এখনই যাও। আমি প্রতি পনেরো মিনিটে ফোন করব।” ফোনটা কেটে গেল। ওই গলার মধ্যে কিছু একটা ছিল যেটা সিংজিকে নাড়িয়ে দিল, তিনি ড্রাইভারকে বললেন, “ভাই, এক কাম কর। তুই আমাকে নিয়ে চল এই হাইওয়ে ধরে। একটু সাবধানে চালাবি। যতদূর যেতে হবে চল। টাকা নিয়ে ভাবিস না। আমি দেব।”

ড্রাইভার একটু গাঁইগুঁই করল প্রথমে, তারপর সিংজির বোঝানোতে রাজি হয়ে গেল। হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলল অলটো গাড়িটি। বেশিক্ষণ লাগল না, পনেরো মিনিট যেতে না যেতেই সিংজি দেখলেন রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা কালো ইন্ডিকা গাড়ি। কী মনে হতে ড্রাইভারকে গাড়িটিকে দাঁড় করানোর জন্য বললেন। ড্রাইভার প্রথমে শুনতে পায়নি, যখন শুনতে পেল তখন গাড়িটি বেশ কিছুটা এগিয়ে এসেছে। প্রায় একশো মিটার দূরে এসে গাড়িটি দাঁড়াল। সিংজি গাড়ি থেকে নেমে এসে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন অন্য গাড়িটির দিকে। পাশ দিয়ে একের পর এক গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে, কেউ দাঁড়াচ্ছে না। সময় নেই কারওর এই ব্যস্ত শহরে। গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে উঁকি মারতেই বুকটা ধক্ করে উঠল সিংজির, সাত্যকি দুবে ড্রাইভারের সিটে বসে আছেন। তার চোখদুটো খোলা, আর ঠোঁটের কোণে একটু ফেনা লেগে আছে। সিংজি আরও দেখলেন সিটের পাশে রয়েছে একটা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ আর একটা মদের বোতল নিচে পড়ে রয়েছে। কিছুক্ষণ আগেও যেই লোকটা দিব্যি হাসছিল সে এখন আর বেঁচে নেই! ভাবতে পারছিলেন না সিংজি। দূরে একটা পুলিশের গাড়ি আসছিল, কোনোরকমে হাত তুলে সেটাকে দাঁড় করালেন সিংজি। দেখতে না দেখতে পুলিশ সেই জায়গাটাকে ঘিরে দিল, একটা অ্যাম্বুলেন্সও চলে এল। খবরের গন্ধ পেয়ে ভিড় জমিয়েছে মিডিয়াও। এরই মধ্যে এরিয়া-৫১ ধাবার মালিক সরতাজ সিং টের পেলেন ফোনটা বাজছে। ফোনটা ধরতেই শুনতে পেলেন ওপাশ থেকে সেই আগের কণ্ঠস্বর আবার শোনা যাচ্ছে, “খবর? বেঁচে আছে না মরে গেছে?”

সিংজি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?”

“এরিয়া-৫১ ধাবার মালিকের নাম্বার পাবলিক করা আছে সেখানকার ফেসবুক পেজে। এসব কথা ছেড়ে আগে এটা বলো, দুবে বেঁচে আছে না মরে গেছে?”

সিংজি ধরা গলায় বললেন, “মনে হয় বেঁচে নেই। ওই কালো রঙের ইন্ডিকা গাড়ির ড্রাইভারের সিটে ছিলেন দুবেজি। কিন্তু আমার ধাবা থেকে যখন বেরিয়েছিলেন তখন কিন্তু তিনি গাড়ি চালানোর মতো অবস্থায় ছিলেন না। একটা গাড়িই এসে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল।”

ওপাশ থেকে গলাটা বলে উঠল, “এই কথাগুলো পুলিশকে বলেছ?” সিংজি একটু আমতা-আমতা করে বলার চেষ্টা করলেন, “হ্যাঁ… মানে, না… মানে…

“কেটে পড়ো ওখান থেকে। আর আজ রাতটা সাবধানে থেকো।”

ফোনটা কেটে গেল। সিংজি কেমন যেন হতভম্বের মতো সেখান থেকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। পুলিশ বলছিল তাঁকে যে দরকারে আবার হয়তো থানায় আসতে হবে। কিন্তু কানে কিছু যাচ্ছিল না। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল তার। এখনও সিংজি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে, কিছুক্ষণ আগেও যে লোকটা তাঁর ধাবায় এসে খেয়ে গেল সে আর নেই! এই চিন্তার মধ্যে ডুবে থেকেই তিনি উঠে বসলেন সেই অলটো গাড়িতে। তিনি খেয়ালও করলেন না, অলটো গাড়ির ড্রাইভার বদলে গেছে। এখন গাড়ির আসনে যে বসে রয়েছে তার পরনে কালো জামা, নীল জিন্‌স, চুল পনিটেল করে বাঁধা, যার রূপ দেখে সাত্যকির মনে হয়েছিল এঁকে দেখলে বিশ্বামিত্রেরও তপস্যা ভঙ্গ হতে বাধ্য! আর আগের ড্রাইভার? তার প্রাণহীন ছোটোখাটো শরীরটি ওই অলটো গাড়িরই ডিকির মধ্যে রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *