১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৬৬. যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ

১৬৬. যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ 

খুলনা থেকে স্টিমারে উঠতে উঠতে সিঁড়ির গোড়ায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। এটা করিশাল লাইনার তো? ওপরে যাওয়ার খাড়া সিঁড়িটার মাথার ফাঁকাটায় তাকায়, যেন সেখানে কোনো চিহ্ন আছে চেনার। ফাঁকাটা তো অন্ধকার। 

 যোগেন সত্যিই লজ্জা পায়। তাকে কি এখন জিজ্ঞাসা করতে হবে কাউকে, এটা বরিশালের জাহাজ তো? কিন্তু তার খটকাটা ঠেকল কেন? এখনো তো ঠেকছে। যোগেন সিঁড়ি দিয়ে না উঠে ইঞ্জিন ঘরের পাশের গলি দিয়ে সামনে এল। তাকাল—এত কম লোক, এই ট্রিপে? রাত কাটালেই বরিশাল—সেই জন্যই তো সবাই এই জাহাজটা ধরে। আর, খুলনা মেলের প্যাসেনজাররাও ধরে। এতক্ষণ সময় গেল, যোগেনকে কেউ সম্ভাষণ করল না? সে-ও তো কাউকে চেনা পাচ্ছে না। তাহলে কি গেটে সিঁড়ির কাছের টিকিটবেচাকে জিজ্ঞাসা করবে? কী জিজ্ঞাসা করবে—এটা কি বরিশালের? একটু হালকা করেও জিজ্ঞাসা করা যায়, বরিশালের তো? কিন্তু টিকিট বেচা তো তাকে চিনতে পারবে। সে যদি সেই চেনার সুযোগে বরিশাইল্যা রগড় করে, ‘বরিশাল? বরিশাল হইব ক্যা?’ সে তো আর যোগেনকে বলতে পারবে না—আরে মণ্ডলমশায়, নিজের জাহাজ ভুইল্যা গেলেন? তাহলে যোগেন বুঝবে কী করে, টিকিট বেচার জবটা জব না ঠাট্টা? 

নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে যোগেন ইঞ্জিন ঘরের পাশের উল্টো গলি দিয়ে এগল। দু-পা গিয়েই থেমে যায়—আরে, এই জাহাজের একতলায়-না জামির মিয়ার পান-বিড়ির দোকান আর ভাতের হোটেল। জামির মিয়া থাকলে তো এটা বরিশাল না হয়ে যায় না। যোগেনের আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকল। যোগেন মণ্ডল থাকলে বরিশাল হয় না? যোগেন মণ্ডলের এখন জামির মিয়া-র সাবুদ লাগে? বদলাইলডা কী? 

জামির মিয়ার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে যোগেন দেখে ওটা জামির মিয়ার দোকান। সব জাহাজের একটাই নকসা। এ জাহাজেও একটা পান-বিড়ির দোকান আর একটা ভাতের হোটেল পাশাপাশি আছে। কিন্তু জামির মিয়া নেই। তাহলে কি…। আরে, তা কি হয়? তাইলে একটা খবর হইত না? 

কয়ডা কী? রোজ সেইখানে এতগুলা যুদ্ধে লাখে-লাখে মানুষ মরে, সেখানে জামির মিয়া কি অমর হবে? এটা বরিশালের সার্ভিস হতে পারে, যোগেন জাহাজ ভুল করে থাকতে পারে, সে যাই হোক, যোগেন এটা নিশ্চিত যে দোকানের ঐ লোকটা জামির মিয়া না, এ-লোকটার মাথায় বেখাপ এক জিন্নাটুপি, বোধহয়, খুলির মাপের থিক্যা বড়, মাঝে মাঝেই ঝুইল্যা পইড়্যা চোখড়া ঢাকে। আর লোকটা হাতের এক ঠেলায় টুপিটা পেছিয়ে দেয়। ঝিলিক মারে তার কাল কুচকুচে টেড়ি। এর ওপর কাল একগুচ্ছ নুড়, সেও ঝকঝকে কাল, জামির মিয়ার কষ্মিনকালেও নুড় ছিল না, থাকলেও কাল থাকা সম্ভব? 

জামির মিয়ার দোকানেই একবার বাকলার নোয়া পণ্ডিতমশায় যথেষ্ঠ দূরত্ব রেখে জামির মিয়াকে দেখিয়ে যথাযথ দূরত্ব রেখে যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘মণ্ডল, কও দেহি কোন দ্বার দিয়া ছাড়া মানুষের গমন নাই শুধুই নির্গমন আছে?’ যোগেন এই পণ্ডিতি বদরসিকতা সহ্য করতে পারে না। খানিকটা ঠাট্টার সুরেই বলে, ‘আমার তো শুদু বাহ্যদ্বার মনে হয় পণ্ডিতমশায়। 

একটু হাসাহাসির পর পণ্ডিতমশায় বলেন, ‘তোমার জাতধর্ম অনুযায়ী যা ভাবার তাই তো ভাববা—গায়ত্রী-জিজ্ঞাসিতঃ শূদ্রঃ করোতি শৃগালরবঃ। শূদ্রকে গায়ত্রী বলতে বললে সে শিয়ালের মত হুক্কাহুয়া করে। তুমি শুদ্দুর হইয়্যা কি কইর‍্যা বাহ্যদ্বার ছাড়া ভাইবব্যা যোগেন?’ 

নেহাৎ যোগেন রাগতে পারে না, তাই এটুকু বলেই সেদিন বাকলার পণ্ডিতকে ছেড়ে দিয়েছিল, ‘আপনে য্যান জামির মিয়ারে নিয়্যা কী য্যান বলব্যার চান। সেইডা কন। কমক্রোধোহি বিপ্রাণাম মোক্ষদ্বারাগলা বুভৌ। 

শেয়ানাবুদ্ধিতে বামুনের বাড়া নাই। পণ্ডিতমশায় যোগেনের জবাবে বুঝলেন, যোগেন ডুবজল। তাই যোগেনের পরামর্শ মত জামিয়ে ফিরে গেলেন—’কইতেছিলাম জামির আমাগ সিদ্ধপুরুষ। নির্গত হওয়ার কালেই মাথামুণ্ড চিরতরে কামাইয়া কেমন পক্ক পেয়ারার মত ডালে ঝুইল্যা আছে।’ 

যে জামিরকে নিয়ে এত স্মৃতি, সেই জামিরকেও পাচ্ছে না যখন, তখন যোগেন ভুলই করেছে। নিজের কাছে ভুল মানলেই তো টোপ পালানো মাছ ফিরে আসে না। যোগেন মণ্ডল থাকলেই জাহাজ বরিশালে যায় না। যোগেনকে এখন বেরিয়ে কোনো একভাবে বরিশালের ব্যাপারটা মেটাতে হবে। হ্যাঁ। পাড়েই যেতে হবে। 

পা-টাও বাড়িয়েছিল যোগেন কিন্তু আর-এক পা টানল না। ঐ দোকানে বসা লোকটিকে একটু দূর থেকেই জিজ্ঞাসা করে বসল, ‘জামির মিয়া কি অ্যাহন দোকানে বসে না, অবসর নিচ্ছে? দোকানের লোকটি কোনো খদ্দেরকে কিছু দিতে ঘাড় নুইয়েছিল, জামির মিয়ার অবসর নিয়্যা এত দুশ্চিন্তা ক্যা, যদি মানুষডারে চিনব্যারই না পারেন? 

তাহলে জামিরই নাকী? এক পায়ে দোকানের সামনে গিয়ে যদিও যোগেন বলে ফেলে, ‘দ্যাখো তো চেনা যায় কি না যায়,’ এটা আবার নিশ্চিত হয়—এই কুচকুচে কাল চুলে টকটকে জিন্নাটুপি আর লখনৌ-পাঞ্জাবি পুনর্জন্মেও জামির হওয়া সম্ভবব না। সে লোকটি প্রথমে বলে, ‘কে ডা?’ তারপর ভুরুর ওপরে হাতের পাঞ্জাব আড়াল দেয়, আলোটাতে ঢাকান দেয়া, যাতে বাইরে না আসে, সব আলোই লোকটার চোখে পড়ে তাকে কানা করে দিয়েছে, ‘কে ডা? জিন হইলেও তো এতক্ষণে দেখা যাওয়ার কথা।’ লোকটি ধৈর্য রাখতে না পেরে আলোটা একটু ঘুরিয়ে এক পলক দেখেই হেঁকে ওঠে, ‘আরে মণ্ডল-চেম্বার?’ আলোটা আবার সে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ফেলে, ‘আপনার এই দশা?’ 

‘ক্যা? আমার দশ কী দেইখল্যা? কিন্তু তুমি যদি সত্যিকারের জামির হও, জিহুরির দখলি জামির না হও, তাইলে, কও–তোমার এই দশা ক্যা? 

‘কী দশা দ্যাহেন মণ্ডলমেম্বার। কারো তো তেমন ভুল হয় না। বেবাক তো একবার চায়্যাই চিনে। তবে, অ্যাহন তো না চেনা মাইনষিই বেশি। তারা তো ডাকে মিয়াশাব আদাব। বুইঝ্যাই যাই নয়াচেনা। আপনারে য্যান অনেকদিন পরে দেহি? হকশাহেব হিন্দু হওয়ার পর বোধহয় আগমন নাই? যান কই? সদর। তো যান, গাও মেইল্যা দ্যান। আমি যাবনে উপরে—’ 

যোগেন বিমূঢ়তা নিয়েই দোতলায় ওঠে, একটা কিছু বড় রকমের বদল ঘটেছে। কাল শাহেবের সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধের জানা-অজানা নিয়ে কী কী বিভ্রাট হতে পারে—তার একটা আন্দাজ সে পেয়েছে, মানে, একটা আন্দাজ বানাতে পেরেছে। সে-আন্দাজটাকে সে আরো খানিকটা বাড়াতেও পেরেছে শাহেবের ঐ কথা থেকে—যুদ্ধ তো একটা স্বাভাবিক অবস্থা নয়, স্বাভাবিকের সম্পূর্ণ বিপর্যয়। বিকার। যুদ্ধই হচ্ছে সেই সময় যখন সাপখোপ, পোকামাকড়, রেপটাইলস, বিষাক্ত মাকড়সা, তেলাপোকা, উকুন, কেন্নো, কেঁচো বেরিয়ে পড়ে। কোনো কিছুই যুদ্ধে অসম্ভব নয়। যুদ্ধের সময় হয় চোখ বুজে বা দৃষ্টি সরিয়ে রাখতে হয়। সেটাকে, এই কথা অনেক ছড়িয়ে নিলেও কি এই পর্যন্ত ভাবা যায় যে সে খুলনার ঘাটে বরিশালের জাহাজ হারিয়ে ফেলবে আর জামির মিয়া এমন বদলে গিয়ে তার পুরনো দোকানেই বেচাবিক্রি করবে? 

সরু, খাড়া ও ছোট সিঁড়িটা ভাঙতে গিয়ে যোগেন বোঝে, পা হড়কে যেতে পারে, দেখতে পাচ্ছে না, ওপরের ধাপের ছায়া পড়ছে নীচে ধাপে, সিঁড়ির ওপরে কোনো আলো নেই—অন্য কোথাও থেকে আলো এসে পড়ছে। যোগেন রেলিংটা ধরে পায়ে-পায়ে ওপরে ওঠে। ওঠার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে সে সিঁড়ির অন্ধকার খাড়াইটা মাপে। আর, তারপর আবার ঘুরে ওখান থেকেই অন্ধকার প্রবাহের দিকে চেয়ে থাকে। চাইতেই সেই প্রবাহ তার বিস্তার ও শূন্য আকাশের সঙ্গে কল্লোল নিয়ে ফিরে আসে। জল, জল, আঃ জল। বড় নদীতে অন্ধকার কখনো জমাট হয় না। কুয়াশা, একটু ঘন বা পাতলা, ছড়িয়ে থাকে আলোর আভার মতো। হাওয়া, জলের, জাহাজের ও-মুখ থেকে। 

যোগেন এগিয়ে যায়। কোণের একটা চেয়ারে একটু বসে থাকলে শরীর ও মন শুশ্রুষা পাবে। 

চেয়ারটায়, ডেক চেয়ারটায় শরীর এলিয়ে দিয়ে যোগেন জলের দিকে তাকায়। কোনো ডিঙি নৌকো, ছিপ নৌকো, ছই নৌকো নেই, কিন্তু এ-সময় তো গিজগিজ করে জিনিশবেচার নৌকোগুলো। যোগেনের মনে পড়ে, সব নৌকো পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। 

ডিনায়্যাল পলিসি। সংবাদ বা তথ্যের ভিতর এতটাই তফাৎ? জাহাজে এখনো একটি লোকও তার সঙ্গে কথা বলেনি। এটা সম্ভব? এক জাহাজ লোকের মধ্যে যোগেন মণ্ডল একজনেরও চেনা নয়? 

তা কেন? জামির তো আসবে। 

চেয়ার থেকে ঘাড় উঁচিয়ে সে অন্য যাত্রীদের দিকে তাকায়। যত কম যাত্রী মনে হয়েছিল, তত কম নয়। চোখ সয়ে গেলে বোঝা যায় যত ফাঁকা ভেবেছিল, তত ফাঁকা নয়। চেয়ারে অনেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। 

যোগেন তো কারো মুখই দেখতে পাচ্ছে না। তাহলে চিনবে কী করে? তার চেনা লোকরাও নিশ্চয়ই তার মুখ দেখতে পাচ্ছে না। তাহলে তারাই-বা চিনবে কী করে? যোগেন তাকাচ্ছিল—কোনো বাটলারকে দেখা যায় কী না। খিদে পেয়েছে, একটু কিছু খাবে। 

বাটলার খুঁজতে গিয়েই যোগেন এমন একটা কারণ খুঁজে পেল—এই ব্ল্যাক-আউটের জন্যই সব বিভ্রাট। ব্ল্যাক-আউট নিয়ে কলকাতার বাইরে, ইনডাসট্রিয়াল বেল্ট ছেড়ে দিলে কোথাও তো কোনো অসুবিধের কথা শোনেনি যোগেন। প্রথমত, কলকাতার বাইরে সন্ধ্যা ছোট, তাড়াতাড়ি রাত হয়। দ্বিতীতয়, সদরগুলো বাদ দিলে বাংলা বা মফস্বল তো চিরকাল ছোট সন্ধ্যাটা অন্ধকারেই কাটায়। এমন কী দুর্যোগের রাতও। এমন কী তুফানের নদীও অন্ধকারে পেরতে হয়। 

এখানে হয়তো বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জাহাজ-লাইনের এত ভিড় বলে। রাতের জাহাজে তো সব সময়ই ফূর্তি, ঘুমিয়ে থাকলেও। এত জাহাজ, এত নৌকো, এত আলো—–এ ঘাট তো গমগম করে। কোনো ছোট লঞ্চও যাচ্ছে না—একটা হুইসলও শোনেনি। এই তরল জলবিস্তার দিয়ে আলোকিত কোনো রেখা এখনো চোখে পড়েনি। 

যোগেন এক বাটলার খুঁজে পায় বটে কিন্তু সে যোগেনের ডাকের ইশারা দেখতে পায় না। 

এতক্ষণে যোগেন ধরতে পারে—আলো সব গোলমাল করে দিচ্ছে। আলো? না, ছায়া। আলোগুলি থেকে কোনো ছায়া তৈরি হচ্ছে না। বা, যেটুকু হচ্ছে, তা হারিয়ে যাচ্ছে। মাথার ছায়া ঢেকে দিচ্ছে মুখ। তাই, কেউ কাউকে চিনতে পারছে না। 

একটা কারণ খুঁজে পেয়ে আশ্বাস্ত হয় নাকী যোগেন? 

যোগেন উঠে রেস্টুরেন্টে যায়। রেস্টুরেন্ট তো ঠিকই আছে, শাদা ধবধবে কাপড়ে মোড়া। কাচের গ্লাশগুলো উপুড় করা। মেইন দরজার ডানদিকে ক্যাশ কাউন্টার। এক মহিলা, এক বাচ্চা ও এক ভদ্রলোক খাচ্ছেন। সেই টেবিলটার ওপর যে আলো জ্বলছে, সারা রেস্টুরেন্টে সেটাই আলো। 

যোগেন ঢোকার পরই এক বাটলার ছুটে আসে, ‘আসেন বাবু, আসেন, ডিনার তো, কয় কোর্স, স্টার্টার দিব নি?’ 

ধুতি-পাঞ্জাবি বলে যোগেন বাবু, কোটপ্যান্ট হলে স্যার পাজামা-পাঞ্জাবি হলে ছাহাব, লুঙি হল মিয়াছাব। 

‘তোমার মেনু তুমি তো কইয়্যা সারলা! এদিকে যে চাতক পক্ষীর মতন চাইয়্যা আছি—কারো তো দেহা নাই—’ 

‘খাইছে। আপনে খুঁইজ্যা পান নাই বাবু? কাউরে খুঁজছিলেন আমাগ?’ মানে যারা খুব নিয়মিত যাতায়াত করে ফার্স্ট ক্লাশ বা কেবিনে, তাদের কোনো-কোনো বাটলারের সঙ্গে এমন ভাব হয়ে যায় যেন তার নিজেরই বাটলার। 

‘তোমারেই তো খুঁজছিল্যাম সোনা। ডিনারের অর্ডার বাদে নিয়ো। অ্যাহন এড্‌ডু চা দ্যাও। আর, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এক ডিশ। আমার একজন গেস্ট আসব। দুইডা চা দিয়ো। জাহাজ ছাড়ব কহন? 

বাটলার তার কোর্টের হাতাটা তুলে ঘড়ি দেখে বলে, ‘টাইম তো হয়্যা গিছে। তবে মনে হয় আইজ মেটরিওয়াল লোড হচ্ছে। দেইখ্যা আইসব? দেখা নিষেধ বটে, মেটরিওয়াল লোড তো। ডিপারচার টাইম পার না হইলে, সিঁড়ি না তুইললে, স্টার্ট হয় না। ঐ পিছনের দিকে লোড হয় ডাইরেক্ট এক্কেবারে ছোট বোট থিক্যা। দেইখ্যা আইসলে মনে শান্তি—দুই ঘন্টা না চারঘন্টা আন্দাজ কইর‍্যা কাম করা যায়।’ বাটলার আবার তার হাতা তুলে ঘড়ি, দেখে। ‘দেখাইড্যা কিন্তু পুরা বেআইন। এম. পির আওতায়। কিন্তু বাবু, সিঁড়ি যদি তুইল্যা থাহে, কাছি যদি ছুঁইড়া থাহে, তাইলে আপনার গেস্ট ক্যান লেট বাবু’, ছেলেটি আবার ঘড়ি দেখে। 

‘আরে মিয়া, তোমার ঘড়ি-দেখা তো শ্যাষ হয় না।’ 

বাটলার ছোট্ট একটা ‘হিস্‌স্‌’ আওয়াজ করে, নতুন আওয়াজ, কলকাতায় শুনেছে, ইয়াংকি সোলজাররা ট্যাকসি-ডাকলে, টমিরা করে না। আওয়াজটা খুলনা-বরিশাল লাইনে পৌঁছে গেছে। ছেলেটি ততক্ষণে তার ঠোটের উপর তর্জনীর নিষেধে কথা বলতে না করে। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে, ‘ঘড়ি পইড়ব্যার পাইরলে তো পড়ব? জাপানি মাল বাবু। বার্মার এক ইভ্যাকুর থিক্যা দিন দুই আগে কিনছি। চাইছিল একশ। জামির আলি দর পাকা কইর‍্যা দিল, সত্তর। যুদ্ধের বাজার কিন্তু চড়া। বাঘের দুধ চান, সিল কৌটায় পাবেন, সত্যিকারের বাঘের দুধ। জাপানি বাঘ।’ 

‘জামির মিয়া কেডা। তলার ভাতের হোটেল?’ যোগেনের কথা শুনে ছেলেটি আবার সেই হিস্ শব্দ তুলে আঙুল ঠেকায় ঠোটে, ‘কন কী বাবু, জামির মিয়ার ক্যাপাসিটি জানেন? লিগের সেক্রেটারি।’ 

‘কও কী? জামিরই তো আমার গেস্ট!’ 

‘কন কী বাবু। আপনে কি লিগ? তাইলে ধুতি ক্যা? বাবু, তেষ্ঠার কথা কইতেছিলেন, এডডু স্কচ দিব। খাশ জাপানি। জামির মিয়ারে দিয়্যা যাচাই করেন।’ 

‘আচ্ছা। সে জামির মিয়্যা আউক। তার লগে বুঝো। আমারে তুমি মণি এডডু আলুভাজা আর একডা জাপানি চা দ্যাও।’ যোগেন বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই বাটলার তাকে আধা-পাক দিয়ে সামনে এসে বলে, ‘বাবু, চা তো জাপানি হয় নাই অ্যাহনো? 

‘ও। তুমি না কইল্যা জাপানি বাঘের দুধও কৌটায় সিল করা পাওয়া যায়। স্কচও জাপানি পাওয়া যায়, তাই ভাইবল্যাম চা কি আর জাপানি না হইয়া পাবে?’ 

‘বাবু, আমার একডা কথা রাখেন। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের লগে একডা স্কচ, ঠিক এক পেগ বাবু। দ্যাহেন, তেষ্টাটাও দূর হইব, মনডাও ভাল হইব’, ছেলেটি আবার ঘড়ি দেখল। 

‘সে তো কইল্যাম, জামির মিয়্যা আসুক—’ যোগেন বেরিয়ে গেল। বাটলার দৌড়ল ভিতরে। যোগেন একটু হাসতে পারে, সামান্য। না, বাটলার বাটলারই আছে। এখনো যুদ্ধেও। মুরগির যে ডিম তখনো পাড়া হয়নি তারও ওমলেট ভেজে খাওয়ায় খদ্দেরকে। 

হয় চা, না হয়, জামির মিয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে যোগেন একটু স্বাভাবিক হয় ও ঝিমিয়ে যায়। জাহাজে উঠে বুঝতে পারছে না, বরিশালের জাহাজ কী না, চেনা লোক পায় না, তাকে চেনে এমন লোক পায় না, পাকা পেয়ারাতুল্য মাথা-মুখ বদলে জামির মিয়া কেমন টুপি পরা, ঝালর-লেজা মোরগ হয়ে যায়—এতে কার না মাথা খারাপ হবে। এমন একটা যুতসই যুক্তিও তো পাওয়া যায়—রাত বলেই এমন, দিনের বেলা তো সূর্যের আলো। সেটা তো আর ব্ল্যাকআউট হবে না। তখন মানুষের ছায়াও পড়বে, চোখও দেখা যাবে। 

বাটলারটা জাপানি স্কচের গল্প বলে মনের সাড় ফিরিয়ে দিয়েছে। 

তার চেয়ারের পাশে একটা পেগ টেবল রেখে দিয়ে যায় বাটলার। তারপর দৌড়ে ফিরে পট-পুট ঢাকা ট্রে নিয়ে আসে, চায়ের। ‘বাবু, এডডু ভিজব্যার দিবেন, দার্জিলিং টি তো, তাও আবার গোল্ডেন পিকো। এই চা তো সার্ভিস করা বেআইন। শুদু মিলিটারি অফিসারগ আর গরমেন্টের অফিসারগ।’ বাটলার একটু হেসে, কথাটা শেষ না করে চলে যায় ও এক জামবাটি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ঢাকা দেয়া, নিয়ে ফেরে। 

‘বাবু, আপনে কি সস নিবেন, চিলি, আলুভাজার লগে’? 

‘না। কোন দুঃখে? যাগ দ্যাশে কাঁচা মরিচ নাই, স্যায়রা সস খাবার পারে, আমি তো কচ কইরা কামড়াইয়া কাঁচা মরিচ কাইটব্যার পারি।’ 

‘যা কইছেন, বাবু। এই যুদ্ধের দৌলতে তো এই সবের খুব আমদানি হচ্ছে। বাবুলোকদের দিমাগ বদলে তাজ্জব লাগে। সময়ডা তো আগের মতন নাই।’ 

‘এই শোনো, বান্যায়া বান্যায়া দুঃখের কান্না যদি কাঁদো, তাইলে তুমি যাও, আর কাউরে পাঠাইয়্যা দ্যাও’— 

‘অর্থাৎ যে আপনারে হাস্যরস দিব্যার পারে—এই তো? তার কারণে আমারে বিদায় দেওনের কারণডা কী। তার থিক্যা কইলেই হয়। আইজকাইল লোকে দুঃখের কথা শুইনব্যার চায়। বেশি। ওয়ারটাইম তো? বাবু, চাটা আমি ঢালি? 

‘তো ঢালো—’ 

পটের ঢাকনি খুলতেই ভাল চায়ের গন্ধ নাকে লাগে, ‘বাবু, কইছিলাম না গোল্ডেন পিকো। শুধু বাবু অফিসারগ লাইগ্যা। হাই অফিসার। ধরেন, মিলিটারির লগে বাবু, কর্নেলের নীচে কাউরে দেয়ার অর্ডার, নাই কিন্তু বাবু, মিথ্যা কথা কব না, আমরা লেফটেন কর্নেলরেও দেই আর আপনারে দিল্যাম –’

‘আমারে কি তুমি গবর্মেন্টের অফিসার ধইরছ? আমি কিন্তু অফিসার না। আইন ভঙ্গ কইরো না। চা খায়্যা ফেলার পর ফিরৎ চাইলে ফেরৎ দিব্যার পারব না।’ 

‘কী যে কন, বাবু। অফিসার মানে সাব-ডেপুটি কি মুনসেবা হইলে চলব না। কমপক্ষে সদর-হাকিম। আপনার কথা আলাদা’। 

‘ক্যা? আমি তোমার বাপের গুরুঠাকুর লাগি ক্যামনে?’ 

‘ছি বাবু। ছী। আপনারা মানী মানুষরাই মানুষের মান নষ্ট করেন বেশি। আপনে-না কইলেন, জামির মিয়া আপনার লোক। তাই যদি হয়, তাইলে আপনে কি এই বরিশ্যাল লাইনে স্পেশ্যাল গেস্ট লাগেন না? জামির মিয়ার লোকরে যদি গোল্ডেন পিকু খাওয়াবার না পারি তাইলে আমার বাটলার হাওয়ার কামডা কী? তাইলে কুনো কর্নেল শাহেবকে কইলে তো আমারে আর্মি মেসের বাটলার কইর‍্যা নিয়্যা যাব, তেমন গেলেই হয়। এই যে বাবু, বরিশাল-বাখরগঞ্জ-চাটি গাঁ-খুলনা—যুদ্ধের এই বেবাক তল্লাটে কুনো একজন লেফটেন–কর্নেলের আর তার থিক্যা উপর দিকের লাইনে কুনো শাহেব অফিসার পাইবে না যে আমার হাতে তৈরি ককটেল খাইব্যার আসে নাই। তার উপুর বাবু, আপনে জামির মিয়ার মানুষ। জামির মিয়া হইল লিগের সেক্রেটারি। তাইলে আপনে আমার নিজের মানুষ কী না, কন।’ 

‘তা তোমার সেক্রেটারি শাহেবরে তো দেখি না।’ 

‘এই অ্যাহনি আইয়া পড়ব। জাহাজ ছাড়ার মিনিট পনেরর পরে মেক-আপ তুইল্যা জামির মিয়া সব দেইখবার বারান।’

‘জাহাজ ছাড়ছে নি?’ 

‘বুঝেন নাই? পনের মিনিট হইল। আলো নাই তো। জলে তাই জাহাজের ছবি ছাপা হচ্ছে না। আপনার মত পুরান— প্যাসেনজারই টের পাইলন না। এমন হচ্ছে। তবে অভ্যেস হয়া যাবে? যুদ্ধের সময় বাবু, কত যে অভ্যাস হয়। ডিনারে কী দিব কন’। লোকটি বলে বসে। 

‘সেডা আমি কই ক্যামনে? আমারডা কইব্যার পারি। কিন্তু জামির মিয়ারডা জামির মিয়ারে শুধাইয়্যা আইসো। না হয় তো ধইরা আনো তারে।’ 

‘খাড়ান বাবু। সেডাই উত্তম কথা’ ছেলেটি দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায়। একটু পরেই পুরনো জামির মিয়াকে নিয়ে ফেরে। যোগেন দেখে, সেই আদি জামির মিয়া—সেই গাল-মাথা কামানো, একেবারে ঝুঁটি না বাঁধা বড় পেঁয়াজ। 

যোগেন বলে, ‘এই তো বন থিক্যা বারাইল চেনা টিয়্যা।’ 

‘বাবু। ডিনারের অর্ডারডা—’ 

‘জামির, কয়্যা দ্যাও কী খাবা?’ 

‘যা তো অ্যাহন। জানিস মানুষড়া কেডা? তোর যা খাওয়াওইবার বাসনা, তাই নিয়্যা আয়। যা-আ। অ্যাহন দরকারি কথা হইব। মাইঝখানে আইয়্যা কথা ছিটাইস না।’ 

ছেলেটি দৌড়ে চলে যায় বলতে-বলতে, ‘মোরগা কোঁক পাড়ে, কোঁক পাড়ে আন্ডা পাড়ে না।’ 

যোগেন আর জামির দুজন দু-জনার দিকে তাকিয়ে হাসে। যোগেন বলে, ‘এইডা কী কাম কইরছ। বেবাক বদল। আমি তো চিনব্যারই পারি না।’ 

‘যুদ্ধ-না? শুনি যে কইলকাতা এক্কেরে বদলাইছে? কী য্যান একটা থাম্বা আছে গড়ের মাঠে। সেইডা না কী পূর্ণিমা রাইতে আকাশ থিক্যা দেখা যায়। তাই থাম্বা ডারে উলটা কইর‍্যা মাটির ভিতর ঢুকাইয়্যা রাখছে।’ 

‘আর এমন কী বদলের সংবাদ পাইল্যা জামির?’ 

‘শাহেবগ সঙ্গে মুসলমানগ কথা পাকা হইয়্যা গিছে। এই চাইর জিল্যার মালিকানা শাহেবরা ঢাকার নবাব ছাহাবরে গস্ত কইর‍্যা ‘তবে’ বলে জামির গায় আমারই বঁধুয়া আনবাড়ি যায় আমারই আঙিনা দিয়্যা?’ 

‘সত্যিই বদলাইছে জামির। নাইলে তোমার গলায় রাধিকার গান? তুমি না কংসবধ পালায় নেপথ্যে কংসের অট্টহাস্য হাসতা? এমন সাহস তোমার জুটাইল্যা কোত্থিকা’। 

জামির এদিক-ওদিক তাকিয়ে যোগেন আর লঞ্চের বেড়ার মাঝখানের ফাঁকটাতে বসে পড়ে, যোগেনের হাঁটুতে হাত রাখে আর হাসে। তারপর বলে, ‘দ্যাশের বিপদ, ইসলামের বিপদ, লড়কে লেঙগে পাকিস্তান।’ 

‘আরে, তা ন্যাও। কিন্তু তার লাইগ্যা ঐ নাম্বা টুপি, পাঞ্জাবি ক্যা যে আমিও তোমারে চিনব্যার পারি না? চুল কি পরচুলা? নুরও তাই?’ 

‘ভ্যাক লাগব না? ভ্যাক না লইলে নেতা হয়? আমি তো সেক্রেটারি। লিগের। দ্যাহেন মেম্বারশাব, নসিবের কথা কেউ কইব্যার পারে? আপনাগ জামির না কী লিগের সেক্রেটারি। তাই সন্ধ্যাডা ভ্যাক লইয়্যা থাকি, পরচুল্যা আর পরনুর লইয়্যা। সন্ধাবেলা তো লোকজন বেশি, লাইট কম। তাই ভ্যাক মাইন্যা যায়।’

‘তুমি কোন লিগের সেক্রেটারি?’ 

‘হকশাহেবের না। হকশাহেব তো হিন্দুমহাসভা হইছেন।’ 

‘এইডা কি একডা সেক্রেটারি আন্দাজের কথা হইল? যত বরিশাইল্যা জব। মণি, তুমি খাবা? না-খাওয়ার তো কারণ নাই। সিধা কও তোমার নেতা কেডা?’ 

‘সব মুসলমানের যেডা নেতা—’ 

‘তুমি কি নবী মোহম্মদের কথা কও, জামির?’ 

‘আরে, আপনে কি আমার পড়া ধনের নাকী! আমি ক্যামনে নবী মোহম্মদের কথা জানব? আমি তো কই, কায়েদ আজমের কথা।’

‘ঠিক, তাইলে তাই কও। তো কংগ্রেসে যেমন বামুন আছে, লিগেও তো তেমনি বামুন আছে। বামুনরা কি চায় আমার মত শুদ্দুররে সেক্রেটারি, মিনিস্টারি কইরতে, আর লিগের বামুনরা কি চায় তোমার নাগাল পাতি-নেড়ারে সেক্রেটারি কইরব্যার? বামুন কেউ ছিল না?’ 

‘কী যে ক–ন,’ বলে জামির একেবারে আওয়াজ না-করে এমন হাসে যেন জোয়ারের কাদার ভিতর থেকে কুমির শুধু তার চোয়ালের হাসিটুকু বের করে রেখেছে। যা হোক, জামির তার নিজের সময়ে হাসিটা শেষ করে একটা হেঁচকি তুলে। তারপর বলে, ‘সেইডাই তো রহস্য! নাইলে জামিররে করে সেক্রেটারি?’ 

যোগেন রহস্য জানতে চায় না। সে বলে, ‘তোমার সাজগোছ কি তোমার ন্যাতারাই সাপ্লাই দিল?’ 

‘না, না, ঐটা তো আমারই বাছা। যশোরে এক যাত্রাপার্টির দুকানে গিয়্যা নিজে পইর‍্যা-পইর্যা আয়নায় দেইখ্যা-দেইখ্যা চয়েস করছি। দোকানি এক বুড়া ঠসা। সে শুদু জিগায় পালা কী আর পাট কী। আমি কি জানি নাকী যে কব। আমি বুড়ার দিকে চাইয়্যা ঠোঁট নাড়াই। বুড়া ভাবে আমি তার কথার জব দিছি, সে-ই ঠসা বইল্যা শুইনব্যার পারে নাই। কিন্তু বুড়া নজর কইর‍্যা দেইখছে, আমি পরচুলা আর টুপি পইর্যা-পইর্যা দেখবার লাগছি বেশি। তহন আবার চিল্লায়, ‘আরে, আমার দুইকানে তো পালা মাইপে পাট মাইপে সেট আছে। কী, মুগলের পাট? আমি তার দিকে ঘুইর্যা আবার মুখ নাড়াইয়া যেডা কইল্যাম না সেইডা হইল—আরে বুড়া খাটাশ, আমার কি পালার পাট? আমার তো ড্রেসের পালা।’ 

‘তোমার কি সেক্রেটারির লগে এডা ইউনিফর্ম, নাকী ইউনিফর্মের লগে সেক্রেটারি?’

‘আমি কি পুলিশ, নাকি সিভিক গার্ড, নাকি হোমগার্ড, নাকি এ-আর পি যে আমারে সরকারের কাছ থিক্যা ইউনিফর্ম নিব্যার লাগব? আমি তো পার্টির লিডার। ঠিক লিডার না অইলেও, মুসলিম লিগ পার্টি, জিন্নাপন্থীর সেক্রেটারি। পার্টির নেতাগ তো নিজের পছন্দসই পোশাক। কায়েদে আজমের লম্বা কোট আর চিপা পায়জামা। আবার সারওয়ারদি সাহেব তো খাশশাহাব। গান্ধীর না কাপড় হাঁটু থিক্যা মাজার দিক বরাবর উইঠতেই থাহে। হিন্দুসভার শ্যামাপদর গলা বন্ধ কোট। তো একডা বড় মুশকিল হইছে যে পাড়ার লিডারও পোশাক বানায় জাহাজেই সেদিন দেহি, ছোট হুলার কাঠির হাটের এক হাটদার ছিল না, গুলি কইয়্যাই তো ডাকত্যাম, মনে আছে নি?’ 

‘ক্যা আমার মনে কি মড়ক দিচ্ছে। ওরে কম চিনব্যার পারি, ওর বাবাকে তো চিনত্যাম। চশমা ছিল—ছোট হুলার হাটের সব মানুষের মইদ্যে একা চশমাধারী। 

‘কন কি মেম্বার শাহাব, স্যাও মনে রাইখছেন?’ 

‘আরে, বড় আবিদ আলি কার হাফশার্ট বানাইল-না? বাঁ-কাঁধের থিক্যা ডাইন কাঁধ নাকি বড় হইয়্যা গিছে। একে হাফশার্ট কেডা পরে এহানে? বাবুগ কলেজে পড়া ছাওয়ালরা ছুটিতে বাড়ি আইলে পরে। বড় আবিদ আলি যার হাফশার্ট অর্ডার নিছিল, তারে তো কেউ এইখানকার মানুষ বইল্যা চেনে না। সে বোধহয় ঐ পশ্চিমের মাইঝ্যান বাবুর প্রথম পক্ষের শালার ছাওয়াল। যশোর না খুলনায় কলেজে পড়ে। স্যায় তো শার্ট ডেলিভারি লগে আইস্যা শার্ট পইর্যা কয়, আমার ডান কাঁধ ক্যা বাঁ কাধ থিক্যা বেশি ঝোলা?’ 

‘দ্যাখল কই, সেই পোলা? নিজের কাঁধ নি নিজে মাপা যায়?’ 

‘তোমার দেহি লিগের সেক্রেটারি হইয়্যাও উন্নতি নাই। কথার সুত ছাইড়ব্যার চাও না? না-হয় ধইরা নিল্যা, এক হাটে ডেলিভারি দিয়া পরের হাটে কমপ্লেন দিছে। তাতে তোমার কী আপত্ত আছে?’ 

‘আপত্ত নাই। সত্যাসত্য মাপার লাগব না? সেটাই তো পার্টির লিডারের কাম আর খ্যামতা—’

‘আরে, এইডা তো সাবেক কালের ঘটনা। তহন তোমার কামও তৈরি হয় নাই, খ্যামতা ও তৈরি হয় নাই।’ 

‘স্বীকার হইল্যাম। ক—ন।’ 

‘সেই ছ্যামড়া আইস্যা, আবিদ আলিরে কয়—তার শার্টের দুইখান কাঁধের ব্যাশকম হইল ক্যা? তোমার কাঁধ যদি বেমাপের হয় ঠাকুরবাছা, তাইলে তো তোমারে ফৌজদারি রুজু কইরব্যার লাগে খোদার দরবারে। এহানে বিচার কইরব কেডা—আবিদ আলি তার দিকে চাউনি উপুড় করে না। সে পোলার তো য্যান কুত্তার গাঁড়ে পাটের মশাল ঢুইকছে। তহন শার্টের কথা আর নাই। পোলা ইংরাজি বাংলায় আবিদ আলিরে ধুয়াইতে লাগে। তহন তার নালিশ শার্ট নিয়্যা না। তহন তার নালিশ আবিদ আলি তার নামে স্ক্যান্ডাল কইরতেছে। স্ক্যান্ডাল বুঝ?’

‘আপনারে কি কওয়া যায়—বুঝি। তবে মতলবড়া বুঝছি। অকথা-কুকথা।’ 

‘আবিদ আলি তারে একবার কইছে কিন্তু আমার চোখ দিয়া মাপ নিছি। আর কাচি দিয়্যা কাটছি। এর মইধ্যে আমি আসি কুথায়?’ 

তহন পোলাবাবু চিক্কুর দিয়া কয়—তুমি তো আমার মাপই ন্যাও নাই। আবিদ আলি এইবার কইল, ক্যান? আমি তোমার দিকে চাই নাই? দুইডা চক্ষু দিয়্যা চাই নাই? পোলাবাবু তহন তার শেষ অস্ত্রডা ছাইড়ল—আপনার চশমাডা তো ঘোলা, বাইরে থিক্যা তো আপনার চক্ষু দেহা যায় না, আর, আপনে কন চক্ষু দিয়্যা মাপ নিছেন? খলিফার কাম করেন, মাপ নিয়ার ফিত্যাও নাই? আবিদ আলির অপমান ঠেকে। এ ছ্যামড়া তাকে কইল—চোখে কানা, মাপে কানা, ফিতাকানা। সে কইয়্যা উইঠল—হারামি কথা কইবেন না। আপনার কাঁধও খোদার সৃষ্টি। আমার চক্ষুও খোদার সৃষ্টি। এর মইধ্যে শাহেবগ মাপামাপির ফিতা আসে কোথিক্যা? কাফেরগ ভাষার ১, ২ লেখা। কাফেরের সংখ্যা আমি পইড়ব ক্যামনে। বাংলাও যে পারি, তা না, তবু সংখ্যাগুলা তো বেশি চেনা ঠেকে। চক্ষুর মাপ থিক্যা ফিত্যার মাপ হইল বড়? এই সব লেখাপড়া শিখায় ইশকুলে? তহন পোলাডা একডা পাল্টা কথা কইয়্যা আবিদ আলিরে দিল ফাঁসাইয়া। পোল্যা কয়্যা বসে, তোমার খোদার দরবারে কি সুবিচার নাই? কার দোষ সেডা তো মাপা লাগে। মাপা লাগে কি লাগে না? তহন আবিদ আলি তার প্রস্তাব দেয়। তুমি এইহানে ঐ শার্টটা পইর্যা খাড়াও, এই মানুষ ভর্তি হাটের একগণ্ডা এক মানুষও যদি কয় তোমার শার্টের দুই কাঁধের দুই মাপ, এক-গণ্ডা-একজন মানুষও যদি কয়—আমি নিজের গুনাহ মাইন্যা শোধ দিব। ব্যাস। শুরু হইয়্যা গেল খোদার বিচার। মাইঝ্যান কত্তার আগের পক্ষের শালার পোলা সেই শার্টখান পইর্যা খাড়াইল। আবিদ আলির দুকানের সামনে দিয়্যা যে যায়, তারেই আবিদ আলি ডাইক্যা কয়, ‘এই মিয়া, দেহ তো এই ছ্যামড়ার শার্টের মাপে কান্ধের ডাইনে-বাঁয়ে তফাৎ আছে কী নাই।’ প্রথম দিকের দুই-চাইর জনকে বলার পর আর কাউরে বলার লাগে নাই। কেউ আইস্যা, তলার সেলাই দেইখ্যা কয়, ‘এরে কয় খলিফাগিরি। খোদার দোষও সামলায়।’ কেউ-কেউ আবার সমস্যাটা বুঝতেই পারে না। কিন্তু খোদার দুনিয়ায় তো ইবলিসও থাকে। এমন এক ইবলিশের বাচ্চা পোলাবাবুরে কানে-কানে কইল—আবিদ আলির একডা চোখ তো কানা, সেই দিকের মাপড়া টেড়া হইয়্যা যায়। আর, আবিদ আলিরে কইল, ‘তোমার কামের খুঁত ধরে কেডা?’ আর-একজন পোলাবাবুরে কয়, ‘আরে আবিদ আলি কি সারা জীবনে লুঙ্গি-ছাড়া কিছুর সেলাই দিছে?’ আপনারা টাউনের…।’ আর, আবিদ আলিরে বলে, ‘তোমার সেলাইয়েরও পরীক্ষা? একগণ্ডা-এক তো দূরের কথা, মানে, একহাতের পাঞ্জায় পাঁচড়া আঙুল, দূরে থাক, পোলাঠাকুর তো লবডঙ্কাও পাইল না যে কইব যে তার শার্টের বাঁ কাঁধের থিক্যা ডাইন কাঁধড়া বড়। মাঝখানে একহাট লোকের মইধ্যে এইডা প্রমাণ হইয়্যা থাকে যে বাবুগ পোলার দুই কাঁধ অসমান। তার তো নামই হইয়্যা গেল—দেড়কান্ধা। শ্যাষে নামের বেড় থিক্যা বাঁইচবার লগে পালাইল তার বাপের বাড়ি। তো, কী য্যান কইতেছিল্যা এবাদ আলির পোলা গুলিরে লইয়্যা?’ 

‘আমি? কহন কইল্যাম? গুলিরে লইয়্যা? ক্যা? কব ক্যা?’ 

‘আরে—কইল্যা-না—লিডারগ ড্রেস লইয়্যা? আমি তো তহন ওর বাবার গল্প কইল্যাম— দেড়কান্ধার গল্প। 

‘ও ও ঠিকই তো। আমনে যদি এই বেবাক মানুষের বাবা বাবারবাবা নিয়্যা টানাটানি করেন, তালি আর বাপের পোলার কেচ্ছা কার মনে থাইকব? গুলিরে দেখি সেদিন একখান নামাজি টুপি মাথায় দিয়্যা জাহাজ পারায়। ছিটের। ঐ বাপের সেলাই-ফোঁড়ার বাড়তি ছেঁড়া কাপড়গুলা সিলাইয়া মাথায় দিছে। আমি ডাইক্যা কইল্যাম, ক্যারে গুলি, খুলি-ঢাকার কাম হইল কী? তো, সেই ছ্যামড়ার নিকট শুনি পরের কোন হাটবারে ইশকুলের মাঠে মিটিং দিবে পিরশাহেব কুমিল্যার। সেই মিটিঙে আবদুল বারি ছাহাব গুলিরে কাজ দিছে। দশ-দশজন এমন মানুষরে জড়ো দিব্যার লাগব যারা আগে কহনো পার্টিও ধরে নাই, মিটিঙও ধরে নাই। তো কও কাহা, আমার কথা শুইন্যা পিরের মিটিঙে যোগ দিবার মতন আহাম্মক কি দ্যাশে কেউ আর বাকি আছে? তাই আগেই একখান টুপি পইড়ল্যাম, যাতে মাতবর মাতবর লাগে দেইখবার। তারপর আবার শুনায়—নামাজির এক বয়েৎ। মেম্বার শাহেব, দ্যাশের হাল বুঝেন। গুলি, ছোট হুলার হাটের গুলি, শুনায় বয়েত। তো জিগ্যাই—এ কার কাছ থিক্যা বিদ্যা নিলি। ক্যা, আমাগ গ্রামের মসজিদের ইমাম মৌলানা জমিরুদ্দিনের কাছ থিক্যা। সে তহন জাহাজের ঐখানে খাড়াইয়াই ইমামের কাছে শিখা আজান ছাড়ে আমারে শুইন্যাব্যার তালে। একটা ভুল কইরা ফেইলছে। তহন তো দু-পহরের নমাজের টাইম। ও দিয়া বইসছে, ফজরের আজান। জাহাজে তো পাঁচ ওক্ত সাত ওক্ত নমাজির অভাব নাই। তারা তো নিজের—নিজের মাদুর-শতরঞ্চি বিছাইয়্যা পা দিয়া চাইপ্যা খাড়া হইছে। যশোরের পুরানা রাজবাড়ির মসজিদের হাজি ইমাম ছিলেন উপরে। তিনি দিলেন বিরাশি সিক্কার গর্জন—আরে, আজান দ্যাও তো নমাজ জানো না? কিন্তু ততক্ষণে স্যায় গুলিও তার আজান থামায় না, আর, জাহাজ জুইড়া বর উইঠ্যা গিছে—আজান যহন কানে গিছে নামাজ ফিরাইয়ো না। খোদাতালা নমাজে ডাইকছেন, নমাজ ফিরাইনা নাই। আমাগ সেই ছ্যামড়াগুলি, ছিট সেলাইয়া নমাজি টুপিতে, দু-পহর কালে মেঘনার বুকে পড়াইয়া দিল ফজরের নমাজ। হাজি ইমামের ফতোয়ারে লবডঙ্কা দেখাইয়্যা। সেই থিক্যা তো গুলির নামই হইয়্যা গিছে—’লেট আজানি’। জাহাজের যেমন লেট হয়—’

‘আরে তোমার হইলডা কী জামিদ? কইল্যা—বেবাকে যদি লিডার সাজে, তাইলে, লিডারের সাজের কী দাম থাকে? গুলিও মার্ সাইজব্যার লগে মাথায় দেয় ছিটের নমাজি-টুপি। আর শেষ কইরল্যা, গুলি কেমন হাজি ইমামের মুখ ঘইষ্যা দিয়্যা ‘লেট আজানি’ নামধাম লইয়্যা মাত্বর হইল। তোমার কথাডা শ্যাষ তক খাড়াইল কী? কথার সুতা হারাও ক্যা?’ 

জামিদ ঐ একটু আবছায় যে মুখ তুলে তাকায় তাতে তার সারাটা মুখ থেকে যেন অসহায়তা গলে পড়ে। সে কার পক্ষে বা তার পক্ষ কোনটা। 

‘কী য্যান, মেম্বার, একবার মনে হয়—দেড়কান্ধা, লেট আজানি ভাল। আবার মনে হয়, পোলাবাবু-হাজি ইমামই ভাল। কোনডা যে ঠিক ভাল বুঝি না।’ 

‘বুঝাডারে আবার এত কঠিন কইর‍্যা তুলা ক্যান?’ যোগেন বলে। 

‘আমি কই কঠিন করি? আমারেই যে কঠিন করে। চারি দিগে যে মুসলমানের রাজ্যলাভ ঘইটব্যার লাগছে।’ 

‘তা ঘটুক। তুমি তো কুনো কালে মুসলমানও ছিলা না রাজাও ছিলা না। যার হওয়ার স্যায় যাউক। তুমি জামিদ থাইক্যাই গোরে যাইতা।’

‘অ! আপনের সন্দ যে আমার লোভ হইছে তাই লিগে গেছি।’ 

‘সন্দেহ না-হওনের কি কারণ আছে?’ 

‘কোনডারে সন্দ? আমার মনে হওয়াডায়? না কী মুসলমানের একডা দেশ হওয়ায়? শুধু-শুধু মুসলমানগ লাইগ্যা একটা দ্যাশে?’ 

‘আমার সন্দ দিয়্যা তোমার কাম কী? রাজ্য হইলে আমার কী ক্ষতি? চণ্ডাল তো মুসলমানগ ভাই। চণ্ডালগরও তো হিন্দু হওয়ার কুনো দায় নাই। আমার তো সুবিদা, মুসলমান আর শিডিউলগো আলাদা রাজ্য অইলে, যে-রাজ্যে বামুন নাই—।’ 

‘আপনে যেমন কয়্যা দিলেন, আমি তেমন ক্যান কইব্যার পাইরল্যাম না? এদিগে কইলকাতার কোম্পানি আইস্যা চাউল আর নাও ধইরব্যার লাগে। ধরাধরি থাইকলে তো এদিক-ওদিক পালানও থাহে। পালানো আটকাইতে তো শক্ত দাগী মানুষ লাগে। ধরেন, বরিশাল আর বাখরগঞ্জের কোনো হাট-বন্দর নাই যে হানে এক মুসলিম লিগের দুই-তিনজন সেক্রেটারি নাই। যেমন এক সেক্রেটারি খাল ঘুইরা চাউল আনে। আর-এক সেক্রেটারি সেই চাউল নৌকায় তোলে। আর-এক সেক্রেটারি টাহা দ্যায়—গুইন্যা-গুইন্যা দেয়। আর আমি সেক্রেটারি সেই মাল ফেলি, নৌকার পেট থিক্যা জাহাজের খোলে। আর তারপর খোল থিক্যা সেইডা ডেলিভারি দেই মেইললাইনের কুনো জায়গায়। এইটা তো হারামির কাজ। যারই রাইজ্য হোক, হারামির কাজ। অ্যাহন কার রাইজ্য? সব রাইজ্যেই তো হারামি লাগে।’ 

‘তোমার যা কওয়ার কও। ঠিক ভুল দিয়া তোমার কী? আমি শুদ্ধ কইর‍্যা ভাইব্যা নিব।’

‘বে—শ। ধরেন, যদি কেউ কয় এই বেবাক এলাকার সব চাইল এই জিলাতেই রাইখ্যা দিয়া নিষেধ। খাওয়ার চাল রাইখ্যা বাকি চাইল সরকাররে বেইচ্যা দ্যাও। হাতে নগদ পয়সায় দাম। আপনে তো জানেন মেম্বার শাহাব—রাজা হইলেও চাষা নগদের আকাঙ্খি। এক্কো চাউলও ঘরে রাখে নাই। যে-নৌকায় চাল ডেলিভারি দেই, সেই নৌকা তো আর জল পাড়ায় না। পুড়ায়্যা দ্যায়। মাস খান হইল তো ঘরদুয়ার ভাঙা শুরু হইছে। অ্যাহন শুরু হইছে যা হোক কিছু হাতে নিয়্যা ভিক্ষায় বাড়ান। রাজ্য যারই হোক, স্যায় ইবলিশ। যার ধান তারে দ্যায় না। তার হাতে দ্যায় এক ভাঙা সাকনি। সেইডা ধইর‍্যা টাউনে-টাউনে ঘুরে। ক্ষুধার তরে। ক্ষুধার তরে। মেম্বার শাহাব—আপনার চোদ্দ পুরুষে শুইনছেন কুনোদিন বাখরগঞ্জের মানুষ না-খাইয়্যা মরে? এই-যে দ্যাহেন মেম্বারশাহাব, রাইত নিশুত, মানুষভরতি জাহাজ, জলে য্যান আলো না পড়ে, হেডলাইটের আলো জ্বাইলব্যা না, অন্ধকার এই নদী দিয়্যা, অন্ধকার এই জাহাজ, অন্ধকার সব মানুষ নিয়্যা আন্ধার থিক্যা আন্ধারে যাইবার পাইরলে উচিত হইত। কিন্তু আন্ধারের নিয়ম আছে তো। যুদ্ধের আর আন্ধারের নিয়ম তো এক না। আন্ধার জুইড়া আন্ধার জাহাজ যদি আন্ধার মানুষগ নিয়্যা আন্ধার পারায়—তালেও তো আলো ফুটবে-নে। অমাবস্যার পক্ষ জাহাজ চইলবে আর জামিদ মিয়া যশোর-খুলনার যাত্রার দোকান থিক্যা কেনা জামা-কাপড় আর জিন্না-ক্যাপ পইর্যা মুসলিম লিগের সেক্রেটারি সাজব। তারপর আবার সেই সব খুইল্যা, নারকেল তেল দিয়্যা মুখের রঙ তুইল্যা উপরে আসব পুরানা মেম্বার শাহাবের লগে কথা কইব্যার?’ 

যোগেনের আর জামিদ মিয়ার এই সব কথা চলছিলই। 

জাহাজটা অন্ধকারে নদীর অন্ধকার জল পেরিয়ে চলছিলই। 

যখন ওদের কথাবার্তা চলছিল না, তখন জলস্রোতের আওয়াজ আসছিল তলা থেকে ওপরে, মানে, জাহাজ যে-জলস্রোত ঠেলে এগচ্ছে, সেই স্তর থেকে দোতলার ডক পর্যন্ত। অন্ধকারে থাকতে-থাকতে যেমন চেনা হয়ে যায় অন্ধকার, গভীর খনির গর্ত কয়লার ধসে বন্ধ হয়ে গেলে আটকে-পড়ে-যাওয়া খনি-মজুররা যেমন চিনে নেয় অন্ধকার, অন্ধকারে বন্যার কলনাদ, দশদিকের কাল পাথরের ঘের, কাল পাথরে জল বা অন্য কিছুর আকার। যোগেন যুদ্ধ বলতে তার জিলাবাসী দু-জনের কাছ থেকে সর্বনাশা খবর পেয়ে, রাজপুরুষদের কাছ থেকে যাচাই করে তার দেশে ফিরছে। কিন্তু ঘাট থেকে তাকে আর নদী পেরতে হয় না। সে সেই যুদ্ধের অন্ধকারে প্রত্যাবর্তনহীন ঢুকে পড়েছে। 

‘জমিজমা না কী চৈত্যা বঢপাতার নাখাল রাইত—খসব্যার ধরে?’ 

‘না খইস্যা করে কী? ঐ জমির ধানডা তো আর গোলায় নাই। সরকার নিয়া সারা। সেই জমিতে পরের বছরের চাষ তো আর চলব না। তার থিক্যা বেইচ্যা যদি দুইডা পয়সা পায়—নগদ পয়সায় টাউনে গিয়্যা চাইল কিনব্যার পারব। কয়, খাও কী? কয় যে নোট খাই। খিদ্যা মেটে? খিদ্যার হিশাব কই যে মেটার হিশ্যাব কইব? যোগেন জানে—এটা যুদ্ধ, উপকূল থিক্যা মরুভূমি বানান্, বার্মায় টাইম পায় নাই, ইনডিয়ায় তাই আগের থিক্যাই বেকবুল কইরছে। জামিদ মিয়া জানে না। সে সন্ধ্যার শো-তে মুসলিম লিগের সেকরেটারি সাইজ্যা পরচুলা পরে। 

বাটলার অনেক অনেকক্ষণ আগে, বলা চলে গত সন্ধ্যায়, দুই ট্রেতে আলাদা-আলাদা ঘটি সাজাইয়্যা দিয়্যা গিছিল, তার সুবাসে ভরে ছিল যোগেন, জামিদ ও আরো প্যাসেঞ্জারের শ্বাস। সুবাসের যেটুকু আয়ু সেটুকু থাইক্যা সুবাস যায় ফুরাইয়া। সুবাস-ফুরানোডার তো আর কোনো বাস নাই। কিন্তু পচনের তো আছে। পচা ভাত, পচা রোস্ট, পচা মাছ। পচনের বাসে নাক জ্বলে। জামিদ মিয়া লাথি মাইর্যা সেই ট্রে-দুইডারে জাহাজের বেড়া গলাইয়া জলে ফেলে। 

যোগেন জানে, এই যে তার প্রবেশ, এর থিক্যা আর নিষ্ক্রমণ নাই। যুদ্ধ 

বেকবুল দেশ—ডিনায়্যাল 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *