১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৫৬. নতুন দাঙ্গা?

১৫৬. নতুন দাঙ্গা? 

ডাক্তারবাবুর গাড়িতে পেছনের সিটে যোগেনকে শুইয়ে দিয়ে রসিকলাল যোগেনের মাথার কাছে আর মোহিনীমোহন ড্রাইভারের পাশে বসার পর গাড়িটা ঘোরানো শুরু হলে গোয়ালাটুলির গলি থেকে লাঠি শোঁটা শরকি বর্শা নিয়ে ‘রে-রে’ করতে-করতে একটা দঙ্গল ছুটে রাস্তা পেরিয়ে উলটো দিকের রাস্তার ভিতর ঢুকে গেল। যারা ধরাধরি করে যোগেনকে এনে গাড়িতে তুলে দিল তারা তখন গাড়ির সামনে আর তাদের সামনে সেই ছুটন্ত দঙ্গল। তারা যেন থমকে দাঁড়াল, তারপর দৌড়ে সেই দঙ্গলে মিশে ছুটে গেল। তাদেরই একজন চিৎকার করে উঠল, ‘বামুন-কায়েত মানি না’, ‘শ্যামাপ্রসাদ ধ্বংস হোক, ‘বামুনগ টিকি কাটো, পৈতা ছিঁড়ো’, ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়।’ ড্রাইভার স্টার্ট দিয়ে রেখেছিল। সে-আওয়াজে কথাগুলো বোঝা যাচ্ছিল না। এক ডাক্তারবাবুর কিছুটা জানা বলে তিনি প্রথম দুটো শুনে ফেলে বাকিগুলোও বুঝে নিতে পারলেন। রসিকলাল ওই দঙ্গলের ধেয়ে যাওয়াটা দেখেনইনি, যোগেনের মুখের ওপর এমন ঝুঁকে ছিলেন। 

গাড়ি ঘুরিয়েই ড্রাইভার বাঁয়ের এক গলিতে ঢুকে গাড়ির গতি দিল বাড়িয়ে। তারপর এ-বাঁক, ও-বাঁক করতে-করতে যেখানে এসে বেশ আওয়াজ তুলে ব্রেক কষে, রসিকলাল বোঝেননি, সেটাই হাসপাতাল। ড্রাইভার লাফিয়ে নেমে একটা খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকেই বেরিয়ে আসে, এক হাতে স্ট্রেচারের এক-মাথা ধরে, আর-এক মাথা খালি গায়ের এক ছোকরাকে ধরিয়ে 

রসিকলাল নেমে দাঁড়িয়েছিলেন। 

গাড়ি থেকে ডাক্তারের নামতে একটু সময় লাগে। নেমেই এমার্জেন্সির সেই দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলেন। 

ততক্ষণে যোগেনকে ধরে ওরা স্ট্রেচারে শুইয়ে দিয়েছে। স্ট্রেচারটা ওরা তোলার আগে যোগেনের একটু যেন গোঙানি শোনা গেল। বা, রসিকলাল বাজিয়ে শুনলেন। তিনি ভিতরে ঢোকার সাহস করলেন না। 

রসিকলাল বাইরে পায়চারি করছিলেন। ভাবার চেষ্টা করছেন—ঘটনাটা কী হল? সেটা কি ভাবছেন, যোগেন এমন মার খেল বলে? দাঙ্গা মানেই তো মারার স্বাধীনতা। যখন বাঁচার স্বাধীনতা থাকে না আর আর-একজনকে মারার স্বাধীনতাই মাত্র থাকে—তখনই সেই অবস্থাকে দাঙ্গা বলে। আমাদের দেশে হিন্দু আর মুসলমান এই দুই প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে। রসিকলাল একটা এমন ফাঁপরে পড়ে যান, যেখানে তিনি পড়তে চাইছিলেন না। হিন্দুরা কোনোক্রমেই এটা মেনে নিতে পারছে না যে তাদের মুসলমানদের শাসনে থাকতে হবে। যশোরে সে আর যোগেন দু-জনে ঘুরে-ঘুরে তো দেখেছে, সেই প্রথম দেখা—হিন্দুদের মধ্যে যারা চায় মুসলমানদের শাসন শেষ করতে, তারা কত রকম প্রতিষ্ঠানে-মিশনে-পার্টিতে কাজ করছে। হিন্দু সেবাশ্রম, হিন্দু মিশন, হিন্দু মহাসভা, স্থানীয় সব সেবা মিশন, দাতব্য হোমিয়োপ্যাথি সেবাসমিতি, ব্যায়ামসমিতি—এইসব সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি বাইরে যাই বলুক, ভিতরে একেবারে আপাদ শির মুসলিম বিরোধী। এরা হিন্দুধর্মের সবকিছু হয়তো বিশ্বাসই করে না। এমন অনেকেও আছেন, যাঁরা ধর্মই মানেন না। কিন্তু মুসলমানদের বিশ্বাস করেন না। বরং উলটে একেবারে চরম মনে করেন যে মনুষ্যজন্মের এমন কোনো পাপ নেই যা মুসলমানরা করতে পারে না। মুসলমানদের নিয়ে যে-সব গুলগল্প হিন্দুদের মধ্যে চালু আছে, তাঁরা সেগুলো বিশ্বাস করেন ও যে-কোনো জায়গাতেই তাঁরা সেই গল্প বিস্তৃত করে বলেন। হিন্দুদের সামাজিক সংগঠনগুলো ও মুসলমানদের রাজনৈতিক পার্টি ছাড়া কোনো দাঙ্গা হতেই পারে না। প্রত্যক্ষ না হলেও, অনতিদূর ভবিষ্যতে হিন্দুদের সঙ্গে হিন্দুদেরই দাঙ্গা বাঁধবে। সেটাই কি আজ শুরু হল আর-এক নয়া দাঙ্গায় সেখানে যোগেন মার খেল হিন্দুদেরই হাতে, যেখানে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভা একসঙ্গে মুসলমানদের বিরোধিতা করছে। 

রসিকলাল কী চান? 

চান—দাঙ্গা-হাঙ্গামার শেষ। চান—হিন্দুদের বহু ধরনের ব্যভিচারী ধারণার ধ্বংস। চান-হিন্দু- তপশিলীদের সম্মান। চান—মুসলমান-তপশিলিদের একটা তালিকা। চান—তপশিলি সমাজের বড়-বড় মানুষের হিন্দু হিশেবেই সংবর্ধনা ও অধিষ্ঠান। তাঁর এই চাওয়া, তাঁদের অনেকের এমন চাওয়ার জবাবেই, আজ যোগেনকে মেরে অজ্ঞান করে মাটিতে ফেলে দেয়া হল। হিন্দু বড়জাতের কাছে তপশিলি বা শূদ্র আর মুসলমানরা পৃথক কোনো জনসত্তা নয়। চাঁড়াল আর নেড়া—দুইয়ে মিলে একটাই ছোটলোক। 

রসিকলাল এতটা যে এখনই গুছিয়ে ভেবে ফেলেন তা নয়। তিনি বুঝতে চাইছেন তাঁর সঙ্গে যোগেনের কোথাও তো কোনো অমিল নেই, মতের তফাৎ নেই, তবু কোথাও একটা সুতোর মত ব্যবধান তৈরি হচ্ছে কি? আর, সে-ব্যবধানের কারণ কি এই, যোগেন যে-তীব্রতায় বলতে চায়, আমরা হিন্দু না, রসিকলাল তা পারছেন না। পারছেন না যে কোনো যুক্তির কারণে, তা নয়। পারছেন না যে শিকড়ের টানে, সেটা রসিকলাল বুঝে ফেলেছেন। বুঝে ফেলার পর তিনি নিজের ওপর বিরক্ত হয়েছেন। হিন্দু সমাজ ও ব্যবস্থাকে অমান্য করেই তো তিনি এতদিন চলেছেন। বিধবা বিবাহ করে হিন্দু উঁচু সমাজের শুদ্ধতা-সংস্কারকে আঘাত করেছেন। গান্ধীজির অনশনে পুনে চুক্তি নিষ্পন্ন করতে মালব্যজি আর আম্বেদকারকে মিলিয়েছেন। মালব্যাজিকে রসিকলাল বলেছিলেন পণ্ডিতজি, আপনারা কিন্তু কিছুতেই এই উচ্চবর্ণের অহংকার ছাড়ছেন না যে আপনারা যেন দয়াবশত আমাদের মত নিম্নবর্ণদের জন্য জায়গা করে দিচ্ছেন। ব্যাপারটা কিন্তু একেবারে উলটো। গান্ধীজির অনশনের অছিলায় আপনাদের শুদ্ধ হিন্দুত্বের যত বেশি অংশ আপনারা দখলে রাখতে পারেন, তার জন্য আপনারা উঠেপড়ে লেগেছেন। আমরা কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের একটা রোয়েদাদের জোরেই এই সংরক্ষণ পাচ্ছি. গান্ধীজির জীবনের মূল্য নিশ্চয়ই সংরক্ষণের চাইতে মূল্যবান। সে-মূল্যটাকে আপনারা বাজারের দরকষাকষিতে নামিয়ে আনবেন না, পণ্ডিতজি। 

রসিকলালের কথাগুলিতে মালব্যজি খুশি হননি। তাঁর অখুশি তিনি বুঝিয়েও দিয়েছিলেন। ‘হাঁ হাঁ, ব্ৰহ্মবাক্য তো এখনো আছে। কিন্তু উহে বাক্য কো বক্তা উলট গিয়া। আভি বামুনলোগ তো আর হিন্দু কো গুরু নাহি। আভি তো নয়া গুরু সব আ গয়া’, মালব্যজি তাঁর হাতটা ঘুরিয়েছিলে আম্বেদকার ও রসিকলালকে দেখাতে। 

আম্বেদকারকেও রসিকলাল বলেছিলেন, এটা কিছু ভুলে থাকা ঠিক হবে না যে সাম্প্রদায়িক আসন সবচেয়ে বেশি হবে বাংলায় আর বাংলার কাজ থেকে সে-দামও উচ্চবর্ণরা আদায় করে নেবেন। আমাদের ভবিষ্যৎ একটু মনে রাখবেন 

কিন্তু যোগেন যখন বলল, তপশিলিরা হিন্দু না, তখন এতটা স্পষ্ট বিচ্ছেদ রসিকলাল মেনে নিতে পারছেন না। মেনে নিতে হয়তো পারবেন বা মানা-না-মানা পর্যন্ত কথাটাকে গড়াতেই দেবেন না—তবু অস্বস্তিটা তো মিথ্যা নয়। অজ্ঞান যোগেনের আঘাতের কোনো খবর না পেয়ে রসিকলাল নিজেকেই আঘাত করছিলেন। 

মোহিনীমোহন বেরিয়ে এসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। রসিকলাল তাঁর দিকে এগিয়ে যান। ডাক্তার বলেন, ‘না, ভয়ের কিছু নাই। আমি একডু ভয় খাইছিল্যাম যদি লোহার রড দিয়্যা মাইর্যা থাহে, তা লি তো বাঁচামরা অনিশ্চিত। লোহা দিয়া মারে নাই। পাথর দিয়াও না। ইট দিয়্যা মারছে। তাতেই মনে হয়, হয়তো আগের থিক্যা ভাইব্যা মারে নাই। হঠাৎ মাথা গরম কইরা মাইরা বইসছে। এরা তো কইল বাড়ি নিয়্যা যাইতে। কয়, আমাদের ভরসায় সারা রাইত না-থাইক্যা, আপনার ভরসায় আপনার বাড়িতে থাকা বেশি নিরাপদ। আমি কইল্যাম, না, আঘাতের থিক্যা ট্রম্যাডা বেশি। তবে সামলাইয়্যা নিবে। সারা রাইত স্যালাইন দিলে সকালে ঝরঝরা হইয়্যা যাবে। আমার সঙ্গে তো কথা কইল, আপনে কথা কবেন? আসেন—না।’ 

‘না, না, আমি অ্যাহন দেইখব্যার চাই না। যহন বাড়ি নিয়া যাইবেন, তহনই দেখব।

‘তাইলে চলেন। একবার গোয়ালাটুলি ঘুরান দিয়্যা যাই। সেহানে আবার কী যুদ্ধ বাইধল!’

অনুমান তো একটা ছিলই। কারা এই আক্রমণটা করে থাকতে পারে? স্বভাবতই মুসলমানদের কথা মনে আসে—কারণ দাঙ্গাটা তো চলছিলই। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে-সঙ্গে ঘোষদের ছেলেছোকরারা যোগেনের দিকে ফিরে না তাকিয়ে এমন দৌড়েছিল আততায়ীর পেছনে টিনের চাল দিয়ে, ছাদের কার্নিস থেকে লাফিয়ে বাড়ির মাঝখান দিয়ে যে ছেলের দলের ফনফনানো দৌড়ের সঙ্গে অতটা লম্বা-চওড়া সেই পশ্চিমা-বামুন দৌড়ে পারেনি। 

পশ্চিমা-বামুন তো পেছন থেকে চিনলেও চেনা যায়, খাড়া, লম্বা, বড় টিকি, টিকির আগায় কারো-কারো ফুল, পাথরের মত পিঠ, ছোট লাল পেড়ে ধুতি, পায়ের সাইজ বড়-বড় জুতোর দোকানের বাইরে যে জুতোটা টাঙানো থাকে, সেটার মত। 

এদের নিয়ে নানা মজার গল্প হয়। কবে নাকী বামুনদের শুদ্ধি করানোর জন্য বামুনদের আদিবাস কান্যকুব্জ থেকে এদের আনা হয়েছিল গৌড়ের রাজার হুকুমে। কিন্তু বাঙালি বামুনই-বা অন্য জাতের বামুনকে নিজেদের দলে ঢুকতে দেবে কেন? সুতরাং বাংলায় এসে এরা হয়ে গেল বামুনদের দঙ্গল। 

গোয়ালাটুলিতে এসে জানা গেল, লোকটি কে এরা ধরে ফেলেছে। সে নাকী এক পশ্চিমা বামুন। 

গায়ের জোর আছে। কয়েকঘর পশ্চিমা বামুন মুর্শিদাবাদ থেকে বিক্রমপুর এসেছিল কতদিন আগে। তারা বামুন হিশেবে সামাজিক কোনো খাতির পেত না মুর্শিদাবাদের তলার দিকে, এমন কী অগ্রদানী হিশেবেও শ্রাদ্ধকর্মে তাদের ডাকা হত না। বিক্রমপুরের দিকে বামুন কম, সুতরাং সেখানে বামুন হিশেবে তাদের কিছুটা খাতির জুটতেও পারে। সে নিশ্চয়ই শ-শ বছর আগের ব্যাপার। তাদের অবস্থার খুব যে একটা পুরুষানুক্রমিক বদল ঘটেছিল, তা নয়, তবে পূর্ব বাংলার নিম্নবর্ণ প্রধান অঞ্চলের কোনো-কোনো জায়গায় তাদের বামুনের কাজকর্ম কিছু-কিছু জুটেছিল। এই হিন্দু-মুসলমান মারামারির সময় তাদের একটা সামাজিক জায়গাই তৈরি হয়েছে। তারা রায়টের সময় হিন্দুদের আগুয়ান বাহিনী হিশাবে কাজ করত। অনেক রায়ট-প্রবণ টাউনে বড়লোকরা এ-রকম এক-একটা দলকে পুষত, বিশেষ করে সেইসব এলাকায় যেখানে থেকে-থেকেই নমশূদ্ররা এমন আওয়াজ তুলত যে তারা বামুন-বৈদ্য-কায়স্থদের প্রাণ বাঁচাবার জন্য আর ঢাল হিশাবে কাজ করবে না। 

এরা, এই পশ্চিমা বামুনরা দাঙ্গা চাইত পেশাগত কারণে। তারা শান্তিটান্তির খুব বিরোধী ছিল। কোনো-কোনো পাড়া বা মহল্লা থেকে তাদের রুটিরুজি পেত। তাছাড়াও দাঙ্গার সময় বিশেষ বোনাস ছিল, দোকানপাট লুটতরাজ। সেই কারণেই এদের একটা ভিড় ছিল ঢাকায় 

যোগেন তার বক্তৃতায় যতই বর্ণহিন্দুদের নিন্দা করছিল ও শূদ্র মানুষজনের এক হওয়ায় লাভ বোঝাচ্ছিল, এই লোকটি ততই বুঝে ফেলে যে যোগেন তাকে বেকার করে দিচ্ছে। সে আর সহ্য করতে পারেনি। উঠে যোগেনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। 

মোহিনীমোহন এতক্ষণে একটু হাঁফ ছেড়ে বলেন, ‘যাগ, এইডা অন্তত বাঁচা গেল যে, যে-লোকডা মারছে সে নিজে বোধয় মহাসভাটভাও জানে না।’ অর্থাৎ, দাঙ্গা সম্পর্কে নতুন কোনো কথা রটবে না। 

পরের দিনের সকালের কাগজগুলিতে প্রথম পৃষ্ঠায় বড়-বড় হরফে ইংরেজি-বাংলা-উর্দুতে নানারকম খবরের কাগজে, বেরল। ‘বিশিষ্ট এমএলএ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল গোয়ালাটুলিতে আনল। ‘ঢাকা-দাঙ্গার নতুন মোড়’, ‘এসসিজ (sc) অ্যাফার্ম হিন্দুয়িজম’, ‘সেনসাসে সম্প্রদায়-পরিচয় থেকে গোলমাল।’ 

যোগেনকে হাসপাতাল থেকে মোহিনীমোহনের বাড়িতে নিয়ে এসেছে মঞ্জু মাস্টার আর ড্রাইভার। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে যোগেন কাগজগুলি পড়ছিল। সবগুলো কাগজ দেখা হয়ে গেলে, সে আস্তে করে উঠে বসল আর তার দুটো পা নামাল। ধরে-ধরে খাট থেকে নেমে ধীরে-ধীরে সে রসিকলালের থাকার সম্ভাব্য জায়গাগুলির দিকে যায়। ঘর থেকে কয়েক পা দূরেই একটা বেতের চেয়ারে বসেছিলেন রসিকলাল। পেছন থেকেই বলে ওঠে যোগেন—’কাহা; কী উবগারডা যে কইরল কুলীন পচ্চিমা। অ্যাদ্দিন তো চিল্লয়্যা গলা ভাঙছি। আপনারাই ভাল কইর‍্যা কান পাতেন নাই। ডর খাইছেন। পশ্চিমা বামুনডা তো আমারে উদ্ধার দিল, কাহা দেখাইয়্যা দিল যে, তপশিলিগ হিন্দু বইল্যা হিন্দুরাই মানে না। নারানগঞ্জ, মুন্সি গঞ্জ, বিক্রমপুর কিন্তু বাদ দিবেন না। আমি যাব।’ 

‘সেডা তো যোগেন, ডাক্তারবাবুর ব্যাপার। উনি যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন তো ‘হ্যাঁ, ‘না’ বলেন তো ‘না’। 

‘না, না। বড়জ্যাঠার কথা মাড়াব না। কিন্তু আপনে য্যান কোনো বাগড়া দিবেন না। কাহা, ঘটনার যা গতি, তাতে আমাগ কিন্তু এই সুবিদা আর একবার নাও আইসব্যারও পারে। 

‘আরে, তার লগে লগে প্রাণেও বাঁইচব্যার লাইগব তো। মঞ্জু বইস্যা আছে, নীচে, ডাকব?’ মঞ্জু গলা নামাইয়া সাপের মন্ত্র পড়ে ক্যা? ডাকেন উপরে। একটা ইস্তাহার ঝাড়ুক আজই—গ্রামে।’ 

মঞ্জু মাস্টারকে রসিকলাল সিঁড়ির মাথা থেকেই ডাকেন। মঞ্জু হয়তো সিঁড়ির গোড়াতেই বসেছিল। ডাকের জবাব না দিয়ে দৌড়ে উঠে এল, ‘যোগেন-না ডাকে তোমারে। 

মঞ্জুকে যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘আমারে শহিদ বানাইয়্যা তোমার কী সুবিধা হইল? হিন্দু মহাসভা, ভারত সেবাশ্রম, আর্যসমাজ, কারেও কি নড়াইব্যার পাইরল্যা গোয়ালাটুলি-শাঁখারিপাড়া থিক্যা?’ 

‘এডা কি আর সরাসরি হয় দাদা? তবে শাঁখারি-পশ্চিমা ভাবটায় ছানা কাটছে পছন্দ হয়। গোয়ালাটুলির কথা এহনো ঠিক কওয়া যায় না—জায়গাও বড়, লোকও বেশি, মাতবরও অনেক। আর-এক মাতবরের মন না জাইন্যা এ মাতবর কোনো কইব না।’ 

‘আমি কই কী খবরডা গরম থাইকতে-থাইকতে উশুল নেয়া কাম। একডা ছোড লিফলেট কয়েক হাজার ছাপাইয়্যা শহরে-গ্রামে বিলি কর। বড় জ্যাঠারে দেখাইয়া যা করার করব্যা! আর কাইলের মইধ্যে যদি শরীরে জুত দেয়, তালি কাইলকা বিকালে একডা জনসভা ডাইকব্যার পার, যেহানে সেদিনের মিটিংডা ডাকা হইছিল। বড়জ্যাঠা আর রসিকবাবুর আপত্ত থাইকলে সেই কাজ কইরো না। লেখো।’ 

মঞ্জু দৌড়ে গিয়ে একটা শাদা লম্বা কাগজ আর একটা পেন নিয়ে আসে। তৈরি হয়ে সে জিজ্ঞাসা করে, ‘বন্ধুগণ দিয়্যা তো। হইয়া গেল তো লেখা, কন 

যোগেন একটু ভাবছিল। তারপর বলে, ‘না, এইডা বরং এডডু অন্যরকম কইর‍্যা লেখো যাতে ঢাকার যারা নামডাকওলা তাগ অনেকের নাম দেয়া যায়। ধরো—সাম্প্রদায়িক হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় ঢাকা শহরের সম্পর্কে নানারকম সত্যমিথ্যা ঘটনা দেশের সব মানুষই জানে। ইহা ঢাকাবাসিবৃন্দের পক্ষে খুবই লজ্জার কথা। দুই-চারদিনের মধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটিয়াছে যাহাতে আমাদের লজ্জা শতগুণ হইয়া উঠিয়াছে। সেনসাস সম্পর্কিত কিন্তু জাতি-বিষয়ক হাঙ্গামার সংবাদ পাইয়া আইনসভার দুই মাননীয় সদস্য শ্রীযুক্ত রসিকলাল বিশ্বাস বিএ, বিএল ও শ্রীযুক্ত যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল সরেজমিনে দেখিবার জন্য ঢাকা আসিয়াছিলেন’, 

‘তারিখড়া দিয়া দিয়ো। তাহারা পরদিন সকাল হইতেই ঢাকার সর্বজনশ্রদ্ধেয় জননেতা ও আইন পরিষদের প্রাক্তন সদস্য ডাক্তার মোহিনীমোহন বিশ্বাসকে সঙ্গে লইয়া প্রথমে গোয়ালাটুলি সফর করেন। গোয়ালাটুলিতে তাঁহারা জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের দ্বারা সংবর্ধিত হন ও পর পর তিনটি জনসভায় বক্তৃতা করেন। এই তৃতীয় জনসভাটি হয় খালপুলের নিকট ও তাহা একটি মহতী জনসভায় পরিণত হইতেছিল। শ্রীযুক্ত যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল যখন হিন্দু বর্ণভেদ প্রথার ফলে নিম্নবর্ণ হিন্দু জনসাধারণের দুরবস্থার কথা বলিতেছিলেন তখন এক ব্যক্তি তাঁহার মাথার উপরে একটি অখণ্ড ইট দ্বারা এমন আঘাত করে যে শ্রীযুক্ত যোগেন্দ্রনাথবাবু মহাশয় অজ্ঞান হইয়া ভূমিতল আশ্রয় করেন। পরে আততায়ীকে ধরা হয় ও জানা যায় সে পশ্চিমা ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত, তাহাদের লম্বা-চৌড়া স্বাস্থ্য ও দীর্ঘদেহবিধায় উচ্চবর্ণহিন্দুগণ কর্তৃক দাঙ্গা কার্যে রক্ষিত ও পোষিত হয়। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা না হইলে ইঁহারা রোজগার হইতে বঞ্চিত হইবেন। দাঙ্গা বাড়িলে ও ছড়াইয়া পড়িলে ইঁহাদের আয় বাড়িবে, অবস্থাও ভাল হইবে। 

সেই কারণেই উচ্চবর্ণ হিন্দুগণ ইঁহাদের কাজে লাগাইতেছেন, যাহাতে তপশিল জাতিভুক্ত সকলেই নিজের ধর্মপরিচয়ে ‘হিন্দু’ বলে। তাহা হইলে হিন্দুর সংখ্যা বেশি দেখাইবে ও অন্য ধর্মীয়দের সংখ্যা কম দেখাইবে। সেই কারণেই হিন্দুদের নিজেদের মধ্যে এইপ্রকার দাঙ্গা, ও সেনসাসের কাছে ধর্মপরিচয়ে সবাইকেই হিন্দু বলিয়া লিখিবার দাবি জগৎসভায় আমাদের মাথা হেঁট করিয়া দিবে। উচ্চবর্ণ হিন্দুদের এইরূপ কৌশলের বলে ও নিম্নবর্ণের মানুষদের কেবল হিন্দু–পরিচয় রেকর্ডভুক্ত হইলে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাধিক্য গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করিতেছি, আপরাধীদের যথাআইন শাস্তি দাবি করিতেছি ও নানাপ্রকার সাম্প্রদায়িক সুবিধা আদায় করিবার অসদুদ্দেশ্যে দাঙ্গায় অংশগ্রহণকারী সম্প্রদায়গুলির সংখ্যাবৃদ্ধিতে আমরা আশঙ্কা বোধ করিতেছি।’ 

এই বিবৃতিতে সই জোগাড় করতে মঞ্জু মাস্টার তার দলবল নিয়ে ঢাকায় বেরিয়ে পড়ল। মোহিনীমোহন ও রসিকলালের সই থাকায়, চারুচন্দ্র দাস, যিনি নমশূদ্র না হলেও একবার কাউন্সিলে ডিপ্রেসড ক্লাসের প্রতিনিধি মনোনীত হয়েছিলেন, রেবতীমোহন সরকার, ইনিও প্রাক্তন মনোনীত কাউন্সিলার, ও আরো অনেকে সই করলেন। এতে লিফটেটটির মর্যাদা বেড়ে গেল।

মঞ্জু মাস্টার নারানগঞ্জেও এই লিফলেট পাঠিয়ে দিল, বিশেষ করে যে তিনটি থানায় মুসলমানরা নমশূদ্রদের বাড়ি থেকে উৎখাত করছে। 

.

মোহিনীমোহনকে নিয়ে রসিকলাল আর যোগেন ঢাকা থেকে নারানগঞ্জে পৌঁছুলেন, যোগেনের মাথার ব্যান্ডেজ খোলার পর। যে-জায়গা ফেটে গিয়েছিল সেখানকার চুল কেটে দেয়া হয়েছিল। এখন, সেখানে তুলোর একটা ড্রেসিং যোগেনের কাল বাবরি চুলের মধ্যে অদ্ভুত লাগছিল। রসিকলাল বললেন, ‘তুই একটা গান্ধীটুপি দিয়্যা মাথাখ্যান ঢাইক্যা নে।’ যোগেনের খুব আপত্তি ছিল না, মোহিনীমোহনের বাড়িতে টুপিও পাওয়া গেল। সেটা পরে বেরবার আগে যোগেন আয়নায় নিজেকে দেখে, ওঁদের সঙ্গে লঞ্চঘাটায় পৌঁছুনোর জন্য গাড়িতে ওঠার সময় টুপিটা খুলে পকেটে রেখে দিল। ডাক্তার সময় দেখেই বেরিয়েছিলেন, খবরও পাঠানো ছিল। ওঁরা ওপরের ডেকে উঠে বসতে না বসতেই লঞ্চ ছেড়ে দিল আর নদী থেকে হাওয়া এসে যেন সব তছনছ করে দিল। 

মোহিনীমোহন যোগেনকে বললেন, ‘তোমার যদি শুয়্যা থাইকলে আরাম হয়, শোও গা যাইয়া।’ 

এই কথার সঙ্গেই রসিকলালও তাকান যোগেনের দিকে আর বলে উঠলেন, ‘ক্যা রে, তোর মাথার টুপি কি বাতাসে উইড়া গেল না কী? 

মোহিনীমোহনও তখন দেখে বলে ওঠেন, ‘তাই তো, তুমি না টুপি পইরল্যা?’ যোগেন হেসে বলে, ‘পকেটে রাখছি।’

ডাক্তার বলেন, ‘পইর‍্যা থাকাই তো ভাল ছিল, খোঁচাখঁচি না লাগে!’ 

যোগেন আরো হেসে বলে, ‘পইয়্যা একবার দেইখ্‌ল্যাম তো আয়নায়। ক্যামন পচ্চিমা বামুনের মত লাগে।’ 

‘তাইলে এগডা নমাজি টুপি পরো খুঁইজ্যা পাই নাকি দেহি’ রসিকলাল চেয়ার ছাড়ার উদ্যোগ নিতেই মোহিনীমোহন তাঁকে হাত দিয়ে নিষেধ করে বলেন, ‘ক্যা? নামাজি টুপির বুঝি ধর্ম নাই?’

রসিকলাল চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘সেডা অবিশ্যি ঠিক। কিন্তু যোগেনের তো পরনে ধুতি। নামাজি টুপির মাহাত্ম্য তো তাতে ঢাকব!’ 

‘তাইলে তো পুলিশের হ্যাট লাগে। সব মাহাত্ম্য দাঁড়াইব টুপির,’ ডাক্তার বলেন। 

একটু চুপ করে থেকে রসিকলাল বলেন, ‘যোগেন, তোর অ্যাহন যে মতবাদ, তার আগে তো তোর এগডা টুপি ভাবব্যার লাগে, বাবা, ধর্, গান্ধীটুপি হিন্দুগ, নামাজিটুপি শ্যাখগ, তপশিল টুপি তো একডা লাগে। না?’ 

শীতলক্ষ্যার স্রোতের আওয়াজে ওদের হাসি চাপা পড়ে যায়। জলে এমন হয়। এক-একটা জায়গায় স্রোত হঠাৎ ফুঁসে ওঠে। 

সেই জায়গাটা পেরিয়ে গেলে যোগেন বলে, ‘কাকা, আমারে হ্যাই গল্পের সন্ন্যাসীঠাকুর বানায়েন না য্যান। একলেঙটির লাইগ্যা যারে সংসার পাতব্যার লাইগ্‌গ্ল। আমার তো লেঙটিও নাই, কাকা। আমি কইব্যার চাই—আমারে হিন্দুও বানান না, শ্যাখও বানান না, আমি শুদ্দুর, আমারে শুদ্দুর থাইকব্যার দ্যান। তাও দিব না। কয় যে তুই হিন্দু না-হইলে তো আমার মেম্বার হওয়া হব না। ক, ক তুই হিন্দু। ল্যাখ, ল্যাখ তুই হিন্দু। লিখব কেডা? লিখব্যার জানে তো এক বামুন-কায়েত-বৈদ্য। আমি যাই কই, সে আমার নামের পাশে তো লিখবই হিন্দু।’ 

আগেই ঠিক করা ছিল ওঁরা নারানগঞ্জে এক রাতের বেশি থাকবেন না। লঞ্চঘাটে মঞ্জু মাস্টার থাকবে। তার সঙ্গে কোথায়-কোথায় যেতে হবে জেনে আগে সার্কেল ইনস্পেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে যায় সরকারি খবরটা নিতে। সরকারি খবর যে ঠিক হয়, তা না। সেটাও তো হয় রাজনীতি অনুসারে। কিন্তু সরকারি হিশাবটা জানা না থাকলে সরাসরি লোকজনের কাছ থেকে এতরকম উলটো-পালটা খবর পাওয়া যায় যে, সত্যিকথার আন্দাজ মেলে না। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তো এই কায়দাতেই হিন্দু খেপিয়ে বেড়াচ্ছে। 

সার্কেল ইনস্পেক্টর রোগা মানুষ, সিরাজগঞ্জের ছেলে, এডোয়ার্ড কলেজ থেকে বিএ পাশ করেছে। তার বাড়িতেই যেতে হল। তার বাড়িতে একসঙ্গে এমন চারজন গণ্যমান্যকে বসতে দেয়ার জায়গাই নেই। যদি-বা ভিতর থেকে একটা টুল আনল, সেটাতে মঞ্জু বসতে পারল, সে দাঁড়িয়েই থাকল। টানাটানি করে ওই টুলের অর্ধেকটায় মঞ্জু ওকে বসতে বাধ্য করল। সে তার কথা আগেই শুরু করেছিল, ‘আমি আপনাদের মত মানুষের কাছে কী কব? দাঙ্গা যদি শুরু হয়, তাইলে যাগ সংখ্যা কম তারাই মরে বেশি। রায়পুরায় মুসলমানগ সংখ্যা হিন্দুগর দশগুণ,’ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘না, দশগুণ না। আটগুণ। আর শিবপুরে সাড়ে পাঁচগুণ। তেমন জায়গায় যদি দাঙ্গা বাঁধে আমি খবর পাওয়ার আগেই তো সমস্ত দুষ্কর্ম হাসিল ও সাক্ষ্য লোপ। নারানগঞ্জ সদরে কোনো গোলমাল নেই। রায়পুরা আর শিবপুরায় এত মাতবর জুইটল কোয় থিক্যা যে শ-খানেক গ্রাম পুড়াইল, আড়াই হাজার বাড়ি পুড়াইল, সোয়া পনের হাজার মানুষ খুন কইরল?’ 

‘এ সংখ্যাগুল্যা কি অফিসিয়্যাল?’ ডাক্তার জিজ্ঞাসা করেন। 

‘ওহানে অফিস থাইকলে তো অফিসিয়্যাল হইব? একমাত্র অফিসার বড়হাটের ডাকনদার। আমারে নেতারা কইয়্যা গেলেন। আমি শুইনল্যাম।’ 

‘নেতারা? কেডা? কইলকাতার?’ 

‘নাঃ। অ্যাহনো অদ্দূর যায় নাই। সব লোক্যাল, মহাসভা আর কংগ্রেস মিল্যাইয়া মিশাইয়া।’

‘আমরাও তো ওই সংখ্যাই পাইছি’, ডাক্তার বলেন। 

‘তাই পাবেন। ওই সংখ্যাডায় হয়তো একমত হইছে’। 

‘আপনি কি যাব্যার পারছেন?’ 

‘আমার তো গাড়ি নাই। যাওয়ার উপায় একমাত্র সাইকেল। রাস্তা এদ্দূর খারাপ যে মরার জইন্য দাঙ্গা লাগব না। গাড়ি চাইব্যার লাইগব এসডিও শাহেবের কাছে। তিনি কোনো জবাবি দ্যান নাই। আমি ওই নেতাগ কথা শুইন্যা এখানকার লিগের সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা কইর‍্যা কইল্যাম—আমারে তো ফাইল ঠিক রাখব্যার লাগব। আপনার হিশাবড়া কন। তাতে উনি খেইপ্যা উইঠ্যা কইলেন, আপনে নিজে মুসলমান হইয়্যা যদি মুসলমানগ ক্ষতির হিশাব না রাখেন, তাইলে আপনার মুসলমান হইব্যার কামডা কী ছিল। ওই হিন্দুরা যা ফিগার দিছে, তার উপুর লাখ-হাজার যেহানে যা বাড়াইব্যার বাড়াইয়্যা মুসলমানগ ক্ষতি দেখান। তো আমি কইল্যাম, তাইলে তো জনসংখ্যার সঙ্গে মিলব না। উনি চিল্লায়া কলেন, তাইলে, মিল্যাইব্যার যদি না পারেন, অফিসার হওয়ার হাউস ক্যা? যাউক, আমার অনুরোধে আর আমি মুসলমান বইল্যাও হয়তো, উনি ওঁর লিগের একডা প্যাডের কাগজ দিলেন। আমি তাতে উনি যা কইছেন তাই লিখ্যা ওনাকে সই করতে দিল্যাম। উনি একবার তাকাইয়্যা দেখলেনও না কী লিখছি? কারে ডাইক্যা কলেন, অ্যাড্‌ডা সিল লাগাইয়্যা দে। লোকটা সিল দিয়্যা খামে পুরা দিল। আমি সেডা ফাইলে রাইখ্যা দিছি। নিজেও দেখি নাই।’

‘আমরাও তো পার্টির লোক। আপনে এই সব কথা কতেছেন, আমরা যদি বাইরে গিয়া কয়্যা দি।’ 

‘আমিও তো চাই, আপনারা কয়্যা দ্যান। তাইলে আমি সব থিক্যা নীচের তলার অফিসার হিশাবে অন্তত কব্যার পারি, যেরকম প্ল্যান কইর‍্যা এত বড় সব দাঙ্গার ঘটনা ঘটতেছে, সেডার ঝামেলা ঠেহানোর খ্যামোতা সরকারের নাই। মানে আমার নাই, কইলে তো কথাডার জোর কইম্যা যায়। তাই কইল্যাম—সরকারের নাই। মানে, আমারও নাই।’ 

‘বাঃ। আপনের মত ভাইব্যা-চিন্তিয়া কথা বলে নাকী নারানগঞ্জের অফিসাররা’, যোগেনের কথার লক্ষ বোঝা যায় না। 

‘এর পিছনে ভাবনা খোঁজনের তো কিছু নাই। ভাবনা একডাই। বাপের জন্মে অফিসার হইব ভাবি নাই। অ্যাহন কোটার জোরে যহন পাইছি তহন য্যান বুদ্ধির দোষে হারাইয়্যা না বসি। আমি ওই দুই থানার সব থিক্যা বড় দুই হাটে গিছিলাম একদিন-একদিন কইর‍্যা। কী কইরা গেলাম সেডা আর কই না। ফিরার সময় কুনো হাঙ্গাম হয় নাই। ওরাই পৌঁছাইয়া দিছে।’ 

‘তাইলে তো একমাত্র আপনারই ফার্স্ট হ্যান্ড নলেজ।’ 

‘বাড়াইয়্যা ভাইববেন না। আমি আমার সার্ভিস-ফাইল যাতে ঠিক থাকে তার লগে গিছিলাম। গিয়্যা ওহানকার মুসলমান মাতবরের সঙ্গে দেখা করি। আমি মুসলমান বইল্যা ওনারা যথেষ্ট খাতিরজমা কইর‍্যা জাইনব্যার চাইলেন যে ঢাকার নবাব শাহেবরে নবাব কইর‍্যা আর হকশাহেবরে উজির কইর‍্যা পাকিস্তান কবুলের আইনে আর কী কী আছে। ওনারা কী কী আছে বইল্যা খবর পাইছেন জিগ্যালে জাইনল্যাম—বিলাত থিক্যা হুকুম আইসছে সাতদিনের লগে মুসলমানগ আজাদ দিয়া হইছে, হিন্দুগ পুড়াইলে মাইরলে উচ্ছেদ দিলে মুসলমানগ বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি করা চইলব না। তহন আমি জিগাইল্যাম—অ, সেই হুকুম মাইন্যাই রায়ট বান্ধাইছেন? উনারা বইললেন, হিস্যা না জাইন্যা দাঙ্গা বাধাব আমারে কি তেমন বুরবাক পাইছেন? এরপর আমার অনুরোধে ওনারা হিন্দুগ বড় মোড়ল দুইজনরে ডাইকলেন। তারপর আমার অনুরোধে দুইজন একডা কাগজে স্টেটমেন্ট দিলেন, কী কী ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে ও হয় নাই। দুই জায়গায়ই। তারপর অগ অনুরোধে আমি গরম-গরম মুরগির মাংস দিয়্যা ভাত খাইল্যাম। দুই জায়গায়ই। আমি শহরে ফিরৎ আসার মিনিটখানেক আগে কইল্যাম—অ্যাহন আমি অফিসার হিশাবে আপনাগ জিগাই—আমি ফিরান যাওয়ার আগে এহানের সব দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও সেই নিয়্যা গুজব পুরাপুরি ষোলআনা বন্ধ হইব কি? নাকি আমারে ৩৬ ঘণ্টা পরে বন্দুকপুলিশ আর মিলিটারি নিয়্যা আইস্যা এহানে পিটানি-থানা (পিউনিটিভ পুলিশ) বসাইতে হইব? উনারা মক্কামুখ্যা হইয়া কাম কাইটছেন। তারপর থিক্যা একদিন বাদে একদিন লোকমুখে আমারে খবর দিছেন। সব স্টেটমেন্টেই অগ টিপসই। সবই আমি ফাইলে রাইখ্যা দিছি। এর মইধ্যে দুইডা আকস্মিক ঘটনা ঘইটতে পারে, যা আমার ফাইলের বাইরের ব্যাপার। যদি মন্ত্রীরা আইস্যা মিটিং করেন, বা, আপনাদের মত লিডাররা আইস্যা মিটিং করেন, তার দায়িত্ব আমার না। সেডা তো এস-ডি-ও শাহেবের এক্তিয়ারে। আপনাদের যদি আরো কিছু জিগ্যাবার থাকে, জিগ্যান।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *