১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৭৭. ১৬ আগস্টের জুয়ো: কে কার পার্টনার?

১৭৭. ১৬ আগস্টের জুয়ো: কে কার পার্টনার? 

বাঙালিদের হিন্দুবড়াইয়ের জায়গাটা স্বাধীনতার পূর্ব মুহূর্ত থেকে কুয়াশামাখা হয়ে উঠেছিল। তখন তো সকলে জেনে গেছে দেশভাগ হবে। এমন আহাম্মক কেউ ছিল যে ধরে নেবে— দেশভাগ বা পার্টিশন হচ্ছে বটে কিন্তু পাঞ্জাব আর বাংলা ভাগ হবে না? কংগ্রেস নেতারা ৪৫-সালে জেল থেকে বেরিয়েই যে একটা হাওয়া তুললেন, তার প্রধান বিষয় ছিল—একটা চরমসীমার ভাব। যা, পার্টিশনই হোক। এই নতুন ভাব দেশে রটনা হওয়ার সঙ্গে আরো একটা হাওয়া লোকের মুখে-মুখে উঠল—–পাকিস্তান যদি হয়ও, টিকবে ক-দিন? 

এমনই একটা হিন্দুয়ানির মধ্যে কংগ্রেস আর মুসলিম লিগ কানামাছি খেলতে শুরু করে। সিমলা ব্যথ ঘোষণার পর (১২ মে, ৪৬), জুন থেকে শুরু হল এই খেলা। একবার লিগ বলে ‘হ্যাঁ।’ তখন কংগ্রেস বলে, ‘না।’ তখন লিগ বলে ‘না।’ তখন কংগ্রেস বলে, ‘হ্যাঁ।’ তখন লিগও বলে বসে ‘না’। ‘না’ তো বটেই—১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। গত বছর থেকে লিগের কোনো দাবির প্রতি কোনো সুবিচার হয়নি। তোমরা যখন দিচ্ছ না—শাহেব-কংগ্রেসরা যখন দিচ্ছ ই না, আমাদের মত করে আমরা আন্দোলন করব। যুদ্ধের মধ্যেও ব্রিটিশ কর্তাদের পক্ষপাতিত্ব ছিল লিগের দিকে। যুদ্ধের শেষে সে পক্ষপাত আর নেই। তখন ১৯৪৬-এ, ব্রিটিশ কর্তারা ভারত থেকে সরে যেতে চান শুধু, জিন্নার পাকিস্তান প্রস্তাব তখন ব্রিটিশদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা। ক্যাবিনেট মিশনের পক্ষপাত জিন্নার দিকে ছিল না। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ছিল সেই অধিকার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। 

এ-কথা আজ আর পরীক্ষা করা সম্ভব না যে ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বলতে কী বুঝিয়েছিলেন, জিন্না বম্বেতে? হ্যাঁ, এটা বলেননি—হিন্দু মারো। এর আগেই অবিশ্যি বলেছিলেন, ২৩ জুন : গৃহযুদ্ধ আসন্ন। যে যাকেই মারুক, গৃহযুদ্ধের কথা কিন্তু জিন্নাই বলে যাচ্ছিলেন। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার অঘোষিত জোটের অঘোষিত নেতা শ্যামাপ্রসাদও বলেছেন কিন্তু বোঝা যায় যে তিনি ভয় দেখাচ্ছিলেন, যুক্তি বলছিলেন না। জিন্নার ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রামের’ ডাক, গান্ধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ ডাকের তুলনীয় ছিল না—উত্তাপে না, সংগঠন না, পরিকল্পনায় নয়, প্রচারে নয়, প্রস্তুতিতে নয়। কিন্তু ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’-এর ভাষা ও ভঙ্গি গান্ধীজির অনুকরণে তৈরি, ‘ভারত ছাড়ো’র ছাঁচে তৈরি। জিন্না নিজেই জানতেন না—সেদিন কী ঘটবে। তাঁর অক্ষমতা তাঁকে দায় থেকে অব্যাহতি দেয়নি। ‘ভারত ছাড়ো’র প্রস্তাবকে গান্ধীজি একবার জুয়ো খেলা বলেছিলেন। বছর চার, পর গান্ধীর জুয়োর পাল্টা দান দিলেন জিন্না। ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ বলে। জিন্না গান্ধীজির বিরুদ্ধে বলেছিলেন কি? নাকি, বলেছিলেন—ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে? 

সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিন্না খুব বেশি কথা বলেননি। তাঁর রাজনীতির জীবন থেকে আবার উল্টোটাও বলা যায়—তিনি কখনোই সাম্রাজ্যের মুৎসুদ্দি ছিলেন না। ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডাকা হয়েছিল ব্রিটিশ পক্ষপাতিত্বের লক্ষ-বদলের বিরুদ্ধে, কংগ্রেসের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের নতুন ঘনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে ও ‘পাকিস্তান’-নামকরণটি স্বীকারে। বেশ, আমরা যদিও বলিনি, শত্রুরাই যদিও পাকিস্তান আওয়াজটি তুলেছে, তবু আমরা মেনে নিচ্ছি ঐ নাম, আমরা আদায় নেব ঐ নাম। আদায় করে নেব। 

১৬ আগস্টে কলকাতায় যে ঐ রকম দাঙ্গা লাগবে তা প্রায় কোনো উচ্চপর্যায়ের লিগনেতাই জানতেন না। সারা ভারতে এই আহ্বান ছড়ানো হলেও কোথাও তো আর দাঙ্গা হয়নি, এমন কী, কলকাতার কাছাকাছিও হয়নি। ১৬ আগস্ট কলকাতার দাঙ্গা লিগের কোনো কেন্দ্ৰীয় পরিকল্পনা নয়। দেশব্যাপী আন্দোলনের সুযোগ নিয়েছেন কলকাতার কিছু হিন্দুপক্ষীয় ও মুসলমান পক্ষীয় স্থানীয় নেতারা ও তাঁদের প্রশ্রয়ে গুণ্ডাবহিনী। 

১৬ আগস্ট ময়দানের সমাবেশে সারওয়ারদি বক্তৃতা করেন ও নাকি তিনি বলেন, পুলিশকে তিনি বলে দিয়েছেন। তা থেকে মুসলমানরা উৎসাহিত হন নাকি! এই কথার কোনো প্রমাণ নেই, ছাপা কাগজ ছাড়া। সারওয়ারদি বাংলা বলতে পারতেন না। তাঁর উর্দু বক্তৃতার কোনো বাংলা অনুবাদ করা হয়নি। তিনি পরদিন স্কুল-কলেজ ছুটি দেন। 

১৬ আগস্ট ময়দানের সমাবেশে যোগেন মণ্ডল তাঁর সমর্থন জানান। 

১৬ আগস্ট ময়দানের সমাবেশকে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন জানায়—শ্রমিকশ্রেণীর একটি বড় অংশ মুসলমান ও পাকিস্তানের পক্ষে এই জাগরণ, একদিক থেকে গরিব মুসলমানের আত্মনিয়ন্ত্রণের জাগরণ—এই যুক্তিতে। 

১৬ আগস্ট বাংলার লিগের সম্পাদক আবুল হাশেম ময়দানে গিয়েছিলেন আরো অনেক বন্ধুর সঙ্গে, তাঁর নাতিদেরও হাত ধরে। যদি দাঙ্গা হাঙ্গামার সামান্য ভয়ও থাকত, তিনি কি নাতিদের নিয়ে যেতেন? 

মীজানুর রহমান শাহেব ১৬ আগস্ট নিয়ে ছোট একটা গোটা বই লিখেছেন, ‘কৃষ্ণ ষোলই।’ তাতে তিনি বলেছিলেন, ময়দানে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল না। কিন্তু মানিকতলার মোড় থেকেই তিনি দেখছিলেন, আর-একটু উত্তরে উল্টোডিঙি থেকে একদল লোক বাস-ট্রাক থেকে নামছে ও নেমেই লুটপাট শুরু করেছে। ওয়েস্ট ক্যানাল ও ইস্ট ক্যানাল রোড জোড়া লাগিয়ে কাঠের একটা সাঁকো ছিল। সেটার ওপর দিয়ে ছোটাছুটি বালক মীজানুর দেখেছিলেন। 

আরো এমন কিছু সাক্ষ্য থেকে এটা জানা যায় যে ১৬ আগস্ট ময়দানের সমাবেশ যখন চলছে, তখনই উত্তর ও মধ্য কলকাতায় দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। দাঙ্গার সরাসরি অভিজ্ঞতা যাঁদের ছিল, তাঁদের কথাগুলি মেলালে দেখা যায় ১৬ আগস্টের এই দাঙ্গায় পাড়া-প্রতিবেশীরা সমবেতভাবে অপ্রস্তুত ও আতঙ্ক বোধ করেন ও সবাই মিলে বাঁচার চেষ্টা করেন। 

পুলিশ না থাকায় সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় আগুন লাগাবার ঘটনা। 

১৭ আগস্ট, আশা ছিল, সব ঠিক হয়ে যাবে। বেলা একটু বাড়তে বোঝা গেল, দাঙ্গা নতুন মোড় নিয়েছে। আগে, কোনোদিন কোনো দাঙ্গা এতটা ছড়িয়ে পড়েনি। ১৭ তারিখ থেকে অচেনা মানুষজন সশস্ত্র হয়ে রাস্তায় নেমেছে। নির্দিষ্ট লক্ষের দিকে এগচ্ছে। কাজ শেষ করে বেরিয়ে পড়ছে। দুপুরের পর থেকে মুসলমানপ্রধান অঞ্চল থেকে হিন্দুরা ও হিন্দুপ্রধান অঞ্চল থেকে মুসলমানরা নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে শুরু করে। ফলে গুজব আরো ছড়ায়। কোনো পুলিশ ছিল না। সন্ধ্যার পর থেকে আগুন লাগানো শুরু হয়। 

লুটপাট হয়নি। মেয়েদের ওপর অত্যাচার খুব একটা ঘটেনি। শুধু হত্যা আর মৃত্যু আর হত্যা। ১৬ তারিখে রাস্তার পড়ে থাকা মৃতদেহগুলি সরানো হয়নি, পচতে শুরু করেছে আর বাতাসে পচা, ভ্যাপসা, বাসি মৃত্যুর গন্ধে দম আটকে আসে। 

১৭ তারিখ সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে যায়—দলবেঁধে সশস্ত্র বেরনো। মুখোমুখি লড়াই। দলগুলির খুব লক্ষ ছিল না কোনো। ১৭ তারিখ থেকে সারওয়ারদি পুলিশ কনট্রোল রুমে। ফলে, কমিশনার কোনো কাজ করতে পারলেন না। কোনো পুলিশ নেই। ১৮ তারিখ সন্ধ্যা থেকে গুর্খা বাহিনীর ভাঙাচোরা কিছু সোলজারকে দেখানো হল। ১৯ তারিখে দাঙ্গা থামেনি। 

কলকাতার দাঙ্গা, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিঙে যে লক্ষ-লক্ষ মানুষ মারা গেছেন তাঁরা বেশির ভাগই গরিব থেকে গরিবতর। কোনো পাড়ার কোনো বাড়ির কোনো কর্তাব্যক্তি খুন হন নি, এঁদের কোনো মহিলার কোনো অমর্যাদা ঘটেনি। কলকাতার মত শহরে যাঁদের বেঁচে থাকার জায়গা ছিল না, সুতরাং তাঁদের মেরে ফেলায় কোনো বাধা ছিল না। ও তাদের ধর্মীয় কোনো পরীক্ষাও করা হয় নি। 

যেন একটা পর্যায়ক্রম আছে। 

১৬ আগস্ট পাড়া বাঁচিয়েছেন পাড়ার লোক—হিন্দু-মুসলমান মিলে। দাঙ্গা সম্পর্কে ধারণা ও এতটা আগুন লাগা আকাশ থেকে, ভয় ছড়াল। 

১৭ আগস্ট দুপুর থেকে ধর্মানুযায়ী নিরাপদস্থানে চলে যাওয়া। তখনো পাড়ার লোকই পাড়া বাঁচাচ্ছে, যারা নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে চাইছে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে। নিরাপদ মনে করে এই পাড়ায় যারা আসছে, তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ছোট একটা পরিবারে বড় একটা পরিবার যদি এসে ওঠে, কোনো বড় বাড়ির বাড়তি ঘর তাদের দেয়া হচ্ছে। 

১৭ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে পাড়ার ছেলেরাও বেরতে শুরু করে। আগুন আর অচেনা থাকে না। দাঙ্গার দলও অচেনা নয়। মুখোমুখি যুদ্ধ শুরু হয়। কী ভাবে শেষ হয়, কেউ জানে না। 

১৮ ও ১৯ দিনরাত এমনই চলে। 

১৯ তারিখ গোধুলিতে পুরো শহরের স-বটা, স-বটা শহর, অচেনা হয়ে যায়। শহরের মানুষ অচেনা। মড়া ও বিষবাতাস থেকে শ্বাস টানে। নিজের ফুসফুস নিজের অচেনা। 

মৃত্যু নয়, নরকের পরের শহর। 

যে-মৃত্যু আমার কাছে স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে না, সে-মৃত্যু যেন ভুলে যেতে চাই, ভুলে থাকতে চাই, ভুলে যাওয়া অভ্যাস করি, শেষে একদিন আর মনে পড়ে না—কবে যেন এমন একটা মৃত্যু ঘটেছিল, আমার বেঁচে থাকা যেখানে প্রত্যাশিত ছিল না। কোনো মৃত মানুষ যেমন জীবিত সমাজের সম্পর্কহীন, তেমনি কোনো জীবিত মানুষ মৃত সমাজের অনাবাসী। ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ কলকাতায়, একটি কলোনিদেশের শাসনক্ষমতা নিয়ে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায় জীবিত ও মৃতের সমাজ তৈরি করেছিল। কেউ কেউ বলেন এটা একটা নতুন পদ্ধতি—এই পদ্ধতিতে নোয়াখালি, বিহার, গড়মুক্তেশ্বর, পাঞ্জাব, কেউ কেউ বলেন। এই পদ্ধতির ভিতর শৃঙ্খলা আছে। কেউ কেউ বলেন, এই শৃঙ্খলাতেই ‘দেশভাগ’ পর্যন্ত পৌঁছে যায় তারা, যারা জীবিত ও মৃতের সমাজের দ্বন্দ্বকে রাজনীতির এক আপতিক সমস্যার বিশল্যকরণী হিশেবে ব্যবহার করে। 

ঘটনার একটা পরম্পরা সাজিয়ে ইতিহাসের কালানুক্রম তৈরি করা যায়। তেমন এক পরম্পরায় সাজিয়ে বলা হয়েছে, ‘দুটো ঘটনা, কলকাতার হত্যা (১৬ আগস্ট, ১৯৪৬) ও পণ্ডিত নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভা (অন্তর্বর্তী সরকার, সেপ্টেম্বর ১৯৪৬) শুরু করে দিল ১৬ মাসের এক গৃহযুদ্ধ। এই গৃহযুদ্ধে মারা গেল আনুমানিক ৫০০,০০০ মানুষ। ছ-বছর ধরে (১৯৩৯-১৯৪৬) যে মহাযুদ্ধ চলল তাতে সমগ্র ব্রিটিশ কমনওয়েলথের মৃত্যুর সংখ্যার প্রায় সমান’ (আয়ান স্টিফেন্স, পাকিস্তান ১৯৬৩, পৃ. ১০৭)। 

এ সব তুলনায় গোলমাল থাকে। ভারতের লোকসংখ্যা ব্রিটিশ কমনওয়েলথের মোট লোকসংখ্যার (ভারত বাদে) চাইতে বেশি। সেই কারণেই এমন নির্বাচিত পরিসংখ্যন যতটা চমকে দেয়, ততটা সত্য নয়। 

এটা সত্য নয় যে জেল থেকে বেরিয়েই কংগ্রেস নেতারা যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তাতেই প্রথম বোঝা গিয়েছিল, কংগ্রেস দেশভাগের সম্ভাবনা স্বীকার করল। তারপরই শুরু হল দুই বা তিন সম্প্রদায়ের দাঙ্গা—যতক্ষণ না দুটো আলাদা দেশ বা রাষ্ট্র আলাদা পতাকা, সেনাবাহিনী সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হল। মানে, জেল থেকে ছাড়া পেয়েই কংগ্রেস-নেতারা বুঝলেন, পার্টিশন হবেই। কংগ্রেস পার্টিশনে রাজি হয়ে গেছে রটানো মাত্রই গ্রাম পর্যন্ত দাঙ্গা শুরু হল, সেই জায়গাটিকে নিজেদের সুবিধে মত ‘স্তানে’ রাখতে। 

সত্য এইটুকুমাত্র নয় 

ভারতের প্রদেশগুলিকে তিনটি আলাদা গুচ্ছে ভাগ করার ও সেই ভাগের ভিত্তিতে যুদ্ধের পর ডোমিনিয়ান স্ট্যাটাস নিয়ে কথা বলার ক্রিপস প্রস্তাব বাতিল হল তামাদি হুন্ডি বলে। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে প্রদেশগুলিকে তিনটি গুচ্ছে যে সাজানো হয়েছিল, সেটা থেকেই গেল। ক্যাবিনেট মিশন সেই গুচ্ছভাগের ম্যাপ বহাল রাখলেন। ক্যাবিনেট মিশন ফিরে যাওয়ার পর ওয়াভেল ‘ইনটেরিম গবর্নমেন্ট’ শব্দটি ব্যবহার করলেন ভাইসরয়ের একজিকিউটিভ কাউন্সিলের বদলে। ১৪ জন সদস্য হবেন। লিগের জন্য দুটি আসন খালি রেখে ১২ জনকে নিয়ে ‘ইনটারিম গভর্নমেন্ট’ বা অন্তর্বর্তী সরকার হল। ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের মেম্বারদের ‘মন্ত্রী’ বলা হত না। কিন্তু তাঁদের দপ্তর ছিল—মেম্বার-ফাইন্যান্স, মেম্বার-হোম, মেম্বার-রেইলওয়েজ ইত্যাদি। অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের ‘মন্ত্রী’ বলা হল—জওহরলাল—প্রধানমন্ত্রী, বল্লভভাই প্যাটেল—স্বরাষ্টমন্ত্রী, বলদেব সিং—প্রতিরক্ষা মন্ত্রী; এইভাবেই রাজেন্দ্রপ্রসাদ, রাজাগোপালাচারি, শরৎ বোস, জগজীবনরাম, অরুণা আসফ আলি, সফফৎ আমেদ খাঁ, সৈয়দ আলি জাহির, সি এইচ ভাবা, জনমাথাই। 

যোগেন মণ্ডল এমন বিশিষ্ট কোনো নেতা নয় যে অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো একটা টুকরো জায়গাতেও তার কোনো জায়গা তৈরি করা যায়। ১৯৩৫-এর প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন আইনে সম্প্রদায় ধরে তপশিলিদের জন্য কয়েকটি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। ফলে, ব্রিটিশ ভারতের ১১টি প্রদেশেই কোটা-অনুযায়ী কিছু তপশিলি মেম্বার ছিল। তার বেশি কিছু যোগেন ছিল না। আর, যোগেনের মত এমন মেম্বার সারা ভারতে দু-বারের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ভোটে, একবার ১৯৩৭-এ, আর-একবার ১৯৪৬-এ, আরো অন্তত পাঁচ-শ তপশিলি মেম্বার জিতেছিলেন। যোগেন তাদের একজন মাত্র, একতমজন নয়। 

১৯৩৭-এর ভোটে একটা বিষয়ে যোগেন সারা ভারতে ছিল অদ্বিতীয়। সে সাধারণ আসনে দাঁড়িয়ে জিতেছিল। সাধারণ আসনের ভোটার ছিল সকলেই, কিন্তু প্রধানত নানা ধরণের হিন্দু। ভারতের ১১টি প্রদেশের আইনসভার হাজারটি সাধারণ আসনে কোনো তপশিলি প্রার্থীকে কোনো হিন্দু ভোট দেয়নি। একজন প্রার্থীকেও না। যোগেন সেই অদ্বিতীয় একা। অথচ আমরণ অনশনে গান্ধীজি মৃতপ্রায় হয়েছিলেন—তপশিলি হিন্দুদের আলাদা ভোট নাকচের দাবিতে। গান্ধীজি বলেছিলেন, হিন্দুদের ভাঙতে দেব না। গান্ধীজি এটা হিশেব কষে দেখেছিলেন ভারতের হিন্দুজনসংখ্যা থেকে তপশিলিদের আলাদা ভোট করলে, উঁচু হিন্দুরা জিততেই পারবে না। 

যোগেনের আর-একটা অদ্বিতীয় আছে। ১৯৪৬-এর প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের দ্বিতীয় ভোটের আগে সারা ভারতে তপশিলিদের একটিমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি হচ্ছিল মহারাষ্ট্রের দলিত-নেতা আম্বেদকরকে নেতা মেনে—’ভারতীয় তপশিলি জাতি ফেডারেশন।’ এই ফেডারেশন তপশিল আসনগুলিতে প্রার্থী দিয়েছিল। তারা কেউই জিততে পারেনি। এক যোগেন্দ্র ছাড়া। 

যোগেনের আরো একটি অদ্বিতীয় আছে। ‘সংবিধান রচনা পরিষদ’-এর সদস্য-নির্বাচনে আম্বেদকর হেরে যান, বম্বে থেকে। যোগেন তাঁকে ডেকে এনে বাংলা থেকে জিতিয়ে দেন। নইলে আম্বেদকর সংবিধান পরিষদে ঢুকতেই পারতেন না। বল্লভভাই প্রকাশ্যে বলে দিয়েছিলেন, আম্বেদকার যাতে গণপরিষদে কোনো ভাবেই ঢুকতে না পারেন, কংগ্রেস যে-ব্যবস্থা করে রেখেছে। সেই ব্যবস্থা হচ্ছে কংগ্রেসের শিডিউল কাস্ট এক এম.এল.একে রংপুরে নিয়ে গিয়ে গোপন জায়গায় আটকে রেখেছিল আম্বেদকর-বিরোধী কংগ্রেস। যোগেন তাঁর তরুণ সমর্থকদের সাহায্যে সেই এম.এল.একে উদ্ধার করেন। আম্বেদকর বেশ ভাল ভোটে জেতেন। 

যোগেন মণ্ডল প্রথম মন্ত্রী হয়েছিল ১৯৪৩-এর ২৪ এপ্রিল শনিবার নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায়। শুধু যোগেন নয়, পুলিনবিহারী মল্লিক ও প্রেমহরি বর্মণও। কেবল তাই নয় এই মন্ত্রিসভার ডেপুটি লিডার হয়েছিলেন মুকুন্দবিহারী মল্লিক। পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি হয়েছিলেন তিন তপশিলি মেম্বার রায়শাহেব অনুকূলচন্দ্র দাস, রায়বাহাদুর বঙ্কবিহারী মণ্ডল আর রসিকলাল বিশ্বাস। এর আগে কোনো মন্ত্রিসভায় তপশিল দলের মেম্বারদের এতটা জায়গা দেয়া হয়নি—তিনজন মন্ত্রী, হাউসের ডেপুটি লিডার ও তিনজন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি। এর মধ্যে নমশূদ্র ছিল চারজন।

এমনটা ঘটল কী করে? 

খুব মাপজোখ করে দেখলে হয়ত বলা যায়, তপশিলি আন্দোলনের লক্ষবিন্দু বদলে গেল বলে। কেন বদলাল যদি খোঁজ করতে হয়, তাহলে, সেই বদলের একটা পার্শ্বকারণ হিশেবে যোগেনের রাজনৈতিক ধরণের আঁচ নিতে হয়। 

এক যোগেনই নিজের তপশিলি পরিচয় ভাঙিয়ে অন্য কোনো বড় পার্টির লেজ হতে যায়নি। চায়ও নি। 

এক যোগেনই ছিল নিজের তপশিলি পরিচয়ে ও নমশূদ্র পরিচয়ে সম্পূর্ণ এক নেতা, আইনসভায় সম্মানিত ও বিভিন্ন রকম সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। 

শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা যখন তৈরি হয় তখন তপশিলি মন্ত্রী নেয়া হয় একজন। আর-একজন মন্ত্রী নেয়া হবে কথা ছিল, আইনসভায় কথা তোলা হয়েছিল, হকশাহেব বরাবরই রাজি ছিলেন, কোনো সময়েই নেননি। তিনি যে নেবেন না সেটা বুঝে ফেলে তপশিলি মেম্বাররা, বিশেষ করে নমশূদ্ররা, নিজেদের এক জোট করতে চাইল। যোগেন সেই ৩৭ সালের ভোটের পর থেকেই বলে আসছে দুটি কথা। সুভাষচন্দ্রের সঙ্গেও তার এ নিয়ে কথা হয়েছিল। একটি কথা—তপশিলিদের রাজনৈতিক পরিচয় তপশিলি। অন্য পার্টিতে কী আন্দোলনেও তপশিলরা থাকতে পারে, যেমন মজুর আন্দোলনে, কৃষক আন্দোলনে। কিন্তু তাদের রাজনীতির পরিচয় তপশিলি হিশেবেই। যোগেন ‘শূদ্র’ কথাটাই বলে বেশি। ‘শুদ্দুর’ও বলে। ‘চাঁড়াল’ বলেও নিজের পরিচয় দেয়। এমন একটা আত্মপরিচয়কে এতটা প্রাধান্য দেয়ার মধ্যে একটা অস্বীকার অঘোষিত ছিল—নমশূদ্র বা রাজবংশী ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর শাবেক নেতৃত্বকে অমান্য করা। হয় বামুনদের মত গুরুগিরি করে, পৈতে পড়ে, মন্ত্র দিয়ে তারা গুরু হওয়ার সূত্রে নেতা হত। না-হয় পূর্বপুরুষের বড় জমিদারি বা রাজাগিরির সুবাদে অনগ্রসরদের নেতা হত। 

এই দুই ধরণের নেতার প্রথম ধরণের উদাহরণ, ঠাকুররা। আর দ্বিতীয় ধরণের উদাহরণ প্রসন্নদেব রায়কত। এ-ছাড়াও মল্লিকদের মত শিক্ষিত পরিবার ছিল। তাঁরাও নেতা হতে চাইতেন। চাইতেন শুধু না–নেতৃত্বে তাঁদের যেন স্বাভাবিক অধিকার আর শূদ্র পরিচয়টা সেই অধিকারের প্রমাণ মাত্র। এঁদের ও বাইরে যাঁরা শিক্ষিত, আধুনিক, বড় সমাজের নেতা—বিরাট মণ্ডল, রসিকলাল বিশ্বাস, মোহিনী ডাক্তার তাঁরা কখনোই শুধু শূদ্রদের নেতা হতে চাইতেন না। যোগেন এমন একটা বোঝাবুঝি থেকেই বলত, আগে তপশিলরা তপশিলি হোক তারপর ভাগে যাক। 

যোগেনের রাজনীতির দ্বিতীয় সূত্রটাও ছিল প্রথমটির মতই স্পষ্ট ও শাদাসিধে। শূদ্ররা শূদ্র। তারা হিন্দু হওয়ার ফলে শূদ্র নয়। কোনো রকম হিন্দুগিরির ছোঁয়া শূদ্রকে রক্ষা করে না। গান্ধীজিরও না। হিন্দু মিশনেরও না। মন্দিরে ঢোকার আইন পাশ করে বা শুদ্ধি করে শূদ্রের শূদ্র-থাকাটাকে শুধু অস্থির করা যায়। শূদ্রের স্বাভাবিক আত্মীয়তা মুসলমানদের সঙ্গে। শূদ্র ও মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট, আয়-ব্যয়, চাষ-আবাদ, মাছ ধরা, নৌকা চালানো, সুখ-অসুখ, চেঁচামেচি, ডাকাডাকি অসুখ-বিসুখ, টোটকা-টুটকি—সবই একরকম। তাহলে, কোথাও হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাধলেই শূদ্ররা গিয়ে, বামুন-কায়েত হিন্দুদের লেঠেল হবে কেন? হিন্দুরা যে থেকে-থেকেই শূদ্রদের ‘আয় ভাই, বুকে আয়’ বলে ডাকে তার হিশেব আছে। রায়টের সময় বাঁচাস। আর, মুসলিম আর তপশিলি এক হলে উচ্চবর্ণের হিন্দুর সংখ্যা তো নামবে : একহাটে দেড়জন। 

১৯৪১-এর ডিসেম্বর থেকে ৪৩-এর মার্চ পর্যন্ত ষোলমাস স্থায়ী শ্যামা-হক মন্ত্রিসভায় জাগা না পাওয়ায় সব রকম তপশিলিরা ২৩ মার্চ একটা মিটিঙে বসে যোগেনের প্রথম কথাটা মেনে নেয়। ভবিষ্যতে তপশিলি মেম্বাররা তপশিলি জোট হিশেবে সমস্ত কথাবার্তা যুদ্ধবিগ্রহ সমর্থন-অসমর্থন করবে। আর, দ্বিতীয় কথাটা নিয়ে কোনো কথা হয় না—তপশিলিরা হিন্দু না।—যখন হবে, দেখা যাবে। নাজিমুদ্দিনের হঠাৎ এমএল এ সংখ্যা কম পড়ে গেল। বরাবরই ইয়োরোপিয়ান ব্লকের ২৩টি ভোট কংগ্রেস-বিরোধীদের বাঁচিয়ে এসেছে। হকশাহেবের পক্ষে শাহেবদের ভোটই সরকার বাঁচিয়েছে এক সময়। কিন্তু সেই ইয়োরোপিয়ান ব্লকের সঙ্গে গভর্নর ও তাঁর অফিসারদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হল। তার নানা রকম কারণই ছিল। প্রধান কারণ ছিল—ইয়োরোপিয়ান সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক-অধ্যাপক, ধর্মপ্রচারের লোকজন, ছাত্রছাত্রীরা যুদ্ধের জন্য যাকে নাগরিক অধিকার বলে, তেমন অধিকার দমন মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরা চান আইনসভার মেম্বার হিশেবে স্বাধীনতা। আর্থার মুর ছিলেন এর নেতা। ‘স্টেটসম্যান’ কাগজ ছিল এদের সমর্থক। কলকাতার ‘স্টেটসম্যান’ ৪৩-এর ৬ জানুয়ারির প্রেস ধর্মঘটেও যোগ দিতে যাচ্ছিল— সেনশরশিপের বিরুদ্ধে। শেষে গভর্নর হেবার্ট তাদের ডেকে পাঠিয়ে নিষেধ করেন। ইয়োরোপিয়ান ব্লকের এই সমর্থন সম্পর্কে নাজিমুদ্দিন অনিশ্চিত ছিলেন। সুতরাং তিনি তপশিলি মেম্বারদের ২১ জনের জোটের সমর্থনের বিনিময়ে তাদের সমস্ত দাবি মেনে নিলেন। 

কিন্তু সময়টা বড় তাড়াতাড়ি বদলে যাচ্ছিল। সমস্ত রকম চেনার বাইরে। যুদ্ধ যতক্ষণ চলছিল উত্তর আফ্রিকায় আর পশ্চিম আটলান্টিকে, ততদিন বেশ আরামের তাপ লাগছিল। জাপান যুদ্ধে নেমে ১০০ দিনের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে সমুদ্রপথের আক্রমণে বিধ্বস্ত করে ডিমাপুর-আসামের কাছে চলে এসেছে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটা অংশে জাপানী সেনাবাহিনীর কথাতে বেশ বড় একটা অঞ্চল স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, বেশির ভাগই মুসলমান। বাংলার উপকূল ও নদীতীরবর্তী তিরিশ মাইলের মধ্যে কোনো মানুষ, জীবজন্তু, ধানচাল, নৌকোডিঙি, ঘরবাড়ি থাকতে দেয়া হয়নি, যে-চাল ঐ সব জায়গা থেকে প্রকিওরমেন্ট করা হয়েছে সব আনা হয়েছে কলকাতায়—যুদ্ধের যে-কোনো প্রয়োজনে যে-সব ফ্যাক্টরি চলছে, তার মজুরদের রেশন চালু রাখতে আর গ্রামের সব মানুষ এসে পড়েছে কলকাতায়, বার্মিজ উদ্বাস্তুদের সঙ্গে, তার ওপর, ৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন দমনে মেদিনীপুরের গ্রামে প্যারাসুট বাহিনী নামাবার জন্য এয়ার ফোর্সের সঙ্গে কথা বলছেন গভর্নর, প্রায় একই সময়ে কাঁথি-র সাইক্লোনে (এখন শোনা যাচ্ছে, সেটা না কী ছিল সুনামি) পর্যুদস্ত মানুষের ওপর সেনাবাহিনীর অত্যাচারের বিবরণ মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ছে অথচ এ-বিষয়ে হাইকোর্টের কোনো বিচারপতিকে দিয়ে তদন্ত করা হবে, হকশাহেবের এমন ঘোষণায় তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে তিরস্কার করেন ছোটলাট—সেটা, আর যাই হোক, মন্ত্রিত্বের পক্ষে সুসময় নয়। 

ভারতের ব্রিটিশ সরকারের সব হিশেবই গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের এই চেহারা তাঁরা আন্দাজ করতেও পারেননি। লিনলিথগ নিজেদের মধ্যে বলেছিলেন, ‘১৮৫৭-র পর এমন বিদ্রোহ আর হয়নি।’ দুশ বছরের ইংরেজ-শাসনে ইংরেজের বিরুদ্ধে যত মত তৈরি হয়েছে তার সবগুলি ‘ভারত ছাড়ো’তে এসে বিদ্যুৎস্পর্শে বিস্ফোরণ ঘটাল। ব্রিটিশ রাজের অনুগততম যাঁরা বড়লাটের মন্ত্রী, হাইকোর্টগুলির বিচারপতি, কংগ্রেসের মত প্রাচীন সংস্থা, গান্ধীবাদীদের অহিংস ও গুরুবাদী কর্মীরা, কংগ্রেসবিরোধী ফরোয়ার্ড ব্লক, কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টি, গবর্মেন্টের ভারতীয় অফিসাররা, উপকূল রক্ষা বাহিনীর জোয়ানদের গ্রুপ, পুরনো সশস্ত্র বিপ্লবীরা, রেললাইন উপড়ে ফেলার ও ওয়াগন ভাঙার কাজে দক্ষ সব ফাটক-খাটা কয়েদি, গ্রামের চাষি—যে কারো কাছে এই খবরটা পৌঁছেছে—’ভারত ছাড়ো’, ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’—সেই কোনো-না-কোনো ভাবে আন্দোলনে নেমেছে। কোন সম্প্রদায় নামেনি, কোন মহকুমা নামেনি, কোন প্রদেশ নামেনি—এ-সব গবেষণা অর্থহীন। ভারতের জনসংখ্যার অনুপাতে তা হলে কোনো আন্দোলনই সফল নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধানতম নির্ভর ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধ্বংস শুরু হয়ে গেছে, তাদের নিজেদের সব রকম রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সেই ধ্বংসকে আরো এগিয়ে এনেছে। ধ্বংস বা মৃত্যু যত কাছে আসে ও যত নিশ্চিত হয়ে ওঠে, ততই শরীর যেন স্ববশ ছেড়ে দেয়। যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভঙ্গিতে প্রাদেশিক নির্বাচন এতদিন স্থগিত রেখে হঠাৎ ঘোষিত হল। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *