৩. অক্টোবর ২৪ রাত সাড়ে বারোটা
প্রত্যেকটা শহরের একটা নিজস্ব চেহারা থাকে, আমেজ থাকে। এমনকি যদি বলা হয় যে প্রতিটি শহরের একটা নিজস্ব আত্মাও থাকে তাহলেও হয়তো খুব একটা ভুল বলা হবে না। শবনমেরও তা-ই মনে হয়। বিশেষ করে পুরোনো দিল্লির দিকে এলে ওর তো ভীষণই মনে হয় এই হাজার জাঁকজমকের মাঝেও এই শহরটার আত্মা যেন আগের মতোই রয়ে গেছে। এখনও যেন কিছুই বদলায়নি। আর এখানেই শবনমের অদ্ভুত লাগে। শহরের মানুষ বদলালেও কিন্তু শহরের আত্মা একই রকম রয়ে যায়! পুরোনো দিল্লির একটা কবরখানার পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে শবনম, পাশে স্ট্যান্ড করে দাঁড় করানো রয়েছে মোটরবাইকটা। মাথাটা অসম্ভব ধরে এসেছে, একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো হত। কিন্তু এখন ধরাতে পারবে না। যতটা সম্ভব লোকের নজর এড়িয়ে এখানে অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু মাথা যন্ত্রণাটা বাড়ছে, মাথার ভেতর একটা চাপা শব্দ আবার শুনতে পাচ্ছে শবনম। নিজেকে শান্ত রাখতে হবে, শ্বাস- প্রশ্বাসের ওপর একটু-একটু করে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করল শবনম। একটু ভালো লাগছে এখন। এমন সময় পেছন থেকে একটা ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “বডি কাউন্ট আজ একটু বেশি বেড়েছে, শবনম।”
চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল শবনম, ওর পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক দীর্ঘদেহী ছায়ামূর্তি। পরনে বাদামি জ্যাকেট, কালো ট্রাউজার্স, আর মুখে রয়েছে একটা অদ্ভুত ধরনের মুখোশ। সেই মুখোশ থেকে আবার একটু-একটু করে বেরোচ্ছে চন্দনের গন্ধ। শবনম শান্তস্বরে উত্তর দিল, “উপায় ছিল না। ওই ধাবার মালিক ভিক্টিমের ফোন নিয়ে চলে এসেছিল। শেষ করে দিতেই হত।”
ছায়ামূর্তি বলে উঠল, “যা করবে একটু সামলে করবে। কারণ আমি চাই না এই লাশের সূত্র ধরে কেউ তোমার দিকে পৌঁছে যাক। যা-ই হোক, জিনিসগুলো কোথায়?”
শবনম একটা লেদারের ব্যাগ আর একটা মোবাইল ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল, “আমার জিনিসটা এনেছ?”
ছায়ামূর্তি এগিয়ে দিল একটা বাদামি রঙের ভায়াল। মোবাইল ফোন আর লেদার-ব্যাগটা ছায়ামূর্তির হাতে দিয়ে সেই ভায়ালের দিকে হাত বাড়াল শবনম। কিন্তু ছায়ামূর্তি হাত সরিয়ে নিল। সে বলল, “সাত্যকি দুবের ব্যাগ আর মোবাইল। তুমি ঠিক যেরকমভাবে পেয়েছ সেভাবেই নিয়ে এসেছ। ঠিক?”
শবনমের শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে ক্রমাগত, ও টের পাচ্ছে রাগ চড়ছে আবার, ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে, মনে হচ্ছে সামনে যে আছে তার জীবনের সমাপ্তি এখানেই ঘটিয়ে দেয় সে। দাঁতে-দাঁত চেপে ও উত্তর দিল, “হ্যাঁ, সব আছে ওখানে। এখন আমাকে দাও ওটা।”
ছায়ামূর্তি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল শবনমের দিকে, তারপর ও বলল, “তুমি নিজে নিতে পারবে না, তোমার হাতটা এগিয়ে দাও।”
শবনম এগিয়ে দিল ওর বামহাত, ও দেখতে পেল ওই ছায়ামূর্তি নিপুনভাবে ভায়াল থেকে বাদামি রঙের তরলটা একটা সিরিঞ্জে ভরে সেটা একটু একটু করে পুশ করে দিল ওর শিরার মধ্যে। আস্তে-আস্তে শবনমের মাথা ঠান্ডা হয়ে এল এবার। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, এখন একটা ভায়ালে পুরো মাসও টিকতে পারি না। এক সপ্তাহ থেকেই এই লক্ষণগুলো দেখা দেয়।”
ছায়ামূর্তি বলল, “আর কয়েকটা দিন। তারপর তোমার ছুটি।”
শবনম জিজ্ঞেস করল, “পরের কাজ কী?”
ছায়ামূর্তি একটা বাদামি কাগজের মোটা খাম এগিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে সব পাবে। কাজটা একমাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। ভুল যেন না হয়। আর বডি কাউন্ট যেন না বাড়ে।”
বলে সেই ছায়ামূর্তি ওই কবরখানার ভেতরের অন্ধকারের মধ্যে যেন মিশে গেল। সেদিকে তাকিয়ে শবনমের মনে হল সে যেন এক প্রেতাত্মার মুখোমুখি ছিল এতক্ষণ। মাঝে-মাঝে শবনমের মনে হয়, সত্যিই হয়তো ও এক প্রেতের হয়েই কাজ করছে। কারণ এই ছায়ামূর্তি ওর সম্পর্কে সব জানে, ওকে ক্ষণিকের জন্য হলেও শান্তি দিতে পারে। আর শবনম কী করে? ছায়ামূর্তি ওকে এক মানুষের ডিটেলস দেয়, শবনম সেই মানুষকে নিপুণভাবে হত্যা করে, আর সেই হত্যাকাণ্ড দেখলে মনে হবে যেন সেই মানুষ আত্মহত্যা করেছে বা সে কোনো দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে। বিগত ছ’টা মাস ধরে প্রায় ছ’জনকে এইভাবে পরপারে পাঠিয়েছে শবনম। আজকের টার্গেট সাত্যকি দুবে ছিল শবনমের সাত নম্বর শিকার। হ্যাঁ, এর সঙ্গে আরও কিছু মানুষেরও প্রাণ চলে যায় ঠিকই, কিন্তু সেটা নিয়ে শবনম ভাবে না। ওসবের অনেক ঊর্ধ্বে চলে এসেছে ও। বাইকটা স্টার্ট করল শবনম, তারপর ওর চোখের সামনে ওর জীবনটা ফুটে উঠল এক-এক করে। এই ওষুধের এক সাইড-এফেক্ট বলা যেতে পারে। জীবনটা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
আগে ও একটা সিকিউরিটি ফার্মে কাজ করত। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নিরাপত্তা দেওয়া ছিল ওদের কাজ। সেখানেই ও একজন গার্ড হিসেবে কাজ করত। প্রথম জীবনে শবনম কিকবক্সার ছিল। জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় ও অংশ নিয়েছে, চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বেশ কয়েক বার। এশিয়ান কিকবক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে ও সেমিফাইনাল অবধি যেতে পেরেছিল একবার। কিন্তু দুর্ভাগ্য, জিততে পারেনি। যদিও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে যে ও এতটা করতে পেরেছে এটাই অনেক বড়ো ব্যাপার। আর এর চেয়ে বেশি ও আশাও করেনি কখনও। যেখানে একজন ক্রিকেটার সামান্য একবার হাঁচলে খবর হয়ে যায়, সেখানে ওর লড়াইয়ের সম্পর্কে লোক জানতে পারবে এতটা আশা করাটা বাতুলতা। নাহলে স্পোর্টস কোটাতে ও চাকরির জন্য চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনোবারই ওর ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি। উলটে ওর থেকে কম যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষদের ও এই কাজ পেতে দেখেছে। যা-ই হোক, সব ঠিকই ছিল। সেই সিকিউরিটি ফার্মে মোটামুটি ঠিকঠাকই কাজ করছিল শবনম। আর সে-সময়ই, প্রায় দেড় বছর আগে, ওর সঙ্গে এমন কিছু একটা হয়ে যায় যেটা ওর কল্পনাতেও আসেনি। একটা বাসে সেদিন রাতে ও একা ফিরছিল কাজের জায়গা থেকে। মোটরবাইকটা সেদিন খারাপ হয়ে পড়েছিল। তাই এই সিদ্ধান্ত কিন্তু শবনম বাড়ি পৌঁছতে পারেনি আর। ড্রাইভার সমেত প্রায় সাতজন ছিল ওরা, একটা ফাঁকা বাসে ঘিরে ধরেছিল ওকে। তিনজনকে গুরুতরভাবে আহত করেছিল শবনম। কিন্তু সেই সময়ই ওর মাথায় কেউ একজন একটা রড দিয়ে জোরে আঘাত করে, আর এরপর ওর সঙ্গে যেটা হয় সেটা কোনো পশু ও অন্য কোনো পশুর সঙ্গে করবে না। এই ধরনের নৃশংসতা বোধ হয় সভ্যতার সবচেয়ে উন্নত জীব মানুষের পক্ষেই সম্ভব। কোনোরকমে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ইন্টারনাল ব্লিডিং-এর পরিমাণ এতটাই গুরুতর ছিল যে ডাক্তাররা নিজেরাও নিশ্চিত ছিলেন না যে, ওকে বাঁচানো সম্ভব হবে কি না। কিন্তু শবনম বাঁচতে চেয়েছিল, সুস্থ হয়ে উঠতে চেয়েছিল। আর সেই সময়ে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে এক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রতিনিধি। তারা শবনমকে জানায় যে, ও যদি একটা নতুন ড্রাগের টেস্ট সাবজেক্ট হতে রাজি থাকে তাহলে হয়তো ও সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। এখন শবনমের জন্য ওর আম্মিজান রোজ পিরের দরগায় গিয়ে প্রার্থনা করে আসছে ঠিকই, এই প্রার্থনায় কী কাজ হয় সেটা ওই অদৃশ্য ওপরওয়ালাই জানে হয়তো। কিন্তু এই নতুন ওষুধ দিলে হয়তো কোনো কাজের কাজ হতেও পারে, হয়তো শরীরের এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে ও মুক্তি পেতে পারে। আই-ভি ড্রিপের মাধ্যমে ওর শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছিল সেই ড্রাগ। শবনমের শরীর সেরে উঠেছিল, আর এটা মিরাকল ছাড়া কিছু নয়। কারণ ডাক্তাররা ধরেই নিয়েছিলেন যে শবনম হয়তো কোনোদিন সুস্থ হয়ে উঠবে না। কিন্তু সেখান থেকে শবনম উঠে দাঁড়িয়েছিল। যাদের জন্য ওর অবস্থা হয়েছিল, তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতেও দেখেছিল। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে ওর মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ঠিক নেই। ওর মনে হওয়া শুরু হয়েছিল, এই সিস্টেমের ভেতরে ঘুণ ধরেছে, আর এই ঘুণকে তাড়াতে হলে সিস্টেমকে নতুন করে রিসেট করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। প্রায় আটমাস আগে ও চোখের সামনে দু’জন ছেলেকে ও ইভটিজিং করতে দেখে। হিসেবমতো ওর হয়তো পুরো ব্যাপারটা রেকর্ড করে থানায় যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু শবনম সেটা করেনি, ও এই দু’জন ইভটিজারের মধ্যে যেন সেই জাহান্নমের কীটগুলোর ছায়া দেখতে পাচ্ছিল যাদের জন্য শবনম মৃত্যুমুখে চলে গিয়েছিল প্রায়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ও সেই ছেলেদুটোকে ট্র্যাক করে, তারপর একদিন সুযোগ বুঝে পুরোনো দিল্লির এক অন্ধকার গলিতে ওই দুই ছেলের মুখে ঢেলে দেয় অ্যাসিড! একটি ছেলে বাঁচেনি আর আর একজন সারাজীবনের মতো বিছানায় শয্যাশায়ী। আর শবনম? তাকে সেই কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক দিন হল। কথায়-কথায় শবনমের রাগ হত খুব, যখন-তখন যার-তার ওপর হাত তুলে দিত; ওই ফার্মেরই কয়েক জন গার্ড ওর কাছে ঠ্যাঙানি খেয়ে হাসপাতালেও কাটিয়ে এসেছে। অতএব, অস্থিতিশীল মানসিক অবস্থার দোহাই দিয়ে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। মাঝে দুই মাস শবনমকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছেও পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি। শবনমের ভেতরের রাগ, ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। ওর মনে হয় এই দুনিয়াটা আসলেই জাহান্নমের একটা স্তর, জন্নত বলে সত্যিই কিছু নেই। এক-এক করে ওর আত্মীয়, বন্ধু সবাই ওকে ছেড়ে চলে গেল। ওর যা অবস্থা তাতে বিয়ে করা ওর পক্ষে অসম্ভব ছিল। সাতমাস আগে শবনমের আম্মিজানেরও ইন্তেকাল হয়েছে। পুরোনো দিল্লির বাড়িতে একাই থাকত নিজের রাগ আর ক্ষোভের খাঁচার ভেতর। একদিন ও ভেবেছিল নিজেকে শেষ করে দেবে। একটা ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ভেবেছিল ফ্যান থেকে ঝুলে পড়বে ও। কিন্তু ওই লোকটা ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল সেদিন। কোন লোকটা? সেই লোকটা, যার মুখ কখনও শবনম দেখেনি, কিন্তু লোকটার কথা শুনলে মনে হয় হয়তো এই অভিশপ্ত জীবনের একটা সুরাহা হলেও হতে পারে। ছ’মাস আগের সেই রাতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়তে যাওয়ার আগেই শবনম দেখতে পেয়েছিল আলো-আঁধারি ঘরের টুলে বসে রয়েছে একটা ছায়ামূর্তি। মুখটা দেখতে পায়নি শবনম, শুধু চাঁদের আলোয় দেখতে পেয়েছিল লোকটির দীর্ঘ ছায়া।
“জীবন তুমি শেষ করতে চাও, শবনম? করো, আমি বাধা দেব না। কিন্তু এই জীবন শেষ হয়ে গেলে তুমি তোমার মতো বাকি শবনমদের বাঁচাতে পারবে? এই জাহান্নমের মতো দুনিয়াটাকে শোধরাতে পারবে?” একটা ভারী গলা ভেসে এসেছিল সেই ছায়ামূর্তির দিক থেকে। ওই মুহূর্তে শবনমের মাথায় একটাই কথা ঘুরছিল— এই লোক ওর নাম, ঠিকানা এগুলো পেল কোত্থেকে?
উলটোদিক থেকে সেই ছায়ামূর্তি বলছিল, “তোমাকে খুঁজে পাওয়াটা কোনো কঠিন ব্যাপার নয় শবনম। যা হয়েছিল তোমার সঙ্গে, সেটা দেশের সবাই জানে, সেই সুবাদে গোটা দেশ জানে তোমার বাড়ির খবর। কিন্তু আমি তোমার এখানে এসেছি অন্য একটা কারণে। তোমার শরীরে যে ওষুধ বা সিরামটা দেওয়া হয়েছিল সেটার জন্য।”
গলা থেকে ফাঁসটা খুলে বিছানা থেকে নীচে নেমে এসেছিল শবনম। তাকিয়েছিল লোকটির দিকে। লোকটি যেন শবনমের মনের কথাও বুঝতে পেরেছিল সেদিন, “অনেক প্রশ্ন আছে আমি জানি। তোমার অনেক বার হয়তো মনে হয়েছে যে, তুমি এতটা ঘন-ঘন রেগে ওঠো বা আবেগতাড়িত কেন হয়ে যাও? আগে তো তুমি এরকম ছিলে না। তা-ই না? তোমার মানসিক পরিবর্তনটা এসেছে ওই ঘটনার জন্য? হয়তো, কিন্তু পুরোটা নয়। তুমি আজ এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছ অলিম্পাসের সেই সিরামের জন্য, যেটা তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এখনও।”
শবনমের মনে পড়ল হাসপাতালে কাটানো সেই দিনগুলোর কথা। ওই রহস্যময় ওষুধটা দেওয়ার পরই ওর শরীর যেন রাতারাতি সেরে উঠেছিল। ছায়ামূর্তি ওদিকে বলে চলেছে, “কিছু কথা তোমার জানা দরকার, তা-ই বলছি। কারণ, তোমাকে আমার দরকার। তুমি হলে প্রথম ক্যান্ডিডেট যার ওপর ওই সিরাম অলিম্পাসের বাইরে প্রয়োগ করা হয়েছিল। অলিম্পাসের বাইরে নন- মিলিটারি পারসোনেল এবং সিভিলিয়ানদের মধ্যে যতজনের ওপর এই সিরাম প্রয়োগ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে একমাত্র তুমিই বেঁচে গিয়েছিলে। বাকিরা কেউ বাঁচেনি। তোমার কথা কেউ জানে না। এমনকি অলিম্পাসের কর্ণধার ডক্টর সেনও কখনও তোমার কথা ভুল করেও বলেননি কাউকে। তুমি ততদিনই বাঁচবে যতদিন ওই সিরাম তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। তুমি এখনই মরতে পারবে না, শবনম।”
শবনম কেমন যেন বোবা হয়ে গিয়েছিল, ও পড়েছিল পেপারে ডক্টর সেন, অলিম্পাস ফার্মাসিউটিক্যাল এদের ব্যাপারে। কিন্তু এসব যান্ত্রিক কথা ওর কানে যাচ্ছে না একদম। ওর চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে সব ছেড়ে দিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতে। কিন্তু ও যাবে কোথায়? ওর যাওয়ার জায়গা নেই কোনো। লোকটি শবনমের কাঁধে হাত রেখে বলেছিল সেদিন, “তোমার কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি তোমার কষ্ট একটু হলেও কম করতে পারি। তোমাকে শুধু একটু আমার কথা শুনতে হবে। কিছু কাজ করে দিতে হবে আমার জন্য। পারবে? বিনিময়ে তুমি একটু শান্তিতে থাকতে পারবে কয়েকটা দিন। আর যখন তোমার কাজ শেষ হবে, সেদিন তুমি চিরনিদ্রায় যেতে পারবে।”
এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর শবনম জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি আমার ভেতরের রাগ, যন্ত্রণা এগুলোকে যে কমিয়ে দিতে পারবেন তার কী গ্যারান্টি আছে?”
লোকটি আর একটু কাছে এগিয়ে এল, শবনম দেখতে পেয়েছিল লোকটির মুখে রয়েছে একটা পুরু মাস্ক, সেখান থেকে চন্দনের গন্ধ ভেসে আসছে। পরনে কালো বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, একটা ধূসর মোটা শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স, পায়ে রয়েছে একজোড়া স্নিকার। লোকটি একটা ইনজেকশন দেওয়ার সিরিঞ্জ আর একটা বাদামি রঙের ভায়াল এগিয়ে দিয়ে বলল শবনমকে, “তোমাকে সিরামের ফার্স্ট জেনারেশনের ব্যাচটা দেওয়া হয়েছিল। এটা যেটা দিচ্ছি তোমাকে, সেটা নেক্সট জেনারেশনের ব্যাচ। ডক্টর সেন কখনও মুখ ফুটে বলেননি, কিন্তু তিনি জানতেন এই ফার্স্ট জেনারেশনের টেস্ট সাবজেক্ট বেঁচে না থাকলে তাঁর সিরাম সম্পূর্ণ হত না। এই নেক্সট জেনারেশন সিরাম নিজের শরীরে নিয়ে নিয়ো। মানসিক যন্ত্রণা অনেক কম হবে।”
শবনম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে লোকটির দিকে, তারপর সে জিজ্ঞাসা করে, “আপনি এত কিছু আমার জন্য করবেন? কেন?”
লোকটি তাকিয়ে ছিল ওর দিকে একদৃষ্টে, তারপর বলেছিল, “কারণ এই দুনিয়াটা যে জাহান্নম হয়ে গেছে, শবনম! জাহান্নমকে জন্নত বানাতে হলে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। আর এর জন্য প্রলয় আনতে হবে। আর প্রলয় আনার জন্য কিছু মানুষের চলে যাওয়াটা খুব দরকার। আমি চাই সেই মানুষদের তুমি পরপারে পাঠাও।”
শবনম অবাক হয়ে গিয়েছিল, এই লোক মানুষ খুন করতে বলছে নাকি? সে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার জন্য আমি মানুষ খুন কেন করব? আর মানুষ খুন করতে হলে আপনিই কেন করছেন না? দেখে তো মনে হয় অনেক লোককে ওপরওয়ালার কাছে পাঠিয়েছেন!”
লোকটি সেদিন শবনমের গালে হাত দিয়ে বলেছিল, “কারণ, আমি যদি এই পেয়াদাদের মারি, তাহলে বাদশাহের ওপর হামলা করবে কে? আর তুমি কেন করবে এই কাজ? কারণ, তোমার ভালো থাকার ওষুধ আমার কাছে। তুমি নিজেও জানো তুমি এই কাজ করবে। কিছু জানোয়ার দুনিয়া থেকে মুছে যাবে। কিছু শবনম বেঁচে যাবে আবার।”
শবনম কিছু বলতে পারেনি আর। সেই থেকে ও এই কাজই করে চলেছে। প্রতি মাসে অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা চলে আসে। তা দিয়ে ওর ভালোমতোই চলে যায়। এলাকার লোক জানে শবনম এখন একটা শপিং মলের গার্ড হিসেবে কাজ করে, কিন্তু ওর আসল পরিচয় কেউ জানে না। আর জানার প্রয়োজনও নেই। বাইক চালিয়ে ওর একতলা বাড়ির সামনে এল শবনম। ঘরে ঢুকে ও খামটা খুলে দেখল সেখানে রয়েছে কয়েক তাড়া পাঁচশো টাকার নোট, তিনটে বাদামি রঙের ভায়াল, আর বেশ কয়েকটা কাগজ। সেই কাগজগুলোতে রয়েছে একজন মানুষের সম্পর্কে বেশ কিছু লেখা। সঙ্গে রয়েছে একটা ছবি— ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের ওপরেই হবে বোধ হয়; কাঁচাপাকা চুল, কয়েকদিনের না-কাটা উশকো- খুশকো দাড়ি, কোটরে চলে যাওয়া চোখকে ঢেকে রয়েছে একটা চশমা। এক মুহূর্তের জন্য শবনমের মনে হল, কোনো ভুল হচ্ছে না তো? এই লোকটাকে দেখে কিন্তু কোনো ভুলভাল লোক মনে হচ্ছে না! কিন্তু তারপরই শবনমের মনে হল, ওপর-ওপর দেখলে ক’টা মানুষকেই বা ভুলভাল মনে হয়? আজকেই তো ওই চুতিয়াটাই চান্স পেয়ে ওর শরীরের ভাঁজে হাত দিয়েছিল। শরীর হঠাৎ ঘিনঘিন করে উঠল ওর, পোশাকটা ছেড়ে চলে গেল বাথরুমে। কাগজ আর ছবিগুলো তখন বিছানায় পড়ে রয়েছে। সেই কাগজে এরিয়েল ফন্টে টাইপ করা রয়েছে শবনমের পরের টার্গেটের নাম— ডক্টর বোধিসত্ত্ব নাগ, সাইকায়াট্রিস্ট।
***
অক্টোবর ২৫ রাত দুটো তিরিশ
“বোধিসত্ত্ব নাগের পেছনে শবনমকে পাঠানোটা কি উচিত হল?”
“চিন্তা কোরো না। উচিত-অনুচিতের কথা ভেবে আমাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয় মোটেও।”
“বেশ, তা-ই হোক।”
“আমাদের পথের কাঁটা আপাতত বুনো হাঁসের পিছু নিক। ও বোঝার চেষ্টা করুক কী হচ্ছে এবং হয়ে চলেছে। যে-ই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে সেটা আমাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যেই নিয়ে যাবে।”
“আর বোধিসত্ত্ব নাগ?”
“অপেক্ষা, হে তৃতীয় পাণ্ডব! অপেক্ষা। তার মন প্রবল শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু তার শরীর নয়। আমার অর্ধাংশকে মনের গভীরে বন্দি করে রেখেছে। মনের ওপর যা প্রভাব পড়ছে তার লক্ষণ তুমি ওর শরীরেই দেখতে পাবে হয়তো। হয়তো সামান্য আঘাতেই তার শরীর একটু-একটু করে ভেঙে পঞ্চভূতে মিলিয়ে যাবে, দেখবে। আর শরীর না থাকলে মন নামক মহাসমুদ্রের অস্তিত্ব থাকবে কেমনে?”
মাস্ক খুলতে-খুলতে এই কথাগুলো শুনছিল সেই ছায়ামূর্তি। তার মনের গভীরে একটা ধাতব কক্ষের ভেতর থাকে একজন। তার সঙ্গেই হচ্ছিল এই কথাগুলো। অলিম্পাসের পরিত্যক্ত অফিসের বেসমেন্টের ঘরে পোশাক-আশাক ছেড়ে ও নগ্ন অবস্থায় দাঁড়াল একটা বোর্ডের সামনে। প্রায় ছয় মাস আগে ওই ধুরন্ধর লোকের এক সহকারীর কাছ থেকে বেশ কিছু নথি কায়দা করে আদায় করেছিল, যার মধ্যে এই অফিসের কথা ছিল। এখানে তখনও গোটা পনেরো পুরোনো সিরামের ভায়াল রয়ে গেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু ও দিয়েছে শবনমকে। ওর এই মুহূর্তে দরকার নিজেকে স্বাভাবিক রাখার জন্য। সরকার যে-কোনো কারণেই হোক এই দফতরটিকে স্যানিটাইজ করেনি! আর এই সিরামের একটা মস্ত বড়ো গুণ হচ্ছে এটি স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেও দিব্যি টিকে থাকবে। আলাদা করে ফ্রিজারের দরকার হবে না।
বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে, গোটা শরীর জুড়ে অজস্র কাটা দাগ। আর সেই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, বুকে একটা দগদগে ঘা দেখা দিয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে, শরীর এই মানসিক পরজীবীকে প্রত্যাখ্যান করা শুরু করে দিয়েছে। কতদিন ওর কাছে সময় আছে ও জানে না। ও শুধু সেটাই করবে যেটা ওকে করতে বলা হবে। বুকের ওপর একটা আয়োডিনে ভেজানো তুলো চেপে ধরে ও তাকাল বোর্ডের দিকে। সেখানে অসংখ্য ছবি এবং খবরের কাগজের টুকরো সুতো দিয়ে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। আর সেই সুতোগুলো মিশেছে একটি বাচ্চা মেয়ের ছবির ওপর। ছবিটি অনেক পুরোনো, প্রায় কুড়ি বছরেরও বেশি। সেই মেয়েটির কাছেই ওকে যেতে হবে। তবে তার জন্য একজনকে সরানো খুব দরকার। তাঁর ছবি রয়েছে ওই বোর্ডেই। ছবির ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে অর্জুন কাজ করেছে অনেক দিন। খুব ভালো করে জানে ওই লোক কীভাবে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ প্ল্যান করে ফেলেন। এক-এক করে তাঁর বেশিরভাগ সোর্সকে প্ল্যান করে মারা হয়েছে। আর প্রায় ছয় মাস হয়ে গেল সেই ভদ্রলোকও উধাও হয়ে গিয়েছেন। হন্যে হয়ে সবাই খুঁজে চলেছে। আর অর্জুন জানে এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। হিসেব কষেই ভদ্রলোক উধাও হয়েছেন। তিনি তলে-তলে কিছু আন্দাজ করে থাকলেও থাকতে পারেন। এখন দেখা যাক তিনি বুনো হাঁসের পেছনে ধাওয়া করেন, না স্বর্ণডিম্ব প্রদানকারী হাঁসের! পাশের টেবিল থেকে একটা ছয় ইঞ্চি লম্বা ছুরি তুলে ছুড়ে দিল ওই ছবির দিকে। ছুরিটা সশব্দে বিঁধে গেল ভদ্রলোকের তীক্ষ্ণ দুই চোখের মাঝে। ‘কলিযুগের অর্জুন’ অর্জুন জ্যাকসের লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা এখনও আগের মতোই আছে।
