০. জানুয়ারি ২৬ রাত দশটা

০. জানুয়ারি ২৬ রাত দশটা

আমি জানি না কতদিন পারব নিজেকে স্থির রাখতে। আমি জানি না। আমাকে সে বলে, প্রলয় আনতে হবে। নতুবা এই পৃথিবী নিষ্কলুষ হবে না। আমি জানি, এই পৃথিবী কতটা আবর্জনায় ভরে গিয়েছে। আমি জানি, এই পৃথিবীর অধিপতি মানুষেরা আর আগের মতো নেই। তাদের আত্মায় ধরেছে পচন। তারা বিষিয়ে তুলছে এই পৃথিবীকে, আর তাদেরকে ঝাড়ে-বংশে শেষ না করতে পারলে এই পৃথিবীর উদ্ধার সম্ভব নয়। নয়। কোনোভাবেই নয়।

একটা রুলটানা খাতায় এই কথাগুলো লিখছিল সে। না লিখতে পারলে তার মন শান্ত হচ্ছিল না মোটেও। খাতার মধ্যে এই টুকরো কথাগুলো লিখেই সে নিজেকে শান্ত রাখতে পারে, মনে হয় সে যেন ঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ওর খুব কাছের এক মানুষ, ওর সহযোদ্ধা যে পথে এগিয়ে গিয়েছিল, সেই পথেই সে এগোচ্ছে। ও জানে, এই পথ ছাড়া ওর গতি নেই। প্রলয় ছাড়া গতি নেই। নাহলে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে ওর মুক্তি নেই।

“তৃতীয় পাণ্ডব! শুনতে পাচ্ছ, তৃতীয় পাণ্ডব?” ওই যে ডাক দিয়েছে ও। মনের ভেতর-ঘর থেকে ডাক এসেছে। দীর্ঘদেহী মানুষটি উত্তর দিল, “পাচ্ছি।”

“প্রলয় আসতে বেশি দেরি নেই। চিন্তা কোরো না। আর কয়েক মাস। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আমাকে পৌঁছে দেবে আমার আদর্শ আধারের কাছে। যার ক্ষমতার কাছে ওই প্রবুদ্ধ মানবও তুচ্ছ!”

“ততদিন আমি যদি বেঁচে না থাকি? যদি এই শরীর সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেয়?”

“চিন্তা কোরো না, উপায় বেরোবেই। যদি তোমার শরীর তার শেষ সীমানায় পৌঁছে যায় তাহলে তুমি এমন কাউকে আমার অস্থায়ী আধার হিসেবে বেছে নিয়ো, যে আমাকে আমার আদর্শ আধারের কাছে পৌঁছে দেবে।”

সেই দীর্ঘদেহী বসে রইল চুপ করে কিছুক্ষণ, টেবিলের সামনে রাখা তিন- চারটে কাগজের ওপর সে চোখ বোলাল, তারপর একটা ছবির ওপর আঙুল রেখে বলল সে, “অস্থায়ী আধার হিসেবে এই ব্যক্তি কাজ করতে পারে বলে মনে হয়।”

“সহমত আমিও। কিন্তু মনে রেখো, আদর্শ আধারের কাছে যাওয়ার অন্তত পক্ষে একদণ্ড আগে সেই অস্থায়ী আধারে স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নইলে সমস্যা হবে।”

“চিন্তা নেই। তাই-ই হবে।”

“তবে তার আগে আমাদের পথের কাঁটাকে সরাতে হবে। বুঝতে পেরেছ তো?”

“হয়ে যাবে। একটু-একটু করে তাকে পথ থেকে সরানোর সব ব্যবস্থা আমি করে নেব।” বলে সে আরও একটা ছবি তার সামনে বের করল।

ওর ভেতর-ঘরের অতিথি জিজ্ঞেস করল, “এই মহিলা পারবে বলে মনে হয়?”

“আপনার খণ্ডাংশের দ্বারা সংক্রামিত এ। প্রতিনিয়ত তার জোগান না পেলে এ পাগল হয়ে যাবে। আমি যা বলব, এই মহিলা তা-ই করতে বাধ্য!”

“বেশ, যা বললে আমি বিশ্বাস করলাম। তোমার এই সিদ্ধান্তের প্রতি আমার ভরসা তৈরি হয়েছে।”

মাথা নীচু করে যেন অভিবাদন জানাল সেই দীর্ঘদেহী, “ধন্যবাদ আপনাকে।”

“তুমি অনেক বার ওই ব্যক্তির পিছু নিয়েছিলে, কিন্তু সে প্রতিবার পালিয়ে বেঁচেছে। আশা করা যায় এবার সে পালাতে পারবে না।”

“যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন।”

“আর আমার অর্ধাংশ?”

“তাকেও আমি আপনার কাছে আনার ব্যবস্থা করব। সব ঠিক থাকলে আমাদের পথের কাঁটাকে আগে উপড়ে ফেলা হবে। তারপর আপনার অর্ধাংশকে আপনার কাছে আনা হবে।”

“তা-ই হোক। সমস্যা নেই কোনো। আমার অর্ধাংশকে না পেলেও ক্ষতি নেই। আমাকে শুধু আমার আদর্শ আধারের কাছে পৌঁছতে হবে।”

“হয়ে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি চিন্তা করবেন না।”

“চিন্তা করি না, হে বালক। চিন্তার অনেক ঊর্ধ্বে আমি বিরাজ করি। বিশ্রাম নাও এখন। রুদ্র যে কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি, সেই কাজ তোমাকে সম্পন্ন করতে হবে। আর আমি জানি তুমি পারবে, কারণ তুমি আদেশ পালন করতে জানো।”

হ্যাঁ, আদেশ পালন করতে জানে অর্জুন। এটাই সে করে এসেছে। রুদ্রর মতো নয় সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *