হাসির জন্যে হাহাকার
চারুমোহনবাবু আমার বিশেষ পরিচিত। চারুমোহন মজুমদার। গল্পকার। অবশ্য শুধু গল্পকার বললে অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হবে। চারুবাবু রম্যগল্পকার। মানে হাসির গল্প লেখক। বাজারে তাঁর বইয়ের মোটামুটি কাটতি আছে। বঙ্গীয় প্রকাশক-সম্পাদকরা যে তাঁকে অপছন্দ করেন, সেকথা কোনওভাবেই বলা যাবে না। তার প্রমাণ বিখ্যাত-বিখ্যাত সব সম্পাদক-প্রকাশকের মেয়ের বিয়ে, ছেলের পৈতে কিংবা নাতির মুখেভাতে আমন্ত্রণ পান তিনি। হাসি হাসি মুখ করে চারুবাবু নিমন্ত্রণ রক্ষাও করে আসেন। এমনই একটা নিমন্ত্রণ বাড়ি থেকে ফিরে তিনি ঘোষণা করলেন, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়, লেখালিখি ছেড়ে দিলাম।
শুনে আঁতকে উঠলাম আমি! বললাম, কেন, লেখা ছেড়ে দেবেন কেন; হাত বা চোখের কোনও সমস্যা? প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমিও সামান্য একটু সাহিত্যচর্চা করি এবং এই চারুবাবুকে গুরু মানি। কারণ আমারও বিচরণক্ষেত্র হাসির গল্প।
প্রথমে কিছু বলতে চাইছিলেন না চারুবাবু। তারপর বহু পীড়াপীড়ির পর মুখ খুললেন। আগের দিন কোনও এক সম্পাদকের বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ ছিল তাঁর। ছোট ঘরোয়া অনুষ্ঠান। অতিথিবর্গের বেশিরভাগই সাহিত্য জগতের মানুষ। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা ভালোই। কিন্তু খাওয়ার সময় একটা ব্যাপার চোখে পড়ে চারুবাবুর। তাঁর অনাদর হচ্ছে। পরিবেশনকারীরা ইচ্ছে করেই যেন তাঁর পাতে হাড়সর্বস্ব মাংস, কাঁটাভরা মাছ, এমনকী গামলা থেকে চামচ দিয়ে ফ্রায়েড রাইস এমনভাবে তুলছে যাতে কাজুর পরিমাণ নগণ্য। চারুবাবুর মত, হাসির গল্পলেখক বলেই তাঁকে এই উপেক্ষা।
কিছুদিন পর অনুরূপ অভিজ্ঞতা আমারও হল। আগেই বলেছি, আমারও কিছু সাহিত্যবাতিক আছে এবং গুরু চারুমোহনের মতোই আমিও রসের ধারে ধারে ঘুরি। কিছুদিনের চেষ্টায় আমিও একটি গল্প লিখে ফেললাম। এখন লিখে তো ফেললাম; কিন্তু ছাপতে দেব কোথায়? আমার মতো অজ্ঞাতকুলশীলের লেখা কে প্রকাশ করবে? শুনছিলাম, লিটিল ম্যাগাজিন নবীন লেখকদের আত্মপ্রকাশের জায়গা। আমার মতো যারা সাহিত্যে সদ্য পা রাখছে তারা এখানে লিখে পরিপক্ব হয়। তাই সাহসে ভর করে চলে গেলাম এক লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদকের কাছে। মুখে দাড়ি, চোখে ভারী লেন্সের চশমা, আর চোখে-মুখে পর্বতপ্রমাণ উন্নাসিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, কী চাই?
আমি আমার মনোবাঞ্ছা ব্যক্ত করলাম তাঁর কাছে।
হাসির গল্প শুনে তিনি ভয়ানক বিরক্তির সঙ্গে তাকালেন আমার দিকে। যেন ফুলের দোকানে শুঁটকি মাছ রাখার অনুরোধ করে ফেলেছি। শুঁটকির দুর্গন্ধের মতো নাক সিঁটকে বললেন, হাসির গল্প নিয়ে আমি কী করব; আপনি জীবনমুখী কিছু লিখুন।
আমি তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, হাসি জিনিসটা জীবনবিমুখ হবে কেন; হাসি তো জীবনেরই অঙ্গ।
এবার তিনি ভারি গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, জীবনের আপনি কতটুকু দেখেছেন? ইথিওপিয়ার শতসহস্র মানুষ মরছে অনাহারে, ইরাকে মার্কিন ড্রোন হামলা হচ্ছে; আমাদের দেশ থেকেই প্রতিদিন কত শিশু, নারী পাচার হয়ে যাচ্ছে—এইসব তুলে ধরতে হবে লেখায়। একজন প্রকৃত লেখকের এটাই তো কাজ।
আমি এবার তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, সাহিত্যে এসব থাকবে ঠিকই কিন্তু এর পাশাপাশি হাসির গল্প তো থাকতেই পারে। রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে আজকের শীর্ষেন্দু-সঞ্জীব—এঁরা প্রত্যেকেই মরমী লেখক, খুব উঁচু দরের শিল্পী, এঁরা কিন্তু প্রত্যেকেই তুমুলভাবে লিখে গেছেন হাসির লেখা।
কিন্তু সম্পাদক এসবে কর্ণপাত করতে নারাজ। তিনি আমাকে কাফকা-কামু-সার্ত্রের কথা বললেন, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ব, স্ট্রিম-অফ-কনসাসনেস, ডি-কনস্ট্রাকশন বিষয়ে ব্যাখ্যা দিলেন, লেখকের দায়বদ্ধতা সামাজিক অবক্ষয় এবং অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। বললেন, লিটিল ম্যাগাজিন মানে ফাজলামি নয়, লিটিল ম্যাগাজিন একটা আন্দোলনের নাম। এই আন্দোলনের শরিক হতে হলে আলতু-ফালতু লেখা ছাড়তে হবে।
বাড়ি ফিরে ভাবতে বসলাম। সত্যিই কি হাসির লেখা আলতু ফালতু; অর্থাৎ ঠিক সাহিত্য পদবাচ্য নয়। হাসির লেখক সাহিত্য আসরে অপাঙক্তেয়? অমুক হল গিয়ে লেখক, কারণ তাঁর লেখায় যুগ-কাল ধরা থাকে, থাকে মানবচরিত্রের রহস্যময় গলিগুঁজি, মনোবিকলনের রেখাচিত্র, সম্পর্কের উত্থানপতন। গল্পের শেষে থাকে শোষণের বিরুদ্ধে স্পষ্ট জেহাদ, থাকে নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত কিংবা মানব-মানবীর সম্পর্কের চতুর্থ কোনও মাত্রা। হাসির গল্পে এসব কোথায়? চরিত্ররা এল, নানাপ্রকার কাণ্ডকারখানা করল, কিছু মজাও লাগল—সবই ঠিক আছে; কিন্তু তাতে শেষপর্যন্ত কী দাঁড়াল? একে সাহিত্য বলব কেন? এখানে কি এমন কোনও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যা পাঠককে কুরে কুরে খেয়েছে? লক্ষণীয় এই ‘কুরে কুরে খেয়েছে’ শব্দগুচ্ছ গম্ভীর পাঠক এবং গুরুগম্ভীর লেখক—উভয়েরই ভীষণ আদরের। প্রায়ই লেখককে বলতে শোনা যায়, অমুক ঘটনা বা অমুক দৃশ্য আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল; তা থেকেই এই লেখাটা মাথায় আসে। কিংবা কখনও পাঠক বলছে, ওহ, অমুক লেখাটা পড়ে সাতদিন ভালো করে ঘুমতে পারিনি; প্রশ্নটা দিনরাত আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে। অনুরূপ আরও কিছু শব্দগুচ্ছ হল—’ভেতরটা ধরে কে যেন ঝাঁকিয়ে দিল’, ‘দাঁড়াবার জায়গাটা টলিয়ে দিল’, ‘মর্মে গিয়ে বিঁধল একেবারে’—ইত্যাদি। তাহলে প্রশ্ন—লেখাটা যখন, কারও নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটায়নি, কারও মর্ম বিদীর্ণ করেনি, কিংবা কাউকে ধাক্কাধাক্কি দিয়ে বেটাল করেনি; তাহলে একে সাহিত্য বলব কেন? তাহলে এই লেখককে কেন পুরস্কার দেব?
সম্ভবত এই ধারণার বশবর্তী হয়ে বঙ্গীয় লেখককুল সম্প্রতি এমন সব সাহিত্য সৃষ্টির দিকে অভিনিবেশ করছেন, তা হয়তো মানের বিচারে অতীব উৎকৃষ্ট, পড়লে অন্তরে হাহাকার ওঠে, চোখ ভেসে যায় জলে; কিন্তু তাতে সরসতার লেশমাত্র নেই। এইসকল সৃষ্টিকে আখমাড়াই কলে পিষলেও একফোঁটা রস বেরোবে না। হাসির লেখা দূরস্থান; আরও এক ধাপ এগিয়ে তাঁদের বেশিরভাগই লেখা থেকে সরসতা ব্যাপারটা, নিপুণ শল্যচিকিৎসকের টিউমার বাদ দেওয়ার মতনই বিসর্জন দিয়ে দিলেন। ‘শুষ্কং কাষ্ঠং’ না হলে যেন সাহিত্যের জাত যায়। লেখক যেন সদ্য জাগ্রত, তাঁর লেখা পড়তে পড়তে পাঠকের ভুরু কুঁচকে উঠবে, মুখের পেশি কঠিন হবে, হাত হবে মুষ্টিবদ্ধ, এমনকী চোখ গোল গোল বা চুল খাড়াও হতে পারে, কিন্তু ওষ্ঠাধরে হাসির লেশমাত্র ফুটে না ওঠে। অথচ এদের মধ্যে বিরোধ আগে কখনও ছিল না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অন্তত সেই সাক্ষ্যই দেয়। সবচেয়ে বড় উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ। চিরকুমার সভা, বৈকুণ্ঠের খাতা, গোড়ায় গলদের মতো প্রহসন; ‘সে’-এর মতো কিশোররচনা কিংবা খাপছাড়ার মতো ননসেন্স লিরিকে তিনি দেখিয়ে গেছেন কৌতুক কত অনাবিল হতে পারে। কিন্তু তার বাইরেও, যেখানে তিনি আদ্যক্ত মানবিক, গভীর রোম্যান্টিক কিংবা কঠোর বাস্তববাদী, সেখানেও সময়ে সময়ে ঝলসে উঠেছে তাঁর কৌতুকবোধ। শেষের কবিতার মতো নিখাদ প্রেমের উপন্যাসে, কথকের শ্যালক নবকৃষ্ণ সম্পর্কে বলেছেন—সে ছিল ইংরিজি সাহিত্যের রোমহর্ষক এম. এ., তাকে পড়তে হয়েছে বিস্তর, বুঝতে হয়েছে অল্প। অথবা ‘রামকানাইয়ের নিবুর্দ্ধিতা’-র মতো আদ্যন্ত মানবিক এবং মনস্তাত্বিক গল্পে লেখেন—বিধবা তখন মুখে মুখে দীর্ঘ পদ রচনা করিয়া উচ্চৈ:স্বরে বিলাপ করিতেছিলেন, দুই চারিজন দাসীও তাহার সহিত স্বর মিলাইয়া মধ্যে মধ্যে দুই চারিটা নতুন শব্দ যোজনা পূর্বক লোকসংগীতে সমস্ত পল্লীর নিদ্রা দূর করিতেছিল। মাঝে হইতে এই কাগজখণ্ড আসিয়া এক প্রকার লয়ভঙ্গ হইয়া গেল, এবং ভাবেরও পূর্বাপর যোগ রহিল না। ব্যাপারটা নিম্নলিখিত-মতো অসংলগ্ন আকার ধারণ করিল।
‘ওগো আমার কী সর্বনাশ হল গো, কী সর্বনাশ হল। আচ্ছা ঠাকুরপো লেখাটা কার। তোমার বুঝি? ওগো তেমন যত্ন করে আমাকে আর কে দেখবে, আমার দিকে কে মুখ তুলে চাইবে গো।—তোরা একটুকু থাম, মেলা চেঁচাসনে, কথাটা শুনতে দে। ওগো আমি কেন আগে গেলুম না গো—আমি কেন বেঁচে রইলুম।’ রামকানাই মনে মনে নি:শ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, ‘সে আমাদের কপালের দোষ।’
বাংলা সাহিত্যে হাস্যরসের শুরুটা অবশ্য হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে। সাহিত্যে হাস্যরসকে স্থূল ভাঁড়ামি আর গ্যাদগেদে আদিরসের চৌহদ্দি থেকে বের করে প্রথম জাতে তুললেন তিনি। তাঁর কমলাকান্তের দপ্তর এক অনন্য সৃষ্টি। সেখানে মুহুর্মুহু আছড়ে পড়েছে ব্যঙ্গের চাবুক।—যখন তাঁহার (নসীবাবুর) বাড়িতে নাচ, গান, যাত্রা, পর্ব্ব—উপস্থিত হয়, তখন দলে দলে মানুষ-কোকিল আসিয়া তাঁহার ঘর-বাড়ি আঁধার করিয়া তুলে—কেহ খায়, কেহ গায়, কেহ হাসে, কেহ কাশে, কেহ তামাক পোড়ায়, কেহ হাসিয়া বেড়ায়, কেহ মাত্রা চড়ায়, কেহ টেবিলের নীচে গড়ায়। যখন নসীবাবু বাগানে যান মানুষ-কোকিল তাহার সঙ্গে পিপীড়ার সাড়ি দেয়। আর যে রাত্রে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হইতেছিল, আর নসীবাবুর পুত্রটির অকালে মৃত্যু হইল, তখন তিনি একটিও লোক পাইলেন না। কাহারও ‘অসুখ’, এজন্য আসিতে পারিলেন না; কাহারও বড় সুখ—একটি নাতি হইয়াছে, এজন্য আসিতে পারিলেন না; কাহারও সমস্ত রাত্রি নিদ্রা হয় নাই, এজন্যে আসিতে পারিলেন না; কেহ সমস্ত রাত্রি নিদ্রায় অভিভূত, এজন্য আসিতে পারিলেন না; আসল কথা সেদিন বর্ষা, বসন্ত নহে, বসন্তের কোকিল সেদিন আসিবে কেন?
বঙ্কিমের পর এলেন ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি হাস্যরসের সঙ্গে ফ্যান্টাসির মেলবন্ধন ঘটিয়ে নতুন এক ধারার সূচনা করলেন। তাঁর লুল্লু, ডমরুচরিত—এই সব রচনা বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে।
আর একজন লেখক শরৎচন্দ্র। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে নিছক হাসির লেখা তিনি লেখেননি ঠিকই বরং নিজেই কবুল করেছেন, দুনিয়ার বঞ্চিত অবহেলিতদের জন্যেই তাঁর কলম ধরা; কিন্তু তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে হাস্যরস। হিউমার। ইন দি ট্রু সেন্স অফ দি টার্ম। পড়তে পড়তে দমকা হাসি আসে, কিন্তু হাসি থামার আগেই যেন ব্যথা ব্যথা করে গলার কাছটা।
একটিও উপন্যাস না লিখে, শুধু গল্প লিখেই বাঙালি পাঠকের মনে চিরস্থায়ী আসন পেয়েছেন পরশুরাম। উইট এবং স্যাটায়ারের অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন তিনি।
এরপর একে একে এলেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলি, প্রমথনাথ বিশী, শিবরাম চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আর পরবর্তীকালে এঁদের লেখার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এলেন হিমানীশ গোস্বামী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, নবনীতা দেবসেন, ইন্দ্র মিত্র প্রমুখ। এলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তাঁর ছোটদের জন্যে অদ্ভুতুড়ে সিরিজের লেখাগুলির তুল্য লেখা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। ভূত ওঝা কাপালিক চোর দারোগা ভবঘুরেদের নিয়ে তৈরি অলৌকিক মায়াময় এবং মজার জগতে, আট থেকে আশি, মজে গেল সবাই। তিনি ইংরেজি ভাষায় লিখলে, কিংবা তাঁর লেখাগুলির ঠিকঠাক অনুবাদ হলে, হ্যারি পটারের নামই হয়তো জানত না এই গ্রহের মানুষ।
হাসির গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি বাঙালি পাঠককে একসময় হাসির খোরাক জুগিয়েছে প্যারডি এবং ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনা সাহিত্যগুলি। এ-ব্যাপারে ‘শনিবারের চিঠি’-র সজনীকান্ত দাস, ‘অচল পত্র’-র দীপেন্দ্রকুমার সান্যালের নাম স্মরণীয় হয়ে আছে।
কিন্তু তারপর থেকেই যেন ভাটার টান। এখনকার সচল সাহিত্যিকদের মধ্যে স্বপ্নময় চক্রবর্তী, ভগীরথ মিশ্র, প্রচেত গুপ্ত, চন্দ্রিল ভট্টাচার্য, তপন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ হাসি এবং ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখলেও তা যেন মরা গাঙে জোয়ার আনার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বাণিজ্যিক পত্র-পত্রিকায় মাঝেমধ্যে হাসির গল্প ছাপা হয় বটে, সে-ও বড় দৈবাৎ। সম্পাদকেরা একটা যুক্তি দেন—খুব ভালো হাসির লেখা বেশি পাই না, তাই ছাপা হয় না। এখন প্রশ্ন হল, পত্রিকাগুলোতে রোজদিন যেসব গল্প প্রকাশিত হয়, তার কতগুলো ‘খুব ভালো’? বিস্তর মাঝারি এবং মন্দ গল্প ছাপা হয় সেখানে। তবে হাসির গল্প কী এমন দোষ করল যে তাকে সবসময় ‘খুব ভালো’ হতে হবে, তবেই প্রকাশভাগ্য ঘটবে তার।
এমন দুয়োরানির সন্তান হওয়ার জন্যেই বোধহয় পুরস্কারদেবীও কদাচিৎ মুখ তুলে তাকায় তার দিকে। হাসির লেখক কখনও যদি পুরস্কার পায়, এমন হাহাকার ওঠে যেন বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা ঝুলল।
এই সব কারণেই বোধহয় হাসির লেখার ধারা ক্রমশ ক্ষীয়মান। অথচ সমাজ যেখানে জটিল হয়ে উঠছে দিন দিন, জীবন হয়ে উঠছে সংকটময়, সেখানে রসসাহিত্যই হতে পারে সঞ্জীবনী সুধা। চারদিকে হাসির লেখার উপাদান বাড়ছে বই কমছে না, জীবনের অসঙ্গতি, মানুষের বোকামি, ভণ্ডামি, অহংকার, পাগলামি বাড়ছে—এসবের মধ্যেই ঠাসা আছে হাস্যরসের উপাদান। হীনমন্যতা ঝেড়ে লেখক যদি সেসব কুড়িয়ে নেন, আর সম্পাদক উপযুক্ত উৎসাহ জোগান তাহলে দিন দিন গোমড়া হয়ে যাওয়া বাংলা সাহিত্য প্রাণ খুলে হাসতে পারে। এই বাংলা সাহিত্যের জন্যই কলম ধরেছিলেন সুকুমার রায়। কোনও পটুয়া যদি কোনওদিন খড়-মাটি দিয়ে হাসির দেবতা বানাতে চান, আমি নিশ্চিত, সেটা দেখতে ডিটো ওই স্বল্পায়ু রসস্রষ্টার মতো হয়ে যাবে। এই মানুষটিই তো লিখেছিলেন, ‘রামগরুড়ের ছানা / হাসতে তাদের মানা।’ সাহিত্যিক মাত্রই নাকি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। তিনি কি আগাম অনুমান করেছিলেন, একদিন বাংলা সাহিত্যক্ষেত্র থিক থিক করবে রামগরুড়ের ছানায়।
