ডাক্তারবাবু বৃত্তান্ত
একদা এক মহাজ্ঞানী মহাজন বলেছিলেন, দুনিয়ার তাবৎ ডাক্তারকুল দুটো ভাগে বিভক্ত। এক, যাদের জন্য রোগীরা অপেক্ষা করে আর দুই, যারা রোগীর জন্যে অপেক্ষা করে।
এমনতরো ভাবনা ঘোর বোকামি, ডিগ্রিওলা পাস করা সব ডাক্তারদের জন্যে অপেক্ষমান থাকে রোগীরা আর হাতুড়েরা হাপিত্যেশ করে বসে থাকে রোগীর জন্যে।
তিনহাত লম্বা ডিগ্রি পুচ্ছধারী ভূরি ভূরি চিকিৎসক আছে, যারা ছিপুড়েদের মতো ধৈর্য সহকারে নিজ চেম্বারে বসে থাকে রোগীর প্রত্যাশায়। আবার সামান্য কোয়াক—পুঁথিগত বিদ্যায় ক্লাস এইট, তারপর হয়তো কোনও ডাক্তারের সহকারী, সে চেম্বার খুলে বসল আর দেখা গেল রেশন দোকানের মতো লম্বা লাইন, সকাল-সন্ধে নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই ডাক্তারের। অর্থাৎ কার পসার জমবে আর কে মাছি তাড়াবে দেবা না জানন্তি।
বোঝাই যাচ্ছে, কেবল ডিগ্রির ফিরিস্তি দিয়ে চললে কপালে কিংবা পকেটে দু:খ অনিবার্য। আরও অতিরিক্ত কিছু চাই সফল ডাক্তারবাবুর। সেই অতিরিক্তটা কী? এ-ব্যাপারে বোধহয় ঐকমত্য সম্ভব নয়। আমরা কেবল ভাসাভাসা আন্দাজ করি মাত্র।
প্রথমেই বলি, হাতের লেখা। বীভৎস হস্তাক্ষর বড় ডাক্তারের সম্পদ। এ লাইনে সফল হতে গেলে খুব যত্ন সহকারে হাতের লেখাটি খারাপ করে ফেলতে হবে। ওষুধের দোকানদার ছাড়া অন্য লোক যদি বুঝেই গেল ডাক্তারবাবু কী লিখেছে, তাহলে আর সে কীসের বড় ডাক্তার? একবার এক বিপজ্জনক কথা শুনেছিলাম এমনই এক দোকানদারের কাছে। জিগ্যেস করেছিলাম, ওই কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং বোঝো কী করে? সে বলল, সব সময় যে বুঝি তা জোর দিয়ে বলতে পারি না। আমি আঁতকে উঠলাম, তবে! ভুল ওষুধ দিয়ে দিলে! সে বলে, ভুল তো ডাক্তারবাবুও করতে পারে। তা ছাড়া সবসময় যে ক্ষতি হয় তা নয়। ডাক্তারবাবু ভুল ডায়াগোনিসিস করে ওষুধ লিখলেন, আমারা ভুল করে অন্য কিছু দিলাম এবং দেখা গেল সেটাই রোগীর পক্ষে ঠিক ওষুধ। দুটো ভুল থেকে একটা ঠিক হয়, যেমন দুবার পেছন ফিরলে ফের সামনে চলে আসে। নয় কি, তুমিই বলো না।
না, আমি আর কিছু বলতে পারিনি। শুধু নিজের অসুখ করলে মনে মনে প্রার্থনা করি যে ভুল করলে যেন দুজনই করে।
এ হেন প্রেসক্রিপশন আবার অনেক সময় সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়। এক ভদ্রলোকের কথা জানি যিনি একখানা এমনই দুর্বোধ্য ব্যবস্থাপত্র রেলের পাস বলে চালিয়েছিলেন। সেটা দেখিয়ে এক সরকারি গেস্টহাউসে কাটিয়ে এসেছিলেন ক-দিন। ছোট নাতি দুষ্টুমি করলে সামনে ধরতেন আর নাতি জুজু বলে আঁতকে উঠত। সেই প্রেসক্রিপশন সামনে রেখেই নাকি তাঁর কন্যা পিয়ানোতে সুন্দর সুর বাজিয়েছিল একবার।
এরপর চেহারা। ডাক্তার যদি কন্দর্পকান্তি হয় তবে বাড়তি মাইলেজ। রোগী প্রেমে পড়বেই। কোনও গাবলু-গুবলু সুদর্শন বাচ্চা দেখলে অনেকেই ভবিষ্যদবাণী করে বসে বড় হলে ডাক্তার হবে ঠিক। ডাক্তারকে দেখেই অর্ধেক রোগ সেরে যাবে এই মিথে বিশ্বাসী তারা। এ হয়তো নেহাতই যুক্তিহীন বিশ্বাস, কিন্তু কোনও রোগীই বোধহয় অন্তর থেকে চায় না ডাক্তারকে দেখে যমরাজের চেহারা ভেসে উঠুক মনে। পসার জমাতে ব্যর্থ এক অসুন্দর ডাক্তার বলেছিল, ডাক্তারকে দেখেই যদি অর্ধেক রোগ সেরে যায় তবে তাকে দুবার দেখে নিলেই পারে, খরচা করে ওষুধ খেতে যাওয়ার কী দরকার!
যথেষ্ট সংগত ক্ষোভ। বিনা ওষুধে রোগ নিরাময় হলে ওষুধ না খাওয়াই তো বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে ওষুধ সম্পর্কিত সেই অমোঘ সাবধানীবাণী যখন শুনিয়েছিলেন ভিষক শিরোমণি বিধানচন্দ্র রায়,—অসুখ করলে আপনি নিশ্চয়ই ডাক্তারের কাছে যাবেন কারণ ডাক্তারকে খেয়েপরে বাঁচতে হবে। তারপর ব্যবস্থাপত্র মতো ওষুধ কিনবেন অবশ্যই, কারণ ওষুধ প্রস্তুকারক এবং দোকানদারকে বউ ছেলেপুলে নিয়ে বাঁচতে হবে এবং ওষুধ কিনে নির্দ্বিধায় সেগুলো ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করবেন, কারণ আপনাকেও তো বাঁচতে হবে। এর প্রতিধ্বনি ছিল কোনও এক বিশ্ববিশ্রুত চিকিৎসকের কণ্ঠে। ডাক্তারদের এক আলোচনার শেষে সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন,—Inspite of all that has been said for the medical science, if all the medical books and journals are thrown out into the sea, it will be the best for mankind but the worst for fishes—অর্থাৎ ডাক্তারি বইপত্র সব জলে ফেলে দিলে মানুষ বেঁচে যাবে কিন্তু ধনেপ্রাণে মরবে মাছেরা।
শুনে হোমিয়োপ্যাথি ডাক্তাররা রে-রে করে তেড়ে আসতে পারে। তারা বলে, অ্যালোপ্যাথি ওষুধ বিষবৎ, কিন্তু হোমিয়োপ্যাথি নির্বিষ। হোমিয়ো-অ্যালো সম্পর্ক অনেকটা কংগ্রেস-সিপিএমের মতো। বিস্তর অভিযোগ একে অপরের নামে। হোমিয়ো বলে, অ্যালোপ্যাথিতে রোগ সারে না, কেবল ধামাচাপা পড়ে। পরে সেই রোগ দুনো হয়ে হামলা চালায়, কিংবা টেনে আনে অন্য ব্যাধি। তোমার কনুইয়ের ঘা সারল, কিন্তু বদলে পেলে হাঁপানি। মাইগ্রেন যাওয়ার সময় সমাদরে বসিয়ে দিয়ে গেল ক্রনিক পেটের রোগকে।
আবার অ্যালোপ্যাথি বলে হোমিয়োপ্যাথি খাওয়া না খাওয়া সমান। খেলে সাতদিন না খেলে এক সপ্তাহ। ছোট পিসি ঘুমের ঘোরে দাঁত কিড়মিড় করত কি না, রোগীর ঘামে বোঁটকা গন্ধ না মিষ্টি বিচার করে ডাক্তার একফোঁটা জল বা দুটো চিনির দানা দিল, এতে যদি রোগ নিরাময় হয় তবে অনতিবিলম্বে সেই রোগীকে মনোবিদের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।
হোমিয়োপ্যাথি চিকিৎসা কেবল সূক্ষ্ম নয়—সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম, বাঙালির বুদ্ধির মতো; এত সূক্ষ্ম যে আছে কিনা বোঝা কঠিন।
প্রসব বেদনায় ছটফট করছে পোয়াতি। বাড়ির লোক ছুটলে ডাক্তারের কাছে। কিন্তু ডাক্তারের কিছুতেই মনে পড়ছে না, প্রসব সংক্রান্ত ওষুধের নামটা। এ-আলমারি সে-আলমারি হাতড়াচ্ছেন। রোগীর লোক অধৈর্য। অবশেষে একটা শিশি বের করে ছিপিটা সবেমাত্র খুলেছে, বাড়ি থেকে সংবাদ এল প্রসব হয়ে গেছে, ওষুধের আর দরকার নেই। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে ডাক্তার ফিজ দাবি করল।
—ফিজ কেন ডাক্তারবাবু, ওষুধ তো লাগেনি!
ডাক্তার বলল, আমাদের শাস্ত্রের এমনই মহিমা, বুঝলি, এখানে ছিপি খুললে বাড়িতে প্রসব হয়ে যায়।
আর থাকা চাই প্রখর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব অর্থাৎ সাদা বাংলায় ম্যানেজ মাস্টারি। ভুল করে ফেলে ঘাবড়ালে চলবে না। ভেঙেছে বাঁ-পা ডাক্তার প্লাস্টার করে দিল ডান পা। রোগী দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে বলল, এইবার তো বাঁ-পাটা করব—দু-পায়ে প্লাস্টার করে দিলে চলাফেরা করতে সুবিধে হবে। ডান পায়ের জন্যে মজুরি নেব না, শুধু প্লাস্টারের দামটা দিয়ে দিলেই হবে।
অপারেশনের পর ডাক্তাররা ভুল করে মাঝেমধ্যে ছুরি-কাঁচি ফেলে রাখে। একবার এক শল্যচিকিৎসক এক টুকরো স্পঞ্জ রেখে পেট সেলাই করে দিল। কিছুদিন পর রোগী গিয়ে বলল, সব ঠিক আছে ডাক্তারবাবু কেবল জল তেষ্টা বেড়ে গেছে প্রচণ্ড। ডাক্তার বুঝল কেলেঙ্কারিটা। সঙ্গে সঙ্গে বলল, খুব ভালো কথা, ভয়ের কিছু নেই, বেশি বেশি জল খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো।
ভালো চিকিৎসক রোগীর মনে সঞ্চারিত করে আশাবাদ। কাশি হোক বা কর্কট রোগ, ডাক্তারবাবুকে সব সময় বলতে হবে, ভয়ের কিছু নেই, আপনি ভালো হয়ে যাবেন। অপারেশন টেবিলে শায়িত এক রোগীকে কিছুতেই ভয়মুক্ত করতে না পেরে ডাক্তার বলল, আপনার মতো রোগ আমারও হয়েছিল, দেখুন অপারেশনের পর কেমন ভালো হয়ে গেছি। আপনি মিছিমিছি ভয় পাচ্ছেন। রোগী খুব অসহায়ভাবে বলেছিল, কিন্তু স্যার, আপনার অপারেশনটা তো আর আপনি করেননি, অন্য ডাক্তার করেছিল।
সবাই যে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করবে এমনটা ভাবা ভুল। একবার একজন অপারেশন টেবিল থেকে পালিয়েছিল। বাড়ির লোক অবাক। জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার! রোগী হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, অপারেশন থিয়েটারে নার্সটি কেবলই বলছিল, ভয় পাবেন না, আমি আছি, ভয়ের কিছু নেই। তো বাড়ির লোক বলল, এ তো ভালো কথা, নার্স তো রুগিকে অমন বলবেই। রোগী বিরক্ত হয়ে বলল, দুর ছাই! আমাকে নয়, ডাক্তারকে বলছিল যে!
ডাক্তার যত বড়, তার বিচরণক্ষেত্র তত সংক্ষিপ্ত। হার্টের ডাক্তার কিছুতেই পেটে হাত দেবে না। চোখের ডাক্তারের কাছে কান নিয়ে গেলে শুনতেই চাইবে না। কত রকমের স্পেশালিস্ট পেট-বুক-মাথা-চোখ-কান-গলা দাঁত-বাত…! বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি। দন্তশূলে কাতর একজন গেল ডেন্টিস্ট ডা. ধড়ের কাছে। ধড় দেখেশুনে বলল, আপনি ডা. ভড়ের কাছে যান। রোগী বলল, ক’দিন আগেই তো আপনি আমার একটা দাঁত তুলে দিলেন। ডা. ধড় বলল, সেটা তো নীচের পাটির ছিল, আমি নীচের পাটি স্পেশালিস্ট, ডা. ভড় ওপরের পাটি।
হাতুড়েদের নিয়ে সে সমস্যা নেই। তারা ভীষণ রকমের বহুমাত্রিক। অর্শ টু উদুরি, যক্ষ্মা হোক বা পক্ষাঘাত—সবকিছু একা লড়ে নেয়। দেশগাঁয়ে বহু ডাক্তারবাবু গোরু-ছাগলের সঙ্গে মালিকেরও চিকিৎসা করে। অ্যালোপ্যাথি, হোমিয়োপ্যাথি, কবিরাজি সবকিছু মজুত রাখে তারা, সঙ্গে দরকার মতো চালপড়া, নুনপড়া বা ঝাড়ফুঁক। দু-ফোঁটা হোমিয়োপ্যাথি দিল জিভে, অ্যালোপ্যাথি বড়ি দিল; আর ক’টা পাঁচনেরও ব্যবস্থা করল। তার ওপর মন্ত্রতন্ত্র আওড়ে ঝেড়ে দিল রোগীর শরীর আর জলপড়া দিল কিছুটা। একেবারে সাঁড়াশি আক্রমণ। রোগ বাপ বাপ বলে পালাবে।
আমাদের পাড়ার শোভা গোয়ালিনি। চিংড়ি মাছ দিয়ে পুঁইশাকের ঘ্যাঁট খেয়ে পেট ছেড়ে দিয়েছে। শোভা গেল কানাই ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার ওষুধ দিল। শোভার কালো গাইটারও অসুখ। দুধ দিচ্ছে না ভালো। তার জন্যেও ওষুধ দিল ডাক্তার। কিন্তু কেলেঙ্কারি করে বসল শোভা। বাড়ি ফিরে উলটো-পালটা করে ফেলল ওষুধ। খাবার পর ধরা পড়ল ব্যাপারটা। আতঙ্কিত শোভা ফের ছুটল ডাক্তারের কাছে। শুনেটুনে মৃদু হেসে ডাক্তার বলল, ভালোই হয়েছে, এবার তোর গোরু ঘুঁটে হাগবে আর চেহারা ফিরে যাবে তোর কোলের ছেলেটার।
একটু বিজ্ঞাপন করলে ভালো হয়, বিশেষত পসারের শুরুতে। দিগবিদিকে গল্পগুজবে—ডক্টর অমুক একেবারে ধন্বন্তরি, ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া রোগীকে বাঁচিয়ে দিয়েছে—শ্মশান থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরেছে রোগী। আমাদের পুলিন ডাক্তার হাতুড়ে, তার ছিল অন্য পন্থা। প্রথমদিকে একদম রোগী হত না। সকালে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত পাড়া-বেপাড়ায়। রাস্তার ওপর হয়তো কোনও বাচ্চা পায়খানা করছে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল ডাক্তার। তারপর হাঁকডাক—কার বাচ্চা এটা? তখন তাড়াতাড়ি দৌড়ে এসে বাচ্চার মা বলছে—দুষ্টু ছেলে বাবা, কিছু মনে কোরো না, পোষ্কার করে দিচ্ছি। ডাক্তার বলল, পরিষ্কারের কথা হচ্ছে কেন? এ তো পরিষ্কার হুকওয়ার্ম কেস; ফেলে রাখলে বিপদ, আন একবার দেখি ছেলেকে।
সফল ডাক্তারের রেসিপির মূল উপাদান নাকি অন্য আর-একটা জিনিস। সেদিন আমাকে হাতেকলমে শিখিয়ে দিল আমার এক বাল্যবন্ধু। ধরা যাক, তার নাম গোপাল। আমার ইস্কুলের সহপাঠী সে। বহুদিন পর গোপালের সঙ্গে হঠাৎ দেখা। আমি সাইকেলের টায়ারে পাম্প দিচ্ছি, পাশে এসে দাঁড়াল ঝকঝকে একটা গাড়ি। গাড়ি থেকে যে নামল তাকে গোপাল বলে চিনতে কিছুটা সময় লাগল আমার। স্যুট-বুট পরিহিত চাবুক সাহেব একখানা। শুধু কপালের মাঝখানে মস্ত আবখানা নির্ভুল আছে। সেটা দেখেই শনাক্ত করলুম গোপালকে।
মনে পড়ল শিক্ষকমশাইরা বলতেন, তোর মাথায় এত গোবর যে বাড়তিটুকু আব হয়ে ফুলে আছে। গোপালকে জিগ্যেস করলুম, এখন কী করছিস? গোপাল বলল, ডাক্তারি। শুনে এত ঘাবড়ে গেলুম যে বেখেয়ালে বেশি পাম্প দিয়ে ফাটিয়ে ফেললুম টায়ারটা। গোপাল বলল, উঠে আয় আমার গাড়িতে।
গাড়ির ভেতরটা বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা। গোপাল বলল, এসিটা নতুন লাগিয়েছি। কৌতূহলে আমার পেট ফুলছে। ভয় হল, টায়ারের মতো ফেটে না যায়। তাই বলে ফেললুম, তোর পসার তাহলে ভালোই জমেছে, কী বলিস? গোপাল বলল, মন্দ নয়। আমি বললুম, জমালি কী করে? গোপাল বলল, ডাক্তারি যদি আটঘাট বেঁধে করতে পারিস তো মার নেই।
গোপালের বাড়ি পৌঁছোলাম। বাড়িতেই চেম্বার গোপালের।
আমি এমন অবাক হয়ে গেছি যে মুখে বাক্য সরছে না। আমাকে এমন তাজ্জব দেখে গোপাল ব্যাখ্যা করল—তুই তো জানিস, আমরা আট ভাই। আমার যে কম্পাউন্ডার সে আমার এক ভাই। যে ছেলেটা রোগীদের নাম-ঠিকানা লিখছে সে আর-এক ভাই। বাড়ির পেছনের জমিতে ভেষজ চাষ করছে এক ভাই, ওষুধ বানাচ্ছে একজন, শিশি-বোতল ধুচ্ছে আর-একজন।
এমন করে সাত ভাইয়ের হিসেব মিলিয়ে দিল গোপাল। আমি তখন বললুম, এ তো সাতঘাট হল রে, আর একজন কোথায়? গোপাল বলল, আছে-আছে, চল দেখাচ্ছি। তারপর গোপাল আমাকে সঙ্গে নিয়ে বেরোল। অনেকটা পথ হাঁটলুম আমরা। গ্রামের শেষে শ্মশান। গোপাল আঙুল তুলে দেখাল, ওই যে, শ্মশানের পাশে কাঠের দোকান, ওই দোকানদার আমার এক ভাই।
আটঘাটের হিসেব প্রাঞ্জলভাবে বুঝে গেলুম আমি।
কী মনে হচ্ছে, নির্জলা গুল! ঠিক আছে, আপনি নিজে যখন ডাক্তার-নার্সিংহোম-প্যাথোলজিস্ট-ফিজিয়োথেরাপিস্ট ইত্যাদি চক্রব্যূহে পড়বেন এবং অভিমন্যুর মতো অসহায় মনে হবে নিজেকে, তখন প্রত্যয় হবে অধমের কথা।
