৫. নভেম্বর ১৮ দুপুর দেড়টা

৫. নভেম্বর ১৮ দুপুর দেড়টা

সপ্তাহে চারদিন বিকেলবেলা বাড়ির চেম্বারে রোগী দেখা ডক্টর নাগের রুটিনের মধ্যে পড়ে। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার, চারজন করে রোগী আসে তাঁর কাছে। আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হয়। আগে সেটার প্রয়োজন হত না, কিন্তু শরীরের অবস্থার জন্য আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া কাউকে দেখেন না ডক্টর নাগ। আর রোগীও তিনি সকালেই দেখেন। অন্যসময় তিনি দেখতে পারেন না। মাঝে-মাঝে তার খারাপ লাগে, হয়তো আরও একটু করতে পারতেন এই মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে পিষতে থাকা মানুষগুলোর জন্য। কিন্তু মন চাইলেও শরীর তো আর সায় দেয় না এখন। ওই কথায় আছে ঠিকই, শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়, কিন্তু সেটা তখনই সম্ভব যখন মন আর শরীর একই সারিতে থাকবে। তবুও কাজ করে যান ডক্টর নাগ, যতটুকু সম্ভব ততটুকুই। আজ বেশি কেউ আসেনি, দু’জন রোগীই এসেছিল। এদের মধ্যে একজনের কথা মনে পড়ল ডক্টর নাগের। একটি বছর পঁচিশের মেয়ে, এক বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে। আপাতদৃষ্টিতে সে ঠিক রয়েছে, কিন্তু সারাক্ষণ উদ্‌বেগে ভুগে চলেছে সে। সে বলছিল কাজের জায়গায় ঘটে চলা ছোটো- বড়ো অনেক ঘটনার কথা। এই বছর বিশ্বজুড়ে চলা আর্থিক মন্দার জেরে তার কোম্পানি অনেক কর্মীকে ছাঁটাই করেছে, মেয়েটির মনে হয় এই বোধহয় সে-ও ছাঁটাই নামক গিলোটিনের আওতায় চলে এল। মেয়েটির কথা শুনতে-শুনতে মনে হচ্ছিল ডক্টর নাগের, এখন তাঁর কাছে যারা আসে বেশিরভাগেরই সমস্যা যেন কিছুটা একরকমই। জীবন নামক জাঁতাকল এমনভাবে পিষে চলেছে তাদের, বেরোনোর উপায় নেই একদম। পাল্স দেখার সময় যখন ডক্টর নাগ মেয়েটির হাত ধরেছিলেন, তিনি এক মুহূর্তের জন্য দেখতে পেয়েছিলেন মেয়েটির মনের ভেতর ঘরের অবস্থা। সে বসে রয়েছে এক দ্বীপের মধ্যে, চারপাশে হয়ে চলেছে তুমুল সামুদ্রিক ঝড়। আর সমুদ্রের জল একটু-একটু করে যেন দ্বীপটিকে গ্রাস করছে। মেয়েটির কথা পুরোটা শুনে ডক্টর নাগ ওকে দুটো ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছিলেন, আর বলেছিলেন দিনে অন্তত আধ ঘণ্টা সময় যেন ও নিজেকে দেয়। বলেছিলেন ও নিজেকে যেভাবেই দেখুক না কেন সেটা যেন ভেতরে না চেপে রাখে, যদি কাউকে ও বলতে না-ও পারে তাহলে সেটা লিখে রাখুক। লিখতে না পারলে ও সেটা ছবির মাধ্যমে বা যে কোনো উপায়ে ও প্রকাশ করুক। মোদ্দা কথা ওকে নিজের মনের কথা ভেতর থেকে বের করতে হবে। সব কথা নিজের ভেতর চেপে রাখা কোনো কাজের কথা নয়। তারপরই তাঁর মনে হল, নিজে তো এই জ্ঞানটা রোগীদের তিনি দিচ্ছেন, নিজের ক্ষেত্রে সেটা প্রয়োগ করছেন কি? বোধহয় না। তাহলে কি তাকে জ্ঞানপাপী বলা যায়? কে জানে!

চেম্বার থেকে বেরিয়ে তিনি ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। মহেশ গিয়ে চেম্বার বন্ধ করে দেবে। ঘরের ভেতর ঢুকে তিনি বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। দেখতে না দেখতে তিনি পৌঁছে গেলেন ওই দিঘির সামনে। অদ্ভুত শান্তি রয়েছে এখানে আজ। কিন্তু সেই শান্তি কতক্ষণ থাকবে সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে ডক্টর নাগের মনে। কারণ তিনি দেখতে পাচ্ছেন দিঘির জলে একটু-একটু করে শ্যাওলা ভাসছে। যতবার তিনি সাঁতার দিয়ে সেই শ্যাওলাকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন, কোনো না কোনোভাবে আবার সেটা চলেই আসে। শরীর ভেঙে পড়ছে। এরই ইঙ্গিত হয়তো এটা। উঠে দাঁড়ালেন ডক্টর নাগ, তারপর তিনি ঝাঁপ দিলেন দিঘিতে। শুরু করলেন ডুবসাঁতার দেওয়া। তাঁকে যেতে হবে অনেকটা গভীরে, একটা লুকোনো কুঠুরিতে, তারা রয়েছে সেখানে। তারা রাজবংশী— এই পোড়া জীবনে সবচেয়ে বেশি যাঁকে ভালোবাসতেন ডক্টর নাগ। ডুবসাঁতার দিয়ে অনেকটা নেমে গেছেন নিচে, ওই যে দেখা যাচ্ছে সেই কুঠুরি, যেখানে তারা রয়েছেন একটা আগুনের পাশে। ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তারা বললেন, “সময় হল এতক্ষণে?”

গলার মধ্যে একটা চাপা অভিমান টের পেলেন ডক্টর নাগ। তিনি এগিয়ে এসে বললেন, “ওই আর কী, মানে, বেশ কিছু পেশেন্ট এসেছিল আজ। একটু সময় লাগল।”

তারা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “সেটা দেখতেই পাচ্ছি। বড্ড উচাটন হয়ে যাচ্ছ আজকাল। জলে শ্যাওলা জমেছে দেখতে পাচ্ছ নিশ্চয়ই?”

বোধি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “না দেখতে পেয়ে উপায় আছে? রোজই পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। রোজই আবার জমা হয়।”

তারা বোধিকে কাছে টেনে বললেন, “এর মানে তুমি নিশ্চয়ই জানো?”

বোধি মাথা নাড়লেন, দেয়াল-লিখন পড়েছেন অনেক আগেই। তারা এবারে একটু কড়া গলায় বললেন, “বোধি, এই পৃথিবীর দায়িত্ব তোমাকে কেউ নিতে বলেনি। যে ক্যানসার তোমার শরীরে বাসা বেঁধেছে সেটা কিন্তু তুমি এক বছর আগে যা করেছিলে সেটারই সাইড এফেক্ট।”

বোধি তাকালেন তারার দিকে, তিনি বললেন, “খুব ভালো করে জানি, তারা। অভিশাপকে নিজের শরীরে বহন করার মানে কী সেটা খুব ভালো করেই জানি।”

“তুমি অভিশপ্তকে নিজের আত্মার মধ্যে বন্দি করেছ, সেটা বুঝলাম। কিন্তু এই অভিশাপকে কেন নিজের শরীরে পাঠাচ্ছ?” ঝাঁঝিয়ে উঠলেন তারা।

বোধি একটু অবাক হয়ে তাকালেন, “আমি ঠিক বুঝলাম না! কী বলতে চাইছ তুমি?”

“শেষ এক বছরে ক’বার নিজের জন্য সময় দিয়েছ বোধি? কতবার নিজের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে খুঁজে দেখেছ তুমি? তুমি পাগলের মতো শুধু সেই অভিশপ্তের পেছনে ছুটে চলেছ। দিন নেই রাত নেই শুধু একই চিন্তা তোমার মাথায়— এই বোধহয় প্রলয় আসবে! এই করে তোমার নিজের ভেতরের পৃথিবীর বারোটা বাজছে সেটা খেয়াল করেছ?” চিৎকার করে উঠলেন তারা।

বোধি একটু চুপ করে রইলেন, “আমি এটা করতে বাধ্য হয়েছি, তারা। কারণ আমার মনে হয়েছে এটা এখন আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমি যদি এই এই দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন না করি তাহলে ভবিষ্যতে একটা অনর্থ হতে পারে।”

“কিন্তু এই অনর্থকে আটকাতে গিয়ে তুমি যে নিজের আত্মার অনর্থ ঘটিয়ে ফেলছ সেটার খেয়াল আছে? তুমি নিজে কোথাও গিয়ে নিজের মধ্যে একটা গড কমপ্লেক্স তৈরি করছ, বোধি! সেটা খেয়াল করেছ?”

“গড কমপ্লেক্স? কী বলতে চাইছ তুমি?” বোধি খেয়াল করলেন তাঁর গলাও সামান্য চড়ে গেছে। বহুদিন পর তিনি তারার সঙ্গে ঝগড়া করছেন। একটা অদ্ভুত রকমের মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে তার মনে।

“এই পৃথিবীর দায়িত্ব, প্রলয়কে আটকানোর দায়িত্ব তুমি নিয়ে নিয়েছ। এটা গড কমপ্লেক্স নয়? আর মাঝে-মাঝেই তুমি রোগীদের কাউন্সেলিং করানোর সময় তাদের ভেতরে উঁকি দিয়ে তাদের সারানোর চেষ্টা কর। এটাও কি গড কমপ্লেক্সের মধ্যে পড়ে না?”

“না, পড়ে না। জেনেশুনে আমি যদি কাউকে আত্মঘাতী হওয়ার দিকে ঠেলে দিই সেটা চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় বলেই আমার মনে হয়।”

“আচ্ছা? একটা মানুষ তাহলে কীভাবে বাঁচবে সেটাও তুমি ঠিক করে দেবে তাহলে? তোমার কাজ পথ দেখানো, তাকে হাতে ধরে হাঁটানো তোমার কাজ নয়।”

“কিন্তু সেই মানুষ যদি হাঁটতে-হাঁটতে একটা খাদের ধারে চলে আসে তাহলে কী করব, তারা? তাকে ছেড়ে দেব?” একটু মরিয়া হয়ে বলে উঠলেন বোধি। তারা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন বোধির দিকে। তিনি কিছু বললেন না। বোধি মাথা নীচু করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর তিনি বললেন, “হয়তো আমি ভুল করছি কিছু। হয়তো। আমি নিজে সম্পূর্ণ ঠিক? না, তারা; আমি এটা দাবি করিনি, করি না। কিন্তু মনের ভেতরে জেগে ওঠা এই বোধটা আমাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। জানি না কেন।”

“তাহলে তো তোমাকে জানতে হবে, বোধি। না জেনেশুনে অন্ধের মতো এভাবে আত্মঘাতী হওয়ার কোনো মানে আছে কি?” ঝাঁঝিয়ে উঠলেন তারা। সূক্ষ্মদেহেও বোধির জন্য এখনও এতটা চিন্তা করে চলেন তারা। দেখে একটু হাসলেন তিনি। তারা আবার ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “বোকার মতো না হেসে বলবে কিছু?”

একটু চুপ করে রইলেন ডক্টর বোধিসত্ত্ব নাগ, তারপর তিনি বললেন, “আসলে কী জানো, এই অভিশাপকে বহন না করলে যে অনেক মানুষের ক্ষতি হয়ে যাবে।”

“আবার শুরু হল! উফ্, তোমাকে নিয়ে পারা যায় না মাইরি! এসেছেন আমার স্পিরিচুয়াল জেলার!” মুখ ঝামটা দিলেন তারা।

হেসে উঠলেন ডক্টর নাগ, “স্পিরিচুয়াল জেলার! কথাটা কিন্তু বেশ! তাহলে এটা কী ধরনের জেলখানা? আলকাতরাজ না তিহাড়?”

তারা এখনও তাকিয়ে ডক্টর নাগের দিকে, “ব্যাড জোক, বোধি। আর আমি ঠাট্টা-তামাশার মেজাজে নেই একদম।”

কান ধরে বললেন ডক্টর নাগ, “ওক্কে ম্যাডাম, সরি। ক্ষমো মোরে দেবী!” তারা আরও জোরগলায় বললেন, “বোধি, আই অ্যাম সিরিয়াস। ইউ আর ডায়িং! তোমার কি মনে হয় আমি জানি না? আমি খেয়াল করিনি?”

বোধি একটা পাথরের চাঁই-এর ওপর বসে বললেন, “জানি, তারা। তুমি সব জানো। সময় খুব বেশি নেই আমার কাছে আমি জানি সেটা। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার কাছে রাস্তা নেই আর। সেজন্যই হয়তো আমি অর্বাচীনের মতো ভাবছিলাম অমরত্ব নামক অভিশাপের কথা। সেজন্যই হয়তো আমি ম্যাক্সিকে বাড়াবাড়ি চাপ দিচ্ছি। ভুল করছি না ঠিক করছি জানি না। হয়তো ভুলই করছি। কিন্তু রাস্তা নেই। সত্যিই রাস্তা নেই।”

তারা বোধির কাছে এসে বললেন, “এভাবে বলতে নেই, বোধি। তুমি নিজেকে জানতে পেরেছিলে। নিজের দায়িত্বে কিন্তু তুমি নিজেকে ভুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করছ। রাস্তা আছে, বোধি। তোমার কাছে রাস্তা আছে।”

বোধি তাকালেন তারার দিকে। তারা বোধির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “লেট ইট গো। অভিশাপকে বহন করার এই বোধকে ত্যাগ করো, বোধি। এই পৃথিবীর ভার তুমি একা কাঁধে নিতে পারবে না।

“কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব, তারা? আমি তো সত্যিই জানি না। অভিশপ্তকে নিয়েও আমি অভিশাপের বোধকে ছেড়ে দেব? আমি জানি না কীভাবে সেটা সম্ভব! সারাক্ষণ আমাকে এই ভয়টা তাড়িয়ে বেড়ায় যে এই অভিশাপ অন্য কোনো নিরপরাধ মানুষকে গ্রাস করে ফেলবে! রুদ্রর চেহারাটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। আমি কীভাবে সেটা হতে দিই? এতটা স্বার্থপর কি আমি হতে পারি?” বলে তাকিয়ে রইলেন তারার দিকে ডক্টর নাগ

তারা বোধির পাশে বসলেন, “কিন্তু তোমাকে আমি এভাবে যন্ত্রণা পেয়ে মরতেও দেখতে পারব না, বোধি।” গলাটা যেন কেঁপে গেল তারার। বোধি তাকালেন তারার দিকে, তারার রক্তমাংসের শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়েছে অনেক দিন হল। যেটা বেঁচে আছে বোধির ভেতরে, সেটা হল তারার চেতনা। আর চেতনা এবং আত্মা যদি কোনোভাবে সমার্থক হয়ে থাকে তাহলে সেটাকে হয়তো বোধি নিজের মধ্যেই লালন করে চলেছেন। এহেন চেতনা কি কখনও এতটা আবেগপ্রবণ হতে পারে? না কি বোধি যা ভাবছেন সেটাই প্রতিফলিত হচ্ছে তারার মাধ্যমে?

তিনি জড়িয়ে ধরলেন তারাকে, “তুমিই তো বলেছিলে, একটা মানুষের মৃত্যু তখনই হয় যখন তাকে কেউ মনে রাখে না। চিন্তা কোরো না, আমি সব ঠিক করে দেব।”

“মানে তুমি শুধরোবে না এখনই! জ্ঞানপাপী হয়েই রয়ে যাবে!” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন তারা।

বোধি, তারার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন, “কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো। তারপর আমি দেখে নিচ্ছি। জানোই তো একটা রাস্তা বন্ধ হলে আরও অনেক ক’টা রাস্তা খুলে যায়। এটা সত্যি যে শরীরের খবর পেয়ে আমি মুষড়ে পড়েছিলাম ঠিকই, বিগত এক বছর ধরে অনেক কিছুই হয়ে চলেছে আমার মনের ভেতর। কিন্তু ওই যে, আশা ছাড়ছি না এখনই। দেখি না কদ্দুর কী হয়। যা হবে দেখা যাবে। দেখি না আর একটু চেষ্টা করে যদি কিছু বদলায়! যা-ই হোক, অনেক দিন পর আমাদের মধ্যে ঝগড়া হল। আজ আসি?”

“যদি সম্ভব হয় দাদার সঙ্গে একটু দেখা করে এসো। দেখো, তোমার হয়তো ভালোই লাগবে।”

বোধির মুখটা মুহূর্তের মধ্যে থমথমে হয়ে গেল, “জানি না সেটা আমি পারব কি না। নিজেকে এখনও আমার এক অপরাধী মনে হয়।”

“উফ্! আবার শুরু হল এই গিল্ট ট্রিপে যাওয়া। ঠিক আছে তোমাকে এখনই যেতে হবে না। যদি সময়-সুযোগ পরিস্থিতি অনুকুল হয় তখনই নাহয়

দেখা করে এসো।”

“ওক্কে, ম্যাডাম। আসি এখন?” উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ডক্টর নাগ।

এতক্ষণে তারার মুখে একটু হাসি দেখা দিল, “সাবধানে এসো, একেবারে ডুব মেরে দিয়ো না আবার। এসো এখন।”

সেই পাথুরে কন্দর থেকে বেরিয়ে আবার স্রোতের মধ্যে নিজেকে সঁপে দিলেন ডক্টর নাগ। নিজের হাতের এক ইশারায় সেই স্রোত তাঁকে নিয়ে চলল ওপরে। যেতে-যেতে তিনি শুনতে পেলেন এক অপার্থিব অট্টহাসি। তাঁর বন্দি হাসছে, আর বলে চলেছে, “সময় শেষ হয়ে আসছে, হে প্রবুদ্ধ মানব। সময় শেষ হয়ে আসছে একটু-একটু করে। ক্ষয় হচ্ছে, ক্ষয়। ক্ষয়কে আটকাবে কী করে?”

সেই অট্টহাসি যেন জলের মধ্যে এক আলোড়নের সৃষ্টি করল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল সেই পরজীবী যেন এখনই তার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে চলে যাবে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিলেন ডক্টর নাগ। এখনও কিছুই শেষ হয়ে যায়নি। সেই বন্দি কোথাও পালাতে পারবে না, ডক্টর নাগের আদিম সত্তা নজর রাখছে। তারা ভালো বলেছিলেন কথাটা কিন্তু! স্পিরিচুয়াল জেলার! অনেক দিন পর হাসলেন ডক্টর নাগ। দিঘি থেকে উঠে আসার সঙ্গে-সঙ্গে তিনি শুনতে পেলেন আকাশে মেঘগর্জন হচ্ছে হঠাৎ। এর মানে একটাই, বাস্তব জগৎ থেকে ডাক এসেছে।

মনের ভেতরের পরাবাস্তব জগৎ থেকে বাস্তব জগতে ফিরে এলেন ডক্টর নাগ। দরজায় বেশ জোরে ধাক্কা দিচ্ছে মহেশ। দরজা খুলতেই তিনি দেখতে পেলেন মহেশ দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে বলছে, “কাকাবাবু, আপনার একটা ফোন এসেছে।”

ঘড়ির দিকে তাকালেন ডক্টর নাগ, দুপুর দুটো বাজে। এখন আবার কে ফোন করবে? সাধারণত এই সময় কেউ ফোন করে না। অবশ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার জন্য কেউ ফোন করতেই পারে। ল্যান্ডফোনের রিসিভারটা তুলতেই ওপাশ থেকে একটা গলা ভেসে এল, “নমস্কার, ডক্টর। কেমন আছেন? চিনতে পারছেন তো?”

গলাটা শুনেই চিনতে পারলেন ডক্টর নাগ, মুখ থমথমে হয়ে উঠল তাঁর। চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বছর আগের কিছু দৃশ্য। তিনি উত্তর দিলেন, “না চিনতে পারার কিছু নেই। যে কারণে ফোন করেছেন সেটা বলুন। আমার লাঞ্চের সময় হয়ে এসেছে।”

“একদম কাজের কথায় চলে আসাটা আপনার বরাবরের অভ্যেস দেখতেই পারছি। যা-ই হোক, তাহলে কাজের কথাতেই আসি। আপনার কাছে চিকিৎসার জন্য দিল্লি থেকে একজন বোধহয় আসবে এই এক-দু’দিনের মধ্যে, তা-ই না?”

“আমার কাছে অনেকেই আসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসে। এটা কোনো বড়ো ব্যাপার নয়।” ডক্টর নাগ উত্তর দিলেন।

“আচ্ছা বেশ, আপনার কথা মেনে নিলাম, এটা বড়ো ব্যাপার নয়। তাহলে আমাকে এটা বলুন, সেই পেশেন্টের নাম কি শবনম সুলতানা?” ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বরটা আবার ভেসে এল।

ডক্টর নাগ বললেন, “আমি বাইরের কারুর সঙ্গে আমার পেশেন্টদের ডিটেলস নিয়ে আলোচনা করি না।”

“কাম অন, ডক্টর! রুদ্রকে নিয়ে তো দিব্যি আলোচনা করেছিলেন মেজর সিংহের সঙ্গে গতবার!” একটা মেকি অভিযোগের সুর ভেসে উঠল টেলিফোনকারীর স্বরে।

ডক্টর নাগের গলাটা একটু কঠিন হল এবারে, “সেটা অন্য ব্যাপার ছিল। আশা করি ভুলে যাননি আপনি?”

“আরে না না, ডক্টর। মজা করছিলাম একটু। যা-ই হোক, দুটো জিনিস আপনাকে জানানোর ছিল।” এবারে টেলিফোনের ওপাশের গলাটা বেশ গম্ভীর শোনাল, “আপনি আমাকে বিশ্বাস করবেন কি করবেন না, সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। কিন্তু আমার মনে হয় আপনাকে এটা বলা দরকার। আপনার প্রাণসংশয় রয়েছে। আর আপনার কাছে শবনম সুলতানা বলে কেউ যদি আসে তার থেকে একটু সাবধানে থাকবেন।”

“আপনার এই কথা মনে হওয়ার কারণ?” ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন ডক্টর নাগ। টেলিফোনের ওপারের গলা আবার শোনা গেল, “কারণ আছে, ডক্টর। কারণ ছাড়া এ শর্মা আপনাকে ফোন করবে তা তো হয় না। উপ্‌স, আমি তো শৰ্মা নই, আমি তো অন্য কিছু!” একটা অট্টহাস্য ভেসে এল টেলিফোনের ওপার থেকে, মুহূর্তের মধ্যে গাম্ভীর্য উধাও! এক মুহূর্তের জন্য মনে হল ডক্টর নাগের, এই মানুষটাকে একবার স্টাডি করতে পারলে খুব ভালো হত।

নিজের মনোভাবকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রেখে ডক্টর নাগ বললেন, “আর কিছু বলবেন?”

“ও হ্যাঁ, একটা খবর আছে ঠিকই। সেটা আপনার জন্য নয়। আপনার বাড়ির কাজের লোক মহেশের জন্য। ওকে বলবেন ওর ফরিদচাচা আর বেঁচে নেই।”

নামটা জানেন ডক্টর নাগ, সামনা-সামনি কখনও দেখেননি ভদ্রলোককে, কিন্তু মহেশের কাছে শুনেছেন এই শহরে বেশ কিছু অনাথ ছেলেমেয়ের দায়িত্ব এই ভদ্রলোক নিতেন। মনটা একটু ভারী হয়ে গেল ডক্টর নাগের, তিনি বললেন, “কবে হল? আর কীভাবে হল?”

“সেটা এখন ফোনে বলব না আপনাকে। সামনা-সামনি যেদিন দেখা হবে সেদিন আপনি ঠিক জানতে পারবেন। আর তখনই বুঝবেন কেন আপনাকে সাবধান করছিলাম। ততক্ষণ অবধি বেঁচে থাকুন, মরবেন না প্লিজ।” ফোনটা কেটে গেল।

একটু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন ডক্টর নাগ। পাশ থেকে মহেশ বলছে, “অনেকক্ষণ টেলিফোনে বকবক করলেন, কাকাবাবু। এবার আসুন দুপুরের স্যুপটা খেয়ে নিন।”

মহেশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ডক্টর নাগ। তিনি ভাবছেন কীভাবে তিনি ওকে ফরিদের মৃত্যুসংবাদ দেবেন। মহেশ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার, কাকাবাবু? কিছু হয়েছে নাকি?”

মহেশের কাঁধে হাত রাখলেন তিনি। এই প্রথম বুঝতে পারলেন ডক্টর নাগ এই পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ কী হতে পারে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, “নিজেকে শক্ত করিস, মহেশ। তোর ফরিদচাচা আর বেঁচে নেই।”

চোখের সামনে একটা শক্তসমর্থ ছেলেকে তিনি ভেঙে পড়তে দেখলেন। বুঝতে পারলেন আবার ডক্টর নাগ, মৃত্যুর অভিঘাত কতটা প্রবল হতে পারে। তাঁর মনে হল, যদি সত্যিই তিনি তার ভেতরের পরজীবী সত্তাকে বন্দি করে রাখার জন্য অমৃতের সেবন করেন, তাহলে এই ধরনের অভিঘাত প্রচুর আসবে; তিনি আদৌ সামলাতে পারবেন তো?

ডক্টর নাগ যেন স্পষ্ট শুনতে পেলেন তার ভেতরের পরজীবী বন্দি বলে চলেছে, “সামলাতে পারবে, হে প্রবুদ্ধ মানব? পারবে সামলাতে?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *