ঠগি-ঠ্যাঙাড়ে
বাবুয়ার সঙ্গে দেখা সেদিন। বেশ মনমরা। বাবুয়ার বিষণ্ণতা ব্যাপারটা সধবার একাদশীর মতো। ওর মেজাজের দুটো ‘কালার’—গরম আর মস্তি। তাই জিগ্যেস করলাম, কী রে, মনখারাপ কেন? বাবুয়া বলল, দাদা, চারদিকে যে এত পরিবর্তন-পরিবর্তন শুনলাম, কোথায় দাদা, কিছুই তো শালা টের পাচ্ছি না! আমি বললাম, কেন? বাবুয়া ব্যাখ্যা করার আগেই একটা ফোন এল ওর মোবাইলে। এক শাগরেদের ফোন। কোথায় কী একটা ঝামেলা হচ্ছে। ফোনেই তাকে পেটো ‘চার্জ’-এর নির্দেশ দিয়ে দৌড়োল বাবুয়া। বলে গেল—পরে ‘ডিটেল’-এ কথা বলব দাদা।
বাবুয়া আসলে গুণের ছেলে। তার মানে এই নয় যে, বাবুয়া ‘গুণ’ নামে কোনও ব্যক্তির ঔরসজাত সন্তান। মানে হল, বাবুয়ার অনেক গুণ। এক ডাকে এলাকার সবাই চেনে। অবশ্য শুধু বাবুয়া বললে হবে না। কারণ, এলাকায় জনাছয়েক বাবুয়া রয়েছে। বলতে হবে, ‘হাতকাটা বাবুয়া।’ বাবুয়ার ডানহাত কবজি থেকে বহুদিন ‘ভ্যানিশ।’ তাতে অবশ্য বাবুয়ার কোনও পরোয়া নেই। বাঁ-হাতে নিখুঁত নিশানায় মেশিন চালাতে পারে সে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রতিবন্ধী অলিম্পিকের ‘শ্যুটিং’-এ গেলে বাবুয়া অনেক মেডেল আনতে পারত।
বাবুয়া যে গুণের ছেলে, সেটা প্রথম টের পান ভানুবাবু। আসলে ভানুবাবুও গুণী মানুষ। সবাই জানে, একজন প্রকৃত গুণী মানুষই অন্য প্রকৃত গুণী মানুষকে চিনতে পারেন। ভানুবাবুর সমাজসেবার বাতিক ছিল। সমাজের নিপীড়িত, শোষিত পাবলিকের জন্য ভানুবাবুর প্রাণ আকুল হয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, আমাদের এই শাসনব্যবস্থা আদতে বুর্জোয়া কিছু মানুষের কুক্ষিগত এবং এটা গরিব-আদমি পেষাইকল ছাড়া কিছু নয়। এই সব সহজ-সরল অসহায় মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে আসছে স্বার্থান্বেষী একদল মানুষ। এদের উন্নতি না-হলে দেশের উন্নতি অসম্ভব। তাই ভানুবাবু এই সব মানুষকে সচেতন করার কাজে লেগে পড়লেন। তাদের আত্মমর্যাদা আর অধিকারের গল্প শোনালেন। রুখে দাঁড়াতে বললেন, কাঁঠাল-ভাঙিয়েদের বিরুদ্ধে। ফলও পেলেন হাতেনাতে। ভানুবাবু ভোটে দাঁড়ালেন এবং জয়লাভ করলেন বিপুল ভোটে।
এখন ভানুবাবু তো কুরশিতে বসলেন। বসে দেখলেন, বেশ আরাম। গদি যতটা নরম ভেবেছিলেন, তার চেয়েও বেশি নরম। অনভ্যাসের জন্য প্রথম ক’দিন গা ব্যথাও করল। বুঝলেন বেশি আরাম ভালো নয়। এই দর্শন পরবর্তীকালে তাঁর প্রভূত উপকার করল। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সর্বহারা মানুষের কাজ করবেন। তাদের ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু কুরশিতে বসার পর গদি, গাত্রব্যথার মাধ্যমে যে দর্শনবোধ তাঁর মধ্যে গেঁড়ে গিয়েছিল, তদ্বারা তিনি বুঝলেন, এতকাল যারা পেটে কিল মেরে কাটিয়েছে, বেমক্কা সরু চালের ভাত তাদের পেটে সইবে না। তাই মোটা চাল। বুভুক্ষু মানুষগুলো সেই ভাতই বেদম খেল। সন্দেহবাতিক দু’একজন সামান্য খুঁতখুঁত করেছিল—ভাতে যেন স্বাদ কম, গন্ধ-গন্ধ। ভানুবাবুকে কিছু বলতে হয়নি। অন্যেরাই ধমকে দিয়েছিল তাদের। চোপ, ভগবান আর ভানুবাবু যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন! এইসব করতে গিয়ে ভানুবাবু দেখলেন, প্রচুর অর্থ উদ্বৃত্ত। ভানুবাবু পড়লেন সমস্যায়, কী হবে এই টাকা? অনেক ভাবার পর সমাধান মিলল। বিশাল একটা বাড়ি ফাঁদলেন, ঝকঝকে গাড়ি কিনলেন, ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্সটাও গায়ে-গতরে হল। দু’চারজন ফিসফাস করল। ভানুভক্তেরা বোঝালেন, ভানুবাবু তো জনগণেরই লোক, তাই তাঁর বাড়ি জনগণের বাড়ি, তাঁর গাড়ি জনগণের গাড়ি—অর্থাৎ, বউ ছাড়া তাঁর আর যা যা কিছু, সবই জনগণের।
আবার ভোট এল। ভানুবাবু দেখলেন, সেদিনের সেই ফিসফাস কোলাহলের আকার নিয়েছে। ভানুবাবু নাকি জনগণকে ধাপ্পা দিয়েছেন, তাই তাঁকে কিছুতেই ভোট নয়। ভানুবাবু দেখলেন, এই কোলাহলকে বুঝিয়ে বা দাবড়ে চুপ করানো যাবে না। অগত্যা তিনি বাবুয়ার শরণাপন্ন হলেন। বাবুয়ার পিতামহ ছিলেন তৎকালীন জমিদারের মুখ্য লেঠেল। পেশিবহুল তাগড়াই শরীর ছিল তাঁর। সেইসঙ্গে অতুলনীয় প্রভুভক্তি। হুকুম পেলে যে কোনও বেয়াদব প্রজাকে সহবত শিখিয়ে দিতেন। নদীর বুকে নতুন চর দেখা দিলে কিংবা অন্য জমিদারের কোনও জমি নজরে ধরে গেলে দলবল নিয়ে রে-রে করে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। শামুকখালি বিলের পাঁকে, বকপোতার চরে খুঁজলে এখনও তাঁর হাতে পোঁতা অনেক কঙ্কাল পাওয়া যাবে। সেই লেঠেলের সুযোগ্য বংশধর আমাদের এই বাবুয়া। তারও বুকে দুর্জয় সাহস, মাথায় ক্ষুরধার বুদ্ধি। সেই বুদ্ধি আর সাহস সম্বল করেই সে দিনে দিনে হয়ে উঠেছিল ‘ওয়াগন ব্রেকার’-দের লিডার।
বাবুয়া আবার সেই সময় বেশ বেকায়দায়। দিন দিন পুলিশের হুজ্জুতি বাড়ছে। মার খাচ্ছে ব্যবসা। ভানুবাবু কথা দিলেন, পুলিশের ব্যাপারটা তিনি দেখবেন। বাবুয়া কসম খেল, ভোটে ভানুবাবুর হয়ে জান লড়িয়ে দেবে।
হ্যাঁ, সত্যি বটে। বাবুয়া জবান রেখেছিল। চ্যালা-চামুণ্ডা নিয়ে ভোটে এইসান খাটুনি দিল যে, ভোটার ভোটকর্মী কারও কোনও কাজ থাকল না। পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে বলে এল—আপনাদের কষ্ট করে বুথে গিয়ে, লাইন দিয়ে ভোট দেওয়ার দরকার নেই, সেই কাজের জন্য আপনাদের সেবক বাবুয়া আছে।
কিছু মানুষ আছে, যারা কানে কম শোনে, তারা বাবুয়ার কথাগুলো ঠিক শুনতে পেল না। কিছু মানুষ শুনতে পেল, কিন্তু বুদ্ধি কম, কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারল না। কিছু মানুষ শুনতেও পেল, বুঝতেও পারল, কিন্তু তারা বড় ভুলো, ভোটের দিন ভুলে গেল সব। এই সব কিছু বোকা, কালা আর ভুলোর দল পরদিন হাজির হয়েছিল বুথে। ফলে বাবুয়াকে কিছু মেহনত করতে হল। কয়েকজনকে চড়-থাপ্পড়, রিভলভারের বাঁটের গাঁট্টা আর পেটো নিক্ষেপ। ব্যস! সব ফরসা। বাবুয়া ব্যালেটে ছাপ মারতে মারতে ক্ষোভের গলায় বলল, শালা, এই জন্যই কারও ভালো করতে নেই।
ভানুবাবুর এক হিংসুটে ‘অপোনেন্ট’ ছিল। তাঁর নাম মিনুদি। তিনি সব কিছুতেই ভানুবাবুর দোষ ধরতেন। ভানুবাবুর রং ময়লা, ভানুবাবুর নাক বোঁচা, চোখ ট্যারা ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি ভোটে অন্যায় হয়েছে বলে, বিস্তর কাঁউমাউ করে নালিশ জানালেন, ভানুবাবু বললেন—বোগাস, হেরে যাবেন বুঝে মিনুদি এই সব আঙবাঙ বকছেন। উনি আসলে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছেন।
ফল বেরোতে দেখা গেল, ভানুবাবু বিপুল ভোটে জিতেছেন। মিনুদি হেরে ভূত। ভানুবাবু ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানালেন এবং আরও প্রবল জনসেবার অঙ্গীকার নিলেন।
হ্যাঁ, কথা রাখলেন ভানুবাবু। জনসেবার দৌলতে তাঁর আরও একটা গাড়ি হল। বাড়ি আরও বড় হল। ব্যাঙ্ক-ব্যালান্সের গায়ে আরও গত্তি লাগল। আর এ সবের মধ্যেই ভোট এসে গেল আবার।
এবার ভানুবাবু দেখলেন, সেদিনের সেই কোলাহল আরও উচ্চগ্রামে পৌঁছেছে। ঘোঁট পাকাচ্ছেন মিনুদি। ফলে ফের বাবুয়াকে তলব। তবে বাবুয়াকে একটু বেশি গা ঘামাতে হল এবার। কিছু কচুয়া ধোলাই, দু’চারটে লাশ আর কয়েকটা ঘরে অগ্নিসংযোগ। ফল সেই এক। ভানুবাবুর বিপুল ভোটে জয় আর মিনুদির নাকিকান্না।
তারপর বছরের পর বছর চলতে লাগল এই গল্প। ‘গিনেস বুক’-এ নাম খোদাই হয়ে গেল ভানুবাবুর। লোকে বিশ্বাস করতে শুরু করল, সংগীতে যেমন সুর, শিঙাড়ার যেমন পুর, গরুর যেমন খুর, মসনদে তেমনই ভানুবাবু। এর কোনও ব্যত্যয় নেই। সারাজীবন নাকেই কেঁদে যেতে হবে মিনুদিকে।
এরপর একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল। কেউ কেউ আবার এটাকেই বড় করে দেখে। ভানুবাবু রাজ্যপাট থেকে অবসর নিলেন। তাঁর নাকি ভয়ানক পেটের ব্যামো, বার বার পটি পায়, তাই আর পারছিলেন না। কেউ বলল, বাজে কথা, উনি পটি করে করেই চালাবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু ওঁর ভাই কানুবাবু কলকাঠি নেড়ে সরিয়ে দিয়েছেন ওঁকে। যাই হোক, রাজপরিবারে এমন হয়েই থাকে। মোদ্দা কথা, ভানুবাবুর মসনদে এখন কানুবাবু। অনেককেই বলতে শোনা গেল, এই বেশ। পটি করে দেশ শাসন জিনিসটা মোটেই ভালো দেখায় না। উনি যে বহুদিন ধরে পটি করে চালিয়ে যাচ্ছেন, শাসনের নমুনাতেই পরিষ্কার। আর যাই হোক, কানুবাবুর এ সবের বালাই নেই। তিনি অন্যরকম মানুষ। মেলা পড়াশোনা, নিজে কেতাব লেখেন, ভালো ভালো থিয়েটার-বায়োস্কোপ দেখেন। তাঁর রাজত্বে বাবুয়া-টাবুয়া টাইট খেয়ে যাবে।
কিন্তু দেখা গেল, ও বাবা, এ-ও তো দাদার ভাই। কেতাব-টেতাব সব ভাঁওতা। বাবুয়া তো দিব্যি আছে। রোয়াব বেড়েছে বই কমেনি। আর বাবুয়ার রোয়াব বাড়া মানেই প্রজাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। লোকে বলতে গেল, কানুবাবু দেখুন একটু, বাবুয়া যে বড্ড বজ্জাতি করছে। একটু বকঝকা করুন। ভানুভক্তের মতো কানুভক্তও ছিল প্রচুর। তারা বলল, চুপ! কানুবাবু এখন ‘কালচার’ করছেন। এসব করতে গেলে ‘কালচার’ চলকে যাবে।
টানা বহুদিন এই কাহিনি চলার পর একদিন কেমন করে যেন সব ঘেঁটে গেল। আসলে কানুবাবু বড্ড বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন। রাজ্য পরিচালনার কতগুলো নিয়ম আছে। বাবুয়া যদি কোথাও কোনও কীর্তি করে আসে, উচিত হল, পরদিন ধোপদুরন্ত ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, পারিষদবর্গ সমভিব্যাহারে সেখানে যাওয়া। গিয়ে লাশের বাবা, ধর্ষিতার মা বা ছাই হয়ে যাওয়া বাড়ির কর্তাকে কিছু সান্ত্বনাবাক্য শোনাতে হয়। বাবুয়ার নামে নরমগরম দু-চার কথা বলতে হয়। বাবুয়াকে গারদে ভরার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। কানুবাবু এসব গা করলেন না। তারপর বড্ড বেশি দুচ্ছাই শুরু করলেন মিনুদিকে। মিনুদির কোনও কথাই কানে তোলেন না। একবার তো বলেই বসলেন—আমি রাজা। বাট হু ইজ মিনু? আমার ঘরে যে ধন আছে, মিনুর ঘরে কি সে ধন আছে?
ব্যস! কানুবাবুর এই কথায় বিপুল হইচই শুরু হল। নিন্দেমন্দ। রাজ্য চালাতে গিয়ে নাকি অমন বলতে নেই। সে যতই তুমি রাজা হও। রাজার উচিত, টুনির কথাও মন দিয়ে শোনা।
কানুবাবু দেখলেন, মহাবিপদ। সবাই যেন তাঁর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। তাঁর মনে হল, একটু শাসন দরকার। বাবুয়াকে ‘অল-আউট’ যেতে বললেন। বাবুয়া ‘ফুল ফোর্স’ নিয়ে ঝাঁপাল। কিন্তু হল হিতে বিপরীত। আরও বেশি মানুষ কানুবাবুর বিরুদ্ধে কোমর বাঁধল। দিশেহারা কানুবাবু আবার বেফাঁস বললেন। ইংরেজি কপচালেন—ঢিলটি ছুঁড়লে পাটকেলটি খেতে হয়। আবার ছিছিক্কার। অনেকে এতে ‘পলিটিক্যাল’ দোষ দেখলেন, অনেকে ‘গ্রামাটিক্যাল’।
মওকাটা চমৎকার কাজে লাগালেন মিনুদি। ভারি অমায়িক ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন, তাঁকে একবার সুযোগ দেওয়া হোক, সুশাসন আনবেন। কারণ, তিনি পাটকেল-থিওরিতে বিশ্বাস করেন না। আরও বললেন, এই সব বাবুয়া-টাবুয়াকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে দেবেন। মানুষ বিশ্বাস করল তাঁকে। তিনি সিংহাসনে বসলেন।
এই সময় বাবুয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। ভেবেছিলাম, খুব টেনশনে দেখব। কারণ মিনুদি তো বলেই দিয়েছেন, শিক্ষাক্ষেত্র, শিল্পক্ষেত্র, স্বাস্থ্যক্ষেত্র—এ সবকে কখনও রণক্ষেত্র হতে দেবেন না। বাবুয়ার ছায়া দেখলেই দূরদূর করে খেদাবেন, কিন্তু বাবুয়া দেখলাম, বিন্দাস।
বললাম, কী রে বাবুয়া, তোর দিন তো গেল।
বাবুয়া হাসল। বলল, আপনিও দেখছি দাদা দাদুর মতো।
কে দাদু? আমি অবাক।
আমার দাদু ঈশ্বর পরাশর সর্দার। যিনি জমিদার বীরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর প্রধান লেঠেল ছিলেন। যাঁর নামে প্রজারা ঘোর জষ্ঠিতেও মাঘের শীতের মতো কাঁপত। যাঁর নাম শুনলে কান্না থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত বাচ্চারা। সেই দাদুও দেখি আমার জন্য ভেবে অস্থির।
আমি অবাক হয়ে বললাম, দাদুকে দেখলি কী করে? তিনি তো বহুদিন আগেই….
দাদু রোজ রাতেই আমায় দেখা দেন, দাদা! অনেক কথা হয়।
বুঝলাম, সাতসকালে খুব টেনেছে বাবুয়া। তবু বললাম, কী কথা বলিস?
বাবুয়া বলল, দাদুর প্রথমে খুব চিন্তা ছিল আমায় নিয়ে। আমার এই পাতলা শরীর। তার উপর নেশাটেশা করি। মেয়েমানুষের দোষটাও আছে। দাদু নাকি শরীরের যত্ন নিতেন খুব, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাঠি-চালানো ‘প্র্যাকটিস’ করতেন। আমি বলেছিলাম—দাদু, তোমার হাতে তো পেটো-মেশিন ছিল না, থাকলে বুঝতে শরীর-টরীরের দরকার পড়ে না। শুধু হাঁকডাক আর নার্ভটা ঠিক রাখলেই হল। দাদু বলতেন, ঠিক আছে দেখব, আমার লাঠির জোর বেশি না তোর পেটো-পিস্তলের।
আমি বললাম, বলিস কি।
হ্যাঁ, দাদা। যেদিন পশ্চিমপাড়ায় গোটা পঞ্চাশ খুলি উড়িয়ে দিলুম, দাদুর সে কী আনন্দ! বললেন,—তুই তো আমাকেও যে ছাড়িয়ে গেলি রে নাতি! আমি একবার একসঙ্গে চল্লিশটার মতো উড়িয়ে ছিলুম কর্তামশায়ের আদেশে। তারপর যেদিন রাঘবনগরে একরাতে তিনটে লাশ নামালুম, দাদু বললেন—এইখানে তুই হেরে গেলি বাবুয়া। মোল্লাচকের চর দখল করতে গিয়ে একদিনে সাতটাকে শ্মশানে পাঠিয়েছিলুম। ওফ, সে কী রক্ত রে! ভাবলে এখনও শরীর গরম হয়ে ওঠে। কী কান্না আর হাহাকার। শুনলে কান জুড়িয়ে যায়। সোমত্ত মেয়েছেলেগুলোকে যখন ধরে ধরে কর্তাবাবুর ঘরে ঢুকিয়ে দিতুম, কী আকুতি আর আর্তনাদ তাদের। মনে পড়লে এখনও শিহরন জাগে।
শুনে আমি থ হয়ে রইলুম কিছুক্ষণ! তারপর বললাম, তা তোর দাদু এখন কী বলছেন?
দাদু বলছেন, বাবুয়া এবার তো তোর বিপদ রে। মনিবের সিংহাসন তো উলটে গেল।
আমি বললাম, ঠিকই তো।
বাবুয়া বলল, দেখুন দাদা, আপনি হয়তো ভাবছেন, বাবুয়াটা মাল টেনে ভুলভাল বকছে। দাদু সেকেলে লোক। ক্রিকেট-ফিকেট বোঝেন না। কিন্তু আপনি বুঝবেন বলেই বলছি, আমি হচ্ছি আইপিএল-প্লেয়ার। আমার মধ্যে এখনও অনেক ক্রিকেট আছে। খেলাটাকে এখনও উপভোগ করি। আমার টিমের অভাব হবে না। পরে মিলিয়ে নেবেন কথাটা।
সেদিন কিছু বলিনি। চলে এসেছিলাম। পরে দেখলাম, বাবুয়ার কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।
কিছুদিনের মধ্যেই নানা অভিযোগ মিনুদির নামে। ভোটের আগে মিনুদি যা-যা বলেছিলেন, আর এখন যা যা করছেন, তাতে নাকি বিস্তর গরমিল। সব কিছুতেই তিনি কানুবাবুর চক্রান্ত দেখছেন। সারদা থেকে শিলাজিৎ, অতিবর্ষণ থেকে গণধর্ষণ—সবই সাজানো। সবাই নাকি কাজকর্ম ফেলে তার পাকা ধানে মই দিচ্ছে। সব চেয়ে বড় কথা, কোথায় গেল তাঁর সেই অমায়িক ভঙ্গি! উনিই এখন কথায় কথায় তেড়ে যান, দাঁত খিঁচোন, ঘুসি পাকান। নিজেই বলেন—’আমি রাফ অ্যান্ড টাফ।’ লোকে বলতে লাগল, এ কী ব্যাভার! আপনি তো সেই ভানুবাবু-কানুবাবুর মতনই…একদিন তাঁর হয়ে যাঁরা সওয়াল করেছিল তাদের অনেকেই আওয়াজ তুলল।
ভোট এসে গেল আবার। অবাক হয়ে দেখলাম, বাবুয়া ফের ‘ফিল্ড’-এ। আবার মহল্লায় মহল্লায় ঘুরছে।
রেজাল্ট বেরোতে দেখা গেল, মিনুদি বিপুল ভোটে জিতেছেন। এবার কাঁউমাউ শুরু করলেন কানুবাবু। মিনুদি বললেন—বোগাস, কানুবাবু আসলে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন। মিনুদি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং বিপুল ভোটে জয়লাভের সব কৃতিত্ব দিলেন জনসাধারণকে।
এখানে ক্ষোভ বাবুয়ার। তার দাবি, পরিবর্তন বলে কিছু হয়নি, অবস্থা সেই আগের মতনই।
আমি বললাম, তাই তো দেখছি, তুই আগেও যা করতিস, এখনও তাই।
বাবুয়া বলল, সে কথা নয় দাদা। আমার কাজ আমিই তো করব। কথা হচ্ছে স্বীকৃতি। আগেও দেখেছি, এখনও দেখছি, ভোটে জিতে কেউই আমায় অভিনন্দন জানায় না। ক্যামেরার সামনে, রিপোর্টারের কাছে বলে না যে, বাবুয়ার জন্য জিতলাম, বাবুয়াকে অভিনন্দন। সবাই শালা জনগণকে অভিনন্দন জানায়। কাজ করব আমি আর অভিনন্দন পাবে পাবলিক। স্বীকৃতি সবাই চায় দাদা। আমি তাই একটা অন্য ধান্দা করছি।
বললাম, কী?
আমি নিজেই এবার ভোটে দাঁড়াব। দল খুলব। আমার ‘পার্টি-অফিস’ থাকবে, ‘সিম্বল’ থাকবে, ভোটের আগে ইস্তেহার প্রকাশ করব। এরা কে কেমন চালায়, আমার জানা হয়ে গিয়েছে। মাসান্তে একটা ‘রেপ’, দু’টো ‘মার্ডার’, মাস্টার প্যাঁদানো, হাসপাতালে হুজ্জুতি, কারখানায় লালবাতি—এসব ব্যাপারে ‘গ্যারান্টি’। টাকাকড়ি অনেক হয়েছে দাদা, এবার একটু সনমান আর সিককিতি চাই। কী দাদা, অন্যায় বলছি?
না না। বললাম আমি।
আমায় তা হলে ভোটটা দেবেন তো? খুব মোলায়েম গলায় বলল বাবুয়া।
