১০. নভেম্বর ১৯ রাত এগারোটা পনেরো
একটা বেশ বড়োসড়ো বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেল গাড়িটা। অমিতাভ ফোন করে ডাকছে ওর বন্ধুকে। এর মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটার দিকে তাকালেন ডক্টর নাগ। আর দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভাবলেন, ‘এখানেই আসতে হল?’
এর মধ্যেই অমিতাভর বন্ধু এসে গেট খুলে দিয়েছে, আর সে বলছে, “কী ব্যাপার, অমিত? এত রাতে এত লোকজন নিয়ে এসেছিস যে? ডাকাতি করার প্ল্যান আছে নাকি?”
অমিতাভ এগিয়ে সিট থেকে নেমে বলল, “সব বলব, ভাই। কিন্তু আগে গাড়িটাকে ভেতরে কোথাও পার্ক করার ব্যবস্থা কর।”
“হ্যাঁ, সে ঠিক আছে, ভেতরে রাখার ব্যবস্থা আছে। তুই আয় আগে। আর এতদিন কোথায় ডুব মেরে ছিলিস? র’ ছিপ মেরে তোকে তুলে নিল আর তুইও বেপাত্তা হয়ে গেলি। হ্যাঁ?” অমিতাভর বন্ধু তখনও বলে চলেছে।
“হবে, ভাই, সব কথা হবে। আগে গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিই।” বলে গাড়িটা চালিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল অমিতাভ। বলাই বাহুল্য শবনম এবং এজেন্ট বর্মা ভেতরেই বসে ছিলেন। ডক্টর নাগ এখনও গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি ভেতরে ঢোকেননি। তাঁর দিকে তাকিয়ে অমিতাভর বন্ধু বলে উঠল, “ও কাকু, বাইরে কেন? ভেতরে আসুন।” ডক্টর নাগ এক’পা-দু’পা করে গেট পেরিয়ে ঢুকলেন ভেতরে। কোনোদিন এই বাড়ির মুখোমুখি হবেন তিনি ভাবেননি। নিয়তি তাঁকে এখানেই নিয়ে এল শেষমেশ! ছেলেটি ডক্টর নাগের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি অমিতকে কীভাবে চেনেন? ও আমাদের সঙ্গেই কলেজে পড়ত। তারপর এদিক-ওদিকে কীসের যেন ট্রেনিং না কোর্স না কীসব করে বেড়াচ্ছিল। তারপর র’ ওকে ছিপ দিয়ে তুলে নিয়ে চলে যায়। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে কিন্তু। ও হ্যাঁ, আমি তো বলিইনি আমি কে। আমি অতনু।”
ডক্টর নাগ অতনুর দিকে তাকালেন, ছেলেটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে সত্যিই। ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। অতনু একটু থতমত খেয়ে গেল যেন ডক্টর নাগের হাসি দেখে। সদর দরজার সামনে ততক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এজেন্ট বর্মা, অমিতাভ আর শবনম। ওঁদের দিকে তাকিয়ে বলল অতনু, “যা- ই হোক, চলে আসুন ভেতরে আপনারা। কাকু এখনও জেগেই আছেন। এত তাড়াতাড়ি ঘুমনোর অভ্যাস নেই তার। যদিও আমি চান্স পেলেই ঘুমিয়ে পড়ি।”
দরজা ঠেলে তাঁরা ভেতরে ঢুকে গেলেন। শুরুতেই পড়বে একটা বড়োসড়ো ড্রয়িংরুম। সেখান থেকে ডানদিকে গেলে দুটো বেডরুম, বামদিকে গেলে ডাইনিং রুম, আর কিচেন। সামনে রয়েছে এই বাড়ির মালিকের স্টাডিরুম। অতনু সেখানে গিয়েই দরজায় আলতো টোকা দিয়ে বলল, “কাকু, চলে এসেছে ওরা।”
দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ, মাথার চুলে অল্প পাক ধরেছে, বয়স ডক্টর নাগের মতোই হবে। একটা সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে রয়েছেন তিনি, আর গায়ে জড়িয়ে রেখেছেন একটা সাদা চাদর। ব্যক্তিত্ব এমনই ভদ্রলোকের যে আর পাঁচজন সহজে কথা বলার সাহসই করবে না। কিন্তু ভদ্রলোকের বন্ধুবৃত্তে যাঁরা রয়েছেন তাঁরাই জানেন তিনি আসলে কেমন। আর সেই বৃত্তে খুব বেশি মানুষ থাকেন না, এটাই হচ্ছে ব্যাপার। অতনু বুঝিয়ে বলতে গেল কিছু একটা, কিন্তু ভদ্রলোক হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিলেন। তারপর তিনি গটগট করে হেঁটে এগিয়ে গেলেন ডক্টর নাগের দিকে। ডক্টর নাগ রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করছেন, কিন্তু চেষ্টা করছেন নিজেকে স্বাভাবিক রাখার। ভদ্রলোক ডক্টর নাগের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “ডক্টর বোধিসত্ত্ব নাগ! এখানে কী মনে করে?”
একটু গলাখাঁকারি দিয়ে ডক্টর নাগ বললেন, “ওয়েল, প্রফেসর বিক্রমাদিত্য দাস, নিজের ইচ্ছেয় আসিনি, আমাদের একজন এই জায়গার কথা সাজেস্ট করেছিল তাই এসেছি।”
“শেষ কবে এসেছিলে মনে আছে?” স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন ডক্টর নাগের দিকে প্রফেসর বিক্রমাদিত্য দাস।
মাথা নীচু করে রইলেন কিছুক্ষণ ডক্টর নাগ, তারপর তিনি বললেন, “সাতাশ বছর, সাত মাস, সতেরো দিন আগে।”
“এখনও দিন গোনার অভ্যাসটা গেল না?” প্রফেসর দাসের গলায় যেন একটা হালকা শ্লেষের ছোঁয়া শোনা গেল। ডক্টর নাগ উত্তর দিলেন না কোনো কী উত্তর দেবেন উনি জানেন না। “সেদিনের ঘটনার পর তোকে আমি ইউএসএ-র হাসপাতালে দেখে এসেছিলাম। তখনও তোর জ্ঞান ফেরেনি। আর তুই, ইডিয়ট, দেশে ফেরার পর একবার আসিসনি এখানে? কেন?” চিৎকার করে উঠলেন প্রফেসর দাস।
“তোমার বোন আমার ফেইল্ড এক্সপেরিমেন্টের জন্য এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে। কোন মুখে তোমার সামনে দাঁড়াতাম?” আস্তে-আস্তে বললেন ডক্টর নাগ।
“শাট আপ, ইউ ইডিয়ট! আমি নিজে একজন সায়েন্টিস্ট। আমি জানি কিছু-কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি কতটা থাকে। অনেকবার আমি নিজে মরতে-মরতে বেঁচেছি। তারার সঙ্গে যেটা হয়েছিল সেটার জন্য কষ্ট আমি পেয়েছিলাম সত্যি কথা, কিন্তু তোকে কোনোদিন দায়ী করিনি। আর আমি জানি, ওই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট যদি কেউ পেয়ে থাকে সেটা তুই। কোথায় না তুই আমার এখানে আসবি, যাতে নিজেকে সারিয়ে তুলতে পারিস, না বাবু সেটা করলেন না! বাবু নিজেকে আইসোলেট করে দিলেন! সে-জন্য তোর ওপর রাগ হয়েছিল। বেশ করেছি তোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখিনি আমি! তুই এলি কেন এখানে? চলে যেতিস গেট থেকেই। এখনও সময় আছে। যা, বেরো এখান থেকে।” বলে তিনি অতনুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই অন্তু, ওকে ওর গঙ্গার ধারের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আয় তো। আর যদি কখনও এ-মুখো হয় ওকে ভুল করেও ভেতরে ঢুকতে দিবি না।”
অতনু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, অমিতাভ হাঁ করে দেখছে সব, শবনমও বোঝার চেষ্টা করছে যে, হচ্ছেটা কী। মাঝখানে একটা চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে মিটিমিটি হাসছেন এজেন্ট বর্মা। ডক্টর নাগ প্রফেসর দাসের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “সরি, বিকুদা।”
বয়স্ক মানুষটি জড়িয়ে ধরলেন ডক্টর নাগকে। প্রফেসর দাসের এই ধরনের শক্ত করে জড়িয়ে ধরার সঙ্গে বিলক্ষণ পরিচিত ডক্টর নাগ, উনি ততক্ষণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখবেন যতক্ষণ না দমবন্ধ হবার উপক্রম হয়। বিক্রমাদিত্যের এই বজ্র আলিঙ্গনে নিজেকে একটা পুতুলের মতো মনে হচ্ছিল ডক্টর নাগের, তিনি কোনোরকমে বললেন, “ঠিক আছে, বিকুদা। এবারে ছাড়ো। দম নিতে পারছি না।”
“নে, ছাড়লাম তোকে। তোর কপাল ভালো, নইলে ধৃতরাষ্ট্র ওই লোহার ভীমের যেমন অবস্থা করেছিল সেই অবস্থা আমি তোর করে দিতাম।” চোখ মুছে বললেন প্রফেসর দাস। ডক্টর নাগ দেখলেন এতক্ষণে তাঁর মুখে একটু হাসি ফুটেছে। তিনি বললেন, “এবারে বল এই মাঝরাত্তিরে এখানে কী মনে করে? অন্তুর ওই বন্ধুকে তো আমি চিনি। কিন্তু বাকিদের তো চিনি না!”
এবারে চেয়ার থেকে এজেন্ট বর্মা উঠে দাঁড়ালেন, “নমস্কার, স্যার। অ্যালাউ মি টু ইন্ট্রোডিউস মাইসেলফ। আমি বাসুদেব বর্মা। র-এর সঙ্গে যুক্ত। এই যে ‘বিগ বি’-রূপী মূর্তিমানকে দেখছেন, এঁকে রিক্রুট করার পেছনে আমারই হাত ছিল, কিন্তু এটা সবাই জানে না। জানলে আজ এ বেঁচে থাকত না। ওই যে মেয়েটিকে দেখছেন, ও শবনম, ওর হাতেই এর মৃত্যু হত। আর হ্যাঁ, আর একজন গাড়িতে এখনও রয়েছে। তাকে আনা দরকার, তবে অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে। বুঝলেন তো, স্যার?” বলে তিনি অমিতাভর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবারা একটু জলদি গিয়ে দেখো তো আমাদের বন্দির কী অবস্থা? আর হ্যাঁ, তাকে নিয়ে এসো এখানে। জলদি করো বাবারা, জলদি করো!”
অমিতাভ অতনুর দিকে ইশারা করল। অতনু গজগজ করা শুরু করল, “কোথায় ভাবলাম তুই আসবি, একটু মাল-ফাল খাব, তা নয়, কীসব ভুলভাল ঝামেলা!”
এমন সময় ডক্টর নাগ কাশতে শুরু করলেন, কাশির দমকে তিনি মেঝেতে বসে পড়লেন প্রায়। মুখ থেকে বেরিয়ে এল বেশ কিছুটা রক্ত, পকেট থেকে রুমাল বের করে তিনি মুখটা মুছলেন। পাশে তখন প্রফেসর দাস একটা বোতল এগিয়ে দিয়ে বলছেন, “একটু জল খেয়ে নে, বোধি। আর তোর এত কাশি হল কী করে? কাশির সঙ্গে রক্ত আসছে কেন? বোধি, তুই ঠিক আছিস?”
একটু জল খেলেন ডক্টর নাগ। জল খেয়ে বোতলটা এজেন্ট বর্মাকে ফিরিয়ে দিয়ে একটু চুপ করে বসে রইলেন তিনি। তারপর বললেন, “শরীর জবাব দিয়ে দিয়েছে, বিকুদা। লাং ক্যানসার, লাস্ট স্টেজ। ডাক্তার বলেছে, সময় বেশি নেই। এখন কবে গ্রিম রিপার এসে তুলে নিয়ে যাবে সেটাই দেখার।”
বজ্রাহতের মতো তাকিয়ে রইলেন প্রফেসর দাস, শবনম ওর মুখে হাত চাপা দিয়েছে, ওরা কেউই বিশ্বাস করতে পারেনি কথাটা। এজেন্ট বর্মার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ডক্টর নাগ, “আপনি তো নিশ্চয়ই জানতেন? আমার ওপর গত বছর থেকেই তো নজর রেখেছিলেন আপনি?”
এজেন্ট বর্মা এই প্রথমবার মেকি অভিব্যক্তির মুখোশটা সরিয়ে ডক্টর নাগের দিকে তাকালেন, ওর চোখে প্রথমবার একটা সহানুভূতির ছাপ দেখতে পেলেন ডক্টর নাগ। তিনি বললেন, “ইয়েস, ডক্টর; আমি জানি সবটাই। এই অবস্থাতেও যে আপনাকে ট্রাবল নিতে হচ্ছে সেটার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু বুঝতেই পারছেন কিছু করার নেই।”
“দ্যাটস ওকে, মিস্টার বর্মা। কোনো ব্যাপার নয় এটা। কপালে ছিল তা-ই হয়েছে। এই নিয়ে আক্ষেপ নেই কোনো।
প্রফেসর দাস একটু অধৈর্য হয়েই জিজ্ঞেস করলেন, “বোধি, পুরো ব্যাপারটা কী… বলবি আমাকে? আমার কিছুই মাথায় ঢুকছে না।”
“লম্বা ঘটনা, বিকুদা। সময় লাগবে একটু। কিছু ঝামেলা বাকি আছে, সেটা মেটাতে হবে আগে। ওই অমিতাভ আর অতনু যাকে আনতে গেছে তার মধ্যে এমন একজন লুকিয়ে বসে আছে যাকে বের করে আমার মধ্যে আনতে হবে। নইলে প্রলয় চলে আসবে।” কাশি চাপতে চাপতে বললেন ডক্টর নাগ।
প্রফেসর দাস একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ডক্টর নাগের দিকে, তারপর বললেন, “তুই কি কোনো সাইকিক প্রসিডিয়োরের কথা বলছিস?”
ডক্টর নাগ উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে বললেন, “বলতে পারো। কিছুটা ওরকমই।”
প্রফেসর দাস কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই এজেন্ট বর্মা বলে উঠলেন, “আপনারা এই থিয়োরি পরে আলোচনা করবেন, তার আগে আমাদের দেখা দরকার বিগ বি আর আপনার ভাইপো এত দেরি করছে কেন! গ্যারেজটা কোনদিকে, প্রফেসর?”
প্রফেসর দাস বললেন, “আসুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
এজেন্ট বর্মা শবনমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমিও এসো, শবনম। কে জানে কী অবস্থা হবে। তোমার স্কিলসেট খুব কাজে আসবে সেই সময়।” মাথা নেড়ে শবনম এগিয়ে এল ডক্টর নাগের দিকে, তারপর ও ডক্টর নাগের একটা হাত নিজের কাঁধে রেখে বলল, “আমি আছি, ডক্টরসাহাব। আমার সময় আপনি ছিলেন। আপনার সময়ও আমি থাকব। ক্যয়ামত চলে এলেও আমি থাকব।”
সবাই পিছু নিলেন প্রফেসর দাসের। সদর দরজা থেকে বেরিয়ে ডানদিকে মিনিট দুয়েক হাঁটলেই চলে আসে একটা টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর। একটা অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে সেখানে। ওই টিমটিমে আলোতে দেখা যাচ্ছে সেখানে দাঁড় করানো রয়েছে ওই এসইউভি গাড়িটি। আর গ্যারেজে ঢোকার মুখেই পড়ে রয়েছে একটি দেহ, কাছে গেলে দেখা গেল সেটি অমিতাভর প্রফেসর দাস ওর কাছে ছুটে গেলেন, ওর গলায় হাত দিয়ে বললেন, “পাল্স আছে এখনও, কিন্তু বেশ ক্ষীণ। অজ্ঞান করে দেওয়া হয়েছে ওকে। মিস্টার বর্মা, আপনার কাছে জলের বোতলটা আছে না?” এজেন্ট বর্মা ওর দিকে বোতলটি এগিয়ে দিলেন। বেশ কয়েকবার জলের ছিটে দেওয়ার পর অমিতাভর একটু- একটু করে জ্ঞান ফিরে এল। এজেন্ট বর্মা ওর কাছে এসে বললেন, “ঠিক আছ হে, বেরাদর? এমন অবস্থা হল কীভাবে?”
অমিতাভ কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। ওর গলায় বেশ জোরালো আঘাত লেগেছে, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে রীতিমতো। ডক্টর নাগ হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিলেন, কারণ অমিতাভর কিছু বলার দরকার নেই। তিনি দেখতে পেয়েছেন আর একটি দেহ। কাছে গিয়ে দেখলেন গাড়ির দরজার পাশে মেঝেতে পড়ে রয়েছে অর্জুন! পাল্স ধরারও দরকার নেই, দেখেই বুঝতে পারছেন ডক্টর নাগ ওর শরীরে প্রাণ অবশিষ্ট নেই। শুধু তা-ই নয়, ওই মৃতদেহের হাতে রয়েছে একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। দেখে শিউরে উঠলেন ডক্টর নাগ। তাঁর কাছে এসে ততক্ষণে দাঁড়িয়েছেন এজেন্ট বর্মা এবং বাকিরা। এজেন্ট বর্মা নিজেও হতবাক হয়ে গেলেন ওই দেহটিকে দেখে, তিনি বলে উঠলেন, “এর মানে কী?”
“এর মানে একটাই। স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে!” বলে তিনি তাকালেন প্রফেসর দাসের দিকে, “বিকুদা, নিরুপমা এখনও এখানেই আছে, তা-ই না?”
প্রফেসর দাস তাকালেন তাঁর দিকে, “তুই কী করে জানলি?”
“ম্যাক্সি ইমহোটেপ আমার ব্যাচমেট, বিকুদা। ওর কাছে সবই শুনেছি। ও আছে কোথায় এখন?” একটু মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ডক্টর নাগ।
প্রফেসর দাস বললেন, “ওই তো বেসমেন্টের ঘরে।”
“সেখানে যাওয়ার আর কোনো রাস্তা আছে?” প্রফেসর দাস বললেন, “সে তো আমাদের সিঁড়ির ঘর থেকেই যেতে হয়। তবে হ্যাঁ, সিঁড়ির ঘরের একটা দরজা বাইরে থেকে খোলা যায় ঠিকই, কিন্তু সেটার চাবি তো অতনু আর বাহাদুর ছাড়া কারুর কাছে থাকে না!”
অমিতাভ এর মধ্যেই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ও কোনোরকমে গাড়ির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, “অতনু ওদিকেই গেছে আমি শিয়োর। “ ডক্টর নাগ প্রফেসর দাসের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাও। আমার যদি ভুল না হয় ছেলেটা এখন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই! না গেলে একটা অঘটন ঘটে যাবে, বিকুদা। জলদি যাও। জলদি!”
প্রফেসর দাস এগিয়ে চললেন সিঁড়ির ঘরের দিকে। এজেন্ট বর্মা বললেন, “ডক্টর?”
ডক্টর নাগ বললেন, “আপনি শবনমকে নিয়ে এগোন, আমি অমিতাভকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসছি।” শবনম ডক্টর নাগের দিকে মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল এজেন্ট বর্মার সঙ্গে। ডক্টর নাগ কোনোরকমে অমিতাভকে ধরে-ধরে নিয়ে গেলেন ঘরের দিকে।
অমিতাভ কোনোরকমে বলছে তখন, “ব্যাপারটা না আচমকা হল জানেন তো, স্যার? আমি আর অন্তু দু’জনে যখন গাড়ির দরজাটা খুললাম তখনই আমার চোয়ালে ওই লোকটা সজোরে লাথি কষিয়ে দেয়! আমি জানি না ও কীভাবে ওই হ্যান্ডকাফকে খুলল! ও তারপর অন্তুর গলায় কামড়ানোর চেষ্টা করে। আমি পেছন থেকে ওকে আটকানোর চেষ্টা করি, কিন্তু পারিনি। ওর মাথার আঘাতে আমি ছিটকে পড়ি। তবে হ্যাঁ, ওই ধস্তাধস্তি চলার সময় ওই লোকটার জ্যাকেট থেকে একটা জিনিস আমার হাতে চলে আসে। সেটা জানি না কোনো কাজে লাগবে কি না।” বলে ও জামার ভেতর থেকে বের করে আনল একটা ছোটো রুলটানা খাতা।
সেটা নিয়ে ডক্টর নাগ অমিতাভকে বললেন, “ভেবো না এখন এগুলো নিয়ে। বিশ্রাম নাও। নাহলে তোমার অবস্থা আরও খারাপ হবে।” বলে তিনি ঘরের ভেতর দিকে এগোনোর চেষ্টা করলেন সিঁড়ির ঘরের দিকে। আগে এই বাড়িতে বহুবার এসেছেন, তিনি জানেন সিঁড়ির ঘরটা কোনদিকে। সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকে বিক্রমাদিত্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব, আর বিক্রমাদিত্যেরই মামাতো বোন তারার সঙ্গে এখানেই আলাপ। সিঁড়ির ঘর ছিল তাঁদের লুকিয়ে প্রেম করার জায়গা। বেশ কয়েকবার হাতেনাতে ধরা পড়তে-পড়তে বেঁচে গিয়েছিলেন। সেখানে একটা বেসমেন্ট আছে তিনি শুনেছিলেন, আজ সেখানে যাওয়ার সুযোগ হল তবে। কিন্তু সেটা এভাবে হবে ভাবেননি ডক্টর নাগ। যেতে-যেতে তিনি অর্জুনের নোটবুকটা উলটে-পালটে দেখছিলেন। অর্জুন সব ছক করেই এগিয়েছে, এবারের টার্গেট প্রথম থেকেই অন্য কেউ ছিল! এজেন্ট বর্মার ক্লোজড অ্যাসোসিয়েটসদের এক-এক করে নিকেশ করে ও এজেন্ট বর্মাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিল। আর খুব হিসেব কষেই বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল অমিতাভকে। কারণ অমিতাভ আর অতনু খুব ভালো বন্ধু। অর্জুন ভালোমতো বুঝেছিল, যদি এজেন্ট বর্মা কোনোভাবে এই ঘটনায় নিজেকে জড়িয়েও ফেলেন, তাঁকে এই অমিতাভর কাছ থেকেই সাহায্য নিতে হবে। ঘুরেফিরে অর্জুন তার ভেতরের পরজীবীকে তার আদর্শ আধারের কাছেই নিয়ে এসেছে, যাতে সে রুদ্রের মতোই প্রলয় আনতে সাহায্য করতে পারে! এতটা প্ল্যানিং কি অর্জুন একা করেছিল? মনে হয় না। অর্জুন আদেশ পালন করতে পারে খুব ভালো, কলকাঠি নেড়েছে ওর ভেতরের অতিথি!
নোটবুকটা জামার পকেটে ঢুকিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন সিঁড়ির ঘরের দিকে। মাথার ভেতর সেই অট্টহাসিটা আবার শুনতে পেলেন ডক্টর নাগ, “ধরতে পারোনি তো, প্রবুদ্ধ মানব? জানি ধরতে পারোনি। এত সহজ নয়।”
ঠিক সেই সময়ই শোনা গেল একটা গুলি চালানোর শব্দ! মনে মনে বলে উঠলেন ডক্টর নাগ, “সর্বনাশ!” দৌড় শুরু করলেন তিনি। মাথার ভেতর দ্রোণপুত্র চেঁচিয়ে চলেছেন ওদিকে, “প্রলয় এবার আসবেই হে, প্রলয় এবার আসবেই!”
