১৭১. খরচের খাতায় বাংলা
বম্বে তো রণাঙ্গনের সম্মুখভাগ ছিল না। আর কলকাতা ও বাংলা পুরো পূর্ব-রণাঙ্গনের বোঝা নিয়ে, পলায়মান ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের বোঝা নিয়ে, রেঙ্গুন-উদ্ধাস্তুদের বোঝা নিয়ে, চালের খোলা বাজার ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার সামনে সরকারি কর্মচারীদের যুদ্ধভাতা দু-এক পয়সা দেয়ার ব্যাপারে সর্বভারতীয় নীতির জিগির তুলে রাখেন, বাংলার ছোটলাট হার্বাট। সব দিক দিয়েই বাংলা খরচের খাতায় উঠে গিয়েছিল। যেটুকু গুরুত্ব ছিল তাও মুসলিম জনসংখ্যার কারণে।
এরপর হার্বাটের যে ব্যক্তিগত ও গোপনীয় রিপোর্টে প্রথম খাদ্যের কথা এল, দাম বাড়ার কথা এল ও দরনিন্ত্রণের কথা এল, তার তারিখ ৭ জুলাই ১৯৪২—প্রথম সেই চিঠিটির ২ বছর ৭ মাস পর, তাও কমিশনারদের একটা সম্মিলনের বিবরণ দিতে গিয়ে। ‘সবচেয়ে জরুরি ও ঝামেলার কথাটা ছিল প্রতিদিনের খাওয়া-দাওয়ার খরচার ব্যাপারে। চালের দাম বাঁধতে গেলে আবার পাঞ্জাবের মতো প্যাঁচে পড়তে না হয়, গমের দর বাঁধতে গিয়ে যা হয়েছিল। কমিশনাররা সকলেই বললেন, লাইসেন্স ছাড়া বাংলা থেকে চাল রপ্তানি বন্ধ করা যায়, তাহলে দরবাঁধার দরকার নেই। জিলাগুলির মধ্যে চাল যাতায়াত একটু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও জিলা-অফিসাররা যেন তাঁদের জিলার ধানচালের আলাদ-আলাদা দর বেঁধে না বসেন।
৪২-এর জুলাইয়ে বাংলার গ্রামে ভাতের অভাব যে কতটা ছড়িয়ে পড়ছে ও কত গভীরে ঢুকেছে—তা জানতেন না প্রশাসন, তা জানতেন না এম এল এরা, জানতেন না কোনো পার্টি প্রশাসন ব্যতিব্যস্ত ছিল যুদ্ধের সিভিল সাপ্লাই বহাল রাখতে ও জিলা সদরে ওয়ার ফ্রন্ট তৈরি করে চাঁদা তুলতে। আইনসভার অধিকার যুদ্ধের সময় এতই কমিয়ে দেয়া হয়েছে মেম্বররা মন্ত্রিসভার লোকবদলে ও পার্টি বদলে অষ্টপ্রহর ব্যস্ত থাকতে পারতেন। তাঁরা তাঁদের নির্বাচনক্ষেত্রে যেতেনই না। যদি যেতেন, তাহলে তাঁরা বুঝতে পারতেন, এক-একটা পার্টি যে এক-একটি জায়গায় জোরদার হয়, তার কারণ তো সেই জায়গার কোনো আঞ্চলিক সমস্যা মেটাতে সেখানকার মানুষজনেরা তাঁরা জড়ো করতে পারেন। যেমন কালীগঙ্গার লঞ্চ সার্ভিসকে শুধু ফেয়ার ওয়েদারের বদলে অল ওয়েদার করা, যেমন কুমিল্লার চাষীদের বাসে পাটের টিকিট তুলে দেয়া, যেমন নোয়াখালির ফেরিবাড়ির খালের ওপর আড়াআড়ি একটা কাঠের ব্রিজ বানানো—যাতে গরুর গাড়ি পেরতে পারে। যুদ্ধের সময় তো আর এ-সব লোক্যাল থাকে না। সবই হয়ে যায় যুদ্ধ বিষয়, গ্লোব্যাল। এই সব স্থানীয় পার্টিগুলিতে আর পার্টি বলে কোনো কাজ ছিল না। থাকলে, তাঁরা জানতে পারতেন।
দুর্ভিক্ষ কথাটির অর্থ যদি হয়—সে সময় একমুঠ ভিক্ষেও জোটে না, বা, আরো একটু বদলে যদি অর্থটাকে করা যায় মানুষের অনাহার, ১৯৪২-এর জুলাই, মানে বাংলার ১৩৪৯-এর আষাঢ়-শ্রাবণেও যে মানুষজন হাটে ঘাটে ঘুরে বেড়াত তাদের চোখেই পড়ল না—বড় বড় হাটখোলায় বা স্টিমারঘাটায় কোনো কোনো ভিড় হয়ে যাচ্ছে?
৪৩-এর দুর্ভিক্ষ পৃথিবীর ইতিহাসে কঠিনতম দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষ দুর্ভিক্ষতত্ত্বই বদলে দিয়েছে। খাদ্য ছিল না, ফলন নষ্ট হয়ে গেছে বা পঙ্গপাল চেটে দিয়েছে—এমন কোনো কারণই নেই। ফলন ভাল, দর ভাল, পরের বছরের আমনও ভাল। খাদ্য-ফসলের অভাবের কারণে দুর্ভিক্ষ হয় না। দুর্ভিক্ষ, মানে যদি হয় না-খেয়ে মরা, তাহলে খাদ্যের অভাব বোঝায় না, বোঝায় যারা মারা গেল তারা খাদ্যের কাছে পৌঁছুতে পারল না। সে কী করে খাদ্য পাবে? কেমন ভুল পায়ে দুর্ভিক্ষটা দুর্ভিক্ষ হয়ে গেল।
চাষী কোনোদিন ফসলের বিনিময়ে এত নগদ পায়নি। বাংলায় ঐ ১৯৪০ থেকে ৪২ ছিল চাষীদের ফূর্তির সময়। প্রশাসন, রাজনীতি, নেতা কারো চোখেই পড়ল না। চোখে পড়ে গেলে বিরক্ত হচ্ছেন সবাই। ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ হার্বার্ট সেই বিরক্তি নিয়েই লিখছেন, ‘এই প্ৰদেশ থেকে পারস্য উপসাগর ও সিংহলে চাল রপ্তানির কথা জানলে আপনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন। হকশাহেব ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন—বাংলার কোথাও চাল নেই। বরং শ্যামপ্রসাদ মুখার্জির আক্কেল আছে। আইনসভার মেম্বারদের তিনি মুখের ওপর বলে দিয়েছেন—বাঙালি একা বাঁচতে পারবে না, চাল ছাড়া আর সব কিছুতেই ভারতের অন্য সব প্রদেশের ওপর বাংলা নির্ভরশীল। চাল রপ্তানির ফলে আমাদের কী ক্ষতি হয়েছে? তিন মাসের যে রপ্তানি-বরাত এসেছে আমাদের কাছে, ৩৫০০০ টন, সে চাল তো বাঙালির দু-দিনের আহার।’
সেই প্রথম লঙ্গরখানার জায়গা বাছতে যাচ্ছেন সারওয়ারদি, যোগেন, পিনেল শাহেব আর বরিশালের এম এল এ হাশেম আলি শেখ। হোম সেক্রেটারি এস ডি ওকে জানিয়ে দিয়েছিলেন—এয়ার রেইডের জখমি লোকজনের জন্য বারাসতের একটু পুবে যে ক্যাম্প তৈরি হয়েছিল, ওপরে বাঁশের ছাউনি ও মেঝেতেও বাঁশের বাতা ছড়িয়ে, সেই ক্যাম্পটাতে লঙ্গরখানা চালু করতে। কাঁচা ঘর বলেই লঙ্গরখানার আশ্রয়প্রার্থীদের তাদের দেশে ফেরৎ পাঠানোর পর এই ক্যাম্পটা পুড়িয়ে দেয়া যাবে—সংক্রমণ এড়াতে। তখন প্রয়োজন হলে একটু পাকা ব্যবস্থাও করা যাবে।
এস ডি ও জায়গা মত দাঁড়িয়ে ছিলেন। একসঙ্গে তিন-তিন মন্ত্রী হাজির হওয়ায় নার্ভাস হয়ে যান। তারপর পরস্পরের কথাবার্তায় ঠিক হল—এক বেলার গ্রুয়েল কিচেন। প্রথম ধাক্কায় গ্রুয়েল বেশি করে খেয়ে পেটখারাপে মানুষজন মরে যেতে শুরু করে। তাই, এক হাতার বেশি প্রথম দিকে দেয়া হবে না। বারাসাত হাসপাতালকে প্রথম দিকে ‘সক্রিয় সহযোগিতার’ জন্য অনুরোধ করা হবে, যাতে কারো কোনো অসুখবিসুখ করলে সেও আরো কিছুটা যত্ন পায় পিনেল শাহেবই বললেন, ‘কাউকে সন্দেহ না করেও এটা আমাদের দায়িত্ব হওয়া বোধহয় দরকার যে লঙ্গরখানা সম্পর্কে এমন গুজব যাতে তৈরির সুযোগ না থাকে যে এখানে যে খাবার দেয়া হচ্ছে, তা যথেষ্ট নিরাপদ নয়।’
যোগেন একটু হেসে বলে, ‘যুদ্ধের টাইমে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় গুজব। এতদিন ধরে যুদ্ধ তো, নতুন-নতুন জায়গা, নতুন নতুন নাম, লোকজনের জিভ শুলশুলায়। এগ কিন্তু কোনো ফল লাভের আকাঙ্ক্ষা নাই, শুধু কর্মের অধিকার। রটাইয়্যাই সুখ।’
সারওয়ারদি এস ডি ও-র সঙ্গে পায়চারি করতে করতে কথা বলেছিলেন, গ্রুয়েল কিচেনের জন্য খাদ্য সাপ্লাই কোথা থেকে হবে, সেন্ট পারসেন্ট গবমেন্ট অর্গানাইজেশন, রান্নাবান্নার কাজ যারা করবে তারা ঠিকে লোক হিশেবে কাজ করবে ও পেমেন্ট পাবে। কোনো প্রাইভেট বা ভলান্টারি সংগঠন যদি রিলিফ দিতে চান, দে উইল হ্যাভ টু হ্যান্ডওভার দেয়ার মেটেরিয়ালস টু গবমেন্ট অ্যান্ড সাচ অর্গানাইজেশনস মাস্ট হ্যাভ নো রোল ইন দি অর্গানাইজেশন। নো ডিসিশন মে বি টেকেন অর অ্যামেনডেড উইদাউট দি স্পেসিফিক ইনস্ট্রাকশনস অব দি রিলিফ কমিশনার, মিস্টার পিনেল। যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি ঘটে, গভমেন্ট উইল টেক সাইড অফ মিস্টার পিনেল। এটা না হলেই ভাল হত, কিন্তু আমরা এটা এড়াতেও পারি না যে টু রান সাচ গ্রুয়েল কিচেনস থ্রু আউট দি প্রভিন্স ইজ অ্যান এসেনশিয়াল পার্ট অব দি ওয়ার ইফর্টস।’
