১৪ পার্বণ – উল্লাস মল্লিক

১৪ পার্বণ

হেঁপো রুগির মতো কাশতে কাশতে বাসটা এগোচ্ছে। আরতি দেখল, খুব ভ্যাবাচ্যাকা মুখ করে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সন্তোষ। আগে দুবার কন্ডাক্টরকে জিগ্যেস করে খিঁচুনি শুনেছে—বলছি তো নামিয়ে দেব, বসুন চুপ করে। আর একটু গিয়েই একটা জায়গায় জোর হিক্কা তুলে দাঁড়িয়ে গেল বাসটা, আর হুড়মুড় করে সবাই দরজার দিকে। মুহূর্তের মধ্যে বাস ফাঁকা। জানলা দিয়ে আরতি দেখে চার দিকে হরেক রকম মাথার বাহার। কন্ডাক্টর রাস্তায় দাঁড়িয়ে গলা ফাটাচ্ছে—হাতিবাগান, হাতিবাগান। শঙ্খ ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওর নড়া ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে নেমে পড়ে আরতি। পেছন পেছন সন্তোষ। বাস, ট্রাম, অটো, ট্যাক্সি ছুটে এসে সবাই থমকে দাঁড়াচ্ছে এই জায়গায় আর উগরে দিচ্ছে গাদাগাদা মানুষ। পিলপিল করে সবাই ছুটে এসে উঠছে ফুটপাথে। চারপাশে কুম্ভমেলার ভিড়। ওরা তিন জনই বেশ বোমকে গেছে। সেই উদয়নারায়ণপুর থেকে এতটা পথ উজিয়ে এসে এক্কেবারে মানুষেণ ঘূর্ণিস্রোতের মধ্যে। এত দিন পর্যন্ত আরতির কেনাকাটা যা কিছু সবই হত পুজোর আগে। নিজেদের তো বটেই—তার সঙ্গে ভাইপো-ভাইঝি, দাদা-বউদি, বাবা-মা, কাজের লোক—সবার জন্যেই ওই পুজোর সময়।

সুদূর মফসসলে চৈত্রের শেষ ক’দিন দোকানে দোকানে পিচবোর্ডের ওপর আলতায় লেখা ‘সেল’ পাটের দড়ি থেকে লতর-পতর করে দোলে। আরতি দু’একবার কিনে রামবুদ্ধু বনেছে, তিনশো টাকার শাড়িতে চারশো টাকার স্টিকার লাগিয়ে টোয়েন্টি পারসেন্ট লেস। হ্যাঁচড়া-হেঁচড়ি করে যে শাড়িটা ফর্টি পারসেন্টে নামল, বাড়ি এসে ভাঁজ খুলতেই চক্ষু ছানাবড়া! ভেতরে অজস্র পোকার কারিকুরি আর দাগ। খুব উত্তেজিত হয়ে এক বার দু’কথা শোনাতে গিয়েছিল দোকানদারকে। দোকানদার মোলায়েম হেসে জানিয়ে দেয়—সেলের কাপড় আর বরফের মাছ, দিদি, সবটাই নসিবের ব্যাপার। কোনও গিরিন্টি নেই। সেই থেকে সেলের নামে আঁতকে ওঠে আরতি। আর সন্তোষের কাছে সেল মানে সেই সেলুনের গল্প। চার পাশে সেলের হিড়িক দেখে একটা সেলুন বোর্ড ঝোলাল—সুবর্ণ সুযোগ। বিশেষ ছাড়! ডিসকাউন্ট! এখানে ৬ টাকার চুল ৩ টাকায় ছাঁটা হয়। ক’দিন পর পাশের সেলুন বোর্ড ঝোলায়—এখানে ৩ টাকায় ছাঁটা মাথা ২ টাকায় মেরামত করা হয়।

ইদানীং বেলঘরিয়া থেকে ছোট বোন ভারতী প্রায়ই ফোনে সেল-মাহাত্ম্য কীর্তন করে। কলকাতার চৈত্র সেল—সে বস্তুটা নাকি আধুনিক জমানার অষ্টম আশ্চর্য। পৃথিবীতে দু’রকমের মানুষ আছে—যারা কলকাতার চৈত্রসেলে কেনাকাটা করেছে, আর যারা করেনি। শ্যামবাজার থেকে ধর্মতলা হয়ে দক্ষিণাপণ—চৈত্রসেল সর্বত্র। তবে, হাতিবাগান, শিয়ালদহ, গড়িয়াহাট—সেলের গয়া-কাশী-বৃন্দাবন।

বোনের ওপর অগাধ আস্থা আরতির। কিছুটা ভারতীয় উৎসাহ আর কিছুটা সস্তায় দাঁও মারার ধান্দা—’জয় মা’ বলে আজ চলে এসেছে কলকাতায়। সঙ্গে পাঁচন-খাওয়া মুখ করে নিমরাজি সন্তোষ। কিন্তু, ফুটপাথে পা দিয়ে মনে হল নবমী রাতের পুজামণ্ডপ। পায়ে পায়ে জড়ামড়ি, ধস্তাধস্তি, গুঁতোগুঁতি সঙ্গে কনুইয়ের কোঁতকা। চার পাশ থেকে বিচিত্র সুরে কিম্ভূত ভঙ্গিতে, হ্রস্ব-দীর্ঘ নানা লয়ে হকারদের হাঁকডাক—সেল সেল, শুধু সেল! বাম্পার সেল! সেল ধামাকা! একশো টাকার জামার সঙ্গে পাজামা। ধুম মচা দে, সেল জমা দে! ওনলি ফিফটি, ফিফটি ওনলি! মনে হচ্ছে, কানের কাছে নানান সুরে / নামতা শোনায় একশো উড়ে। আরতি আর সন্তোষ পরস্পরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। দরিয়ার দিক গুলিয়ে ফেলা নাবিকের হাল। শঙ্খ শক্ত করে ধরে আছে বাবার হাত।

কাছেই একটা ছোকরা হকার স্ট্যান্ডে নানা রকম পাঞ্জাবি ঝুলিয়ে চিৎকার করছে—হোলসেল ফিফটি, হোলসেল ফিফটি—যা নেবে তাই ফিফটি। হঠাৎ একটি পাঞ্জাবি ধরিয়ে দেয় সন্তোষের হাতে। অপ্রস্তুত হয়ে আরতির দিকে তাকায় সন্তোষ।

কত দাম?

পঞ্চাশ টাকা, ফিফটি রুপিস ওনলি, কাল আর পাবেন না।

ভালো করে কিছু বোঝার আগেই ঘচাৎ করে জামাটা টেনে নিয়ে প্যাক করে দেয় ছেলেটি—লাটের মাল নয় দাদা, নিউ জিনিস। পরলে আপানাকে শারুক খানের মতো দেখাবে।

শাহরুখ নয়, এখন একটা পরিচ্ছন্ন গাড়লের মতো দেখাচ্ছে সন্তোষকে। ভেবলুর মতো মুখ করে টাকাটা বের করে দেয়। ছেলেটি গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করছে—ফিফটি রুপিজে শারুক খান, ঋত্বিক রোসন—হাত চালিয়ে, পা চালিয়ে—কাল আর পাবেন না।

মনটা খুঁতখুঁত করে আরতির—পাঞ্জাবিটা হুট করে কেনা হয়ে গেল। ভারতী নানা রকম টিপস দিয়েছে। সেল মার্কেটে চার দিকে গাদা গাদা গাড্ডা, সব সময় চোখ-কান খুলে রাখতে হবে, হামলে পড়েছ কী মরেছ। আজকাল জিনিসপত্র নাকি তৈরিই হচ্ছে চৈত্রসেলের জন্যে। কম সুতো, কাঁচা রং, মাপে একটু খাটো—প্রাোডাকশন কস্ট যথেষ্ট কমিয়ে তৈরি হচ্ছে মালটা। নতুন দেখে গলে গেল খদ্দের, কাক-কাঁকুড় জ্ঞান না করে কিনে ফেলল গণ্ডা গণ্ডা, আর দুদিন যেতে না যেতেই ন্যাতা। গোয়েন্দাদের মতো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, ছিপুড়েদের মতো ধৈর্য আর নেতাদের মতো মোটা চামড়া হবে, তবে সেলে বাজিমাত।

ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে নিজেদের শান্টিং করে নেয় ওরা। জনতার গ্যাদারিং-এ এই মজা। এক বার তাল-লয়ে মিলিয়ে নিতে পারলেই কেল্লা ফতে। আর ঝক্কি নেই। যা করার, যেখানে নিয়ে যাওয়ার, মহামানবের ঢল ব্যবস্থা করে দেবে।

পাবলিকের পায়ে পা মিলিয়ে ওরা এগোয়। সন্তোষ লক্ষ করে সে এখানে নিতান্তই সংখ্যালঘু। হোল মার্কেট দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রমীলাবাহিনী। ছন্নছাড়া পুরুষ যে ক’জনকে দেখা যাচ্ছে, তারই মতো গোবেচারা বডিগার্ড বা মূক ব্যাগ-বাহক। পুজোবাজারের সঙ্গে এটুকুই যা তফাত। না হলে সে বাজারও এত জমজমে হয় না। যত এগোয় তত অবাক। কী নেই! শাড়ি থেকে সাজের জিনিস, ব্যাগ থেকে ব্যাগি শার্ট, প্যান্ট থেকে প্যান্টি। এ দিকে পাপোষ, তো ও দিকে রুমাল, সামনে ফ্রক, তো পেছনে গেঞ্জি। হাঁড়ির পাশে হাতা, জগের পাশে মগ। কেউ তালি দিচ্ছে, কেউ দাবনা চাপড়াচ্ছে, টুলে উঠে ঊর্ধ্ববাহু নৃত্য করছে কেউ! এক জন বলে, দিদিভাই এ দিকে। অন্য জন—বউদিমণি দেখে যান। থার্টি পারসেন্টকে দাবড়ে বসিয়ে দিচ্ছে ফর্টির হুঙ্কার, তখনই সবার ওপর গলা চড়িয়ে দিচ্ছে ফিফটি পারসেন্ট। পুব-পশ্চিম উত্তর-দক্ষিণ রিভলভিং হ্যাঙারে বাঁই বাঁই করে ঘুরে হাতছানি দিচ্ছে শাড়ি-সালোয়ার-নাইটি।

এক লট শাড়ির সামনে আরতি। আকাশ কটন প্রিন্টেড শাড়ি। ও: মা, কী সস্তা! কিন্তু হাতে নিয়ে ধাক্কা খায়। কোনওটা বড্ড ময়লা, কোনওটা দাগে ভর্তি। নতুন মতো মনে হল যেটা, সেটার রং বড় ক্যাটকেটে। একটু থিতু হয়ে দেখার জো নেই। পেছন থেকে ধাক্কা আসছে, গুঁতো মারছে, একটু ফাঁক পেলেই মাথা গলিয়ে দিচ্ছে। চোখে-ধরা একটা শাড়ির দিকে হাত বাড়াতেই ক্ষিপ্র একটা হাত তুলে নেয় সেটা। আরতি বোঝে, এরাই হচ্ছে সেল-ঘুঘু। কুস্তিগিরের মতো জোশ, উইকেটকিপারের মতো ক্ষিপ্রতা। অরন্ধনের সময় ইলিশ বাছার কম্পিটিশন। বিস্তর গুঁতো আর লেঙ্গি সহ্য করে গাদা থেকে একটা শাড়ি তোলে—কত দেব ঠিক করে বলুন। তিরিক্ষে হকার বিরক্তি দেখায়—দিদি কি সেলে নতুন? সব ফিকস রেট, নিতে হলে ঝটপট নিন।

ব্যাগের পেট ফুলছে, হাত টনটন সন্তোষের। ইতিমধ্যে সেলের ইশারা-ইঙ্গিত বুঝে নিয়ে বেশ চড়কো হয়ে উঠেছে আরতি। তিনশো টাকায় সিল্কের শাড়ি, একশো টাকায় জিনসের শার্ট। ভাবা যায়! নাগা-সন্ন্যাসীদেরও নাল পড়বে। তারপর শঙ্খর জামাপ্যান্ট, সন্তোষের লুঙ্গি, বেডকভার, পাপোষ। ব্যাগ উপচে পড়ল বলে! অগত্যা নতুন ব্যাগ। সেটাও সেলে।

সূর্যদেব কিন্তু ফুল রেটেই তাপ দিচ্ছেন। কোনও ডিসকাউন্ট নেই। ঘেমে নেয়ে আলজিভ পর্যন্ত শুকিয়ে চচ্চড়ি। শঙ্খর বায়না, কোল্ড ড্রিঙ্কস খাব। কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়েই; চিপস খাব। এক প্যাকেট চিপস দশ টাকা। সন্তোষ ভাবে, এই মালটাকে সেলে চড়ানো উচিত; পাঁচ টাকার জিনিস সর্বত্র দশ টাকা দাম, তবু কেন যে ‘চিপস’ নাম হয়েছে কে জানে!

ও দিক থেকে হাঁক—ফেং শুই শাড়ি—নতুন বছরে ভাগ্য বদলান—ফেং শুই শাড়ি। আরতি চোখ নাচায়, কী গো, দেখব নাকি?

আরতির আর দোষ কী! চার দিকে এত শাড়ি, তার ওপর ডিসকাউন্ট— মাথার ঠিক থাকে! সন্তোষ বোঝায়, সেলের মাল, এক বারে এত বেশি ঠিক হবে?

ফেং শুই শাড়ি বলছে তো, তাই, বলা যায় না, এটা পরে লটারির টিকিট ফিকিট কাটলাম—

আরে ধুর, ওই শাড়ি ভাগ্য বদলাতে পারলে ওর অমন দশা হয়? সেলের মাল হয়ে ফুটপাথে গড়াচ্ছে।

ব্যস, আরতির মুখ থোম্বা। পরিস্থিতি প্যাঁচালো। হঠাৎ একটা ছেলে সন্তোষের হাতে হলুদ রঙের লিফলেট ধরিয়ে দিয়ে বলে, দোকানে আসুন না স্যার, ভালো জিনিস, দেখেশুনে নেবেন, ফিফটি পারসেন্ট অফ।

একটু ইতস্তত করে ছেলেটির সঙ্গে এগোয় তিন জন। সারি সারি বড় দোকান, নামি ব্র্যান্ড। কাচের দরজায় বড় বড় করে লেখা ৫০ পারসেন্ট অফ। বেশ পুলক লাগে। ভেতরে থরে থরে সাজানো শাড়ি। আরতির মুখের রাগ-বিরক্তি কর্পূরের মতো উবে গেছে। একটা তাঁত সিল্ক পছন্দ হয়। দাম লেখা ছশো। তার মানে তিনশো। খচাৎ করে ক্যাশমেমো ছেঁড়ে ক্যাশিয়ার। কিন্তু, এ কী! পাঁচশো চল্লিশ কেন? কাউন্টারের সেলসম্যান কান এঁটো করা হাসি ছুড়ে বলে—সব শাড়িতে তো আর ফিফটি পারসেন্ট নেই, এটাতে টেন ছিল।

—কিন্তু আমাদের ফিফটি পারসেন্ট বলে ডেকে নিয়ে এসেছে!

—আপনি ভুল শুনেছেন, ফিফটি পারসেন্ট পর্যন্ত ছাড়।

—তবে ফিফটি পারসেন্ট কীসে?

—ওই যে ও দিকে। এক কোণে ঝুলতে থাকা শাড়িগুলো দেখায়।

দু-একটা শাড়ি ঘেঁটে আরতি বোঝে এগুলোকে ন্যাতা বললে ন্যাতার অপমান হয়।

বুড়বকের মতো দোকান থেকে বেরিয়ে এসে সন্তোষ কাচের দরজার দিকে তাকায়। ঠিকই ৫০ শতাংশর উপরে ছোট্ট করে লেখা—আপ টু!

সেই দুপুর থেকে বিস্তর হাঁটাহাঁটি। পেটের মধ্যে বুকডন দিচ্ছে ধেড়ে ছুঁচো। একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে ওরা। এখানেও গাদাগাদি ভিড়, মিউজিক্যাল চেয়ার চলছে। খাওয়া শেষ হতে না হতেই ওয়েটার টেনে নিচ্ছে ডিশ, অন্য লোক ঝাঁপিয়ে পড়ছে কোলের ওপর। মেনুকার্ডটা ভালো করে লক্ষ করে আরতি—না:, কোথাও ডিসকাউন্টের গন্ধ নেই। হঠাৎ সামনের টেবিলে চোখ আটকে যায়। মুখটা খুব চেনা মনে হচ্ছে। সেও দেখছে আরতিকে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছে। অনিন্দিতা। সেই কলেজবেলার বন্ধু। বেশ মুটিয়েছে, ত্বকেও জেল্লা। কিন্তু আগের মতনই হুল্লোড়বাজ। হইহই করে উঠল—তুই আরতি, না?

—তুই অনিন্দিতা?

ব্যস জমে গেল দু-বন্ধু। পুরোনো কথা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, মান-অভিমান, ছেলেমেয়ে, রান্নার লোক, জলের সমস্যা, মাথার খুশকি। শেষে অনিন্দিতা—বাব্বা, কত কিছু কিনেছিস রে!

—হ্যাঁ রে, জানতাম না এত সস্তা! লোভ সামলাতে পারলাম না।

—কার জন্য? অনিন্দিতা বলে।

—কার আবার, নিজের জন্যেই। তুই ক’টা কিনলি?

অনিন্দিতা বলে, আসলে সেলে নিজের জন্য তেমন কিছু কেনা হয় না রে। অ্যাকচুয়ালি সারা বছরের কেনাকাটা এই সময় করে নিই। আমার তো লতায়-পাতায় আত্মীয় কম নয়—পুজোয় সবাইকে দিতে-টিতে হয়, তারপর ধর রান্নার লোক, ঠিকে ঝি, ড্রাইভার—ইন ফ্যাক্ট চৈত্রসেলে আমি পুজো মার্কেটিংটা সেরে রাখি।

সন্তোষ সায় দেয়। যা দেখছি, পুজোর বোনাসটা চৈত্রে পেলেই ভালো হত।

অনিন্দিতা বলে, আমি এক বার গড়িয়াহাট যাব, যাবি? গাড়ি আছে।

আরতিকে কেমন যেন সেলের ঘোরে পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রাজি। কিনুক না কিনুক, দেখা তো যাবে।

গড়িয়াহাটের ভিড়টাও বেশ গায়ে-গতরে, ফুটপাথ উপচে রাস্তায়। নিট ফল : ট্রফিক জ্যাম। ট্রামের ঘন্টি, বাসের হর্ন, মানুষের হাঁকডাক—সত্যিই মনে হচ্ছে বাঙালির চোদ্দো নম্বর মোচ্ছব। তুখোড় যুবতী, ন্যুব্জ বৃদ্ধা, পৃথুলা রমণী, ছা-পোষা গৃহিণী, শ্রমজীবী নারী—সবাই এই মহা সেলের সাগরতীরে। কারও মুখে টেনশন, কারও যুদ্ধজয়ের দীপ্তি, কারও ক্লান্তি আর হতাশা। লাফাচ্ছে, ছুটছে, হাঁপাচ্ছে, হেদিয়ে পড়ছে। হাঁকডাকের পারা চড়ছে পাল্লা দিয়ে। ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে হবে জমে থাকা মাল।

একটু পরেই চমক। বৈশাখী মুখার্জি না! ঘুরে ঘুরে কোনাকাটা করছে। সঙ্গে এক জন গাঁট্টাগোঁট্টা গুঁফো লোক। কে রে বাবা! ওর বর নাকি! এ মা, কী বিচ্ছিরি দেখতে। আরতি সন্তোষকে দেখায়, ওই দেখো বৈশাখী মুখার্জি।

—সেটা আবার কে?

—ওহ, তুমিও যেমন। চেনো না, কত সিরিয়াল করছে। ওই যে গো, ‘চার দেওয়ালের মধ্যে’র ছোট বউ, ‘ওয়ারের রং লাল’-এও আছে। এ বার তো শুনছি ফিল্মও করছে; ‘আমি সাগর তুমি ঢেউ’-এ নায়িকার বোন।

—যাক, তোমার সেলে এসে স্টার দেখা হয়ে গেল।

—নায়িকারাও সেলে কেনে!

অনিন্দিতা—কিনবে না, রোজ রোজ অত নতুন শাড়ি সেল ছাড়া জোগাবে কে!

একটা দোকানে ঢুকে যায় বৈশাখী মুখার্জি। কাছে গিয়ে ভালো করে দেখতে ইচ্ছে করে আরতির। আবার ভাবে, সত্যি বৈশাখীই তো? ক’দিন আগে কাগজে ইন্টারভিউ দিয়েছিল ও নাকি স্বচ্ছন্দে কেনাকাটা করতে পারে না, রেস্তোরাঁয় খেতে পারে না—সব সময় লোক ছেঁকে ধরে। এ তো বাবা বেশ একা একাই ঘুরছে!

গড়িয়াহাটের পর ওরা শিয়ালদাতেও ঢুঁ মারল এক বার। সন্ধে হয়ে গেছে। চার দিকে ভেপার ল্যাম্প। সেই খ্যাপাটে ভিড়, সেই বিজাতীয় হাঁকডাক। গুড়ে মাছি বসার মতো ক্রেতারা ছেঁকে ধরছে হকারকে। সুযোগ বুঝে মতলববাজ লোকজন শরীর ছুঁয়ে দিল দু-এক বার, একটা পকেটমারকে মার খেতে দেখল। আর তারই মাঝে কখন যেন ভরতি হয়ে গেল আর একটা ব্যাগ।

শঙ্খ ফিসফিস করে বলল, মা, দাদুর গামছা। তাই তো, এতক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছে, গামছা চোখে পড়েনি। কিন্তু টাওয়েল তো রয়েছে। অগত্যা গামছার বদলে টাওয়েল।

হাওড়া বাসস্ট্যান্ডে একটা ব্যাগের হাতল গিয়েছিল, পাড়ায় ঢোকার মুখে দু-নম্বর ব্যাগটাও গেল। মনটা একটু দমে যায় আরতির। সন্তোষ সান্ত্বনা দিল, সেলের মাল তো একটু আপলকা হবেই। কিন্তু ভেতরের জিনিসগুলো! ধোপে টিকবে তো! যা ভিড়! একটু দেখেশুনে নেবার উপায় নেই। ক’দিন আগে গেলে ভালো হত। যাক, অভিজ্ঞতাটাও তো কম নয়। সামনের বছর আরও তাড়াতাড়ি যাবে, সরেস মালগুলো থাকতে থাকতে কেনাকাটা সেরে নেবে। ভাবতে ভাবতে হাতল ছেঁড়া ব্যাগ দু-হাতে বুকের মধ্যে জড়িয়ে বাড়ির দিকে এগোয় আরতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *