১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৭৩. গৃহযুদ্ধে পক্ষ সাজানো

১৭৩. গৃহযুদ্ধে পক্ষ সাজানো 

খুলনা থেকে গোপালগঞ্জের লঞ্চের সময় যোগেনের জানা থাকলেও সে ঠিক করেনি, কোন সার্ভিস নেবে। তার একবার মনে হয়েছিল, বিরাট জ্যাঠাকে নিয়ে যাবে কী না। বিরাট জ্যাঠার খ্যাতি-প্রতিপত্তির ওজন আলাদা। সঙ্গে যেতেন কী না সন্দেহ ছিল—এতটা সরাসরি হিন্দু মহাসভার বিরোধিতায় যেতে তাঁর একটু বাধা থাকতে পারে। কিন্তু তপশিলি-বিক্ষোভকে একটু বেড়াভাঙা না করলে বিক্ষোভের ওসারটা বাড়বে না। বিরাট জ্যাঠাকে নিয়ে যেতে পারলে সব দিক দিয়েই মানানসই হত—হকশাহেবের দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আবার একটু হিন্দু-হিন্দুও আছেন। যোগেন না হয় তার রাজনীতিই বলবে—শূদ্ররা হিন্দু না। কিন্তু যদি হিন্দু বলে মান্যগণ্য কেউ এমন রাজনীতির কথা বলেন যে হিন্দুত্বের বিচারেও মহাসভা হিন্দুস্বার্থের রক্ষক নয়—তা হলে বিষয়টা পুরোপুরি খুলত। 

প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ায় বিরাট জ্যাঠা এত মনমরা হয়ে গিয়েছিলেন, যে মাস আটেক না-যেতেই দ্বিতীয় স্ত্রীকে ঘরে তোলেন। আগরতলার অধরবাসী মজুমদারের বড় মেয়ে, খ্যাতিমান পরিবার, শিক্ষিত। জেঠি বিয়ের পর কলকাতায় মেয়েদের মেট্রপলিটানে আই-এ পড়েছেন। বি-এও পড়ছেন। জেঠিমার ছোটবোনও নাকি খুব ভাল ছাত্রী। দ্বিতীয় স্ত্রী এমন কিছু ব্যাপার না, বিশেষ করে প্রথম স্ত্রী যদি মারা গিয়ে থাকেন। বিরাট জ্যাঠার প্রথম পক্ষ থেকে কোনো সন্তানসন্ততি হয়নি বলেও দিনদিনই কেমন মিইয়ে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর জ্যাঠার চলাফেরাই বদলে গেছে। সেটা নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা যায় ও করা হয়ও। কিন্তু বিরাট জ্যাঠা এমন সহজভাবে জ্যেটিকে সঙ্গে নিয়ে ১৫ নম্বরের নানা মিটিঙে আসেন আর জেঠিও এত সুন্দর ও সহজভঙ্গিতে সমিতি ও সমাজের নানা বিষয়ে নিয়ে কথা বলেন যে শিডিউল কাস্ট আন্দোলনের নতুন নেতাদের মনে হতে শুরু করেছে—তাদের মেয়েদের এই সব কাজকর্মে নামাতে হবে। এর আগেও মুন্সিগঞ্জ-সত্যাগ্রহে ডাক্তার মোহিনী সরকারের স্ত্রীর নেতৃত্ব সকলের মনে আছে। আরো আছেন কয়েকজন। শিক্ষার দিকেও মেয়েদের টান এসেছে। বিরাট জ্যাঠার কাছে লোক পাঠিয়েছিল যোগেন, নিজে যেতে পারেনি। এখানকার নানা কাজে এত জড়িয়ে থাকেন যে ওঁর পক্ষে ‘চলো’ বললেই চলা সম্ভব নয়। অন্তত কদিন আগে না-জানালে ওঁর পক্ষে প্রোগ্রাম করা সম্ভব নয়। 

যোগেন নিজের খোঁজাখুঁজিতে মজা পেল। একজন নামজাদা লোক তার দরকার। কিন্তু তাকে বলতে হবে—যোগেনের বুদ্ধিমত কথা। তার চাইতে যোগেন নিজে বলুক। তাও হবে না। তাহলে যোগেনের কথাটা কে বলবে? কিন্তু এ বিষয়ে যোগেনের সন্দেহ নেই যে হিন্দু হিশেবে হিন্দু মহাসভার বিরোধিতাটা দরকারি। কিন্তু সেটা তো কংগ্রেসই সবচেয়ে ভাল পারত। যোগেন নিজেকে ঠাট্টা করে, সে যেন গান্ধীজি হয়ে উঠছে—এক দেহেই হিন্দু-অবতার, হরিজন নেতা, কংগ্রেসের ডিকটেটর, আগস্ট বিপ্লবের বিপ্লবী। এই ঠাট্টাটা মনে খেলে গেল বলেই যোগেনের মগজে ভেসে ওঠে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সঙ্ঘে এমন কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষুকে পাওয়া যেতে পারে, যিনি হিন্দু বর্ণভেদের অধার্মিকতার একটার পর একটা উদাহরণ দিতে পারবেন। 

তাই করবে যোগেন। 

পারলে, খুলনা থেকেই লোক পাঠাবে পার্বত্য চাটগাঁয়। যোগেন জেনে গেছে—ডাউন-সার্ভিস ধরে বরিশাল-গোপালগঞ্জ থেকে অনেক লোক খুলনা চলে এসেছে, তার গোপালগঞ্জ যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে। এখন সে দেখে, দুদু মিয়ার মাথা। প্ল্যাটফর্ম তো ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়’ আওয়াজে গমগম করছে। তার অনুরাগী ও সমর্থকদের ভিড় ঠেলে যোগেন দুদু মিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। সারওয়ারদিই লিগের আসল নেতা? প্রদেশের লিগের জেনারেল সেক্রেটারি। প্রথম ভোটে, লিগ একটু কেরে ছিল, এবার তার পুরো বদলা দেবে। 

‘আরে, দুদু ভাই, আপনে এদ্দূর কেন আইলেন?’ দুদু মিয়া খুব আপ্যায়িত বোধ করেন—যোগেন যে ভিড়টা ঠেলে তার কাছেই প্রথম এল। দুদু মিয়ার ধুতি পরা শাদা ফুলশার্টের মাথায় কুচকুচে বাবরি, ঘোর কাল কোঁকড়া চুলের কাল মুকুট যেন। দুদু মিয়া তার শরীরটাকে কোমরের ভাঁজে ভেঙে, দুই হাতে যোগেনের হাঁটু ছুঁয়ে বলে, ‘খোদা হাফেজ।’ তারপর সোজা দাঁড়িয়ে বলে, ‘কাইল মইধ্য রাইতে নদী বাইয়া চোঙা ফুঁইখ্যা জাগাইয়া থুইল। আগামীকল্য আমাগ সেনাপতি আইনমন্ত্রী যোগেন্দ্র নাথ মণ্ডল খুলনা হইয়্যা গোপালগঞ্জ স্টিমার ঘাটায় নামিয়া যুদ্ধ পরিচালনা করিবেন! আপনারা সগগলে জাহাজঘাটায় সমবেত হইবেন। তো ভাইবল্যাম, ‘সেনাপতির লগে গেলে খুলনাতেই যাই, গোপালগঞ্জরে এত গৌরব দিব্যার কারণ নাই। কইল্যাম, নাও ভাসাও।’ 

দুদু মিয়া যে ভাসানচর থেকে একেবারে খুলনায় দলবল নিয়ে এসে গেছে—তাতে যোগেন যেন একটু ভরসা পায়। তাহলে কি যে ধরনের রাজনীতির পক্ষে মুসলমান ও তপশিলিদের জড়ো করা দরকার বলে যোগেনের মনে হচ্ছিল, তার একটা সম্ভাবনা গ্রাম-বাংলায় তৈরি হয়েই আছে? দুদু মিয়াকে জড়িয়ে ধরে যোগেন বলে ওঠে, ‘দেখছো কি কাণ্ড! আইলেন কী সে?’ 

দুদু মিয়া তার ধুতির খুঁটটা তুলে নিজের চোখে ঠেকায়। তারপর নিজেকেই ধমকে যেন বলে, ‘আরে, ঠাকুর ভাই, জিগ্যান কী? বোয়াল মাছরে জিগ্যান, তুই এই জলে আইলি ক্যামনে? ‘না—আ। কইলেন না নৌকা কইর‍্যা? নাও কি একডা দুইটা ছাইড়ব্যার ধইরছে অ্যাহ, কহনো-সহনো?’ 

‘ঠাকুরভাই, যে যুদ্ধের লগে এত সব আন্ধার, ঘরপোড়ানো, নাওপোড়ানো, ক্ষেত পোড়ানো, 

মাটিপোড়ানো স্যায় কি থামছে?’ 

‘থামে নাই। ক্যা? কেউ কি কিছু সংবাদ দিছে?’ 

‘সংবাদ তো ঘইটলে দিব? যুদ্ধ থামছে কী থামে নাই—এমন খবর দিয়ার মানুষ এই জলদেশে আর কেডা হব? সে সব কথা তো জাইন্যা যাবেন আপনে। আমারে শুধু আপনার, কী কইল য্যান, কী কইল রে, পরোগ্রাম, কুথায় কুনদিন আর কী কাম সেইডা জানাইয়্যা থোন। আমি আপনাকে খুঁইজ্যা নিব।’ 

‘তার থিক্যা তো সোজা হয়, আপনে আমার লগে-লগেই থাইক্যা যান, খোঁজাখুঁজির কাম কী?’

‘এইডা কি কুনো কথা হইল। আপনে হইছেন মন্ত্রী। আপনে এই বিপদের সময় মন্ত্রী হইয়া তো জানান দিলেন, এ করাল যুদ্ধ শ্যাষ হইলেও হইব্যার পারে। কত শাহেব-সুবার সঙ্গে মিটিং? আর সবহানে এক ইবলিশের মতন খাড়াইয়্যা থাকব দুদু মিয়া? এডা হয় না। আপনে ঐ, ক্যারে কী কইলি য্যান, ঠাকুরভাইয়ের কী একখান লাগব? পোরো—?’ 

যোগেন ঘাড় ঘুরিয়ে একবার যেন কাউকে খোঁজে। না পেয়ে ডাকে, ‘সুবিমল’, তাতেও না পেয়ে গলা তুলে চেঁচায় ‘হ্যাঁ রে, এ-ই উদ্‌দুর।’ তখন দেখা গেল, প্যারীডাক্তারের মধ্যম পুত্র উদ্‌দুর মুখ বাড়িয়েছে। দেখে, যোগেন তাকে বলে, ‘এগ এডডু কইয়্যা দে, কবে কোথায় কীসের মিটিং।’ উদ্‌দুর দূর থেকে হাত তুলে মাথা হেলায়। 

যোগেন গোপালগঞ্জ অভিযানে যে-একটা ছক মনে মনে তৈরি করতে চাইছিল ভোলার ভাসানচরে দুদু মিয়া খুলনায় এসে যোগেনকে সংবর্ধনা জানানোয় যোগেনের মনে-মনে যে-আন্দাজ তৈরি হচ্ছিল ও ভেঙে যাচ্ছিল সেটা একটা আকার পেয়ে গেল। দুদু মিয়া না কোনো পার্টির, না কোনো সরকারের, না কোনো আদর্শের লোক। ভোলার সাইক্লোনের পর যে ত্রাণ সমিতি তৈরি হয়েছিল, যোগেনের দৌড়োদৌড়িতে, তার দৌলতে হয়তো দুদু মিয়ার নামটা টাউনের মানুষদের কারো কারো কানে উঠেছিল। সে-সব কোনো কারণেই দুদু মিয়া খুলনা পর্যন্ত আসেনি। বলল তো, নদী থেকে ফোঁকা চোঙা শুনেছে। যোগেন মণ্ডলের মিটিং জেনেছে। তার কোনো চিঠি নিয়ে যোগেনের কাছে কেউ আসেনি। সারওয়ারদি শাহেবের টেলিফোন নির্দেশ তাঁর কাছে পৌঁছুতে পারে—এটা দীনদুনিয়ার মালেকেরও জ্ঞানের বাইরে। দুদু মিয়াই যোগেনকে ছেড়ে দেয়, ‘আপনারে আটকানোর লগে তো আমরা খাড়াইয়্যা নাই। সব অফিসাররা বড়-বড় নেতারা আপনার লগে মিটিং কইরবে বইল্যা খাড়াইয়্যা আছে। আপনে আগান। অগর লগে তো আমাগ নিয়্যাই কথা হব। আপনারে লেট করাইয়্যা দিলে তো আমাগই ক্ষতি। আপনে আগান—’ 

যোগেন পেছন ফিরতেই দুদু মিয়ার দলবল থেকে ধ্বনি উঠল, ‘যোগেন মণ্ডল—জয় জয়।’

যোগেন ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার হাত তুলল। আবারও যোগেনের নামে জয়ধ্বনি উঠল।

যোগেন চলল তার জন্য যারা আপেক্ষা করছে সেই নেতা আর অফিসারদের ভিড়ের দিকে।

পেছন থেকে উদ্‌দুর প্রায় দৌড়ে এসে বলে, ‘স্যার, স্যার—’ 

যোগেন থমকে তাকে বলে,’তুই আবার স্যারানো শুরু কইরলি ক্যা?’ 

উদ্‌দুর তার হাতে একটা লম্বা টাইপ-করা কাগজ দিয়ে চাপা স্বরে ইংরেজিতে বলে—সরকারি স্তবরে আপনার এখানে আসা নিয়ে যা যা খবর এখানে আজ পর্যন্ত এসেছে, তার লিস্টি এটা। এঁরা সবাই লিস্ট করে রেখেছেন, আমার এক ঝলক দেখে মনে হল—একই সময়ে একের বেশি প্রোগ্রাম আছে। 

‘সেইডা আমি কী করব? তুই যা বুঝিস, কর গিয়্যা—’  

সুবিমল ইংরেজিতেই বলে ও যোগেনের বাঁ কানের পেছন থেকে। যোগেন তার মুখোমুখি হওয়ার জন্য দু-বার ঘুরেছে। দুবারই উদ্‌দুর ঘুরে যোগেনের কানের পেছনে চলে গেছে। স্যার, এটা বোধহয় আপনাকেই ঠিক করতে হবে। এটা কারো কোনো দোষে ঘটে নি। বরং সবার সদিচ্ছাগুলির মিলিত ফল এটি। আপনি যে এই টুরে আসছেন, সেটা সরকার যতটা উশুল করতে পারে, সেই চেষ্টাতেই আপনার প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বের অধীন ডিপাটমেন্টগুলি, তার সঙ্গে স্যার পি এম-এর ডিপার্টমেন্টগুলো থেকে ও তার সঙ্গে সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী মিস্টার সারওয়ারদির মন্ত্রক থেকেও প্রোগ্রাম করা হয়েছে। 

‘অ্যাহন থিক্যা কি আমারে মামা না-ডাইক্যা, স্যার, ডাকবি? আর আমার লগে ইংরাজিতে কথা কবি?’ 

‘হ্যাঁ। মামা, তুমিও আমারে উদ্‌দুর বলে ডাকবে না, সবার সামনে। আর, ইংরেজিতে কথা বলবে। না হলে, আমার কাজের অসুবিধে হবে। তোমার মন্ত্রীগিরির কাজের মতই, তোমার কনফিডেনশিয়াল অ্যাসিস্টান্টের চাকরিটাও, আমার পক্ষে নতুন। আমি যে তোমার এত নিকটজন, সেটা এখন থেকেই সবাই জানলে, আমার অসুবিধে হবে।’ 

‘কী চাকরি দিলি রে, বাবা, যাতে উদ্‌দুররে উদ্‌দুর ডাকা যায় না?’ যোগেন বাইরের দিকে পা বাড়ায়—অফিসারদের মিটিঙের জন্য। মিটিংটা ডাকবাংলোতে। 

এ-বাড়িতে যোগেন তো আগেও থেকেছে। রসিককাকাকে নিয়ে, নাকি সার্কিট হাউসে? রকিস কাকাকে জিজ্ঞেস করলে হত, সেবার কংগ্রেস অফিসে এক কম বয়েসি ছেলে, রায়িস্ট? দারুণ বক্তৃতা করেছিল। তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায়? বা, সেই এক রাজবন্দী-ডেটিনিউ, বুড়ো মানুষ। তাঁকে পেলেও চলে কিন্তু তাঁকে কি খবর দেওয়া হয়েছে। মিটিঙের শুরুতেই এই ঝামেলা চোকাতে হবে। যোগেন মিটিং ঘরে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়ায়। একটা খশখশ আওয়াজ ওঠে—পরনের ধুতি-প্যান্টের ঘষায়। 

চেয়ার সরাবার ও টানার কোনো আওয়াজ উঠল না। যোগেন না বসে বলল, কলকাতায় গোপালগঞ্জ থেকে খবর পাই যে সেখানে সাম্প্রদায়িক অবস্থা খুব খারাপ। কোনো হিন্দু বা মুসলমানকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। এই অবস্থা শুনে আমি বলতে গেলে রাইটার্স থেকে ট্রেন ধরেছি। শুধু সিভিল সাপ্লাই মিনিস্টার মিস্টার সারওয়ারদির সঙ্গে মুখের কথা বলে আসতে পেরেছি। আমি যখন ট্রেনে, ওঁরা তখন আমার প্রোগ্রাম সেট করে আপনাদের পাঠিয়েছেন। তাঁদের ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার নেই। কিন্তু আমরা সকলে মিলেই যুদ্ধ, খাদ্যাবস্থা, দাঙ্গাঘটিত এই সংকটে কাজের চেষ্টা করছি। আপনাদের নিজেদের কাজ সম্পর্কে কোনো সমস্যা থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারেন। যতটুকু পারি, জানাব। আমার নিজের দুটি ডিপার্টমেন্টকে অনুরোধ করব—কোনো ডিপার্টমেন্টাল বা রুটিন ঝামেলার কথা তুলবেন না। কিন্তু যুদ্ধ, খাদ্য, পোড়ামাটি ও সাম্প্রদায়িক—এই চারটি বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলব। 

এতক্ষণ সবাই দাঁড়িয়েই। যোগেন বসার পর, সবাই বসে। সেই বসায় আবার কাপড়-ঘষার আওয়াজ হয়। সেই ফাঁকে যোগেন বাঁয়ে পেছনে তাকায়, যেন কাউকে খুঁজছে। উদ্‌দুর এসে পেছন থেকে কান পাতে। যোগেন বলে, ‘রসিক কাহারে তালাস দে। পাইলে এইহানে বসাবি, চেয়ার টাইন্যা। না পাইলে কয়্যা যাবি।’ 

যোগেনের কথা কেউ শুনতে পেল না কিন্তু সে যে তার ডান হাত নাড়িয়ে তার চেয়ারের পাশের জায়গাটা দেখাল–সেখানে একটা টুলের ওপর ফাইল পাঁজা করা—সেটা সবাই দেখল। 

টেবিলের উল্টো মাথায় এক শাহেব বসেছিলেন—একটা খুব পাতলা সুতির কোট-টাইয়ে। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিলেন ডিভিশন্যাল কমিশনার বলে। তিনি তাঁর দু-পাশে হাত ছড়িয়ে বললেন—ইস্টার্ন বেঙ্গল বলতে বাংলার যে পূর্বদেশ বোঝায়, তার প্রায় প্রত্যেকটি জিলা থেকেই দায়িত্বসম্পন্ন উচ্চপদস্থ অফিসাররা মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন। তার প্রধান কারণ এটা নয় যে তাঁরা কোনো মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান—কারণ, তাঁরা কোনো কথা কাউকেই কিছু বলতে পারছেন না, কারো কাছ থেকে কিছু জানতে পারছো না। অথচ তাঁদেরই তো রোজ খবর দিতে হয়—চিনি দেয়া হবে কবে, গেলবারের আগের বার ওড়িশার চালে খুব পচা গন্ধ ছিল, ওড়িশা আর আসামের চালের গুণ ও নিয়মানুগত্য নিয়ে কি ভরসা করা যায়? আপনাদের কাছে অনুরোধ, আপনারা কথা বলার সময় নিজের পরিচয় দিয়ে দেবেন। তারিখহীন ও তথ্যহীন কোনো শখের অভিযোগ তুলে সময় নষ্ট করবেন না। মাননীয় মন্ত্ৰী ওপারে তাঁর পূর্বনির্ধারিত মিটিঙে যাবেন প্লী-ই-জ। 

একজন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে উঠে জানায়-সে নদীয়ার মহকুমা শাসক। খাদ্যসমস্যা তো আমরা সকলেই বুঝছি, কেন্দ্র থেকে প্রদেশ, প্রদেশ থেকে জিলা, জিলা থেকে মহকুমা—সকলেই আত্মরক্ষা করতে পারছে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম নীতি অনুসরণ করে—’টেল অব ইয়োর ফাদার, অনলি হোয়েন ইউ আর সিয়োরার’—। এটা নিশ্চয়ই খুবই বড় আকারের দুর্ভাগ্য যে—একটা সংকটে বাঁচলাম কী না বুঝে ওঠার আগেই আর-একটা সংকট এসে যাচ্ছে, ‘সে’ ‘ওয়ার’, ফলোড বাই প্রাইজরাইস, অ্যান্ড দি স্টার্ভেশনস এগেইন ফলোড বাই ম্যালেরিয়া-এপিডেমিক।’ আমাদের ওখানে একজন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জেন অব পাবলিক হেলথ ডিপাটমেন্টকে জিলা ম্যাজিস্ট্রেট আরেস্ট করেছেন। সে হাসপাতালের রোগীদের কুইনিন বলে সাধারণ জল ইনজেক্ট করছিল। আর এই চুরি করা কুইনাইন বাইরে বিক্রি করছিল প্ৰতি পাউন্ড ২০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে। তার সরকারি দর পাউন্ড প্রতি ৭০ টাকা। এই চুরি সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক প্রচারের ফলে। সে প্রচারে সব দলেরই এক রা। মুখে গরিবদের জন্য চোখের জল আর হাহাকার। খাদ্যের বাড়তি দর ও অভাব মধ্যবিত্তদের বিপদে ফেলেছে। তাঁরাও ম্যালেরিয়া এপিডেমিকে কুইনিন কিনতে পারছেন না। আজকের মিটিঙ থেকে কুইনাইন সরবরাহের পরিকল্পনাটা জানতে চাই। 

এ রকম ভাবেই উঠল—চিনির কথা, কোথাও কোথাও লঙ্গরখানা বন্ধ করে দেয়ায় ক্ষুধার্তদের কলকাতার দিকে পুনর্যাত্রা, গ্রামস্তর থেকে জিলাস্তর পর্যন্ত বিভিন্ন রিপোর্ট পাঠানোর নিয়ম ও রুটিন ভেঙে পড়ছে, মানে, প্রদেশের সরকারের সিদ্ধান্ত তথ্যনির্ভর হওয়ার বদলে প্রভাব নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে প্রদেশের নেতারা এই দুনীর্তির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন অথবা তাঁরা এই বিপদে অবান্তর হয়ে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে যুদ্ধের বাজার। সে-বাজার সিভিল বাজারের সঙ্গে কোথাও মিশে যাচ্ছে, কোথাও সিভিল বাজারকে মজিয়ে দিচ্ছে। এমন একটা সিদ্ধান্ত যেন পুরনো এই বদ্বীপ অঞ্চলে ও পূর্বের এই অববাহিকা অঞ্চলে প্রতিদিনই সত্য হয়ে উঠেছে যে এখানে কাউকে বাঁচানোর দায়িত্ব সরকারের নয়। সরকারের কাঠামোটা কিন্তু রাখতেই হবে। 

এ রকম আরো কিছু আলোচনার পর যোগেন বলে আপনারা তো এই অঞ্চলে সরকারকে রক্ষা করছেন। আজকে আমি খুলনাতে থাকব জেনে এখানে এসেছেন, কমিশনার থেকে রিলিফ অফিসার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসার। আমি একজন মন্ত্রী বলেই যে আপনারা এসেছেন, অন্তত আমি তা বিশ্বাস করি না। আমি এইখানকার মানুষ, কত পুরুষের, তা আমি জানি না। আপনারা আমার এই মিটিঙে এসেছেন শুধু আমার প্রতি বিশ্বাসে আর আপনারা যেখানে কাজ করেন সেখানকার মানুষজনকে বাঁচিয়ে রাখতে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি—এই বিশ্বাস ও ভালবাসার মূল্য আমি দেব। এর সঙ্গে মন্ত্রী থাকা না-থাকার সম্পর্ক নেই। তেমনি এ-কথাটাও আপনাদের আমি মনে রাখতে অনুরোধ করছি যে আপনাদের প্রতিটি অভিযোগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে নিলেও সেটা সত্যিই থাকবে। মন্ত্রী হওয়ার ফলে আমার পক্ষে দায়িত্বহীন ভাবে বলা সম্ভব নয় এই সংকটের কারণ কী। কারণ নিয়ে তো মতপ্রভেদও থাকতে পারে। যুদ্ধ চলছে ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। আজ ৪৩ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। যুদ্ধ চারবছর চলছে। তার আগে ধরুন ৩২/৩৩ সাল থেকেই যুদ্ধের আওয়াজ উঠেছে। তাহলে যুদ্ধ তো প্রায় ১০ বছর সময় দিয়েছে। যুদ্ধ, ডিনায়্যাল পলিসি, প্রকিওরমেন্ট, চাল আমদানি বন্ধ, সৈন্য ও যুদ্ধ উৎপাদনের জন্য কলকাতা ও শিল্পাঞ্চলের রেশন চালু রাখা, এগুলোর জন্য তৈরি হওয়ার সময় ছিল না—এ কথাটি ঠিক নয়। যাঁদের দায়িত্ব ছিল, তাঁরা করেননি। অথবা, তাঁরা যুদ্ধটাকে যেভাবে ভেবেছিলেন, যুদ্ধটা সে ভাবে হল না। তাও যদি ঘটে থাকে, সেটাও তো একটা বিচ্যুতি। আমি দোষারোপ করতে অক্ষম। আমি বংশগত শূদ্র। সুতরাং দোষী থাকাটা আমার অগ্রাধিকার। কিন্তু শূদ্র বলেই আমি শুধু আমার সেবা ও কর্মের মধ্য দিয়ে নিজের দোষ ক্ষালন করার চেষ্টা করতে পারি। 

যোগেন তো এই কথাগুলি ইংরেজিতে বলছিল। বরিশালিয়া বাংলায় বললে তার আবেগ পাকিয়ে ওঠা সে আগেই টের পেত ও রঙ্গ-রসিকতা-আয়রনিতে নিজেকে সামলে নিত। কিন্তু ইংরেজিতে তো সেটা সম্ভব না। সে যখন বলে ফেলল বলে নিজেই শুনল, ‘আই অ্যাম আনেবল টু সার্চ ফর গিল্ট ইন আদারস বিকজ অব মাই বার্থ অ্যাজ এ শূদ্র। দিস ইজ মাই প্রিভিলেজ অ্যাজ-এ শূদ্র টু প্লিড গিল্টি অলওয়েজ আন্ড টু অ্যাটোন বাই কনস্ট্যান্ট ওয়ার্ক অ্যান্ড সারভিস’, আর এই মিটিঙের অনেকে চাপা হাততালি দিয়ে ফেলেন মিটিঙের আদব কায়দা ভেঙে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু শাহেব, নানা বয়সের। তারা বিশ্বখ্যাত তাদের জাতিগত নিরাবেগের কারণে, যোগেন নিজের কাছে বোকা হয়ে যায়। এটা সে কী করল? 

বোকামো থেকে বেরিয়ে আসতে যোগেন বলে, সে বলতে চাইছে যে অন্তত কিছু কাজ করতে পারে, আমাদের সকলের দুশ্চিন্তা দূর করতে। আলোচনা থেকে এই কটি কাজ বেরিয়ে আসে, তার পক্ষে যা করা সম্ভব। এখানে কয়েকটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে—উদাহরণ হিশেবে। রাই মোহন সাহা ২৬ টাকা থেকে সাড়ে ২৬ টাকা মন দরে ৯৫০ মণ চাল কিনেছে। কিন্তু যে বেচেছে সে চাল তার কাছে পৌঁছে দিতে পারছে না, পুলিশের ভয়ে। তার চালের পরিমাণ প্রায় দুই ওয়াগনের মত। আর একটা ঘটনায় লাইসেন্স ছাড়া কেরসিন তেল পাইকারি দরে বেচার কথা এসেছে। স্টক করা হচ্ছে দুর্গম গ্রামে। আরো একটা ঘটনা এসেছে—গোপনে ১৪ টাকা মণ দরে ৪০০ মণ ধান কলকাতায় পাচার করতে সম্পূর্ণ ছইয়ে ঢাকা নৌকো পাঠাতে বলা হয়েছে। আর একটা ঘটনায় মজুত চাল বাজারে ছাড়তে না করা হয়েছে, পরে ভাল দাম পাওয়া যাবে। এগুলো সবই আইনলঙ্ঘনের ব্যাপার ও ফৌজদারিযোগ্য। কলকাতায় ফিরেই আমি সিভিল-সাপ্লাই মন্ত্রীকে বলব। আমার আশা মিস্টার সারওয়ারদি ও আমি একটা পারচেজ বোর্ড তৈরি করে দিতে পারব। ফার্মগুলির প্রতিনিধি থাকবে, রেল ও যে-সব চেম্বার জড়িত, তাদের প্রতিনিধিরাও থাকবে। বোর্ড কনট্রাকটারদের বলবে চাল কিনতে। রেল ও ইনডাস্ট্রি ও সরকারের জরুরি রিজার্ভের জন্য। যাদের জন্য চাল, তাদের দেয়া টাকায় কিনতে হবে। পাইকারিতে সরকার একচেটিয়া ব্যবসা করবে এমন আইন এখন তৈরি করা যায় না। কারণ সরকারের লোক নেই। সরকার এখন এইটুকু পর্যন্ত করতে পারে—একটি বোর্ড মারফৎ ক্রেতা হতে পারে, জানুয়ারির মধ্যে চালের পাইকারি দর ১৫ টাকায় নামিয়ে ১০ লক্ষ মণ প্রকিয়োর করবে, এই বোর্ডেও এই উদ্দেশ্যে মাত্র কয়েকজনকে ডেপুটি কনট্রোলার পদে কাজ করতে বলা হবে। কুইনাইন বিতরণ ব্যবস্থাকে গ্রাম বাংলায় সিভিল সাপ্লাইয়ের ভিতরে আনলে ভাল হয়। 

সমবেত গুঞ্জনে সমর্থন পেয়ে যোগেন হেসে বলল—আপনাদের এই সভার সুপারিশ কটি পাঠিয়ে দিলে সুবিধে হয়। আর, আমার দপ্তর সংক্রান্ত একটি আনন্দ সংবাদ আপনাদের জানিয়ে শেষ করছি। একটি অর্ডিনান্স করে ৪৩ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ৫ বিঘে নীচে সমস্ত বিক্রীত জমির বিক্রয় নাকচ করা হল। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *