১৩. নভেম্বর ১৯ বহির্জগতে সময় হয়েছে রাত এগারোটা বত্রিশ
ভেসে চলেছেন ডক্টর নাগ। এক মহাশূন্যে ভেসে চলেছেন তিনি। সেখানে কিছু নেই। জরা নেই, মৃত্যু নেই, পাপ নেই, পুণ্য নেই, আনন্দ নেই, বেদনা নেই। কিচ্ছু নেই সেখানে। আছে এক সীমাহীন শূন্যতা। কতদূর তিনি ভেসে গেলেন সেখানে? খেয়াল নেই তাঁর। শুধু এটুকুই মনে হচ্ছে তাঁর, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি প্রলয়কে রুখতে ব্যর্থ হয়েছেন!
“ব্যর্থ? তাই নাকি?” এক কিশোরের কণ্ঠস্বর শুনে তিনি চমকে উঠলেন। কোত্থেকে এল এই কণ্ঠস্বর? তিনি উঠে বসার চেষ্টা করে এদিক-ওদিক তাকালেন। কেউ কোথাও নেই। আবার শুনতে পেলেন তিনি সেই কণ্ঠস্বর, “কোথায় খুঁজছ আমাকে? আমি তো রয়েছি তোমাতে।”
ডক্টর নাগ বলে উঠলেন, “কে আপনি? কোথায় আপনি? আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন?”
“চর্মচক্ষু দিয়ে দেখতে পাবে না হে! এই মহাশূন্যে তোমার চর্মচক্ষু কাজ করবে না। বুঝলে হে, বোধিসত্ত্ব?”
সেই শূন্যের ওপর বসে তিনি চেষ্টা করলেন নিজেকে আত্মস্থ করার। তারপর আস্তে-আস্তে চোখের সামনে ফুটে উঠল এক অপরূপ কিশোরের রূপ। কৃষ্ণবর্ণ সেই কিশোর পরে রয়েছে তার ছোটোবেলার স্কুলের পোশাক! নীল প্যান্ট আর সাদা জামা। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে এক শান্ত সমাহিত হাসি। যখন তিনি দেখতে পেলেন সেই কিশোরকে, সে হেসে উঠল, “এই তো, এই তো, দিব্যি পেরেছ! তুমি ক পেয়েছ!” বলে সে হাততালি দিয়ে হেসে উঠল।
ডক্টর নাগ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে?”
“আমি কে? আমি অনেক, আবার আমি এক। আমি তুমিও হতে পারি, অন্য কেউও হতে পারি কিন্তু আবার আমি কেউ না-ও হতে পারি। বুঝলে?” বলে সেই কিশোর দাঁড়িয়ে উঠে হাফপ্যান্টের পকেট থেকে বের করল একটা চ্যাপটা পাথরের টুকরো, তারপর সেটা ছুড়ে দিল সেই মহাশূন্যের মধ্যে। ঠিক যেন ব্যাঙাচির মতো সেই পাথরটি গোঁত্তা খেতে-খেতে চলে গেল দূরে কোথাও। সে পকেট থেকে এগিয়ে দিল আরও একটি চ্যাপটা পাথরের টুকরো ডক্টর নাগের দিকে, সে বলল, “এসো, তুমিও খেলে দেখো একটু। দেখো, ভালো লাগবে।”
ডক্টর নাগ কিছুটা ইতস্তত করে পাথরটি হাতে নিলেন, তারপর ছুড়ে দিলেন সেটিকে। ডক্টর নাগের ছোড়া পাথরটি সেই শূন্যের মধ্যে অদ্ভুতভাবে ডুবে গেল। সেই কিশোর মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু, হচ্ছে না। অনেক ভারী করে দিচ্ছ পাথরটিকে। এত বোঝা চাপালে হবে? বোঝা কমাও, বোঝা কমাও!”
ডক্টর নাগ বললেন, “কীভাবে কমাব? আমি জানি না। সত্যিই জানি না। আমি জানি না আমার মধ্যে কীসের বোঝা রয়েছে। আমি সত্যিই জানি না। আমি তো এ-ও জানি না যে আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি।”
“আহা, মনখারাপ করে না! এত মনখারাপ কর কেন?” বলে সেই কিশোর তাঁর হাতে সেই পাথরটি আবার ধরিয়ে দিল। তারপর বলল, “বেঁচে থাকা মরে যাওয়া কি তোমার হাতে, বাবা? তুমি ভুলে যাও ওসব। কী যায়-আসে তুমি যদি বেঁচেই থাক বা মরেই যাও?”
“অনেক কিছুই যায়-আসে। এক উন্মাদ দেশ-কাল-সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চেষ্টা করছে প্রলয় আনার। আমি না থাকলে সে সফল হবে। অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি হবে। আমি ব্যর্থ! আমি ব্যর্থ!” কান্নায় ভেঙে পড়লেন ডক্টর নাগ। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন সেই মহাশূন্যে।
ছেলেটি এগিয়ে এসে ডক্টর নাগের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল একটু, তারপর সে বলল, “সে যেমন প্রলয় আনতে পারে না, তুমিও তেমনই প্রলয়কে আটকাতেও পার না।”
“তাহলে আমি কী করতে পারি?” সেই ছেলেটির দিকে তাকালেন ডক্টর নাগ। ছেলেটি ভুবনভোলানো এক হাসি হেসে বললে, “তুমি সেটাই করবে যেটা তুমি করবে। শুধু একটা জিনিস করতে হবে এর সঙ্গে।”
ডক্টর নাগ কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলেন, তিনি বললেন, “কী?”
ছেলেটি এবার ডক্টর নাগের বুকে হাত রাখল, “সমর্পণ।”
মুহূর্তের মধ্যে ডক্টর নাগের মনে হল তাঁর বুকে যেন এক উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। সেই স্রোত আস্তে-আস্তে ছড়িয়ে গেল তাঁর সমগ্র সত্তায়। তিনি বুঝতে পারলেন কোথায় তিনি ভুল ছিলেন। অশ্বত্থামাকে আটকাতে গিয়ে তিনি নিজে অমরত্বকে অর্জন করার কথা ভাবছিলেন, তিনি নিজের কাঁধে সমগ্র সৃষ্টির ভার নিয়েছিলেন যেন, তিনি নিজের অজান্তেই নিজেকে যেন ঈশ্বরের মতো ভেবে ফেলেছিলেন। এটাই কি তারা তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন? ভেতর থেকে ভেসে এল তারার কণ্ঠস্বর, “এমনি এমনিই তোমাকে জ্ঞানপাপী বলি না! এবার বুঝলে তো?” সেই কণ্ঠস্বর যেন ওই মহাশূন্যে ছড়িয়ে গেল।
ডক্টর নাগ সেই কিশোরের দিকে তাকালেন, সে মুচকি হাসছে তখন। সে তাঁকে বলল, “এবারে ছুড়ে দেখো তো কেমন হয়?”
তিনি ছুড়ে দিলেন পাথরটি সেই মহাশূন্যে। বেশ কয়েকবার গোঁত্তা খেয়ে সেটি ডুবে গেল মহাশূন্যে। ছেলেটি বলল, “ঠিক আছে, আগের থেকে একটু ভালো হয়েছে। তবে অসুবিধে নেই। আপাতত এতেই হবে। বুদ্ধ হতে সময় লাগবে আর একটু। শুধু মনে থাকে যেন, সমর্পণ করতে হবে। কী করতে হবে?”
“সমৰ্পণ!”
ছেলেটি ডক্টর নাগকে ঠেলে দিল একটু, একটা আলোর স্রোত এসে ডক্টর নাগকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল। যাওয়ার আগে উনি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এখনও বললে না, তুমি কে?”
ছেলেটির অপার্থিব সুরেলা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “বলেছি তো। আমি অনেক, আবার আমি এক। আমি তুমিও হতে পারি, অন্য কেউও হতে পারি, কিন্তু আবার আমি কেউ না-ও হতে পারি।”
আলোর মধ্যে হারিয়ে যেতে-যেতে দেখলেন ডক্টর নাগ, ছেলেটি চ্যাপটা পাথরটি ছুড়ে একটা বাঁশি বের করে বাজাতে বাজাতে দূরে চলে গেল কোথাও হঠাৎ ডক্টর নাগের মনে হল তিনি যেন বুঝতে পেরেছেন কিছু। চোখ জলে ভরে এল তাঁর। সমর্পণের মর্ম বুঝতে এত দেরি হল তার!
