১১. নভেম্বর ১৯ রাত এগারোটা একত্রিশ
বিছানায় নিরুপমা জেগেই ছিল। ও ঘুমোয় না এত সহজে, ঘুম আসে না। ও গান শুনছে, রবি ঠাকুরের গান। ও শুনতে পাচ্ছে এখন, এক সুরেলা কণ্ঠ গেয়ে চলেছে,
“শান্তি করো বরিষন নীরব ধারে, নাথ, চিত্তমাঝে
সুখে দুখে সব কাজে, নির্জনে জনসমাজে।”
মুহূর্তের শান্তি ওর মনে আসছে ঠিকই। কিন্তু এসে চলেও যাচ্ছে। ওর মায়ের হত্যাকারীদের সবাইকে ও মেরে নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে ঠিকই, কিন্তু ওর মনে হয় এখনও যেন ওর মধ্যে একটা শূন্যতা এখনও রয়ে গেছে। রবি ঠাকুরের গান এখনও ওকে স্থির রাখে ঠিকই, কিন্তু সেই অমোঘ শান্তি যেন সে হারিয়ে ফেলছে একটু-একটু করে। আজও নিরুপমা গান শুনছিল, এমন সময় ওর মনে হল এই বাড়ির চৌহদ্দিতে এমন কেউ পা রেখেছে যার উপস্থিতি মোটেও সুবিধেজনক নয়। নিজের পরিধিটা একটু বাড়িয়ে তুলল ও হ্যাঁ, অনেকেই এসেছে, তিনজন জেগে রয়েছে, আর একজন অজ্ঞান অবস্থায় আছে। এদের মধ্যে যে অজ্ঞান অবস্থায় রয়েছে তার মধ্যেই একটা দ্বিতীয় নারকীয় সত্তা বিরাজ করছে। ওর কি এখন মাথা ঘামানো উচিত এটা নিয়ে? না, থাক। কাকু রাগ করবে যদি বেশি চাপ নিয়ে ফেলে ও। এ-ছাড়া অতনুদা, বাহাদুরদা, এরা তো রয়েইছে। ও নিজেকে আবার শান্ত করার চেষ্টা করল। অন্য এক সুরেলা গলায় তখন ভেসে আসছে,
“এ ভাঙা সুখের মাঝে নয়ন-জলে, এ মলিন মালা কে লইবে।
ম্লান আলো ম্লান আশা হৃদয়-তলে, এ চির বিষাদ কে বহিবে।”
ক্ষণিকের জন্য হলেও শান্তি ফিরে এল নিরুপমার কাছে। আহ্! ঠাকুরের গানে সত্যিই এক অদ্ভুত শান্তি আছে। এমন সময় নিরুপমা টের পেল ওর ঘরের দিকে কেউ যেন এগিয়ে আসছে, ও বাহাদুরের মধ্যে দিয়ে দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগেই ভেসে এল একটা কানফাটা বন্দুকের শব্দ। বাহাদুরের চোখ দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য হলেও দেখতে পেয়েছিল নিরুপমা ওই আততায়ীকে। অতনুদার হাতে ধরা এক পিস্তল, তার নল দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। অতনুদা এমনটা কেন করল? কেন? অবিশ্বাস ঘিরে ধরল নিরুপমাকে। ও চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে চাইল অতনুদাকে, “কেন করলে এটা অন্তুদা? বাহাদুরদাকে মারলে কেন? ও কী ক্ষতি করেছিল তোমার?”
চোখের সামনে ফিরে এল সেই পুরোনো স্মৃতি, ওর মায়ের মৃত্যুর স্মৃতি। একটা বোবা রাগ ঘিরে ধরল ওকে, চিৎকার করে উঠল নিরুপমা। আর ঘরে যেন শুরু হল এক ঘূর্ণিঝড়। জিনিসপত্র সব এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। এর মধ্যেও ও টের পেল ওর দিকে কেউ এগিয়ে আসছে, ওর হাতে বিধিয়ে দিচ্ছে একটা ধারালো কিছু। তারপর ওকে কেউ যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও। অনেক অনেক দূরে। কোথায় যাচ্ছে নিরুপমা? ও জানে না। ও আসেনি এখানে কখনও। এতটা গভীরে ও আসেনি। নিরুপমা দেখতে পেল ও এখন বসে আছে একটা ঘাসজমির ওপর। সেখানে বিকেল হয়ে এসেছে, আর বিকেলের আলোয় ও দেখতে পেল সেই ঘাসজমির পাশ দিয়ে চলে গেছে একটা রাস্তা। রাস্তাটা কোথায় গেছে? জানে না নিরুপমা। হেঁটে গেলে কোথায় পৌঁছবে ও? কৌতূহলবশত ও রাস্তার দিকে তাকিয়েছিল যখন, তখনই পেছন থেকে একজন একটা অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে কণ্ঠস্বরে ওকে ডাকল, “কেমন আছ, নিরুপমা?”
পেছন ফিরে তাকাল ও, দেখল এক অদ্ভুতদর্শন মূর্তি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। শরীরে অজস্র ক্ষতচিহ্ন, মুখ বলিরেখায় ভর্তি। শনের মতো চুল কাঁধ বেয়ে নেমে গেছে নীচে, মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল। কপালে অদ্ভুত একটা কাটা দাগ, আর চোখের মধ্যে যেন জমা হয়ে রয়েছে হাজার বছরের জমা বিষণ্ণতা, রাগ এবং ক্ষোভ। সেই অদ্ভুত মূর্তির দিকে তাকিয়ে নিরুপমা বলল, “তুমি কে? এখানে কীভাবে এলে?”
“আমি কে? আমি এক হতভাগ্য যে মুক্ত হতে চায়। কীভাবে এলাম? প্রশ্নটি সহজ কিন্তু উত্তর সহজ নয়। যদি বলি স্থানান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসেছি তাহলে কি বুঝতে পারবে? মনে হয় না। সে-জন্যই বলছি, চিন্তা কোরো না এটা নিয়ে। এটুকুই জেনে রাখো যে আমি এসেছি তোমার ভালোর জন্য।” শীর্ণকায় জরাগ্রস্ত মূর্তি বলে উঠল।
নিরুপমা তাকিয়ে রইল ওর দিকে, তারপর বলে উঠল, “তোমাকে আমি চিনি না। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না। একদম বিশ্বাস করি না। তোমার জন্য বাহাদুরদা মরে গেছে। আমি জানি।”
একটা দমকা হাওয়া যেন সেই জরাগ্রস্ত মূর্তিকে উড়িয়ে নিয়ে গেল প্রায়। সে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিল, তারপর বলল, “তোমার বাহাদুরদা আসলে খুব কষ্টে ছিল, নিরুপমা। তাই তাকে আমি পরলোকে পাঠাতে বাধ্য হয়েছি। সে এখন অনেক ভালো জায়গায় আছে। সে মুক্ত এখন, নিরুপমা এই পৃথিবীর সব যন্ত্রণা থেকে মুক্ত সে।”
“তাই বলে তুমি মারলে কেন তাকে? কেন?” চিৎকার করে উঠল নিরুপমা। ওর চোখে-মুখে ফুটে উঠছে এক গনগনে রাগ, ও হাতটা তুলে ইশারা করল সেই জরাগ্রস্ত মূর্তির দিকে। সেই দমকা হাওয়া ওই জরাগ্রস্ত মূর্তিকে শূন্যে তুলে নিল যেন, তারপর একটু একটু করে তার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পুরোনো কাগজের মতো ছিঁড়ে নিল সেই শরীর থেকে। এক পচা, গলা রক্তমাংসের পিণ্ড হয়ে সে পড়ে রইল সেখানে। নিরুপমা হাত নামিয়ে নিল। সে হাঁফাচ্ছে তখন। কিন্তু একটু-একটু করে বুঝতে পারছে এখানে সে যা চাইবে তা-ই হবে। এখানে তার কথাই শেষ কথা। আর সে ওই লোকটাকে শাস্তি দিয়েছে বাহাদুরদাকে মারার জন্য। উচিত শাস্তি হয়েছে। বেশ হয়েছে।
“শাস্তি? দাও, আরও দাও আমাকে। এই শাস্তি আমি আদি অনন্তকাল ধরে ভোগ করে চলেছি, নিরুপমা। আদি অনন্তকাল ধরে আমি ভোগ করে চলেছি। সেই দ্বাপরযুগ থেকে এই ঘোর কলিযুগেও আমি শাস্তি পেয়ে চলেছি। দাও, আমাকে আরও শাস্তি দাও। যদি এতে তোমার রাগ শান্ত হয় তো তা-ই হোক।”
চমকে মুখ ফিরে তাকাল নিরুপমা, সেই রক্তমাংসের পিণ্ড আস্তে-আস্তে আবার রূপ নিচ্ছে জরাগ্রস্ত মূর্তির। একটা নিষ্ফল আক্রোশে নিরুপমা আবার সেই মূর্তিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিল। কিন্তু সেই খণ্ডাংশগুলো পুনরায় জুড়ে গিয়ে আবার পরিণত হল সেই জরাগ্রস্ত মূর্তিতে। সে বলে উঠল আবার, “আমার মৃত্যু নেই, নিরুপমা, আমি অমর! আমি অমরত্বের অভিশাপে অভিশপ্ত। এভাবে তুমি আমাকে শাস্তি দিতে পারবে না। যদি আমাকে শাস্তি দিতেই হয় তাহলে এর একটাই উপায় রয়েছে।”
নিরুপমা একটু অবিশ্বাসের চোখে তাকাল তার দিকে, “কী উপায়?”
জরাগ্রস্ত মুখে একটা কুটিল হাসি ফুটে উঠল, “প্রলয়। এটাই একমাত্র উপায়।”
বলে সে চারপাশে ইঙ্গিত করল, “তোমার মনের ভেতর-ঘরে, তুমি যদি চাও, এই পৃথিবীর যন্ত্রণা চাক্ষুষ করতে পারবে, নিরুপমা। দেখবে তোমার বাহাদুরদার মতো অনেকে এরকম কষ্টে আছে। তুমি দেখতে পারবে, নিরুপমা, এই পৃথিবী নিজেই কষ্টে রয়েছে অনেক। দেখতে চাও তুমি? একটু চোখ মেলে দেখো, তুমি দেখতে পাবে।”
বলে সে হাত তুলে ইঙ্গিত করল সেই রাস্তার দিকে। নিরুপমা কোনোরকমে চেষ্টা করল উঠে দাঁড়ানোর। একবার উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বেশ কয়েকবার পড়ে গেল সে। দাঁতে দাঁত চেপে ও নিজেকে বলল, “আমি যা চাইব, তা-ই হবে! আমাকে উঠে দাঁড়াতে হবে।”
একসময় ঠিক উঠে দাঁড়াল নিরুপমা। একটু হলেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিল, ধীরে-ধীরে নিজেকে সামলে নিল ও। বাস্তব দুনিয়াতে এটা অসম্ভব, কিন্তু যেখানে নিরুপমা আছে সেখানে এই অসম্ভবও সম্ভব হয়েছে। বিকুকাকু বলেছিল একবার মনের ভেতর ঘরের কথা। এটাই তাহলে সেই জায়গা! একটু- একটু করে ও এগিয়ে গেল সেই রাস্তার পাশে, আর দেখতে পেল অসংখ্য টুকরো-টুকরো দৃশ্য— যুদ্ধ, নরসংহার, দুর্ভিক্ষ, মড়ক, মৃত্যু— সব চোখের সামনে ভেসে উঠল নিরুপমার। এরই মাঝে ও দেখতে পেল ওর মায়ের মৃত্যুর দৃশ্য, ওর দাদার মৃত্যুর দৃশ্য, কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া বাহাদুরের মৃত্যুর দৃশ্য। না, ও সহ্য করতে পারল না। এই যন্ত্রণা ও সহ্য করতে পারল না আর। নিরুপমা পাগলের মতো হয়ে গেল যেন। ওর মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত আছড়ে পড়ল সেই রাস্তায়, আর কেঁপে উঠল চারিদিক। পাগলের মতো রাস্তায় দুই হাত দিয়ে আঘাত করতে থাকল নিরুপমা, আর দেখতে না দেখতে রাস্তায় দেখা দিল এক ফাটল। প্রতিটি আঘাতের ফলে সেই ফাটল বড়ো হতে লাগল, আর সেই জরাগ্রস্ত মূর্তির মুখে ফুটে উঠল এক নারকীয় হাসি। সে স্বগতোক্তি করে চলেছে, “আরও একটু, নিরুপমা, আরও একটু। তাহলেই আমার উদ্দেশ্য সফল হবে। তোমার নিজের অন্তঃস্থলের পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে বহির্জগতেও আসবে প্রলয়।”
হঠাৎ নিরুপমা ভেসে উঠল বাতাসে, ওর সাদা রঙের গাউন পরা শীর্ণকায় শরীরটা নেমে এল সেই ফাটলের ওপর। আর ওর পায়ের আঘাতে সেই ফাটল এবার ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে, আর সেই ফাটল থেকে বেরিয়ে এল তপ্ত লাভার স্রোত। এবার অট্টহাস্য করে উঠল সেই জরাগ্রস্ত মূর্তি। সে চিৎকার করে বলল, “দাও, নিরুপমা, আমাকে শাস্তি দাও! আসুক প্রলয় এই পৃথিবীতে! মুক্তি দাও, এই অভিশপ্ত দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামাকে মুক্তি পাবে এবার!”
