১৬. নভেম্বর ২৬ বহির্জগতে সময় হয়েছে রাত এগারোটা পঁয়ত্রিশ
অর্জুন কোথায় আছে ও জানে না। ও শুধু জানে ও এখন মুক্ত। ওর মনের ভেতরের ধাতব ঘর থেকে সে চলে গেছে। অর্জুন এখন বসে রয়েছে এক বিশাল প্রান্তরে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে ওর। মাটিতে শুয়ে পড়ল ও। এমন সময় টের পেল পাশে এসে বসেছে কেউ। ও উঠে বসতেই দেখতে পেল ওর পাশে বসে রয়েছে রুদ্র। রুদ্র হাসল অর্জুনকে দেখে, “যাক তুইও এলি?”
অর্জুন বলল, “অবশেষে মুক্ত হতে পারলাম। কিন্তু ওই লোকটাকে যে ওদের মধ্যে ছেড়ে দিলাম?”
রুদ্র হাসল, “চিন্তা করিস না। ওই ডক্টর আছে না, ও সামলে নেবে দেখিস। ওই লোকটা স্পেশাল। চল, এখন আমাদের সঙ্গে খেলবি আয়।”
“তোদের সঙ্গে?” জিজ্ঞেস করল অর্জুন।
“ওই যে দাঁড়িয়ে রয়েছে আসলাম, ফারুক, কার্তিক, জোসেফ এবং আরও অনেকে। আমার বন্ধু ওরা। আর তুই আমার বন্ধু তো ওরাও আমার বন্ধু। চল এবার। খেলা হবে।” হেসে উঠল রুদ্র। ওর দেখাদেখি অর্জুনও হেসে উঠল। দেখতে না দেখতে ওরা যেন ফিরে গেল ওদের ছোটোবেলার রূপে। তারপর শুরু হল ধুলোর মধ্যে ওদের ফুটবল খেলা। অর্জুন সত্যিই খুব খুশি এখন। সত্যিই।
***
স্টাডিরুমে বসেছিলেন ডক্টর নাগ। ডক্টর ইমহোটেপের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি, আগের মতো আর তাড়াহুড়ো করতে হবে না জানিয়ে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁর স্বাস্থ্যের উন্নতি চোখে পড়েছে। তাই তিনি বলেছেন যে, ম্যাক্সিকে যতটা সম্ভব সময় নিতে হয় নিক। আর স্বাভাবিকভাবেই ম্যাক্সি ইমহোটেপ খুশি হয়েছেন খুব। কারণ তাঁকে পাগলের মতো খাটতে হবে না আর তিনি নিউ ইংল্যান্ড পেট্রিয়টসের খেলাও মিস করবেন না। শহর, রাজ্য, দেশ অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে এদিকে। প্রফেসর দাস এবং অতনু ও সামলে নিয়েছে। ও আবার কলকাতা পুলিশের চাকরিতে জয়েন করেছে। ডক্টর নাগ এবার প্রফেসর দাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন নিয়মিত। আর নিরুপমা? ও ভালো আছে, অনেক ভালো আছে। শবনমের সঙ্গে ও সত্যিই খুব ভালো আছে।
ফোনটা রেখে তিনি গেলেন ঘরে। পাশের ঘরে মহেশ ঘুমোচ্ছে। ছেলেটা একধাক্কায় যেন অনেকটা বড়ো হয়ে গেল। ঘরে গিয়ে তিনি চোখ বন্ধ করলেন, আর দেখতে না দেখতে তিনি নিজেকে পেলেন সেই দিঘির সামনে। সেখানে আর আগের মতো শ্যাওলা নেই। ঝাঁপ দিলেন সেখানে ডক্টর নাগ। তিনি শুনতে পাচ্ছেন তারাদেবীর ডাক, এখনই গিয়ে তাঁর সঙ্গে রোজকার আলোচনা করতে হবে। তারার কাছে যাওয়ার আগে তিনি দেখলেন তার সঙ্গে সাঁতার দিচ্ছে ওই অদ্ভুত দেখতে প্রাণীটা, ওর মধ্যে এখন হিংস্রতার লেশমাত্রও নেই। সে দিঘিতে সাঁতার কাটে, দৌড়ে বেড়ায়, সে-ও ভালো আছে অনেক। তারার কাছে আসার আগে আর একটি কাজ করতে হবে। দিঘির একদম গভীরে চলে এলেন তিনি, সেখানে এক অপার্থিব নীল আলোয় দেখা যাচ্ছে গলা অবধি প্রোথিত একটি মূর্তিকে। ডক্টর নাগ আঙুলের ইশারা করলেন, সেই মূর্তি একটু উঠে এল যেন। এখন সে বুক অবধি প্রোথিত। তিনি অশ্বত্থামা, ডক্টর নাগের বন্দি। ডক্টর নাগের দিকে এক জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তিনি বললেন, “কী বলতে এসেছ এখানে, প্রবুদ্ধ মানব?”
ডক্টর নাগ হাসলেন, “বলতে নয়। আপনাকে দিতে এসেছি।”
বলে তিনি বুকের মধ্যে হাত বোলালেন, সেখান থেকে এক উজ্জ্বল রশ্মি এসে মিশে গেল দ্রোণপুত্রের শরীরে। নিমেশের মধ্যে তাঁর আকার যেন বেড়ে গেল বেশ কিছুটা। তিনি তাকালেন ডক্টর নাগের দিকে, “আমাকে সম্পূর্ণ করে দিলে? কেন?”
“কারণ আমি জানি ক্ষয় হলে কেমন লাগে। তাই আপনাকে সম্পূর্ণ করে দিলাম।” স্মিত হাসলেন ডক্টর নাগ।
অশ্বত্থামা একটা ক্রূর হাসি হাসলেন, “কতদিন তুমি আমাকে আটকে রাখবে এখানে? একদিন না একদিন আমি এই কারাগৃহ থেকে বেরিয়ে প্রলয় আনবই।”
শান্ত স্বরে হাসলেন ডক্টর নাগ, তাঁর পেছনে ফুটে উঠল সহস্র জ্বলন্ত চোখ। তিনি স্মিত হেসে বললেন, “আর তখন নাহয় আমরা আরও একবার প্রার্থনা করব।” বলে তিনি ইশারা করলেন পেছনদিকে। অশ্বত্থামা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন তিনি আসলে প্রোথিত রয়েছেন এক মহাকায় ধ্যানী মূর্তির কোলে। সেই ধ্যানী মূর্তির এগারোটা মুখ, সহস্র চোখ, সহস্রাধিক হাত। এর মধ্যে দুটো হাত তার দু’পাশে অবস্থিত। তার সামনে এসে বসলেন ডক্টর নাগ, “আসুন, দ্রোণপুত্র, আমরা প্রার্থনা করি। প্রলয় আমাদের হাতে নেই। কিন্তু এটুকু তো করতেই পারি, তা-ই না? আসুন, প্রলয়ের পথ থেকে আমরা বরং মহাপ্রস্থান করি মুক্তির পথে।”
“না, আমি তোমার এইসব কথা শুনতে রাজি নই। আমি এই সমগ্র সৃষ্টিকে ছারখার করে দিয়ে নিজের মুক্তির পথ খুঁজে নেবই!” হুংকার দিয়ে উঠলেন অশ্বত্থামা। তাঁর দিকে শান্ত সমাহিত স্বরে বললেন ডক্টর নাগ, “সেই দায়িত্ব আপনার নয়। আপনি ঈশ্বর নন।”
***
