১৬৮. বেকবুল দেশের তল্লাশ
যোগেন তার চেনাজানা মানুষগুলির খোঁজে সেই জনহীন জলভুবন পেরতে লাগল, হ্যাঁ, হেঁটেই, কিন্তু পায়ের তলা দিয়ে সেই সেই মাটি বা জল ছুঁল না। সেখানে, সেই বেকবুল (ডিনায়েড) দেশে, মানবসম্পর্কোচিত সমস্ত সম্বোধন লোপাট। সেই জলপ্রান্তরে যাতায়াতের কোনো পথও নেই, সাঁকোও নেই, উপায়ও নেই। সেখানে মানুষের পায়ের ছাপফেলা আইনত নিষিদ্ধ।
যোগেন তো শূদ্র। তেমন কোনো উপমা-প্রতিমা তৈরি করা তার ধাতে নেই। স্বদেশ, জন্মভূমি, স্বাধীনতা, জাতিত্ব, এসব এখন তার জানা কথা হতে পারে। এ-বিষয়ে তার নানারকম মত বা অমতও তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এ-সব কোনোটাই তার জন্মসূত্রে পাওয়া নয়, এমন কী শিক্ষাসূত্রেও নয়। শিক্ষায় হতে পারত। স্কুল-কলেজে তো যোগেন পড়েছে খিলাফৎ-আইন-অমান্য, অসহযোগ, সত্যাগ্রহের সময় জুড়ে। গান্ধী না জেনে কি তখন কোনো উপায় ছিল? বিশেষ করে যোগেন বর্ণভেদ নিয়ে তখন কিছু আপত্তি করেছে, বরিশালের কালীবাড়ির ঘটনা, ল-কলেজ সরস্বতী পুজোর ঘটনা, সমস্ত গীতা মুখস্থ করার ঘটনা ও সেটা সবার সামনে আবৃত্তির ঘটনা। এগুলো তো সচেতনতা ছাড়া সম্ভব ছিল না।
সম্ভব হোক বা না-হোক, যোগেন জানে ও-সব সচেতনতার খোঁজখবরও তার ছিল না। গান্ধীজির আন্দোলনের সে বিরোধীই ছিল। স্কুল-কলেজ ছেড়ে দিলে বামুনের ছেলে বামুনই থাকবে, পরে পরীক্ষা দিয়ে পাশও করবে, চাকরিও করবে কিন্তু কোনো নমশূদ্রের ছেলে ক্লাশ টেনে বা কলেজে পড়াশুনো ছেড়ে গান্ধীজি-স্বামীজি করলে তার আর জীবনে কখনো পরীক্ষা দেয়াও হবে না, পাশ করাও হবে না। তেমন একটি শূদ্রসন্তানের পড়াশুনো করা বা পাশ দেয়াটা তার বাড়ির লোকজনও চায় না, তার চৌদ্দ পুরুষও চায় না। বরং পড়াশোনা বন্ধ হলে বাড়িতে একজন কাজের লোক বাড়বে। করা যায় এমন কোনো কাজ বাড়িতে না-থাকলেও, জমি-নৌকো-মহাজনি-মাঝিগিরির মত কাজের সামান্য সুযোগও না থাকলেও। বাড়ির লোকজন অন্তত স্বস্তির শ্বাস ফেলত—যাক, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল, শুদ্দুরের ছেলে শুদ্দুরই থাকল। ঘরে থাকলেই শুদ্দুরের কাজ জুটে যায়—বামুনবাড়ি কায়েতপাড়া বদ্যিদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করলেই, এই কাঠটা চিরা দে, এই গোয়ালটা ধুয়্যা দে, এই আলটায় মাটি ঢাল, এই বস্তাটা ঘাড়ে নে, এই নৌকাডায় গুন টান। এটা তো মুখের কথা—বামুনবাড়ি যাইও না, ওরা খাড়া মানুষ দেইখব্যার পারে না। খাটালেই যে খেতে দেবে বা একটা ডবল পয়সা দেবে মজুরি বলে—তার কিছু ঠিক নেই। শুদ্দুরের ছেলে তো, চোর কী না কে জানে—ঠাকুরগ এই মত ঠিক হতেই তো দুই বা ফরশা। এক যদি কপালের জোরে দাঙ্গা বাঁধে বা বামুন বাড়িতে ডাকাত পড়ে আর ছ্যামড়া যদি টাইম-মাফিক থাকে ঐখানে আর বামুনদের ও তাদের বাড়িঘর বাঁচায়, তা হলে ঠাকুরমশার বা ঠাকুরগিন্নির কৃপা হতেও পারে। কত শুদ্দুরই তো সেই সুবাদে কত ভদ্রবাড়িতে থেকে গেছে, লেঠেল হয়েছে, নামধাম করেছে। শুদ্দুরনি ছাড়া ভদ্রলোকদের বাড়ির পোয়াতিদের আঁতুড় সামলাবে কে। শুদ্দুর ছাড়া বাড়ির বুড়িকে পোড়ানোর জন্য অমাবস্যার শেষ রাতে গাছ কাটবে কে।
যোগেনের সচেতনতা, সে বাইরেরই হোক আর ভিতরেরই হোক, হিন্দু বর্ণভেদ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। দেশ, জাতি, নেতা, দাঙ্গা, গান্ধীজি, শ্রমিক-কৃষক, স্বাধীনতা, যুদ্ধ এগুলো মাত্র বছর পাঁচ-সাত হল তার কাছে সত্য হয়ে উঠছে। সত্য হয়ে উঠছে এমন বিস্ফারে ও গতিতে, যে আগ্নেয়গিরির লাভা উদগীরণ দেখা থাকলে সেই উপমাটাই সে ভাবত। কিন্তু সে তো শিশুকাল থেকে এই সেদিনও ভোলায় দেখেছে কী বেগে সমুদ্রের হাওয়া তার চলাচলের নদীগুলির তল থেকে মাটি পর্যন্ত পৌঁছে অতলের মাটির জল-বিস্ফোরণ ঘটায়। যোগেনের ভিতরসত্যের তেমনই একটা বিস্ফোরণ ঘটছিল এই জলপ্রান্তরের ওপর দিয়ে কিছু স্পর্শ না করে এই বেকবুল দেশে অনুপ্রবেশের ফাঁক-ফোঁকর খুঁজতে। যোগেনের পা মাটি ছুঁচ্ছিল না বলেই সে যেতে পারছিল। সে যেতে পারছিল বলেই, সে এই জমিকে তার স্বদেশ ভাবতে পারছিল ও বাংলার অজস্র নভেল-নাটকের স্টাইলে সেই স্বদেশ, স্বাধীনতা ও যুদ্ধ সম্পর্কে ভাবতে পারছিল :
এই সেই পূর্বদেশ, গৌড় ও বঙ্গ, যেখানে ভাসমান পৃথিবীর একমাত্র অথচ অকালভূমিষ্ঠ কণ্টকারণ্য। এই সেই নদীভাসা দেশ যার নানা আকারের জলের নানা মিষ্টত্বে, নানা রঙের অঙ্গুলিমেয় মৎস্যকন্যারা যথা পুঁটি, ফলি, ফেঁসা, মৌরলা, ট্যাংরা, সরপুঁটি, খড়সে, চাপিলা—নাচের মুদ্রায় সাঁতার কাটে। এই সেই ভেজা দেশ যার ভিতর থেকে নিশিদিন উত হতে থাকে অজস্র রঙের ও নকশার সবুজ লতাপাতা ও শাকপাতা। এই সেই জল-মাটি-পাখিদের অতি উর্বরতার বাহুল্যকে ঠাট্টা করে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর ও রাজমহল পাহাড়ের পশ্চিমের আর্যাবর্তের সামবেদী দীর্ঘ পৈতেধারী দীর্ঘবাহু অতিহিন্দু বিদূষকগণ শাকম্ভরী, মছলিখোর, পক্ষীখোড় ও অক্ষরডম্বরের কবি বলে আসছেন অন্তত হাজার দেড়েক বছর। এই সেই একনদীর দুই মোহানার দেশ যেখানে উজানস্রোতে শীতের সৈকতের ঝুরঝুরে রুপোলি বালি রঙের মৎস্যানী তার চ্যাপ্টা ও খটে শরীরে গোপন শ্রোণি দেশের অনাস্বাদিতপূর্ব তৈলাক্ত যৌনতার গন্ধে শ্বাস ভারী করে। সে-মৎস্যানীরা অধিকাংশ সময় মূর্তির যক্ষিণীর মত।
এই বিপুল জলদেশ মহাদেশ স্রোতোদেশ ঘূর্ণিদেশ নৌদেশ মেঘদেশকে কতটাই শিক্ষিত নিশ্চয়তায় চিহ্নহীন করে দেয়া হল। এমন শিক্ষিত নিশ্চয়তা থাকে শুধু তেমন কল্পনাক্ষমদের যারা এক কল্প পরিমাণ সময় দেখে ফেলতে পারে সেই সময়ের সূচনার আগে। যারা দ্রষ্টা। যারা নিজেরও অজ্ঞাতে ইতিহাসের বাহক। যারা অনেক অতীত থেকে স্থির মানববসতিকে অনায়াসে বাতিল করে দিতে পারে নদীর পারাপার সেতুতে জুড়ে দিয়ে, মানুষের ভারবহনশক্তির অতিরিক্ত ভার—উত্তোলনে ক্রেন ব্যবহার করে। যদি পেরেক আর ক্রেন, যদি সামান্য স্বয়ংক্রিয়তাই, সভ্যতাবাহক হতে পারে, তা হলে, এমন একটা জলদেশ, মহাদেশ, ঘূর্ণিদেশ, স্রোতোদেশ, থেকে ইতিহাসের সব চিহ্ন লোপাট করে দেয়া সম্ভব। ইতিহাসকে ধ্বংসচিহ্নহীন, ক্ষতহীন, আদিম ও নৈসর্গিক করে দিতে তো শুধু একটা মহকুমার হাকিম হলেই চলে, যারা গেজেটেড হওয়ার কারণে সার্টিফিকেট দিতে পারে যে অন্যের ঘরের চালে আগুন লাগানো ফৌজদারি অপরাধ নয়, যদি ইতিহাসের অজুহাত জুড়ে দেয়া হয়। একজন এস-ডি-ওই তো ইতিহাসের অজুহাতটুকুকে আইনসঙ্গত করে দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট একটি সার্টিফিকেটের জোরে।
শত্রুবাহিনী যেন চিনতে না পারে, হ্যাঁ, এই সেই দেশ, তাদের আক্রমণের লক্ষদেশ। শত্রুবাহিনী যদি সমুদ্রের ভিতর থেকে এই গৌড়দেশ-বঙ্গদেশের দিকে তাকায় তবে তাদের মনে হতে পারে এই ভূখণ্ড একটি কচ্ছপ যেন। মনে হতে পারে, এক প্রাচীন ও প্রাচীন কূর্ম যেন নানাবিধ জলের ভিতর থেকে চারটি থাবা জলেরই ভিতর এগিয়ে রেখেছে ও তার প্রাচীন ও প্রাচীয়মান পাথরতুল্য শক্ত খোলার বৃত্ত ঘিরে কেলি-আসক্ত তরলাবালাগণ জল-নূপুরের ধ্বনি তুলছে। তা হলে, যেমন কোনো অতীতে অডিসিয়ুস নামক এক গ্রিক বা ধনপতি নামধারী এক বাঙালি, সমুদ্র থেকে সমুদ্রান্তরে মায়াদৃশ্যরাজি দেখতে ও শুনতে-শুনতে সেই দৃশ্যমান দৃশ্যকে মাত্রই মায়াদৃশ্য মনে করেছে ও তাদের অবতরণের লক্ষ বিবেচনা করেনি তেমনি, তেমনি, এই জাপানি-শত্রুরাও, এই কূর্মভূমি, এই কর্মের জলাবতরণ, এই কূর্মঘেরা জলকেলিকেও অসত্য ও মায়া মনে করে চলে যাবে। তারা যেন জানতে-বুঝতে না পারে, তারা যেন গন্ধও না পায় যে তারা পার হয়ে যাচ্ছে বাংলার সামুদ্রিক উপকূলের শস্যভূমি। তারা যেন চিনতে না পারে খুলনা-বরিশাল- ফরিদপুরের নিম্নভূমি। বায়ু সমুদ্র থেকে স্থলভূমিতেই বয়। ফলে, সেই আক্রামী বাহিনী বাংলার শস্যগন্ধ পাবে না।
শিকড়ের সুবাস ও পাকা ধান থেকে চাউলের সুবাস, একঋতু-ভর বায়ুকে, ভারী করে রাখে এমন মায়ায়, যেন সেই সুবাস, পরিণত ফসলের নয়, যেন সেই বায়ুর মন্থরতা জল থেকে উত্থিত বাষ্পের ভারে, যেন সেই মন্থরতা জলপাত-ধারাপাত-বজ্রপাতকে আসন্ন করে তুলবে এই বিপুল জলদেশে মহাদেশে স্রোতোদেশে ঘূর্ণিদেশে নৌদেশে মেঘদেশে, যেন এখন কর্ষণের ঋতু আসেনি, যেন এখন শস্যসুবাসে বাতাস মন্থর হওয়ার ঋতু আসেনি, ঋতু বদলে দাও, আকাশ বদলে দাও, মাটি বদলে দাও, বায়ুবাস বদলে দাও, আক্রমক জাপানি বাহিনী চিনতে না পারে এই সেই গৌড়বঙ্গ যেখান দিয়ে তারা ভারতের সমতলে ঢুকে যেতে পারে। সব চিহ্ন, মানুষের সব চিহ্ন, মানুষের বসবাসের সব কুটির, মানুষের চাষবাসের সব হাতিয়ার, মানুষের যাতায়াতের সব রকমের নৌকো পুড়িয়ে দাও, ছাই করে দাও, ধ্বংস করে দাও, অস্বীকার করো এটা কোনো জায়গা যেখানে শত্রু মাটি পেতে পারে, জল পেতে পারে, খাদ্য পেতে পারে। এই বিপুল জলদেশটিকে উৎখাত করো। এই মানুষ-বসতিকে অস্বীকার করো। ডিনায়্যাল। এই বিশেষ জলের মাটির বিশেষ রকম জলা ফলনকে অস্বীকার করো। ক্ষেতের ধান পুড়িয়ে দিয়ে চলে যাও। তোমার পা যে-নৌকো সেগুলো জমা দিয়ে চলে যাও।
যোগেন পেরচ্ছিল সেই তার আজন্ম ধাত্রী জলভূমি। নিপুন সামরিকতায় পরিকল্পিত সংগঠন তৈরি করে সেই জলভূমিকে আদিমতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মানুষের হাতে-হাতে জল ঘরনি হয়ে ওঠে, এখন যেমন সাজগোছ তেমন সেজে ওঠে গুছিয়ে ওঠে, মানুষের খাটাখাটনিতে সেই জল আর ভূমির একটা লেনদেনও তৈরি হয়, জলের স্বভাব ও মর্জি বুঝে সেই লেনদেন, জলের ওপর কোনো জোর খাটিয়ে সে-লেনদেনে জলের বিস্তারকে ছোট বা তার জোয়ারপথকে আটক করা হয় না, জলের একেবারে ভিতরে সেই চাষবাস সম্ভব করা হয় মাত্র মানুষের খাটুনি দিয়ে, যতটা খাটুনি মানুষ শরীর থেকে বের করতে পারে, সে-খাটুনি কোনো তদবিরে বা মালিকানায় বাড়ানো হয় না, বাড়ানো যায় না। থাকার মধ্যে আছো তুমি আর এই জল আর কিছু গাই-বলদ। বাড়তে চাইলেই তো আর বাড়ানো যায় না। তবু সারা বছর যে খাটুনি একই পরিমাণ থাকে তা তো নয়। কোনো-কোনো ঋতুতে কাজ এতটা বেড়ে যায় যে রাত-হওয়াটাকে মনে হয় বাজে সময় নষ্ট। একটা রাত কম করেও যত প্রহরের হতে পারে তার সমতুল্য খাটুনিটা তো এই একটা শরীর থেকেই নিংড়ে বের করতে হয়। মানুষের শরীর আর খাটুনি আর যে-ফসল ফলছে—তার ভিতরে-ভিতরে এক চলাচল ঘটে, চলাচল তৈরি হয়, সে-চলাচলেও জোয়ার-ভাঁটা খেলে। সেই চলাচলই শরীরকে বাড়তি খাটুনির জোগান দেয়। সে-জোগানে কখনো কাজের গতি বেড়ে যায়, সে-জোগানে কখনো কাজের গতিতে আড় আসে। এ-সব তার আর আড় কোনো তত্ত্ব তৈরি করে না। তৈরি করে ঋতু-ঋতু ধরে ব্যাপ্ত এক বিশাল ছন্দ। তাই চাষের কাজ আর ফসল ফলে-ওঠা অনন্ত কাল ধরে মানুষের কত সম্পর্কের তুলনা হয়ে ওঠে। স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্কই বেশি আসে। আসারই কথা। সেই দুজনের ভিতরও তো এক চলাচল চলে, জোয়ার-ভাঁটা খেলে, সেই স্রোতের ভাটি-উজানের উল্টো লীলায় তাদের অবলম্বন তো, এই জলচাষের মতই, দুটো শরীর। স্ত্রী-পুরুষের মিলনে আনন্দের বিনিময় চলতে থাকে। এটাকে ঐ আনন্দটুকু নিতে কত ভাবুক এই নিয়ে গানও বাঁধে। সে-গানে স্ত্রী-অঙ্গের কত বদল ঘটে—যেন তার বুক কখনো পাহারা, কখনো ভাণ্ডার, যেন সে-শরীরে ঢোকার চেনা পথটাও অচিন পথ, যে অন্ধকারেও যে-অঙ্গ নির্ভুল পাওয়া যায়—আলোর প্লাবনে ও তাকে চিনে ওঠা যায় না। সেই সব গানে-কথায় এমন ভাব আসে যেন স্ত্রী পুরুষের মিলন ভগবানেরই নাম-গান। আর ভগবান যেমন সর্বত্র থাকেন, স্ত্রী-পুরুষও তেমন সর্বত্র থাকে। জলকে নিয়ে খেলতে পারো। কিন্তু তোমার খেলা যদি হয় জবরদস্তি তাহলে সে খেলা জল ভেঙে দেবে। জলকে তুমি একটুখানি পথ করে আনতে পারো, ক্ষেত থেকে ক্ষেতে, কিন্তু সেই আনা যদি হয় চুলের মুঠি ধরে আনা তাহলে জল সে-মুঠি ছাড়াতে তোমার বেশি জলের খাঁই মিটিয়ে দেবে। তুমি তো মিষ্টি জল ছাড়া চাষ করতে পারবে না। এ তো সমুদ্র আর নদীর, নোনা আর মিষ্টির অদল-বদলের এলাকা। কোনো একদিন এখানে নদীর জল থেকে প্লাবন এসে মাটির তলায় ঢুকে গেছে। সেই মাটির বুকের কাছের জলটাকে তুমি তুলে এনেছ। তোমার দরকার যদি বাড়তেই থাকে, সঙ্গে বেচাবিক্রিও যদি ছড়াতে থাকে, সঙ্গে নগদ টাকার লোভও যদি বাড়তে থাকে, তুমি নৌকোয় ফেরি করার বদলে চাও আরো বাদশাহি সড়ক, আর এই জলভূমিতে তোমার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যদি জুড়ে ফেলতে চাও, সাঁকোতে সাঁকোতে, তাহলে, এ-জল অত লোহা আর কংক্রিটের ভার বইতে পারবে না। পৃথিবীর কোথায় কোন নদীর ওপর কত সাঁকো আর কত বাঁধ সে-হিশেব দিয়ে ঢাকা-ফরিদপুর-বরিশাল-নোয়াখালি- যশোর-খুলনার জলের যোগ-বিয়োগ মিলবে না। শুধু সাঁকোর হিশেব আর বাঁধের হিশেব কষছ, যত কষছ তত ভুলছ জলের মাটির কথা। কোন মাটির ভিতর দিয়ে জল তার পথ করে নিয়ে নদী হয়ে বয়েছে, খাল হয়ে টিকে আছে, বিল হয়ে আলগোছে আছে সেই মাটির হিশেব নেই? কোন মাটি পাহাড় গুঁড়ো হয়ে মাটি হয়েছে আর কোন মাটি নদীর ফেলে-যাওয়া পলিতে মাটি হয়েছে? এত পৃথিবী-পৃথিবী শুনছ তো শাহেবরা যদ্দিন এসেছে তদ্দিন থেকে, সে আর ক-দিন, বড়জোর শ-দেড়েক বছর, ঠিকঠাক হিশেবে তাও নয়, সেই পৃথিবী তো এখন তোমার বসত, তোমার চাষ, তোমার মাটি-জল-নৌকো সব সবকিছু গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, পুড়িয়ে দিচ্ছে, তোমার চুলের ডগাটি চেঁছে দিচ্ছে, একটা মড়াকেও তো এতটা চামড়া ছুলে মাটি চাপা দেয়া হয় না, আর তোমার পৃথিবী তো তোমাকে চেঁছে মুছে দিচ্ছে তোমার এই জল থেকে, তোমার এই নিজের জল থেকে, তোমার এই জলের চাষ থেকে, এ-জলে যেন এমন কোনো নিশানা না থাকে যা থেকে আভাস পাওয়া যায় যে এ-মূল মানুষের ছোঁয়া আছে, যে মানুষের ছোঁয়া আছে তারা শাহেব জন্মাবার হাজার-হাজার বছর আগে নির্বাসিত শূদ্র হয়ে এই জলে ঠাঁই গেড়ে থাকলেও জলে তোমার ছোঁয়ার চিহ্ন থাকা চলবে না। হাজার-হাজার বছরের ছোঁয়া চিহ্ন কি লোপাট করা যায়? লোপাট করতেই হবে যখন আরো বড় পৃথিবী তোমার দরজা ভাঙছে, সমুদ্রের দরজা, শাহেবের সাম্রাজ্যের দরজা। যুদ্ধ। যুদ্ধের এই নিয়ম। জলচাষ দিয়ে তো আর যুদ্ধ হবে না। যুদ্ধে জেতার জন্য জায়গা চাই। যুদ্ধে পিছিয়ে আসার জায়গা চাই। যুদ্ধে ছড়িয়ে যাবার জায়গা চাই। যুদ্ধে যুদ্ধই হয়, কোনো চাষ হয় না। কটা মানুষ থাকে এই সব নদীগুলোর তিরিশ মাইলের মধ্যে? কত ফলন হয় এই চারজেলার এই জলে? কটা নৌকো ভাসে এই এত জলে? কটা গাই-বলদের সংসার তোমার? সারা পৃথিবী বাজি রেখে যে-যুদ্ধ তাতে বাংলার এই চার-পাঁচ জিলার মধ্যে ছড়ানো এই ক-মাইল জলা-জায়গার দাম কী? তোমার সাজানো সংসার কি আমি আমাদের শত্রুসৈন্যের ঘরকন্নার জন্য রেখে যাব? যাতে তারা খেয়েপরে সুখেশান্তিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জঁলা ফোপড়া করে দিতে পারে? যুদ্ধ যুদ্ধের নিয়মে চলে। আর-সব আইন এখন মুলতুবি। সাম্রাজ্যের এখন দরকার তোমার বেকবুলিয়ত। অস্বীকার করা যে কোনো কালে এখানে মানুষ ছিল। নিজেও অস্বীকার করো তোমার এখানে চাষবাস ছিল। হাজার-হাজার বছর ধরে ছিল। শূদ্ররা এখানে নির্বাসিত হয়ে এসেছিল? নির্বাসন তো কোনো সাফ-কবলা দেয় না, হাজার-হাজার বছরের পুরনো নির্বাসন হলেও দেয় না। দিলেও, যুদ্ধের সময় সে কবলার আইনের জোর থাকে না। যুদ্ধ মানে, ডিন্যায়াল, অস্বীকার, বেকবুলিয়ৎ।
যোগেন এই বেকবুলিয়তি জলভুবন পার হচ্ছিল, এখানকার উচ্ছন্ন মানুষদের খোঁজে। সাঁতরে নয়, নৌকোতেও নয়, লঞ্চসার্ভিসেও নয়। হেঁটেও নয়। উড়েও নয়। তার পা জল বা মাটি ছুঁচ্ছিল না অথচ তার ভঙ্গি ছিল হাঁটার, সেই সময় থেকে ছেষট্টি বছর পরে পিকিং অলিম্পিকের শেষ দৃশ্যে নভশ্চর যেমন পরবর্তী অলিম্পিকের পতাকা গ্রহণের জন্য স্পেসে হাঁটছিল, হাঁটছিল। স্পেসে তো মাটি নেই। তবু হাঁটছিল।
জানলে তো? এগুলো তো যোগেন জানতেই পারে না। প্রধামন্ত্রীও না। এগুলো তো যুদ্ধকালীন ব্যবস্থা। সামরিক বাহিনীর প্রধানরা জানেন। আর, লাটশাহেব জানেন, যদি জানেন যদি জানানো হয়। যোগেন জানবেই না, এদের খিদেগুলো ক্রমে ক্রমে দৈনিক থেকে আধা-সাপ্তাহিক থেকে সাপ্তাহিক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যোগেন এদের পরিংখ্যান জানবে। পোড়ামাটি নীতি থেকে প্রকিওরমেন্ট, নৌকো-ডুবনো থেকে স্মাগলিং, প্রধানত পূর্ববঙ্গের চার জিলা থেকে কত হাজার জন কলকাতায় এসেছিল, সে সব, সবেরই পরিসংখ্যান আছে।
সেই সব সংখ্যা ও পরিসংখ্যা ব্রিটিশ সরকারকে ব্যবহার করতে হবে, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের মন্ত্রিসভা ও আইন সভাকে ব্যবহার করতে হবে, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের বিধি-অনুযায়ী আইনসভার বিরোধী পক্ষকে ব্যবহার করতে হবে, সরকারের বাইরে যাঁরা গবেষক ও সংখ্যাতাত্ত্বিক তাঁদেরও ব্যবহার করতে হবে। যোগেনকেও ব্যবহার করতে হবে।
যোগেন মন্ত্রী। ও আইনসভার মেম্বার। তদুপরি যে চারটি জিলা থেকে আশিরপদ ক্ষুধা নিয়ে মানুষজন শহরে ও কলকাতায় এসেছিল ও আসছিল এমন একটা অনুমান থেকে যে শহরে বড়লোকরা থাকে, তাদের খাওয়ার জন্য শহরে অনেক খাবার থাকে, হয়তো সেই শহরবাসীর মন সহজেই মানুষের দুঃখে ভিজে যায়, সেই চার জিলা থেকে এই যারা কলকাতায় আসছিল, তারা হয় নমশূদ্র নয় মুসলমান—খুলনার, বাখরগঞ্জের, বরিশালের, ফরিদপুরের নমশূদ্র ও মুসলমান। তাদের, সেই ক্ষুণ্ণ ক্ষুধার্তদের শরীরে রক্ত-মেদ-মজ্জা এত নিঃশেষে ঝরে গেছে যে তারা শুধু শরীরের সেই নিয়মে বেঁচে থাকে ও হাঁটে ও এমন কী মানুষের স্বরেই ‘মা, ফ্যান দ্যাও মা, রব তোলে, যে-নিয়মে বলির ও কোরবানির পশুর মুণ্ডুচ্ছেদের পরও তার শরীরের ভিতর থেকে আক্ষেপ শরীরের ওপরে উঠে আসে। সুস্থ, পেশল, রক্তপূর্ণ পশুর শরীরে সেই আক্ষেপ নিহিত থাকে যা খঙ্গের বা ছুরির আচমকা আচমকা ধারে ও সূচ্যগ্রতায় উৎক্ষিপ্ত হয় কিন্তু ক্ষুধার্ত এই মানুষদের তেমন উৎক্ষেপণ অবশিষ্ট থাকে না, তারা কোনো কোনো জ্যান্ত মানুষের মত মরতে পারে না। তারা অঙ্গে-অঙ্গে আলাদা-আলাদা করে মরতেই থাকে। তাদের হাঁটুসন্ধি থেকে যখন আর গতি বেরয় না, তখন তারা স্থানু হয়ে যায়। তাদের কোমর যখন আর ভাঁজ হয় না, তখন তাদের পতন ঘটে। তাদের চামড়া যখন আর কুঞ্চিত হয় না তখন তাদের শরীরের অন্তর্গত তাপ, কোনো পোড়ো ভিটের উনুনের এমন গর্তের মত হয়ে যায় যেখান থেকে বিড়ালবাচ্চার বেঁচে থাকার মত তাপটুকুও বেরয় না।
এটা মাপা হয়নি—তাদের শ্বাস আগে শেষ হয়, নাকী তাদের শরীর আগে ঠাণ্ডা হয়। তখন যুদ্ধের মধ্যপর্ব। সামরিক সেন্সার অতিমাত্রায় প্রখর। ক্যামেরা, মুভি ক্যামেরা না-হয় দশ মিনিট বা এক রিলের বেশি সেলুলয়েড ঘোরাতে পারে না। দশ মিনিটই বা কম কীসের, না-খেতে পেয়ে একজন মানুষের মৃত্যু কোন ক্রমে ঘটে তার প্রমাণচিত্র রাখতে? দশ মিনিটে তো কত অনন্ত ঘটে যায়।
হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের কিছু ছবি ও ফটো বেরতে তখনো বছর দুই বাকি। রুয়াণ্ডার-দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত শিশুনারীদের ছবি বেরতে তখনো তিরিশ বছর বাকি। বাংলার কলকাতায় ক্ষুধার মৃত্যুর প্রথম ছবি দেখা গিয়েছিল। প্রমাণচিত্রই তো বটে। না-হয় মুভি নয়। তখনো তো দূষণ নিয়ে সবাই এখনকার মত চিন্তিত ছিল না। তকনো তো আণবিক যুগ শুরু হতে বছর দুই দেরি আছে। তকনো তো নারীপুরুষের বিভাজন নিয়ে কোনো আপত্তি তৈরি হয়নি, যদিও পৃথিবীর প্রথম নারী–পাইলট বোমারু বিমান নিয়ে লন্ডন থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন জার্মানির আকাশে। যদিও নাৎসি–আক্রান্ত সোভিয়েতে মেয়েরাই প্রধান কর্মী ছিলেন যুদ্ধের অস্ত্রনির্মাণের কারখানায়।
কিন্তু, তারও আগে মানুষের শরীরের নারীপুরুষভেদ লোপ হয়ে যায়, প্রথম কলকাতার ফুটপাতে ১৯৪৩-এ।
.
আয়হীন, ভূমিহীন, পেশাহীন, মাঝেমধ্যে নৌকো বানানোর সুবাদে যা কিছু আয়, এত বড় পরিবার, সবার শোয়ার জায়গাও জোটে না, এমনই হয়ে আসছে চিরকাল, সে-চিরকালের যত গল্প অন্যমনস্ক চলে এসেছে হঠাৎ-হঠাৎ, তেমন একটি নমশূদ্র-বাড়ির ছেলে হিশেবে যোগেনের বিপন্নতাবোধ প্রায় ধাতেই নেই। যেমন, যোগেরন ছেলেরও থাকবে না। বিপন্নতা বা ভয় বা তরাস হয় কখন? যখন মরণ আসে আচম্বিতে। আচম্বিতে। ভাঙনের নদীতে এক আঙুল তফাতের ঘূর্ণির পাশ কাটানো গেলে অমরণ, না-গেলে মরণ, এটা আচম্বিত। আসছ চরপথে অনেক দূর থেকে, অনেক দূর যাবে। এক উল্টা হাওয়ার ঘূর্ণি এসে পাক দিয়ে ঘেরে তোমাকে। তুমি সেই পাক থেকে ছাড়া পেতে পাকের উল্টো পাকে ঘুরতে থাকো বনবন করে। কিন্তু এমন আচম্বিত ঘূর্ণি যখন পাক দেয় তখন কি আর যুক্তি থাকে—কোনটা বাঁধার পাক আর কোনটা খোলার? তাই তুমি কোন পাকে মরণ আর কোন পাকে অমরণ সেটা বুঝে ওঠার আগেই তোমার নিজেরই ঘূর্ণবাতাসের পাকে পাকে জড়িয়ে তুমি আচম্বিত মরণে পড়ে গেছ।
শুদ্দুরদের মরণের ভয় পাওয়ার টাইম নেই।
না-খেতে পাওয়ায় শরীরের যে ক্ষয় ও বিনাশ তাতে ভয় নেই, ত্রাস নেই। শুধু একদিন বেঁচে থেকে একদিন মরে-যাওয়া—ভয়-পাওয়ার সময় কোথায়?
যোগেন খুব ছোট মাপের সাম্প্রদায়িক কারণে কলকাতার রাস্তায় ফুটপাতে এই ভয়ের কারণহীন মরণকে মানতে পারছিল না। পারত, যদি সে নিশ্চিত না জানত যে এমন যারা মরে যাচ্ছে, পড়ে যাচ্ছে, মরে থাকছে, পড়ে থাকছে যেখানে ভঙ্গিগুলো চিহ্নিত নয়—বাঁচার বা মরার, যে-শরীরে কোনো লিঙ্গভেদ নেই—তাদের ষোল আনার ওপর আঠারো আনা শরীরই শূদ্রের, চাড়ালের, মুললমানের। যোগেন, এমন একটা প্রশ্ন দানা বাঁধতেই দেয় নি যে মৃতেরা যদি উচ্চবর্ণ হিন্দু হত, তাহলে কি তার এতটা অস্থির লাগত না?
যোগেন মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে সিভিল সাপ্লাইয়ের মন্ত্রী সারওয়ারদিকে ধরে কলকাতা থেকে মাইল পঁচিশ দূরে বারাসতের যশোর রোডের ওপরে একটা লঙ্গরখানা খোলাল। উদ্দেশ্য—কলকাতায় পৌঁছুবে বলে যারা পাকা রাস্তা ধরে পুব থেকে পশ্চিমে আসছে, তাদের থামিয়ে দেয়া, তাদের পথ একটু ঘুরিয়ে দেয়া, তাদের একবেলা বড় এক হাতা গরম জল-ডাল-চাল নিশ্চিত করা।
এ সব কাজের হিশেব নিতে গেলে জানা যায় না, কারা বা কে কে কাজটাকে তৈরি করেছে। যেমন, পাড়ার একটা বাড়িতে আগুন লাগলে এটা বের করা যায় না, কে বা কারা প্রথম আগুন নেবাতে ডোবা থেকে বদনা বা বালতি ভরে জল এনে আগুনে ঢেলেছিল।
বাংলার সরকার, তখন না-হয় নাজিমুদ্দিনের ও বাংলার গভর্নর হার্বার্টের, দুর্ভিক্ষটাকে চেপে যেতে চেষ্টা করছিলেন। চেপে যাওয়ার চেষ্টা ছাড়া তাঁদের কিছুই করণীয়ও ছিল না।
