১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৫৫. হিন্দু ও মুসলিম দাঙ্গায় তপশিলিরা কোথায়?

১৫৫. হিন্দু ও মুসলিম দাঙ্গায় তপশিলিরা কোথায়? 

ফাল্গুনের বেলা লম্বা। ঘাটপাড়ে নেমে যখন ওরা রিক্সা করবে কি ঘোড়ার গাড়ি করবে, তা নিয়ে ভাবতে-ভাবতে এগচ্ছে, তখনো সন্ধ্যার আলো জ্বলেনি, রাস্তাঘাটে কিংবা দোকানপাটে। ঘোড়ার গাড়িগুলো এমন চালাকি করে সাজিয়ে রাখা যে গাড়ির ভিতরে না ঢুকে রাস্তা পেরবার উপায় নেই। ঘোড়ার মলমূত্রের গন্ধে বাতাস ভারী। 

মঞ্জু বলে, ‘পা চালাইয়্যা চলেন। ওরা য্যান বুইঝবার না পারে আপনেরা ঢাকার লোক না। তাইলে গাড়ি ছাড়া যাইবার দিব না।’ 

‘এত হাঙ্গামার কাম কী? নিলেই হয় গাড়ি?’ যোগেন একটু দ্রুত হাঁটতে-হাঁটতেই পরামর্শ দেয়। 

‘কী যে কও যোগেনদাদা, তিনজন গাড়ি নিলে খরচা পোষায়? তিনজন গাড়ি নিলেই ওরা টের পায় যে নতুন লোক। তারপর যেহানে যাইব্যার সেহানে গিয়্যা জামাকাপড় খুইল্যা নিবে তোমার।’ 

‘তাতে আর অসুবিদা কিছু নাই। শিব সাইজ্যা মোহিনী ডাক্তারের সামনে দাঁড়াইব। কইব, আমাগ শুদ্দুর চিন্যা কুট্টিয়া কাপড়চোপড় খুইল্যা নিয়্যা কইল, যান, পরানডা তো থাইকল, ঐডা নিয়্যাই যান—’ 

ওরা বেশ খানিকটা রাস্তা পেছনে ফেলে এগিয়ে এলে, টমটমের আড্ডা—ওই যেমন থাকে, সামনে-পিছনে চাইরডা সিট। তিনজন গেলে এখনই ছাড়বে। রাস্তায় এক প্যাসেঞ্জার তুলবে। এই টমটমের আড্ডারও শেষে গোটা কয়েক সাইকেল রিক্সা যেন দেখা যায়। একেবারেই গোটা কয়েক। টিনের পাতগুলো ঝকঝক করছে। এই কটা সাইকেল রিক্সা নিয়ে গাড়োয়ানদের এত দুশ্চিন্তা কীসের যে তাদের ঘাটপাড়ে ঢুকতে দেয় না? 

‘ওরাও যে খুব এড্ডা ঢুইকব্যার চায়, তা না। সাইকেল রিক্সা এত কম বইল্যাই সারাদিনে দুই-চাইরডা ভাড়া জুটবই। সেটাই তো গাড়ি পিছু আয়ের থিক্যা বেশি। যারা জানে, তারা এতডা হাঁইডা আইস্যাই রিক্সা চাপে। বাঁধা কিছু বড় প্যাসেঞ্জার এইভাবে গাড়ি ছাইড়্যা ঢাকায় ওঠায় গাড়োয়ানরা জোট পাকাইছে।’ 

‘জোট পাকাইয়্যা কি চাকার লগে পারা যায় ঘোড়ার গাড়ির? কোথাও ঘটছে এমন? শুইনছ কোথায়।’ 

দেখাই যাচ্ছিল—রাস্তার মোড়ে বেশ নানা রঙিন কাগজে সাজানো রিক্সার লাইন। ঢাকায় বছর দুই তো হল। উঠে তো যায়নি। 

মঞ্জু রাস্তার এক টমটমকে ইশারা করে তারা যে তিনজন এটা বোঝাতেই টমটমটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে। ওরা উঠে পড়লে মঞ্জু বলে, ‘নবাব পুর’। 

ওরা মোহিনী ডাক্তারের বাড়িতে যাচ্ছে। তাদের কাছে মোহিনী ডাক্তারই ঢাকার একমাত্র নেতা। অন্যদের কাছেও। তবে একমাত্র না। নমশূদ্র সমাজে ডাক্তারের গল্প খুব চলে, কীভাবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। ওঁর বাড়ি মেলামোচ্ছবের মত। সব সময়ই দরজা খোলা। দরজা সবার জন্য খোলা থাকলেও আসে তো নমশূদ্ররাই এক। নমশূদ্রগ কোনো হোটেল নাই। আছে হিন্দুদের আর মুসলমানদের। বরাবরই মুসলিম হোটেলে যার ইচ্ছে সে-ই খেতে পারে। কিন্তু ভুল করে হিন্দু হোটেল ঢুকে পড়লে শুদ্দুরগ আর উদ্ধার নাই—এমন মার খেতে হয়। তার চেয়ে মোহিনী ডাক্তারের বাড়িই ভাল। পাঁজা থেকে দুটো কলাপাতার নীচে হাত দিয়ে তুলে ঠাকুরের সামনে ধরলেই, এক হাতা ভাত, এক হাতা ডাল, এক হাতা মাছের ঝোল। সবগুলো হাতারই গর্ত এক-বিধবার কড়াইয়ের মত। একবার ভাত নিলেই হয়ে যায়। খাওয়া কলাপাতা তুলে ঠাকুরের কাছে দাঁড়ানোর অনেক অসুবিধে। তাই যারা নিজেদের পেটের আন্দাজ জানে, তারা হয়তো, এক হাতার পর, আরো এক হাতা ভাত নিয়ে নেয়। বিশাল পাক দেয়া বারান্দা। সেইখানে নিজের বিছানা বিস্তারিয়াই গা আলগা দ্যাও। দেইখতে-দেইখতে তোমার চক্ষু মুইদ্যা আসব। ঢাকার নমশূদ্ররা রটিয়ে দিয়েছে, মোহিনী ডাক্তারের বাড়ির বারান্দায় দুপুরের ঘুম সাইরতে না কী বামুনরাও আসে। ঘুমের ঘোরে তাদের কাছা খুলে গেলে কোমরে পেঁচানো লুকনো পৈতে বেরিয়ে পড়ে। অথবা বাহ্য-পেচ্ছাব করতে গেলে বামুন হঠাৎ লুকানো পৈতা বের করে কানে গোঁজে। মজা হচ্ছে, বামুনদের নিয়ে এই মজার গল্প কিন্তু কখনো মুসলমানদের নিয়ে হয় না। 

ডাক্তার মোহিনীমোহন দাস ছিলেন বরিশালের চাঁদশীর বিখ্যাত ক্ষত-চিকিৎসক বাড়ির ছেলে। বাড়ির সব বড়দের কাছ থেকে ক্ষত-চেনার পদ্ধতি শিখেছেন—ক্ষতের আকার, গভীরতা ও বিস্তার কী করে মাপতে হয়, কী করে হদিশ করা যায় ক্ষতের গোপন পথ, কেমন করে ক্ষতের বর্গ নির্ণয় সম্ভব, পেশাগত ও বয়সের কারণে কোন-কোন বিশিষ্ট ক্ষত তৈরি হয়, ক্ষত থেকে অপর কোনো লক্ষণ, জ্বর-শ্লেষ্মা-অগ্নিমান্দ্য, স্পষ্ট হয়ে উঠছে কী না, যে-কোনো মানুষেরই যে-কোনো ক্ষত হতে পারে—রোগীর সামাজিক প্রতিষ্ঠা দিয়ে রোগ নির্ণয় নিষিদ্ধ, চিকিৎসা ভিন্ন চিকিৎসার অন্য কোনো নীতি নেই, চিকিৎসা ও রোগীর মধ্যে ধর্মীয়-সামাজিক-আত্মীয়বিবাদ-আর্থিক অবিশ্বাস ইত্যাদির কোনো অনুপ্রবেশ বা প্রভাব কখনোই ঘটবে না—এই অভ্যাস ও নীতিনির্দেশ আয়ত্ত করে তিনি আর-জি-কর মেডিক্যাল স্কুলে তিন বছরের ডাক্তারি কোর্স (সম্ভবত এলএমএফ) পড়েন ও ১৯০৬ সালে স্থায়ীভাবে ঢাকায় এসে পেশা শুরু করেন। ১৯২৪ ও ১৯৩০ দুবারই তিনি দক্ষিণ ফরিদপুর কেন্দ্র থেকে কাউন্সিলের ভোটে জেতেন। ১৯৩৫-এর আইনে আইনসভার ভোটে তিনি হেরে যান। ঢাকায় নমশূদ্র ছাত্রদের জন্য দুটি হস্টেল, নমশূদ্রদের অবস্থা জানিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ ও বই-লেখা তাঁর প্রধান কাজ, পেশার বাইরে। 

মোহিনীমোহনের নাম ছড়িয়ে পড়ে কালীবাড়িতে প্রবেশাধিকারের দাবিতে মুন্সিগঞ্জের নমশূদ্রদের সত্যাগ্রহে। কালীবাড়ির কর্তা ছিল স্থানীয় বার লাইব্রেরি। আর মুন্সিগঞ্জের এসডিও ছিলেন বর্ণভেদে বিশ্বাসী এক কায়স্থ। বামুন-কায়েত উকিলরা হিন্দুধর্ম রক্ষায় শূদ্রদের প্রবেশাধিকার-দাবি অস্বীকার করলেন ও উচ্চবর্ণীয় কায়স্থ এসডিও সরকারের পক্ষ থেকে এই নিষেধ বলবৎ রাখতে পুলিশ রাখলেন। উচ্চবর্ণের এই সংহতি দেখে কোনো পার্টিরই প্রাদেশিক নেতা মিটিঙে বক্তৃতার বেশি কিছু বললেন না। 

বড় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুন্সিগঞ্জ আন্দোলন নিয়ে মোহিনীমোহন খুব একলা হয়ে যান। তাঁর স্ত্রী তাঁর পাশে ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, শুধু নমশূদ্র মেয়েদের নিয়ে একটা মিছিল ও তৈরি করেছিলেন। মন্দিরে শূদ্রের প্রবেশাধিকার দাবির সমর্থনে মুন্সিগঞ্জের ছ-জন ব্রাহ্মণ গান্ধীবাদীও বটে, বিপ্লবীও, ব্রাহ্মণপুত্র অনশন শুরু করার ফলে সর্বদলমতের এক বিশাল মিছিল পুলিশ ও প্রতিরক্ষা ভেঙে মন্দিরে প্রবেশ করে। সেই মিছিলেরও মাথায় ছিলেন মোহিনীমোহনের স্ত্রী। 

নিজে কি জানতেন মোহিনীমোহন, তিনি ভারতের রাজনৈতিক ব্যবহারের দুরূহতম সমস্যার সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন সারাটা জীবন? মোহিনীমোহন ছিলেন ঢাকার কংগ্রেস নেতা, গান্ধীবাদী নেতা ও নমশূদ্র নেতা। এই তিন রকমের আনুগত্যগুলির ভিতরে তাঁর কি কখনো কোনো সংঘাত হয়নি? এই আনুগত্যগুলি কি অবিভাজিত রাখা যায়? যেমন একসময় কামরাজ নাদারের মত বক্তৃতাহীন নিরলস কর্মী, দ্রাবিড় আন্দোলনের মুখে একটা নিরপেক্ষতার ভঙ্গি নিয়েছিলেন? যেমন খালিস্তান আন্দোলনের সময় পাঞ্জাব কংগ্রেসের সভাপতি, শিখধর্মের প্রধানতম কর্মী ও স্বর্ণমন্দিরের রক্ষক হিশেবে বিভাজিত আনুগত্যে দীর্ণ হয়েছিলেন? মোহিনীমোহন খুব বড় নেতা নন, সর্বক্ষণের নেতা নন। তিনি অনুশীলন সমিতিরও সদস্য ছিলেন। অথচ, কী আশ্চর্য, মোহিনীমোহন পেরে গেলেন সারাজীবন কংগ্রেসি, নমশূদ্র ও বিপ্লবী থাকতে। কী করে পারলেন? এটার উত্তর খোঁজার চেষ্টা আমাদের ‘জাতীয়’ ইতিহাসের বিষয় হবে কবে? 

পেরেছিলেন যদি মেনে নেয়া যায় তবে তাঁর জীবনের শৃঙ্খলায় হয়তো একটা ব্যাখ্যার আভাস পাওয়া যায়। এন্ট্রান্স পাশ করার পর তিনি ডাক্তারির, আধুনিক ডাক্তারির, নিম্নতম শিক্ষা নেন যোগ্য প্রতিষ্ঠানে। ওই একই সময়, দু-তিন বছর ধরে শিক্ষা নেন বংশগত চিকিৎসাবিদ্যায়। দুটো শিক্ষা মিলে তিনি তখনকার মান-অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের মর্যাদা আয়ত্ত করেন। সেই বিশেষজ্ঞতার প্রয়োগক্ষেত্র হিশেবে বেছে নেন বড় একটি শহরকে। কংগ্রেস, নমশূদ্র ও বিপ্লবী—এই বিশ্বাসগুলির মধ্যে বৈপরীত্য আছে। সেই বৈপরীত্যগুলির সমাধান অনেক বড় নেতারা করেছিলেন ক্ষমতার প্রচ্ছদে, মোহিনীমোহন করেছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্বকে ধারণের যোগ্য করে তুলতে। তাঁর সমাজ ও রাজনীতিকে তিনি তাঁর অনুকূলে আনতে পেরেছিলেন। নমশূদ্রসমাজ তখন বৃহত্তর একটা পরিচয়ের ভিতর ঢুকতে চাইছিল। ১৯৪০-এর পর-পরই নিম্নবর্ণ এক-একটি গোষ্ঠী বা কৌম বা সম্প্রদায়ের কাছে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ভোটাধিকারের সুবাদে কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক বা হিন্দু মহাসভার সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ এসেছিল। তিনটি রাজনৈতিক দলই প্রধানত হিন্দুত্ব নিয়ন্ত্রিত। 

যোগেন মণ্ডল হয়ে উঠেছিলেন আধুনিকতর এক শূদ্র নেতা যিনি এই হিন্দুনিয়ন্ত্রণকেও অস্বীকার করতে পেরেছিলেন। যোগেন মণ্ডল অদ্বিতীয়। তিনি নেতা ছিলেন তাঁর সমাবেশ তৈরির ক্ষমতায়। তাঁর সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করতেন। সে-বিশ্বাস তিনি তৈরি করেছিলেন সম্প্রদায়ের পরিচয়কে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত ও স্বাধীন চলনশক্তি দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে। কোনো হাওয়ার বা প্রচলনের সুবিধা তিনি নেননি। রাজনৈতিক যে-বিকল্পগুলি হিন্দুত্বের সম্পর্কিত থেকে তখন নিম্নবর্ণের সামনে খুলে গিয়েছিল–কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক ও হিন্দু মহাসভা—তার যে-কোনোটিতেই তিনি উচ্চতম স্তরে আমন্ত্রিত ছিলেন। সে-আমন্ত্রণ তিনি নেননি। কারণ, তিনি জানতেন ওইসব বিকল্পেই তাঁকে তাঁর শূদ্রপরিচয় কার্যত ছাড়তে হবে। কখনো-সখনো সেই পরিচয় দেখিয়ে কিছু লাভ করার সুযোগ তিনি একলা হয়তো পাবেন। কিন্তু সে-লাভে তাঁর সম্প্রদায়ের কিছু যাবে আসবে না। বড়জোর তাঁর সম্প্রদায়ও তাঁকে প্রদর্শনীয় হিশেবে ব্যবহার করবে। 

এ এক বিরল সাহস যা এক বিরল মানুষেরই থাকতে পারে। শেষ পর্যন্তও যে তিনি শূদ্র-মানুষ থেকে গেছেন—এই তাঁর মহত্ত্ব। হিন্দুত্বের সংকীর্ণ বা প্রগতিমান সিলমোহর চিহ্নিত কোনো শূদ্র নন। হিন্দুত্ব ও তার সংলগ্ন রাজনীতি থেকে স্বাধীন শূদ্র। সে শূদ্র তার প্রাণটুকু বাঁচিয়ে রাখার শ্রম, ও সেই বাঁচার চাইতে একটু বেশি বাঁচার অতিরিক্ত শ্রম, হিন্দু সমাজকে লুণ্ঠনের অধিকার দিয়ে আধ্যাত্মিক খতবন্দী শূদ্র নয়। এমন একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা পাকিস্তানকে যোগেন নিজের রাষ্ট্র বলে বেছে নিয়েছিল, যে-ব্যবস্থায় শূদ্রত্ব কোনো ধারণাই নয়। যোগেন ছাড়া আর কেউ ভারতের হিন্দুতা এমন আমূল আশীষ প্রত্যাখ্যান করেনি। 

.

মোহিনীমোহন বললেন, ‘এ তো খাড়াইছে আমরা হইল্যাম ছাগলের মধ্যমপুত্র। কংগ্রেস মায়ের বাঁট পায়, লিগও পায় আর শিডিউল কাস্টরা কোনো বাঁটই পায় না। মুসলমানরা শাসায় হিন্দু বইল্যা আর হিন্দুরা শাসায় লোয়ার ক্লাশ বইল্যা।’ 

‘জ্যাঠা, ঢাকার এবারের রায়ট তো বাসি হওয়া ধইরল। আপনারা ঢাকায় তো তেমন সাড়াশব্দ কিছু তুললেন না—’ রসিকলাল বলেন। 

‘ঢাকা টাউনে তো রায়ট ছিল হিন্দু-মুসলমান, ওই যা-হয়, এক রায়টের সতের গল্প। শাঁখারিরাই আগে লাগাইছে। তারপর মুসলমানরাও পালটা দিছে। তহন তো শিডিউলগ কেউই আলাদা করে নাই। সাহাগ তো আর কেউ শিডিউল ধরে না। তারা তো হিন্দুগরও চাঁই। ঢাকা থিক্যা রায়ট যখন নারানগঞ্জে গিছে, তারপর আবার ওই দুই-তিনডা থানায়, সেই হানেই ঘটনাগুলা ঘটছে। তবে, এ-সব কথা তো রটেও বেশি।’ 

‘আপনাগ কাছে কোনো খবর আসে নাই?’ যোগেন জানতে চায়। 

‘হ্যাঁ, আইসব্যার লাগছে তো। ঢাকায় গুজব রটাইয়্যা দিল ফজলুল হকরে হিন্দুরা খুন কইরছে। অ্যাহন, ঢাকাই কও আর নারানগঞ্জই কও, মুসলমানরা হিন্দু চিনব ক্যামনে, হিন্দুরাই-বা মুসলমান চিনব ক্যামনে? তার মইধ্যে আবার মিয়াগ তো চিনব্যার লাইগব—শিডিউল। এডা কি সম্ভব নাকী? তাইলে চেনা লোক ছাড়া খুন কইরব? চেনা দোকান ছাড়াই-বা কুন দোকান লুট করব? আমার লগে তো ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ শাহেবের কথা হইল। আমিই গেছিল্যাম কয়জনারে সঙ্গে লইয়্যা।’ 

‘আপনাগ কথা কিছু কওয়া গেল, না শাহেব শুধু নিজের কথা শুনাইল?’ রসিক বলেন।

 ‘আমাগ তো কুনো নতুন খবর নাই। কংগ্রেসের আমরা দুইজন, আমাগ গবমেন্ট প্লিডার, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর। হিন্দু-মুসলমান মিল্যাইয়া একডা ডেপুটেশন। আমরা কইল্যাম—আমরা শুধু কইব্যার আসছি সরকার শক্ত হাতে খুনাখুনিডা বন্ধ করেন।’ 

‘খুনাখুনিটা শুরু হইছিল ক্যান সেইডা নিয়্যা ডি-এম কিছু কইল?’ মঞ্জু জানতে চায়।

‘সেইডা নিয়্যা কি আর অ্যাহন কথা হয়, বাপ? এ তো সত্যি-সত্যি পথের গোড়া খুঁইজতে-খুঁইজতে পথ হারাইবার বুদ্ধি। কে দোলের রং-ছড়াছড়িতে মুসলমান মাইয়্যার গায়ে রং ছিটাইছে, কে আগে দল পাকাইয়া মুসলমান পাড়ায় আগুন দিছে, সাহাগ দোকান লুট কইরল যারা তারা মুসলমান আর আজিজ স্টোর্স ভাঙল যারা তারা হিন্দু। ক্যান? যেহেতু সাহারা হিন্দু আর আজিজ স্টোর্স মুসলমান। বেশ। কিন্তু এডা কি আইনত শুদ্ধ? যোগেন কইব্যার পারে—’

যোগেন হেসে বলে, ‘আন্দাজ নিয়্যা তো প্রমাণ হয় না, বড় জ্যাঠা। বড়জোর কওয়া যায়—যুক্তির জোর আছে কোন আন্দাজে। কিন্তু আরো বড় যুক্তি আইসলে এই আন্দাজ আর ঢেঁকে না।’ 

‘সেইডা কে মাপব, আন্দাজের পক্ষে যুক্তির ওজনডা? লোহার কামার না সোনার কামার? রতি দিয়্যা না হন্দর দিয়া?’ 

‘ওডা কি দাঁড়িপাল্লায় মাপা যায় কাহা’, রসিকলালের এই কথায় মোহিনীমোহন নীরবে মুখভরা একটা হাসি হাসলেন, তাঁর নাকের দুদিক থেকে দুটো মোটা ভাঁজ ঠোঁট পর্যন্ত নেমে স্থির থাকল তাঁর অরব হাসির সময় জুড়ে, ‘তাই তো কই তোমাগ। সাহার দোকানের জিনিশের উপর তো আমারও লোভ আছে, পয়সা নাই, কিনব্যার পারি না, লুট হইছে, লুট কইরব্যার পারি। সেই রম ধরো, ঢাকার নবাব শাহেবেরও তো চোখ থাইকতে পারে, আজিজ স্টোর্সে রাখা একডা মোটরগাড়ির দিকে। এদিন কেনেন নাই। বা, বলা ভাল, কেনার সুবিধা ছিল না। বা, ধরো ইচ্ছা হয় নাই। অ্যাহন, আজিজ স্টোর্স লুট হইতেছে শুইন্যা তার নিজের এক লোককে ডাইক্যা কন—আজিজ স্টোর্স লুট হইতেছে, শুইনল্যাম। তুমি একা গিয়্যা ওগ দোকানে একডা ছোট মত নীল রঙের মরিস-মাইনর গাড়ি আছে, সেইডা চালাইয়া বাইর কইর‍্যা বড়-কাঠরার কুঠির গ্যারাজে ঢুকাইয়্যা চইল্যা আইসব্যা।’ 

সবাই চুপ করে থাকল। মোহিনীমোহনও। চারজনই বুঝতে চাইছে মোহিনীমোহনের উত্থাপিত সমস্যা। খুবই সহজ একটা গিঁঠ—রায়ট হচ্ছে মানেই দলবেঁধে আগুন, লুট, মেয়েদের অপমান, খুন। দুটো উলটো দল ছাড়া রায়ট হয় না। একা লোক রায়ট করতে পারে না। কিন্তু একা-একা এই সবগুলো অপরাধই করতে পারে—আগুন লাগানো, চুরি, মেয়েদের অপমান, খুন যে-কোনো একটা অপরাধে ধরা পড়লে তার বিচার হবে। বিচার হবে ফৌজদারি আইনের একটি, দুটি বা পাঁচটি ধারায়। শাস্তি হবে। সেই সব ধারায় নির্দিষ্ট শাস্তি। রায় হবে, সবগুলি শাস্তি একসঙ্গে চলবে। 

রায়টে যদি এই ঘটনাগুলিই ঘটে তাহলে সেটা কোনো ফৌজদারি আইনে পড়ে না। এমন কী রায়টের সময়ও, খুন করা হচ্ছে যখন, তখনই পুলিশ ধরলেও তাকে অপরাধী বলে আলাদা করা যায় না, একটা লোক হিশেবে তার কোনো অপরাধ নেই। একটা দল হিশেবে অপরাধ থাকতে পারত—যদি কেবল সেই দলের লোকরাই কোনো চুরি বা লুট করে থাকে। যে-অপরাধ দল না-বেঁধে করা যায় না, সে-অপরাধের জন্যও শাস্তি হতে পারে কিন্তু প্রত্যেকটা শাস্তিই হবে এক-একজনকে আলাদা করে। এমন একটা দলবদ্ধ অপরাধ যদি কেউ রায়টের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারে, তাহলেও সেটা আর ফৌজদারি-মামলা থাকে না। হয়ে যায়, রায়ট। সেটা ঠেকানো পুলিশের কাজ। রায়টের ফলে শান্তি নষ্ট হবে, রাস্তাঘাটে গাড়ি ঘোড়া থাকবে না, মানুষজনের যাতায়াতে অসুবিধে হবে, দৈনিক কাজকর্মে বেরতে পারবে না কেউ, ফলে, একটা অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হবে। ঠেকানোর জন্য অ্যারেস্টও করতে পারে পুলিশ, কিন্তু তার বেশি কিছু না। আইন কেবল সেই অপরাধ নির্ণয় করতে পারে, যে অপরাধের একজন অপরাধী আছে। সমষ্টির বা সমাজের সম্প্রদায়ের বা কৌমের বা জাতির বা জাতের কোনো অপরাধ পেনালকোডে নেই। 

এই নকশার মধ্যেই গৃহযুদ্ধ বা বহির্যুদ্ধকেও ধরা হবে। সেটাও দলবেঁধে হচ্ছে। এবার দলের নাম : একটা দেশ। বা সেই দেশে সক্রিয় দুটি পার্টি। তাই, যুদ্ধে হাজার-হাজার লোক ধরলেও একজনকেও অপরাধী হিশেবে ধরা যায় না। আর, রসিকলাল-যোগেনরা কী খোঁজ করতে এসেছেন? মুসলমানরা নমশূদ্রদের হিন্দু বলে তাড়িয়ে দিচ্ছে—তার প্রতিবাদ চান, প্রতিকার চান। সেটা কী করে ঠিক হবে, কে মুসলমান, কে হিন্দু বা কে শূদ্র? 

সেটাও তো যোগেন বেশ স্পষ্ট করেই বলল, ‘এই কথাডা তো সব পক্ষরেই জানাইতে হইব যে শিডিউল কাস্টগ তাড়ানো হইতেছে, যেহেতু হিন্দু মহাসভা চারিদিকে রটনা কইরব্যার ধইরছে যে শিডিউলগ বাধ্য করতে হব সেনসাসে নিজেগ হিন্দু বইল্যা ঘোষণা কইরতে হব। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তো দিনে সাতড়া মিটিং করে। যেহানেই মিটিং করে পরের দিন সেহানেই দাঙ্গা বাঁধে। হিন্দুরা বাঁধায়। তারপর মুসলমানরা চালায়। এ তো এক বজ্জাতি। ষড়যন্ত্র কইর‍্যা বজ্জাতি। আর, বজ্জাতির তো কোনো অসুবিধা নাই, মাঝখানে তো চাঁড়াল-শুদ্দুর-শিডিউলরা আছে, মরলে অরাই মরব, পুড়লে অরাই পুড়ব। আমরা এই কথাডা ক্যান কইব্যার পারব না—হিন্দু-মুসলমানের এই দাঙ্গায় আমরা নাই। কাউরে তো আর দাঙ্গায় না-থাকার জন্যে কয়েদ করা যায় না।’ 

মোহিনীমোহন বলে, ‘এডা তো কওয়াই যায়। ভাল কথা। সোজা কথা। বইলব্যা কারে?’

‘সেডা তো আপনে ঠিক কইরবেন।’ রসিকলাল বলেন। 

‘এ-কথাডা তো প্রথম বলা দরকার আমাগ স্বজাতদের। সাহাগ, গোয়ালাগ আর শাঁখারিগ। অগ যদি বুঝান্ যায় তালি অন্তত অর্ধেকের বেশি কাম হইয়্যা যাব।’ 

‘জনসভা কইর‍্যা?’ মঞ্জু জিজ্ঞাসা করে। 

‘হ। করা যায়। কিন্তু তোমাগ জন কেডা যারা সভায় আসব?’ যোগেন জিজ্ঞাসা করে।

‘ক্যা? যাগ কথা বললা। সাহারা, গোয়ালারা আর শাঁখারিরা,’ বেশ সহজ সুরেই বলে মঞ্জু।

‘তারা তোমাগ কথা শুইনতে আসব ক্যা? তাগ মইধ্যে কি শিডিউলগ কোনো সমিতি-কমিটি আছে? যদি কিছুও থাকে, তালেও অইব। আছে? মঞ্জু—?’ 

‘আছেও আবার নাইও। ধরেন, সাহারা কবে কোন্ সমিতি-কমিটিতে থাহে? তবে তাগ নেতাগোছের মুরুব্বি বাইছ্যা কথা বলা যায়। অরা তো একটা অব্রাহ্মণ সমিতির দুর্গা পূজা করছিল।’ মঞ্জু বলে। 

‘হ হ করছিল একবার। স্যায় তো ওই মহাদেব সাহার ছোট পোলার কাণ্ড। সে পইড়তে-পইড়তে সাহাগ পক্ষে একটু বেশিই পইড়্যা ফেলছে। সে কইল, আমরা ক্যান দুর্গাপূজার লগে বামুনগ চাঁদা দিব? না-পারব মণ্ডপে উঠতে, না পারব অঞ্জলি দিতে। পূজা করো, নিজে পূজা। ওর বাপ-কাকারা তার মুখের উপর কথা কইব্যার পারে না। বংশের প্রথম বিদ্বান ছাওয়াল। কী কইতে কী কইয়্যা বলদামি কইর‍্যা ফেলার ভয়ে। কিন্তু নিজেগ পূজা কথাটা তাদের কারো কাছেই খুব একটা স্পষ্ট হয় নাই। অর বাবাই তহন জিগ্যায়, নিজেগ পূজা? ছাওয়ালও জবাব দেয়, হ্যাঁ, আমাগ পূজা। বাপ হইয়া ছেলেরে জিগায়, নিজেরা আমরা কেডা? ছেলে বলে, যা বইল্যা দুনিয়া আমাগ ডাকে, সাহা। সাহাগ পূজা। ধুত, বাড়ির পূজা করা যায়, তুই তো কস সর্বজনীন? হ্যাঁ, ঘরের মইধ্যে কে আইস্যা দ্যাহে কার পূজা। সর্বজনীন। সাহাগ সর্বজনীন পূজা। ধুত, শুনায় না ভাল, তরিবত থাহে না, মাথা হেঁট হয়। শেষে আমাগ শশীবাবু, কংগ্রেসের কমিউনিস্ট, জেলখাটা, ইউনিভার্সিটির, পণ্ডিত বইল্যা নামডাক আছে, নিজে বামুন নাস্তিক। তিনিই কইয়্যা দিলেন, অব্রাহ্মণ দুর্গা পূজা। কইয়্যা দিলেন, এতে তো কারো আপত্তরের কারণ নাই। হিন্দুগ যারা বর্ণহিন্দু তাগ কইয়্যা দেয়া থাইকল—যাতে তারা ভুল না করেন। 

‘এত্‌ত বড় খবরখান কাগজে বারাল না ক্যান?’ যোগেন, মঞ্জুকেই। 

মঞ্জু বলল, ‘বারাইছে তো ফটো দিয়া। 

‘বারাইছিল? তাই তো! ভাবছিল্যাম, লোকজন জাইনলে তো জিগ্যাইত—’ 

‘ইংরাজিতে। বাংলায় ছাপে নাই।’ মঞ্জু আশ্বাস দিয়ে যোগ করে ‘কইতে ছিলাম—এটা কিন্তু কামের কাম হইব্যারও পারে। শিডিউল মাইন্যা তো নিজেরে শিডিউল কওয়া। শিডিউল বইল্যা যদি সরকারি নোটিশ বাইর হয়, তাইলে তুমি তো আর শিডিউল থিক্যা বারাবার পারবা না। তালে তোমাগ শিডিউলের নেতাগ কথা শুইনব্যার লাগে’। 

‘তাইলে বড়-জ্যাঠা একডা কিছু সাব্যস্ত করেন। আমি যেটুক্ বুইঝল্যাম রায়টটা টাউনে খেপে-খেপে হইছে। কওয়া যাক্, অ্যাহনো চইলতেছে। তবে পাড়াগুলাতে। সারা টাউনে না। আর বুইঝল্যাম, রায়ট শহর থিক্যা গ্রামে গিছে। গ্রামে মুসলমানরা শিডিউলগ গ্রাম থিক্যা খ্যাদাচ্ছে। তাগ ন্যায্য ভয়, ওই শিডিউলরা নিজেগ হিন্দু বইল্যা পরিচয় দিবে সেন্সাসে। আরো বুইঝল্যাম, সেডা বুইঝ্যাই আসছি কইলকাতা থিক্যা। কিন্তু কইলকাতার জ্ঞান আর অকুস্থলের জ্ঞান পৃথক। যশোর-খুলনা-মোল্লাহাট থিক্যা হিন্দু মহাসভা নেতাগ আইন্যা মিটিং কইরতেছে কইলকাতার হলে-হলে। প্রচার কইর‍্যা লোক আনত্যাছে সব হিন্দু পাড়া থিক্যা। এক্কারে উছলাইয়া পড়ছে সব মিটিং। তাতে এই নেতারা মুসলিম লিগ সহ মুসলমানদের আদ্যশ্ৰাদ্ধ কইরতেছে। বিশেষ কইরা, সেনসাসে হিন্দুগ ভিতরে আরো পার্থক্য ঘটাইবার বুদ্ধিতে শিডিউল কাস্টের এনট্রি কি হিন্দু হইব, না শূদ্র হইব, এই নিয়্যা ক্যাচাল বাধাইতে চায় হিন্দুসভা। কংগ্রেস হাল ছাইড়া দিছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি অ্যাহন জাতীয় নেতা, হিন্দু নেতা, বাংলার নেতা। সব মিটিঙের সার কথা হক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ। এই তিনডা অবিদ্যার জ্ঞানের মইধ্যে ঢাকায় কোনডা দিয়া কী কইরব। বড়জ্যাঠা, প্রতিপক্ষডা ভাইব্যা নিবেন। কংগ্রেসও না, লিগও না, ফজলুল হকও না, সুভাষ বোসও না। প্রতিপক্ষ, তাবৎ হিন্দুসমাজ। দাবি, হিন্দুগ আধিপত্য-রক্ষা। উপায়, বাংলায় হিন্দুদের জনসংখ্যা মুসলমানগ থিক্যা কম এই গোনাগনতির হিশাবডারে নাকচ কইরব্যার লগে এই যুক্তি প্রচার—সংখ্যায় কম বইল্যাই হিন্দুরা স্বাভাবিক-শাসক। বা, উলটাডাও হইবার পারে। বলেন, কী করার লাগব? কোনটা আগে আর কোনটা পরে। বড়জ্যাঠা, যুধিষ্ঠিরের বড় বাহাদুরি যে ভারত সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারের নিষ্পত্তির জন্য যে-কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ, তারে তিনি বানায়্যা দিলেন পাঁচটা গ্রামের দখল আদায়ের লগে যুদ্ধ। হিন্দুগ তো এক ঘাড়ে দুই যুধিষ্ঠির। তারাও বুদ্ধি কইরছে—এটা ধর্মরক্ষার যুদ্ধ। হিন্দুধর্ম রক্ষার ধর্ম। হিন্দুধর্ম রক্ষার যুদ্ধ হইলে তো সেডা জাতীয় যুদ্ধ আর স্বাধীনতার যুদ্ধ হইবই, অটোম্যাটিক। আর হিন্দু মানেই তো বামুন-বৈদ্য-কায়েত তাইলে খাড়াইল তো এইডা যে বর্ণহিন্দুর বিরোধী হইলেই স্যায় দেশদ্রোহী, জাতিদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী, আরো যা যা দ্রোহী হওয়া যায়—সব। এই কথা যারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, রক্তের মইধ্যে যাগ এই বিষ, তাগ মইধ্যে কিন্তু বাংলার সব প্রাতঃস্মরণীয় ঋষিরাও আছেন—বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, জগদীশচন্দ্র, বিবেকানন্দ–কেডা নাই? তারা একজনও কি একটা কথাও লিখছে যে উচ্চ-হিন্দুগ কালচারের শ্রেষ্ঠতা মিথ্যা কথা। তাইলে তো আমাগ খোলা গলায় কইব্যার লাইগব—কর্তাগণ, আমরা বেবাক অপর জাত আপনাগ গলকম্বল হইয়্যা থাইকব্যার চাই না। আমরা হিন্দু না। এইডাই লিখব সেনসাসে। তাতে কার বংশবৃদ্ধি আর কার বংশহ্রাস, তা আমরা জানিও না, দেখবও না।’ 

সবাই একটু চুপ করে থাকে। রসিকলাল বোঝার চেষ্টা করেন, যোগেন এতটা খেপে গেল কেন। ওর তো সব থেকে বড়গুণ মাথা ঠান্ডা রাখা। তারা তো অনেকটাই জেনেশুনে এসেছে। শিডিউলদের গাঁও থেকে বের করে দিচ্ছে শুনেই তারা সেটা ঠেকাতে এল। তাদের তো তাহলে এই দাঙ্গার মধ্যে তিনটি কথা বললেই সব কথা আপাতত সারা হয়। এক নম্বর কথা—দাঙ্গাটা বন্ধ হোক। দুই নম্বর কথা—শিডিউলদের সেনসাসে নিজের পরিচয়ের স্বাধীনতা মানতে হবে। 

এইবারেই সেনসাসেই ‘ধর্ম’ আর ‘সম্প্রদায়’ বলে দুটি ঘর আছে। নতুন-নতুন ঘর হিন্দু সংখ্যা বাড়ানোর বুদ্ধিতে? তপশিলিরা তাহলে ধর্মের ঘরে কিছু বলবে না। সম্প্রদায়ের ঘরে বলবে, শিডিউল বা তপশিলি। তিন নম্বর কথা— মুসলমানদের বলতে হবে যে তপশিলিদের আক্রমণ করা চলবে না, তপশিলিরা আর এই গোয়ালা-সাহা-শাঁখারিরাও মুসলমানদের আক্রমণ করবে না। রসিকলাল ভাবছিলেন—বাংলায় এখন যে-রাজনীতি তাতে এই তিনটি কথা আঁটবে কী না। রসিকলাল ঠেকে যাচ্ছেন তিন নম্বর কথাটায়। তপশিলিরা আর মুসলমানরা পরস্পরকে আক্রমণ করবে না—এই কথাটা এখনই বলে দিলে কি শিডিউলরা ভরসা পাবে, না, ভয় পাবে? কলকাতা আর জিলা সদর কি মহকুমার হিন্দুবাবুরা তো একসঙ্গে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে? এখনই তো কংগ্রেস ছেড়ে হিন্দু মহাসভায় যাওয়ার ধুম লেগেছে। তাদের এই প্রচারে হিন্দুমহাসভার কোনো উপকার করে বসা হবে না তো? অন্য একটা ভাষা খুঁজছিলেন রসিকলাল। 

চুপচাপটা ভাঙলেন মোহিনীমোহন, ‘যোগেন, একডা গল্প মনে পইড়ল। তোমারও জানা হয়তো। এক বামনি স্নানে যাওয়ার আগে বামুনরে কইয়্যা গেল—আমি এডডু ঘাটে যাই, আখায় ভাত চড়ান আছে, এডডু চোখ রাইখো। বামুন চোখ রাইখতে-রাইখতে দ্যাহে, ড্যাকের ঢাকনিখান নড়ব্যার লাগছে। তারপর দ্যাহে, নড়া তো থামেই না, উল্ট্যা বাড়ে আর ধোঁয়াও উঠে। বামুন তখনই গায়ত্রীমন্ত্র পড়া শুরু কইরছে। বামনি ক্যান আসে না। ড্যাকের ঢাকনা আরো নড়ে, ধোঁয়ার সঙ্গে ফেনও উথলায়। বামুনের তখন বুদ্ধিনাশ। আগুন নিবানোর মন্ত্র আর মনে পড়ে না। তহন বুড়া আঙুলে পৈতা পেঁচাইয়া ঢাকনার ধোঁয়ার মাথায় যজ্ঞের আগুন নিবানোর মন্ত্র জোরে-জোরে পড়ে য্যান তারডা শুইন্যা যজমান কইব—’অগ্নে ত্বং সমুদ্রং গচ্ছ, ওঁ পৃথ্বী ত্বং শীতলা ভব।’ 

বামনি তহন আইস্যা গিছেন। বাইর থিক্যা কন-’একা-একা মন্ত্র চিল্লাও কীয়ের লাইগ্যা?’

‘আরে, এ ড্যাকের ঢাকনা তো মন্ত্রও মানে না—’ 

বামনি তহন রান্নাঘারে ঢুইক্যা ব্যাপার দেইখ্যা ড্যাকডা আখার উপুর থিক্যা নামাইতেই ঢাকনা ঠান্ডা। বামনি তহন মুখ নাড়াইয়্যা কয়, ‘মা কালীরে যে পাঁঠা বলি দ্যাও, সেই মন্তরডা কি পাঁঠাব কান শোনে না অণ্ডকোষ শোনে? অকাল কুষ্মাণ্ড! বাইরে গিয়্যা মন্তর চেঁচাও। তাও দুইডা কাক তাড়ান হব। আমারে আইঠ্যা ছোঁয়াইলা-আর-একডা ডুব দিয়া আসি।’ 

‘বড়জেঠা, এই গল্পডা আমার শোনা নাই। এত ভাল একডা কথা। শুইনতে এত ভাল যে মর্মার্থ বুঝি নাই।’ 

‘মর্মার্থ কিছু থাইকলে তো বুঝবা? সব ওই পুরুতের ড্যাক-পড়া মন্তর। তুমি যেসব কথা কইল্যা বাবা, সেগুলা তো আমিই সব জানি না। জাইনব্যার লাগব। কিন্তু অ্যাহন তো ড্যাক উথলায়। অ্যাহন তো মন্ত্র দিয়া আগুন নি না। প্রথম কামডা তো খুনাখুনিটা থামানো। খুনাখুনির তো হিন্দু-মুসলমান-তপশিল নাই। যে মরে, সে-ই মরে।’ 

মোহিনীমোহন থামলে রসিকলাল বলেন, ‘সেডা তো ঠিক কথা—ওই কথা প্রচারের সময় কি এ—ই? এই কথাডা পর্যন্ত কওয়া যায় যে খুনাখুনিডা বন্ধ হইক। এডাও কওয়া যায় যে সেনসাস নিয়্যা পাকানো দাঙ্গা-হিন্দু মহাসভার আর লিগের। এডাও কওয়া যায়, তপশিলগ জাত-পাত- ধর্ম-সম্প্রদায় তো তপশিলরাই জানে। তালি তাগ ‘হিন্দু’ লেখানোর জন্য মারামারি ক্যান। আর হিন্দু না-লেখানোর লগে খেদাখেদি ক্যান। কিন্তু এই কথাটা কওয়া যায় না শিডিউলরা হিন্দু না।’ 

‘সেনসাস নিয়্যা বিবাদ। অ্যাহন কওয়া যাইব না তো কবে কওয়া যাইব? হিন্দু মহাসভার উদ্দেশ্য তো সামনের বছরের ভোটে সংরক্ষণ কমানো। 

‘তহন কব। কথাডা উঠুক আগে। বাবুরাই তুলব—কংগ্রেসের বা মহাসভার। তহন কব।’

‘ক্যাঁ? কাহা? সব কথাই বাবুরা যাতে কয় তার লগে ছাইড়্যা রাইখব ক্যা? দুটা-একডা আসল কথা তো ড্যাকের ঢাকনাড়ার লাগান আমাগও কইব্যার লাইগব।’ যোগেন একটু হেসেই বলে বোঝাতে যে কথাগুলির পেছনে কোনো রাগ নেই, চিন্তিত আছে। 

সেটা বুঝেই মোহিনীমোহন বলেন, ‘আমি কই কি, সইন্ধ্যা তো লাইগা গেল। মঞ্জু অ্যাহন গোয়ালাপাড়া, শাঁখাটুলি, শাঁখারিপট্টিতে ঘুরান দিক। কাইল সকাল থিক্যা যাতে তোমরা পাড়াগুলাতে ঘুরব্যার পারো, সভা ঠিক না, ওই দল পাকাইয়্যা কথা কওয়া। আর আমরা তিনজন চলো যাই ইউনিভার্সিটিতে আমাগ বামুন-নাস্তিক, কংগ্রেসি কমিউনিস্ট আর জেলফেরৎ প্রফেসরের সঙ্গে এডডু কথা-পরামর্শ কইর‍্যা আসি।’ 

.

যেমন ঠিক হয়েছিল, পরদিন সকাল ১১টা নাগাদ মোহিনীমোহন, যোগেন আর রসিকলাল, মোহিনীমোহনের গাড়িতেই গোয়ালাটুলি গেলেন। ওদের সারাদিনের কাজ আজ গোয়ালটুলি আর শাঁখারিপাড়া ঘোরা। তারপর যদি সাহাদের দু-একজনের সঙ্গে দেখা করা যায়, দেখা করবে। গোয়ালাটুলি-শাঁখারিপাড়া একদিনে শেষ হবে না। একবার কথা উঠেছিল যে সাহাদের সঙ্গেই আগে কথা বলে, যদি সাহাদের কাউকে সঙ্গে পাওয়া যায়, তা হলে সঙ্গে নিয়ে গোয়ালাটুলি ও শাঁখারিপাড়া ঘোরা। তার প্রধান অসুবিধে যে সকালে সাহাদের বাড়িতে পাওয়া যাবে না। তারা গদিতে-গুদামে চলে যাবে। আবার বেলা এগারটা বারটা পর্যন্ত ঘোষদের ব্যস্ততা এত বেশি যে শ্বাস-ফেলার সময় থাকে না তাদের। অগত্যা এটাই ঠিক হল যে দশটা-এগারটা থেকে তারা ঘুরানটা অন্তত শুরু করুক। 

গাড়ি দাঁড়াল নবাবপুরের মোড়ে, গাড়ি নিয়ে গোয়ালাটুলির ভিতরে ঢোকাও যায় না, কয়েকটা রাস্তায় যদি যায়ও কথা বলবে কী করে? 

মঞ্জু মোড়ে দাঁড়িয়েছিল, কয়েকজনকে নিয়ে, রাস্তার উলটোদিকে। এঁদের দেখে তারা সবাই এদিকে চলে আসে। ‘এরা তো কয়, জনসভা হইলেই ভাল, মনে একটা জোর আসে’। 

যোগেন বলে, ‘জনসভা ডাকো। জনসভা হব। অ্যাহন এডডু পদসভা কইর‍্যা নেই। চলো গিয়া? আগাও।’ 

তিন-চারজন ভার-ভারিক্কি বাবু নবাবপুরের গলি দিয়ে যাচ্ছে—এটা খুব একটা রোজকার দৃশ্য নয়, এখন তো আরো না। দু-একজন তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে বোঝাও যে আরো আছে এদের সঙ্গে, তাদের মুখগুলো খুব অচেনা না। 

যোগেন এটা খেয়াল করেছিল। মোহিনীমোহন মাঝে-মাঝে হাত তুলছিলেন, দু-একবার নমস্কারও করলেন। যোগেন আন্দাজ করে, লোকজনের চোখ পড়ছে, মোহিনীমোহনের কারণেই। মিনিট পাঁচ-সাত হাঁটতে-হাঁটতেই দলটা তিন টুকরো হল। মঞ্জু কয়েকজনকে নিয়ে এগিয়ে গেল, বোধহয় কোথায় দাঁড়িয়ে বা বসে কথাবার্তা হবে সেটা ঠিক করতে। 

মাঝখানে ডাক্তারের সঙ্গে যোগেন আর রসিকলাল। ডাক্তার রসিকলালকে বলে, ‘শুঁকছ? বাতাসে কেমন পবিত্তর গন্ধ। ঘুমের মইধ্যে নাকে লাগলে গোয়ালাটুলি চেনা যায়।’ 

‘কোনডা পবিত্তর ঠেকে বড়জ্যাঠা? কাঁচাদুধের গন্ধ না গোবরের?’ যোগেন জিজ্ঞাসা করে বটে কিন্তু বোঝা যায় না একটু ঠাট্টা মেশাল কী না!’ 

‘তা যদি কও, তালি চোনা ক্যান বাদ দিব? চোনাও তো পূজায় লাগে। পবিত্তর। গন্ধডা ও ঝাঁঝাল,’ রসিকলাল বলেন, ‘অ্যাড্ডা সত্যিকথা যোগেন, আমরা তো টাউনের মানুষ হইয়্যা গিছি। কইলকাতা। আর যশোর। তোর অবিশ্যি তা না। তোক তো মৈস্তারকান্দি-আগৈলঝরা যাইতে হয়। ডাক্তারবাবু তো ঢাকা-কইলকাতা—’ 

ডাক্তার বলেন, ‘আরে আমাগ তো টাউন গজাব্যার ধইরছে কচুবনের নাগাল। কইলকাত্তা আর যাওয়া হয় না। নারানগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর তো ফনফনাইয়া বাড়ত্যাছে।’ 

রসিকলাল বলেন, ‘তা তো বাড়ত্যাছেই, যুদ্ধের টাইমে য্যান বেশি। দ্যাশের বাসডা নাক থিক্যা সইরা যায় না? এই-যে অ্যাহন মনে হইল, এই মিশাল-বাসডা— দুধ-গোবর-চোনার বাসডা নাকে লাগতেই মনে আইল ক্যা বাসডা ভুল্যা গিছিল্যাম।’ 

‘কাহা, এডা ক্যাম অন্যায্য কথা। বউবাজারের মোড়ে ছানাপট্টির পচা ছানার গন্ধে তো নাকে কাপড় দেয়ার লাগে—’  

‘কই কাঁচা দুধ, গোবর আর চোনার কথা! আর তুই কস ছানার কথা? বউবাজারের ছানাপট্টির গরুগুল্যা কি দুধরে একেবারে ছানা বানাইয়্যা দ্যায়?’ রসিকলাল বলেন। 

‘না, তাই কই, আপনে য্যান ক্যামন ঘটিগ নাগাল কইলেন গন্ধের কথাডা, তাই কই—’

‘আমি তো ঘটিই রে, যশোর না?’ 

‘হ্যাঁ, হ্যা, আমার আর যোগেনের গৌরনদীর তুলনায় যশোররে বিলাত কইতেই-বা কী? ‘ ডাক্তার নিজেই হাসেন, রসিকলালও হাসেন। 

দু-তিনজন লোক একজনের ফতুয়া গায়ে, বাকিদের খালি গা, একটু দূর থেকেই নমস্কার করতে থাকে, ‘আরে, কাম দেখছ নি, ডাক্তারবাবু সদলবলে প্রাতঃকালে। খবর দ্যায় নাই তো ছ্যামরাগুল্যা।’ পৌঁছে, ওরা সকলেই এই তিনজনকে ভক্তি দেয়। 

ডাক্তার বলেন, ‘খবর কী দিবে? তোমরাই তো সব খবরের মাথায়। রাইত-দিন শুধু দাঙ্গা বাধাও।’ 

‘কন কী ডাক্তারবাবু? আমাগ লগে দাঙ্গা কইরব কেডা? আপনারা চলেন দুই পা আগাইয়্যা এডডু বসেন—’ 

ডাক্তার কথাটা ছাড়েন না, ‘তোমরাই তো আগ বাড়াইয়্যা পায়ে পা লাগাইয়্যা কাইজ্যা বানাও। আর তার ঠেলা গিয়া ধাক্কা দ্যায় মফস্বলে। সেহানে তো তোমরা নাই। এহানে যাগ মার, তারা গিয়্যা সেহানে তোমার স্বজাতগ মারে, গাঁও থিক্যা খ্যাদায়, কয় যে তোমরা গিয়্যা নিজেগ হিন্দু লিখাইবা আর আমাগ ভোটে হারাইবা।’ 

এদের যেখানে নিয়ে যেতে চাইছিল, সেই একটু ফাঁকা জায়গা এসে পড়ে। তিনদিকে গোয়াল আর-একদিকে রাস্তা-ঘেরা ফাঁকা জায়গা। কোথা থেকে দু-তিনটি পিঠসোজা প্যাঁচানো লোহার চেয়ার এনেছিল। এঁরা সেটাতে বসলেন। ভিড়টা একটু ঘন হল। সেই একটুখানি চুপের মধ্যে পরপর অনেকগুলো গরু একের পর এক হাম্বা ডাকতে লাগল। ভিড়ের ভিতর থেকে একজন ধমকে ওঠে, ‘পাইছে মাইনষের গন্দ, অমনি জুড়ছে হাম্বা। এগ লাইগ্যা তো মানুষজনের লগে কথা কওয়া যায় না।’ ধমকটাকে আরো চড়িয়ে সে হেঁকে ওঠে, ‘চুপ যা হগগলে।’ 

ডাক্তার তখন বলছেন, ‘দোলখেলার দিন তো আগে-আগে দোলমঞ্চ বানাইয়্যা বেবাক মানুষরে মিষ্টি বিতরণ কইরত্যা। অ্যাহন সেইসব ইষ্ট কর্ম বাদ দিয়া বাইছ্যা বাইছা মুসলমান মাইয়াগ রং দিয়্যা দেশজুড়া একডা হাঙ্গাম বাধাও? এই যে দুইজনই আমাগ স্বজাতের নেতা, আইনসভার মেম্বার, তোমাগ শায়েস্তা কইরব্যার আইসছেন।’

পেছন থেকে টাকমাথা বাবড়ি চুলের এক বুড়ো মত মানুষ তাঁর দাঁড়ানোর জায়গা থেকে হাত জোড় করে বলেন, ‘পেনাম ডাক্তারবাবু আর মেম্বারবাবু, আপনারা তো হগলেই জানেন ঘোষেগ যে-বয়সে বুদ্ধি হওয়ার কথা সে-বয়স পর্যন্ত ঘোষরা সবাই বাঁচে না। আমাগ মইধ্যে নির্বুদ্ধিয়াই বেশি। আপনারা আইজ যা বুঝাবেন সেডা বুইঝতেও টাইম লাগব। তাই কই, দুপুরের আহারের ব্যবস্থাডা এই হানে হোক। এগ যা বকাঝকা কইর‍্যা আপনারা ঘুরানে বাড়ান। ফিরা দুপুরের সেব্যা নিয়্যা আবার ওই একই রাস্তায় ঘুরান দিয়া দ্যাহেন যে শিক্ষা সকালে দিলেন, সেডা বিকালে কয়জনের মনে আছে?’ 

‘স্যায় তো ভাল প্রস্তাব। তালি কয়জনরে আগুরি পাঠান পরের বসার জায়গা ঠিক কইরব্যার লাইগ্যা। আপনাগ সঙ্গে দুইগা কথা কইয়্যা আমরা অগ পাছ নিব।’ যোগেন বলে। 

‘আপনাগ কেউ উঁচা হিন্দু নাই তো? আমাগ হাতে খান তো?’ সেই বৃদ্ধই জিজ্ঞাসা করেন।

‘কইল্যাম না? আমাগ স্বজাত মেম্বার। এনার নাম রসিকলাল বিশ্বাস, এমএলএ, তার থিক্যাও পুরানা ভাইস-চেয়ারম্যান যশোর মিউনিসিপ্যালিটির। পুনাচুক্তির সইদার। আর এনার নাম যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। জেনারেল সিটে বরিশালে কংগ্রেসরে হারাইয়া সারা দেশে, ভারতে একমাত্র, শিডিউল প্রার্থী যে জিতছে।’ হৈ হৈ করে হাততালি পড়ল। ডাক্তারবাবু বলে চললেন, ‘আমার তো উভয়সংকট। আমার পার্টি কংগ্রেস হাইরছে তার লাইগ্যা দুঃখ। নিজে হারছি তার লাইগ্যা দুঃখ। কিন্তু যোগেন এমন জিতা জিতছে যে খুশি না-হইয়্যা পারি না। 

আবার একটা জয়ধ্বনি উঠল। রসিকলাল যোগেনকে বলেন, নিম্নস্বরে, ‘তুই ক। দাঙ্গা থামাইতে ক—আমাগ কী কী ক্ষতি হইব দাঙ্গায়—ক। আর হিন্দু মহাসভার কথা ক। আমরা হিন্দু না কইস না। ভাব দেইখ্যা নেই। হিন্দু মহাসভার উস্কারে লাগে এমন কাম কইরতে না ক।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *