১৫. নভেম্বর ১৯ বহির্জগতে সময় হয়েছে রাত এগারোটা পঁয়ত্রিশ
নিরুপমার ঘরে সবাই বসে ছিলেন। নিরুপমা আবার ঘুমিয়েছে তার বিছানায়। ওর মাথায় শবনম হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ডক্টর নাগ বসে রয়েছেন প্রফেসর দাসের পাশে। প্রফেসর দাস তখনও বাহাদুরের দেহের দিকে তাকিয়ে। এজেন্ট বর্মার মুখ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, কারণ সেই কাঠের আলমারির বেশ কিছু ভাঙা টুকরো ঢুকে রয়েছে তাঁর পায়ের মধ্যে। দেখে মনে হচ্ছে ডক্টর নাগের, ভদ্রলোকের পায়ের হাড় ভেঙে গেলেও যেতে পারে। অমিতাভ এসে সামলাচ্ছে তার বন্ধু অতনুকে। কারণ অতনুর জ্ঞান যখন এসেছিল তখন থেকে সে একটাই কথা বলে যাচ্ছে যে, সে ইচ্ছে করে খুন করেনি। অতনুর দিকে এগিয়ে গেলেন ডক্টর নাগ, তিনি ওর মাথায় হাত রাখলেন, “আমি জানি তুমি নির্দোষ, তুমি নিজে থেকে কিছু করোনি, অতনু। শান্ত হও। সব ঠিক হয়ে যাবে।” একটু-একটু করে অতনু শান্ত হয়ে গেল। তিনি প্রফেসর দাসকে বললেন, “বিকুদা, ঠিক আছ?”
প্রফেসর দাস বললেন, “আমার কথা ছাড়, বোধি। আমি ভাবছি নিরুপমার কী হবে। বাহাদুর নিরুপমাকে দেখে রাখত। শুধু তা-ই নয়, বাহাদুর নিরুপমার চোখ ছিল। ওর চোখ দিয়ে ও দুনিয়াটাকে দেখত। আমি জানি না কে নেবে বাহাদুরের জায়গা।”
এক মুহূর্তের জন্য ডক্টর নাগ শবনমের দিকে তাকালেন, তারপর তিনি বললেন, “আমার মনে হয় সেটা কোনো সমস্যা হবে না, বিকুদা।”
শবনমের দিকে তাকিয়ে প্রফেসর দাস বললেন, “ও পারবে?”
শান্তস্বরে হেসে বললেন ডক্টর নাগ, “পারলে একমাত্র ও-ই পারবে। দেখে নিয়ো।” তারপর তাঁর চোখ গেল বাহাদুরের দিকে, একই সঙ্গে তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল অর্জুনের প্রাণহীন দেহ। তিনি মনে-মনে বললেন, ‘তোমার আত্মার শান্তি কামনা করি। ভালো হোক। তোমার ভালো হোক। ‘
তিনি বললেন প্রফেসর দাসকে, “বাহাদুর এবং অর্জুনের পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া অবধি আমরা এখানেই রয়ে যাব।” অমিতাভ অতনুর পাশে বসে মাথা নাড়ল, সে রাজি আছে এই প্রস্তাবে।
ওদিকে এজেন্ট বর্মা বললেন, “বাবা বিগ বি, তার আগে একটু তোমার মোবাইলটা বের করে খবরগুলো চালাও তো। দেখতে হবে এই ভূমিকম্পের কোনো খবর আছে কি না!”
অমিতাভ ওর মোবাইলে খবরের চ্যানেলটা অন করতে না করতেই সেখানে ব্রেকিং নিউজ শুরু হয়ে গেল—
আজ সমগ্র পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারত এক দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্পের সাক্ষী থেকেছে। অনুমান করা হচ্ছে এই ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল বঙ্গোপসাগরের কোনো এক অংশ। রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্পের প্রভাবে রাজ্যজুড়ে বেশ কিছু ইমারত ভেঙে পড়েছে, কিছু বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে, এমনকি বেশ কিছু পাহাড়ি রাস্তায় ধসও নেমেছে।
ডক্টর নাগের কাঁধে হাত রাখলেন এজেন্ট বর্মা, “আমি জানি না আপনি কী করেছেন, কিন্তু আজ হয়তো আপনার জন্য আমরা বেঁচে গেলাম। এই ভূমিকম্প আর একটু বেশি সময় ধরে হলে বা এর তীব্রতা বেশি হলে আমরা সবাই স্বর্গ বা নরকে চলে যেতাম। উই রিয়ালি ডড এ বুলেট।”
স্মিতহাসি হাসলেন ডক্টর নাগ। জীবন সত্যিই এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা, কখন কার কাছে কী চলে আসে কেউ জানে না। তিনি তাঁর বুকে একটা চাপা স্পন্দন টের পেলেন। সেই উষ্ণ অনুভূতি এখনও রয়ে গেছে সেখানে। তিনি শুনতে পাচ্ছেন সেই কিশোর কণ্ঠের ডাক— “সমর্পণ করো, তাহলেই সব ঠিক হবে।”
***
নভেম্বর ২৬
রাত দশটা
পানশালায় বসে দেশি মদে চুমুক দিচ্ছিল মাইকেল, পানশালায় আজ তুমুল হইহট্টগোল চলছে। ভূমিকম্পের পর আজ সবাই একটু সুযোগ পেয়েছে গলা ভিজিয়ে নেওয়ার। সেই সুযোগে মাইকেলও এসেছে আজ। দেশি মদের সঙ্গে দেশি মুরগির রোস্ট! আহা! পুরো অমৃত। এমন সময় তার সামনে ক্রাচ নিয়ে এসে দাঁড়াল একটি মূর্তি। তার দিকে তাকিয়ে মাইকেলের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি খেলে গেল, “আরে, বর্মাস্যার! সব ঠিক?”
চেয়ার টেনে কোনোরকমে বসতে-বসতে এজেন্ট বর্মা বললেন, “আর ঠিক! খোঁড়া হতে-হতে বেঁচে গেছি। যা-ই হোক, সময় নেই বেশি, কাজের কথায় আসি?”
“একদম, স্যার।” মাইকেলের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল।
“জিনিসটা আছে?” এজেন্ট বর্মা জানতে চাইলেন।
“আছে তো, স্যার।” মাইকেলের হাসিটা আরও চওড়া হল।
“তাহলে দাও সেটা। আর আমি তোমাকে তোমার পাওনা বুঝিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি।” এজেন্ট বর্মার কথা শুনে মাইকেল একটু মুচকি হাসল। তারপর বলল, “স্যার, ধান্দার উসুল হচ্ছে যে, এর কোনো উসুল নেই। বুঝলেন তো? তাই যেটা আপনি চাইছেন সেটা আমি অন্য আর একজনকে দেব বলে ঠিক করেছি। আপনি আমাকে যা দেবেন তার চার ডবল দাম দেবে সে।”
এজেন্ট বর্মা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন মাইকেলের দিকে, তারপর তিনি পেছন ফিরে তাকালেন। পেছনের চেয়ার ছেড়ে উঠে এল এক বিশালকায় মূৰ্তি, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে, ক্রু-কাট চুল, একটা সরু গোঁফ রয়েছে, গলার ঝুলছে একটা লাঙলের লকেট। পরনে নীল টি-শার্ট আর কালো কার্গো প্যান্ট। ওর দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়লেন এজেন্ট বর্মা, “অনেক দিন পর দেখা হচ্ছে।”
সেই মূর্তিও আলতো হেসে বলল, “একদম। তাহলে যাওয়া যাক? কারণ এই অবস্থায় তুমি পালানোর চেষ্টা করবে না বলেই আমি জানি।”
“কতজন আছে এখানে? দশজন? না, সাতজন তো হবেই। একা তো তুমি আসবে না!”
মুখের মধ্যে একটা কাজুবাদাম পুরে দিয়ে হাতটা ওপরে তুলল সেই মূৰ্তি, দেখতে-দেখতে সেই পানশালায় উঠে দাঁড়াল সাতজন শক্তপোক্ত চেহারার লোক। ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন এজেন্ট বর্মা, “আহ্, তোমাকে নিয়ে আটজন, হিসেবে সামান্য ভুল হল! যা-ই হোক। চলো বাবা, কোথায় নিয়ে যাবে এবার। চলো। আর কী কী চার্জ লাগাবে সেটাও একটু শুনে নিই তোমাদের থেকে।”
“সব ঠিক সময়েই জানতে পারবেন। আপাতত চলুন। আমি স্পেশাল সার্ভিসেসের তরফ থেকে মেজর বলদেব গুজ্জর আপনাকে হেফাজতে নিচ্ছি।”
“স্পেশাল সার্ভিসেস? এটা কবে হল আবার? তুমি প্যারা-তে ছিলে না?” ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলেন এজেন্ট বর্মা। মুচকি হাসল বলদেব, “গতকালই হয়েছে। পিএম-এর ডিরেক্ট আন্ডারে আমরা আসি।”
“আহা! দেবু গঙ্গাধরন তাহলে পার্সোনাল হিট স্কোয়াড বানিয়েছে!”
“বয়েজ, টেক হিম,” বলে এজেন্ট বর্মাকে বাকিদের হাতে জিম্মা করে দিল বলদেব। তারপর সে তাকাল মাইকেলের দিকে, “জিনিসটা?”
“এই তো, স্যার। এই যে।” বলদেবের হাতে তুলে দিল সেই বাদামি রঙের ভায়ালটা। বলদেব সেটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর সে একটা এয়ারটাইট ব্যাগে ঢুকিয়ে রওনা দিল দরজার দিকে। ওদিকে মাইকেল একটু হকচকিয়ে ডেকে উঠল, “স্যার, আমার ইয়েটা?”
বলদেব এগিয়ে এল মাইকেলের দিকে, তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে হিসহিসিয়ে বলল, “এই তোমাকে জিন্দা ছেড়ে দিচ্ছি তোমার ইললিগাল কারবারের সঙ্গে, এটাই তোমার ‘ইয়ে’। আর তোমার এই ‘ইয়ে’ যদি বজায় রাখতে চাও, তাহলে খবর যেমন-যেমন আসার তেমন-তেমন যেন আসতে থাকে। বোঝা গেল?” বলে পানশালা থেকে বেরিয়ে গেল বলদেব। বেরিয়ে গিয়ে সে একটা নম্বর ডায়াল করল, ওপাশ থেকে একটা মসৃণ গলা ভেসে এল।
“স্টেটাস, মেজর গুজ্জর?”
“টার্টারাসের লাস্ট স্যাম্পল পাওয়া গেছে, স্যার।”
“গুড। কাম ব্যাক ইমিডিয়েটলি। উই শুড স্টার্ট ওয়ার্কিং
“রজার দ্যাট, স্যার।”
ফোন কেটে এগিয়ে গেল বলদেব। কিন্তু বাইরে বেরনোর সঙ্গে-সঙ্গে সে দেখতে পেল কালো রঙের ভ্যানের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ওই সাতজন স্পেশাল সার্ভিসেসের লোক। বলদেব হুংকার দিয়ে উঠল, “কী হলটা কী?”
একজন কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমরা সাবজেক্টকে ভ্যানে তুলছিলাম তখনই একটা লোক এসে আমাদের অ্যাটাক করে। আর সেই সুযোগে সাবজেক্ট আমাদের ক্রাচের আঘাতে আহত করে সেই লোকটার সঙ্গে পালিয়ে যায়।”
নিষ্ফল আক্রোশে চিৎকার করে উঠল বলদেব। যা-ই হোক, মিশন পুরো ফেল তো হয়নি! ওই সিরাম তো এখন ওদেরই কাছে।
ওদিকে রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে একটা বাইক। বাইক চালাচ্ছে অমিতাভ, আর পেছনে বসে রয়েছেন এজেন্ট বাসুদেব বর্মা। এজেন্ট বর্মা বলে উঠলেন, “বিগ বি, তোমার এই কথায় কথায় অ্যাংরি ইয়ং ম্যান না সাজলেই নয়?”
বাইক চালাতে চালাতেই বলল অমিতাভ, “স্যার, মাঝে-মাঝে দিমাগের বদলে দিলের কথাও শুনতে হয়।”
“এসেছে রে আমার সনিমার ফ্যান!” চোখ ওলটালেন এজেন্ট বর্মা।
“কিন্তু, স্যার, সিরামটা তো হাতছাড়া হয়ে গেল!” বলল অমিতাভ।
মুচকি হাসলেন এজেন্ট বর্মা, “হয়েছে কি?”
অমিতাভ বলল, “কী বলছেন? হয়নি?”
এজেন্ট বর্মা মুচকি হাসলেন, “এই সিরাম পানশালাতে ঢোকার মুখেই একটা ভিখারির কাছ থেকে পেয়েছিলাম। আর মাইকেল তো এই শহরের ইন্টেরিম বাদশা ছিল। আসল বাদশা তো এখন আমাদের ডক্টরসাহাবের বাড়িতে ঘোলের সরবত বানাচ্ছে!”
সশব্দে হেসে উঠলেন এজেন্ট বর্মা। যেদিন মহেশ, ফরিদকে শেষ দেখা দেখতে গিয়েছিল সেদিনই ওকে এই অফারটা দিয়েছিলেন এজেন্ট বৰ্মা। মহেশ নিজের জন্য কিছু চায়নি, ওর দাবি ছিল, দুটো অনাথ বাচ্চাদের জন্য প্রতি মাসে একটা মোটা টাকা চাই, আর ডক্টর নাগকে একলা ছেড়ে দিতে হবে। এই ডিলে রাজি হবে না কোন পাগলা? আর ফরিদের তৈরি করা নেটওয়ার্কের ধারেকাছে কেউ আসতে পারবে না। যতদিন এই নেটওয়ার্ক আছে ততদিন তিনি ঠিক আছেন। এবারে তিনি তাকালেন ওই এয়ারটাইট ব্যাগে রাখা বাদামি রঙের ভায়ালটার দিকে। মনে মনে ভাবলেন তিনি, ‘কী করি তোমায় নিয়ে, হে সখি?”
সামনে থেকে অমিতাভ বলে উঠল, “জানেন, স্যার, কেমন যেন মহাপ্রস্থানের পথে চলেছি বলে মনে হচ্ছে!”
এজেন্ট বর্মা কথাটা শুনে একটু ভাবলেন যেন কিছু, তারপর বললেন, “একটা ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড় করাও তো।”
অমিতাভ বাইক দাঁড় করাল, এজেন্ট বর্মা কোনোরকমে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে একটা নম্বর ডায়াল করলেন। ওপাশে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “বাসু?”
“ইয়েস, স্যার। বলছি ‘স্যার’ বলব না কি ‘দেবু গঙ্গাধরন’ বলব?”
“লিসেন, এজেন্ট বাসুদেব বর্মা। লেটস টক অ্যাবাউট ইট।”
“স্যার, টক করব বলেই তো কল করেছি। আপনিই আমাকে লাগালেন এই বেঁচে থাকা ভায়াল খুঁজে বার করতে, আবার আমার পেছনে আমারই এজেন্সি আর আপনারই হিট স্কোয়াডকে লেলিয়ে দিলেন, স্যার? এ কেমন ইনসাফ, স্যার?”
“দেখুন, এজেন্ট বর্মা, আমাদের কাছে উপায় ছিল না। উই নিডেড ইউ টু টেক দ্য ফল।”
“আমি তো পড়ে গেলাম, স্যার; কিন্তু ওই সিরামকে নিয়ে ওই গাম্বাট বলদেব কী করতে যাচ্ছিল? আপনারা কি আবার সেই সুপার সোলজার প্রজেক্ট শুরু করতে যাচ্ছিলেন নাকি?”
“আই থিঙ্ক ইউ শুড নট ক্রস দ্য লাইন, এজেন্ট। আই অ্যাম ইয়োর প্রাইম মিনিস্টার।”
“ইয়েস স্যার, অ্যান্ড দ্যাট’স প্রিসাইজলি হোয়াই আই মাস্ট ক্রস দ্য লাইন। ইউ আর মাই প্রাইম মিনিস্টার অ্যান্ড ইউ শুড আনসার মি।”
মুহূর্তের নীরবতার পর এজেন্ট বর্মা আবার বললেন, “এসব কথা ফোনে বললে ভুল বোঝাবুঝি বাড়বে, স্যার। এর থেকে ভালো হয় আমরা সামনা-সামনি কথা বলি, কেমন? ডেট অ্যান্ড লোকেশন আমি বলে দেব। আর হ্যাঁ, সুপার সোলজার সিরাম টার্টারাসও আমার কাছে আছে। ওই বলদেব যেটা পেয়েছে সেটা ফক্কা। যা-ই হোক, স্যার, আসি এখন। জয় হিন্দ।”
তিনি মোবাইলটা রাস্তায় আছাড় মেরে সেটাকে ভেঙে ফেললেন। তারপর অমিতাভকে বললেন, “চলো, এবারে আমরা মহাপ্রস্থানের পথে যাব।”
