১২. নভেম্বর ১৯ রাত এগারোটা বত্রিশ

১২. নভেম্বর ১৯ রাত এগারোটা বত্রিশ

বেসমেন্টের ঘরে নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর নাগ টের পেলেন গোটা বাড়িটা যেন দুলে উঠল একবার। একটু হলেই তিনি টলে পড়ে যাচ্ছিলেন প্রায়। কোনোরকমে তিনি নিজেকে সামলে ঢুকে গেলেন ডানদিকের ঘরে। সেখানে মেঝেতে বসে রয়েছেন প্রফেসর দাস এবং শবনম। প্রফেসর দাসের কপাল ফেটে বেরিয়ে আসছে রক্ত। একটু দূরে পড়ে রয়েছে এক শক্তপোক্ত চেহারার মানুষের প্রাণহীন দেহ। প্রফেসর দাস কান্নাভেজা গলায় বলে উঠলেন, “বাহাদুরকে আমার চোখের সামনে শ্যুট করল অন্তু। আমি জানি না কেন হচ্ছে এরকম! আর বোধি, নিরুপমা ইজ লুজিং হার কন্ট্রোল। ও যদি নিজেকে না সামলায়, তাহলে ও শেষ হয়ে যাবে।”

বাহাদুরের কথা জানতেন ডক্টর নাগ। প্রফেসর দাসের সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল সে। তিনি এগিয়ে প্রফেসর দাসকে সান্ত্বনা দিতে যাবেন, তখনই বাড়িটা আবার দুলে উঠল, এবারের দুলুনিটা আরও মারাত্মক! ডক্টর নাগের মনে হল যেন পুরোনো আমলের এই বাড়িটা ধসে পড়বে তাদের ওপরেই। প্রফেসর দাস চিৎকার করে কিছু বললেন ডক্টর নাগকে। সেটা শুনে ডক্টর নাগ এক সেকেন্ডের জন্য তাকালেন ওর দিকে, তারপর তিনি এগিয়ে গেলেন। তিনি কোনোরকমে আর একটু এগোতেই দেখতে পেলেন এজেন্ট বর্মাকে। তাঁর পায়ের ওপর একটা আলমারি উলটে পড়ে রয়েছে, সেদিকে এগোতেই এজেন্ট বর্মা বলে উঠলেন, “আমাকে নিয়ে এখন ভাববেন না, ডক্টর। থিংস আর গোয়িং আউট অফ হ্যান্ড। আপনি ওই বাচ্চা মেয়েটিকে সামলান।” বলে তিনি ঘরে রাখা বিছানার দিকে ইশারা করলেন। সেদিকে মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলেন, বিছানায় শুয়ে আছে রুগ্‌ণ দেখতে একটি মেয়ে, আর ওর হাত রক্তাক্ত। আর মেয়েটির চারপাশে যেন একটা ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে! হঠাৎ ডক্টর নাগের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ছাব্বিশ বছর আগের এক্সপেরিমেন্টের রেকর্ডিং! সেদিনও এরকমই কিছু একটা হয়েছিল! ওদিকে বিছানার পাশেই অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে রয়েছে অতনু, ওর হাতে বিঁধে রয়েছে একটা কাচের টুকরো। স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে তবে! তিনি ওই প্রবল দুলুনির মধ্যেও এগিয়ে গেলেন নিরুপমার দিকে। এগিয়ে গিয়ে তিনি নিরুপমার কপালে হাত রাখলেন, জ্বরে কপাল পুড়ে যাচ্ছে যেন! নিরুপমার আজ্ঞাচক্রে বুড়ো আঙুল রেখে চাপ দিলেন তিনি। চোখ বন্ধ করে চেষ্টা করলেন মনঃসংযোগ করার। এই ভূমিকম্প তাঁকে সহজে মনঃসংযোগ করতে দিচ্ছে না মোটেও। চেষ্টা করেও পারছেন না ডক্টর নাগ। একটু হলেই তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি পড়লেন না, তিনি টের পেলেন পেছন থেকে তাঁকে শক্ত দুটো হাত যেন জড়িয়ে ধরল। একটা চেনা কণ্ঠস্বরও তিনি শুনতে পেলেন।

“আমি আছি, ডক্টরসাহাব। ক্যায়ামত এসে গেলেও আমি আপনাকে ছাড়ব না। এই লড়াই আপনার একার নয়। আমি আছি।”

শবনম! কৃতজ্ঞতায় তাঁর গলা বুজে এল প্রায়, কিন্তু না, আগে নিরুপমাকে বাঁচাতে হবে। আর নিরুপমার মাধ্যমে এই পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে। কারণ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে নিরুপমার একটা যোগ আছে নিশ্চয়ই। চোখ বন্ধ করলেন তিনি, আর দেখতে না দেখতে তিনি নিজেকে খুঁজে পেলেন লাভায় পরিপূর্ণ এক স্থানে। তিনি হাওয়ায় ভাসছেন। এটাই কি নিরুপমার মনের ভেতরের ঘর? এরকম অবস্থা কীভাবে হল? এদিক-ওদিক তাকাতেই তিনি দেখতে পেলেন মেয়েটিকে। মেয়েটি হাওয়ায় ভাসছে, কিন্তু তার চেতনা লুপ্ত হয়েছে। তার মুখ হাঁ করা, চুল উড়ছে, চোখের মণি উলটে রয়েছে! আর তার গলা থেকে বেরিয়ে আসছে এক অপার্থিব চিৎকার। যত সেই চিৎকারের মাত্রা বাড়ছে তত লাভার প্রবাহ বেড়ে চলেছে। ডক্টর নাগ এগিয়ে গেলেন মেয়েটির দিকে, ওকে শান্ত করতে হবে, নয়তো সব শেষ হয়ে যাবে! সেদিকে এগিয়ে যেতে না যেতেই তাঁর সামনে উপস্থিত হল এক জরাগ্রস্ত মূর্তি। একটা বিজাতীয় ঘড়ঘড়ে কণ্ঠস্বর ভেসে এল সেই জরাগ্রস্ত মূর্তির থেকে, “স্বাগতম, হে প্রবুদ্ধ মানব, স্বাগতম। প্রলয়ের রাজ্যে স্বাগতম।”

এগোনোর চেষ্টা করলেন আবার ডক্টর নাগ, কিন্তু তিনি পারলেন না। একটা অদৃশ্য দেয়াল তাঁকে বাধা দিল আবার। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “সরে যান, দ্রোণপুত্র। নইলে অনর্থ হবে!”

“হোক অনর্থ, হোক প্রলয়! এটাই আমি চাই। এটাই আমার সিদ্ধি। এটাই আমার মোক্ষ!” চিৎকার করে হেসে উঠলেন অশ্বত্থামা। ভাসমান অবস্থায় আবার এগিয়ে গেলেন নিরুপমার দিকে ডক্টর নাগ, এবারে অশ্বত্থামার জরাগ্রস্ত হাতদুটো তাঁকে চেপে ধরল, আর চোখের পলকে ছুড়ে দিল দূরে। এক মুহূর্তের জন্য ডক্টর নাগের মনে হল তিনি যেন সেই লাভার মধ্যে পড়ে যাবেন। কোনোরকমে তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর আবার এগিয়ে গেলেন, একবার নয়, বারবার। কিন্তু একবার তিনি নিরুপমার কাছেও পৌঁছতে পারলেন না। নিজেকে কেমন যেন অথর্বের মতো মনে হচ্ছিল তাঁর। এক নিষ্ফল আক্রোশে তিনি চিৎকার করে উঠলেন। অশ্বত্থামা তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে যাবেন, তখনই একরাশ চুল এসে চাবুকের মতো তাঁর হাত আর পা বেঁধে ফেলল। মুহূর্তের জন্য অবাক হলের ডক্টর নাগ, এ তো শবনমের চুল! তিনি মাথা তুলে দেখলেন দূরে হাওয়ায় ভেসে রয়েছে শবনমও। সে তার শিখার মতো চুল দিয়ে অশ্বত্থামাকে বাঁধার চেষ্টা করছে। শবনম চিৎকার করে বলল, “ডক্টরসাহাব! মেরি ফিকর মত কিজিয়ে, বচ্চি কি জান বাচাইয়ে!”

“ধন্যবাদ, শবনম।” বলে তিনি এগিয়ে গেলেন নিরুপমার দিকে। নিরুপমা তখনও বাতাসে ভেসে রয়েছে, ওর হাত আর পা ছড়ানো। মুখ থেকে ভেসে আসছে এক চিৎকার। খেয়াল করলেন ডক্টর নাগ, ধীরে-ধীরে সেই চিৎকার বদলে যাচ্ছে এক সমবেত কোরাসে! তিনি কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না, এক অদৃশ্য ব্লেডে তাঁর হাত-পা যেন কেটে গেল। এই সুযোগ হাতছাড়া করতে দেওয়া যাবে না। কোনোভাবেই না। তাঁকে এগিয়ে যেতেই হবে, এই সৃষ্টিকে বাঁচানোর ভার তাঁরই ওপর। আবার এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই এক জোরালো ঘুষি আছড়ে পড়ল তাঁর চোয়ালে। তাকিয়ে দেখলেন অশ্বত্থামা শবনমের সেই চুলের বাঁধন ছিঁড়ে ওঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। শবনমের কী হল? তিনি মাথা তুলে দেখতে পেলেন, একটা হাওয়ার গোলকের মধ্যে ও বন্দি হয়ে রয়েছে, একটু-একটু সেই গোলক ছোটো হয়ে আসছে! এতটা অসহায় নিজেকে বহুদিন মনে হয়নি নিজেকে ডক্টর নাগের।

অশ্বত্থামা এক ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে বলছেন তখন, “এখানে তুমি ক্ষমতাহীন, হে প্রবুদ্ধ মানব। এখানে তুমি ক্ষমতাহীন। এ তোমার স্থান এবং কাল কোনোটাই নয়। এ হল সে অসামান্যা বালিকার অন্তরমহল! নিজের অন্তরের সঙ্গে সে ধরিত্রীকে পর্যন্ত সংযুক্ত করে ফেলেছে! ভাবতে পারো? এ যেন সাক্ষাৎ ধরিত্রী তাঁর কন্যার যন্ত্রণার প্রতিশোধ নিচ্ছেন। ভাবতে পারো হে, প্রবুদ্ধ মানব? আর কিছুক্ষণ। ব্যস, আর কিছুক্ষণ। এই পরাবাস্তব জগতের সঙ্গে-সঙ্গে প্রলয় আসবে এবার তোমার পচনশীল সভ্যতার বুকেও। আর তোমার ক্ষমতা নেই এই প্রলয়কে রোধ করার। নেই ক্ষমতা তোমার।”

চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ছে ডক্টর নাগের, তিনি টের পাচ্ছেন লাভার উত্তাপ। বলে উঠলেন তিনি, “নিজের স্বার্থের জন্য আপনি দ্বাপর যুগে সমগ্র সৃষ্টিকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। আর এই কলিযুগে আজ আপনি এক নিরপরাধ বালিকাকে ব্যবহার করছেন দাবার ঘুঁটি হিসেবে? আপনার পিতৃদেব বোধহয় বড়োই প্রসন্ন হবেন আজ আপনার ওপর।”

অশ্বত্থামার জরাগ্রস্ত হাত এসে আছড়ে পড়ল তাঁর গালে, “স্তব্ধ হও, মূর্খ! কী জানো তুমি আমার সম্পর্কে? কী জানো তুমি পিতার সম্পর্কে? তোমাদের ওই ব্যাসের তৈরি ব্যাসকূটের অপভ্রংশ থেকে তৈরি হওয়া এক বিকৃত ধারণা নিয়ে তুমি এসেছ আমাকে বিচার করতে? কী জানো তুমি বঞ্চনা সম্পর্কে? হ্যাঁ? কী জানো?” চিৎকার করে উঠলেন আবার অশ্বত্থামা। তাঁর চোখ রাগে গনগন করছে, নাকের পাটা ফুলে উঠছে। একহাতে তিনি ডক্টর নাগের গলা চেপে ধরলেন, তারপর হিসহিস করে বললেন, “অপমানের প্রতিশোধ নিতে যদি ধর্মত্যাগ করতে হয়, তা আমি সহস্রবার করতে রাজি। পিতৃহন্তাদের শাস্তি দিতে যদি ধর্মত্যাগ করতে হয়, আমি তা সহস্রবার করতে রাজি। আর তোমাদের ঈশ্বরের দেওয়া অভিশাপ খণ্ডন করতে হলে যদি আমাকে প্রলয় আনতে হয়, তা-ও আমি সহস্রবার করতে রাজি। সম্মুখে যে আসবে তাকে আমি নরকদর্শন করিয়ে ছাড়ব। সেটা ওই সৃঞ্জয় পাঞ্চালদের বংশধর পিতৃহন্তা ধৃষ্টদ্যুম্নই হোক, কি দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্রই হোক, কি এই কলিযুগের প্রবুদ্ধ মানব বোধিসত্ত্বই হোক!” বলে তিনি ছুড়ে দিলেন ডক্টর নাগকে সেই লাভার দিকে। তপ্ত লাভার দিকে পড়ে যাচ্ছেন ডক্টর নাগ। হেরে যাচ্ছেন তিনি। কিচ্ছু করার নেই। লাভার স্রোত তাঁকে গ্রাস করার আগে ডক্টর নাগ শুনতে পেলেন দ্রোণপুত্র তাঁর বিজাতীয় অভিশপ্ত স্বরে চিৎকার করছেন, “যাও, তুমি নরকে যাও! তোমার অক্ষয় নরকলাভ হোক!”

তপ্ত লাভা গ্রাস করল ডক্টর নাগকে, এক অপার্থিব যন্ত্রণা তাঁকে যেন ঘিরে ধরল, রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বয়ে চলল এক উত্তপ্ত তাপপ্রবাহ। শেষ? এ-ই শেষ? পারলেন না তিনি প্রলয়কে আটকাতে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *