ঘেঁটে দিলে নতুন হবে জীবন – উল্লাস মল্লিক

ঘেঁটে দিলে নতুন হবে জীবন

ফার্নিচার মেয়েদের গয়নার মতো। একদম না থাকলে পড়শি বলবে—’হাভাতে পার্টি’, কেনার দম নেই। আবার গাদাগাদি থাকলে বলবে রুচি নেই, পয়সা আছে, তাই কিনেছে।

গয়না মেয়েদের অবসেশন হলে, ফার্নিচার হল স্বামী-স্ত্রীর যৌথ প্যাশন। মোটামুটি এখন বিয়ে পাকা হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় কেনাকাটা। তারপর চলতেই থাকে চলতেই থাকে, জীবনভর চলতে থাকে। এর মধ্যে কত উত্থান-পতন কত মান-অভিমান সম্পর্কের কত বাঁকচোর। তবু এর মধ্যে অজানা আগন্তুকের মতো ঠিক কখন যেন এসে যায় তারা। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি হল, জীবনের অন্তিম ফার্নিচারটা নিজের পছন্দসই কেনার উপায় নেই। এখানে পরনির্ভরতা অবশ্যম্ভাবী—পর রুচিতে চোখ বুজে সায় দিতে হয়।

ঘরের প্রধানতম আসবাব, বলা বাহুল্য, খাট। ইনি মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী, বাকি সব আসবাবের নিয়ন্ত্রক। যদি সেগুন বা মেহগনি কাঠের জম্পেশ পালঙ্ক হয়, তার পাশে রট আয়রনের শৌখিন ড্রেসিং টেবিল রাখলে মনে হবে সোনার চন্দ্রহারের সঙ্গে প্ল্যাটিনাম চুড়ি পরেছে। ভারিক্কি পালঙ্ক, যার পায়াগুলো বাঘের থাবার মতো, দু-পাশে উঁচু কারুকাজ যদি থাকে তবে চেয়ার-টেবিল আলনা-আলমারি হবে উপযুক্ত রাশভারী চেহারার। হাল ফ্যাশনের বক্সখাট বা ডিভান হলে সঙ্গে সোফা, কর্নার-টেবিল ওয়ারড্রোব। আবার খাট যদি রট আয়রনের হয় তবে ঘরে কাঠের নো এন্ট্রি। তখন পারিষদবর্গ সবাই আয়রন ম্যান।

ঘটিবাটি পাশাপাশি থাকলে নাকি ঠোকাঠুকি অনিবার্য। ফার্নিচার নিজেরা ঝামেলায় জড়ায় না। কিন্তু গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। বাড়ির সব আসবাবপত্র এক জায়গায় রেখে যদি একটা জীবন কাটিয়ে দেয় কোনও দম্পতি, তবে বুঝতে হবে তাদের প্রেমে ঘুণপোকা লেগেছে। কিছু দিনের মধ্যেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। দাম্পত্য যখনই বাক্যময়, বর্ণময় এবং সংগত কারণেই প্রেমময় হবে, তখনই ফার্নিচারবৃন্দের ঠ্যাং বেরোবে, ডানা গজাবে। ঘরের উত্তর-পূর্ব দিকের যে খাট তার হঠাৎই মনে হতে থাকবে দক্ষিণের জানালার ধারটা তোফা জায়গা, আলো-বাতাসের হুটোপুটি। ঠিক আছে বাবা, খাট গেল দক্ষিণে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাস্তুচ্যুত হতে হল রাইটিং টেবিল আর ওয়ারড্রোবকে। তারা এদিকে এসে ঘাড় ধাক্কা দিল ড্রেসিং টেবিলকে। সে উদ্বাস্তু হয়ে অন্যদিক জবরদখল করল! তখন আবার ওয়ারড্রোবকে হতে হল ধাঁইনাড়া। আর কী কাণ্ড—ওয়ারড্রোবটা ওখানে গিয়ে ঢেকে দিল যে বুচানের ছবিটা! কর্তা খিঁচিয়ে উঠলেন, বেশ তো ছিল, তুমি শুধুশুধু ঘাঁটাঘাঁটি করতে গেলে কেন? গিন্নিও ফুঁসে উঠল—তুমি তো রোজ শোবার পর বলতে, খাটটা এমন জায়গায়, হাওয়া লাগছে না একটুও। ব্যস, বেজে গেল যুদ্ধের দামামা।

কিছুদিন পর কর্তা ঝোঁকের মাথায় দুটো বেতের চেয়ার ঢোকালেন ড্রয়িংরুমে। ফলে সোফাসেটকে জায়গা করে দিতে হলে সরতে হয় বুককেসকে। কিন্তু সরে যাবে কোথায়? ওখানে তো অ্যাকোয়ারিয়াম। অ্যাকোয়ারিয়ামটা তাহলে ওই জানালার কাছে বসাও। কিন্তু ওখানে আবার চড়া রোদ, গরমকালে জল তেতে উঠবে যে। তাহলে উপায়? টিভি সেটটাকে তো জায়গামতো রাখতেই হবে—আই লেভেল থাকে যেন। ফের শুরু হয়ে গেল কর্তা-গিন্নির মধ্যে। আসলে ফার্নিচার হল গেঞ্জির সুতো—একটা ধরে টানলে সবগুলোতে টান পড়ে।

 যেমন বাচ্চারা ললিপপ, সুন্দরী ফুচকা, হনুমান কলা, তেমনই কিছু মানুষ ফার্নিচার দেখলে ভয়ানক চঞ্চল হয়ে ওঠে। প্রয়োজন থাক বা না-থাক গৃহবন্দি না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। এদের ঘর ঢেকে যায় ফার্নিচারে। বাড়িতে পা দেওয়ার জায়গা নেই। কাজের লোকের দমফাটা দশা। মেঝের চারদিকে বিস্তর খাঁজ-খোঁজ অলিগলি। রোজ ভিতর থেকে ময়লা টেনে বের করতে করতে জান কয়লা। তার উপর যখন-তখন ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ার ভয়। আর ছুঁচো-ইঁদুর-আরশোলাদের লীলাক্ষেত্র।

তবে ফার্নিচারও ভোল বদলাচ্ছে। ঢাউস পালঙ্ক, পেল্লায় আলমারি, গোবদা সোফা লিলিপুট ফ্ল্যাটে অচল। টানাটানির ফ্লোরে স্পেস সেভিং ফার্নিচার। একই অঙ্গে কত রূপ। দেওয়ালে সাঁটা ডাইনিং টেবিল, টেনে পাতালেই ভিতরে কাবার্ড। এক চেয়ারের গর্ভে আরও পাঁচজন। জুতোর র্যাক দেখে মনে হবে সিন্দুক।

পাদুকারা সব আত্মগোপন করে আছে ভিতরে। উপরে শোভা পাচ্ছে ফ্লাওয়ার ভাস বা শো-পিস। জুতোর র্যাক না বলে ‘জুতোর বাড়ি’ বললে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়।

যে কথা হচ্ছিল। ফার্নিচার এবং দাম্পত্যকলহ। বাড়িতে ফার্নিচার থাকলে কলহ হবেই, আর কলহ মানেই ধরে নেওয়া যায় প্রেম আছে। অর্থাৎ গাণিতিকভাবে প্রমাণিত, ফার্নিচার ইকোয়্যাল-টু প্রেম। রোজকার গতানুগতিক জীবনে ফার্নিচারই ভরসা। আলোনা দাম্পত্যের নুন-মশলা। মাঝে মাঝে ঘেঁটে দিলে নতুন হবে জীবন। টানা বছরের পর বছর মাথার দিকে ওয়ারড্রোব পায়ের কাছে ড্রেসিং টেবিল, ডানদিকে জানালা বাঁ-দিকে বউ—জীবন একঘেয়ে হতে বাধ্য। বউকে বেশি নাড়াচাড়া না করাই ভালো। তার চেয়ে টার্গেট করো ফার্নিচারকে। খাট নিয়ে যাও ঘরের অন্যদিকে। মাথার কাছে নিয়ে এসো কম্পিউটার, বদলে ফ্যালো পুরোনো সোফাসেট। দেখবে পালিশ-চটা বউকেও ব্র্যান্ড-নিউ মনে হচ্ছে। অথবা পর-স্ত্রী।

পুনশ্চ : এত কাণ্ড করেও আমার এক বন্ধু হতাশ। তার নাকি সব ফার্নিচারকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সব জায়গায় খাটানো হয়ে গেছে। এখন যেখানেই রাখছে, দেখছে—ও বাবা, এ তো চেনা চেনা ঠেকছে! কিছু দিন আগেই তো ডিটো এই কম্বিনেশন ছিল। ফলে আবার সেই থোড়-বড়ি-খাড়া জীবন। বিস্তর মাথা ঘামিয়ে জম্পেশ একটা প্ল্যান ভেঁজেছে। তারা নিজেরাই ঘনঘন জায়গা বদলাচ্ছে ফার্নিচারের মতো। রাতে কিছুদিন সোফায় শুল তো তারপর কিছুদিন ডাইনিং টেবিলে। পরে কয়েকদিন হয়তো বাথরুমের সামনে। বেশ রেজাল্ট পাচ্ছে। টগবগ করছে যৌথ জীবন।

শুনে আমি অনেকক্ষণ বাকরুদ্ধ রইলাম। শেষে বললাম, এখন শুচ্ছিস কোথায়?

খাটের নীচে। স্মিত হেসে বন্ধু বলল, ভারি চমৎকার জায়গা রে! তুইও ট্রাই করে দেখতে পারিস। মনে হবে দ্বিতীয় ফুলশয্যা।

বন্ধুপত্নীও দেখলাম লাজুক মুখে সায় দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *