১৫৩. পাটও কী করে হারানো যায় তার শলা
শেষ পর্যন্ত কৃষিমন্ত্রী তামিজউদ্দিনের ডাকা পাট সম্মিলন বসল শনিবার ৪মে। তমিজউদ্দিন শাহেবের কাজের কোনো দোষ ধরা মুশকিল। কথা ছিল, পাশাপাশি আরো যে-সব প্রদেশে পাট চাষ হয়, তাদের কৃষিমন্ত্রী বা সমস্যাটা জানেন, এমন কোনো সিনিয়ার অফিসারদের নিয়ে একটা সম্মিলন করা হবে একটা বিষয়েই কথা বলার জন্য পাটের একটা ন্যূনতম দর এই সবগুলো প্রদেশে একসঙ্গে, বেঁধে দেয়া যায় কী না।
এ-সম্মিলনে সব এমএলএকে নেমন্তন্ন দেয়ার কোনো মানে হয় না, এত বেশি সন্নেসিতে গাজন আর বাঁচানো যাবে না। প্রত্যেকেই তো কথা বলবে- পরের দিনের কাগজে তার কথা কী বেরবে, সেটা ভেবে। জনসভায় যদি সরকারি আইনকানুন ঠিক হয়, তাহলে বক্তৃতায় গেরস্তদের চোখের জলের বন্যাকে কতটা বওয়াতে পারবে—সেটাই হবে প্রধান উদ্দেশ্য। পাঠের দর বাঁধলে এমএলএদের ক্ষতি নেই, বরং, লাভই আছে। কিন্তু তাদের মেম্বাররা বেঁধে দিতে চাইছেন—এটা রটিয়ে দিলে অন্তত ভোটটা বাড়বে।
তমিজউদ্দিনশাহেব এই সব এমএলএকে বা এমএলসি-কে ডাকেননি। ডেকেছেন, শুধু জুট গ্রোয়িং এরিয়ার এমএলএদের। যাঁদের ডাকেননি তাঁদের উনি আলাদা চিঠিতে বলেছেন, ইচ্ছে করলে তাঁরাও আসতে পারেন বা তাঁদের পরামর্শ জানাতে পারেন। যোগেনকে ডেকে পাঠিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আপনে কিন্তু ডুবায়েন না। যা ভাবেন, তা লিইখে আনবেন। এতগুলা শাহেব তো, জুটমিলের আর গভর্নমেন্টের, পেটে-পেটে সবগুল্যার তো নিজের কোলে ঝোলটানা। তাগ একডু ধমকাইয়্যা রাইখতে লাগব না?’
‘ধমকের মানুষ যেমন বাইছছেন, তাতে তো আপনার জিতার কোনো আশা দেখি না।’
‘দ্যাহেন মণ্ডলমশায়, আমারে ডর খাওয়াবেন না। আপনি কিন্তু অ্যাবসেন্ট করবেন না। তাছাড়া আপনার কথার একটা আলাদা ক্রেডিবিলিটি আছে।’
‘ক্রেডিবিলিটি? তাইলে তমিজ ভাই কন, উন্নতির আশা আছে। ক্রেডিবিলিটা কি শুনা যায়?’
‘ক্যান শুনা যাবে না? আপনের উপরের চৌদ্দ পুরুষে বা তলার চৌদ্দ পুরুষের কেউ পাটিদারি করে নাই। কেউল পাটের চাষিও না, চাষিও না। পাটের শেয়ার নাই। পাটার বর্গাদারিও নাই। আপনে অফিসারও না। পাইকারও না। তাইলে আপনে যেইডা কইবেন সেইডার ওজন আলাদা হয় না?’
‘তমিজ ভাই, এই কথাটা ঠিক না। ক্রেডিবিলিটির একটা আইনি মানে আছে। এই ঘটনায় তোমার স্বার্থ কী?’
‘এটা তো গভর্নর জেনারেলও বলাকওয়ার সাহস পাবে না। বাংলার কৃষকদের ভাল হলে সেটা আমার ভাল না? খারাপ হইলে আমার খারাপ না? একটু ভাইব্যা আইসবেন। কারো মাথা থিক্যা তো কোনো নতুন বুদ্ধি বারায় না, যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে।’
‘কে সাপ আর কে লাঠি—এইডা সাবুদ তো?’
তমিজউদ্দিন হো হো হেসে বলে—’সেইটা কখনো হয়? এই আপনার বরিশাইল্যা বুদ্ধি? বরং উলটায়্যা লন কথাডা—একডা সাপের গায়েও য্যান আঘাত না লাগে কিন্তু লাঠি ঘুরানোর বোঁও বোঁও আওয়াজ য্যান না নামে। জুটমিলের শাহেবরা এক সাপ, তাগ বিলাতস্থিত মহাজনগণ অদৃশ্য সাপ। তাগ এতদ্দেশীয়, এজেন্ট-পাইকার-আড়তদার-পাইকার-ফাটকার-দালাল, এগুলা খুবই সুদৃশ্য সাপ। জোতদার বা জমিদার বা ইনামদাররা হতেছে সেই সাপ যারে যে-দেখে সেই একডা ঢিল মারে। সুলভ সাপ। জুটমিলের বিলাইতি মহাজন যেমন অদৃশ্য, এপারেও তেমন একডা অদৃশ্য আছে। সেডারে কেউ কোনো কালে দ্যাখে নাই, কিন্তু সবাইই তার নামে ফুল ছিটায়। আপনাগ গণেশ ঠাকুরের মত। পাটচাষি। চাষিডা যে কে তা ঠাহর নাই কিন্তু তারে বাঁচাইতেই এক কাণ্ড’
শনিবার সকালে কাউন্সিল হাউসের হলে এসে যোগেন দেখে শাহেবে-শাহেবে ছয়লাপ, এত শাহেব যে তাকেও কেউ ‘শাহেব’ দেখতে পারে। সারওয়ারদি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাতটা একটু তোলে। যোগেন তাকে বলে—’আমাগ বাখরগঞ্জের চাষিগ আইন্যা, এই মেলাডা দেখাইলেন না শাহেব, বুইঝত কারে কয় পাট।’ সারওয়ারদি কলকাতার বাইরের বাংলাটাকে ম্যাপ হিশেবে চেনে—পূর্ববঙ্গ তো দূরস্থান, কলকাতার বাইরে কোনো বঙ্গই তার কাছে বিলেতের চেয়ে কাছে নয়। ওদের বাড়ি তো না কী মেদিনীপুরে। বাংলা বলতে তো পারেই না, বুঝতেও পারে না। সারওয়ারদিকে পেয়ে তাকেই কথাটা বলে ফেলল—বৃথা গেল। সারওয়ারদি দু-পা দূর থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁত দেখিয়ে হাসল। দু’পা এগিয়ে না গেলে দাঁত দেখাত না—শুধু ঠোঁটেই সারত। সারওয়ারদিকে দেখা যাচ্ছে—শাহেবদের সঙ্গে কেমন সহজে কথা বলছে, হাত তুলে কিছু বলছে, কোমর ভেঙে জোরে-জোরে হাসছে। যোগেন একটু নরমই হয়, একা-একাই—আচ্ছা, ওর ভাষা যদি হয় ইংরেজি, ও তো ইংরেজিতেই সহজ হবে, ইংরেজি দিয়ে মেলামেশায় ওর ভাল লাগবে, ও যে বাংলা জানে না সেটা তো আর ওর দোষ না। এতটা ভেবে ফেলেও যোগেনের মন থেকে কাঁটাটা যায় না—যেন সারওয়াদির কিছু একটা দোষ আছে। যোগেন নিজের ভুল শুধরে ভাবে—সারওয়ারদি শাহেব তো সবরকম মানুষের সঙ্গেই মিশতে পারে অনায়াসে। সে নিজেই দেখেছে, খিদিরপুরের ডকের লসকরদের সঙ্গে আবার তেলেনিপাড়ার চটকলের মজুরদের সঙ্গেও।
কিন্তু আর কাউকে তো দেখছে না, মেম্বার বা মন্ত্রী। নিশ্চয়ই আরো কোথাও হয়তো ভিতরে ঢুকে গেছে। যোগেন এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই সকলেই যেন হলে ঢুকতে শুরু করে—নিশ্চয়ই ভিতরে ডাকা হয়েছে। গভর্নর ওপেন করবেন, সুতরাং আধঘণ্টা আগে তো চেয়ারে বসতেই হবে। তারা আইনসভায় আসার পর কোনো গভর্নরই যেন টেকে না। অ্যাডারসন শাহেব ছিলেন মোট পাঁচ বছর, যোগেনরা আসার পর বছর খানেক। ব্রেবোর্ন শাহেব তো মরেই গেলেন। তারপর অ্যাকটিভ হলেন রেইড শাহেব। তারপর আবার এক অ্যাকটিভ—তাকে যোগেন দেখেইনি। এখন এসেছে হাবার্ট–এর তো কী এক অপারেশনের সময়ও হোমে গেল না, এখানেই করালো, তার ওপর যুদ্ধটুদ্ধ বেঁধে গেছে, মনে হচ্ছে এ কিছুদিন থাকবে।
হলে ঢুকে যোগেন একটু চোখ ঘুরিয়ে দেখে চেনাজানা কে কে এসেছে। নলিনী সরকার। কিরণশঙ্করবাবু। নিশীথ কুণ্ডু। পুষ্পজিৎ বর্মা। চারু রায়—মৈমন সিং-এর মুখতার শাহেব। জনাব আলি মজুমদার। মন্ত্রীরা সবাই নেই।
যোগেন একটা ফাঁক পেয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। হলটা অনেক বড়। তুলনায় লোক কম। যোগেন যেন বসার সঙ্গী খুঁজছিল। আর না-খুঁজে বসে পড়ল।
সবার বসা হয়ে গেলে দেখে মনে হল মাত্র এই কজনকে ডেকেছে—পাট নিয়ে সরকারি নীতি ঠিক করতে? অবিশ্যি একটা কিছু শুরুর পক্ষে এমন ছোট মিটিংই ভাল—তারপর, যাই ঠিক হোক, আইনসভা ও কাউন্সিলে তো যাবেই। রাস্তাঘাটেও মিটিং হবে। তখন তো আর এই শাহেবদের পাওয়া যাবে না—যারা পাটের বাজারের মালিক।
এক মার্শাল এসে টাইপ-করা একটা কাগজ দিয়ে গেল। পার্টি সিপ্যাস্ট্রস। শাহেব এমএলএদের সবাইকে ডাকেনি। বর্ধমানের আর্মস্ট্রং শাহেব নেই। দার্জিলিঙের প্যাটন শাহেব ও নেই। হুগলি-হাওড়ার ওয়াকার শাহেব আছেন—জুটমিলের নেতা। বেঙ্গল চেম্বারের স্টাড শাহেব, আইজেএমএ-র কেনেডি, ন্যাশন্যাল চেম্বারের নলিনীবাবুর সঙ্গে স্যার হরিশংকর, ইন্ডিয়ান চেম্বারের খৈতান, মারোয়াড়ি অ্যাসোসিয়েশনের রায়বাহাদুর, মুসলিম চেম্বারের সিদ্দিকি শাহেব, ট্রেডস অ্যাসোসিয়েশনের দুজন হ্যামিলটন আর নর্টন শাহেব, নুরুদ্দিন, ইস্পাহানি, আদমজি।
এসব মিটিঙে যা হয়—জোরে কেউ কথা বলছিল না। কিন্তু কথা বলার একটা গুঞ্জন ছিল।
গুঞ্জন হঠাৎ থেমে গেল, দরজা খুলে গেল, একটা লম্বা দণ্ডের মাথায় একটা ইউনিয়ন জ্যাক ঝুলিয়ে উঁচু একটা লাল পাগড়ি মাথায় এক বরকন্দাজ ঢুকতে-না-ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। যোগেনও, যথারীতি একটু পরে।
যোগেন অনেক চেষ্টা করেছে, দরজা খোলার আগেই কী করে সবাই টের পেয়ে যায়, দরজাটা এবার খুলবে। আর টের পেয়েই সবাই দাঁড়িয়ে পড়ে। বুঝেও দেখে যোগেন যখন দাঁড়াতে যায়, তখন হয় সে স্যান্ডেলের এক পা-টি পায়ে খুঁজে পায় না, নয়তো পাঞ্জাবির পকেট হাতলে আটকে যায়, নয় তো হাতে ধরা কাগজগুলি মেঝেতে পড়ে যায়। যোগেন এটাকে শারীরিক ব্যাপার ধরে নিয়ে শোধরাবার চেষ্টা করে বুঝেছে, এটা কোনো শারীরিক ব্যাপার নয়। কই, কোর্টে তো হয় না? জজশাহেব ঢোকার আগেই যোগেন স্বয়ংক্রিয়তায় দাঁড়িয়ে পড়ে। কী করে বোঝে? কোর্ট বেশি চেনা বলে? বেশি চেনা আবার কী? যোগেন তারও পর ভেবেছে, দরজা থাকলেই, মানে দরজা বন্ধ থাকলে ও যিনি ঢুকলে দাঁড়াতে হবে তাঁর ঢোকার জন্য দরজাটা বিশেষ করে খুললেই এই গোলমালটা তার হয়। দরজা যখন খোলা তখনই তো সে ঢোকে। তার মানে কী? দরজাটা তার মাথায় থাকে না? তা কেন থাকবে না? সে কি বন্ধ দরজা ঠেলেও ঢোকে না? ঢোকে বৈ কী? তার কি এটা মনে থাকে না যে সে ঢুকে চেয়ারে বসলেই তার মিটিঙে ঢোকাটা শেষ হয়ে যায় না? বরং, ঠিকভাবে ধরলে, তখনই তার মিটিঙে ঢোকা শুরু হল ও মিটিঙের প্রধান হলে ঢোকার পর যোগেনের মিটিঙে প্রবেশ শেষ হয়। তাও বোধ হয় না। শেষ কি এত আগে হয়? যাই হোক, যোগেনকে এটা নিজের কাছে স্বীকার করে নিতে হয়েছে, কোনো শারীরিক কারণে বা স্বভাবগত বেঠিকপনায় তার এই আচরণের ত্রুটি ঘটে না। এটা তার ত্রুটিই। কারণটা নিশ্চিত না জানলে সে নিজেকে সারাবে কী করে? এই হলে, এখনই, সবাই যখন দাঁড়াল, তখন তো দরজাই খোলেনি। তারা দাঁড়ানোর পর, বা যোগেন দাঁড়াবার পর, দরজা খুলল ও বরকন্দাজ ঢুকল। যারা ঢুকল তাদের সবারই পা-ফেলা একটা অশ্রুত তালে ঘটে, লাটশাহেব ছাড়া।
লাটশাহেব বসার পর সবাই বসে। লাটশাহেব তখন দাঁড়ান ও তাঁর এডিকা পেছন থেকে, মনে হয় রুপোর, একটা ট্রে এগিয়ে দেয়। তার ওপর একটা কাগজ ছিল। লাটশাহেব সেটা তুলে পড়তে শুরু করেন, ‘লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন। আমার সরকারের কৃষিমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী মিলে বাংলার অর্থনীতিতে পাট সমস্যা নিয়ে এই যে সম্মিলন ডেকেছেন, তাতে আমি আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আমার মন্ত্রীরা আমাকে জানিয়েছেন, পাট উৎপাদন ও পাট বিক্রির সঙ্গে কোনো-না-কোনো ভাবে জড়িত ৪২টি সংগঠনের প্রতিনিধিদের তাঁরা ডেকেছেন। তাঁরা এও জানিয়েছেন যে নিমন্ত্রিতদের মধ্যে, খুব কম সংখ্যায় হলেও, কেউ কেউ আছেন, যাঁরা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত নন কিন্তু ব্যক্তিগত স্তরে এই সমস্যাটি নিয়ে চিন্তিত। আমি তাঁদেরও স্বাগত জানাচ্ছি। আমার ও আমার সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে পাটের সর্বনিম্ন দর ও সর্বোচ্চদর নিয়ন্ত্রণ, পাট রপ্তানি, হেশিয়ান উৎপাদন ও পাটচাষের বিস্তার নিয়ে যে-সমস্যা দেখা দিয়েছে সে-বিষয়ে আপনারা আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে খোলা মনে পরামর্শ দেবেন ও আমরা সেই পরামর্শগুলিকে প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের অধিকারভুক্ত ব্যবস্থায় পরিণত করব। এই প্রসঙ্গে এইটুকু আপনাদের মনে রাখতে অনুরোধ করি যে বাংলার পাটের মত নগদ ফসল নিয়ে আমাদের পূর্ববর্গ প্রশাসক ও অনেক চিন্তাভাবনা করেছেন। তাঁরা বাংলার পাটচাষিদের মঙ্গল চেয়েছেন, পাট-ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষজনের আর্থিক নিরাপত্তা চেয়েছেন, যাঁরা পাট থেকে চট বানান তাঁদের আয় বৃদ্ধি চেয়েছেন ও রপ্তানি ব্যবসায় যাতে বাড়ে তার জন্যও চিন্তা করেছেন। তাঁদের এই চিন্তার সঙ্গে আমাদের বর্তমান কালের একটা বিশেষ তফাৎ আছে। তফাৎ এইখানে যে বাংলায় এখন ক্ষমতায় আছে এক নির্বাচিত সরকার আর সেই নির্বাচনে এই সরকার তৈরি হয়েছে প্রধানত কৃষকদের ভোটে। বাংলার কোনো সরকার এটাকে শুধুই একটা তাত্ত্বিক সমস্যা বলে দেখতে পারে না। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন যাঁরা এই ভোটে সরাসরি নির্বাচিত। আরো কেউ কেউ আছেন যাঁরা এই ভোটে পরোক্ষত নির্বাচিত। এমনও অনেকে আছেন, যাঁরা পাট উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত না হলেও, পাটবিক্রির রপ্তানিসহ, সঙ্গে জড়িত। আরো এমন কেউ কেউ আছেন, যাঁরা পাট থেকে চট বানাবার শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। আমরা সকলেই কিন্তু নামহারা সেই কৃষকদের কাছে বাধ্য যে এই বাংলার শস্য-শ্যামল প্রান্তরের আনাচে কানাচে বাড়ির লোকজনের খাটনিতে এই পাট চাষ করছে। পাট বাংলার একমাত্র নগদ ফসল। পাট বিক্রি করেই কৃষক তার জীবনযাপনের নগদের প্রয়োজন মেটায়—সেটা মেয়ের বিয়েই হোক, বৌয়ের শাড়িই হোক আর বুড়ো বাবার চিকিৎসাই হোক। পাটের ন্যূনতম ও উচ্চতম দর বেঁধে দিলে আবার চটকলগুলির ক্ষতি হবে। আমরা তো শিল্পের বিনিময়ে কৃষি চাই না, কারণ পাটের ন্যুনতম দরে পাটচাষি বাঁচলেও, চটকলগুলির ক্ষতিপূরণ হবে না। আমরা নিশ্চয়ই কৃষির বিনিময়ে শিল্প চাই না, কারণ হেশিয়ানের বিক্রি ও দর বাড়ালেও সেই বৃদ্ধি তো কৃষককে কোনোভাবেই সাহায্য করবে না। তার ওপর পাটের একটা ‘দাদনি বাজার, ফিউচার মার্কেট তৈরি হয়েছে বা অনেক দিন থেকেই নামে-বেনামে আছে। সবচেয়ে কঠিন সময়ে কৃষকের জমির আগামী পাট বিক্রি হয়ে থাকে। সেই দাদনি বাজার চড়া কী ঠান্ডা, তার ওপর নির্ভর করে পাটের ওপর নির্ভরশীল কোম্পানিগুলির শেয়ারের দর। অনেক এমন কোম্পানির হেড অফিস এখন লন্ডন। তাঁরা পাটশিল্প বা পাটচাষের কিছুই জানেন না বা বোঝেন না, শুধু শেয়ারের লভ্যাংশ চান। ডিভিডেন্ড না পেলে তাঁদের দিনকাটানো বা মাসকাটানো সম্ভব নয়। তেমন ক্রেতা এদেশের আছে। এটাও কিন্তু ভাবার মত কথা-পাট কোম্পানি বা চা কোম্পানির লভ্যাংশের ওপর ভদ্রশ্রেণীর অনেক পরিবারের অসহায় অকাল-বিধবা ও কুলিন-কুমারীদের জীবনযাপনের সম্মান রক্ষিত হয়। আপনারা কী বিচার করবেন ও সরকারকে কী সুপারিশ করবেন, সে-বিষয়ে আমি কোনোভাবেই আপনাদের প্রভাবিত করতে চাই না। আমি শুধু চাই, আপনারা আপনাদের মত করেই ভাবুন। কিন্তু ভাবুন। এটা তো একটা মজার ব্যাপার যে মাত্র সত্তর-পঁচাত্তর বছর আগে যে-পাট চাষ বাংলার কৃষকদের আওতায় এসেছিল— এইটুকু সময়ের মধ্যেই সেই পাট হয়ে উঠেছে সেই হাঁস যে রোজ একটা করে সোনার ডিম পাড়ে। এইটুকু সময়ের মধ্যেই সেই একটি সোনার ডিমের এত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ভাগীদার জুটেছে যে তাদের মধ্যে এমন কেউ এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পড়তে পারে যে তার পেটের সবগুলো সোনার ডিম অন্যদের ঠকিয়ে হাতড়াতে গিয়ে সে শেষ পর্যন্ত হাঁসটাকে মেরেই ফেলল। আমি জানি, আপনারা এ-বিষয়ে খুবই সচেতন যে হাঁস কিন্তু একটাই ও তার ডিমপাড়ার রেশনও কিন্তু বাঁধা—দিনে একটা, ও তার সেই ডিমের মর্যাদাও কিন্তু একই থাকতে হবে—সোনার ডিম। আপনাদের ধন্যবাদ।
চাপা একটা হাততালি অনেকক্ষণ ধরে চলে। এটা শাহেবদের হাততালি। যতক্ষণ পর্যন্ত না এটা প্রত্যেকের মর্মে পৌঁছয় যে হাততালিটা সম্মতি বা আপত্তিসূচক কিছু নয়। হাততালিটা একটা প্রথা, পদ-অনুযায়ী সেই প্রথাপালনের রীতি জেনে নিতে হয়। হিজ এক্সেলেন্সির জন্য দীর্ঘ করতালি। এক ভাইসরয়কে তার চাইতে বেশি সময় দেয়া যায়। গ্রেট ব্রিটেনের কোনো মন্ত্রী এলে পাবে ভাইসরয়ের সমান সময়। রাজা বা রাজপরিবারের কারো জন্য সময় ধরা নেই, দিয়ে যেতেই হবে।
তমিজউদ্দিন শাহেব দাঁড়িয়ে লাটশাহেবকে ধন্যবাদ দিলেন, তিনি তাঁর অনেক দরকারি কাজ সত্ত্বেও এই সম্মিলনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন ও তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়েছেন। এখন আমরা নিশ্চয়ই তাঁর কথা অনুযায়ী কাজ করতে পারব।
কোনো শাহেবের গলায় শোনা গেল, ‘অ্যাডভাইস অর কশন?’ সঙ্গে-সঙ্গেই লাটশাহেব উঠে দাঁড়ালেন ও বরকন্দাজের নেতৃত্বে মিছিল শুরু করলেন। মিছিলের আর সবাই মেপেঝেঁপে পা ফেলেন। এক লাটশাহেবেরই তালছাড়া।
লাটশাহেবের প্রস্থানের পর চা-পানের সময়ও বোঝা যায়নি। কনফারেন্স শুরু হতেই তমিজুদ্দিনের প্রস্তাবে সারওয়ারদি সভামুখ্য হয়ে এত তাড়াতাড়ি ক্যালক্যাটা ট্রেডস অ্যাসোসিয়েশনের নর্টন শাহেবকে ডাকলেন, যেন মনে হল, আগে থাকতেই ঠিক ছিল। শাহেবরা আন্দাজ দিতে চাইছে, সরকার কি কিছু ঠিক করে রেখে তাদের গেলাতে চাইছে। নইলে নর্টন কেন? নর্টনের কথা সবচেয়ে বেশি লোক জানে—সে ফাটকা খেলে পাট নিয়ে সুতরাং সে চায় সরকার এই মুহূর্তে ‘দৃঢ় হস্তে’ বাজারে হস্তক্ষেপ করে মার্কেট ফোর্সকে স্বাভাবিক করে দিক, যাতে সেই বাজার দেশী-বিদেশী চেম্বারগুলির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয় ও যাতে বাজার নিয়ে যাদের কারবার সেই ব্যবসায়ীরা খোলা মনে ও খোলা হাতে বাজারে খেলতে পারে। নর্টন শেষ করে বেশ রেগে গিয়ে—’চেম্বারগুলো নাক গলায় কেন পাটের বাজারে? কত কীই তো বাজারে ওঠে। সে-সব কি কোনো চেম্বারের অধীনস্থ?’
সারওয়ারদি ডাকলেন, ইন্ডিয়ান চেম্বারের খৈতানকে। যোগেন সারওয়ারদির মিটিং-চালানোর দক্ষতা জানে। শাহেবদের অনেকেও হয়তো জানে। গবর্মেন্ট কী চায়, সেটা সবাই জানতে বা আন্দাজ করতে চায় বলেই সারওয়ার্দি প্রথমে নর্টন শাহেবকে ও তারপর খৈতানশাহেবকে ডেকেছে। যার যা তাস, টেবিলে ফেলো।
ইন্ডিয়ান চেম্বার মোটেই চায় না যে সরকার পাটের বাজারে নামুক। নামলে কত দরের কমে পাট আর কেনা যাবে না সেটা চেম্বাররা ঠিক করতে পারবে না, করবে গবর্মেন্ট অফিসাররা। কিন্তু খৈতানশাহেব খেললেন, উলটো দান। ঠোঁটটোট বেঁকিয়ে, গলা উঁচুনিচুতে খেলিয়ে বিরক্তি জানিয়ে বললেন, ‘সরকার কোথায় নাক গলাবেন আর কোথায় গলাবেন না—সেটা ঠিক করে দেয়ার আমরা কে? সেটা সরকারকেই করতে হবে। সরকারের এতরকম ডাক্তার আছে, বৈদ্য আছে, সার্জেন আছে, তারা বলে দিক কতটা ঢোকালে নাকে ফোস্কা পড়বে আর কতটা ঢোকালে পড়বে না।’
একটু হাসি উঠল। খৈতানশাহেবও হাসলেন। তারপর হিন্দিতে বলে উঠলেন, কেন কে জানে, ‘আরে ভাই, নাক এক আদমির, আগ ঔর এক আদমির ঔর দাওয়াই ঔর ঔর এক আদমির—তো হাম কেইসেঁ বলোঁ, নাককো কেতনা তক নাশক হোগা।’
হাসি ও হাততালির মধ্যে খৈতান বসে পড়েন।
সারওয়ারদি বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে ডাকে, ‘মিস্টার সিদ্দিকি, মুসলিম চেম্বার অব কমার্স।
সিদ্দিকি দাঁড়াবার আগেই বেঙ্গল চেম্বারের স্টাড শাহেব দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলেন, ‘আমার এতে খুব আপত্তি আছে। মুসলিম চেম্বার বলে একটা প্রতিষ্ঠান ঠিক ভোটের মুখে-মুখে তৈরি হয়। কারা এটা তৈরি করেছেন ও তাদের উদ্দেশ্য কী সেটাও আমাদের সকলের জানা। সরকার ও সরকারের প্রধানদলের সঙ্গে এঁদের সুসম্পর্কও সকলের জানা। ভোটের মুখে এই সংগঠনকে মর্যাদা দিয়ে তাদের জন্য আইনসভায় একটা আসন বরাদ্দ করায় নানা দিক থেকে আপত্তিও করা হয়েছিল। এমনকী, ব্যবসা-বাণিজ্যের চেম্বারকে ‘মুসলিম’ এই সাম্প্রদায়িক নাম দেয়াতেও আপত্তি ছিল। আজকে পাটসংক্রান্ত এই অত্যন্ত বাছাই করা লোকদের মিটিঙে ‘মুসলিম চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি বলে কাউকে ডাকা ও কথা বলার সুযোগ দেওয়া ঠিক কাজ নয়।’
সারওয়ারদি ঘাড় ঘুরিয়ে সব দিক দেখে, কেউ দাঁড়ায়নি, হাতও তোলেনি। সারওয়াদি ভেবেছিল, কেউ নিশ্চয়ই পাল্টা কথা বলবে। কিন্তু স্টাড শাহেব যা বলেন তা না ভেবে বলেন না আর বেশ কড়া ধাঁচের মানুষ, এমন একটা ধারণা চালু আছে। আবার সিদ্দিকি শাহেবের আধুনিকতা, আইনসভা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও একটা মান্য ধারণা প্রচলিত। এ নিয়ে কারো পক্ষে কথা বলা মুশকিল।
স্টাড শাহেবের মুসলিম চেম্বারের ওপর এত রেগে থাকার কারণ ওরা বেঙ্গল চেম্বারের ব্যবসা খাচ্ছে। কিন্তু সেই কারণে ইয়োরোপিয়ান গ্রুপের সঙ্গে সরকারের বন্ধুত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা যায়?
এটা সত্যি-সত্যি সারওয়ারদির পক্ষেও বেশ কঠিন ব্যাপার। স্টাড শাহেবের আপত্তি মেনে সিদ্দিকি শাহেবকে বলতে না-দেয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। কিন্তু স্টাড শাহেবও কম জানেন না যে তাঁর এই আপত্তি ও মুসলিম চেম্বারের বিরোধিতার প্রতিক্রিয়া অনেক দূর ছড়াতে পারে। হয়তো স্টাডের আপত্তিতে তেমন একটা ইঙ্গিতও ছিল। ইয়োরোপিয়ান গ্রুপের পঁচিশটা ভোট এই গবর্মেন্টকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই তাদের ব্যবসার ক্ষতি করে নয়। সুতরাং ইয়োরোপিয়ান গ্রুপের সমর্থন চিরকালই থাকবে এমন ধরে নেওয়ারও কোনো কারণ নেই।
যোগেন মুগ্ধ হয়ে যায় সারওয়ারদি শাহেববের উপস্থিত বুদ্ধিতে। উনি স্টাড শাহেবকে সম্বোধন করে বলে ওঠেন, ‘ওয়েল, মিস্টার স্টাড, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না আপনার আপত্তিটা কার সম্পর্কে? মুসলিম চেম্বার, পাট ব্যবসা নাকি মিস্টার সিদ্দিকি? আপনি নিশ্চয়ই মিস্টার সিদ্দিকি-র অতুলনীয় বিশ্লেষণ থেকে নিজেকে ও আমাদের বঞ্চিত করতে চান না। তাহলে বাকি থাকে মুসলিম চেম্বার আর পাট-ব্যবসা।’
স্টাড শাহেব দাঁড়িয়ে উঠে বলেন, ‘কিন্তু আপনিই তো মিস্টার সিদ্দিকিকে ডেকে বললেন, মুসলিম চেম্বার অব কমার্স। আমি তো বলিনি।
সারওয়ারদি তাঁর সামনে রাখা কাগজটায় চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘তাই নাকি। আমিই তাহলে দোষী? ওয়েল, ডোন্ট মাইন্ড। মিস্টার সিদ্দিকি, দি ওয়ান অ্যান্ড দি ওরিজিন্যাল প্লিইজ’।
তাঁকে নিয়ে যখন এত কথাবার্তা চলছে, সিদ্দিকি শাহেব তখন একটাও কথা বলেননি। এখন দাঁড়িয়ে উঠে একটু খেঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার প্রেসিডেন্ট, অ্যাট লাস্ট ইউ হ্যাভ মেটেরিয়াইজড মি।’ যোগেন উচ্ছ্বাসে টেবিল চাপড়ে বসে। তার দেখাদেখি আরো অনেকে। যেন জানাই ছিল হাততালির জন্য তাঁকে একটু থামতে হবে। একটু থেমে সিদ্দিকি শাহেব বলেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফ্রেন্ডস। এতক্ষণ আবার নিজেকে ‘হ্যামলেট’-নাটকের প্রথম দৃশ্যে হ্যামলেটের বাবার ভূত মনে হচ্ছিল, দ্যাট বোডস সাম স্ট্রেঞ্জ ইরাপসন টু আওয়ার স্টেট।’ যোগেন আবার টেবিল চাপড়ায়। কিন্তু একবার চাপড়েই থেমে যায়। সে যে বুঝেছে, সেটা জাহির করা হয়ে যাবে। সিদ্দিকি শাহেবের গলায় তখন গাম্ভীর্য এসে গেছে, ‘আমি যেমন মুসলমান বলে কোনো অতিরিক্ত সুযোগ নিতে ঘৃণা বোধ করি, সেই একই পরিমাণ ঘৃণা আমি বোধ করি, যদি কেউ হিন্দু বলে বা খ্রিস্টান বলে কোনো অতিরিক্ত সুযোগ নিতে চায়। কিন্তু আমার ঘৃণার পরিমাণটা লাফিয়ে-লাফিয়ে বেড়ে যায়—যদি মুসলিম বলেই কেউ আমাকে কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়। আমার বাড়ির লোকজন ও বন্ধুবান্ধব সকলেই জানেন, খাঁটি মুসলমানের যে-সব লক্ষণ আছে, সেগুলো দিয়ে বিচার করলে আমাকে খুব খাঁটি মুসলমান বলে মার্কা দেয়া বেশ কঠিন। মুসলিমরা কোনো ব্যবসায় যদি যুক্ত থাকে ও মুসলিম বলেই যদি সেই ব্যবসায় তারা বিশেষ এক ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তাদের নিশ্চয়ই আইনি অধিকার আছে। কোনো একটা সমিতি গঠন করার। যদি কেউ সে অধিকার দিতে না চায় বা যদি কেউ সেই কারণে আমাকে বা আমাদের দোষ ধরে, তাহলে, আমি নিজেকে প্রকাশ্যত চিৎকার করে একজন গোঁড়া ও খাঁটি মুসলমান বলে ঘোষণা করব। এ কথাটা এত কর্কশ সুরে আলোচনার প্রথমেই বলতে আমার শিক্ষা, রুচি ও বিশ্বাসে লাগছে। শুনতে, আশা করি, আপনাদেরও খারাপ লাগছে। তবু যে আমি কথাটা আপনাদের জানাতে দরকার মনে করলাম, তার কারণ, আপনারা যদি আমার মত ধর্মসংস্কারমুক্ত মানুষকেও সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দেন, তাহলে, আপনাদের ধর্মনিরপেক্ষতা পালনের জন্য কোনো মুসলমানকেই পাবেন না। আরো একটা কথা আমি দেগে দিতে চাই যে মুসলমান-বিদ্বেষী বলতে শুধু হিন্দুদেরই বোঝায় না। ইসলামি সভ্যতার বিরুদ্ধে কয়েকশ বছর ধরে যারা সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করেছে আর সেই যুদ্ধকে পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য বলে প্রমাণ করেছে তারাও কেউ হিন্দু নয়। আমাদের আজকের এই আলোচনা সভার বিষয় পাট। সেই পাট উৎপাদন, ব্যবসা ও চটকলের এক মেরুতে আই জে এম এ, ডুফুস, স্টিল, ল্যানডেল অ্যান্ড ক্লার্ক, র্যালি ব্রাদার্স, সারকিজ অ্যান্ড কোম্পানি, ডেভিড অ্যান্ড কোম্পানি, আর-এক মেরুতে বাংলার মুসলমান পাটচাষি।’
সিদ্দিকিশাহেব একটু থেমে আবার শুরু করেন, শুরু করেও থেমে যান, তারপর একটু হেসে বলেন, ‘আমাদের দেশে একটা কথা আছে, মেয়েদের মধ্যে, যা আছে তা তো পেটেই আছে, বলার দরকার কী? আমি মেয়ে নই বলেই অসাবধানতায় আমার পেটের কথাটা মুখে বলে ফেলেছি। কিন্তু বলা কথা আর ছোঁড়া ঢিলের তো আর কোনো ফেরৎ হয় না। বাংলার পাটচাষিরা যে প্রধানত মুসলমান এ নিয়ে তো কারো কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি থাকলেও তা টিকবে না। ছ-ছটা সেনসাসের হিশেবে সেটা প্রমাণ হয়ে আছে, সাত নম্বর সেনসাসের হিশেবও তো তাই বলবে। যে ব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন, এই মুসলিম পাটচাষির রোজকার খাওয়া ও বেঁচে থাকা তার ওপর নির্ভর করবে। শাহেবদের একটা মুশকিল এই যে তাদের আর পাটচাষিদের মাঝখানে কোনো হিন্দু মহাজন পাওয়া যাচ্ছে না, ধান-চালের বেলায় যেমন পাওয়া গিয়েছিল—জমিদার হিন্দু আর রায়ত মুসলমান। চাষি কোথাও নেই। সুতরাং জমিজির নিয়ে গোলমাল মানেই হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা। ভোটের আগে তাই দাবি উঠেছিল— জমিদারিপ্রথার উচ্ছেদ চাই, মহাজনি শাসন বন্ধ করো। সেই দাবির ভিত্তিতেই এই সরকার ক্ষমতায় আছে ও তারা অস্বাভাবিক দ্রুতবেগে ভূমি ব্যবস্থা সংক্রান্ত আইন বদলের জন্য এক কমিশন বানিয়েছেন, মহাজনি লাইসেন্স চালু করেছেন, সুদের হার বেঁধে দিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের জন্য আরো দশ শতাংশ, মানে মোট পঞ্চাশ শতাংশ কেটে রাখার আইন করেছেন। এমন আরো কিছু সংস্কার করেছেন। এই সরকার কোন বিষয়ে আইন আনবেন ও কোন বিষয়ে আনবেন না—তার একটা থিয়রি অব প্রব্যাবিলিটি খুঁজে পেয়েছি। যে-সংস্কারে মুসলমানদের ক্ষতি, সে-সংস্কার হবে না। যে-সংস্কারে মুসলমানের লাভ, সে-সংস্কার হবে। যে-সংস্কারে মুসলমানের লাভ না থাকলেও, তেমন ক্ষতিও কিছু নেই, সে-সংস্কারও হবে। যে-সংস্কারে মুসলমানের ক্ষতি সে-সংস্কার কিছুতেই হবে না। যে-সংস্কারের হিন্দুর লাভ কিন্তু মুসলমানের ক্ষতি তেমন নেই, সে-সংস্কারও হবে। আমার এই ‘থিয়ারি অব প্রব্যাবিলিটি তে পাটটা ঢোকানো যাচ্ছে না। কারণ পাটে হিন্দু স্বার্থের চাইতে মুসলিম স্বার্থ বেশি আর এখানে স্বার্থগুলো একটু বেশি স্পষ্ট ভাগ করা। পাট চাষ করে পাটচাষি, তারা বেশিরভাগই মুসলমান, পাটের ব্যবসা করে আড়তদার—তার মধ্যে অবাঙালিরা বেশি, পাট থেকে হেশিয়ান বানায় বেশির ভাগ শাহেবদের চটকল আর পাট বিদেশে চালান দেয় শাহেব কোম্পানিগুলি। এই চারভাগের মধ্যে একভাগেও হিন্দুদের প্রাধান্য নেই। তাদের জায়গা চাকুরে হিশেবে বিভিন্ন পাট-কোম্পানির অফিসে, পাটগোলায়, বড়বাবু-ছোটবাবুর পোস্টে কলকাতায় ও মফস্বলে। তাহলে পাটের বেলায় স্বার্থটা শাহেবদের আর মুসলমানদের। সেখানেই এই সরকারের বিপদ। শ্যাম রাখি না কুল রাখি। যদি সরকার পাটের নিম্নতম দর বেঁধে দেয়, তাহলে কোনো শাহেবই পাট কিনবে না—আই জে এম এও না, এজেন্ট-এক্সপোর্টারও না, আড়তদাররাও না। আমি যে খুব সংসারী মানুষ, তা না। সেই আমিও জানি, খদ্দের যদি একবার শস্তার স্বাদ পায়, তাহলে সে আর দর বাড়তে দেয় না। পাট না পাটরানী, পাট বা সোনার সুতো—এই সব প্রবাদ ১৯১৪-১৮-র যুদ্ধের আগের সময় নিয়ে। সেই যুদ্ধের পর পাট কিন্তু কোনোদিনই আর আগের দর পায়নি। ২৫ সালে একটু উঠল, তারপরেই তো ৩৪-৩৫ সালে নেমে গেল ২৫ সালের দরের ১০ আনি থেকে ১২ আনিতে। এখন আবার একটু নাড়াচাড়া পড়ছে। কিন্তু পাটের পাটরানীগিরি শেষ। তুলো পাটের চাইতে বেশি দর পায়। তার প্রধান কারণ বাংলার কৃষির বিরুদ্ধে বাজারি ও প্রশাসনিক মনোভাব। যুদ্ধের পর দর যা-একটু বাড়ল, তাও তো পাটচাষির কাছে পৌঁছল না। চলে গেল চাষি আর শেষ-খদ্দেরের মাঝখানে গজিয়ে ওঠা—সব হাতবদলি দালালদের হাতে। চাষির বাড়ি থেকে পাট কিনে নিয়ে যায় পাইকার বা ফড়ে। সে দেয় বেপারির হাতে। বেপারিরা তুলে দেয় এজেন্টের গুদামে বা খোদ কোম্পানির কাছে। নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, সরিষাবাড়ি, চাঁদপুর এই সব স্টিমারঘাটায় কোম্পানি তো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মাল কেনে। পাটের জন্য উত্তরবঙ্গে কতগুলি নতুন স্টেশন বসল। এর মধ্যে কোথাও একই লোক বেপারিও বটে আড়তদারও বটে। আবার কোথাও ফড়েই বেপারি হয়ে ওঠে। বেপারির একটা সামাজিক সম্মান থাকা দরকার। আজ ১৯৪০ সালে কথটা তুলছি এই কারণে যে ১৯২০-র আগে পাটের বাজারে পাইকার বা ফড়ে, বেপারি বা ডিলার, মহাজন বা আড়তদার, দালাল বা এজেন্ট—এই ভাগাভাগিগুলি ছিল না। ১৪-১৮-র যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সব ভাগ কায়েম হয়ে গেছে। মাত্র ২০ বছরে, ১৯৪০-এ আমরা পাটের দর বুঝতে বেবাক ভুলে বসে আছি যে প্রথম রয়্যাল কমিশন অব এগ্রিকালচারের সামনে বাংলার কৃষি ডিরেক্টর ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর মিস্টার ফিনলো ও মিস্টার ম্যাকক্লিন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে পাটের দরের বিশ শতাংশ যায় এই কেনাবেচার দালালদের হাতে। ঐ কমিশন সেই হাতখরচার হিশেব কষে বলেছিল ২০ শতাংশের নীচে নয়, ২৫ শতাংশের ওপরে নয়। পাটের দরে যুদ্ধের আগে, ঐ ১৪-১৮-র যুদ্ধের আগে এই কমিশনটা যেত মিলের হিশেব থেকে, এখন যাচ্ছে চাষির হিশেব থেকে। যদি টাকা দেয়ার আগেই তা থেকে ভাগ কাটা হয়, তাহলে যতই টাকা বাড়াবেন, ভাগও তো ততই বাড়বে। যতই বাড়ুক সেটা কাটা হবে চাষির প্রাপ্য থেকে। খাদ্য ফসলের বেলাতে মালিকের বাজে আদায়ের তো শেষ নেই। পাট খাদ্য ফসল নয় বলেই তাতে বর্গা নেই, ভাগচাষ নেই, অধিকার নেই। সেই না থাকাটা এতদিনে পুষিয়ে নেয়া হচ্ছে। জমিদার কে পাটের? আই জে এম এ, এক্সপোর্টার আর আড়তদার। একমাত্র যারা বাজারে কিনছে তারা নয়, ফিউচার মার্কেট বলে যে ব্যবস্থা বাজারের নিজের নিয়মে তৈরি হয়ে উঠেছে, আর যে ফিউচার মার্কেটের ব্যাপারে উৎসাহী বলে মুসলিম চেম্বারকে পাটব্যবাসার পুরনো অভিজাতরা দোষ দিচ্ছে, সেই ফিউচার মার্কেটের প্রসারে সরকার যদি কোনো ব্যবস্থার কথা ভাবেন, আমরা নিশ্চয়ই সব রকম সাহায্য করব।’
সিদ্দিকিশাহেব এই কথা বলা মাত্র যেন কাউতাল শুরু হয়ে গেল। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, ইংরেজিতে ও বাংলায় চিৎকার করতে লাগল, বেশ খানিকটা চিৎকারের পর বোঝা গেল শুধু সিদ্দিকিশাহেবের বিরুদ্ধে নয়, সারওয়ারদির বিরুদ্ধেও সরাই রাগে ফেটে পড়ছে।
‘মুসলিম চেম্বারের সঙ্গে সরকারের বোঝাপড়া স্যাংশন করাতেই কি আমাদের ডাকা হয়েছে?’
‘এমন কনফারেন্স এত ঢাকঢোল বাজিয়ে লাটশাহেবকে দিয়ে ওপেন করার ছিলটা কী?’
‘লাটশাহেবকে এই সব আন্ডারহ্যান্ড ডিলের পার্টি করার পেছনে কংগ্রেসি মাথা আছে।’
‘একই সঙ্গে দুটো বাজার? একটা টেবিলের ওপরে, একটা নীচে?’
‘ব্ল্যাকমার্কেট আর ফিউচার মার্কেটের তফাৎ কী?’
‘মন্ত্রীরা কেন হাজির নেই? ইস্পাহানির বখরা খায় যে মন্ত্রীরা তারা কোথায়?’
‘যার প্রমাণ নেই, তেমন কথা আর-একবার বললে, কোর্টে দেখা হবে।’
‘অত কোর্ট দেখাচ্ছেন কাকে? নলিনী সরকার চুপ করে আছেন কেন? উনি ইস্পাহানিদের লাইসেন্স গোপনে পাশ করে দেননি? কেন ওপেন টেন্ডার ডাকা হয়নি?
‘সারওয়ারদিশাহেবের লেবার ইউনিয়ন আমাদের টাকা খায় না? আর, ফিউচার মার্কেট? আমরা এ মিটিঙে নেই। আমরা ওয়াক-আউট করছি।’
সারওয়ারদি আর তমিজুদ্দিন দুই হাত মাথার ওপর তুলে সবাইকে থামতে বলেই যাচ্ছেন, তমিজুদ্দিন তো ওয়েলের মধ্যে হাত জোড় করে দৌড়োদৌড়ি করছেন।
মনে হয়, মিটিংটা ভেঙে যাবেই।
এমন সময় মিস্টার স্টাড দাঁড়িয়ে উঠে দুই হাত তুললেন আর গোলমালটা যেন আচমকা নেমে গেল। সেটা মিস্টার স্টাড-এর প্রতিষ্ঠার জন্যও হতে পারে আবার চেঁচামেচির প্রথম পর্যায় শেষ হয়েছে বলেও হতে পারে।
মিস্টার স্টাড গোলমালের সেই অনিশ্চয়তাটা ব্যবহার করে প্রথমে সকলকে বললেন, ‘আমাকে একটু কথা বলতে দিন। আমার কথা শেষ হলে যাঁরা আমার কথা সমর্থন করেন, তাঁরা সেই অনুযায়ী করণীয় করবেন। আর, যাঁরা তা করেন না, তাঁরা তাঁদের মতানুযায়ী যা করণীয় তা করবেন।’ এই পর্যন্ত বলেই তিনি সারওয়ারদিকে সম্বোধন করে বললেন, ‘মিস্টার মিনিস্টার, আমার কথা খুব সংক্ষেপে বলছি। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমরা যারা এই সভায় আপনাদের আহ্বানে এসেছি তারা মনে করতে পারছি না এটা একটা যথাযথ সভা। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি—এটাকে সভা বলে কোনো স্বীকৃতি দেবেন না ও আমাকে সেখানে উপস্থিত বলে দেখাবেন না। থ্যাঙ্ক ইউ’।
মিস্টার স্টাড তাঁর আসন থেকে ওয়েলে বেরিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিলেন। এটা এতটাই অপ্রত্যাশিত যে সারা ঘর থমথমে নীরবতায় ছেয়ে গেল ও যেন মিস্টার স্টাডের প্রতি স্বীকৃতিতে একে-একে সকলেই বসে পড়লেন।
তমিজুদ্দিন দৌড়ে দরজার কাছে চলে গিয়ে, দরজার পিঠ দিয়ে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঐ নীরবতার যোগ্য স্বরে বললেন, ‘এটা করা যায় না, মিস্টার স্টাড। আপনি কোনো অবস্থাতেই আনজেন্টলম্যানলি ব্যবহার করতে পারেন না’।
হলের আরো নীরব হওয়ার মত কোনো পরিসর ছিল না। মিস্টার স্টাড থমকে তমিজুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটা সভা থেকে ওয়াক আউট করার অধিকার আমার নিশ্চয় আছে।’
‘নিশ্চয়। কিন্তু এটাকে আপনি সভা বলেই মানেননি। এখন ওয়াকআউটের একটাই অর্থ—ব্যাড ম্যানার্স। আপনি আমাদের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের জবাব না শুনে। আপনি কোনো কোম্পানিকেই এমন অসম্মান করতে পারেন না। ইটস এগেইনস্ট ইয়োর কালচার।’ মিস্টার স্টাড তমিজুদ্দিনের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে, ‘সরি’ বলে, নিজের চেয়ারে ফিরে এলেন।
তমিজুদ্দিন তাঁর আসনের দিকে পা বাড়াতেই সারওয়ারদি বললেন, ‘এবার কি আপনি বলবেন, মিস্টার তমিজুদ্দিন?’
তমিজুদ্দিন কোনো জবাব না দিয়ে নিজের আসনে বসে, তারপর দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার কাছে এটা একটা বিধিসম্মত মিটিং এবং আমি তার যুগ্ম আহ্বায়কদের একজন। এই ধরনের মিটিঙের প্রথা অনুযায়ী আপনি আমার সিনিয়ার বলেই চেয়ার নিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আপনারই বলার অগ্রাধিকার। কোনো কারণেই আমাদের অর্ডার ভাঙা উচিত নয়।’
সারওয়ারদি দাঁড়িয়েই বলতে শুরু করলেন, যদিও সভামুখ্য হিশেবে তিনি বসে বসেই বলতে পারতেন।
‘প্রথমত, আমি মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে এ কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে চাই যে আমরা কোনো পক্ষের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়াকে আইনানুগ করার জন্য এই সভা ডাকিনি। এমন একটি সভা ডাকার কথা হিজ এক্সেলেন্সি আমাদের ফুল ক্যাবিনেটে বলেন এবং এটাও বলেন যে হিজ মেজেস্টি ভাইসরয়ও এটা চান। তৎসত্ত্বেও যদি আমার অজ্ঞাতে কোনো বোঝাপড়া হয়ে থাকে, আমি তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে বলছি—মন্ত্রী হিশেবে আপনাদের কাছে অসত্য তথ্য দেয়ার অপরাধে তাহলে আমার মন্ত্রী থাকা চলবে না। কিন্তু বোঝাপড়া প্রমাণিত হতে হবে, প্রমাণিত বলতে আইনে যা বোঝায়, সেই অনুযায়ী প্রমাণিত।
‘ফ্রেন্ডস, এখানে উত্তেজনার মধ্যে কিছু ধরনের অভিযোগ উঠেছে, যেমন মন্ত্রীদের মধ্যে কেউ-কেউ পাট ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে ব্যক্তিগতভাবে টাকা নিয়েছেন। দু-একবার দু-একজনের নামও উঠেছে, যেমন মিস্টার সরকার। আমি পার্লামেন্টারি পদ্ধতিতে গভীর বিশ্বাসী। সেই কারণেই আমি মনে করি—ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে এই ধরনের অভিযোগ পার্লামেন্টারি রীতিসম্মত নয়। যিনি বা যাঁরা এটা করেছেন তাঁরা আইনসভার এই পবিত্র হলের অমর্যাদা করে এখানে হাটবাজারের চালচলন ও বুলি আমদানি করেছেন।
যোগেন টের পায়—সারওয়ারদি মিটিংটা ধরে ফেলেছে। তার কথা সবাই বিশ্বাস করছে তা নয় কিন্তু ছোটখাটো মানুষটির কথাগুলো থেকে একই সঙ্গে এমন একটা সংযোগ তৈরি হয়ে যাচ্ছিল সবার সঙ্গে যে মোটামুটি সকলেই বুঝছে যে মিটিংটা ভেঙে দেয়া যায় না। বা, যোগেন আর একটু—কুটিল কারণে ভেবে নেয়—মিটিংটা এভাবে ভেঙে দিলেই প্রমাণ হবে না যে গবর্মেন্ট আগেই মুসলিম চেম্বারের সঙ্গে কী হবে সেটা ঠিক করে রেখেছে। কিন্তু মিস্টার স্টেইড অতটা গেলেন কেন? আর, গেলেনই যদি ফিরলেন কেন? তমিজুদ্দিনের কথায়? তমিজুদ্দিন ঐ ভঙ্গিতে ও ভাষায় বাধা দেয়ায় মিস্টার স্টেইড হয়তো সংবিৎ পেলেন। কিন্তু হাজার-হাজার, হাজার-হাজার বছর ধরে লুপ্ত বংশানুক্রম জুড়ে উচ্চবর্ণের মতলব ঠাহর করতে পারার শূদ্র-অভ্যাসে যোগেন নিজের শরীরের গভীরে বোঝে—শূদ্র যেমন উচ্চবর্ণের সম্মুখে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে নিজের ছায়া মুছে দিতে চায়—যাতে বর্ণহিন্দুকে সে-ছায়া স্পর্শ না করে ও তার সর্বত্র দুই চোখের রক্তিমের সঙ্গে যাতে বর্ণহিন্দুদের দৃষ্টি বিনিময় না হয়, তেমনি যোগেন মিস্টার স্টাডকে একটা সাফাই দিচ্ছে—এটা যোগেন নিজের মনে বুঝে ফেলে। মিস্টার স্টাডস সংবিৎ হারিয়ে থাকতে পারেন—কিন্তু সেটা শাদা চামড়ার সংবিৎ। তার গ্রুপের ২৫টি ভোট পেয়ে, যে-মন্ত্রিসভা টিকে থাকে তার মন্ত্রীদের সাহস হয় কী করে যে মুখের ওপর কথা বলে? মুসলিম চেম্বার দেখায়? মন্ত্রিসভা ফেলে দিতে তো মিস্টার স্টাড-এর গভর্নরকে দু-লাইনের চিঠি দিয়ে অফিসের বেয়ারাকে রাইটার্সে পাঠিয়ে দেয়াটাই যথেষ্ট। তমিজুদ্দিনের বাধাটুকু মিস্টার স্টাডসকে বড়জোর মনে করার ফাঁক দিল যে এমন একটা যুদ্ধের বিপাকে ব্রিটেন যখন বিপন্ন, তখন ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা তাঁর মত প্রবীণ ব্রিটিশের মানায় না। এমন কী, তাঁর সমর্থনের ভিক্ষে দিয়ে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের এক প্রাদেশিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি ব্রিটিশের সশ্রদ্ধ পক্ষপাত যেমন প্রমাণিত সেই প্রমাণটি অনেক বেশি দরকার। অনেক বেশি দরকার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য।
যোগেন হঠাৎ শোনে সারওয়ারদি বলছেন, ‘দেখুন, এই সম্মিলন ডাকার প্রশ্নই উঠত না যদি এই যুদ্ধের ফলে বিশেষ করে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গারিতে আমাদের ট্র্যাডিশন্যাল পাট-রপ্তানির বাজার আমাদের পক্ষে একেবারে নিষিদ্ধ হয়ে না যেত। আমরা, বেঙ্গল, বাংলা, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাট উৎপাদক, গুণে শ্রেষ্ঠ ও বিস্তারে, বৃহত্তম, হ্যাঁ এই বেঙ্গল, বাংলা, তাই এই যুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠিত পুরনো ব্যবস্থা যখন ধসে গেছে, তখন সেই বাংলায় সেই পাটের ব্যবসা নিয়ে যে সামান্য অনিশ্চয়তা দেখা গেছে তাকে তো অতিশয় সামান্য বলাই যায়। কিন্তু আমরা তো চাই সেই অনিশ্চয়তায় জড়িয়ে পড়েছে যারা, তাদের সব পক্ষের কাছে এই সমাধান গ্রহণীয় হোক—মিল-মালিকদের কাছে, চেম্বারগুলোর কাছে, নতুন স্থানীয় পেশাদারদের কাছে ও ‘লাস্ট বাট নট দি লিস্ট, পাটচাষিদের কাছে। এবার আমি তমিজুদ্দিন ভাইকে অনুরোধ করছি আপনাদের সবার সঙ্গে কথা বলে এই মিটিঙের পরবর্তী বৈঠকের ব্যবস্থা কী হয়েছে তা আমাদের জানাতে। কাল তো রোববার। তাহলে কালই আমরা বসি না-কেন। বিফোর লাঞ্চ আমরা নিশ্চয়ই মিটিং শেষ করতে পারব।’ তমিজুদ্দিন শাহেব তখন নানা জনের সঙ্গে নানা রকম কথা বলছেন, যোগেনের মনে হল—কালই হচ্ছে তাহলে মিটিংটা, সময়টা জেনে নেয়ার জন্য সে তমিজুদ্দিনকে ঘিরে থাকা ভিড়টার পেছনে দাঁড়ায়। শুনে নিলেই হল বা কাউকে ফোন করে নিলেও হত।
তমিজুদ্দিনই ডেকে ওঠে, ‘যোগেনদা, কাল সকাল নটা। গাড়ি পাঠাব না কী?’
যোগেন তার ডান হাত তুলে আঙুলগুলো খেলিয়ে ও একটু হেসে জানিয়ে দেয়, গাড়ি লাগবে না।
হল থেকে বেরিয়ে যোগেন দেখে—বেলা শেষ কিন্তু আলো জ্বলেনি। যেন আলো জ্বলা উচিত ছিল—এই রকম ভঙ্গিতে আরো একবার তাকাতেই যোগেনের মনে পড়ে যায়—যুদ্ধের জন্য ডেলাইট সেভিং চলছে।
সময় আছে বলে যোগেন নীহারেন্দু দত্ত মজুমদারের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে যাবে ঠিক করল।
যোগেনের ইচ্ছে করছিল পাটের ব্যাপারটা নিয়ে ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলতে। সুভাষের কাছে যাওয়ার কথা স্বাভাবিকভাবেই মনে এসেছিল। সেই মনে আসা সত্ত্বেও যোগেন যে সুভাষকে ছেড়ে নীহারেন্দুর কাছে যাচ্ছে, তা নয়। যেন, সুভাষের কথা মনে এসেছিল, তারপর নীহারেন্দুর কথা মনে এল, তাই নীহারেন্দুর কাছেই যাবে ঠিক করল। সুভাষবাবুর ওখানে না-জানিয়ে গেলে, কাজ নাও হতে পারে। কথায়-কথায় বা খাওয়ায়-খাওয়ায় এত দেরি হয়ে যায় যে ১৫ নম্বরে ঢুঁ মারার সময় আর হাতে থাকে না। কংগ্রেসের ভাঙাভাঙি নিয়ে সুভাষবাবুর ওখানে প্রায় রোজই যেতে হচ্ছিল।
ঠিক যে হিশেবনিকেশ করে যোগেন সুভাষের কাছে না-গিয়ে নীহারেন্দুর কাছে যাচ্ছে—তা না হলেও, একটু হিশেব-নিকেশ যে মনের আড়ালে ঘটেনি, তাও নয়। এসব নিয়ে সুভাষের মত যোগেন শুনেছে—একদিন ওর সঙ্গেই কথা হচ্ছিল, আর-এক দিন পাঞ্জাব থেকে একজন এসেছিলেন, যোগেন পরে জেনেছিল তিনি পাঞ্জাব সরকারের কৃষিমন্ত্রী, তিনি জানতে চাওয়ায় সুভাষ একটু ছড়িয়ে বলছিলেন। কারণ, পাঞ্জাবের কৃষিমন্ত্রী পাটচাষ, পাট ব্যবসা, পাটের দাম ব্যাপারটা প্রায় বুঝতেই পারছিলেন না। তাঁদের কাথাবার্তা শুনতে-শুনতে যোগেন জেনে ফেলে, মন্ত্রী মনে করছেন—পাঞ্জাবের আখচাষের সঙ্গে বাংলার পাটচাষ তুলনীয়। উনি ওঁদের অসুবিধের কথাও বলছিলেন—আখের দর বেঁধে দেয়া, কৃষকদের ক্ষতি ইত্যাদি। এই দু-দিনের কথাবার্তা থেকে যোগেন বুঝে নিয়েছে—সুভাষবাবু পাটের ব্যাপারে তাঁর পুরনো ধারণাই আঁকড়ে আছেন যে, পদ্ধতি যাই হোক না কেন, পাটের চাষের একরোজ যদি কমানো না যায়, তাহলে খোলা বাজারের নিয়মে পাটচাষি কোনো সময়ই ন্যয্য দাম পেতে পারে না, কারণ, বাজারের নিয়ম অনুযায়ী খদ্দের যত পারে তত কম দাম দেবে আর চাষি, যদি এবার দর পাওয়া যায় ভেবে চাষ বাড়িয়ে বাজারের চাহিদার চাইতে অনেক বেশি পাট বাজারে আনবে। পাঞ্জাবের কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে সুভাষবাবু বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন—এটা তো একটা ইম্পসিব্ব্ল সিচুয়েশন। ক্যাশক্রপ মানে যে ক্রপ বেচে ক্যাশ পাওয়া যায়। মানে, সেখানে মার্কেট রিলেশনস অপারেট করবে। তাহলে তো আপনাকে প্রাইস ভেরিয়েশনের রিস্কও নিতে হবে। একমাত্র প্রোডাকশন লিমিটেশন ছাড়া তো বাজারের ওপর চাষি কোনো চাপ তৈরি করতে পারবে না। একারেজ লিমিটে বাধ্য করা। দরকার হলে পুলিশ দিয়ে, প্যারা-মিলিটারি ফোর্স দিয়ে, আইন দিয়ে পাট উৎপাদন কমালে চাষিকে খদ্দের একটা দর দিতে বাধ্য হবে। পাঞ্জাবের মন্ত্রী একবার কথাটা তুলেছিলেন যে এই উৎপাদন-নিয়ন্ত্রণে কিষান সমিতি বা এমনকী কমিউনিটি প্রেসারকে কাজে লাগানো যায় কী না কারণ পাঞ্জাবে শিখ আর মুসলমান এই দুই ধর্মের মানুষই সংগঠিত ধর্মাচরণ করে। সেখানে গুরুদ্বার থেকে বা মসজিদ থেকে কোনো ফরমান জারি কি সাহায্য করতে পারে বা কাজটাকে গবর্মেন্টটেন্ট থেকে সরিয়ে সমাজের একটা কাজের অংশ করে দেয়ার চেষ্টা কি করা যায়?
সুভাষবাবু এই প্রশ্নটির কোনো সরাসরি জবাব দিলেন না—বরং তিনি বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠলেন যে পাঞ্জাবে সব ধর্মাচরণের একটা সংগঠিত চেহারা আছে। তিনি আরো জানতে চাইলেন—এই সংগঠনগুলি কীভাবে কাজ করে। কৃষিমন্ত্রী খানিকটা বলতেই বোঝা গেল—বিষয়টি সুভাষবাবু জানেন কিন্তু কৃষিমন্ত্রী আখ বা পাটের বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে বলেছেন বলে তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। সুভাষবাবু বললেন, ‘কিষান সমিতির ধারণাটি ভাল কিন্তু আমাদের এই আইন-অমান্যই বলুন আর জাঠা-মিছিলই বলুন, সব কিছুই যেন বিশৃঙ্খল ভিড়ের ব্যাপার। এদিয়ে কি এই ধরনের কঠিন কাজ করা যায়? গান্ধীজি আমাদের স্বভাবই নষ্ট করে দিয়েছেন তো! ধরুন, কিষান সমিতিগুলি যদি একটা সংগঠিত বাহিনীর মত, ইউনিফর্ম পরে, অধিকার নিয়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য করে—তাহলে কৃষকরাও ভরসা পাবে, তাদের কথা শুনবে। সেটা হতে পারত।
সুভাষবাবুর এই মতটা যোগেনের জানা আছে বলেও হয়তো সে নীহারেন্দুবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গেল। হয়তো সেখানে সে সুভাষবাবুর কথাটাও যাচাই করতে পারে। হয়তো, পাট নিয়ে সুভাষবাবু যে-যুক্তি দিচ্ছেন যুক্তি হিশেবে সেটাই ঠিক কিন্তু সেই যুক্তির পরিসরে যেন পাট সমস্যাটি কোনাকানছি-সহ ঠিক আঁটছে না। যুক্তির বাইরে যে-অংশগুলি ছড়িয়ে থাকছে তার বহর কিছু কম না। পাট নিয়ে যোগেনের কোনো পারিবারিক অভিজ্ঞতা নেই—তাদের তো কোনো জমিই নেই পাট বা ধান কোনো কিছুরই কোনো টুকরো জমিও নেই। আর পাটের সঙ্গে চটকল একেবারে গাটছড়া বাঁধা। চটকলের বিষয়টা নীহারেন্দুবাবুর কাছে বিস্তারিত জানা যাবে।
কিন্তু নীহারেন্দুবাবুর বাড়ি গিয়ে শুনল, উনি বাড়ি নেই। এমনটা হতে পারে, জানাই ছিল। বাড়ির লোকজন ভিতরে বসতে অনুরোধ করল কিন্তু যোগেন না বসে বেরিয়ে আসছে, এমন সময় একটি ফুটফুটে মেয়ে, শাদা ফ্রকে, ছুটতে ছুটতে এসে বলে, জেঠু ভারতসভা হলে মিটিঙে আছেন।
যোগেন হেসে ফেলল দেখে মেয়েটিও হেসে ঠোটে হাত চাপা দিল।
‘আরে তাই তো! দ্যাখো তো মা, সে-মিটিঙে তো আমারও যাওয়ার কথা। কিন্তু আমার আর-একটা মিটিং ছিল বলে আমি ঐ মিটিংটার কথা ভুলে গিসলাম।’
‘তুমি কি পরের খবরটা পেলে আগের খবরটা ভুলে যাও?’
‘তাহলে তো মা, তোমাকে অনেক কথা বলতে হয়’।
‘বলো, আমি শুনব। তুমি তো ভুলেই যাও, তাহলে গল্প বলবে কী করে?’
‘মা রে, তুমি তো আটকাইয়া দিল্যা!’
‘কী বললে? আট— কী।’
‘মাজননী, তোমার ডাক শুইন্যা প্যাট থিক্যা মাতৃভাষা বাইরিয়্যা পইড়ছে মা। আমার দ্যাশে সব মানুষই এই রকম কথা বলে।’
‘তাহলে তো তোমার দেশে আমার যাওয়া হবে না।’
‘কেন মা, তুমি যদি যাইব্যার না পারো তাইলে আমার দ্যাশ যাওনের কামডা কী? যাউকগা ভাইস্যা সমুদ্দুরে।’ শুনে মেয়েটি ফুরফুরিয়ে হাসে। কোন কথাটাতে সে মজা পেয়েছে তা বুঝতে না পেরে যোগেন আবার বলে, ‘কাম কী আমার তেমন দ্যাশে—?’
মেয়েটি আবার হেসে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমাদের দেশে কি সব ভাসে?’
‘যোগেন একটু চিন্তিত মুখে বলে, ‘না-ভেসে করব কী’ দশ পাকে তো জল। জলে তো আর হাঁটা যায় না, মা, ভাসতেই হয়—
‘তোমরা কি হাঁসের মত ভাসো, না, সিন্ধুঘোটকের মত, নাকি, সিলমৎস্যের মত?’
‘তুমি এ সব দেখলা কোথায় মা? সিন্ধুঘোটক, সিলমৎস্য, এগুলা কি সত্যি-সত্যি আছে?’
‘হ্যাঁ আছে। আমি দেখেছি। চিড়িয়াখানায়। সিন্ধুঘোটক তো পুরোটা একবারে ভাসতে পারে না, মানে, ও তো খুব মোটা,’ মেয়েটি দু-হাত ছড়িয়ে সিন্ধুঘোটকের বিশালতা বোঝায়, ‘একদিকটা ভাসালে, আর–একটা দিক ডুবে যায়। আবার অনেকক্ষণ পর, সে সেই আর-একটা দিক ভাসায়—’
মেয়েটি হাসে, যোগেনকেও হাসায়। যোগেন বলে, ‘তাহলে খুব মজা হয়েছে চিড়িয়াখানায়?’
‘মজা হবে কেন। চিড়িয়াখানায় ভাসা দেখা গেল বলে? সেটা মজা ছিল? ভাসাটা?’
‘বাঃ, মজা না? একটা সিন্ধুঘোটককে তুমি কতবার ভাসতে দেখলে, সেটা মজা না?’
মেয়েটি একটু টেরিয়ে যোগেনের কথাটা বুঝতে চায়, ‘কোনটা মজা বলছ? সিন্ধুঘোটক একটা বলে, না, ভাসাটা অনেক বলে?’
‘আমি তো চিড়িয়াখানায় যাই নাই। তাই আমি বলতে পারব না। তুমি তো গিছ। তুমিই কও।’
মেয়েটি আবার চিন্তা করার পুরনো ভঙ্গিটা তৈরি করল, হয়তো ভঙ্গিটা নতুন শিখেছে—গালে আঙুল, ঘাড় হেলানো চোখ টেড়ানো।
‘সিন্ধুঘোটক একটাই ভাল। দুটো হলে দেখা যাবে না, ভিড় হয়ে যাবে।’
‘হ্যাঁ, এডা ঠিক। দুই-দুইডা সিন্ধুঘোটকে যদি ভিড় না হয়, তাহলে সেগুলো সিন্ধুঘোটক কী না সে-বিষয়ে সন্দেহ হবে।’
মেয়েটি সম্মতি জানিয়ে হেসেই তাড়াতাড়ি হাসিটা মুছে নেয়, ‘কেন হবে? সিন্ধুঘোটকদের কি ছোটবেলা নেই। তেমন ছোটবেলার দুটো সিন্ধুঘোটক এঁটে যেতে পারে। বুম্বা আর আমি তো এক খাটে এঁটে যাই কিন্তু জেঠু আর বাবা শুলেই ভিড় হয়ে যাবে। তবু, একটাই থাক।’
‘নিশ্চয়ই একটাই থাক। দুটোর দরকার কী?’
‘ঐ তুমি যেটা বললে একটাই থাক, সেটাই।’
‘সেটার নাম কী?’
নাম দিয়ে কী হবে মা, এই যে তুমি আর আমি এতক্ষণ কত কথা বলছি, তুমি কি আমার নাম জানো, না, আমি তোমার নাম জানি?’
‘আমি তো ছোট। তুমি যে-নামে ডাকবে, সেটাই আমার নাম হয়ে যাবে। কিন্তু তুমি তো বুড়ো হয়েছ। তোমার নাম তো তোমার সঙ্গে সেঁটে গেছে। নতুন নামের জায়গা নেই। তোমার নামটা বলবে?’
‘তুমিই দিয়ে দাও না মা। সবার জানার দরকার নেই। শুধু তুমি জানবে আর আমি জানব। কী মজাটাই হবে—বলো।’
‘ঠিক চিড়িয়াখানার ঐ সিলমৎস্যটার মত। জানো, সিলমৎস্যের ইয়া বড়-বড় গোঁফ আছে, বিড়ালের মত আলগা, সীতানাথের মত ঝাপড়া নয়। সিলমৎস্যটা জলের ভিতর একটু সরু আর শুকনো পাথরের মাথায় বসেছিল। সবাই বলছিল, সিলমৎস্যটা যখন ঘুমিয়ে পড়বে, তখন ওর গোঁফগুলো নড়ে উঠবে। অনেকই দেখল, আমার দেখা হল না। আমি এতটাই দেখছিলাম, যে আমার চোখে জল এসে গেল। কিন্তু সিলমৎস্যটির একটা গোঁফও নড়ল না। ও তো মিছিমিছি ঘুমও ঘুমুতে পারত একটু’।
‘ওটা ঘুমাতে জানলে তো ঘুমাবে? আমি খবর কইর্যা আসি কোন সিলমৎস্য ঘুমাতে জানে! কিন্তু তোমার কি সিলমৎস্যই লাগবে মা? অন্য মৎস্যে হবে না?’
‘কেন? অন্য মৎস্য কি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে?’
‘ঘুমিয়ে পড়লেই তো চলে না। তারে তো আবার ঘুমের মধ্যে গোঁফও নাচানার লাগব তাও একবারে এক গোছা গোঁফ নাচাইলেও তো হব না। একটা একটা কইর্যা গোঁফ নাচাইতে হইব। এ বড় কঠিন কাজ মা। তুমি কি সিলমৎস্য ছাড়া অন্য কোনো মৎস্য দেইখছ কুনোদিন?’
‘মৎস্য? দেখেছি? না। মৎস্য তো সিলমৎস্য’।
‘তাহলে তুমি ভাতের সঙ্গে মাছ খাও না?’
‘হ্যাঁ। খাই তো।’
‘আচ্ছা। সেগুলা তাইলে তুচ্ছ মাছ? সিলমৎস্য না?’
‘তুচ্ছ মৎস্য দেখেছ?’
‘আমি দেখলে তো তোমার চলবে না, মা। তোমার তো সিলমৎস্যই চাই।’
‘না-হলে গোঁফ থাকবে?’
‘গোঁফ না থাকলে নাড়াবে কী?’
‘না। ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে নাড়াবে।’
‘সে তো বটেই। জাইগ্যা-জাইগ্যা গোঁফ নাড়াইলে তো আর সিলমৎস্য হয় না।’
‘তাই তো। দেখো আমার ঠিকঠাক মনে আছে কী না। সিলমৎস্য-পাথর থিক্যা নামা ঝরনার মত লেজ, এক দিকে মূল কইর্যা বসে থাকে। ঘুমাতে বললেও, ঘুমায় না।’
‘লেজ কি ঝরনার মত হয়?’
কোনো একটা কিছুর মত তো হতেই লাগে?’
‘লেজটা তো লেজের মত—’
লেজের তো ছোটবড় হয়। তুমি ছাগলের লেজ দেখছ, মা?’
‘ছাগল কী?’
‘মাগ, সিন্ধুঘোটক, তিমিমৎস্য পর্যন্ত পাড়ি দিল্যাম। এখন ছাগলে আইস্যা গর্তে পড়ি?’
‘ছাগল চিড়িয়াখানায় থাকে?’
বাড়ির ভিতর থেকে চাপা একটা গলা এল। মেয়েটি সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে বাড়ির দরজার দিকে ছুটতে-ছুটতে বলে যায়, ‘পিসিমণি ডাকছে। তুমি কিন্তু সিলমৎস্য ভুলো না।’ মেয়েটিকে আর দেখা গেল না কিন্তু যোগেন হাতটা নাড়িয়ে ফেলল। গেট দিয়ে বেরতে-বেরতে যোগেন ঠোটের একটু হাসি মিশিয়ে নিজেকে বলে, ‘ভাগ্যি, নীহারেন্দুবাবুদের মিটিং থাকে—’।
নীহারেন্দুবাবুদের বাড়ি থেকে ‘ভারতসভা’ হলে পৌঁছুতে বাসে মিনিট বিশের বেশি লাগত না। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলা তাকে এমন ফুরফুরিয়ে দিয়েছে যে সে বাস ধরার জরুরি ব্যবস্থাটা ভুলে গেল ও খানিকটা হেঁটে ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসে উঠল। এখন যোগেনের যাতায়াত-ব্যবস্থা এটাই। ট্রাম কোম্পানির একটা অলরুট মান্থলি করে নিয়েছে। অতিরিক্ত তাড়া না থাকলে বা গন্তব্যের কাছাকাছি ট্রাম না থাকলে অগত্যা বাস। কতদূর পর্যন্ত ট্রামে গেলে বাসভাড়া কম লাগবে সেটা ঠিক করতে বাসের স্টেজ জানতে হয়েছে যোগেনকে। নীহারেন্দুবাবুদের বাড়ি থেকে বেরতে বেরতে ভেবেছিল, বাস ধরে হুস করে ‘ভারতসভা’য় পৌঁছে যাবে। কিন্তু আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে সেই ট্রামেই উঠল।
‘ভারতসভা’ হলের দোতলায় ওঠার সিঁড়ির প্রথম বাঁক থেকেই উঁচু গলার বক্তৃতা শুনে যোগেন আশ্বস্ত হয় যে মিটিং চলছে।
ভিতরে ঢুকে পেছনের একটা চেয়ারে বসে পড়ে যোগেন। এই মিটিংটার কথা নীহারেন্দুবাবু অনেকবার বলেছিলেন। চটকলের নানা ইউনিয়ন মিলে করছে, ‘শহরের লোকজনকে সচেতন’ করতে। এই পেছন থেকে যে রকম মাথা আর জামা দেখছে, যোগেন তাতে তো মনে হয় না—টাউনের লোক খুব একটা এসেছে।
গভর্নমেন্ট যে তাকে কনফারেন্সে ডাকবে—যোগেন তার কোনো আভাস পায়নি, কোনো কারণও বোঝেনি।
কিন্তু নীহারেন্দুবাবুকে কনফারেন্সের কথাটা জানাতেই পারেনি। নিজের দোষী-দোষী ভাবটা কেটে গেল।
সারাদিন ধরে পাটের আর গবর্মেন্টের শাহেবদের আর মন্ত্রীদের পাট নিয়ে ঝগড়াঝাটি শুনতে-শুনতে ও দেখতে-দেখতে পাটটাকে যোগেন তার নিজের মত করে বোঝার একটা জায়গায় এসেছে। সেটা একেবারে তার নিজের পদ্ধতি। কার সঙ্গে কার কী মতলবে কোন বিবাদ সেটা আন্দাজ করে ফেলার শুদ্দুরি ক্ষমতা না থাকলে কি কোনো শুদ্দুরই বাঁচতে পারে? কনফারেন্সের সব ঘটনা বিশদে এই ইউনিয়ন-নেতাদের না-জানালে তার চলবে না। সেটা জানতে-জানতে তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে যোগেনকে আবার নিজের একটা বোঝাপড়া বানিয়ে ফেলতে হবে, কাল সকালের আগেই, যাতে নটাতেই কাউন্সিল হলে পৌঁছুতে পারে।
মঞ্চ মত জায়গাটিতে সুরেশ ব্যানার্জি, মৃণাল বোস, নীহারেন্দুবাবু, শিবনাথবাবু, বঙ্কিমবাবু বসেছিলেন। সুরেশ ব্যানার্জি ঘোর গান্ধীবাদী কিন্তু ইউনিয়নের বক্তৃতা করেন যেন চটকলের চালে আগুন লাগাচ্ছেন। ওঁকে নাকি দেশী মালিকরা সাহায্য করেন যাতে শাহেব চটকলগুলোতে উনি গোলমাল বাঁধাতে পারেন। সুরেশ ব্যানার্জির বক্তৃতার পর এমন কী বঙ্কিম মুখার্জির বক্তৃতা শুনলে মনে হয় শুদ্ধ খাদি। নানারকম ইউনিয়নের কথা শুনেছে বটে যোগেন, কিন্তু তার মনে থেকে গেছে এ আইটিইউসি, বিপিটিইউসি, এনটিইউএফ, বিএলএ, বিএলপি, এই নামগুলিই। কমিউনিস্ট, সোস্যালিস্ট আর ওয়ার্কার্স পার্টি কংগ্রেসের ভিতর থেকেই নিজেদের ইউনিয়ন করে। বেঙ্গল প্রভিন্সিয়্যাল মুসলিম লিগ ইউনিয়ন চালায় সারওয়ারদি। তাদের প্রধান কাজ নাকি অন্য মিলের হিন্দু শ্রমিকদের ওপর দাঙ্গা করা। যুদ্ধের আগে চটকলে নাকি গোলমাল লেগেই থাকত—হয় স্ট্রাইক নয় দাঙ্গা। কিন্তু যুদ্ধ লাগতে-না-লাগতে চট আর হেসিয়ানের চাহিদা বাইরে এত বেড়ে গেছে যে কাজের সময় নষ্ট না করে শ্রমিকদের টাকাপয়সা দেয়াটাও লাভজনক ছিল।
শ্রমিকরা ওভারটাইম ও ওয়ারবোনাসের দাবি তুলতেই আইজেএম-এ খেপে উঠেছে।
‘মিল মালিকরা তাদের সঙ্গে মজুরদের লড়াইটা বদলে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। যেন, মালিকদের সঙ্গে মজুরদের কোনো খিটিমিটি নেই। সব খিটিমিটি হচ্ছে পাটচাষিদের জন্য। পাটচাষিরা পাটের দর বাড়াতে চায় যাতে তাদের হাতে নগদ আসে। এত চাষ করলে পাটের কোয়ালিটি থাকবে কী করে। এই সব কথার মাথাও নেই, লেজও নাই। মালিকের কথা শুনে আমরা পাটচাষি ভাইদের ওপর চড়াও হওয়ার মত বেকুফ না। যে চাষ করছে, সে পাটই হোক আর চাল-ডালই হোক—সে তো তার ন্যায্য দাম আদায় করবেই। আমরা চটকলের মজুররা আমাদের মেহনতের দর চাই। চাষিভাইরা তাদের মেহনতের দর চায়। আমাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া নাই। ঝগড়া হবে না। এ কি রথেরমেলায় দানধ্যান করা নাকি। মালিক দশটাকার খুচরা করে বলে—আমার এই দশটাকার দান। তোমরা ঠিক করে দাও—কারা দান পাবে, যাদের কুঠ হয়েছে তারা, নাকি যারা আন্ধা হয়েছে তারা? তোমরা যা বলবে, আমরা তাদেরই দান দেব। এই যে আমরা খুচরা নিয়ে তৈরি।’
বক্তা একটু থামল। এত সুন্দর গল্পের মত বলছিল যে কেউ টেরই পায়নি, তারা কখন গল্পটার সঙ্গে এতটা লেপ্টে গেছে। বক্তা বোধহয় একটু বেশিক্ষণই চুপ করেছিল। হল থেকে কেউ চিৎকার করে উঠল, ‘আরে হুয়া কিয়া, বাতলাও।’
বক্তা সারা মুখ ভরিয়ে হাসল আর হাসিটা লেগে থাকল ঝকঝকে শাদা দাঁতে। সবাই ভেবেছিল—এবার বিস্ফোরণ ঘটবে। তার বদলে বক্তা শান্তিজল ছিটিয়ে হাসিমাখা গলায় নিচু স্বরে বলে ওঠে, ‘আরে উজবুক। এই বুদ্ধি না হলে কি মালিক হয়? তোর কিম্মত যদি দশটাকার খুচরা হয়, তাহলে তোর দান নেওয়ার জন্য দুনিয়ার সারে আদমি দোভাগে ভাগ হবে হয় কুঠ, নয় আন্ধা।’
কথাটা এমন স্বরে, এমন হাসিতে, এমন থেমে থেমে বলা যে পুরো হল ও বক্তাও হেসে উঠল ও হাততালি দিল। যোগেন খুব একচোট হাসল। দারুণ বলেছে। তোর দানের কিম্মত জেনে কি কুঠ আর আন্ধা ভাগ হবে? সত্যি, দারুণ বলেছে। সবার হাসি শেষ হওয়ার পর যোগেন আবার একচোট হাসে, একা। যেন, সে সারাদিনের কনফারেন্সের জবাব শুনল—পাটের চাষ কমাও, তাহলেই ন্যায্য দর পাবে। আরে, বেশি বেঁচে থেকো না, তাহলেই বেশিদিন অনাহারে থাকতে হবে না।
যোগেন আবার একা-একা হেসে ফেলল, দারুণ বলেছে, হাঁটতে গেলে ব্যথা লাগছে, পা-টা কেটে বাদ দাও তাহলে ব্যথা থাকবে না।
এরকম আরো অনেক তুলনা মনে আসতেই লাগল আর যোগেন ফুকফুক করে হাসতেই লাগল।
হঠাৎ বঙ্কিমবাবু মঞ্চ থেকে যোগেনকে ডাকেন, এম এল এর ওপর জোর দিয়ে, শিডিউল কাস্টের ওপর জোর দিয়ে ও সাধারণ আসনের ওপর জোর দিয়ে। বঙ্কিমবাবুর গলার জোরে ও কথা বলার কায়দায়, সবার মনে হল, যোগেন তাহলে খুব লড়াকু মানুষ, নদীনালা-সমুদ্রের দেশ থেকে সাঁতরাতে সাঁতরাতে কলকাতায় এসেছে। সবাই এমন হাতাতালি দিয়ে উঠল যে যোগেনের আর না-উঠে উপায় থাকল না।
যোগেন খুব নিচু স্বরে বলল, ‘আমি বঙ্কিমদার আদেশে এইখানে দাঁড়াইছি। কিন্তু আমি পাট নিয়েও কিছু জানি না, চট নিয়েও কিছু জানি না। আমার বাড়ি বরিশালে। সারা বাংলায় যেসব জায়গায় সবথিকা বেশি আর সবথিকা ভাল পাট হয়, তার মধ্যে বরিশাল ফার্স্ট।’
হঠাৎ হাততালি পড়ল। যেন, বরিশালের এই শ্রেষ্ঠত্ব এই মিটিঙেরও কৃতিত্ব। যোগেন কিন্তু ধরতে পারেনি, কেন হাততালি। সে বলতে লাগল।
‘বরিশালের মানুষ হওয়ার কিছু স্থায়ী অসুবিধা আছে। লোকে ভাবে, বরিশালের মানুষ মানেই বড়-বড় ডাকাত। অ্যাহন ধরেন, জোয়ান ছেলের বিয়া হইল। ফুলশয্যাও হইল। ফিরত ঘোরানোও হইল। বাপের বাড়ি গিয়ে মাইয়া তো মায়ের কাছে কাইন্দ্যা একসা। মা, মাস কাইটতে গেল, মানুষ তো বাড়ির বাইর হয় না। শুদু আমার লগে-লগে থাকে।
মায়েও তো বরিশালের। সে মুখ ঝাপটায়, ‘জামাই যদি তোর হোগায় হোগায় না থাইকত তাইলে তো আইস্যা কাঁইদবার ধরতি। বিয়্যার পরের মাসিক হইছে?’
‘ঐ সব কথা না। তুমি না কইছিলা বড় বড় ডাকাতি করে। তাতেই সম্পদ। কইছিল্যা–ট্যার প্যালেও ভাঁজ দিবি না। কইছিল্যা-না—বৌয়ের ভাইগ্যে ডাকাইতি উশুল।’
‘আরে, সবে তো বিয়া বইসছে। এর মইধ্যে কারো ইচ্ছা হয়—বন্দুক-শড়কি-বল্লম নিয়্যা মাইল মাইল জল উথলাইতে? সাবধান, জামাই য্যান তোর মনের এই দুঃখের দিশা না পায় যহন ডাকাতি টাইম আইবে, ততুন কইরবে।’
সারা হল তখন হাসিতে হাততালিতে চিৎকারে যোগেনের কথায় ফূর্তি জানাচ্ছে।
‘এই রকম আরো কিছু স্থায়ী অসুবিধা আছে বরিশাইল্যাগ। এই—যে বঙ্কিমদাদা আমারে মঞ্চে ডাক দিলেন, তার কারণ কী? বরিশাইল্যা মানুষ যখন যোগেন, ও কী কইর্যা পাট না-জানে? কিন্তু সত্য কথাডা হইল, আমি আমার বাপের নামডাও জানি না। ক্যান? সরকারি কাগজপত্রে তো নিজের পরিচয় আইন-মোতাবেক কইরতে বাপের নাম দিতে হয়। আমাগ পরিবারের-মোতাবেক কইরতে বাপের নাম দিতে হয়। আমাগ পরিবারের কারো কুনোদিন দলিল হয় নাই। দলিলই যদি না-হয়, তাইলে বাপের নামের প্রয়োজন কী? আমাগ বংশের বা বাড়ির গুষ্ঠির কোনো একডা শিমূল গাছের ছায়ার মাপেরও জমি নাই।
‘তাইলে পাটের দর দিয়া আমার কী লাভ? লাভডা খুউব সত্য ও খুউব গোপন। যে পরিমাণ পাট প্রথম ধাক্কায় বাজারে আসে, সেগুলা ভাল পাট না। কিন্তু সারা বছরের মোট পাটের আট আনি বা দশ আনি। কিন্তু সে-পাট না-বেচলে ঘরে তো হাঁড়ি চড়বে না। তাই খানিকটা পাট কম দরে বেইচ্যা চাযাগ তো নিজের প্যাটে আর ছাওয়াল-পাওয়ালগ প্যাটে কিছু ধানের বিচি ভইর্যা কৃষ্ণ বা শুক্ল কোনো একডা পক্ষ কাটাইতে হয়। আশা এই লটের পাট-টা সরেস হবে। কিন্তু আঁতুড়ঘরে যে শিশু কান্দে না, সে আর কোনোদিনই কান্দে না। পাট সরেস না নিরেশ সেইডা ঠিক করে কে? পাটের চাষি না—যে পচা জলের তলায় পাটের ভাঁটা টার মাপ আঙুলে মাইপ্যা জানে কোন পাট সরেস আর কোন পাট নিরেশ। সেডা তো হুকুম দিবে হাকিম—ফইড়্যা, পাইকার, আড়তদার।
‘তাইলে আমাগ স্বার্থডা কী? যাগ বাপের নামটাও জানা নাই? এইডা খুব গোপন কথা, নিজের কাছেও কওয়া যায় না। পাটের দামটায় অন্তত কয়েকমাস ধান কেনার টাকাডা যদি পাওয়া যায়, তাইলে আমাগ খালেবিলে, হাওয়ায়, হাটে, নৌকায় সিদ্ধ চালের বাস পাওয়া যায়। ভাতের গন্ধেই তো খিদার অর্ধেক পূরণ।
‘এইডা ছাড়া আমাগ আর স্বার্থ কী?’
যোগেন মঞ্চ থেকে নেমে আসে। সে নেমে এসেছে বোঝার পর হলের লোকজন একটু বিলম্বিত হাততালি দিয়ে ওঠে। বক্তৃতার শুরুতে যোগেন যে বাহবা পেয়েছিল, শেষে সেই বাহবা পেল না। যারা শুনছিল, তাদের ভাল লাগেনি বলে তারা বাহবা দিল না—তা নয়। যোগেন যেখানে এসে শেষ করল—সেটাই যে শেষকথা তা অন্তত এই মিটিঙে সবাই জানে। জানলেও, কথাটা অপ্রত্যাশিত। কথাটা তো দাঁড়াল, পাটের দর পেলে, বাতাসে ভাতের গন্ধ পাওয়া যায়।
সারাদিন ধরে কাউন্সিল হলে, প্রধানত ইংরেজিতে, চেম্বারগুলোর রেষারেষি পাটটাকে যেন আকাশের গ্রহ-তারার মত অলৌকিক করে দিয়েছে। পাট মানে কোনো ফলন নয়। পাট মানে একটা বাজার। দুনিয়া জোড়া বাজার। সে-বাজারে, যেমন আজ কাউন্সিল হলের মিটিঙে, পাটের কোনো চাষি নেই। শুধু নানা নামে কিছু খদ্দের আছে।
সেখানে পাট থেকে ভাতের গন্ধ পাওয়া যায়?
