১৪. নভেম্বর ১৯ বহির্জগতে সময় হয়েছে রাত এগারোটা বত্ৰিশ
লাভায় ভরে উঠেছে চারদিক, যেখানে শুরুতে একটা রাস্তা আর কিছু ঘাসজমি দেখা যাচ্ছিল সেখানে শুধু দেখা যাচ্ছে অবিশ্রান্ত লাভার স্রোত। সেই স্রোতের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসলেন অশ্বত্থামা। এবারে তিনি সফল হয়েছেন। আরও কয়েক পক্ষকাল এই স্রোতকে বজায় রাখতে হবে, তাহলে বাস্তব জগতেও প্রলয় আসবে। অবশেষে এই পৃথিবী নামক কারাগারের হবে অন্ত আর তিনি পাবেন মুক্তি। আর তাঁকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না। যে বাধা দিতে পারত, সেই প্রবুদ্ধ মানবকে তিনি নিক্ষেপ করেছেন সেই লাভার মধ্যে। তার সূক্ষ্মদেহ নিরুপমা নাম্নী বালিকার তেজ সহ্য করতে সক্ষম নয়। কারণ এটা তার নিজের স্থান ছিল না। স্থান-কালের বিচার করা খুব প্রয়োজন এ-সব ক্ষেত্রে। মুহূর্তের মধ্যে মনে হল, তাঁর অর্ধাংশের কী হবে? ভেবে লাভ নেই এখন। কারণ প্রলয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। একবার যখন এই কারাগার ভেঙে যাবে, তখন সবাই মুক্তি পাবে। হ্যাঁ, এই পৃথিবীর সবাই মুক্তি পাবে। ওপরে ওই বায়বীয় গোলকের মধ্যে তখনও ঘুরপাক খেয়ে চলেছে সেই ম্লেচ্ছ নারী! হাসলেন তার দিকে তাকিয়ে। মূর্খ নারী ভেবেছিল ওই প্রবুদ্ধ মানবকে সে কিনা সাহায্য করবে! পিপীলিকা এসেছে পঙ্গপালকে সাহায্য করতে! আপনমনেই হাসলেন অশ্বত্থামা। চিৎকার করে উঠলেন তিনি ঈশ্বরের উদ্দেশে, “যদি ক্ষমতা থাকে, হে পরমেশ্বর, তাহলে আটকাও এই প্রলয়। দেখি কেমন পারো!”
ঠিক সেই সময়ই লাভার চাদরটা যেন একটু-একটু করে ফুলে উঠল। ভুরু কুঁচকে তাকালেন অশ্বত্থামা। কী হচ্ছে এটা? তিনি দেখলেন সেই লাভার মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে এক অস্বাভাবিক আলোড়নের। কিছু একটা যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে সেখান থেকে। পরিস্থিতি ভালো ঠেকল না দ্রোণপুত্রের। তিনি এগিয়ে গেলেন সেই ফুলে ওঠা লাভার চাদরের দিকে। দেখতে না দেখতে সেই লাভার চাদর ভেদ করে উঠে এল এক প্রকাণ্ড মূর্তি। দৈর্ঘ্য প্রস্থ এবং উচ্চতা মিলিয়ে সেই মূর্তির মাপ নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। দেখে মনে হচ্ছে কম করে সেই মূর্তি প্রায় পঞ্চাশ যোজন উঁচু হবে আর প্রস্থ হবে অন্তত ষাট যোজন। অশ্বত্থামা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন এই মহাকায় মূর্তির দিকে। প্রস্তর দিয়ে তৈরি এক ধ্যানীমূর্তি। তার এগারোটি মাথা, সহস্র চোখ, এবং সহস্রাধিক হাত। নিজের অজান্তেই বুক কেঁপে উঠল অশ্বত্থামার। কীভাবে এল এই মূর্তি এখানে? এটি কি নিরুপমার আসল স্বরূপ? না, তা নয়। নিরুপমার আসল স্বরূপ তো এই পরাবাস্তব জগতের ধরিত্রী, যা এখন লাভায় ভরে রয়েছে। তাহলে এ কে? একটু ভালো করে তাকাতেই তাঁর সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেন তিনি। সেই মহাকায় ধ্যানীমূর্তির কেন্দ্রীয় মস্তকের ওপর করজোড়ে বসে রয়েছেন বোধিসত্ত্ব নাগ। তাঁর চোখ শান্ত, ঠোঁটের কোণে এক শান্ত সমাহিত হাসি। রাগে শরীর জ্বলে উঠল অশ্বত্থামার, তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “কী ভেবেছ তুমি? এই ধরনের ইন্দ্রজাল দেখিয়ে তুমি আমাকে ভয়ভীত করে তুলবে? না, আমি ভয় পাই না তোমাকে। পাই না তোমার এই মহাকায় মূর্তিকে ভয়!”
ডক্টর নাগের শান্ত কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল সেই চরাচর জুড়ে, “আমি আপনাকে ভয় পাওয়াতে আসিনি। আমি চাই আপনি সমর্পণ করুন। আমি চাই আপনি আমার সঙ্গে আসুন। আমি চাই আপনি ভালো থাকুন। আমি চাই আপনি শান্তিতে থাকুন। আসুন আমার সঙ্গে, এই প্রলয়ের পথ থেকে আমরা মহাপ্রস্থান করি।”
“আমার সঙ্গে তুমি রসিকতা করছ হে, মূর্খ? আমি তখনই শান্তি লাভ করব যেদিন এই পৃথিবী নামক কারাগার ধ্বংস হবে। তখনই আমার মহাপ্রস্থান হবে, যেদিন প্রলয় আসবে। আর কয়েক পক্ষকাল, তারপর বাস্তব পৃথিবীতে নামবে কালান্তক প্রলয়। সব শেষ হয়ে যাবে। সব শেষ! আর আমার লক্ষ্যের মাঝে আমি কাউকে আসতে দেব না। কাউকে না!” বলে তিনি ইশারা করলেন সেই লাভার দিকে, সেখান থেকে কতগুলো জ্বলন্ত লাভার গোলক ছুটে গেল ডক্টর নাগের দিকে। ডক্টর নাগ চোখ বন্ধ করলেন, আর সেই মহাকায় মূর্তির হাত যেন মশা তাড়ানোর মতো সেই জ্বলন্ত লাভার গোলককে অনায়াসে সরিয়ে দিল। যত চেষ্টাই করলেন না কেন অশ্বত্থামা, তাঁর সব চেষ্টা বিফল হল। নিষ্ফল আক্রোশে তিনি চিৎকার করে উঠলেন। ঠিক সেই সময় তিনি দেখতে পেলেন তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে দুটো হাত। তিনি চাপা পড়লেন সেই মহাকায় ধ্যানীমূর্তির করজোড়ের মধ্যে।
সেদিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে বললেন ডক্টর নাগ, “আমি আপনার জন্য প্রার্থনা করব, দ্রোণপুত্র। আপনার মঙ্গল হোক।” বলে তিনি শূন্যে ভাসমান অবস্থায় বাড়িয়ে দিলেন দুই হাত, দেখতে-দেখতে সেই মহাকায় মূৰ্তি ছোটো হতে হতে অঙ্গুষ্ঠপ্রমাণ হয়ে গেল। আর সেই ক্ষুদ্রাকার মূর্তি ভাসতে ভাসতে এসে মিশে গেল ডক্টর নাগের বুকে। তিনি তখন এগিয়ে গেলেন শবনমের দিকে। অশ্বত্থামা এখান থেকে উধাও হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে শবনমের চারপাশের বায়বীয় গোলকও উধাও হয়েছে, কিন্তু সে এখনও হাঁফাচ্ছে। ডক্টর নাগ তার মাথায় হাত রাখলেন। শবনম বলল, “আপনি ওই মেয়েটিকে সামলান, ডক্টরসাহাব। আমি ঠিক আছি।”
এগিয়ে গেলেন বাতাসে ভাসমান নিরুপমার দিকে। ও এখনও চিৎকার করে চলেছে। ডক্টর নাগ ওর সামনে দাঁড়ালেন, তারপর একটু-একটু করে গাওয়ার চেষ্টা করলেন,
“স্বরূপ তাঁর কে জানে, তিনি অনন্ত মঙ্গল —
অযুত জগৎ মগন সেই মহাসমুদ্রে।
তিনি নিজ অনুপম মহিমামাঝে নিলীন—
সন্ধান তাঁর কে করে, নিষ্ফল বেদ বেদান্ত।
পরব্রহ্ম, পরিপূর্ণ, অতি মহান—
তিনি আদিকারণ, তিনি বর্ণন-অতীত।”
গেয়ে চললেন ডক্টর নাগ। কত যুগ পর তিনি গাইলেন তিনি জানেন না। সেই ছোটোবেলায় মায়ের কাছে শুনেছিলেন রবি ঠাকুরের গান। তারার কাছেও শুনেছিলেন, কিন্তু গাইতেন না কোনোদিন। আজ তিনি গাইছেন, এই সৃষ্টিকে বাঁচাতে তিনি শরণাপন্ন হয়েছেন প্রাণের ঠাকুরের। যদি বিক্রমাদিত্যের কথা সত্যি হয়, তাহলে এতেই কাজ হবে। আস্তে-আস্তে নিরুপমার চিৎকার থেমে গেল, ওর চোখ আবার আগের মতো স্বাভাবিক হল। নিরুপমাকে কোলে তুলে নিলেন ডক্টর নাগ। ওদের কাছে তখন শবনমও চলে এসেছে। সে নিরুপমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আর নিরুপমা অস্ফুটে বলে উঠছে, “মা? তুমি এসেছ?”
শবনমের চোখে বোধহয় বাষ্প জমা হল একটু। ডক্টর নাগেরও কি হয়নি? হয়েছে। না হলেই হয়তো তাঁর নিজের মানবসত্তার ওপর সংশয় সৃষ্টি হত। কিন্তু না, আর সংশয় আসবে না। কারণ ডক্টর নাগ বুঝতে পেরেছেন তিনি কোথায় ভুল ছিলেন। পূর্বে তিনি সমর্পণ করেননি। এখন করেছেন। এখন সব ঠিক হবে। এটা তাঁর বিশ্বাস। আর কে না জানে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর!
