৭. নভেম্বর ১৯ সন্ধ্যা সাতটা
চেম্বারে আজ একা বসে রয়েছেন ডক্টর নাগ, একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছেন টেবিলে রাখা পেপারওয়েট, পেন, প্যাডের দিকে। মহেশ বাড়িতে নেই, ও গেছে ওর ফরিদচাচার ওখানে। ডক্টর নাগের খারাপ লাগছিল, মহেশকে একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে ওর কাছে পাঠানো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সময়ের সঙ্গে- সঙ্গে মহেশ ওর জীবনের একটা অংশ হয়ে গিয়েছিল। ছোটো-ছোটো অনেক কিছুতেই ডক্টর নাগ মহেশের ওপর নির্ভর করতেন। ইদানীং মহেশ ডক্টর নাগের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো কাজ করছিল একটু। সেই ছেলেটা আজ সকাল থেকে নেই। কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা লাগছিল। তবুও জীবন তো চলতেই থাকে। আজও স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছিলেন রোগীদের দেখার জন্য, তিনজনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। কিন্তু এসেছে দু’জন। একজন বলেছে সে বিকেলে আসতে চায়, কারণ অনিবার্য কারণবশত নাকি সে এখনও শহরে এসে পৌঁছয়নি। অন্য সময় হলে ডক্টর নাগ হয়তো অন্য কোনোদিন সকালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার কথা বলতেন, কিন্তু আজ কী মনে হল তিনি রাজি হয়ে গেলেন। সেই রোগীর জন্যই এখন অপেক্ষা করছেন তিনি। ঠিক এই সময়ই শোনা গেল কলিংবেলের শব্দ। ডক্টর নাগ এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলেন বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক মহিলা, পরনে একটা নীল জিন্স, আর লাল কুর্তি। কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম দেখা যাচ্ছে। ডক্টর নাগ তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মিস শবনম সুলতানা?”
“জি, ডক্টর। আমিই শবনম। মাফ করবেন, সকালে আসতে পারিনি। কিছু কাজ পড়ে গেছিল। তাই শহরে পৌঁছতে পারিনি।” একটু অপ্রতিভ স্বরে বলল শবনম।
ডক্টর নাগ হেসে বললেন, “কোনো ব্যাপার নয়। আপনি আসুন ভেতরে।”
ভেতরে ঢুকতে-ঢুকতে শবনম বলল, “আর ডক্টর, আপনি আমাকে ‘আপনি’ না বলে ‘তুমি’ করেই বলুন। আমি বয়সে অনেকটাই ছোটো আপনার থেকে।”
ডক্টর নাগ হাসলেন একটু। তিনি শবনমকে নিয়ে গেলেন তাঁর চেম্বারে। একটা চেয়ারে শবনমকে বসিয়ে তিনি বললেন, “আমাদের এই সেশনটা আমি চিকিৎসার প্রয়োজনে রেকর্ড করতে চাই। আর আমি এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি এই সেশন সম্পর্কে কেউ একটা কিছু জানবে না। সুতরাং আপনার আপত্তি নেই তো?”
শবনম মাথা নাড়ল— না, ওর আপত্তি নেই। “ভেরি গুড” বলে মোবাইলটা বের করে ভয়েস রেকর্ডারটা অন করলেন ডক্টর নাগ। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, মিস শবনম, এবারে বলুন আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি।”
শবনম শুকনো হেসে বলল, “স্যার, আপনি আমাকে আবার ‘আপনি’ করে ডাকছেন। প্লিজ ‘তুমি’ করেই বলুন না। আমার নাহলে কেমন যেন অস্বস্তি হয়।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। তা-ই হবে, শবনম। এবারে বলো আমি কীভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।” ডক্টর নাগ জিজ্ঞেস করলেন।
শবনম একটু মাথা নীচু করে রইল, কে জানে কী ভাবছে ও! ডক্টর নাগ চুপ করে লক্ষ করতে থাকলেন শুধু। উনি রোগীদেরকে সময় দেওয়া পছন্দ করেন। একটা লম্বা নীরবতার পর সে বলল, “আসলে ডক্টরসাহাব, আমি ভালো নেই। একদম ভালো নেই।”
ডক্টর নাগ দেখলেন শবনমের মুখ এবং ওর শরীরী ভাষা। ওর পা স্থির রয়েছে, ডানহাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ও বামহাতের বুড়ো আঙুলটাকে ঘষছে একটু-একটু করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার খারাপ লাগা থেকে শুরু করে যা যা মনের মধ্যে আছে তুমি বলতে পারো। নির্দ্বিধায় বলতে পারো। এখানে কেউ তোমাকে জাজ করবে না।”
শবনম হাসল একটু, “সবাই বলে একই কথা, কিন্তু জাজমেন্টাল হয় সবাই।”
“তুমি ঠিক বলছ, শবনম। কিন্তু না হওয়ার চেষ্টা তো এখানে করা যেতেই পারে, তা-ই না?” ডক্টর নাগ তাকিয়ে রইলেন শবনমের দিকে। শবনম শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ সিলিং ফ্যানের দিকে। তারপর ও জিজ্ঞেস করল ডক্টর নাগকে, “আপনার মায়ের কথা মনে আছে?”
ডক্টর নাগের চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোটোবেলার কিছু টুকরো দৃশ্য। গ্রামের বাড়ি, অভাবের সংসার, দু’বেলা দু’মুঠো জুটত না। বাবা ছিলেন সংস্কৃতের পণ্ডিত। মা ঘর সামলাতেন। মা-কে খুব বেশিদিন কাছে পাননি ডক্টর নাগ, বারো বছর বয়সে মা-কে হারান উনি। সাতদিনের জ্বরে মা চলে গিয়েছিলেন পরপারে। তবে এখনও মনে পড়ে মায়ের সুর করে পাঁচালি পড়া। তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, মনে আছে।”
“আমার আম্মিজানের কথা খুব মনে পড়ে। এই দুনিয়াতে একমাত্র আম্মিজান আমাকে ভালোবাসত। আম্মিজান বলত আমাকে, কাউকে কষ্ট দিতে না, নাহলে নাকি খোদা রাগ করে। আচ্ছা ডক্টরসাহাব, খোদা কি সত্যিই রাগ করে?” হঠাৎ শবনমের চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা।
ডক্টর নাগ মনে মনে নোট করলেন, ‘আ ডিপ কানেকশন উইথ মাদার।’ বললেন, “ঈশ্বর সব রকম মানবীয় অনুভূতির ঊর্ধ্বে বিরাজ করেন, শবনম। তিনি রাগ করেন না। রাগ করি আমরা, কষ্ট পাই আমরা। আর আমরা কষ্ট পেলে ঈশ্বর কষ্ট পান। কারণ ঈশ্বর আমাদের মধ্যেই থাকেন।”
শবনম হাসল, “আপনি আমার আম্মিজানের মতো কথা বললেন। আম্মিজানের মা, মানে আমার দাদি আপনাদের এদিকেরই মানুষ, জানেন? ওই যে মুর্শিদাবাদ আছে? সেখানকার। বিয়ের পর দাদি চলে আসে দিল্লিতে। দাদি, আম্মি সবাই আপনাদের এই ভাষাটা বলতে পারত। আমাকেও শিখিয়েছিল।”
“সেটা বুঝতে পারছি। বেশ পরিষ্কার বাংলা বল তুমি। আমার মনে হয়েছিল যে তোমার বাবা বা মায়ের মধ্যে কেউ হয়তো বাংলার হলেও হতে পারেন।”
শবনমের চোখটা যেন ধক্ করে জ্বলে উঠল, সে বলে উঠল, “বাবা! আব্বু! ওই লোকটার কথাই বলবেন না, ডক্টরসাহাব। ওই লোক জাহান্নমে গেলে সবচেয়ে বেশি খুশি হব আমি। যদি সত্যি কথা বলি, ডক্টরসাহাব, এই দুনিয়ায় যত মরদ আছে না, তাদের প্রায় সবাইকে দেখলেই মনে হয়, জাহান্নমে চলে যাক!”
একটু টানটান হয়ে বসলেন ডক্টর নাগ, মনে হচ্ছে বেড়াল ঝুলি থেকে বেরোচ্ছে একটু-একটু করে। মনে মনে নোট করলেন, ‘ডিপ রুটেড হেট্রেড ফর মেল অথরিটি ফিগারস।’
শবনম এরপর বলা শুরু করল ওর জীবনের কথা। আব্বুর কাছে মার খেয়ে হাসপাতালে যাওয়া, কিকবক্সিং ট্রেনিং-এর সময় মলেস্টেড হওয়া এবং তারপর সেই বাসের মধ্যে সেই ভয়ানক ঘটনা! প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে সবটা শুনলেন ডক্টর নাগ, আর ভেতরে-ভেতরে শিউরে উঠলেন তিনি। যা হয়েছে মেয়েটির সঙ্গে সেটা কল্পনারও বাইরে। কেউ এই অবস্থায় পড়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে, আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নিতে পারে। সেখানে এই শবনম নামের মেয়েটি লড়ছে, যেভাবেই হোক। কথা বলতে বলতে শবনম অনেকটা উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল। ওর দিকে একটা জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললেন তিনি, “একটু জল খেয়ে নাও, শবনম। একটু শান্ত হও। তোমার শান্ত থাকাটা খুব দরকার।”
জল খেয়ে শবনম বলল, “সেটাই তো পারি না, ডক্টর। সেটাই তো হয় না। হাসপাতাল থেকে ফেরত আসার পর থেকে শান্ত থাকতে পারি না। মনে হয় কেউ যেন মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, মনে হয় সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দিই।”
ডক্টর নাগ ভাবলেন, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তার সঙ্গে জুড়েছে ট্রাবল্ড চাইল্ডহুড। তুমুল রাগের বশে সবকিছু শেষ করে দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয় মোটেও। তিনি শবনমকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এর আগে কোনো সায়কায়াট্রিস্টের কাছে গিয়েছিলে কখনও? মানে…. হাসপাতাল থেকে ফেরার পর?”
শবনম বলল, “গিয়েছিলাম তো। বেশ কয়েক মাস গিয়েছিলাম। কিন্তু লাভ হয়নি, ডক্টর। কোনো লাভ হয়নি। কোনো ওষুধ কাজ করেনি। শুধু দুটো জিনিস কাজ করত জানেন?” বলে থেমে গেল শবনম। মাথা নীচু করে কিছু একটা ভাবছে যেন।
ডক্টর নাগ বললেন, “তুমি নিশ্চিন্তে বলতে পারো। আগেই বলেছি, কেউ তোমাকে এখানে জাজ করবে না। তুমি নিশ্চিন্তে বলো।”
ডক্টর নাগের দিকে তাকিয়ে শবনম একটু অদ্ভুতভাবে হাসল যেন। কে জানে কেন সেই হাসিটা দেখে ডক্টর নাগ একটু অস্বস্তি বোধ করলেন। ওই হাসির মধ্যে যন্ত্রণা, রাগ, ব্যঙ্গ সবকিছুই যেন লুকিয়ে আছে। শবনম ওর কনুইদুটো টেবিলে রেখে বলল, “সত্যিই জানতে চান, ডক্টর?”
ডক্টর নাগের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে সাবধান করে দিল, কিছু একটা এখন হলেও হতে পারে। তিনি তার চোখেমুখে অবশ্য কোনো ছাপ পড়তে দিলেন না। শান্ত হয়েই বললেন, “হ্যাঁ, জানতে চাই। তুমি যদি তোমার দিকটা পুরোটা না বলো তাহলে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব না।”
শবনম মেঝেতে রাখা ব্যাগটা তুলে সেখান থেকে একটা বাদামি রঙের ভায়াল বের করে ডক্টর নাগের দিকে এগিয়ে দিল, “এটা আমাকে শান্ত রাখতে পারে।”
ডক্টর নাগ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন বাদামি রঙের স্বচ্ছ ভায়ালটার দিকে। ওর মধ্যে অবস্থিত তরলের মধ্যে একটা আন্দোলন লক্ষ করলেন তিনি। শবনমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, “কী ধরনের ড্রাগ এটা? এর কোনো প্রেসক্রিপশন আছে তোমার কাছে?”
শবনম বলল, “না, ডক্টরসাহাব, এর কোনো প্রেসক্রিপশন আমার কাছে নেই। আমাকে একজন এই ড্রাগটা দিয়ে যায়। বিনিময়ে আমাকে কিছু কাজ করতে হয়।”
ডক্টর নাগ মনে-মনে স্থির করে নিয়েছেন তখন, এই ড্রাগটার কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করতে হবে। দেখতে হবে এটা কী ধরনের ড্রাগ! তিনি শবনমকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই ড্রাগের বিনিময়ে তোমাকে ঠিক কী ধরনের কাজ করতে হয়?”
“মানুষ মারতে হয়, ডক্টরসাহাব।” খুব সহজভাবে বলল শবনম। শুনে একটু চমকে গেলেন ডক্টর নাগ, এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল তিনি যেন ভুল শুনলেন। কিন্তু না, তিনি ভুল শোনেননি। শবনম হেসে বলছে তখন,
“চমকে গেলেন, ডক্টর? ভাবছেন আমি মিথ্যে বলছি কি না?”
ডক্টর নাগ নিজের নার্ভের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে বললেন, “না, শবনম। আমি কিছু ভাবিনি।”
শবনম টেবিলে রাখা পেপারওয়েটটা ছুড়ে ফেলল মেঝেতে। ও উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “মিথ্যে বলবেন না, ডক্টর! আপনি ভাবছেন অনেক কিছু। আপনি ভাবছেন— এই মেয়েটা খুনি, এই মেয়েটা একটা শয়তান। ভাবছেন না, ডক্টর? কী হল, ডক্টর? বলুন! ভাবছেন না আপনি?”
ডক্টর নাগের দিক থেকে শান্তস্বরে উত্তর ভেসে এল, “না, শবনম, আমি এগুলো কিছুই ভাবছি না। আমি ভাবছি অন্য একটা কথা।”
শবনম কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল ডক্টর নাগের কথা শুনে, এতটা শান্ত উত্তর ও আশা করেনি। ও একটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকাল ডক্টর নাগের দিকে। ডক্টর নাগের দিক থেকে ঠিক আগের মতোই শান্ত স্বরে উত্তর ভেসে এল, “তুমি সত্যিই খুব যন্ত্রণার মধ্যে আছ, শবনম। আর তোমার আম্মিজান তোমাকে দেখে সত্যিই কষ্ট পাচ্ছেন অনেক।”
ভেঙে পড়ল শবনম, চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল ও। ওই অবস্থাতেই ও কোনোরকমে ডক্টর নাগের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ভালো নেই, ডক্টর। আমি মানুষ মারতে চাই না। কিন্তু না মেরে আমি থাকতেও পারব না। সব ছেলেদের মধ্যে আমি ওই বাসের শয়তানগুলোকে দেখতে পাই। আমাকে হেল্প করুন, ডক্টর। আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিন। যা করা দরকার করুন। কিন্তু আমাকে বাঁচান! নইলে আপনিও বাঁচবেন না!”
ডক্টর নাগ এবারে একটু চমকে উঠলেন, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমি বাঁচব না! কেন?”
শবনমের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল ওর যেন দম আটকে আসবে, কোনোরকমে ও ব্যাগ থেকে একতাড়া কাগজ বের করে ডক্টর নাগের দিকে এগিয়ে দিল। ডক্টর নাগ সেই কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন, এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে কীভাবে তাঁকে প্রথমে অজ্ঞান করতে হবে, তারপর তার বোন ম্যারো এক্সট্র্যাক্ট করে অজ্ঞান অবস্থাতেই ‘স্যাক্রিফাইস’ করতে হবে— ঠিক যেভাবে একটা ইঁদুরকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিনা যন্ত্রণায় মেরে দেওয়া হয়, ঠিক সেভাবে! ডক্টর নাগ তার চেয়ার থেকে উঠে শবনমকে আস্তে আস্তে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে চেম্বারের একটা কাউচে শুইয়ে দিলেন। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “শান্ত হও, শবনম। শান্ত হও। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিচ্ছু হয়নি।
শবনম তখনও ফুঁপিয়ে চলেছে। ওর মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, “তুমি বলতে পারবে, কে তোমাকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছে?”
শবনম কোনো রকমে উত্তর দিল, “আমি ওই লোকের চেহারা কখনও দেখিনি। কিন্তু এটুকু বলতে পারি ওর মুখে সবসময় একটা মুখোশ পরা থাকে।” মুখোশ! ডক্টর নাগ অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলেন, “সেই মুখোশে কি চন্দনের গন্ধ থাকে?”
“ফুল মার্কস, ডক্টর!” একটা ভারী কণ্ঠস্বর শুনে চমকে পাশ ফিরে তাকালেন ডক্টর নাগ। চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক দীর্ঘকায় মূর্তি, তার পরনে কালো জ্যাকেট, নীল জিন্স এবং মুখে রয়েছে একটা পুরু, কালো মুখোশ। এক মুহূর্তের জন্য ডক্টর নাগের মনে হল রুদ্র এসে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু না, রুদ্র হতে পারে না এ। এর মধ্যে একটা হিমশীতল ব্যাপার আছে, ঠিক যেন মৃত্যুর মতো! সেই দীর্ঘকায় মূর্তি এগিয়ে এল ডক্টর নাগ আর শবনমের দিকে। কাউচে শুয়ে থাকা শবনমের দিকে তাকিয়ে বলল ও, “মিশন অলমোস্ট ফেইল্ড, শবনম। আমাকে হতাশ করলে তুমি।”
বলে সে মুখোশটা খুলল, মুখ দেখে এবার চিনতে পারলেন ডক্টর নাগ গতবার এ-ও ছিল সেই দলে, যারা রুদ্রর পিছু নিয়েছিল। ভারী গলাটি ডক্টর নাগের দিকে আবার ভেসে এল, “অর্জুন জ্যাকস অ্যাট ইয়োর সার্ভিস, ডক্টর! মনে আছে নিশ্চয়ই?”
ডক্টর নাগ তাকিয়ে রইলেন ভাবলেশহীন মুখটির দিকে। কোনো উত্তর দিলেন না তিনি। অর্জুন বলছে ওদিকে, “আমি আপনার কাছে আসার ঝুঁকিটা নিতাম না। কিন্তু সাবজেক্ট জিরো কাজটি যেহেতু শেষ করতে পারেনি, তাই আমাকে আসতেই হল।”
ডক্টর নাগ একবার শবনমের দিকে তাকালেন, অর্জুন ওকে ‘সাবজেক্ট জিরো’ বলল কেন? অর্জুনের গলা ভেসে এল ওদিক থেকে, “আপনার কাছে এমন কিছু একটা আছে যেটা আমার দরকার, ডক্টর। খুব দরকার!
ডক্টর নাগ এবার স্থিরদৃষ্টিতে তাকালেন অর্জুনের দিকে, তারপর শান্তস্বরে বললেন, “তোমার কাছেও এমন কিছু একটা রয়েছে যেটা আমার দরকার।”
অর্জুনের ভেতরে অবস্থিত সেই পরজীবীর অর্ধাংশের উপস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন ডক্টর নাগ। এই সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে রাজি ছিলেন না, তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তিনি তাকালেন অর্জুনের দিকে। আর ঘরের মধ্যে যেন একটা ছোটোখাটো ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হল, ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র সেই ঝড়ের প্রকোপে এদিক-ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। সেই ঝড়কে সামলানো যেন অর্জুনের মতো দীর্ঘদেহীর পক্ষেও অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। সে কোনোরকমে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছিল ডক্টর নাগের দিকে কিন্তু অদৃশ্য একটা কিছু যেন তাকে বেঁধে ফেলছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। দেখতে না দেখতে অর্জুন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, ও মুখোশটা পরারও সময় পায়নি। ডক্টর নাগ একটু-একটু করে এগিয়ে যাচ্ছেন, এখন খালি ওর মনের গভীরে অনুপ্রবেশ করে পরজীবীর অর্ধাংশকে নিজের মধ্যে আনতে পারলেই হবে। প্রলয় আসতে দেওয়া যাবে না। অর্জুনের কপালে হাত রাখার আগেই ডক্টর নাগ টের পেলেন একটা তীক্ষ্ণ কিছু তার গলায় এসে বিঁধল। পেছন ফিরে তাকাতেই তিনি দেখতে পেলেন পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে শবনম। মুখে ফুটে উঠেছে একটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট হাসি। সে বলছে, “মাফ করবেন, ডক্টর। কিন্তু আমাকে আমার কাজ শেষ করতে হবে। তবেই হবে আমার ছুটি।” বেশি কিছু ভাবার অবকাশ পেলেন না ডক্টর নাগ, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল তাঁর। ঘর জুড়ে তখন চন্দনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
***
নভেম্বর ১৯
রাত ন’টা
“স্যার, ব্যাপারটা রিস্কি হয়ে গেল না তো?”
“কোন ব্যাপারটা?”
“এই যে ডক্টর নাগকে ওরা দু’জন কিডন্যাপ করে নিল।”
“চাপ নেই। এরা ডক্টরকে সহজে কিছু করবে না।”
“কিন্তু করতে কতক্ষণ, স্যার? আমাদের আরও আগে অ্যাকশন নিতে হত না?”
“কাদের নিয়ে যেতে, জিনিয়াস? পুরোটা আনঅফিশিয়ালি চলছে এখানে। আমাকে এজেন্সি খুঁজছে, আর তুমি তো এখনও খাতায়-কলমে কাজই শুরু করোনি। যা করার আমাদেরই করতে হবে।”
“সে তো নাহয় বুঝলাম। কিন্তু আমার মাথায় এখনও ঢুকছে না আমরা ঠিক কীসের পিছু নিচ্ছি এখানে।”
“বুঝে যাবে, বুঝে যাবে। কবরে মাটি চাপা দেওয়া হয়নি কিনা। সেটা তো আমাকেই করতে হবে! মাঝখান থেকে আমার পেছনে আমারই এজেন্সিকে লেলিয়ে দিয়ে মজা দেখছে লোক। ক্ষমতা সবাইকে চুতিয়া বানায়, বুঝলে, বিগ বি?”
দূরে একটা পার্কিং স্পেসে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেরুন এসইউভি গাড়িতে হচ্ছিল এই পুরো কথোপকথনটা। সেখানে ব্যাকসিটে বসে একটা আইপ্যাডে পুরোটা দেখছিলেন এক ভদ্রলোক। আর ড্রাইভারের সিটে বসে রয়েছে বছর পঁচিশের একটি ছেলে। ছেলেটি বলল, “আমরা জিপিএস ট্র্যাকারটাকে ফলো করলে কিন্তু ওদের ধরে ফেলতে পারব। আপনি বললে আমি যাত্রা শুরু করি?”
“করবে, বৎস, নিশ্চয়ই করবে! তোমার কপাল ভালো যে ভদ্রলোক ট্র্যাকারটি সঙ্গে রেখেছেন। কিন্তু ধরো, যদি তিনি ট্র্যাকারটি সঙ্গে না রাখতেন, তাহলে কী হত?” ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন। ছেলেটি মুখ খুলে কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। কোনো জুতসই উত্তর খুঁজে পেল না। ব্যকসিটে বসা ভদ্রলোক হেসে বললেন, “খাতা-কলম বের করে লিখে নাও— ‘যন্ত্র ফেল করলে মানুষের শরণাপন্ন হও’।”
“কিন্তু আপনার ক্লোসড অ্যাসোসিয়েটস আর অ্যাসেটদের তো নিকেশ করে দিয়েছে ওরা। খবর পাবেন আপনি?” ছেলেটির গলায় অবিশ্বাসের সুর স্পষ্ট।
ভদ্রলোক একটু থমকে গেলেন যেন, তারপর গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, “সে তো দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কী জানো তো, বাবা? হাতের সব তাস কখনও দেখাতে নেই।” ছেলেটি কিছু বলল না। ও জানে এই ভদ্রলোক যাকে বলে ঘোরতর রকমের আবেগহীন মানুষ। কিন্তু ওর মনে হল পুরো ব্যাপারটা তাঁকেও যেন একটু হলেও বিচলিত করে দিয়েছে। আর একজন এজেন্টের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল তথ্য। যাদের কাছে তিনি তথ্যগুলো পেতেন তাদের এক-এক করে মেরে দিয়ে যেন ভদ্রলোককে প্রায় অন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এই ভদ্রলোক কোনো না কোনো উপায় ঠিক বের করে নেন। এমনসময় ভদ্রলোকের ফোন বেজে উঠল, ফোনটা ধরে বললেন তিনি, “বলুন, সন্ত মাইকেল। খবর পেয়েছেন?”
ওপাশ থেকে কী বলা হল সেটা ছেলেটি শুনতে পেল না, কিন্তু সে রিয়ারভিউ মিররে খেয়াল করল ভদ্রলোকের মুখে যেন একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠছে। তিনি বললেন, “বাহ্! সত্যিই আপনি অসাধারণ! এই শহরের বেতাজ বাদশার তখতের জন্য আপনিই যোগ্য। খুব ভালো কাজ করেছেন আপনি। চলুন, আসি এখন, পরে কথা হবে।”
বলে তিনি আইপ্যাডটা পাশের ব্যাগে ঢুকিয়ে বললেন, “চলো বাবা, শহরের বাইরে একটা পুরোনো জুটমিল আছে, সেখানকার লাগোয়া একটা পুরোনো সারভেন্ট’স কোয়ার্টারে চলো। ঠিকানা বলে দিচ্ছি। চলো এবার।”
গাড়ি স্টার্ট করল ছেলেটি। পার্কিং স্পেস থেকে বেরিয়ে ওরা হাইওয়ে ধরল, আর ছেলেটি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করল, যেদিকে ওর জিপিএস ট্র্যাকার এগিয়েছে ঠিক সেই রাস্তা ধরেই ওরা এগোচ্ছে। ও ভদ্রলোককে কিছু বলার আগেই দেখল উনি সিটে বসে চোখ বুজে রয়েছেন একটু। এরকম একটা সময়েও যে তিনি বিশ্রাম করতে পারছেন এটা অনেক বড়ো ব্যাপার। এমনিই এমনিই তো আর বলে না যে, এজেন্ট বাসুদেব বর্মা শয়তানের সঙ্গে পর্যন্ত মাথা ঠান্ডা রেখে লুডো খেলে চলে আসবেন।
