১. অগাস্ট ২৬ ভোর পাঁচটা

১. অগাস্ট ২৬ ভোর পাঁচটা

প্রতিদিন ভোরের আলো না ফোটার আগেই ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে বেরনো অভ্যাস ইসমাইল মাস্টারের। পেশায় দরজি ইসমাইল এই কোচি শহরে রয়েছে প্রায় কুড়ি বছরেরও ওপর। শহরটাকে বেশ ভালোবেসে ফেলেছে সে। এখানেই বিয়ে-থা করে সংসার পেতেছে। দিব্যি আছে। মুর্শিদাবাদ থেকে এখানে এসেছিল ভাগ্যান্বেষণের জন্য। আর ভাগ্য তাকে যা দিয়েছে তাতে ইসমাইলের কোনো আক্ষেপ নেই। শানদার টেইলার্সের মালিক ও এখন। এই কোচি শহরের অন্যতম নামকরা দরজির দোকান হল এই শানদার টেইলার্স। ওর কাছে শহরের সবচেয়ে বড়ো-বড়ো রাজনেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা আসে জামা-প্যান্ট-স্যুট বানানোর জন্য। ব্যস, আর কী চাই! যা যা দরকার ছিল সবই আছে ওর। আর শুধু তা-ই’ই নয়, জামাকাপড়ের মাপ নেওয়ার সময় ইসমাইল এমন-এমন অনেক খবর জানতে পারে এই সব গুরুত্বপূর্ণ লোকেদের যা এদেরকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। কী করবে ইসমাইল এই খবরগুলোর? কী আর করবে ও, নিজের কাছে সাংকেতিক ভাষায় লিখে রেখে দেবে। আর প্রতি সপ্তাহে একটা ঠিকানায় সেই লেখাগুলোকে ক্যুরিয়ার করে দেবে। বিনিময়ে প্রতি মাসে ওর কাছে একটা করে প্যাকেট চলে আসবে, যার মধ্যে থাকবে টাকার একটা মোটা বান্ডিল। আর সেটা আসবে এই মর্নিংওয়াক করার সময়ই। কোচি শহরের মেরিন ড্রাইভ ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেখানে একজন হকার থাকবে, চা নিয়ে বসে থাকবে সে। তার কাছ থেকেই একটা প্লাস্টিকে মোড়ানো প্যাকেট নিয়ে সে এগিয়ে যাবে তার বাড়ির উদ্দেশে।

আজ বেরনোর সময়ও সেটাই ভাবল ইসমাইল। দেখা যাক চা-ওয়ালা সময়মতো আসে কি না। মেরিন ড্রাইভ ওয়াকওয়ে থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ওর বাড়ি। সেখান থেকে হাঁটতে-হাঁটতেই চলে আসে ও। আজও তা-ই করবে। ভোরের আলো না ফোটার আগেই সে জামা-জুতো-ট্র্যাকস্যুট পরে সে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। ভোরবেলার আবহাওয়া বেশ মনোরম। পলিউশন কম থাকে, যানবাহন থাকে না বললেই চলে, আর কপাল ভালো থাকলে মাঝে মাঝে টাইট্স পরিহিতা বেশ কয়েক জন নাগরিকাদেরও দেখা পাওয়া যায়। আজকাল বিবির থেকে সেভাবে কিছু মেলে না, তাই দেখেই শান্তি করে নেয় ইসমাইল। কী আর করা যাবে। হাঁটছিল বেশ জোরেই। এমন সময় পাশ থেকে এক সুমধুর কণ্ঠে কেউ বলল, “হাই!”

পাশে যে জন রয়েছে, তাকে দেখে ইসমাইলের রক্ত চলাচল তীব্র হয়ে গেল রীতিমতো। হবে না-ই বা কেন? এরকম ঠাসা বুক আর নিতম্ব দেখলে যে কারওর মাথা খারাপ হয়ে যাবে। একটা মেরুন রঙের টাইট প্যান্ট আর নীল রঙের টপ পরে ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে এক মহিলা। সেই মহিলার দিকে ইসমাইল ওর উঁচু দাঁতগুলো বের করে হাসল, “হাই!”

“আপনি তো মেরিন ড্রাইভ ওয়াকওয়ের দিকে যাচ্ছেন, তা-ই না?” মহিলা বলে উঠল।

“হ্যাঁ।” মাথা নাড়ল ইসমাইল। ও দেখে যাচ্ছে সেই মহিলাকে। উফ্‌! সত্যিই আগুন চেহারা পুরো! আর বয়সও খুব বেশি না, মেরেকেটে ত্রিশের কাছেই হবে হয়তো। মহিলা বলছে তখন, “আমি শবনম। মেরিন ড্রাইভ ওয়াকওয়ের দিকেই যাচ্ছি। কিন্তু রাস্তাটা গুলিয়ে যাচ্ছে একটু। আপনি হেল্প করবেন, প্লিজ?”

শবনম! উফ্, কী নাম! ইসমাইল মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, মানে… ইয়ে… মানে, করব তো! যেখানে-যেখানে বলবেন সেখানেই নিয়ে যাব। আপনি শুধু আমাকে ফলো করুন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।”

শবনম ইসমাইলের কাঁধে হাত রেখে বলল, “আরে, থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি বহুত সুইট, জানেন তো? এরকমভাবে হেল্প কে করে বলুন আজকের দিনে! সত্যিই আপনি না থাকলে— “

ইসমাইল গলে যাচ্ছে রীতিমতো, ওর কাঁধে যে একটা পিন ফোটার মতো অনুভূতি হয়েছে সেটাকে ও পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে ও বলছে, “আরে ম্যাডাম, হেল্প কি, আমি আপনাকে জন্নতেরও সফর করাতে পারি! যদি আপনি রাজি থাকেন! বুঝলেন? চলুন।” পুলক ধরছে না আর ইসমাইলের মনে, এতদিনে বোধ হয় বিবিকে বাদ দিয়েও একজন বাহারওয়ালি পাওয়া গেল যার কাছে এই ধরনের চাওয়া-পাওয়াগুলো মিটবে।

ইসমাইল সেদিন অবশ্য মেরিন ড্রাইভ ওয়াকওয়েতে আর পৌঁছতে পারেনি। ওর নিথর শরীর পাওয়া যায় শহরের ফুটপাথে। পোস্টমর্টেম করলে জানা যাবে হঠাৎ হৃত্যন্ত্র কাজ করা বন্ধ করাতে এই অবস্থা হয়েছে। বিষক্রিয়ার ফলাফল নাকি? বলা যাবে না। আর সেই শবনম নামের মহিলা? ওই মহিলাকে এরপর আর কোচি শহরে দেখা যায়নি। যে ঠিকানায় ওই ক্যুরিয়ারগুলো যেত, সেখানে এই ক্যুরিয়ারগুলো যাওয়া এখন বন্ধ হয়ে যাবে। খবর পৌঁছবে না আর।

***

সেপ্টেম্বর ২৩
রাত এগারোটা

‘এক বাঁচে সাবধান, আর এক বাঁচে বুদ্ধিমান!

ছোটোবেলায় এই কথাটা অনেক শুনেছে ম্যানি। তার বাপ-ঠাকুরদা সবাই বলতেন এটা। কেন বলতেন তারা? ম্যানি কি একেবারেই বোকা? না, মোটেই তা নয়। সে ভীষণই বুদ্ধিমান একজন। নয়তো গোয়ার পালোলেম সমুদ্র- সৈকতের ধারে একটা ফুড-স্টল দিয়ে নিজেকে চালাতে পারত না। ব্যবসায়িক বুদ্ধি ভালোমতোই আছে তার। তাই তো এখনও সে দিব্যি বেঁচেবর্তে রয়েছে এবং কিছু একটা করেও খাচ্ছে। তাহলে এই কথাটা আসছে কেন? কারণ ম্যানি বড়োই অসাবধানী। মাঝে-মাঝেই নেশার ঘোরে ও বেফাঁস কথা বলে ফেলে। এই যেমন কয়েক দিন আগে ও একটা পাবে নেশার ঘোরে বলে ফেলেছিল যে, ও আগে এক আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাং-এর হয়ে কাজ করত, ও নাকি সেই গ্যাং-এর টপ শ্যুটার ছিল! সবাই ভেবেছিল, এহ্, মাতাল হয়ে ভুলভাল বকছে এই পাবলিক, কে এর কথাকে সিরিয়াসলি নেবে? কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, ম্যানি যা বলে তা ভুল নয় মোটেও। প্রায় একযুগ আগে ও মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে পরিচিত ছিল কুখ্যাত শ্যুটার মনোহর রাও নামে। যে-সময় মুম্বাই-এর রাস্তায় গ্যাংগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর তাদের সঙ্গে প্রায়ই পুলিশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদের খণ্ডযুদ্ধ চলছে, তখন ম্যানি ওরফে মনোহরের শিকার হয়েছে অসংখ্য বিরোধী গ্যাং-এর সদস্য এবং কিছু পুলিশও। কিন্তু একদিন ম্যানি হঠাৎ ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। ওর মনে হয়েছিল যে সেদিনই হয়তো ওর শেষ দিন, হয়তো সেদিনই ওকে কেউ পরপারে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু না, ম্যানি বেঁচে তো রয়েছে! কারণ ও একজনের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। ও মুম্বাইয়ের কুখ্যাত এক গ্যাং-এর লুকোনো ডেরার ঠিকানা দেবে পুলিশকে, আর তার বিনিময়ে ম্যানি বেঁচে থাকতে পারবে। তফাৎ শুধু একটাই, খাতায়-কলমে ওর মৃত্যু হবে এবং ওকে সারা জীবনের মতো মুম্বাই ছেড়ে চলে যেতে হবে। রাজি হয়ে গিয়েছিল ম্যানি। রাজি না হয়ে উপায়ও ছিল না। কারণ, যে লোকটার সঙ্গে ও চুক্তিটা করেছিল, সে এই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত, আর তলে-তলে ম্যানি শুনেছিল সেই লোক নাকি শয়তানের সঙ্গেও দিব্যি চুক্তি করে বেরিয়ে চলে আসবে। এরপর ভুয়ো এনকাউন্টারের একটা গল্প চাউর করা হল, ফলাও করে পেপারে বেরোল যে, মুম্বাইয়ের ত্রাস মনোহর রাও পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে মারা গিয়েছে, আর রাতারাতি মনোহর ‘ম্যানি’ হয়ে চলে এল গোয়া। তবে হ্যাঁ, এসেও যে শান্তিতে আছে তা নয়। মনোহর ওরফে ম্যানির কাছ থেকে খবরাখবর নিয়েই যেত লোকটা। সত্যিই, এ যেন সাক্ষাৎ শয়তানের সঙ্গেই চুক্তি করার শামিল। মনোহর বা ম্যানি কেউই শান্তিতে থাকতে পারবে না ওর জ্বালায়।

চার নম্বর বিয়ারের বোতলে চুমুক দিতে-দিতে এই কথাগুলো টানা বলে চলছিল ম্যানি, মানে সমুদ্রের ধারে নিজেই নিজের মনে বকছিল ও। এখন তো কাউকে আর বলতেও পারে না। যেদিন বলে ফেলেছিল মুখ ফসকে যে, ও এক রিটায়ার্ড গ্যাংস্টার, সেদিন রাতে ওই লোক ফোন করে মিষ্টি-মিষ্টি কথায় ঝেড়েছিল। তারপর থেকে ম্যানি আর সেই ঝুঁকি নেয় না। ও এখন মদ নিয়ে সমুদ্রের ধারে চলে আসে, আর যা-যা মনে আছে সমুদ্রকে বলে দেয়। শুনশান সমুদ্র-সৈকতে কেউ থাকে না আড়িপাতার মতো। বিয়ারের বোতলে চুমুক দিতে গিয়ে দেখল বিয়ার গেছে শেষ হয়ে

‘বেহেনচোদ!” নিজের মনেই গালাগালি দিয়ে উঠল ম্যানি। আর একটা বিয়ার দরকার ছিল এখন। এমন সময় বামপাশ থেকে কে যেন এগিয়ে দিল আরও একটা বিয়ারের বোতল। চমকে পাশ ফিরে তাকাল ম্যানি, পাশে বসে রয়েছে এক মহিলা, পরনে একটা মেরুন রঙের সারং, খোলা চুল হাওয়ায় উড়ছে। আলতো হেসে সে বিয়ারের বোতল এগিয়ে দিয়ে বলছে, “ইউ নিড অ্যানাদার ওয়ান। রাইট?”

ম্যানি কেমন যেন ভেবলে গেল, তারপর বোকার মতো একটু হেসে বলল, “ইয়েস ইয়েস, রাইট ম্যাম। ইউ লুক সো কড়ক! মতলব ওই কী বলে বেশ— বিউটিফুল!”

মহিলা হেসে উঠল, তারপর সে ডানহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমি শবনম।”

নামটা শুনেই ম্যানির নিজেকে কেমন যেন সেই হিন্দি ফিলিমের নায়কের মতো মনে হল, সে হাতটা ধরে বলল, “অউর ম্যায় হুঁ শোলা।”

শবনম হেসে বলল, “ইউ আর ফানি, মিস্টার ম্যানি, আই মিন মনোহর রাও।”

একধাক্কায় ম্যানির নেশা যেন অনেকটা নেমে গেল, ও একটু সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাল শবনমের দিকে, “কী বললেন?”

“আপনার আসল নাম! এই তো কিছুক্ষণ আগেই তো আপনিই বলছিলেন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে।”

ম্যানি জিজ্ঞেস করল, “আপনি সব শুনেছেন?” ওর হাতটা নিজের অজান্তেই কোমরের পেছনে চলে যাচ্ছিল, সেখানে গোঁজা রয়েছে একটা ছোটো রিভলভার। এক বাঁচে সাবধান আর এক বাঁচে বুদ্ধিমান— এই আপ্তবাক্য নিয়ে চলা ম্যানি সবসময় অস্ত্র সঙ্গে নিয়েই চলাফেরা করে।

শবনম ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “চিন্তা করবেন না, আপনার কথা কেউ জানবে না।” তারপর একটু এগিয়ে এল ওর দিকে। ম্যানি বুঝতে পারল অনেক দিন নারীসঙ্গ না-পাওয়া তার শরীরটা যেন হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠল একটু। ও এক চুমুকে বিয়ারের বোতলটা খালি করে টেনে নিল শবনমকে, তারপর বলল, “জানেমন, অনেক গল্প আছে আমার কাছে। আর সারা রাত আছে। তোমাকে সব গল্প বলব আজ।”

শবনমও ওই খর্বকায় লোকটিকে যেন নিজের মধ্যে মিশিয়ে নিল, “সারা রাতের কথা ভেবো না। যেটুকু সময় আছে, সেটুকুই বেঁচে নাও নাহয়!”

এক মুহূর্তের জন্য ম্যানির মনে হল ও যেন সপ্তম স্বর্গে রয়েছে। কতদিন এই নরম ছোঁয়া পায়নি ও! চোখ বন্ধ করল ম্যানি। কিন্তু ওর চোখ আর খুলল না। চিরনিদ্রায় চলে গেল ম্যানি। ওর শরীর পড়ে রইল সমুদ্র-সৈকতে। পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রইল চারটি বিয়ারের বোতল। আর পাঁচ নম্বর বোতল? সেটা তখন শবনম নামের সেই মহিলার ব্যাগে জায়গা করে নিয়েছে। শবনম ধীরপায়ে এগিয়ে চলেছে রাস্তার পাশে রাখা একটা গাড়ির দিকে। সেখানে গিয়ে ওকে একটা নম্বরে মেসেজ করতে হবে— ‘কাজ হয়ে গেছে।’ তারপর ওকে পাঠানো হবে একটা ঠিকানা। সেই ঠিকানায় গিয়ে শবনম একজনকে ম্যানির ফোন এবং অন্যান্য কাগজপত্র দিয়ে দেবে। বিনিময়ে শবনম পাবে একটা ওষুধ যা ওকে স্থির থাকতে সাহায্য করে; সেই ওষুধের একটা ভায়াল এখন গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রয়েছে। ম্যানির ফোনে তখন মেসেজ আসছে— ‘আপডেট, ম্যানি?”

ম্যানি আর আপডেট দেবে না। ওর থেকে আর কোনো খবর যাবে না সেই মানুষটির কাছে। কারণ ম্যানি ওর-বাপ ঠাকুরদার বলা কথাটিকে ভুলে গিয়েছিল— ‘এক বাঁচে সাবধান, আর এক বাঁচে বুদ্ধিমান!’

***

অর্জুন তার লিস্টে আরও একটি নাম কেটে দিল। ছয় মাসে এই নিয়ে ছয় নম্বর নামটি কাটা হল। এদের কাছ থেকেই ওই লোকটা বেশিরভাগ খবর নিত। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী সে এখন উধাও হয়ে গেছে। কিছু আন্দাজ করেছে কি? হয়তো! আর করলেও কী, এক-এক করে তার চোখ এবং নাক দুটোকেই ভোঁতা করে দেওয়া হচ্ছে। এখন দেখা যাক এই লোক তার খবরিদের মার্ডারের পিছু নেয় না অন্য কিছু করে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *