১৬৯. অলৌকিক আরো তল্লাশ
যোগেন যে সেই মাটির আধ-ইঞ্চি মত ওপর দিয়ে হাঁটার মত করে চলছিল খুলনাতেই সে তিরিশ মাইলের জনহীন, বাস চিহ্নহীন, কৃষিহীন, বেকবুল জলপ্রান্তর ছেড়ে এল, যদিও তার হিশেবমত ছাড়ার কথা নয়—যেখানে সে প্রথম অনস্বীকারের লক্ষণ পেল সেটাও তো নদীতীর, যদিও প্রাচীন কিন্তু তার নতুন খাতও তো আছে, সেটা থেকে তিরিশ মাইলের মধ্যে মানুষের স্থায়ী বাস শুরু হয়ে গেছে। যোগেন তো এই স্থান তার সর্বাঙ্গ দিয়ে জানে। মাটি থেকে সে স্পর্শ নিচ্ছে না বা মাটিকে কোনো স্পর্শ দিচ্ছে ও না, এখন, তার এই অলৌকিক পর্যটনে। কিন্তু তার গায়ে তো লাগছে বাতাসের ছোঁয়া—জলপ্রান্তর থেকে বয়ে আসা হাওয়ায় কত দূরে নদী তা বোঝা যায়, আবার বর্ষণঘন কোনো দীর্ঘ ঋতুতে সেই ছোঁয়া দূরত্ব ঘুচে যায়। আবার ভাদ্র-আশ্বিন দু-মাস ধরে হাওয়ায় হাওয়ায় ফসল-ফসল-ফসলের গন্ধ থাকে। কাঁচা ও সবুজ সে-গন্ধের এমনই বশীকরণ যে আর কোনো অনুভবের জন্য জায়গা রাখা যায় না। কিন্তু যোগেন তো পেয়ে যাচ্ছে এখানে এখন আলাইপুরে—তাকে ঘিরে থাকা আঠারবাঁকি আর মজা ভৈরবের বাতাস। তাহলে আলাইপুরও কি বরবাদ? যোগেন নিজের মনে মুচকে হাসে—যে-যুদ্ধ চলছে বলে খবর সে যুদ্ধে আলাইপুরও কি একটা অনস্বীকার্য গ্রাম হতে পারে?
আলাইপুরেই যোগেন যখন মজাভৈরবের পাড় ধরে উত্তরে এগচ্ছে, একটা সরকারি খাম তার হাতে এসে ঢুকে পড়ল। হ্যাঁ। সরকারি খামই বটে। শুকনো বালির রঙের খসখসে কাগজ। যুদ্ধের সময় এর চাইতে জল কাগজ ব্যবহার নিষিদ্ধ। তার ওপরে ছাপা ‘অন হিজ মেজেস্টিস সার্ভিস’। আঠা ও কাগজ দুইয়েরই অভাব। তাই খামের মুখ আঠা দিয়ে সাঁটা নয়। খামের ঢাকনাটুকুতে একটুখানি স্লিপ লাগিয়ে দিতে হয়। ওটা ছিঁড়ে চিঠি খুলে পড়ে, তার জবাব ঐ খামেই নতুন স্লিপে প্রাপকের নাম-ঠিকানা লিখে দেয়া হয়। চিঠি যদি একাধিক পৃষ্ঠার হয়, তাহলে, জোড়া লাগাতে আলপিনের বদলে বেলের শুকনো কাঁটা দিয়ে পিন-আপ করতে হবে। সর্বত্র সরকারি অফিসে শুকনো বেলকাঁটা সাপ্লাইয়ের কনট্র্যাকট দেয়া হয়েছে লোক্যালদের। কারো সুপারিশে তো নিশ্চয়ই কিন্তু কমিউনিটি রেলিও সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে। মুসলমান, বর্ণহিন্দু, মুসলমান ও অবর্ণ তপশিলিদের মধ্যে যোগেন তার অব্যাহত যাত্রায় চিঠিটি পড়ে দেখে, তাকে নাজিমুদ্দিনশাহেব, তাঁর মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করেছেন ও তাকে অবিলম্বে কাজে যোগ দিতে বলেছেন।
সে-রকমই কথা ছিল। তপশিলের ২১টার ভোট নাজিমুদ্দিনের প্রধানমন্ত্রিত্বে বড় বেশি দরকার।
যোগেন আরো খানিকটা এগিয়ে যেতেই দু-একজন শাহেব দেখে, তাদের কাঁধে ও বুকে দাঁড়ি কাটা—কিছু সাঁটা কাপড়ে সাঁটা, ঠিক বাঁ পকেটের ওপরে।
যোগেন তেমন এক বিদেশীর সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে, যুদ্ধ প্রস্তুতির কাজ কোথায় দেখা যাবে।
যোগেনকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে সেই শাহেব মুচকে হেসে জিজ্ঞাসা করে—আপনাকে তার হদিশ দেয়া কেন হবে। যোগেন পকেট থেকে তার নিয়োগপত্রটা বের করে দেখায়। যোগেন নিশ্চয়ই দুই পায়ের জুতোর ঠকঠক সেলামের অপেক্ষায় ছিল। লোকটি সেলাম না দিয়ে মুখটা তুলে বলে, ওয়েলকাম। মন্ত্রিসভাটভা এত তাড়াতাড়ি বদলে যায় যে ঠিক খেয়াল রাখা যায় না। আপনি থানায় রিপোর্ট করলে সবচেয়ে সুবিধে হত। মন্ত্রী-টন্ত্রী তো ওদেরই কাজ। আমাদের কাজ যুদ্ধ করা।
আমাকে কি তবে অন্য কোথাও যেতে হবে?
না। কখনো-কখনো এমন উদ্ভট ব্যাপারও ঘটে। আপনি না-জেনেও সবচেয়ে ঠিক জায়গায় এসেছেন। এটা আমাদের রিক্রুটিং সেন্টার। এখানে আমরা তিনদিন ক্যাম্প করছি, গতকালও করেছি, আগামীকালও করব। একটু দাঁড়াতে হবে। আপনার জন্য গাড়ি পাঠাতে বলব।
আপনার লাগলে বলুন। আমার গাড়ি দরকার হবে না। আপনার লাগলে বলতে পারেন। এখানেই কি অপেক্ষা করব?
না। এই তো চলুন, এই গেটের পেছনেই ডিউটি রুম। আপনি একটু বসুন। ওখান থেকেই ফোন করব।
যোগেন যে তার মত করে সেই ভিতর দিকে চলে গেল, তা, ঐ অফিসার টেরই পেলেন না, উনি ফোনের ওপর নুয়ে ছিলেন, যোগেনের দিকে পেছন করে।
মাটির আধইঞ্চি ওপর দিয়ে যোগেন হাঁটার ভঙ্গিতেই এগিয়ে যাচ্ছিল। খুব একটা খোঁজাখুঁজি ছিল না সেই গমনে। যোগেন যে জানেই সে পৌঁছে যাবে। আর পৌঁছে গেলও।
সে খুঁজছিল ওই বেকবুল জলদেশ থেকে উৎখাত মানুষগুলো কোথায় গেল। একটু-আধটু নিশানা পেলেই সে বুঝে যাবে। যোগেন জানে, এটা আইনসভায় নোটিশ দিয়েও জানা যাবে না যে সৈন্যবাহিনীতে নতুন নিয়োগে তপশিলি অনুপাত কী? কোন জেলায় কত?
যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য মন্ত্রিসভার জানার এক্তিয়ার নেই। এমন সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন যুদ্ধরত সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে পারে।
যোগেন তার মতো করে বুঝে নিতে পারে।
একটা নতুন ক্ষেত আবাদে আনতে নাকি প্রথম বছর চাষ দেয়া হয় না। প্রথম বছরে কয়েকবার হাল চালিয়ে কিছু আউশ ছিটিয়ে দেয়া হয়। আউশের মধ্যেও এই ধান একটু না কী আলাদা যে আগে চাষ দেয়া যায়, আগে পেকে যায়, আগে কাটা যায়। সেই পাকা ধানের ক্ষেত যখন পাশাপাশি প্রথম হালের আমন ক্ষেতের মধ্যে সোনালি হলুদের একটা পোচ হয়ে ওঠে, তখন মনে হয় ঐ সোনা-হলুদ মাটির নয়, আকাশের সূর্যোদয় বা অস্তের রং। আকাশেই এক রং গড়ায় না। পোচ হয়ে থাকে। সে ধান তো কাটা হয় না। দুনিয়ার যত বেলে হাঁস সেই জলদেশ থেকে উড়ে এসে এই ক্ষেতটুকুর ওপর পড়ে। লুটপাট করে ধান খায়। বন্দুক নিয়ে শিকারে আসে শাহেবসুবোরা কোনো বাবুর নেমন্তন্নে। যে পাখি ধান ঠুকরচ্ছে তাকে তাক করা যায় না। উড়াল দেয়া পাখি তাক হয় সবচেয়ে ভালো। একটা বানানো আওয়াজে পাখিগুলো উড়িয়ে দেয়া হয়। বন্দুকগুলি একসঙ্গে গুলি ছাড়ে। পাখির ঝাঁক আওয়াজ পেয়েই তল বদলে ফেলে, নীচে নেমে যায় বা ওপরে উঠে যায়। ঝাঁক থেকে দুটো-একটা পাখি চৈত্র মাসের বট পাতার মতো ঝরতে থাকে। বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে যায়, নড়ে না।
তখন একটা বেশ মজার ঝগড়া বাঁধেঝাঁকে কত পাখি ছিল, কটা পাখি মারা গেল, কে কটা মারল। সকলেই জানে, এ ঝগড়ার কোনো মিটমাট নেই। সমস্ত হিশেবটাই মিথ্যে।
যোগেনদের বাড়িতে কোনো চাষ নেই। চাষ নিয়ে, ফসল নিয়ে, মাটি নিয়ে তাদের বাড়িতে কোনো কথাবার্তা গড়ায় না। তাই সে কিছুতেই মনে আনতে পারে না—এই নতুন আবাদের প্রথম ধানটাকে কী নামে ডাকে। এই ধান আর ঐ বেলেহাঁসের ঝাঁক আর ঐ বন্দুক নিয়ে কী একটা ছড়াও ছড়ানো আছে—সেটাও যোগেনের মনে পড়ে না। ধানটার নাম মনে পড়লে হয়তো ছড়াটাও মনে পড়ে যেত। সেই ছড়া কেটে বলা হয়েছে, অকালের ধান খেয়ে গতর যা করেছ, শিসের গন্ধ পেলে বলে। না, এমন না। এ-কথাটা ছড়া থেকে মনে হতে পারে, কিন্তু এত কথা কি ছড়া জিভ নাড়িয়ে বলতে পারে? যোগেন আবার চেষ্টা করে ধানটার নাম মনে করতে; ধান ফোলে—উড়ি ফোলে, শিসা ডলে। মনে পড়ে গেছে যোগেনের। উড়ি ধান—ঐ ধানের নাম যার সঙ্গে বেলেহাঁস আর বন্দুক মিলে গেছে।
যুদ্ধের সৈনিকের চাকরিতে যদি নেয়, তাও তো খেয়ে বাঁচবে, মাইনে পাবে, টাকা পাঠাতে পারবে। আর, নেবেই বা না কেন? নমশূদ্ররা নাকী কোন এক কালে যোদ্ধা ছিল, বারভূঁইয়াদের সেনাপতি ছিল, কত গল্পকথা, কোন সর্দার এক লাঠিতে দশজনের মহড়া নিত।
যোগেন দেখে, লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে তার চেনাজানা মুখগুলি। বেশির ভাগই খালি গা বলে হাড়ের কাঠামোটা যেন ফুঁড়ে বেরচ্ছে—চওড়া কাঁধ, ঊরুর হাড় যেন মাটিতে গেঁথে যায়, না খাওয়া শরীরে কলাপাতায় যেটুকু তেল থাকে, তাও নেই। বুকের খাঁচাটা পেটের হাড়ের ওপর খাড়া—যেন দুই মানুষের বুকের জন্য তৈরি খাঁচাটা এক মানুষের বুকেই এঁটে গেছে।
যোগেন লাইনের মাথায় টেবিলের মতো কিছু একটা পেতে যে লোকটি ওজন নিচ্ছিল, হাইট দেখছিল, নাম-ঠিকানা লিখছিল তার কাছ থেকে জানল—এদের সকলেই আর্মিতে যাবে; কিন্তু সকলেই বন্দুক হাতে ফ্রন্টে যাবে না, বেশির ভাগই সাপ্লাই লাইনে থাকবে, সিগন্যালিঙে থাকবে যদি একটু লেখাপড়া জানে, ক্যাম্প কিচেনে যাবে, ক্যাম্প হসপিটালে যাবে, সুইপার, মেসেঞ্জার, এগুলোতেও যাবে। যুদ্ধ চলছে আর ফ্রন্ট এগিয়ে আসছে বলে মেডিক্যাল একজামিনেশন বাদ দেওয়া হয়েছে। এই লিস্ট থেকে অফিসার আর ডাক্তাররা মিলে টিক দিয়ে দেবে—ওজন, হাইট আর বয়স মিলিয়ে, কে কোনো কাজ জানে কী না—ড্রাইভার বা কামার বা ছুতার বা মুচি বা ডোম বা মেথর, রসুইওয়ালা, সেটাও লেখা হচ্ছে। স্পেশালাইজ জব। আমি এখানে কিছু করছি না। শুধু টানা নেশাখোর আর চামড়া বা বুকের কোনো দেখলে-শুনলে চেনা যায় এমন অসুখের রোগীদের বাদ দিচ্ছি আর হাঁটাচলা স্বাভাবিক কী না দেখে নিচ্ছি। যাদের ফ্রন্টের জন্য বাছা হবে তাদের পনের দিনের ট্রেনিঙে পাঠানো হবে। যারা ফাইটিঙে যাচ্ছে না, তাদের কালই পোস্টিঙে পাঠিয়ে দেয়া হবে। ওখানেই কাজ করতে করতে ট্রেনিং হবে।
যোগেন এই সৈন্যের কথা শুনতে-শুনতে দেখ ছিল—সেই জলদেশের অনেক মানুষ লাইন বেঁধে এমন হাঁটছে যেন তার সামনে দুটো বলদ আছে আর তার মুঠোতে হালের হাতল। কেউ-কেউ যেন জলের ভিতর দিয়ে হাঁটছে জলকে মাটি ভেবে। একটু হাসিঠাট্টা যে নেই তা না, হাসিঠাট্টা না করে কি মানুষ যুদ্ধ পর্যন্ত যেতে পারে, কিন্তু এই পুরো সমাবেশের ওপর গুমোট এক মেঘের অনিশ্চিত ছায়া। এক চির-অচেনার সম্মুখীন হওয়ার অনিশ্চয়।
আর, বাকিরা? যাদের যাওয়ার মতো যুদ্ধ ও নেই?
