৪. নভেম্বর ১৫ বিকেল পাঁচটা

৪. নভেম্বর ১৫ বিকেল পাঁচটা

হাসপাতালের বাইরে এখন অতটা লোক নেই। বেশ কিছু রোগীর আত্মীয়স্বজনরা এসেছে বোঝা যাচ্ছে, এদের মধ্যে কেউ হয়তো তাদের প্রিয়জনকে দেখতে এসেছে, কেউ এসেছে ছুটি করাতে, আবার কেউ এসেছে শেষ দেখা দেখতে। জীবন-মৃত্যুর এক অদ্ভুত চক্র চলতে থাকে ইট-কাঠ-কংক্রিটের এই জঙ্গলের ভেতর। হাসপাতালের বাইরের গেটে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলোই ভাবছিলেন ডক্টর বোধিসত্ত্ব নাগ। একটা ক্যাব বুক করেছেন তিনি, এখনও আসতে বোধহয় পাঁচ মিনিট মতো লাগবে। কর্মব্যস্ত এই শহরের মধ্যে তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক প্রস্তরীভূত মূর্তির মতো, চোখ স্থির হয়ে রয়েছে হাসপাতালের ইমারতের দিকে। তিনি যেন শুনতে পাচ্ছেন কোনো এক সদ্যোজাতের কান্নার শব্দ, আর যেন তার কানে এসে পৌঁছচ্ছে কোনো এক মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ নিঃশ্বাসের শব্দ। আর এর মাঝেই তিনি টের পাচ্ছেন তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন, ঠিক যেন একটা ঘড়ি থেমে যাওয়ার আগের মুহূর্তে আপ্রাণ চেষ্টা করছে সময়টাকে ধরে রাখার। অন্তত আজ অঙ্কোলজি ডিপার্টমেন্টের হেড ডক্টর সাধুর কথায় সেটাই মনে হল। কিছুক্ষণ আগেও তিনি বলছিলেন, “বড্ড দেরি করে ফেললেন, ডক্টর নাগ! সময় বেশি নেই আপনার কাছে। ফুসফুসে যেভাবে ক্যানসার ছড়িয়ে গেছে সেটার জন্য আর কিছু করার নেই। আই অ্যাম সরি, ডক্টর!”

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডক্টর নাগ, প্রায় এক বছর আগে শোনা তার ভেতরের পরজীবী সত্তার ওই কথাটি মনে পড়ে যাচ্ছিল— “তোমার এই শরীর একদিন না একদিন ক্ষয়ে যাবেই। সেদিন এই বন্দিশালা থেকে আমি মুক্তি পাব। সেদিন দেখবো তুমি কী করতে পারো।”

নিজের অজান্তেই তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “কী করতে পারি? দেখা যাক কী করতে পারি। করতে হয়তো পারি অনেক কিছুই, দেখা যাক।”

পকেটে রাখা দূরভাষ যন্ত্রটি হঠাৎ কেঁপে উঠল, কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ব্যাগ সামলে পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে তাকালেন সেদিকে। ক্যাব চলে এসেছে, গেটের থেকে মোটামুটি দশ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ব্যাগটা সামলে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। একটা সাদা ডিজায়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে সেথায়। পেছনের সিটে বসার সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার ছেলেটি বলে উঠল, “স্যার, ওটিপি-টা।”

ডক্টর নাগ একটু অন্যমনস্ক ছিলেন, তিনি অস্ফুটে বললেন, “কিছু বললে?”

“ওটিপি-টা, স্যার। ওটা দেবেন প্লিজ।” ড্রাইভার ছেলেটি আবার বলল ওঁকে।

“ওটিপি না? দাঁড়াও।” মোবাইলের নোটিফিকেশন দেখেই ওটিপি বললেন ডক্টর নাগ। তারপর তিনি শরীর এলিয়ে দিলেন গাড়ির সিটে। চোখের সামনে ভেসে উঠল অনেকগুলো টুকরো দৃশ্য। ছোটোবেলার দিঘি, হার্ভার্ডে তারার সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, শহরে ফিরে এসে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাজ শুরু করা, সময়ে সময়ে মহেশের হাতের বানানো ঘোলের শরবত— সবই মনে পড়ল। তবে সবচেয়ে বেশি চোখের সামনে ভাসছে সেই দিনটা। ওই একটা দিন, তার জীবনকে ওলট-পালট করে দিয়ে চলে গিয়েছিল। ভালো, খারাপ যা-ই হয়ে থাকুক, ডক্টর নাগ সেইদিনের পর থেকে আগের মতো ছিলেন না।

গাড়ি বাইপাস ধরে চলা শুরু করেছে ততক্ষণে। আর ডক্টর নাগের চোখের সামনে ভেসে উঠছে রুদ্রর মুখ। মায়াভরা চোখ ছিল ছেলেটির। কিন্তু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওকে এমন কিছু করতে হয়েছিল যেটা ওকে শেষ করে দিচ্ছিল ভেতরে। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও কিছু করার নেই, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বাইরে এমন অনেক কিছু ঘটে যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। সেইদিন ডক্টর নাগ বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের মাঝের সেই সূক্ষ্ম সীমারেখা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। মুখোমুখি হয়েছিলেন নিজের অতীতের, যে স্মৃতি মনের গভীরে পুঁতে রেখেছিলেন সেটা যেন জম্বির মতো উঠে এসেছিল, আর তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে তিনি খোঁজ পেয়েছিলেন মুক্তির। বোধিসত্ত্বর সেদিন বোধিলাভ হয়েছিল। আর যেই অপার্থিব পরজীবী সত্তা তাকে ওই অমানুষিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, সে অবশ্য এখনও আছে ডক্টর নাগের ভেতরে। তাঁর যাওয়ার উপায় নেই, যতদিন বেঁচে আছেন ডক্টর নাগ, ততদিন তিনি এই পরজীবী সত্তাকে পালাতে দেবেন না। যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন! কতদিন? এক মুহূর্তের জন্য ডক্টর নাগের মনে হল যদি অমরত্ব নামক অভিশাপটি তিনি পেতেন তাহলে বোধ হয় খুব ভালো হত। পৃথিবীকে প্রলয়ের হাত থেকে রক্ষা করার আর একটু সময় পেতেন তিনি।

এমন সময় কানে ভেসে এল একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি। সে হাসছে আবার। কয়েক মাস আগে যখন কাশির সঙ্গে রক্ত উঠে এল সেদিনও সে হেসেছিল। যেদিন লাইব্রেরি থেকে ফেরার সময় কাশির দমকে রাস্তায় বসে পড়েছিলেন প্রায়, সেদিনও সে হেসেছিল। আর আজ তার অট্টহাসি যেন গোটা ব্ৰহ্মাণ্ড শুনে ফেলবে। ওই তো সে হাসছে, আর বলছে, “বলেছিলাম, হে প্ৰবুদ্ধ মানব, বলেছিলাম। আটকে রাখতে পারবে না। আটকে রাখতে পারবে না। সম্ভব নয় এই অভিশাপকে শরীরে বহন করা। আগের কেউ পারেনি। তুমিও পারবে না। শরীর ক্ষয়ে যাবে তোমার। সেদিন আমার মুক্তি হবে তোমার এই বাঁধন থেকে। মুক্তি হবে। মুক্তি।”

ডক্টর নাগ বিচলিত হলেন না। এই ধরনের উসকানিমূলক কথা সে বলেই থাকে। অতিমারীর সময়ের নিউ নর্মালের মতো এটাও এক ধরনের নিউ নর্মাল হয়ে গিয়েছে তার কাছে। কিন্তু শরীর ক্ষয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ভাবাচ্ছে তাঁকে সময়, আর একটু সময় পেলে সত্যিই খুব ভালো হত। মোবাইলটা বের করে দেখলেন সময় হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচটা। এর মানে বস্টনে হয়তো সময় হবে সকাল আটটা। কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে তিনি একটা নম্বর বের করে সেটাতে ডায়াল করলেন, রিং হচ্ছে, ওপাশের জন এখনও ধরছে না। বেশ কয়েক বার রিং হওয়ার পর ডক্টর নাগ শুনতে পেলেন একটা ঘুমজড়ানো গলা, “হ্যালো!”

ডক্টর নাগ একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন, “ডক্টর ম্যাক্সিমিলিয়ান ইমহোটেপ?”

“দ্যাট উড বি মি। হু ইজ কলিং ইন দিস আওয়ার?” একটা বিরক্তিসূচক উত্তর পেলেন ডক্টর নাগ। তিনি একটু হেসে বললেন, “ইয়োর ওল্ড ফ্রেন্ড। এখন জেগে ওঠো, স্লিপিং বিউটি।”

ওপাশের ভদ্রলোক যেন ধড়মড় করে উঠে বসলেন, “বোধি? তুমি এখন কল করছ? আরে আগে বলবে তো। আমি ঘুমের ঘোরে কী না কী বলে দিলাম তোমাকে! সরি সরি! রিয়ালি সরি।”

হাসলেন ডক্টর নাগ, এখনও আগের মতো রয়ে গেছে, একটু রগচটা কিন্তু খুব ভালো মনের মানুষ এই ডক্টর ইমহোটেপ। আসল নাম ম্যাক্সিমিলিয়ান টমলিনসন। কিন্তু স্কুলে পড়ার সময় মিশরের ওপর বেশ কিছু বই পড়ে নিজের নাম বদলে ম্যাক্সিমিলিয়ান ‘ইমহোটেপ’ করে নিয়েছিল সে। ভদ্রলোককে দেখে কেউ বলতে পারবে না যে এই লোক পৃথিবীর প্রথম দশজন নিউরোবায়োলজিস্টদের মধ্যে আসেন। ডক্টর নাগ হেসে বললেন, “একটু বেলা করে ঘুমোচ্ছিলে? রাতে কয় পাত্তর চড়িয়েছ হে?”

ওপাশ থেকে একটা প্রাণখোলা হাসি ভেসে এল, “নিউ ইংল্যান্ড জিতেছিল, তাই দুটো বাডওয়াইজারের ক্যান শেষ করেছিলাম মাত্র। এই তো। যা-ই হোক, তুমি বলো। এত সকালে নিশ্চয়ই তুমি আমার বিয়ার খাওয়ার গল্প শোনার জন্য ফোন করোনি?”

ডক্টর নাগ একটু চুপ করে গেলেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর তিনি বললেন, “ম্যাক্সি, আই নিড ইউ টু স্পিড আপ দ্য প্রসেস।”

এবার ওপাশের কণ্ঠস্বর চুপ করে গেল। ডক্টর নাগ অপেক্ষা করছিলেন ডক্টর ইমহোটেপের কথার জন্য। বেশিক্ষণ নয়, কয়েক সেকেন্ড পরেই ডক্টর ইমহোটেপের কথা শোনা গেল, “বোধি, এই প্রসেসটা স্পিড আপ করলে কিন্তু হিতে বিপরীত হতে পারে। অনেক ভেবেচিন্তে কিন্তু তুমি আর আমি দু’জনেই এই প্রজেক্ট লাজারুস বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আর এই কাজ আমাকে নিজের দায়িত্বে করতে হচ্ছে। বুঝতেই পারছ। গভর্নমেন্ট জানতে পারলে সবকিছু বাজেয়াপ্ত করে নেবে।”

ডক্টর নাগ বললেন, “জানি ম্যাক্সি, সবটাই জানি। কিন্তু কিছু করার নেই। তাড়া দিয়ে কাজ ভালো হয় না আমি জানি, কিন্তু এটা ছাড়া হয়তো উপায় নেই কোনো।” বলে একটু চুপ করে রইলেন ডক্টর নাগ, তারপর তিনি বললেন, “বেশিদিন নেই আমার হাতে। সেজন্যই বলছিলাম।”

ওপারে যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ শোনা গেল, “ডক্টর কী বলছে?”

“লাস্ট স্টেজ।”

“কত দিন আছে তোমার হাতে?”

“জানা নেই, ম্যাক্সি। কুড বি মান্থস, কুড বি উইকস, কুড বি ডেইস।” ওপাশ থেকে ডক্টর ম্যাক্সিমিলিয়ান ইমহোটেপ আর একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তিনি বললেন, “ঠিক আছে, এখনও টেস্ট রান চলছে। সাফল্যের পরিমাণ মাত্র ওয়ান পারসেন্ট। হান্ড্রেড পারসেন্ট সাফল্য তো দূরের কথা, আমরা টেন পারসেন্ট সাফল্যই অর্জন করতে পারব কি না জানি না।”

“ফাইভ পারসেন্টে কি পৌঁছতে পারবে বলে মনে হয়?” ডক্টর নাগ জিজ্ঞেস করলেন।

“চেষ্টা করতে পারি। প্রবাবলি একমাসের মতো লাগবে হয়তো।” ডক্টর ইমহোটেপের গলা ভেসে এল।

“মেক ইট ইন উইকস। টু পারসেন্ট সাফল্যের সম্ভাবনা থাকলেও হবে। চেষ্টা করো যতটা তাড়াতাড়ি হয়। হলে জানিয়ো। আমি চেষ্টা করব চলে আসার।” ডক্টর নাগ বললেন।

ওদিক থেকে ডক্টর ইমহোটেপ বললেন, “দেখা যাক, বোধি। আমাদের এদিকে এখন বড্ড কড়াকড়ি চলছে। সবচেয়ে ভালো হবে যদি তোমাদের ওদিকে কোথাও ফাইনাল ফেজটাকে এক্সিকিউট করা যায়। বুঝতেই পারছ কেন?”

না বুঝতে পারার কিছু নেই। নিয়মের বেড়াজালের মধ্যে যত ফাঁকফোঁকর এই দেশে রয়েছে অন্য কোথাও সেটা নেই। ডক্টর নাগ বললেন, “ঠিক আছে, আমি দেখে নিচ্ছি। কিন্তু আমি কথা দিতে পারছি না যে এখানে আদৌ সেটা সম্ভব হবে কি না। কারণ রিসোর্স তুমি কতটা পাবে সেটার গ্যারান্টি আমার পক্ষে কতটা দেওয়া সম্ভব হবে আমি জানি না।”

“সে যা-ই হোক; তোমার ওখানে বা আমার এখানে, যেখানেই এক্সপেরিমেন্টটা করা হোক না কেন, সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন আমি হান্ড্রেড পারসেন্ট শিয়োর হতে পারব।”

“যা-ই হয়ে যাক না কেন, একটু চেষ্টা করো, ম্যাক্সি। আমি আবারও বলছি, টু পারসেন্টেও আমি চান্স নিতে রাজি।”

বেশ কিছুক্ষণ ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। তারপর শোনা গেল একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। ডক্টর ইমহোটেপ বললেন, “আন্ডারস্টুড, বোধি। নিজের খেয়াল রেখো। পরে কথা হবে আবার।”

এবারে ডক্টর নাগ একটু চুপ করে রইলেন, তারপর তিনি বললেন, “তুমিও খেয়াল রেখো নিজের। পরে কথা হবে ঠিক।”

“অ্যান্ড বোধি, ডোন্ট লুজ হোপ। অ্যাট লিস্ট নট ইয়েট।” ডক্টর ইমহোটেপ বললেন ওদিকে।

শুনে হাসলেন ডক্টর নাগ, “অ্যান্ড ইট ক্যান ড্রাইভ আ ম্যান ইনসেন।” বলে কেটে দিলেন ফোনটা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন ডক্টর নাগ, সূর্য অস্ত যাব-যাব করছে, দিন ছোটো হয়ে এসেছে অনেকটাই। ড্রাইভার ছেলেটি হঠাৎ বলে উঠল সামনে থেকে, “স্যার, কিছু মনে করবেন না, এমনিই জিজ্ঞেস করছি আর কী! আপনার কি অসুখ হয়েছে কোনো? মানে জটিল কিছু?”

ডক্টর নাগ প্রথমে ভাবলেন এমনিই কিছু একটা বলে কাটিয়ে দেবেন, তারপর কী মনে হতে তিনি বললেন, “শরীরে কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে হে! আমাকে তুমি অনায়াসে কর্কট রাশির জাতক বলতে পারো এখন।” বলে নিজেই হাসা শুরু করলেন। একেবারেই অখাদ্য রসিকতা ছিল ওটা। ডক্টর নাগের মনে হল তিনি যেন নিজেই নিজের ওপর হাসছেন। ছেলেটি তার সহজ সরল গলায় বলল, “বুঝতে পারছি, স্যার। কিন্তু কী জানেন তো, আশা ছাড়তে নেই। ওই যে বলে না, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। সেজন্যই বলছি, স্যার, আশা ছাড়বেন না।”

“কিন্তু আশা দিয়ে তো প্রাণ বাঁচে না, বাবা! শুধু আশাই যদি ওষুধের কাজ করত তাহলে তো হয়েই যেত।” ডক্টর নাগ উত্তর দিলেন। নিজের কথা শুনে নিজেই অবাক হচ্ছেন তিনি, হঠাৎ এতটা নিরাশা কেন ভর করেছে তাঁর ওপর? ওদিক থেকে ছেলেটি বলছে, “ঠিক কথা, স্যার; কিন্তু আশা থাকলে ওষুধ একটু ভালো কাজ করে। আর বলছিলেন না যে আপনার কর্কট রোগ হয়েছে? আমার দিদাও ক্যানসারের পেশেন্ট ছিল। দিদার ক্যানসার হয়েছিল পেটে, বুঝলেন? এখন আমার মা আর মামারা মিলে দিদাকে বুঝিয়েছিল যে দিদার ক্যানসার হয়নি, দিদার পেটের নাড়িভুঁড়ি সব শুকিয়ে গেছে। তাই ডাক্তার দিদাকে এতকিছু ওষুধ আর পথ্য দিচ্ছে। দিদা আজও জানে না যে ওর ক্যানসার হয়েছিল।”

ডক্টর নাগ বেশ আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, “আজও জানেন না উনি?” ছেলেটি হেসে বলল, “বুড়ি এখনও দিব্যি গ্রামের বাড়িতে ছাগল চরিয়ে বেড়াচ্ছে। আর কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তাহলে দিব্যি বলে দেয় যে, হ্যাঁ, ক্যানসারকে হারিয়ে সে মহারানির মতো বেঁচে আছে। এটা অবশ্য আমার মায়ের কীর্তি; মা দিদাকে এটাও বুঝিয়েছিল যে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তাহলে দিদা যেন বলে তার ক্যানসার হয়েছিল, লোকজন একটু সম্ভ্রমের চোখে তাকায়! বুঝলেন কিনা?”

দিব্যি বুঝেছেন ডক্টর নাগ। অসুখেরও শ্রেণিবিভাগ হয় এটা তো পরিষ্কার। ছেলেটি বলে চলেছে ওদিকে, “সেজন্য বলছি, স্যার, যা-ই হোক না কেন, আশা ছাড়বেন না। আর দেখুন না, যদি নিজের মনকে একটু ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখা যায়? মনকে একবার বলেই দেখুন যে আপনার আসলে অন্য কিছু একটা হয়েছে! দেখবেন ট্রাই করে?”

ছেলেটিকে দেখে বড্ড সহজ-সরল মনে হল, কথাগুলোর হয়তো সারবত্তা নেই সেভাবে, কিন্তু ডক্টর নাগের খুব ভালো লাগল। শরীর আর মনের মধ্যে একটা যোগসূত্র তো রয়েছে এটা তো সত্যি। ডক্টর নাগ ভাবলেন আজ গভীরে ডুব দিয়ে দেখবেন একবার, যদি কিছু করা যায়। এর মধ্যে গাড়ি ঢুকে গেছে তার বাড়ির এলাকাতে। ওই তো কালীমন্দিরটা দেখা যাচ্ছে। এর পরেই আসবে একটা বাগানের মতো জায়গা। অনেক বড়ো-বড়ো গাছে ওতে। আগে একেবারেই দেখাশোনা করা হত না, এখন একটু করা হয় ঠিকই কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। আগাছা আগের মতোই গজায়, ঠিক যেন ক্যানসারেরই মতো! মাথা নাড়লেন ডক্টর নাগ— নাহ্, সত্যিই মনকে একটু বোঝাতে হবে। বাড়ির ফটকের সামনে নামলেন তিনি। ড্রাইভার ছেলেটিকে ভাড়া দেওয়ার সময় তিনি তাকালেন ওর দিকে, এত উজ্জ্বল প্রাণবন্ত চোখ তিনি আগে দেখেননি কখনও। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম বলতে পারো?”

“আলবাত পারি। আমি অমিতাভ। বচ্চন নই, স্যার, গুপ্ত।”

অমিতাভ! সাক্ষাৎ ধ্যানী বুদ্ধ তাঁকে ওপার থেকে এপারে নিয়ে এলেন বুঝি? মনে-মনে হাসলেন ডক্টর নাগ। ছেলেটিকে ভালো লেগেছে খুব। বয়স বেশি নয়, খুব বেশি হলে তিরিশের কাছাকাছি হবে। তিনি বললেন, “তোমার কনট্যাক্ট নম্বরটা দিয়ো তো। দরকারে তোমাকে ডাকব তাহলে। এই ক্যাব বুক করা অনেক ঝামেলা।”

একটা কাগজে খসখস করে নাম্বারটা লিখে অমিতাভ একগাল হেসে বলল, “এই নিন। রেখে দিন। প্রয়োজন হলে ডাকবেন। চলে আসব।” যাওয়ার আগে সে গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে একটা ধ্যানী বুদ্ধমূর্তির লকেট ডক্টর নাগকে দিয়ে বলল, “আপনি হয়তো বিশ্বাস করেন না, কিন্তু আমার মনে হয় এটা পরলে আপনার ভালোই হবে। দেখুন না, স্যার, বিশ্বাস করে, ক্ষতি হবে না এটুকু আমি বলতেই পারি।” বলে একগাল হেসে সে গাড়িটা নিয়ে এগিয়ে চলে গেল। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন গাড়িটির চলে যাওয়ার দিকে। কেমন যেন একটা অদ্ভুত ভালোলাগা ঘিরে ধরল ডক্টর নাগকে। কে ছিল ও? এত উজ্জ্বল চোখ কোনো সাধারণ মানুষের হয় না। লকেটটা গলায় পরে তিনি নিজেকে বললেন, “বেশ ডক্টর, দেখা যাক বিশ্বাসের জোর কতটা।”

গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলেন ডক্টর নাগ। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই মহেশ ধেয়ে এল তার দিকে, “বলছি যে ডাক্তার কী বললেন, কাকাবাবু?”

ডক্টর নাগ একপলক তাকিয়ে রইলেন তার দিকে, তারপর বললেন, “বলেছে বিষয়বস্তু জটিল। সরলীকরণ করতে একটু সময় লাগবে। বুঝলি?”

মহেশ হাঁ করে তাকিয়ে রইল একটু, তারপর সে মাথা চুলকে বলল, “ইয়ে মানে বুঝলাম কি না জানিনে! কিন্তু ওই একটু-একটু বুঝেছি। আচ্ছা, যা-ই হোক, হাত-মুখ ধুয়ে নিন। আপনার ঘোলের শরবতটা নিয়ে আসি, নাকি?”

ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ঘরের টেবিলে রাখতে রাখতে ডক্টর নাগ বললেন, “হ্যাঁ, আন; অসুবিধে নেই।”

রান্নাঘরে যাওয়ার আগে মহেশ চেঁচিয়ে বলল, “আর হ্যাঁ, কাকাবাবু, আর একটা ব্যাপার। একটা কল এসেছিল। একজন আপনার ওই কী বলে… অ্যাপো চেয়েছে, পাঁচদিন পর আসবে। আমি লিখে রেখেছি একটা কাগজে সবকিছু।”

মহেশের এই ইংরেজি শব্দকে শেষ না করে বলার অভ্যেসটা অনেক কষ্ট করে ছাড়িয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু মাঝে-মাঝে একটা-দুটো এখনও বেরিয়ে পড়ে। মুচকি হাসলেন ডক্টর নাগ। টেবিলে রাখা কাগজটা তুলে দেখলেন তিনি। কাগজে নাম লেখা রয়েছে— ‘শবনম সুলতানা। পুরানি দিল্লি।’

দিল্লি শব্দটি দেখেই আবার সেই গতবারের কথা মনে হল ডক্টর নাগের। গতবার রাজধানী থেকে এসেছিলেন ধর্মরাজ সিংহ। আর এবার আসছেন শবনম সুলতানা! দেজাভু? দেখা যাক!

***

ওই ডিজায়ার গাড়িতে বসা অমিতাভ নামের ছেলেটির মোবাইল থেকে একটা নম্বর ডায়াল করা হল, রিং হচ্ছে, কিন্তু এখনও কেউ ধরছে না। এই তো ধরেছে একজন, ওপাশ থেকে শোনা গেল, “বলে ফেলুন, বিগ বি।”

অমিতাভ বল উঠল, “স্যার, জিপিএস প্লেস করা হয়ে গেছে। নজর রাখছি আমি। কোনো এদিক-ওদিক হলে আপনাকে জানাবো।”

“এজন্যই তো তোমাকে অ্যাত্ত ভালো লাগে, বিগ বি! আমার চোখ, কান, নাক সব ভোঁতা হয়ে গেছে, এখন এখানে তুমিই ভরসা। আর দেখা যাক যদি কোনো ভরসার লোক পাওয়া যায়। যা-ই হোক, ভালো করে কাজ করে যাও। উন্নতি হবেই।”

“স্যার, কী যে বলেন! আপনিই তো ট্র্যাক করে আমাকে রিক্রুট করলেন। আর আপনার কাছেই একটু-একটু করে কাজ শেখা। আপনি থাকলে হবেই।”

“হয়েছে বাবা, আর তেল দিতে হবে না! তুমি নজর রাখো আগে। তাহলেই হবে।”

“রজার দ্যাট, স্যার।” বলে ফোনটা কেটে দিল অমিতাভ। এখন ওকে কাছাকাছি কোথাও একটা পার্কিং স্পট খুঁজে বার করে গাড়িটা রাখতে হবে। তারপর মাঝে-মাঝেই কাছাকাছি এসে নজর রাখতে হবে। হঠাৎ অ্যাপে একটা পিং করে শব্দ হল, কে একজন ক্যাব বুক করার চেষ্টা করছে। ধ্যুৎ! প্রোফাইলটাই ডিলিট করে দেবে ও। উঠতি র এজেন্টকে এখন লোকজন ক্যাব ড্রাইভার বলে ভুল করলে একটু হলেও বিরক্তি তো আসবেই। আবার যেখানে সাক্ষাৎ বর্মাস্যারের কাজে নেমেছে ও। একটা সিগারেট ধরাল অমিতাভ। লম্বা সময়ের কাজ আছে। মাঝে-মাঝে একটু দরকার হবে।

***

নভেম্বর ১৫ রাত ন’টা চল্লিশ

শহরের এক ব্যস্ত মোড়ে পান-সিগারেটের একটা স্টল, সেটার ঝাঁপ ফেলছেন এক সত্তরোর্ধ্ব মানুষ। আবছা নীল রঙের পাঞ্জাবি, তার ওপর একটা হালকা হাফহাতা, বুকখোলা পুরোনো জহর কোট, ময়লা পাজামা, কাঁধে একটা ঝোলা, হাঁটার সময় এক পা টেনে হাঁটা অভ্যাস তাঁর। এমনিতে দোকান খোলা থাকে প্রায় রাত সাড়ে দশটা থেকে এগারোটা অবধি। কিন্তু আজ একটু তাড়াতাড়িই বন্ধ করে দিচ্ছেন তিনি। আজ তাঁকে ধরতে হবে ট্রেন। অন্যদিন তিনি এই স্টল থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা ঘুপচি গলির ঘরে চলে যান, আজ যাবেন না। আজ তিনি ফেরত যাবেন দেশের বাড়িতে, সেই গেদে লাইনের একটা স্টেশনে নেমে তাকে যেতে হবে। সেখানে এখনও আব্বাজানের তৈরি করা ভিটে রয়েছে। এখনও তাঁর জ্ঞাতি বন্ধুরা রয়েছে সেখানে। এই শহরে নিজের জীবন কাটিয়ে দিলেও এখনও সময় পেলেই সেখানে চলে যান তিনি। দোকানের ঝাঁপ ফেলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সামনে ছুটে এল একটা বছর পনেরোর ছেলে, এসে সে একতাড়া কাগজ ধরিয়ে দিল তাঁকে। ভদ্রলোক কাগজটা হাতে নিয়ে বললেন, “আজকের সব খবর এর মধ্যে আছে?”

ছেলেটি মাথা নাড়ল। ভদ্রলোক পকেট থেকে দুটো একশো টাকার নোট বের করে দিয়ে বললেন, “তোর আর তোর ভাইয়ের স্কুলের খাতা-পেনসিলের জন্য। ফাঁকি মেরেছিস কি মরেছিস! যাহ্, পালা।”

ছেলেটি একগাল হেসে দৌড়ে চলে গেল অন্য কোনো এক গলির ভেতর। ভদ্রলোক হাসলেন। এই ছোটো-ছোটো ছেলেগুলোকে নিয়েই তাঁর দিন চলে যায়। গোটা শহরে এরকম বেশ কিছু অনাথ বাচ্চা আছে, যাদের দায়িত্ব তিনি নিয়ে থাকেন। আর সেই বাচ্চারাও ফরিদচাচা বলতে অজ্ঞান। ফরিদচাচা ওরফে ফরিদউদ্দিন আহমেদ এই ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়েগুলোর মুখের দিকে তাকিয়েই বেঁচে আছেন একরকম। ওদের হাসিই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এবারে তিনি তাকালেন ওই কাগজগুলোর দিকে। রাস্তার আলোয় চোখ বুলিয়ে নিলেন সেদিকে, গোটা শহরের হকার এবং ভিখারিদের থেকে পাওয়া কিছু লুকোনো খবর আছে এখানে। এই শহরের মাথারা কখন কোথায় যাচ্ছেন বা খাচ্ছেন বা হাঁচছেন ইত্যাদি সবকিছুর ফিরিস্তি দেওয়া আছে এখানে। পান- বিড়ির দোকানের আড়ালে এটাই হল ফরিদের আসল কাজ। আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি যদি কিছু বিক্রি হয় সেটা হল খবর— আর খবর রাখা এবং উপযুক্ত মুল্যের বিনিময়ে সেই খবর জায়গামতো পৌঁছে দেওয়া ফরিদ খুব ভালোভাবেই করেন। নাহলে ওই মন্ত্রীমশাইয়ের বন্ধ ফ্ল্যাটে তাড়া-তাড়া নোট পড়ে ছিল সেটা ওই দিল্লির বাবুরা জানল কী করে? মুচকি হাসলেন ফরিদ, বেশ কিছু বিস্ফোরক খবর আছে এখানে। জায়গামতো পৌঁছলে মৌচাকে ঢিল পড়বে। তবে তার আগে স্টেশনে যেতে হবে। বেশি সময় নেই আর। ট্রেন মিস হয়ে যাবে নাহলে। হেঁটে গেলে স্টেশনে পৌঁছতে প্রায় পনেরো মিনিট লাগবে। জোরে পা চালালেন ফরিদ। ব্যস্ত রাজপথ আর মানুষের স্রোত পেরিয়ে যখন তিনি স্টেশনে পৌঁছলেন তখন সময় হয়ে এসেছে দশটা। চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে লোকাল ট্রেনটি আসবে এরকমই ঠিক আছে আপাতত। মানুষের স্রোত ঠেলে তিনি এগোতে লাগলেন প্ল্যাটফর্মের শেষের দিকে। একটু পিছিয়ে গিয়ে ট্রেনে ওঠা তার অভ্যাস। ট্রেন আসছে ওদিকে, ব্যাগপত্র সামলে রেখে তিনি তৈরি হলেন ট্রেনে ওঠার জন্য। অফিসফেরতা নিত্যযাত্রীদের ভিড় হবে এখানে। এঁদেরকে দেখলে মাঝে-মাঝে ফরিদের মনে হয়, এই শহরে বাস করা আর এক যুদ্ধক্ষেত্রে বাস করার মধ্যে বোধহয় খুব একটা ফারাক নেই। স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই জনস্রোত ফরিদকে ঠেলে নিয়ে গেল ট্রেনের মধ্যে। ট্রেনে উঠতে-উঠতে তিনি হঠাৎ টের পেলেন একটা চিনচিনে ব্যথা। কী হল ব্যাপারটা? দেখলেন ডানহাতে একটা সূচ ফুটে রয়েছে! আজব তো, কে এমন পাগলের মতো কাজ করে? তিনি এদিক-ওদিকে তাকানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু জনস্রোতের মধ্যে কিছু বুঝতে পারলেন না কে এই বদমায়েশিটা করল। দেখতে পেলে আচ্ছাসে ধুয়ে দিতেন ওই বুরবককে! কোনোরকমে দরজার সামনের রডটা ধরে দাঁড়িয়ে তিনি সূচটা খুলে ফেলে দিলেন, কপাল খারাপ, সিট পাননি আজ। যদিও দরজার সামনের রডটা ধরে হাওয়া খেতে-খেতে আজ যাওয়া যেতেই পারে। গরম নেই আজ খুব একটা, কিন্তু ঘাম হচ্ছে খুব ফরিদের। এমনিতে তিনি যে খুব বেশি ঘামেন তা নয়, কিন্তু কে জানে কেন হচ্ছে এরকম আজ। সে যা-ই হোক, বেশি ভেবে লাভ নেই, এইভাবে বেশ কয়েকটা স্টেশন পেরিয়ে গেলে তারপর তিনি একটা না একটা সিট ঠিক খুঁজে নেবেন।

এমন সময় পাঞ্জাবির পকেটে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল, চারপাশের কোলাহলের মধ্যেও ফরিদ টের পেলেন আধুনিক দূরভাষ যন্ত্রের কম্পন। তিনি ফোনটা ধরতেই একটা চেনা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন, যেটা শেষবার শুনেছিলেন বোধহয় সাত-আট মাস আগে। আর কণ্ঠস্বরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভুরু একটু কুঁচকে গেল, এই কণ্ঠস্বরের অধিকারীর সঙ্গে খবরের আদান-প্রদান করার সময়ই ফরিদ একটা চাপা অস্বস্তি বোধ করেন। একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “বলুন স্যার, কী করতে পারি আপনার জন্য।”

ওপাশ থেকে গলার আওয়াজ ভেসে এল, “আপনি ঠিক আছেন, ফরিদ?”

একটু অবাক হলেন ফরিদ, তিনি বললেন, “একদম ঠিক আছি ওপরওয়ালার মেহেরবানিতে! আপনি হঠাৎ আমার থেকে আমার খবর নিচ্ছেন? আপনি তো আমার থেকে অন্যদের খবর নেন। বিশেষ করে সেই ডাক্তারের খবর।”

“আপনার খবর নিচ্ছি, এর কারণ আছে। সেটা কী আপনাকে আমি পরেই বলব নাহয়। তার আগে বলুন ওই ডাক্তারের খবর কী?”

ট্রেন ছাড়েনি এখনও, ছাড়বে এখনই সেটা বোঝা যাচ্ছে। আরও বেশ কিছু লোক উঠে এসেছে ইতোমধ্যেই। রড ধরে শক্ত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফরিদ, সেই অবস্থাতেই তিনি বললেন, “খবর বলতে সে আজ ঘরে ছিল বেশ কিছুক্ষণ, সেখান থেকে হাসপাতালে গিয়েছিল। হাসপাতাল থেকে একটা ক্যাব করে বাড়ি আসে। আর কাল ওর কাছে একজন পেশেন্ট আসবে দিল্লি থেকে। নাম হল শবনম সুলতানা।”

ওপারের গলাটি যেন চমকে উঠল হঠাৎ, “শবনম সুলতানা? এই নামটাই দেখেছে আপনার চর? আপনি ঠিক জানেন?

“আল্লাহর কসম আমার ছেলেরা কখনও ভুল কিছু দেখবে না। সত্যি বলছি… “ বলতে-বলতে টের পেলেন ফরিদ যে তাঁর জিভ জড়িয়ে আসছে আর চোখের সামনের দৃশ্য ঝাপসা হয়ে আসছে। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন তিনি। কিন্তু পারলেন না। ওদিকের লোকটা কিছু একটা বলে চলেছে, কিন্তু ফরিদ শুনতে পারছেন না সে-সব কথা। তার মনে হচ্ছে কলজেটা যেন ফেটে বুক থেকে বেরিয়ে আসবে। শরীর ছেড়ে দেওয়ার আগে তিনি টের পেলেন তাঁকে শক্ত করে ধরল একটা লম্বা লোক। একটা পাতলা কালো হুডির মতো কিছু একটা পরে রয়েছে সে, মুখে তার একটা কালো রঙের পুরু মুখোশ। ফরিদ টের পেলেন তার কাঁধ থেকে ব্যাগ আর হাত থেকে মোবাইলটা আস্তে করে নিয়ে নিচ্ছে সেই লোক। চেতনা আস্তে-আস্তে লুপ্ত হচ্ছে ফরিদের, মনে হচ্ছে কলজেটা সত্যিই ফেটে যাবে এবার। জ্ঞান হারানোর আগে তিনি একটা অদ্ভুত গন্ধ পেলেন, যেটা রুদ্রর কাছেও শেষবার পেয়েছিলেন— চন্দনের গন্ধ!

একটা গেল-গেল রব উঠেছে তখন ট্রেনের ওই কামরায়। চলন্ত ট্রেনে সবাই ব্যস্ত হয়ে ঘিরে ধরেছে ফরিদকে, কেউ বুকে হাতের তালু দিয়ে প্রেস করছে, কেউ জলের ছিটে দিচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। কেউ খেয়ালও করল না এক দীর্ঘদেহী মূর্তি তখন চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে নেমে যাচ্ছে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে। তার হাতে তখন ধরা ফরিদউদ্দিন আহমেদের ব্যাগ এবং মোবাইল। মোবাইল কানে দিতেই সেই মূর্তি শুনতে পেল ওপাশ থেকে একজন চিৎকার করে বলে চলেছে, “ফরিদ? তুমি ঠিক আছ? ফরিদ? শুনতে পাচ্ছ তুমি?”

সেই মূর্তি বরফশীতল কণ্ঠে বলে উঠল, “মিস্টার আহমেদ আর শুনতে পাবেন না, স্যার। তিনি পরলোক গমন করেছেন।”

ওপাশের কণ্ঠস্বর তখন যেন থেমে গেল হঠাৎ। মুহূর্তের নীরবতার পর ওপাশ থেকে আবার শোনা গেল, “অর্জুন? অর্জুন জ্যাকস? তাহলে তুমি বেঁচে আছ এখনও?”

“আছি, স্যার। এখনও আছি।”

“ও, ওই বাজির কারখানায় পাওয়া পোড়া বডিটা তাহলে অন্য কারওর ছিল। আমার আগে বোঝা উচিত ছিল। এত সহজে তুমি মরবে এটা ভাবাটাই উচিত হয়নি।”

“সে তো ঠিকই। আপনিই শিখিয়েছিলেন মিসডিরেকশনের ব্যাপারে। আর আপনার খোঁচরেরা একটু ভুল তথ্যই দিয়েছিল আপনাকে। বাজির কারখানায় আমাকে ঢুকতে দেখেছে ঠিকই, কিন্তু বেরোতে আর দেখেনি। উলটে সেই কারখানার মালিক, যার থেকে আপনি ইললিগাল আর্মস আর এক্সপ্লোসিভের খবর পেতেন সে মরে গেল।”

ওপাশে কোনো কথা নেই এখন, যেন সেই লোক অপেক্ষা করছে অর্জুনের পরের কথার। অর্জুন একটু থেমে আবার বলা শুরু করল, “যা-ই হোক, আমি সহজভাবে আপনাকে কয়েকটা কথা বলি, যদি আপনি আপনার নোন অ্যাসোসিয়েটদের মরতে দেখতে না চান তাহলে যেমন বলব তেমন-তেমন করতে হবে আপনাকে। রাজি আছেন?”

ওপাশ থেকে তখন ওই কণ্ঠস্বরে একটা কৌতুকের ছোঁওয়া পাওয়া গেল, “দে আর নট মাই অ্যাসোসিয়েটস, দে আর মাই অ্যাসেটস, যাদের যখন খুশি রিপ্লেস করা যায়। আমার সঙ্গে কাজ করেছ তুমি, এটা তোমার বোঝা উচিত ছিল, অর্জুন। সো, নো ডিল, মাই বয়। যা করার করে নাও।”

বলার সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা কেটে গেল। অর্জুন দাঁড়িয়ে রইল সেই প্ল্যাটফর্মে। লোকটা মিথ্যে কথা বলছে না সত্যি কথা বলছে? বুঝতে পারল না ও। যা-ই হোক না কেন, প্ল্যান যেরকম আছে সেভাবেই এগোতে হবে। ওই লোকটার সঙ্গে যারা লম্বা সময় ধরে কাজ করেছে বা যারা ওকে খবর সরবরাহ করেছে তারা সবাই এক-এক করে মৃত্যুবরণ করেছে। তারপরও লোকটার কোনো হেলদোল নেই! হিসেবে ভুল হচ্ছে না তো? মাথার ভেতর অর্জুন শুনতে পেল, “চিন্তা কোরো না। সে যতই ধুরন্ধর হোক না কেন, সে তার পরিচিত এবং সহকর্মীদের ব্যাপারে যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিল। সে দেখাত না সেটা আলাদা ব্যাপার। যেভাবে এগোনো হচ্ছে সেভাবেই এগোও। শীঘ্রই মুক্তি পাবে তুমি।”

অর্জুন আর দাঁড়াল না। ও এগিয়ে গেল। এমনিতেই এই স্টেশনে প্রচুর লোক থাকে। বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়ালে ও মৃত মানুষের গন্ধে হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাবে। এই মুখোশও কোনো কাজে আসবে না তখন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *