৮. নভেম্বর ১৯ রাত দশটা

৮. নভেম্বর ১৯ রাত দশটা

একটা অদ্ভুত নীলচে আলোর মধ্যে ভাসছিলেন ডক্টর নাগ। সে এক অদ্ভুত আলো, ওতে যেন ঢেউ খেলছে একটু-একটু করে। সেই ঢেউরাজির মধ্যে যেন এক আলাদা স্পন্দন রয়েছে। ডক্টর নাগের মনে হল এই নীলচে আলোর মধ্যেও যেন প্রাণ আছে! ওর মধ্যে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন তিনি, কিন্তু ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। একবার নয়, বারবার চেষ্টা করলেন তিনি, কিন্তু ভারসাম্য খুঁজে পেলেন না। অনেকবারের চেষ্টায় যখন তিনি উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হলেন, তখন তাঁর নিজেকে রবার্ট ব্রুসের মতো মনে হল। উঠে দাঁড়ানোর পরই তিনি দেখতে পেলেন সেই নীলচে আলোর মেঝের ওপর তৈরি হচ্ছে এক কালো ধোঁয়ার স্তম্ভ। একটু-একটু করে সেটি তার দিকে এগিয়ে আসছে। ডক্টর নাগ সেখান থেকে সরে যেতে চাইলেন, কিন্তু তিনি দেখলেন সেই নীলচে আলোর মেঝে থেকে সরু-সরু কতগুলো সরীসৃপ যেন পা বেয়ে উঠছে একটু-একটু করে। তার মনে হচ্ছে তিনি যেন এক অদৃশ্য নাগপাশে বাঁধা পড়েছেন। যতই চেষ্টা তিনি করুন না কেন, নড়তে পারছেন না তিনি। আর সেই ধূম্রস্তম্ভ তাঁর একদম সামনে চলে এসেছে। ডক্টর নাগ স্পষ্ট দেখতে পেলেন সেই ধূম্ৰস্তম্ভ আস্তে-আস্তে একটা মুখের আকার ধারণ করছে। হাজার বছর ধরে এক অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে চলা সেই মুখের অধিকারী পরজীবী সত্তা তো এখন ডক্টর নাগের ভেতরে বন্দি হয়ে রয়েছে, তাহলে ডক্টর নাগ এখন কার মুখোমুখি হয়েছেন? ভাবার সময় পেলেন না তিনি। ওই অপার্থিব ধোঁয়াটে মুখ ডক্টর নাগকে গ্রাস করে ফেলেছে ততক্ষণে।

তলিয়ে যাচ্ছেন সেই ধোঁয়ার ভেতর ডক্টর নাগ। হঠাৎ দেখতে পেলেন সেই ধোঁয়ার মধ্যে একটা হাত গজিয়ে উঠছে! ধোঁয়া দিয়ে তৈরি হলেও ডক্টর নাগ যেন স্পষ্ট দেখতে পেলেন সেই হাতের শিরা-উপশিরাগুলি। তিরের মতো সেই হাত ছুটে এল ডক্টর নাগের নাভির দিকে। আর তখনই ডক্টর নাগ শুনতে পেলেন একটা চিৎকার, “বোধি! জেগে ওঠো! নয়তো তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলবে!”

সেই ধোঁয়ার মধ্যেও ডক্টর নাগ দেখতে পেলেন এক আলোর ফুলকি, ওই ধোঁয়াটে হাতটি ডক্টর নাগকে ছোঁয়ার আগেই তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন সেই আলোর দিকে। মুহূর্তের মধ্যে সেই আলো যেন ডক্টর নাগকে টেনে নিল নিজের মধ্যে। চোখ ধাঁধিয়ে গেল ডক্টর নাগের। একটু একটু করে আলো কমে এলে তিনি নিজেকে একটা চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় পেলেন। এদিক-ওদিক চোখ মেলে তাকাতে তিনি দেখলেন তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়েছে একটা পুরোনো ঘরের মধ্যে। মেঝেতে রয়েছে একটা হ্যারিকেন, সেই হ্যারিকেনের আলোয় ডক্টর নাগ দেখতে পেলেন দেয়ালের রং খসে গিয়েছে, সামনে আরও একটা চেয়ার রয়েছে। ওতে বসে রয়েছে অর্জুন, আর পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে শবনম। ডক্টর নাগকে দেখে অর্জুন বলে উঠল, “জেগে উঠেছেন দেখছি?”

“উঠতেই হত, নাহলে ঘুমন্ত অবস্থায় আমার ওপর বারবার আক্রমণ করা হত যে। অবশ্য আমাদের ভেতরে যে রয়েছে, তার এই বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতা রয়েছে এটাও ঠিক।” ডক্টর নাগের কথা একটা স্পষ্ট শ্লেষের ছোঁওয়া ছিল। অর্জুন কিছু বলল না অবশ্য। ডক্টর নাগ জিজ্ঞেস করলেন, “শবনমকে আমাকে মারার জন্য পাঠিয়েছিলে বলে তো মনে হয় না। ওকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করাই বোধ হয় তোমার উদ্দেশ্য ছিল, তা-ই না?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “ফুল মার্কস, ডক্টর।”

“তাহলে এতদিন অপেক্ষা করলে কেন? আমার শারীরিক অবস্থার অবনতির জন্য?”

“ফুল মার্কস এগেইন, ডক্টর। আপনি সত্যিই খুব ভালো ছাত্র ছিলেন।” বলে উঠল অর্জুন। ডক্টর নাগ তাকিয়ে রইলেন অর্জুনের দিকে। অর্জুন স্বাভাবিক অবস্থায় এতটা কথা বলত না। ও ‘কথা কম কাজ বেশি’ গোছের মানুষ। সেখানে এই অর্জুন এতটা বেশি কথা বলছে? এটা কি আদৌ অৰ্জুন? না কি ওকে পুতুলের মতো চালনা করছে ওর ভেতরের পরজীবী? কারণ, রুদ্র যখন ডক্টর নাগের কাছে এসেছিল, ও নিজের সত্তাকে যেভাবেই হোক একটা সময় অবধি ধরে রাখতে পেরেছিল। ডক্টর নাগ অর্জুনকে জিজ্ঞেস করলেন, “একবার তোমার ভেতরের জনের সঙ্গে কথা বলাবে, অর্জুন?”

“আপনি যা বলার আমাকেই বলুন।” অর্জুন ঠান্ডা স্বরে উত্তর দিল।

“আচ্ছা, বেশ। আমার ভেতরে যে রয়েছে তাকে চুরি করে কী করবে ভাবছ? আমি জানি সে প্রলয় আনতে চায়। কিন্তু প্রলয় আনতে হলে তোমাদের তো একটা আদর্শ আধারের দরকার হবে। গতবার তো নাহয় আমাকে সে আধার হিসেবে ভেবেছিল। এবারে কাকে ভেবেছে সে?” প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে অর্জুনের দিকে তাকিয়ে রইলেন ডক্টর নাগ।

অর্জুন চুপ করে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “সেটা আপনার না জানলেও চলবে ডক্টর।”

“কেন? সে জানতে দিতে চায় না? তার কড়া আদেশ আছে বুঝি? অবশ্য ঠিকই আছে, তুমি বরাবরই আজ্ঞাবহ দাস হিসেবে আদর্শ। সুতরাং তুমি যে তার কথা শুনে চলবেই সে নিয়ে তো দ্বিমত নেই।” মুচকি হাসলেন ডক্টর নাগ।

অর্জুন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ডক্টর নাগের দিকে, তারপর বলল, “এভাবে অবান্তর কথা বলে আপনি সময় নষ্ট করার চেষ্টা করছেন বুঝতে পারছি। কিন্তু লাভ হবে না। নিষ্কাশন প্রক্রিয়া আবার শুরু হবে।”

ডক্টর নাগ জোরে হেসে উঠলেন এবার, সেই হাসি শুনে অর্জুন এবং শবনম দুজনেই যেন একটু চমকে উঠল। ডক্টর নাগ হেসে বললেন, “বৎস অর্জুন, তোমার মুখ থেকে যে কথাগুলো বেরিয়ে আসছে সেগুলো আর যা-ই হোক তোমার নিজের কথা নয়। আমি খুব ভালো করেই বুঝি। তাই তোমার ভেতরের অতিথিকে বলো সরাসরি কথা বলতে। এত ভনিতা না করলেও হবে।”

অর্জুনের চোখ-মুখ এবার রাগে ফুলে উঠল, ও মুখ থেকে খুলে ফেলল ওই মুখোশটা। তারপর ও এগিয়ে এসে ডক্টর নাগের ডান গালে সজোরে কষাল একটা চড়। ডক্টর নাগ ‘পিচ্’ করে মেঝেতে একটু থুতু ফেললেন,

তিনি বুঝতে পারলেন ঠোঁট ফেটে গিয়ে একটু রক্ত বেরোচ্ছে সেখান থেকে। অর্জুনের নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তার ভেতরের অতিথির সেটা একদমই নেই, বরং সেই সত্তা তার অনিয়ন্ত্রিত রাগের জন্য পরিচিত। মুচকি হাসলেন ডক্টর নাগ, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এসেছেন, হে দ্রোণপুত্র?”

একটা বিজাতীয় ঘড়ঘড়ে শব্দ বেরিয়ে এল এবার অর্জুনের গলা থেকে, আর সেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে সে উত্তর দিল, “এতবার ডাকলে তোমাদের ঈশ্বরও তো দেখা দেন, প্রবুদ্ধ মানব। আর তোমার শেষ সময়ের আগে যখন এত করেই ডাকছ তাই চলে এলাম।”

“এসেছেন বেশ করেছেন। এবারে কথা না বাড়িয়ে আমার ভেতর চলে আসুন। আপনার অর্ধাংশ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে যে।”

আরও একটা চড় আছড়ে পড়ল ডক্টর নাগের বাম গালে। চড়ের অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে একটু হলেই ডক্টর নাগ চেয়ার সমেত পড়ে যাচ্ছিলেন। তার জামার কলার ধরে অর্জুনের ভেতর থেকে সেই পরজীবী বলে উঠল, “আদেশ করার জায়গায় তুমি নেই, প্রবুদ্ধ মানব। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তোমাকে হত্যা করেও আমি আমার অর্ধাংশকে মুক্ত করতে পারি!”

ডক্টর নাগ হাসলেন, “তা-ই বুঝি? পারবেন তো?”

ডক্টর নাগের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অর্জুন, কী বলতে চাইছে এই লোক? মেঝেতে আর একবার থুতু ফেলে ডক্টর নাগ বললেন, “আমার দেহের বিনাশ হলেও আমার তো বিনাশ হবে না। আমার আত্মার বিনাশ তো অসম্ভব! জানেন নিশ্চয়ই? আর আপনার অর্ধাংশ এখন আমার আত্মার মধ্যেই বন্দি হয়ে রয়েছে। জন্মান্তরের প্রক্রিয়ায় এই আত্মা নতুন কোনো দেহ খুঁজে নিলেও সে এই আত্মার সঙ্গেই থাকবে। নির্বাণলাভ তো সম্ভব নয়, কিন্তু আপনার অর্ধাংশকে নিয়ে মহাপ্রস্থানের পথে পাড়ি দিতেই পারি।”

অর্জুন চুপ করে রইল, তারপর ওর ভেতর থেকে সেই পরজীবী চিৎকার করে উঠল, “না! মিথ্যে বলছ তুমি! তুমি মিথ্যে বলছ! এটা সম্ভব নয়।”

“সে-জন্যই তো বলছি, আমার সঙ্গে এসে আপনার অর্ধাংশকেই জিজ্ঞেস করে নিন। চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন হয়েই যাবে। কী বলেন?” বলেই জিভ কাটলেন ডক্টর নাগ, “ও হো, মানসিক পরজীবীদের তো আবার চক্ষুকর্ণ থাকে না। থাকে নাকি?”

এবার ডক্টর নাগের চোয়ালে আছড়ে পড়ল একটা ঘুষি। চেয়ার সমেত উলটে পড়ে গেলেন ডক্টর নাগ। এক মুহূর্তের জন্য ডক্টর নাগের মনে হল তিনি যেন চোখে সর্ষেফুল দেখলেন। এত জোরালো ঘুষি আরও কয়েকটা খেলে ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি অবধারিত! অর্জুন ওদিকে পুতুলের মতো চেয়ার সমেত ডক্টর নাগকে তুলে আবার বসিয়েছে আর হিসহিসিয়ে বলছে, “বিশ্বাস করি না, তোর একটা কথাও বিশ্বাস করি না! তুই মিথ্যাবাদী! সবক’টা মানুষের মতো তুইও মিথ্যাবাদী। বিশ্বাস করি না। এত ক্ষমতা তোর নেই!”

চোয়াল নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে ডক্টর নাগের রীতিমতো। তিনি কোনোরকমে বললেন, “সেটা নেই। আমি সত্যিই সাধারণ মানুষ। আমার ক্ষমতা নেই। কিন্তু যেভাবেই হোক নিজেকে একটু হলেও জানতে পেরেছি। আর সেই বিশ্বাস থেকেই বলছি যা বলার। আপনি নিজের স্বার্থের জন্য প্রলয় আনতে চান আমি জানি। আর সেটাকে আটকানোর জন্য যখন আপনাকে নিজের মধ্যে বন্দি করেছিলাম গত বছর, তখন জেনেশুনেই বিষপান করেছিলাম। যদি প্রলয় আসেই তাহলে আমার ভেতরে আসুক। এই বহির্জগতে নয়।”

“কাদের জন্য এতটা যন্ত্রণা সহ্য করবে হে? কাদের জন্য? এই আত্মঘাতী মানবজাতির জন্য?” কিছুটা অবিশ্বাসের সুর ভেসে এল অর্জুনের দিক থেকে। ডক্টর নাগ হাসলেন, “কারওর জন্য না, আবার সবার জন্য।”

“কী পাবে এর বিনিময়ে?”

“শান্তি!” হাসলেন ডক্টর নাগ। এই কথাটা বলে নিজেই যেন এক অদ্ভুত শান্তি পেলেন ডক্টর নাগ। আর তিনি বুঝতে পারলেন এই কথাগুলো হয়তো তিনি নিজেই নিজেকে বলছেন। কয়েক দিন আগেও যখন নিজের ক্যানসারের খবর পেয়ে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তখন এক মুহূর্তের জন্য এই কথাগুলো তিনি নিজেই ভুলে গিয়েছিলেন প্রায়! অবশ্য তিনি তো বোধিসত্ত্ব, বুদ্ধ তো নন! নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন ডক্টর নাগ। অর্জুন বা অর্জুনের মধ্য দিয়ে সেই পরজীবী তখনও দেখে যাচ্ছে ডক্টর নাগকে। সে যেন এখনও সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারেনি ডক্টর নাগের কথা! এরই মাঝে ডক্টর নাগের চোখ গেল শবনমের দিকে। শবনম এতক্ষণ পেছনে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। ডক্টর নাগ খেয়াল করলেন ওর শরীর কাঁপছে আবার। চোখ বারবার খুলছে আর বন্ধ করছে সে। তিনি বললেন, “দ্রোণপুত্র, আপনি আমার সঙ্গে পরেও বোঝাপড়া করতে পারবেন। কিন্তু তার আগে একটু ওই মেয়েটিকে দেখুন। ওর অবস্থা ঠিক মনে হচ্ছে না।”

“ওকে নিয়ে না ভাবলেও হবে। আমার খণ্ডাংশ ওর মধ্যে রয়েছে। তারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এটি। কিন্তু দুর্ভাগ্য! এই আধারের মাধ্যমে ওকে চালিত করা সম্ভব নয়। নাহলে তো কোনো সমস্যাই ছিল না।” অর্জুনের বিজাতীয় কণ্ঠস্বরের মধ্যে একটা বিরক্তি স্পষ্ট ফুটে উঠছিল। মুহূর্তের জন্য ডক্টর নাগের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই বাদামি রঙের ভায়ালটা। কী ছিল সেটার মধ্যে?

শবনম এদিকে অর্জুনের কাছে এগিয়ে এসে বলছে, “আমি থাকতে পারছি না। মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। আমার ওষুধটা চাই। প্লিজ! আমার ওষুধটা চাই!”

ডক্টর নাগ দেখলেন অর্জুনের বামহাতের উলটো দিক আছড়ে পড়ল শবনমের গালে, শবনম ছিটকে পড়ল মেঝেতে। অর্জুনের গলা থেকে ওই ঘড়ঘড়ে কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল, “এখন বিরক্ত করবে না। নিষ্কাশন প্ৰক্ৰিয়া সম্পন্ন হবে। তারপর তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে।”

শবনম মেঝে থেকে একটু-একটু করে উঠে দাঁড়াল, ওর মাথা সামনে ঝুলে রয়েছে, ও যেন টলছে একটু একটু করে। প্রমাদ গুনলেন ডক্টর নাগ, মেয়েটি মনে হয় একটা অস্বাভাবিক কিছু ঘটিয়ে ফেলবে। আর হলও তা-ই। টলতে টলতে শবনম এগিয়ে এল অর্জুনের দিকে আর ওর পা ছুটে গেল অর্জুনের মাথা লক্ষ করে। অর্জুন বোধহয় এটা ঘুণাক্ষরেও আশা করেনি। ও হাত তুলে নিজেকে গার্ড করার আগেই শবনমের লাথি খেয়ে আছড়ে পড়ল মেঝেতে!

‘পারফেক্ট হাই-কিক! হেডশট ডেড!’ নিজের মনেই বলে উঠলেন ডক্টর নাগ। আর একজন মিক্সড মার্শাল আর্টিস্টের মতো এই হেড-কিক করেই শান্ত হয়ে বসে রইল না শবনম। ও অর্জুনের বুকের ওপর চেপে বসে শুরু করল গ্রাউন্ড অ্যান্ড পাউন্ড অ্যাটাক। অন্য কেউ হলে হয়তো শবনমের পাঞ্চ আর কনুইয়ের আঘাতে এতক্ষণে পঞ্চত্ব লাভ করত। কিন্তু অর্জুনের সেই সৌভাগ্য নেই। কারণ ওর ভেতরের অতিথি এত সহজে ওকে মরতে দেবে না। শবনম এদিকে মেরেই চলেছে পাগলের মতো অর্জুনকে। এমন সময় ডক্টর নাগ একটা তীক্ষ্ণ শিসের মতো শব্দ শুনতে পেলেন, তিনি দেখলেন একটা ডার্ট এসে বিঁধেছে শবনমের গলায়। দেখতে না দেখতে শবনম শান্ত হয়ে মেঝেতে এলিয়ে পড়ল। অর্জুন উঠে বসতেই পরপর দুটো ডার্ট এসে বিধল ওর গলাতেও। ওই অবস্থাতেও ও কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল। আবার ভেসে এল দুটো শিসের মতো শব্দ। অর্জুনের দীর্ঘকায় দেহটা কাটা কলাগাছের মতো আছড়ে পড়ল মেঝেতে। তারপর ঘরে ঢুকলেন এক মাঝারি উচ্চতার ভদ্রলোক, তিনি মুচকি হেসে বললেন, “সরি, ডক্টর; অ্যাপয়েন্টমেন্ট না নিয়েই চলে এলাম। তবে ঠিক সময়ে এলাম বলুন?”

একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন মানুষটির দিকে ডক্টর নাগ। এর মতো দয়ামায়াহীন মানুষ বোধহয় এ-জন্মে আর একজনকেও দেখেননি ডক্টর নাগ। এজেন্ট বাসুদেব বর্মা ঠোঁটের কোণে একটা আলতো হাসি ফুটিয়ে বলছেন ওদিকে, “তারপর ডক্টর? অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ নেই। কেমন চলছে সব?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *