১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৭২. গৃহযুদ্ধে পক্ষবিভ্রাট

১৭২. গৃহযুদ্ধে পক্ষবিভ্রাট 

কিন্তু গোলমাল বেধে গেল দিন আট-দশের মাথায় যোগেনের সঙ্গে হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদের। নাজিমুদ্দিন যাতে তাঁকে ক্যাবিনেটে নেন সে জন্য শ্যামাপ্রসাদ অনেক চেষ্টা করেছিলেন। ‘স্টেটসম্যান’-এর আর্থার মুরকে তিনি দূত করেছিলেন, যে-ভাবে শ্যামা হক মন্ত্রিসভা থেকে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন ও তাঁর বিদায়ী বক্তৃতায় তিনি লাটশাহেব সম্পর্কে ও প্রশাসন সম্পর্কে যা বলেছিলেন, তা তাঁর বলা উচিত হয়নি। অর্থার মুর দৌত্য করেছিলেন, গভর্নর হার্বার্টের কাছে। গভর্নর একটু নরম ও হয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রী হিশেবে নির্ভরযোগ্য ও তাঁকে নিলে হিন্দুরা একটু খুশিও হবে। কিন্তু হার্বার্ট নাজিমুদ্দিনকে রাজি হতে বাধ্য করা পর্যন্ত এগলেন না। নাজিমুদ্দিন বললেন, এটা তাঁর ও সরকারের পলিটিক্যাল ডিসঅ্যাডভানটেজ হবে। দুর্ভিক্ষের জন্য শ্যামাপ্রসাদ ও হকশাহেব দায়ী করছেন নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভাকে। আর, নাজিমুদ্দিন, সারওয়ারদি ও মুসলিম লিগ দায়ী করছিল হকশাহেবকে ও শ্যামাপ্রসাদকে। পরন্তু শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার জীবৎকাল জুড়ে সারা বাংলায় মুসলিম লিগ হকবিরোধী অভিযান চালিয়ে বাঙালি মুসলমানদের কাছ থেকে হকশাহেবকে সরিয়ে নিতে পেরেছিল। সেটা সম্ভব হয়েছিল শ্যামাপ্রসাদের ওপর হকশাহেবের নির্ভরতার গুজব রগরগে করে রটিয়ে-রটিয়ে। বাংলা ভাষায় রাজনৈতিক বিরোধিতা উনিশ শতকের শেষ বিশ-পঁচিশ বছরে বদলে হয়ে যায় ঘৃণার ভাষা। ভাষা এমন ঘৃণা প্রকাশের অবলম্বন হয়ে ওঠে প্রধানত হিন্দু উচ্চবর্ণের রক্ষণশীল স্বার্থে। সতীদাহ নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে, বিধবা বিবাহ আইনসঙ্গত করার বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণের রক্ষণশীল স্বার্থে। সতীদাহ নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে বিধবা বিবাহ আইনসঙ্গত করার বিরুদ্ধে, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিরোধিতায় রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও দেবেন্দ্রনাথ সম্পর্কে ভবাণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে কালীপ্রসন্ন বিদ্যাবিনোদ পর্যন্ত প্রায় আশি বছর ধরে যে-বীভৎস রসের চর্চা হয়েছে তার সঙ্গে অর্ধসংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের অশ্লীলতা ও আদিরসপক্ষিতার সংযোগ খুবই স্পষ্ট। তারপর থেকে এটা হয়ে যায় বাঙালির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য উপাদান। সেই বাঙালিয়ানা মুসলিম রাজনীতিরও অংশ হয়ে ওঠে। হকশাহেবের দরকারে তিনি মুসলিম লিগ নেতাদের গ্রাম-বাংলা থেকে উচ্ছেদ করেছিলেন। শহরাঞ্চলে নিজের শিকড় পান নি। একই পদ্ধতিতে লিগের যখন দরকার হল হক উচ্ছদের, তখন লিগের একমাত্র উপায় হল, বাংলার অন্দর-বন্দরে এই কথা বলে বলে সত্য করে তোলা—হকশাহেব খাঁটি মুসলমান নয়। নইলে তিনি শ্যামাপ্রসাদের মত মুসলিমদ্বেষীর সঙ্গে হাত মেলান? এর চাইতে অভ্রান্ত আর কোন প্ৰমাণ? 

ততদিনে, মুসলমানের খাঁটিত্ব রাজনৈতিক বিষয় হয়ে গেছে দু-তিনটি মাত্র বছরে। ততদিনে, মুসলমানের খাঁটিত্ব সর্ব ‘ভারতীয় রাজনীতির বিষয় হয়ে গেছে, বিশেষ করে মুসলিম-সংখ্যালঘু প্রদেশগুলির অভিজাত মুসলমানদের সমর্থনে। ততদিনে হকশাহেবের ডালভাতের শ্লোগান হয়ে গেছে অবান্তর, কারণ, মুসলমানরা ডাল-ভাত নির্ভর উপোসী মানুষ থাকতে চায় না, তারা চায় রাজসিংহাসনের ভাগ। 

ততদিনে, খাঁটি-মুসলমান ধারণাটি বদলে গেছে মুসলমানির খাঁটিত্বে। 

তাই, জিন্না, নাজিমুদ্দিন, সারওয়ারদিকে কেউ পরীক্ষা করে না, তাঁরা কি মুসলমান হিশেবে খাঁটি? তাই হকশাহেবকে পরীক্ষা করা হয়—হকশাহেবের মুসলমানি কি খাঁটি? 

কত অবাককাণ্ডই যে ঘটে। 

যেন আমাদের জাতীয় আখ্যান উদার ও গ্রহিষ্ণু হিন্দু আখ্যানই, যেন সেখানেই জায়গা জুটছে ধর্ম-উদাসীন জিন্না ও ধর্মধ্বজী মালব্যজির। এমন সময় মুসলমান ও মুসলমানির খাঁটিত্ব সারা ভারতের রাজনীতির প্রধান বিষয় হয়ে উঠল জাতীয় আখ্যানের বিপরীত একটি পাঠ তৈরি করতে। সেই মাত্র কয়েকটি বছর ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত পাঁচটি বছরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়েছে সংখ্যায় সবচেয়ে কম। সেদিক থেকে ৪১-এর সেনসাস-দাঙ্গাই শেষ বড় দাঙ্গা। পাঁচ বছর পরই দাঙ্গা, গৃহযুদ্ধের আকার নিয়ে ফেলল ও দাঙ্গা দিয়েই স্থির হল, রাজনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি, যেমন হয়ে থাকে গৃহযুদ্ধে, অনেক সময়ই একশ-দেড়শ বছর ধরে। 

সেই গৃহযুদ্ধেরই দুই পক্ষ ছিল—হিন্দু মহাসভা ও শিডিউল কাস্টরা। যারা এমন দুটি পক্ষ মেনে নিত, তারা। যারা এমন দুটি পক্ষ মেনে নিত না, তাঁরা শিডিউল কাস্ট হিন্দু মহাসভা হয়ে থাকত। বাংলাতেই তেমন হত কারণ বাংলার শিডিউল কাস্টদের একজন নেতা, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, তাঁর জমায়েৎ তৈরির ক্ষমতা ছিল, নিজেকে ও শিডিউলদের, হিন্দুদের খাঁচার বাইরে নিয়ে যান ও ঘোষণা করেন, ‘শূদ্ররা হিন্দু নয়।’ শূদ্ররা ভোটে কাকে সমর্থন করবে—সেটা ঠিক হত সেই প্রার্থীর হিন্দুয়ানি দিয়ে। শ্যামাপ্রসাদ ও যোগেন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল অনিষ্পন্ন ধর্ম রাজনীতির বিরোধ। 

যোগন খবর পেল যে, শ্যামাপ্রসাদ তার দলবল নিয়ে লঞ্চে করে প্রচার অভিযানে বেরুচ্ছেন, প্রধানত গোপালগঞ্জ থেকে ভাটি পাড় ধরে। দুটি মিটিং ডাকা আছে—আশুগঞ্জ হাট ও নবি মসজিদে। গোপালগঞ্জ আবার নমশূদ্র প্রধান বলে যোগেনের অতিরিক্ত দখলে। শ্যামাপ্রসাদকে যোগেন গোপালগঞ্জ ছেড়ে দিতে পারে না। 

কিন্তু যোগেন তো ফাঁপড়েও পড়ল। অন্তত মাসখানেক যদি লঙ্গরখানাটাতে তদারকি না করা যায়, তাহলে কোনটা আগে, কোনটা পরে সেটা গুলিয়ে যাবে। সরকারের লোকজন চাইবে, লঙ্গরখানটা চলুক। সরকারের কোনো ব্যবস্থা চালু করা সহজ, বন্ধ করারা দায় কেউ নিতে চায় না। অথচ লঙ্গরখানার উদ্দেশ্যই হল—একটু সুস্থ করে এদের দেশে ফেরৎ পাঠানো ও নতুন লোকদের ভর্তি করা। তাতে পুরনো-নতুন কোনো অনাহারীই বা আর ক-দিন লঙ্গরখানায় থাকবে? যোগেন আন্দাজ করতে পারে—এর ভিতর অনেক প্যাঁচঘোঁচ আছে, মানবিক প্যাঁচঘোঁচের পাল্টা অমানবিক প্যাঁচঘোঁচও আছে ও এই দুটো প্যাঁচ মিলিয়ে গিঁঠ বাঁধে আরো অনেক। যেমন, নেহাৎ দরকারি জলটুকু ও খাদ্যটুকু পেয়ে গেলেই শরীরের স্বাভাবিক চাহিদা ফিরে আসে। দু-বেলা খিদে পায়। খিদে পাওয়া শুরু হলেই তৈরি হতে হয় এদের দেশে পাঠানোর জন্য। এরা দেশে ফিরতে চাইবে কেন? দেশে তাহলে টেস্ট রিলিফের ব্যবস্থা করতে হয়। নইলে দেশে ফেরার দল তৈরি করে ছেড়ে দিলে, সে দল কয়েক পা গিয়েই ভেঙে যাবে। আবার, তারা নতুন দলের সঙ্গে লঙ্গরখানায় ঢুকবে, বা লঙ্গরখানা থেকে দেশের দিকে না গিয়ে কলকাতা শহরের দিকে যাবে। ততটুকু রক্ত এদের ধমনী থেকে সঞ্চালিত হচ্ছে এক হাতা গ্রুয়েল ও জলের মিশ্রণ কয়েকদিন খেয়েই। কলকাতার রাস্তার মোড়ে-মোড়ে জৈন সমিতি, হিন্দু সেবা সঙ্ঘ, পাঞ্চাব হিন্দু অ্যাসোসিয়েশন, আনজুমান মিলায়েত, জামাত-এই সব প্রতিষ্ঠানের লঙ্গরখানা আছে। কারো কারো লঙ্গর দিনরাত খোলা থাকে। সময়-অসময় নেই, গিয়ে দাঁড়ালেই এক গ্লাশ জল, ও শালপাতায় দুটো পুরি ও একহাতা তরকারি মিলবে। কোনো নাম লেখার ঝন্‌ঝাট নেই, কোনো নিষেধ নেই, কোনো এমন হুকুম নেই যে কাউকে দশদিনের বেশি লঙ্গরখানায় খেতে দেয়া হবে না। এই লঙ্গরগুলো যাঁরা চালান তাঁরা প্রত্যেকেই এমন সব ধর্মে বিশ্বাসী, যে-ধর্মে উপবাসী মানুষকে খাবার দেয়াটাই প্রধান একটি আচরণ। পৃথিবীতে কোনো ধর্মই কি এমন আছে যার নিত্যকর্ম পদ্ধতিতে নিরন্নকে অন্নদানের পরামর্শ নেই? নিজেকে নিরন্ন রাখা, উপবাসে থাকা, সাপ্তাহিক উপোস, প্রত্যেকদিনের উপোস, নানা তিথির উপোস—একাদশী, টেকাদেশী, পূর্ণিমা, রমজান—এটাও যেমন সব ধর্মের বিষয়, তেমনিই অন্যকে খাওয়ানোও। 

এ-সব গুজব রটানোর সময় আছে, লোক আছে। 

সারওয়ারদি বলেন, ‘আপনি তো আর গ্রুয়েল কিচেন ওয়ানের রান্নার ঠাকুর না যে ওখানে আপনাকেই পাহারা দিতে হবে। দুর্ভিক্ষ বড় শত্রু, না জাপান, না শ্যামাপ্রসাদ? বড় শত্রুকে বেছে নেন। আরো কী যেন আছে—কত রকম কনট্রাডিকশন হয়। লন্ডনে থাকতে পড়েছিলাম। সাবজেকটিভ আর অবজেকটিভ। এখন আপনি দেখেন—আপনার সাবজেকটিভ কোনটা আর অবজেকটিভ কোনটা। যদি মনে হয়, মুখার্জিই অবজেকটিভ, তাহলে তাকেই বিনাশ করা প্রথম শর্ত। কারণ, না হলে লঙ্কার সিংহাসনে বসার জন্য বিভীষণ তো উইথ ফ্যামিলি রেডি। আগে বংশ নির্বংশ করুন, তারপর নতুন মালিক খুঁজবেন। আমি লন্ডনে আমাদের স্টাডি সার্কলে সাবজেকটিভ আর অবজেকটিভ কনট্রাডিকশনের বাংলা করেছিলাম— জ্ঞাতিশত্রু আর অজ্ঞাতিশত্ৰু।’ 

‘আপনার আবার বাংলা করার দরকার পড়ছিল ক্যা?’ যোগেন হেসে বলে, ‘এ তো ভাল কারবার ফাঁইছেন—লন্ডনে ইংরাজি বোঝেন না আর কইলকাতায় বাংলা বোঝেন না, যোগেনের ঠাট্টাটা সরব হয়। সারওয়ারদিও খুব হাসেন, তারপর বলেন, ‘এই কথা কি সবাই জানাজানি হয়ে গেছে? তাহলে তো আমার দিন শেষ—গেলাম একটু মার্ক্সিজম কপচাতে, দিলেন আমার পেট ফুটো করে। খুব পড়ছেন না, নতুন আমদানি মার্ক্স-এঙ্গেলস-লেনিন? গবমেন্ট তো তুলে দিয়েছে আমদানির আপত্তি। এটা বোধহয় এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের বড় বেনিফিট।’ 

‘আরো বেনিফিট আপনে হবে মনে করেন?’ 

‘নিশ্চয়ই। দেখেন, যদি মনে না করতাম তা হলে কি আমি কলকাতার ট্রেড ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় নেতা হতাম? শ্রমিক শ্রেণীটা আমি শিখেছি মার্ক্সিজম থেকে। শিখে তা প্রয়োগ করছি কলকাতায় বা বেঙ্গলে অ্যাজ এ ট্রাইব্যাল মেনিফেস্টো। আপনার শ্যামাপ্রসাদের তো কিছু শেখারও নাই, ব্যবহারেরও নাই। ও তো লন্ডন যায় নাই। বাপের কথায় বাংলা পড়ল। তাই মার্ক্সিজম শিখল না। বাংলায় তো আর মার্ক্সিজম হয় না। ব্রিটিশ গবমেন্টকে না দেখলে ডায়ালেকটিকস শেখা যায় না। কোনো সিদ্ধান্তই স্থায়ী না। রাশিয়া ছিল ব্যান্ড ফর এভার। যেই জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করল, অমনি রাশিয়া হয়ে গেল ওপেন ফর এভার। এখন কলকাতার ফুটপাতে এঙ্গেলসের ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি বিক্রি হচ্ছে আর লেনিনের স্টেট অ্যান্ড রেভলিউশন। জানেন তো শুধু এই বইটি তাঁর কাছে পাওয়া গিয়েছিল বলে সতীশ পাকড়াশির আন্দামান হয়েছিল। আর এখন লে-লে-বাবু-ছে-আনা করে সিনেট হাউসের সিঁড়ির ওপর বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু সতীশ পাকড়াশি এখনো আন্দামানেই। সারওয়ারদি হো হো হাসিতে প্রায় গড়িয়ে পড়েন। 

‘ছাইড়্যা দিলেই তো হয়। সে-র বেলায় তো কোনো নেতাই কানের তুলা খোলেন না—যেমন হকশাহেব, তেমনি স্যার শাহেব, তেমনি আপনে শাহেব। 

‘বলেন কী যোগেন বাবু! হকশাহেব আর স্যারশাহেবের সঙ্গে এক লাইনে আমাকেও শাহেব বানাবেন না। আচ্ছা, আপনার কথাটার একটা উত্তর দি। ধরেন, সব রাজবন্দীকে মুক্তি দেয়া হল। তাহলে তো ইলেকশনে আমাদের একটা পয়েন্ট চিরতরে লস্ট। ইলেকশন মানে তো স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতায় আপনি আমাদের প্রধান অস্ত্রটি কেড়ে নিচ্ছেন?’ 

‘আপনারা মানে?’ 

‘মানে, আপনারা নন।’ 

‘আমরা মানে?’ 

‘মনে, আমরা না।’ 

‘আপনাদেরও তাহলে ছোঁয়াছুঁয়ি আছে? বামুন-শূদ্র আছে?’ 

‘নিশ্চয়ই। বামুন-শুদ্দুর না থাকলে দেশ চলে? সমাজ চলে? আমাদের একটা অতিরিক্ত সুবিধে। তবে সব কথা এত গলা চড়িয়ে বলারই-বা কী? আমাদের দেখেও শিখতে পারেন, যা কিছু সব মুসলমানদের দোষ।’ 

‘মানে, আমরা মানে?’ 

‘মানে, আপনারা নন?’ 

‘মানে, আমরা তো আমরা—’ 

‘আপনারা মানে তো আমরা না—’  

‘আরে, এই আপনারা কারা? আর আমরাই বা কারা? তফাৎটা কোথায় রাখছেন, কাদের রাখছেন, সে-সব না কইলে আমরা আপনারা ভাগ মানব কেডা?’ 

‘দেখেন, যোগেনবাবু, ওদের, মানে আপনাদের ট্যাকে আছে একটা মুসলমান। তাতেই তো আপনারা সেজেছেন জাতি। আর মুসলমানদের সাজিয়েছেন জাত। আমাদের মধ্যে, মানে লিগের সঙ্গে যে আপনারা এতজন হিন্দু আছেন তাদের মাথা গুণেও কংগ্রেসকে এইটুকু মানাতে পারছেন না, যে আমরা অন্তত ইনডিয়ার মুসলমানদের দল। কোত্থেকে এক মৌলানা জোগাড় করে তাকে কংগ্রেসের পার্মানেন্ট প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন। কী দেখাতে? না, কংগ্রেসের সভাপতি একজন মুসলমান। কাকে দেখাতে? জানি না। লিগকে যে আপনারা মোল্লা-মৌলানার দল বলেন, সেটার শুরু তো কংগ্রেসই করল। এখন একটা টুর দিয়ে আসেন, সারা বাংলা মোল্লা-মৌলানা-মসজিদে ছেয়ে গেছে।’ 

‘আপনার কথার প্রতিবাদ কইরলে মাইন্যা নেয়া হব যে আপনে আমারে যে-দলে ঠেলতে চান, সে-দলের প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। আপনে যতই আমারে শিখন্ডী বানান, আমি শিখন্ডী হব না। আমি শুদ্দুর। খাঁটি শুদ্দুরই থাকব। বামুনচাটা শুদ্দুর হব না। শুদ্দুরগ নিয়্যা হিন্দুগ দল পাকাইতে দিব না। আমি চলি গোপালগঞ্জে। শ্যামাপ্রসাদের আগে তো পৌঁছানো নাগে। তাই আপনারে কয়্যা গেলাম। না-হয় তো ভাইব্যা রাইখবেন লঙ্গরখানা তো মণ্ডলের কারখানা।’ 

‘গোপালগঞ্জে আপনার উদ্দেশ্য কী?’ 

‘শ্যামাপ্রসাদকে লঞ্চ থিক্যা নামতে দিব না।’ 

‘সেটা তো খবর পাঠিয়েই করা যায়। আপনি গেলে তো আরো ভাল। সেখানে লিগের লোকজন যদি আপনাদের সঙ্গে থাকে, তাহলে কি কোনো আপত্তি আছে। আপনার?’ 

‘লিগ কী করবে না করবে সে তো লিগের ব্যাপার। আমি কেডা আপত্তি তোলার?’

‘আপনি লিগ মন্ত্রিসভার লোক না?’ 

‘না। আমাগ তো কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা। স্যারের—’ 

‘বেশ তো। শিডিউল ক্লাশ বলেই তো লিগের সঙ্গে আন্দোলন করতে আপনার বাধবে না। হিন্দু হলে বা কংগ্রেস হলে—বাধত।’ 

‘লিগের কোনো নাম করা নেতা য্যান না থাকে। ফ্ল্যাগেরও কাম নাই। তাইলেই কইলকাতার ইংরাজি-বাংলা কাগজ হেডিং করব, ‘শ্যামাপ্রসাদের বিরুদ্ধে লিগের বিক্ষোভ।’ তাইলে সব মাঠে মারা যাব। কিন্তু ‘শ্যামাপ্রসাদের বিরুদ্ধে তপশিলিদের বিক্ষোভে’—বাবুদের টনক নড়ব।’ যোগেন উঠে দাঁড়িয়েছিল, সারওয়ারদি হাত তুলে তাকে আটকায় ও ফোনটা তুলে নেয়। নম্বর চেয়ে রিসিভার রেখে বলে, ‘আপনি কখন, কোথায় নামছেন?’ ফোন লাইনটা এসে যায়। সারওয়ারদি বলেন, ‘গোপালগঞ্জে কাল আমাদের ল-মিনিস্টার জে এন মণ্ডল যাচ্ছেন। হিন্দুমহাসভার মিটিং ডাকা আছে। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে লিগের লোকজনকে জমায়েত হতে হবে—ফ্ল্যাগ ছাড়া। মিঃ মণ্ডলের নির্দেশমত সব হবে। এই খবরটা তো আজই পৌঁছুতে হয়।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *