১৬৭. ব্যূহটা তো যোগেনের তৈরি না
যোগেন ভেবেছিল, অ্যাসেম্বলি লাইব্রেরিতে দেশবিদেশের কাগজ পড়ে-পড়ে যুদ্ধটা জানা হয়ে যাবে। আর, আইনসভার মেম্বারদের দলবদলাবদলিতে আজ এ-মন্ত্রী, কাল ও-মন্ত্রী করে যুদ্ধটা করা হয়ে যাবে, যেটুকু করার। যোগেন জানবে কী করে—এ ছাড়া যুদ্ধ জানার বা যুদ্ধ-করার আর কী উপায় আছে।
খুলনা ঘাট থেকে বরিশালের জাহাজে উঠে সে প্রথম সন্দেহ করল—এটা বরিশালের জাহাজ তো? চেনাজানার সেই গোলমালটা যোগেনের মাথায় ঢুকেই পড়েছে। কিছুতেই আর বেরয়নি। কুইনাইন খাওয়ার পরের সকালে যেমন মাথা ফাঁকা ঠেকে, চোখের পাতা ভারী ঠেকে, দৃষ্টি একজায়গা থেকে আর এক জায়গায় সরানোয় অনেক খাটনি ঠেকে—এই যাত্রায় যোগেনের তেমনি হল। তার দুটো পা-ই মাটি থেকে দুই-আঙুল মত ওপরে উঠে গেল।
তার ফলেই যোগেন বাখরগঞ্জ-ফরিদপুর-বরিশাল-ফরিদপুর-খুলনা-ফরিদপুরের বিলএলাকা, যশোরের রিক্রুটিং সেন্টার পাক দিতে পারল। এ-তল্লাটে নৌকোই তো মানুষের পা। সেই নৌকোগুলি ধরে-ধরে পুড়িয়ে দেয়ায় মানুষ তো হাগতে যেতেও পারবে না। এ তল্লাটে মানুষজনের পেটের খোলও বড়, জমির খোলও বড়। যদি দ্বীপ-দ্বীপান্তরে ঘুরে-ঘুরে ঠিকাদারের লোকরা সেই চাইল লিগের নতুন সেকরেটারি জামিদ আলির মারফৎ কলকাতায় চালান দেয়া চালাতেই থাকে, তা হলে, তিন বেলার খিদে মেটানো তো বাউন-কায়েতদেরও সম্ভব না আর জমির আইল ধরে হেঁটেহেঁটে ধানের গন্ধে যারা পেট ভরাত, তাদের পেট তো খালির ওপর খালিই থাকে, কয়টা খিদে পুরল সেটা তো আর খাওয়ার হিশাবে ধরা থাকে না। জমির খাড়া ধান উপড়িয়ে আগুনে পুড়িয়ে মাটির ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। তা হলে, কাঁটা গাছে ভরা সেই আষাঢ়ে জমি দুই-চারটাকায় কিনে নেয় খাজাশাহেবের মুসলিম লিগ, বা হকশাহেবের কৃষকপ্রজা, বা প্রগতিশীল লিগ, বা কংগ্রেসি উকিল-বাবু, বা মহাসভার স্থানীয় নেতা। চালের দাম বাড়ে আর জমির দাম কমে—এটা যুদ্ধ।
যোগেন দেখছিল, সেই তার পায়ের তলার মাটি থেকে দু-আঙুল উচ্চতায় দাঁড়িয়ে ফরিদপুরের গোপালগঞ্জের সাতলা বিলের আলের ওপর থেকে। সে-না বছর দুই আগে এই সাতলা বিলের জলভাগ গুলিকে জোড়া লাগানোর কাজ করে বুক ফুলিয়েছিল। মুসলমান আর নমশূদ্র বিলচাষীরা তাকে দুই হাতে আশীর্বাদ করেছিল, তুলসীতলায় হরির লুটে মুসলমানরাও এসেছিল। তারপর থেকে সাতলা বিলে কোনো রায়ট হয়নি। রায়ট করতে হলে তো অবসর চাই। চাষি যদি জলের তলা থেকে নতুন ক্ষেত বের করে আনতে পারে আর পুরনো চেনা পাথুরে ডাঙাটার ওপর দিয়ে জল বওয়াবার বুদ্ধি করতে ব্যস্ত থাকে আর এমন সব কাজে একবারের ভুল আরেকবার শুধরতে হয়, তাহলে রায়ট-করার টাইম পাবে কোথায়? হ্যাঁ। নিজের কাছে মিছা নাই। যোগেনের বুক তো একটু ফুলেছিল। মাত্র বছর দুই? কটা চাষ? এত বড় একটা আলাদা থানার মত জায়গা, দু-বছরে তো তার জলের তলার মাটিগুলোও চেনা হয় না। তার ওপর বিল্যা জমি। সে-জমির তো দুই আলের মাঝখানে দশ চেহারা। সেই মাটি দেখে বুঝে চাষ দিতে দুটো বছর তো ব্রহ্মা ঠাকুরের এক পলক। আর, এর মধ্যেই সে-জমিতে ডিনায়্যাল। উপকূল আর নদীকূল থেকে তিরিশ মাইলে কোনো বসতি থাকবে না, কোনো পশুপাখি এমন থাকবে না যেগুলো থেকে বোঝা যায় মানুষের বসতি ছিল। মানুষ তার খাটনি দিয়ে চাষ করে তার সব প্রমাণ লোপ। তাছাড়া বিলের জল তো মিষ্টি। জাপানিদের জন্য কি মিষ্টি জলে শরবৎ রাখা হবে? মিষ্টি জল ডিনাই করো। একটা শুকনো খাত আছে যেখান দিয়ে নোনা জল ঢুকতে পারে। যোগেন যখন সাতলা বিলের সংস্কারের প্ল্যান জমা দিচ্ছিল, তখন, ওখানকার চাষিরা দেখিয়েছিল। খুব একটা কেউ জানে না। মিলিটারিরা তো নতুন মানুষ তারা জানবে কোথা থেকে? এত বড় বিল-এলাকায় কোন একটা জায়গা নিচু হয়ে উঁচু হয়েছে, তা চোখে দেখে চেনা যায়? শুখা খাত যে কত তাড়াতাড়ি বুজে যায়, মিশে যায়—তা জাপানিরা জানে না ব্রিটিশরা জানে? কিন্তু যুদ্ধ তো শুধু যন্ত্রেরই খেলা। সেই কোনো যন্ত্র যদি থাকে যাতে মাটির নোনা মিষ্টি ধরা যায়? আর ধরার পর যদি সেই শুখা খাত আর-এক যন্ত্র দিয়ে খাল বানিয়ে নোনাজল ঢুকিয়ে দেয়, তাহলে তো পুরা সাতলা বিলটাই চিরজন্মের মত নোনা হয়ে যাবে। তাহলে?
এ ডিনায়্যাল চোখে না-দেখলে মালুম হয় না। চোখে দেখলেও চাক্ষুষ হয় না। কী মাস এটা? আষাঢ় না? আষাঢ়ই তো। মাসটা আষাঢ়ই কী না সেটা নিশ্চিত হতে যোগেন আকাশের দিকে তাকায়। আকাশটা যেন ক্যালেন্ডার।
যোগেন দিগন্তের আকাশের দিকে তাকায়। সেই দিগন্তে তাও একটু আষাঢ় লেপা। জলে ভরা কাল মেঘ। কাল? কে যেন বলে, কালো আবার দেখিস কোথায়, বর্ষার মেঘ কি কাল হয়, ওরে কালো কয় না, শ্যাম কয়। কে যেন বলে? কেষ্টা? যোগেনের কেষ্টা? বেঁচে আছে কেষ্টা এখনো? এই যুদ্ধের মধ্যে? এই তো গোপালগঞ্জ। নদীটার তফাৎ। এক নদীর তফাৎ। এডা কী নদী? তেঁতুলিয়া না কী? না, বারকান্দির খাল? যোগেন পুবে তাকিয়ে দেখতে পায় বরিশালের পশ্চিমের বিলগুলো—বাগধা, সাতলা, বিসারকান্দি, হারতা, নিচা বিসারকান্দি, বালিখালি, মালুহার, বলদিয়া—নামের তো শেষ আছে, বিলের তো শেষ নাই। যোগেন দেখতে পায়, সেই বরিশালের আকাশের শেষ থেকে একটা ছায়া ধীরে-ধীরে আকাশ বেয়ে আসছে ফরিদপুরের দিকে। দূর থেকে মনে হচ্ছে ধীরে-ধীরে (জ্যৈষ্ঠ আষাঢ়ের মেঘ কি খুঁড়াইয়্যা চলে নাকী, চলে যেন সাগরভাঙা ঢেউয়ের বেগে? )
যোগেন দেখতে পায়, সেই-যে ছায়াটা মাটি থেকে রোদ মুছে উড়ে আসছিল ফরিদপুরের পারে, তার নীচে মাটিতে, জল, নদীর জল, যে-নদীকে খাল বানানো যায়নি। ঐ মেঘচ্ছায়াপাতে যোগেন দেখতে পায়, নদীর একটা চর। কিন্তু কোথাও কোনো একটা মানুষ নেই। কোথাও কোনো একটা মানুষের স্বর নেই। কোথাও রোয়াগাড়া নেই। কোথাও ক্ষেতের কাদায় মানুষের হাঁটু পর্যন্ত ডোবানো নেই। ডিনায়্যাল পলিসি। উপকূল বা নদীকূলের তিরিশ মাইলের মধ্যে কোনো মানুষ, পশু, বসবাস, খাওয়ার জল, সবুজ শস্য, বাড়ির ধান থাকতে পারবে না। এরা সব গেল কোথায়? এই এতগুলো বিলের চরের এত হাজার-হাজার মুসলমান আর নমশূদ্র। এটা না আষাঢ় মাস? চাষ নাই। চাষ নিষিদ্ধ।
নিষিদ্ধচাষ সমুদ্রের মত বিস্তারের ওপারের আকাশ থেকে মেঘের ছায়াটা ডাইনে যশোরের দিকে ঘুরল। ছায়াতে কি বেশি দূর দেখা যায়? ছায়া দেখে যোগেন বুঝবে, ওইদিকে যশোর-খুলনা? মেঘের ছায়া তো দক্ষিণপুবে নেই। তাহলে কি নোয়াখালি বা ফেনি নেই?
আছে যে তার চিহ্নটাও তো নেই। আষাঢ়ে কি এবার বৃষ্টি কম, বন্যা কম, ঝড় কম? ওই সব কম-বেশি মাপে পশ্চিমডাঙার মানুষ—বীরভূম, বর্ধমান, মেদিনীপুর। বাঙাল-সাগরে কি জল মাপা যায়, আকাশেরই হোক আর নদীরই হোক। যোগেন না সরেজমিনে খোঁজ নিতে এসেছে? তাকে তো চিঠি লিখেছে—এখানে বড় বিপদ। বিপদ জানতে-বুঝতে এসেছে যোগেন। কাল সন্ধ্যায় যে-গোধূলিদেশে ঢুকেছে সে-গোধূলির শেষ নেই। একেই বিপদ বলে? তাহলে কী বলে এখানে বাঁচন নাই? আষাঢ় মাসে একটা ক্ষেতে ধানের রোয়া গাড়া নেই, যে-মাটি চৈত্র মাসেও ভেজা থাকে, সে মাটি আষাঢ় মাসে শুকিয়ে গেল? এত নদী, এত জল, এত বিল, এত মেঘ, মেঘের ছায়ার এমন দৌড় অথচ একটা কোনো পাল পতপতায় না নৌকোর, একটা কোনো জল-পেরনো মানুষের ছপ ছপ আওয়াজ নেই, আষাঢ়ের মেঘের নীচে একটা কোনো পাখি নেই যেগুলো ঝাঁক বেঁধে নামে বিছন-ধান চিরতে? পাখির খিদ্যাও মেটায় না—এ আবার কী আষাঢ় মাস? কার আষাঢ় মাস?
যোগেন যেন মানতে পারে না সে যত চেষ্টাই করুক সে এই নদী পেরিয়ে কেষ্টার কাছে পৌঁছুতে পারবে না। জন্মেরও আগে থেকে, পূর্বজন্মেরও পূর্বজন্ম থেকে যোগেন যে-জলকে জানে সেতু বলে, যে-জলকে জানে পারাপারের পথ বলে, যে-জলকে জানে রাসলীলার রাস-অঙ্গন বলে, যে-জল ঘাটেও থাকে, সমুদ্রেও থাকে, যে জল কোনো বাধা মানে না—ভেঙে দেয়, ভাসিয়ে দেয়, সেই জল, সেই জলই, সেই তার আপন জল এখন তার শত্রু। তার সবচেয়ে বড় বাধা। সে কেষ্টার কাছে পৌঁছুতে পারবে না। যোগেন কেষ্টার কাছে পৌঁছুলে জাপানীরা এসে পড়ে যুদ্ধ বাধাবে। ব্রিটিশদের সঙ্গে।
যোগেন সেই জনশূন্য নৌকাশূন্য জলপ্রান্তরের দিকে তাকিয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করে, ‘এই এক দেশের বেবাক মানুষ গেলটা কই? এডা তো, ব্যূহ খাড়া করছে, ঢোকার উপায়ও নাই, হুকুমও নাই।’
