৬. নভেম্বর ১৮ রাত আটটা

৬. নভেম্বর ১৮ রাত আটটা

মহানগরের অলিতে-গলিতে লুকিয়ে থাকে অনেক গল্প, কেউ যদি কান পেতে শোনে তাহলে সেই গল্প শুনতে পাবে সে বারবার। এই গল্প শোনা অভ্যেস মাইকেলের। যদিও সে একা শোনে না, একটা জয়েন্ট ধরিয়ে নেয়, আর তারপর সে গল্প শোনে। কিন্তু তার গল্প শোনার মতো কেউ নেই, একজন ছাড়া শুধু। সেই লোকটার কাছ থেকে মাঝে-মাঝে একটা খাম আসে, সেই খামের ভেতরে সে চিরকুটে গল্প লিখে পাঠিয়ে দেয়। অনেক গল্প থাকে — শহরে নতুন ড্রাগ কিছু এল কি না, বা শহরের বাইরে কোথাও কোনো বোমা-বারুদ মজুত হল কি না— এই ধরনের কত গল্প ওর কাছে থাকে! আজও গল্প শুনছে মাইকেল, একটা ঘিঞ্জি পানশালায় দেশি মদ নিয়ে বসে আছে ও, জ্বলছে একটা জয়েন্ট, আর ও শুনছে সবার গল্প। আর মাইকেলের কান সব শুনতে পায়। দিব্যি দিশি মদে চুমুক দিয়ে ও গল্প শুনছিল, এমন সময় ওর সামনে এসে বসলেন এক মাঝারি চেহারার মাঝবয়েসি লোক। উশকো-খুশকো চুল, কয়েক দিনের না-কাটা দাড়ি, আর চোখের কোণে জমা কালি। দেখে মনে হয় ভদ্রলোক ঘুমোননি অনেক দিন, খাননি ভালো করে। মাইকেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন তিনি, “হেই বেরাদর, এক পাত্তর খাওয়াবে?”

মাইকেল একটু খেঁকিয়ে উঠল, “কেন বাল? আমার কাছে কেন?”

“আরে, শহরের নতুন বেতাজ বাদশার কাছে আসব না তো কার কাছে আসব?” বলে হাসলেন ভদ্রলোক। মাইকেল একটু সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল লোকটির দিকে, “কীসব আলবাল বকছ বলো তো? দাবিটা কী?”

“আরে দাবি তো একটাই। একটু মাল খাব। খাওয়াবে না, মাইকেল ওরফে মধুকর দাঁ? কাশিমকে তো দিব্যি খাওয়াতে? গত বছরও খাইয়েছ। ঠিক সেইদিন। মনে নেই?” ভদ্রলোক টেবিলে মাথা রেখে মাইকেলের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন।

মাইকেল চমকে উঠল একটু, ওর আসল নাম এই মার্কেটে খুব কম লোকই জানে, আর কাশিমের সঙ্গে ওর দহরম-মহরম ছিল সেটাও খুব কম লোকই জানে। গত বছর এলিয়ট রোডের ব্লাস্টে মারা যাওয়ার আগে কাশিম মাইকেলের সঙ্গেই দেখা করেছিল এটা এই লোক কীভাবে জানল? মাইকেল একটু সোজা হয়ে বসল এবার, “কে তুমি?”

“আমি কে এটা প্রশ্ন নয়। তুমি আমাকে যেটা জিজ্ঞেস করবে সেটা হল, ‘মাল খাবেন, স্যার?” ভদ্রলোক মিটিমিটি হেসে বললেন।

লোকটির কথার মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যেটা মাইকেলের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা অনুভূতি বইয়ে দিল। ও গলা খাঁকরে বলল, “মাল খাবেন, স্যার?”

“না, এখন না। এখন একটু তাড়া আছে। ডিউটির সময় আমি মাল খাই না, বুঝলে? বরং আজকের মালটা আমি তোমাকে খাওয়াচ্ছি। কেন বলো তো?” মাঝবয়সী লোকটির মুখের হাসিটা চওড়া হল।

মাইকেল এবার অবাক হচ্ছে একটু-একটু করে, ওর নেশা কেটে যাচ্ছে। ও জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

ভদ্রলোকের ঠোঁটের কোণে হাসি রয়েই গেছে, কিন্তু তাঁর গলা শুনে মনে হচ্ছে না সে হাসছে। “কারণ, এই শহরের জিম্মেদারি এখন তোমার। কাশিম গত বছর ফুটে গেছে। ফরিদ ওপরওয়ালার কাছে চলে গেল গতকালই। এখন খবরের দায়িত্ব সব তোমার। বুঝলে তো? চিরকুটের সংখ্যা বাড়বে এবার।” এতক্ষণে বুঝতে পারল মাইকেল ওর সামনে কে বসে রয়েছে, এর কাছেই ও গল্পগুলো পাঠায়। সে সোজা হয়ে বসল, “আপনি? আগে বলবেন তো?”

“আরে আবার আপনি-আজ্ঞে কেন হে, চিরকুট-মাইকেল? ছাড়ো ওসব। তুমি মাল খাও। আর মাল খেতে-খেতে তোমার কাজটাও জেনে নাও এবার। একজনের দিকে নজর রাখতে হবে। আর তার প্রতিটি স্টেপের খবর লাগবে।”

“লম্বা, মুখে মুখোশ। তা-ই তো? স্টেশনের কাছে পুরোনো একটা গেস্ট হাউসে আছে জানি।” বলে উঠল মাইকেল। লোকটি ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে মাইকেল একটু কাষ্ঠহাসি হেসে বলল, “ফরিদের ঝোলা নিয়ে গতকাল ট্রেন থেকে নামতে দেখা গেছে। আমার ছানারা সব দেখেছে, কিন্তু কাছে যায়নি। আর আপনার খাম আসেনি আজ তাই চিরকুটও পাঠানো হয়নি। আমি ওসব মোবাইল-টোবাইল রাখি না জানেনই তো। গরমেন্ট নজর রাখে ওর মধ্যে দিয়ে।”

ভদ্রলোক চুপ করে রইলেন প্রথমে, তারপর তিনি বলে উঠলেন, “নাহ্, তোমাকে এই শহরের দায়িত্ব দেওয়াটা ভুল হয়নি মোটেও। আমি স্যাঙ্গুইন একদম।” মাইকেলের সামনে কড়কড়ে দশটি পাঁচশো টাকার নোট আর একটা মান্ধাতার আমলের মোবাইল ফোন রেখে তিনি উঠে গেলেন। বেরনোর আগে মাইকেলের কানে-কানে তিনি ফিসফিস করে বলল, “এই মোবাইলটা শুধু আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য ব্যাবহার করবে। ঠিক আছে? আর হ্যাঁ, এটা মাথায় রেখো, বাদশাহের তত কিন্তু যখন-তখন বদলায়। এটা ধরে রাখার দায়িত্ব তোমার।”

বলে বেরিয়ে গেলেন সেখান থেকে। অপলক দৃষ্টিতে লোকটার চলে যাওয়া দেখল মাইকেল ওরফে মধুকর দাঁ। এই শহরের যত বেআইনি মদের ঠেক আছে সেখানে দেশি মদ সরবরাহ করার নেটওয়ার্ক যার অধীনে, সেই মাইকেল। আজ এই শহরের দায়িত্ব পেয়েছে! এর মানে এই শহরের আনাচে- কানাচে হয়ে চলা সব খবর এখন ওর মাধ্যমেই যেখানে যাওয়ার সেখানে যাবে! টাকা আসবে যেমন, রিস্কও বাড়বে তেমনই। কাশিমের কথা মনে আছে মাইকেলের। গ্লাসে আর একটু মদ ঢেলে ও দিল একটা লম্বা চুমুক। ঘুম উড়বে মনে হচ্ছে এখন থেকে। পানশালায় ওদিকে উচ্চকিতে গান শুরু হচ্ছে— পেয়ার মে এইসে পাগলা গ্যয়ে হ্যায়, পান্ডেজি নে কাণ্ড কর দিয়া। মাইকেল গানের তালে মাথা দোলাতে দোলাতে ভাবছে, ‘পান্ডেজির কথা তো জানা নেই। কিন্তু বর্মাজি কাণ্ড করবেনই।’

***

নভেম্বর ১৮

রাত দশটা পঁয়তাল্লিশ

শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা নিরিবিলি জায়গায় রয়েছে একটা গেস্ট হাউস। সেখানকার ৩০৬ নম্বর ঘরে বসে রয়েছে শবনম। থরথর করে কাঁপছে ও, মাথা আর বুক যেন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাবে ওর। এখনও একটা সিরামের ভায়াল আছে, কিন্তু সেটা শবনম ব্যাবহার করতে চাইছে না, কাজ শেষ করে ফেরত যাওয়ার আগে এটা লাগবে। আগের ভায়ালদুটো শেষ হয়ে গেছে। ওই সিরাম এখন ওকে মেরেকেটে সাত থেকে দশ দিন স্থির রাখতে পারে। শেষ ভায়ালের সিরামটা ও নিয়েছিল মোটামুটি ছ’দিন আগে। কিন্তু আজকেই শুরু হয়েছে এই অবস্থা। তুমুল রাগ হচ্ছে, মনে হচ্ছে এই দুনিয়াতে যত লোক আছে এক-এক করে সবাইকে যদি মেরে ফেলতে পারত খুব ভালো হত। চেষ্টা করেছে ও কতগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিজেকে শান্ত রাখার। কিন্তু ওষুধগুলো খেয়েও ওর ঘুম আসেনি। উপায় না দেখে ও বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। গেস্ট হাউস থেকে হাঁটতে-হাঁটতে ও চলে গেল দূরে একটা মাঠের মধ্যে। অন্ধকার রাত, আকাশে টিমটিম করে জ্বলছে কিছু তারা। সেদিকে তাকিয়ে ওর মনে হল যেন একটু শান্তি এসেছে এতক্ষণে। মাঠের ধারে বসে ও তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে, শেষ কবে ও আকাশের দিকে তাকিয়েছে? মনে পড়ে না। আর দিল্লি শহরে আকাশ দেখা যায় না, দেখা যায় শুধু ধোঁয়া। আকাশের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য শবনম ভাবল, মানুষ মরে গেলে যদি তারা হয়ে যায়, তাহলে কি ওর আম্মিজানও এখন আকাশেই আছে? আম্মিজান দেখছে ওর কলিজার টুকরা শবনমকে এখন? আম্মিজান যদি সব দেখে তাহলে খুব কষ্ট পেয়েছে বোধহয়? আম্মিজান কখনও মানুষকে আঘাত করা কিংবা কষ্ট দেওয়া পছন্দ করতেন না। কিন্তু নিজে চুপচাপ সব সহ্য করতেন। নাহলে যেই লোকটাকে হিসেব মতো শবনমের বাবা বলে ডাকার কথা ছিল সেই লোকটার হাতে এত মার খেয়েও কেন একটা কিছু বলেনি কখনও? শবনমের যখন পনেরো বছর বয়স তখন ওর আম্মিজানকে একদিন মার খেতে দেখে সামলাতে পারেনি আর। কষিয়ে দিয়েছিল একটা আপারকাট ওই লোকটার চোয়ালে। আর তখন সদ্য সদ্য কিকবক্সিং-এর ট্রেনিং নেওয়া শুরু করেছে ও। কিছুটা লুকিয়েই শবনম এই কিকবক্সিং-এর ক্লাসে নাম লিখিয়েছিল। ক্লাসের বাইরে শবনমের প্রথম পাঞ্চ যে ওর নিজের জন্মদাতার ওপরেই আছড়ে পড়বে এটা বোধ হয় শবনম স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। সেদিন ওর বাবার হাতে মার খেয়ে প্রায় অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থা হয় শবনমের। জ্ঞান যখন হয়েছিল তখন ও নিজেকে হাসপাতালে পেয়েছিল আর পাশে ছিল আম্মিজান। হাসপাতাল থেকে ছুটি হওয়ার পর ওরা আর ওই বাড়িতে ফেরত যায়নি। শবনমকে নিয়ে ওর আম্মিজান ফেরত চলে গিয়েছিলেন পুরানি দিল্লির ওর ওই বাড়িতে। সেই থেকে আম্মিজানের সঙ্গেই থেকেছে ও। আম্মিজান বলতেন বারবার, কারুর ওপর অকারণে হাত তুলতে না, নইলে খোদা রাগ করবে। প্রতিটি খুনের পর শবনম শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে কাঁদত আর বলত, “আম্মি, আমি ইচ্ছে করে কিছু করছি না। যা করছি সেটা আমি করতে বাধ্য, নাহলে আমি পাগল হয়ে যাব আম্মি। তোমার খোদা রাগ করল কি করল না তাতে আমার কিছু যায় আসে না, আম্মি, কিন্তু তুমি রাগ কোরো না! তুমি রাগ কোরো না!”

আজ আকাশের দিকে তাকিয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটার তাকিয়ে সেই কথাগুলোই বলছিল শবনম। চোখ দিয়ে নেমে আসছিল জলের ধারা, আর মনে হচ্ছিল যত রাগ দুঃখ সব যেন একটু একটু করে গলে-গলে পড়ে যাচ্ছে। এজন্যই কি বলে যে কাঁদলে মানুষের হালকা লাগে?

এমন সময় শবনম শুনতে পেল কতগুলো গলার আওয়াজ। কে বা কারা যেন আসছে এদিকে। মুখ ফিরে তাকাল শবনম— হ্যাঁ, আসছে ওদিকে তিনটে মাঝবয়েসি লোক। শবনমের কানে এল কতগুলো জড়ানো কণ্ঠস্বর, “বাঁড়া পার্টি অফিসে আর হেব্বি খাইয়েচে হাসিবুলদা!”

“হ্যাঁ ভাই, সেই খাওয়া হয়েছে, সেই! আসচে ভোটে হাসিবদার জন্য লাশ ফেলে দিলেও অসুবিদে নেই। উন্নয়নের কীসব বলে… স্রোত-ফ্রোত থেমে যাবে বাঁড়া!”

“তার আগে দাঁড়া, একটু নীচের স্রোতকে মুক্ত করি, নইলে কেলো হবে!”

একজন রাস্তা বেয়ে মাঠে নামার উপক্রম করতে না করতেই দেখতে পেল মাঠের ধারে বসে থাকা শবনমকে। দেখে সে এগিয়ে গেল শবনমের দিকে, উবু হয়ে বসে সে শবনমের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চাটল একটু। শবনম টের পেল ওর মাথার ভেতর সেই দমবন্ধ করা রাগটা আবার ফেরত আসছে। লোকটি ওদিকে শবনমকে বলছে, “কে তুমি নন্দিনী? আগে তো দেখিনি!”

শবনম মুচকি হাসল একটু। ওদিকে বাকি দু’জনও চলে এসেছে ততক্ষণে। তারাও এসে শবনমের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, একজন বলছে, “এ ভাই, এ কে বে? ভূত-ফুত নাকি! মাঝরাত্তিরে বসে আচে?”

শবনমের গায়ে হাত দিয়ে তখন সেই উবু হয়ে বসে থাকা লোকটি বলছে, “আরে না, ভূত না, এ জ্যান্ত মাল আছে রে! আমাদের জন্যই বসেছিল মনে হচ্ছে। কি জানু, তা-ই তো?”

শবনম কিছু না বলে চুপচাপ হাসল শুধু। বাকি লোকগুলো তখন আর একটু কাছে এসে বলছে, “তাহলে চলো, একদান লুডোই খেলে নেওয়া যাক?”

ওরা শবনমকে নিয়ে গেল মাঠের পাশে একটা ঝোপের আড়ালে। বেশিক্ষণ না, আধ ঘণ্টার মধ্যে শবনম বেরিয়ে এল সেখান থেকে। ওর ঠোঁটে সামান্য আঁচড়ের দাগ, চুল উশকো-খুশকো, আর পরনের কুর্তিটার বামহাত সামান্য ছেঁড়া। অবসন্নভাবে ও উঠে পড়ল রাস্তায়। মনে মনে ও ভাবছে তখন, ধার কমে যাচ্ছে, আগে হলে হয়তো দশ মিনিটের মধ্যেই হয়ে যেত, কিন্তু এখন প্রায় আধ ঘণ্টা লাগল। লোক তিনটে অবশ্য ভালো লড়াই দিয়েছে। শবনমের আর একটু বোঝা উচিত ছিল। যা-ই হোক, যা হয় ভালোর জন্যই হয়। ওর মাথা এখন একদম ঠান্ডা। ওই লোক তিনটে আর এল না, ওদের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে ওই ঝোপের মধ্যে। শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন নিয়ে ওরা ঘাড় মোচড়ানো অবস্থায় পড়ে রয়েছে সেখানে। বডি কাউন্ট বাড়ল, আবার!

***

নভেম্বর ১৮

রাত এগারোটা পনেরো

স্টেশনের কাছের একটা ঘিঞ্জি গলির ভেতর হোটেলটা। তারই একতলার একটা ঘুপচি ঘরে রয়েছে অর্জুন। ওর বাইকটা পার্ক করা রয়েছে হোটেলেরই সামনে একটা জায়গায়। খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল বাইকটা অর্জুনের, কিন্তু মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই, এখানে যদি কাজ শেষ হয় তাহলে এই বাইকটা চোরবাজারে বেঁচে দিয়ে অন্য একটা বাইক জোগাড় করে নেবে ও। সঙ্গে থাকবে ভুয়ো নম্বর আর লাইসেন্স। কতদিন ওকে এটা করতে হবে? যতদিন না পর্যন্ত ওর ভেতরের অতিথিকে জায়গামতো পৌঁছে দিতে পারছে ও। মাঝে- মাঝে ওরও দুর্বিষহ লাগে রুদ্রর মতো, মনে হয় ভেতরে যেন কেউ একজন অযাচিতভাবে রয়ে গেছে। তার ওপর বুকের মধ্যে বেড়ে চলা ঘা-টা যেন বাড়ছে একটু-একটু করে। খালি গায়ে দাঁড়ালে নিজেকে দেখলে আজকাল নিজেরই ভয় লাগে। আজকাল জ্বালা হয় খুব, অসহ্য সে জ্বালা। কিন্তু অর্জুন কিছু বলে না। ও সহ্য করে। ও শুধু চুপচাপ সেটাই করে যায় যেটা ওকে দিয়ে ওর ভেতরের অতিথি করিয়ে নেয়। এই শরীর ওর নিজের নয় এখন। অবশ্য কোনদিনই বা ওর নিজের ছিল এটা? ও নিজের মালিক নয়, এই বোধটা ওর ভেতর থেকে সেই শুরুর দিন থেকেই শেষ করে দেওয়া হয়েছে। সেই অনাথ আশ্রমের ফাদারের কাছে শাসন দিয়ে শুরু হয়েছিল, তারপর আর্মির কড়া অনুশাসনে কেটেছে একটা লম্বা সময়; আর এখন সে তার মনের ভেতরে যে রয়েছে, তার শাসনে চলছে। চোখ বন্ধ করলে দেখতে নিজেকে সে ওই ধাতব ঘরের মধ্যে দেখতে পায়। আগের মতো শেকল দিয়ে বাঁধা নয় ও আর, কিন্তু ঘরে আর একলা থাকে না ও। ওর পাশে বসে থাকে এক শীর্ণকায় মূর্তি, কাঁধ অবধি লম্বা চুলে একটু-একটু জট পড়েছে, আর সারা শরীর ক্ষতচিহ্নে ভরা। সে অর্জুনকে বলে কখন কোথায় কী করতে হবে। আর অর্জুন সেটাই করে চলেছে। বিছানায় শুয়ে ছিল একটু, মোবাইলে একটা মেসেজ এসেছে কিছুক্ষণ আগেই, শবনম শহরে চলে এসেছে। কাল ও যাবে ডক্টর নাগের কাছে, আর অর্জুনের ধারণা যদি ঠিক হয় তাহলে ওই লোকটাকে ডক্টর নাগের কাছে যেতেই হবে। কারণ এক-এক করে যাদের সঙ্গে ও কাজ করেছে বা যাদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছে তাদের প্রায় সবাইকে নিকেশ করা হয়েছে গত ছয় মাসের মধ্যে। কিন্তু না, ওই লোককে বিশ্বাস নেই। আস্তিনে তাস আর সাপ দুটোই লুকিয়ে রাখতে পারে ও।

দরজায় একটা টোকার শব্দ শুনতে পেল অর্জুন, এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতে দেখল বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে হোটেলের ছোকরা কর্মচারী। তার হাতে ধরা একটা বড়ো হুইস্কির বোতল আর একটা অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েলে কিছু খাবার। শরীরকে কিছু দিতে হবে, নাহলে কালকের দিনের জন্য তৈরি থাকা যাবে না। পকেট থেকে টাকা বের করার সময় ও খেয়াল করল ছেলেটা উঁকি- ঝুঁকি মারছে ঘরের ভেতর, সে একটু ঠান্ডা চোখে তাকাল ছেলেটার দিকে। সেই দৃষ্টি দেখে অর্জুনের হাত থেকে পাঁচশো টাকার নোটটা নিয়েই ও দৌড়ে চলে গেল। একবার মনে হয়েছিল পিছু নিয়ে নিকেশ করবে কি না, কিন্তু না, সেটা করবে না ও। অকারণে বডি কাউন্ট বাড়ানোর পক্ষপাতী নয় ও। আর মাথার ভেতর থেকে কোনো আদেশ আসেনি এখনও। টেবিলে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলটা খুলে মুরগির ঠ্যাং চিবোতে শুরু করল অর্জুন। পেটে অনেকক্ষণ যেন কিছু পড়েনি। সঙ্গে গলায় ঢেলে দিল সস্তা হুইস্কি। আহ্, জ্বলে গেল যেন, আর মাথার ভেতর সেই পরজীবী হেসে উঠল, “মদ্যপান করে ব্যাথা ভুলে থাকছ হে, তৃতীয় পাণ্ডব? চিন্তা কোরো না, কাল হবে তোমার ব্যাথার অন্ত। শুধু আমাকে আমার জায়গায় পৌঁছে দিয়ো একটু। তারপর ছুটি তোমার। প্রলয় অবশ্য তুমি দেখতে পাবে না সেটা একটা দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার।” পাগলের মতো হাসছে সেই পরজীবী।

অর্জুন আর একটু হুইস্কি ঢালল গলায়। তারপর ও ওর রুলটানা ছোটো নোটবুকটা টেনে লেখা শুরু করল—

যন্ত্রণা বাড়ছে, যত সময় যাচ্ছে। ছোটো থেকে যন্ত্রণা নিয়েই বড়ো হয়েছি। অ্যাসাইলামের ফাদারের কাছে এই যন্ত্রণার শুরু, শেষ হবে কাল, আমার ইচ্ছামৃত্যু দিয়ে। তার আগে আমি আমার ভেতরের এই সত্তাকে তার জায়গায় পৌঁছে দিয়ে আসব। এরপর আমি ঘুমোব। প্রলয় আসুক কি অ্যাপোক্যালিপ্স, নোয়ার নৌকা ভাসুক কি ডুবে যাক, কিচ্ছু যায় আসে না। এই দুনিয়া অর্জুন জ্যাকসের পরোয়া করেনি, অর্জুন জ্যাকসও এই দুনিয়ার পরোয়া করে না। প্রলয় আসুক কি জাজমেন্ট ডে, এই অর্জুন শুধু শান্তিতে মরতে পারলে আর কিছু চায় না। নরকে জায়গা হবে আমার? হোক। আমি সেখানেই যেতে চাই। কারণ আমি জানি অ্যাসাইলামের, ফাদার সেখানেই আছেন। অনেক হিসেব বাকি আছে। আমি ভুলিনি, আমি ভুলি না। আমি জিসাস নই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *