১৬২. মহাদেশ বিভ্রাট ও যুদ্ধবিভ্রাট ৪২
দুনিয়া সম্পর্কে মানুষজনের নানারকম ধারণা থাকা স্বাভাবিক। তার ক্ষেতের শেষে যেখান থেকে বৃষ্টি আসে জ্যৈষ্ঠ মাস থেকেই ও রোদ আসে অঘ্রান মাস থেকেই সেখানে পৃথিবীর শেষ। বেশ, তা যদি না হয় মাইল-দশ এক মাঠ পেরিয়ে লোহার দুটো লাইনের ওপর আগুন-ওগরানো একটা মেশিন আরো দুটো কামরা টানতে-টানতে আসে যেখানে সেটা তো পৃথিবীর শেষ না হয়ে পারে না—লোহার লাইনের চাইতে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
দুনিয়া সম্পর্কে দেশবিদেশের সরকার বা সম্রাটদের ধারণাও এরকমই, তবে ওসারে-বহরে একটু আলাদা। যেমন, ভারতের দক্ষিণের মহাসাগরে কালির ছিটের মত যেসব হাজার দ্বীপপুঞ্জ আছে তার মালিকানা চিরকালের জন্য স্থির হয়ে ছিল। যেমন, সোভিয়েত-জার্মানির সীমান্ত-ঘেঁষা উক্রেইনের রাজধানী কিয়েভে সাড়ে ছয়লক্ষ রুশ সৈন্য আর তাদের ব্যবহারের জন্য রাখা অপরিমেয় অস্ত্র কী করে ধরা পড়ে জার্মান বাহিনীর হাতে? যেমন, সিঙ্গাপুরের পেছনে যে মালয়ের জঙ্গল ও পাহাড় ব্রিটিশরা চিরকাল সিঙ্গাপুরের পেছন বলেই জেনে আসছিল, যেন, ওটা যদি সিঙ্গাপুরের সম্মুখভাগের কোনো টুকরো বা পার্শ্বভাগও হত তাহলে তো ইংল্যান্ডই সেটা ব্যবহার করত, জাপানিরা সেই পাহাড় ও জঙ্গলকেই রাজপথের মতো ব্যবহার করল কী করে? যেমন, ব্রিটিশ ভারতের রেডিয়োতে রেঙ্গুন থেকে ব্রিটিশ বাহিনীর উইড্রয়াল ঘোষণার (৯মার্চ, ১৯৪২) আগেই রেঙ্গুন খালি করে দেয়া হয়, তারপর রেঙ্গুনের ওপর জাপানিরা দুদিন ধরে বোমা ফেলে আর সেই বোমা ফেলার আগেই ব্রিটিশ বাহিনী বার্মা ছেড়ে ভারতের দিকে পালানোর সময় নানা জায়গায় আগুন লাগিয়ে বার্মা পুড়িয়ে ছাই করে দিতে-দিতে পেছয়। তার মধ্যে পেট্রলের খনিও ছিল। রেঙ্গুন-পোড়ানো সেই আগুন না কী চট্টগ্রাম থেকে দেখা যাচ্ছিল। আসলে সেটা ছিল বার্মাশেল পেট্রল কোম্পানির টাওয়ারের আগুন, যুদ্ধ ছাড়াও চট্টগ্রাম থেকে দেখা যেত। বার্মা আর ভারতের মধ্যে তফাৎ কী? কোনো সীমান্ত আছে? ভারত থেকে বার্মায় যাওয়ার কোনো স্থলপথ আছে? জাহাজ কোম্পানিগুলি তেমন স্থলপথ কখনো তৈরি করতে দেয়নি।
রেঙ্গুন থেকে ইম্ফল ও চট্টগ্রাম যথাক্রমে ৬০০ মাইল ও ৮০০ মাইল। বার্মার জঙ্গল দিয়ে পালাতে পারলে আপাতত ভারত। জঙ্গল ঘন, প্রথম বর্ষা শুরু হয়ে গেছে, জঙ্গলে প্রধানত বিষধর সাপ আর উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত নদী, ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলছে জাপানী সৈন্য যাদের কাছে এই জঙ্গল যেন তাদের ইস্কুলের মাঠ। জেনারেল স্টিলওয়েল ও জেনারেল আলেকজান্ডারের এই পশ্চাদপসরণকে পরে ব্রিটিশ সামরিক ইতিহাসে নাম দেয়া হয়, ‘এপিক অব এ রিট্রিট’—পলায়মান মহাকাব্য।
১৯৪২-এর মে মাসের মধ্যেই ব্রহ্মপর্যন্ত পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে জাপানের নিঃসপত্ন আধিপত্য। এত কম সময়ে, ১০০ দিনে, এত বড় সাম্রাজ্য বিস্তার-এর আগে বা পরে কখনো ঘটেনি। ব্রিটিশ, ডাচ, মার্কিন সমস্ত পুরনো ও নতুন দিগ্বিজয়ী, সমুদ্রজয়ী ও সূর্যাস্তহীন সাম্ৰাজ্য, জাপানী বাহিনীর কাছে শুধু যে হেরে গেল, আত্মসমর্পণ করল তাই নয়। পাঁচ-শ বছর ধরে সমুদ্র শাসনের যে-পুরাণ ইয়োরোপ রচনা করেছিল ও তার ওপর ভিত্তি করে, যুক্তি-বিজ্ঞান, বিদ্যা-বাণিজ্যের নতুন যে সংজ্ঞা, সারা পৃথিবীর অদ্বিতীয় হয়ে উঠেছিল, সে সব একেবারে বুদ্বুদের মত ফেটে গেল। জাপানীদের যুদ্ধলক্ষ, যুদ্ধপদ্ধতি, গতিবেগ, সহ্যশক্তি, ব্যূহভেদ কৌশল, অননুমেয়তা, শত্রুর আন্দাজ জব্দ করার চতুরতা ও যুদ্ধ প্রচলিত সমস্ত রীতিনীতি লঙ্ঘন, ভারত পর্যন্ত একটা খুশির হাওয়া ছড়িয়ে দিয়েছিল। আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল। সৈন্য ও বেসামরিক উদ্বাস্তু মিলিয়ে, ‘পোড়ামাটি’ ‘উইড্রয়াল’, ‘ডিনায়াল’, ‘খাদ্য প্রক্রিয়োরমেন্ট? যে যুদ্ধ-আনুষঙ্গিক ঘটনা তা প্রথম জানা গেল। ৪-লাখের ওপর ভারতীয়, পারিবারিক-উদ্বাস্তু। তারা যে-ইতিহাস ও রাজনীতি দুর্গম বার্মা রোড দিয়ে নিয়ে এল শেষ পর্যন্ত ভারতে, প্রধানত আসামে ও বাংলায়, তাতে যুদ্ধ থেকে নামপরিচয় খসে গেল—জাপান, ব্রিটিশ ইত্যাদি। তাতে যুদ্ধের আতঙ্ক ও ধ্বংস হয়ে উঠল একমাত্র সত্য। উপকূলের পাঁচ জিলায়—ঢাকা-ফরিদপুর-বরিশাল-চট্টগ্রাম- নোয়াখালিতে যুদ্ধ যে কতটাই অসম্মান ঘটাতে পারে সেটা বাস্তব হয়ে উঠল।
হয়তো এটাও একটা কারণ, ওই পাঁচটি জিলার সমস্ত নৌকো পুড়িয়ে ফেলার, সমস্ত খাদ্যশস্য সরকারের হাতে নেয়ার ও উপকূল ও নদীতীর থেকে সমস্ত লোকজনকে অন্তত বিশ মাইল দূরে সরিয়ে দেয়া শুরু হল যখন, তখন তেমন কোনো আপত্তি জোট বাঁধল না। অথচ এই জায়গাগুলোর মানুষজন কখনো হিন্দু হয়ে, কখনো মুসলমান হয়ে কত জোট বেঁধে গত তিন-চার বছরে কত দাঙ্গা ও খুনোখুনি করেছে। আইনসভার নথিপত্রে মেম্বারদের বক্তৃতায় সামরিক অত্যাচারের বিবরণ কি কোনো প্রমাণ হতে পারে যে এঁরা এই মানুষজন, এই সব অসম্মান ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাদের ভিতরের কোনো ক্রোধ, হিংসা ও ঘৃণা থেকে নিজেদের মস্তিষ্কের কোশে-কোশে এমন আগুন জ্বালিয়ে তুলেছিল যাতে ছাই হয়ে গিয়েছিল অন্য সব প্রতিবর্ত- ভয়-আশঙ্কা-মান্যতা আর দাউ দাউ হয়ে উঠেছিল ঐ ক্রোধ-হিংসা-ঘৃণা, সব মানুষের মাথায় একই সঙ্গে, যেমনটি হয় না মানুষের মধ্যে, যেমন হয় পশুর পালে, আলাদা করে একটি পশু ভয় পায় না, আলাদা করে কোনো পশু পালায় না, আলাদা করে কোনো পশু আত্মরক্ষার কারণেও আক্রমণ করে না, সেই পলায়মান পশুর পাল আগুন থেকে বা বন্যা থেকে সমবেত গতিতে পালাতে পালাতে যেন একটা নীতির প্রতি বিশ্বাস তৈরি করতে থাকে—একা কোনো আত্মরক্ষা নেই, আত্মরক্ষা আছে দঙ্গলে, দঙ্গলই সেই আত্মরক্ষায় আক্রমণ করে, দঙ্গলই সেই আত্মরক্ষায় একসঙ্গে পালায়। ভোটের আগে দাঙ্গা, সেনসাসের দাঙ্গা, এলিটদের দাঙ্গা, জনসাধারণের দাঙ্গা, চাপানো দাঙ্গা, উথলনো দাঙ্গা, কৃষকের নিহিত বিদ্রোহের বিস্ফোরণের দাঙ্গা, কৃষকের নিহিত ধর্মানুগত্য থেকে আস্তিক্যের বজ্রপাতের দাঙ্গা—দাঙ্গার কি এত শ্রেণীভাগ হয়? যুদ্ধের অসংখ্য চূড়ান্ত মুহূর্তে একজন সৈন্য তার প্রতিপক্ষের সামনে যখন শেষ আঘাতটি হানে তখন কি সেই যুদ্ধের শ্রেণীভাগ থাকে—কোন পক্ষ কোন দেশ, কার কী কৌশল, কার কী উদ্দেশ্য, কার কত সৈন্য, কার কত অস্ত্র? হ্যাঁ, এই সব থেকেই যুদ্ধ ঘটে, যুদ্ধের বিচারও হয় এই সব দিয়েই। সেই হেতু নির্ণয় ও ফলবিচার তো যুদ্ধ নয়। যুদ্ধ তো শেষ পর্যন্ত সেই অজস্র চরম ক্ষণটিতে যখন দু-জন মানুষই একমাত্র চায় তার আঘাতটাই যেন শেষ আঘাত হয়। প্রতিপক্ষকে হত্যা না করে যুদ্ধ জয় ঘটে না। সেই মাত্র একজন সৈন্যের পতন ছাড়া বাহিনীর জয় ঘটে না। বাহিনীর জয় ছাড়া দেশের জয় ঘটে না। দেশের জয় ছাড়া কোনো জোটের জয় ঘটে না। জোটের জয় ছাড়া কোনো মতের জয় ঘটে না। মতের জয় না ঘটলে যুদ্ধের নামকরণ হয় না—’ভারত ছাড়ো’ও না, ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রামও না।
৪২-এ বাংলায় যুদ্ধ এসে গেছে উলটো পথে। শত্রু যদি পেছু ধাওয়া করে তাহলে সে যেন খেতে না পায়, জল না পায়, বসত না পায়, মানুষ না পায়। দ্বীপপুঞ্জের যুদ্ধগুলিতে জাপানের কাছে এমন সব হার হারতে হল, যা চিরকালের জন্য ইতিহাসে ব্রিটিশ ও ডাচ সাম্রাজ্যের চরম লজ্জার উদাহরণ হয়ে থাকল। সিঙ্গাপুর পতন, থাইল্যান্ড পতন, ইন্দোচীন পতন, মালয় পতন, বার্মা পতন, হংকং পতন—কোনো একটি জায়গাতেও ব্রিটিশ সেনাবাহিনী একটা হোঁচট খাওয়ার মত বাধাও জাপানীদের দিতে পারেনি। এমন কী চোখের সামনে ব্রিটেনের ভুবনবিখ্যাত যুদ্ধজাহাজ ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’ আর তার সঙ্গী জাহাজটি ব্রিটেনের সবচেয়ে বেশি প্রচারিত নৌদুর্গ সিঙ্গাপুরের খালে ডুবিয়ে দিল জাপানীরা। এই এক-একটি যুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্য জাপানের যুদ্ধবন্দী হয়েছে হাজারে-হাজারে। যুদ্ধে যুদ্ধবন্দীর সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায়—যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়েছে না যুদ্ধের কারণে অবস্থান পালটেছে। জাপানের হাতে যুদ্ধবন্দী ব্রিটিশ সৈন্য ও ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যের সংখ্যা নিঃসন্দিগ্ধ প্রমাণ করে—ব্রিটেন কোনো রকম যুদ্ধের চেষ্টাই করেনি। ১৯৪২-এর ২৮মে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে বার্মা ও ভারতসহ পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সেনাপতি লর্ড ওয়াভেল ঘোষণা করেছিলেন যে তখনকার মত যুদ্ধ মুলতুবি থাকল। এর দিন সাতেক আগে জেনারেল আলেকজান্ডার ও জেনারেল স্টিলওয়েল বার্মা রোড শেষ করে যথাক্রমে আসাম ও ইম্ফলে অর্থাৎ ব্রিটিশ ভারতের সীমায় ঢুকতে পেরেছিলেন।
৪২-এর জুন থেকে জাপান যেন উধাও হয়ে গেল। রুটিন অনুযায়ী ও সাম্প্রতিক যুদ্ধে জাপানের প্রমাণিত মতিগতি অনুযায়ী একটা হিশেব ছিল—জাপান হয় অস্ট্রেলিয়ার দিকে যাবে, না-হয় ভারতে ঢুকবে। যেন, এমন একটা অনুমান করতে রাষ্ট্রনায়ক বা সেনানায়ক হতে হয়। জাপান যে যুদ্ধে নামবে, সেটাই তো এরা বিশ্বাস করেনি। আত্মরক্ষার ব্যস্ততায় যুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে শুধুই সন্দেহ করা যায় মাত্র, কিছুই নিশ্চিত হয় না, মন দিলেও কাজের সময় মনে পড়ে না। জাপান মাত্র ১০০ দিনে এত কম খরচায় এত বড় একটা সাম্রাজ্য পেয়ে গিয়েছিল এটা না-ভাবাটাই বেয়াক্কেলে যে আসাম হয়ে জাপান বাংলা দিয়ে ভারতে ঢুকবে না। এতই যুক্তিযুক্ত ছিল এই সিদ্ধান্ত যে আসাম থেকে বাংলা হয়ে ওড়িশা— মাদ্রাজ হয়ে সিংহলের মাথা পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের উপকূলভাগ জুড়ে জাপানের ভারত প্রবেশ নিয়ে উদ্ভট সব গুজব রটতেই থাকে। সিংহলের তুতিকোরিনে, চট্টগ্রামে ও কলকাতায় ক-দিন বোমা ফেলে জাপান তাদের ভারতীয় কর্মসূচি ঘোষণাও করেছিল যেন। ফলে, গুজব এটাই পাকিয়ে ওঠে যে জাপানী প্যারাসুট বাহিনীর সঙ্গে অনেকেরই দেখা হয়ে যাচ্ছে এখানে-ওখানে, যখন-তখন। জাপানের গুপ্তচরদের রিস্টওয়াচ এমন যে সেটা দিয়ে খবর পাঠানো যায়। জাপানীদের সুইসাইড স্কোয়াড নাকী প্লেন নিয়ে যুদ্ধ-জাহাজের চোঙের মধ্যে ঢুকে যায়, পূর্ব সীমান্তে নাকী জাপানী গুপ্তচররা গ্রামাঞ্চলে জাপানী নোট দিয়ে যাচ্ছে তারা, যখন আসবে তখন যা কিনবে তার আগাম হিশেবে।
গুজব বাস্তবের চাইতেও শক্তিমান। মাদ্রাজে সরকারি খবর ছুটল যে জাপান মাদ্রাজ-উপকুলে নৌ সৈন্য নামিয়েছে ও তাদের সঙ্গে উপকূল রক্ষী বাহিনীর গুলি বিনিময় গত রাত্রি থেকে চলছে। মাদ্রাজ উপকূল বলতে পুরো করোমণ্ডল উপকূল। কোথায় জাপানীরা নেমেছে, সেই জায়গাটির নাম সঠিক জানা যাচ্ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ-ভারত কোনো অবস্থাতেই পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জগুলির মত পলায়ন করে বাঁচতে পারবে না। কারণ ভারত তখন সামরিক দিক থেকে একটি কেন্দ্র। বোমা তৈরির বেশ কিছু কাঁচামাল ভারত থেকে যেত। আরো অনেক কিছু যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট জিনিশ। সুতরাং উপকূলে সম্ভাব্য জাপানী নৌসৈন্য নামার খবর পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ‘আক্রান্ত হলে অবশ্য করণীয়’ এমন একটা সামরিক নির্দেশপত্র অনুযায়ী মাদ্রাজ বন্দর ও সরকারি দপ্তর স্থানান্তরে নিয়ে যাওয়া হল, নিয়েই যাওয়া হল ও সরকার সেনাবাহিনীকে মাদ্রাজ শহরের দায়িত্ব নিতে বলল। সেনাবাহিনী, এমনকী গুজবটাও শোনেনি।
