মাস্টার-পিস – উল্লাস মল্লিক

মাস্টার-পিস

ঘরে ঢুকেই থমকে গেল হিরু। এক উৎপীড়িতকে উদ্ধার করতে গিয়েছিল সে। কিন্তু ঘরের মধ্যে অমন আজব দৃশ্য দেখে মনে হল—ধরনি দ্বিধা হও।

পাশের ঘরে চাপা-স্বরে একটা কলহ চলছিল কিছুক্ষণ। বনানীর বামা-মা। কিছুদিন হল হিরু বনানীর প্রাইভেট টিউটর। ক্লাস টেনের বনানী পড়াশোনায় আমড়া-আঁটি, কিন্তু দেখতে চমৎকার। ছাত্রীর রূপ আদর্শ শিক্ষকের মাথা ঘামানোর বিষয় নয়, ভূমধ্যসাগরের জলবায়ু কুরূপাকে যতটা নাকাল করবে রূপবতীকে ততটাই। কিন্তু বেকার হিরু ডিলিং-এর সময় ব্যাপারটা মাথায় রাখে। জানে, পুরো মজুরি কখনও আদায় হবে না, এক বছর পড়ালে মেরেকেটে ন’মাসের বেতন। ভাগ্য বিরূপ হলে, আরও বেশি চোট। তাই হিরু প্রথমেই খোঁজ নেয়—পড়াশোনায় কেমন। ভালো হলে—বহুত আচ্ছা, পরিশ্রম কম হবে, রেজাল্ট ভালো হলে বাজারে নাম ফাটবে। কিন্তু যদি দেখে ছাত্রীর মাথায় গ্রে ম্যাটারের বদলে যবের ভুসি তখন দর্শনযোগ্যতা বিবেচনা করে। রোজ ঘণ্টা দুয়েক সুন্দরী-সান্নিধ্য কম প্রাপ্তি নয়, অন্তত কম্পিটিটিভ একজ্যামের জি কে মুখস্থ করার একটা বাড়তি প্রেরণা পাওয়া যায়।

পাশের ঘরের মৌখিক কলহ হঠাৎ সহিংস হয়ে উঠল। প্রবল লাঠি পেটার শব্দ আর তার সঙ্গে পুরুষ কণ্ঠের পাশবিক গর্জন—আর হবে…কোনওদিন হবে আর…আজ মেরে মেরেই…।

হিরু আর পারল না। প্রায় সামনেই এমন নারী নির্যাতন। হোক সে বাইরের লোক, একটা কিছু করা দরকার। সাড়ে একত্রিশ ইঞ্চি বুকের ছাতির স্বভাবভীরু হিরু বনানীর সাবধানবাণী (যাবেন না স্যার, প্রবলেম হয়ে যাবে কিন্তু) অগ্রাহ্য করে ঘরে ঢুকে পড়ল। এবং ঢুকেই…!!

বনানীর মা আঁচলটা গাছ কোমর করে বেঁধে হাত পাখার বাঁট দিয়ে পেটাচ্ছে বাবাকে, আর ভদ্রলোক মার ঠেকাবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করছে—আর হবে…কিছু বলি না বলে…মেরে একেবারে…।

পরে রহস্যটা ভদ্রলোকই ফাঁস করেছিলেন। সহধর্মিণীর হাতে নাকি মাঝেমধ্যেই প্রহৃত হন তিনি, হিরুর কাছে খুবই কুণ্ঠিত গলায় বলেছিলেন—কিন্তু ভাই, একটা চেষ্টা অন্তত করি, পাঁচজনকে জানাতে চাই মারধোরটা আমিই করছি। প্লিজ ভাই, কথাটা পাঁচকান না হয়! কথা রেখেছিল হিরু। পাঁচকান করেনি। এবং পরের মাসেই মাইনের সঙ্গে অতিরিক্ত একটা পঞ্চাশ টাকার নোট পেয়ে মনে হয়েছিল, তার সকল ছাত্রছাত্রীর মায়ের ওপরই এমন প্রবল নারীশক্তি ভর করুক।

গৃহশিক্ষকতা এক বিচিত্র পেশা। গণ্ডার-চর্মবৎ সহিষ্ণুতা (মাঝেমধ্যে ইলেকট্রিক বিল জমা দেওয়া, ছুতোর মিস্তিরি খুঁজে আনা বা ঠাকুমার বাতের মাদুলি জোগাড় করে আনার মতো কাজ উদ্ধার করে দিতে হবে) এর প্রধান গুড-উইল। ধৈর্য এবং নাছোড়বান্দা মনোভাব (কাবুলিওয়ালার মতো তাগাদা দিয়ে বেতন উদ্ধার করতে হবে) মুখ্য শর্ত এবং মনিব পেটানো (যার কল্যাণে চাকরি সেই ছাত্রকে চড়চাপটা দিতে হবে) অন্যতম মূলধন। এই পেশা একই সঙ্গে বর্ণময়, বৈচিত্রময় এবং বিপদসংঙ্কুল। কিছুদিন টিউশনি করলে ফাঁকতালে কখন যেন বিশ্বরূপটা দর্শন হয়ে যায়।

যেমন হিরু। কলেজের পাঠ চুকেছে। প্রেমিকা—’কতদিন আর বাড়িতে ঠেকিয়ে রাখব বলো, তুমি তো এখনও স্টেবল হলে না’—বলে বিদায় সঙ্গীতের মুখরা গেয়ে রেখেছে, চা সিগারেট সিনেমা অথবা অ্যাপ্লিকেশান ছাড়ার জন্যে হার্ট-অ্যাটাক ফেরত বাবার কাছে হাত পাততে সংকোচ হচ্ছে—অগত্যা টিউশনি। মন্দ কী! সকাল সন্ধে সময় কাটে, চায়ের দোকানের মন্টুদা তাগাদা করলেই—’কত হয়েছে বলো, মিটিয়ে দিচ্ছি’—বলে গম্ভীর মুখে পার্স বের করা যায়, পছন্দমাফিক জিনস বা টি-শার্ট দুম করে কিনে ফেলা যায়। কিন্তু হিরুদের কর্মস্থল বড় সহজ জায়গা নয়। বাধ্য ছাত্র, দিলদার ছাত্রপিতা, মমতাময়ী ছাত্রমাতা যদি জোটে বরাতে, তবে তো বলতেই হবে এ তার বহু জন্মের সুকৃতির সুফল।

যেটা দেখা যায়—ছাত্র বিল্টু একখানা সরেস জিনিস। বাঁদর গাঁট কাটা গিটগিটি টক আমড়া ইত্যাদি থেকে ভালো ভালো উপাদানগুলো নিয়ে ঈশ্বর একে বানিয়েছেন। ব্যাটাচ্ছেলে ভয় কাকে বলে জানে না, বইপত্রের ধার ধারে না, আগুনে পোড়ে না, জলে ডোবে না। এই বিল্টুকে বছর বছর পরীক্ষায় উতরে দেওয়ার গুরু দায়িত্ব তার। কারণ এর ওপরই নির্ভর করছে তার চাকরির স্থায়িত্ব, তার ইনক্রিমেন্টের হ্রাসবৃদ্ধি। আমার এক বন্ধুকে দেখতাম স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার সময় কেমন যেন উদভ্রান্ত। চুল উসকো-খুসকো, মুখে বিজবিজে দাড়ি, চোখ কোটরাগত। ছাত্রর পাশের কামনায় সে নিজেই ব্রত-উপবাস করত, দরগায় সিন্নি চড়াত, কিংবা মাদুলি-তাবিজ ধারণ করত কোনও বাবাজির। একবার সে স্থির করল, যথেষ্ট হয়েছে আর নয়—এবার আত্মমর্যাদা রক্ষা করে চলবে। ছাত্রকে সোজা জানিয়ে দিল—দেখ বিল্টু, প্রকৃত শিক্ষকের দায়িত্ব হচ্ছে ছাত্রকে পথ দেখিয়ে দেওয়া, তাকে চলার পথে সাহায্য করা, এর থেকে বেশি কিন্তু সে আর কিছু করতে পারে না, আসল কাজ ছাত্রকেই করতে হবে…বুঝেছ…?

বিল্টু সপাটে ঘাড় নাড়ে—বুঝেছি। তারপরের গতিপ্রকৃতি অন্যদিকে মোড় নিল। বিল্টু খোলাখুলি জানিয়ে দিল—দেখুন স্যার, আমার মাথায় কী আছে তা আমিও জানি, আপনিও জানেন…পড়াশোনা করে মিছিমিছি সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না…পরীক্ষা হলে টুকলি করাই আমার একমাত্র পথ…আপনি সেই পথেই প্রকৃত শিক্ষকের মতো আমাকে সাহায্য করুন। বন্ধুও ভেবে দেখল—কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তারপর থেকে সে ছোট ছোট কাগজের টুকরোয় খুদি খুদি হস্তাক্ষরে বাবরের শাসনব্যবস্থা, প্রাণীকোষ উদ্ভিদ কোষের পার্থক্য, প্রাত্যহিক জীবনে বিজ্ঞান, এইম ইন ইয়োর লাইফ, পাললিক শিলার গঠন এইসব লিখে পুরিয়া (যা ছাত্র সমাজে ‘চোতা’ নামে পরিচিত) বানিয়ে দিত বিল্টুর জন্যে। বাড়িতেই ঘড়ি ধরে পরীক্ষার ব্যবস্থা হত। বাঁ-পকেটে ডান পকেটে, মোজার মধ্যে, হাতার ভাঁজে, কানের খাঁজে সেই সব পুরিয়া নিয়ে আমার বন্ধুর কঠোর নজরদারির মধ্যে পরীক্ষা দিত বিল্টু। ঠিক তিন ঘণ্টা চোর-পুলিশ খেলার পর খাতা দিয়ে মূল্যায়ন। এইভাবেই দিনের পর দিন প্র্যাকটিস। ছাত্রের রেজাল্ট নিয়ে আর কোনও দিন টেনশন করতে দেখিনি বন্ধুকে। বরং একদিন সে জানাল, বিল্টু যেভাবে দিন দিন উন্নতি করছে, তাতে পাশটা কোনও ব্যাপার নয়…ভাগ্য একটু সহায় হলে ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়েও যেতে পারে কিন্তু।

বিল্টুদের নিয়ে এক সমস্যা, আর মালবিকাদের নিয়ে অন্যরকম। এই মালবিকা তিন-চার প্রকার। এক নম্বর মালবিকার, ধরা যাক তৈলাক্ত ত্বক, একটু হিলহিলে চেহারা, কপালের ওপর দলছুট এক গোছা চুল—এই প্যাকেজেই পাড়ার কয়েকজনকে অনিদ্রা রুগি বানিয়েছে। তিনবারে হায়ার সেকেন্ডারি ক্লিয়ার করা টুবাইদা, গম্ভীর মুখে পড়াশোনার খোঁজ নিচ্ছে, ভালো রেজাল্টের টিপস দিচ্ছে, মুদির দোকানের হুঁদকো ছেলেটা মালবিকা গেলে হিসেবের গণ্ডগোল করে ফেলছে, জেরক্স সেন্টারের চকচকে ছেলেটা বলছে—দুপুরের দিকে এসো, ওই সময় মেশিন ফাঁকা থাকে, ধীরেসুস্থে ভালো করে করে দেব…। এ মালবিকার সম্ভবত নিজের কাছেও পরিষ্কার নয় হিরুর কাছে তার কী দাবি। মাসে তিনদিন সে মুখ ব্যাজার করে থাকে, পাঁচদিন প্রগলভতা করে, সাতদিন উদাসীন থাকে এবং দু’দিন মাথা ধরেছে বলে হিরুকে বিদেয় করে দেয়। পড়তে বসে যত ভুলই করুক, হিরুর গলা সামান্য গম্ভীর হলেই তার চোখ ছলছল করে।

হিরু ভাবে, খুঁচিয়ে ঘা করে দরকার নেই বাবা, মাসকাবারি মাইনে পেলেই শান্তি। মাঝে মাঝে শুধু ছাত্রীর মাকে শুনিয়ে দেয়—মালবিকা কিন্তু পড়াশোনায় মন দিচ্ছে না। অর্থাৎ ফেল করলে আমার দোষ ধোরো না বাপু।

দু-নম্বর মালবিকার বাবা ঘ্যাম বড়লোক। পাথর বসানো তিনতলা বাড়ি, গেটে দারোয়ান, গ্যারেজে গাড়ি, অন্দরমহলে কুকুর। তারপর মালবিকা একটু নজরধরা হলে গোদের ওপর বিষফোড়া। মালবিকাদের বাড়ি ঢোকার পর থেকেই নরজবন্দি হয়ে যায় হিরু। এবং যেটা প্রবল আশ্চর্যের ব্যাপার সেটা হল, এদের দারোয়ান আর কুকুরের সঙ্গে কিছুতেই যেন চেনাজানা হয় না। দীর্ঘ ছ’মাস পড়ানোর পরেও গেট দিয়ে ঢুকতে গেলে উমেদার ভাগানোর ভঙ্গিতে দারোয়ান বলবে—কাকে চাই? সাহেবের সঙ্গে এখন দেখা হবে না। তাগড়াই কুকুর বিকট ঝাউ ঝাউ রবে ভিখারি বা ভবঘুরে তাড়ানোর মতো করে তেড়ে আসবে। পড়ানোর সময় কারণে-অকারণে মা জেঠিমা কাকিমা দরজার পাশ দিয়ে যাতায়াত করবে আর দ্রুত আড়চোখে তাকিয়ে নেবে। মালবিকার বাবা আলেকালে একবার উদয় হয়ে বলবে—কী মাস্টার, ছাত্রীকে বুঝছ কেমন…পাস টাস করবে তো…দেখো কিন্তু…। এই বাড়িতে আর একটা আতঙ্ক থাকে হিরুর। এরা এতটাই বড়লোক যে মাঝে মাঝেই মাইনে দিতে ভুলে যায়।

মালবিকা নাম্বার থ্রি। বাবা ঘোর মধ্যবিত্ত এবং মালবিকার রূপ নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। রং চাপা, গড়ন মাঝারি, চোখ-মুখ অতি সো-সো। এই মালবিকার সিকিউরিটির বালাই নেই। বরং মালবিকার মা মাঝে মাঝে হিরুকে নিজের হাতে বানানো নারকোল নাড়ু, তালের বড়া, পিঠে-পায়েস ইত্যাদি খুব যত্ন করে খেতে দেন, মালবিকাকে একটু ভালো করে দেখতে (মানে পড়াতে আর কী!) বলেন, জানিয়ে দেন মালবিকা হিরুদার কথাই যা একটু শোনে (ভীষণ শ্রদ্ধা করে কিনা) তারপর গল্পচ্ছলে জানতে চান হিরুরা ক’ভাই বোন, বাড়িটা নিজেদের কিনা, ভবিষ্যতে হিরু কী করবে বলে ভাবছে—চাকরি না ব্যবসা…কোনওদিন হিরু পড়াতে এসে দেখে মালবিকাকে বুড়ি ঠাকুমার জিম্মায় রেখে মা পাড়ার শনি মন্দিরে পুজো দিতে গেছে।

উপরিউক্ত তিন প্রকার মালবিকার সঙ্গেই হিরুর সম্পর্কের নানা উত্থান-পতন ঘটতে পারে। প্রথম আর তৃতীয় মালবিকার চান্স ফিফটি ফিফটি। যে ঘরটাতে বসে হিরু মালবিকাকে ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র ব্যাখ্যা করত সেই ঘরটাই একদিন ওদের বাসর ঘর হতে পারে। তবে দু-নম্বর মালবিকার বেলায় এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এই মালবিকারা কখনও সখনও স্বীয় বিত্ত-স্টেটাস তুচ্ছ জ্ঞান করে, প্রেমে বলিপ্রদত্ত হয়ে কোনও অভাগা-অকিঞ্চনের সঙ্গে গৃহত্যাগ করে বটে; কিন্তু সে ক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ বাড়ির ড্রাইভার।

হিরুদের সমস্যা একরকম আবার হীরামতীদের অন্যরকম। হীরামতী গৃহশিক্ষিকা। এবং রূপ যৌবনবতী। অতএব ছাত্রের সঙ্গে ছাত্রের বাবাকেও শাসন করতে হয় মাঝে মাঝে। চুলে কলপ এবং আঙুলে রংবেরঙের আংটিওয়ালা বাবা সুযোগ পেলেই এসে গল্প ফাঁদে দিদিমণির সঙ্গে। ছেলের পড়াশোনার তত্বতালাশ নেয়, নিজের স্টুডেন্ট-লাইফের কথা বলে, কীভাবে কঠিন স্ট্রাগল করে সে আজ এই অবস্থায় এসেছে, তার সাতকাহন অতি উচ্ছ্বাসে দু-একটা ভুল ইংরেজি সহ ব্যাখ্যা দেয়। এবং কথার ফাঁকে কোনও এক সময় টুক করে জানিয়ে দেয় যে কোনও প্রকার সমস্যাতেই—তা পারিবারিক, ব্যক্তিগত এমনকী শরীরগত হলেও অযথা সংকোচ না করে ম্যাডাম যেন তাকে স্মরণ করে। ফলে হীরামতিকে নানাবিধ কায়দা-কৌশল করে টিকিয়ে রাখতে হয় চাকরি। কখনও-সখনও সে পাশে পায় কোমলমতি ছাত্রটিকে। এরকম এক ছাত্র প্রথমদিনই তার দিদিমণিকে জানিয়ে দেয় যে তার বাবাকে আগের দিদিমণি সপাটে চড় মেরেছিল একটা। দিদিমণি জানতে চায়—কেন, চড় মেরেছিল কেন? ছাত্র বলে, বাবা দিদিমণিকে নাকছাবি দিয়েছিল যে।

হীরামতিদের আবার অতিরিক্ত কিছু কৌতূহল থাকে। খুব সরল মুখ করে সে জানতে চেয়েছিল—বাহ! নাকছাবি দিয়েছিল সে তো খুব ভালো, একজন আর একজনকে তো একটা জিনিস দিতেই পারে, তাতে চড় মারল কেন…?

নাকছাবির পাথরটা ঝুটো ছিল যে। ছাত্র গলা নামিয়ে বলে, আপনাকেও কিন্তু ওটা গছাবার চেষ্টা করবে, সাবধান, ভালো করে দেখে নেবেন কিন্তু…।

আগেই বলেছি, হীরামতিদের কৌতূহল অনেক সময় একটু বেশি হয়। এই হীরামতির আবার একটু বেশিই বেশি। বেশ কয়েকদিন পরেও ছাত্রের বাবার কাছ থেকে কোনওরকম উপহার না পেয়ে ছাত্রকে বলেই ফেলল,—কই, তোমার বাবা তো কিছু দিলেন না আমায়! আবার গলা নামিয়ে ছাত্র বলল—ওই নিয়েই তো যত অশান্তি দিদিমণি। বাবার পকেট থেকে নাকছাবিটা নিয়ে আমি আমাদের ক্লাসের তনিমাকে দিয়েছিলাম, তনিমার ব্যাগ থেকে নিয়ে ওর দাদা তাদের ক্লাসের অপর্ণাকে দিয়েছিল, অপর্ণার বাবা আবার অপর্ণার ড্রয়ায় থেকে নিয়ে নাকছাবিটা কাজের লোক মানদামাসিকে দিয়েছে, আর হয়েছে কী, ওই মানদামাসি তো আমাদের বাড়িও কাজ করে, মার সন্দেহ, বাবাই ওটা ওকে দিয়েছে…খুব অশান্তি দিদিমণি, মানদামাসিকে কাজ ছাড়িয়ে দিয়েছে মা, মাসি কিন্তু নাকছাবি ফেরত দেয়নি…।

এ তো গেল গোলমেলে গার্জেন। সরল সাদা বাবাও আছে। তারা হয়তো তেমন লেখাপড়া জানে না, ভুল ইংরেজিটাও ঠিকমতো শিখতে পারেনি, তবে শিক্ষিকাকে যথেষ্ট সম্মান দেখায়। কখনও আকারে ইঙ্গিতেও সু বা কু কোনও প্রস্তাবই দেয় না। এরকমই একজন সরল বাবা সখেদে বলেছিল—বুঝলে দিদিমণি রাতে ওর জন্যে আরও একজন মেয়েছেলে রেখেছি, তবু হতভাগাটা পাশ করতে পারল না…!

এরপর আছে বেতন আদায়। পাড়ার নেড়ি ছ’টা বাচ্চা দিলে ছ’টাই কদাচিৎ বাঁচে। তেমনই একজন প্রাইভেট টিউটরকে বছরে দশ মাসের বেতন স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হবে। কোথাও এগারো মাস পেলে বুঝতে হবে এরা নিজেরা যে চা খায়, প্রাইভেট টিউটর আর কাজের লোককে সেই একই চা দেয়। আর দৈবক্রমে কোথাও বারো মাসেরই পেলে চোখ বুজে বলা যায়, এই গৃহকর্তার কাছে টাকা মাটি, মাটি টাকা।

জনৈক শিক্ষক আদায়-উসুল করতে এক অভিনব পন্থা নিয়েছিল। একদিন ছাত্রের বাবাকে কাছাকাছি দেখে খুব চিৎকার করে শাসন করতে লাগল—হতভাগা, আজ মাসের উনিশ তারিখ হয়ে গেল, এখনও বাবরের বাবার নাম ভুল! উনিশ তারিখের সঙ্গে বাবরের বাবার কী সম্পর্ক বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল ছেলেটি। কিন্তু যা বোঝার বুঝে গিয়েছিল বাবা। পরদিনই বেতনের খামটা তার হাতে দিয়ে বলেছিল—জানেন স্যার, আপনার ছাত্র ইতিহাসে কাঁচা হলে কী হবে, পাটিগণিতে তুখোড়। কাল জিগ্যেস করেছিলাম—বল তো, কোনও মাস্টারের মাসিক বেতন যদি তিনশো টাকা হয়, তবে তিনদিন কামাই করলে কত কাটা যাবে; দেখলাম স্যার, আপনার ছাত্র চট করে বলে দিল। বলাবাহুল্য, সেই শিক্ষক মাসকাবারি তিনশো টাকার চুক্তিতেই নিযুক্ত হয়েছিল এবং আগের মাসে তিনদিন কামাই হয়েছিল তার। সেদিন খাম না খুলেই সে বুঝে গিয়েছিল কত টাকা দেওয়া হয়েছে তাকে।

ছাত্রকে পাটিগণিত শেখাতে গিয়ে অন্য একজন শিক্ষকের জ্ঞানচক্ষু খুলে গিয়েছিল একবার। এলাকার সবচেয়ে সফল এবং সঙ্গত কারণেই সবচেয়ে চশমখোর কুসীদজীবী, মানে সুদখোরের ছেলেকে পড়াত সে। ছাত্রকে সুদ কষা অঙ্ক শেখাতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছিল দিনের পর দিন। একদিন তার বাবা স্মিত হেসে বলেছিল, বুঝলে মাস্টার, ওর মতো বয়েসে আমিও ওইরকম কাঁচা ছিলাম সুদকষায়, কিন্তু তার জন্যে পরে আমার কোনও অসুবিধে হয়নি; ওই চ্যাপ্টারটা বাদ দিয়ে তুমি অন্য অঙ্ক করাও ওকে।

আর একজনকে জানি যাকে আরও বেপরোয়া হতে হয়েছিল। মাসের পর মাস যায়, বছর গড়িয়ে গেল, তবু বেতনের নামগন্ধ নেই। আভাস-ইঙ্গিত, সরাসরি তাগাদা সবই ব্যর্থ। অবশেষে একদিন পড়াবার পর সে হাতের কাছে যা যা পেল—টর্চ, রেডিয়ো, ডিকশনারি, দেওয়াল ঘড়ি, ফুলদানি, যা কিছু বহনযোগ্য ছিল সেই ঘরে, সব মস্ত একটা ব্যাগে ভরে নিয়ে চলে এসেছিল। আসার সময় বলে এসেছিল—বাবাকে বলিস, এগুলো ছাড়িয়ে আনতে।

কিন্তু সবাই তো আর এমন বেপরোয়া হতে পারে না। কেউ কেউ স্বভাব লাজুক। এমনই এক মুখচোরা শিক্ষককে ছাত্রের বাবা মাসে মাসে বেতন মিটিয়ে দিত ঠিকই, কিন্তু অব্যবহিত পরেই মাথাটাথা চুলকে টাকাটা আবার চেয়ে নিত ধার হিসেবে। যেহেতু পকেটে জলজ্যান্ত টাকা, মুখচোরা শিক্ষক ‘না’ বলে কী করে! তারপর সারা মাস আর পাত্তা নেই ভদ্রলোকের। পরের মাসে বেতন দিয়েই আবার কাঁচুমাচু মুখ করে, অভাবের লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে, হাত পাতত মাস্টারের কাছে। এমন একজন নি:স্ব লোক, যে হাত পাতছে অন্যের কাছে, তাকে আগের ঋণের কথা স্মরণ করায় কোন পাষণ্ড। এমনই একটা খাচ্ছে-কিন্তু-গিলছে-না মার্কা গোলমেলে চক্রব্যূহে পড়ে সে বেচারা মাসের পর মাস বেতন পেয়ে গেলেও ভোগ করতে পারত না।

এত কিছুর পরেও কিন্তু বাঙালি গৃহশিক্ষকতা করে। জীবনে কখনও, এক মাস বা একদিন হলেও করে। নারীর যেমন মাতৃত্বে পূর্ণতা, বাঙালি তেমনই বেকারত্ব ফ্রাসট্রেশন আর টিউশন ছাড়া গোটাত্ব লাভ করতে পারে না। সে গৃহশিক্ষকতা করে, কারণ এর কল্যাণেই সে প্রথম ‘স্যার’ সম্বোধন শোনে, এই পেশাই তাকে প্রথম ‘প্রণাম’ জুটিয়ে দেয়। তা ছাড়া সব ছাত্রের মা-ই যে বেড়াল-এঁটো দুধ বা অতি নিকৃষ্ট পাঁচনসম চা মাস্টারকে দেবে, সব বাবাই যে বেতন মেরে দেওয়ার ফন্দিফিকির করবে, সব কুকুরই যে ঘেউ ঘেউ করে বিরক্তি প্রকাশ করবে—এমনটা নয়। ব্যতিক্রম আছে। অবশ্যই আছে। আমার নিজের বরাতেই তো জুটেছিল।

প্রথম দিন পড়াতে গেছি; প্রথম দিন বলে সময়ের কিছুটা আগেই চলে গেছি। ছাত্র এসে প্রণাম করল। চাও এসে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

আহ্লাদে ভরে গেল মনটা। বুঝলাম, এরা অতি সজ্জন, ভদ্রলোক। ছাত্রকে জিগ্যেস করলাম—তোমার মা কি চা বানিয়ে রেখেছিল আমার জন্যে?

ছাত্র বলল, না তো স্যার!

তবে এত তাড়াতাড়ি চা দিল যে…আমি তো একটু আগে চলে এসেছি….

তাতে কী হয়েছে স্যার, বাড়ির সবাই চা খাচ্ছিল, সবার কাপ থেকে একটু একটু ঢেলে আপনাকে দিয়েছে। এক গাল হেসে বলল ছাত্র।

কী, বলেছিলাম না, ব্যতিক্রম আছে! শুধু কপালে জোটা চাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *