ছাতা-মাথা
ছাতা বড় অভিমানী। এতটুকু অবহেলা দেখলেই সম্পর্ক ছেদ। ঠিক প্রেমিকার মতো—নিয়ত অ্যাটেনশন চাই। একটু অন্যমন হয়েছ কী,—অমনি বড় নিষ্ঠুরভাবে ধরে নেবে আর একজনের হাত। ভুলে যাবে প্রথম প্রেম। ভুলে যাবে, সেই প্রেমাস্পদের সঙ্গে দু:খে-সুখে কত দিবস কাটিয়েছে, দুর্যোগে হেঁটেছে কত পথ। আবার, নতুন মানুষ ঠিকমতো দেখভাল করল তো ভালো, না হলে ফের হাতবদল। এমনও হয়, সুদীর্ঘকাল পরে পাঁচ-সাত হাত ঘুরে ছাতা আবার প্রথম মালিকের হাতে। সে তখন তাকে ভুলে গেছে বেমালুম। নতুন প্রাপ্তি ভেবে পুলকিত হচ্ছে। উপসংহারে বলা যায়, যার ধন তিনিই নিলেন, জনগণকেও বঞ্চিত করলেন না।
ছাতা সুন্দরীদের মতো রূপ বদল করেছে যুগে যুগে। আগে ছিল গতরভারী—সুতির মোটা কালো কাপড়, কাঠের ডান্ডা। মেলে ধরলে বিশাল চাঁদোয়া; তিন-চারজন আরামসে শেল্টার নিতে পারে নীচে। তারপর ফিগার সচেতন হয়ে স্লিম হল। স্টিলের বাঁট, নাইলনের কাপড়। তারপর ক্রমশ টু ফোল্ড, থ্রি ফোল্ড—পাশ পকেটে ঢুকে যায় অনায়াসে। পালবংশীয় কিংবা দত্তকুলোদ্ভব—সবার এখন নানা বৈচিত্র্য কাপড়ে, রঙে, হ্যান্ডেলে।
তবে একটা কথা, জিনিসটা পুরুষমানুষের হাতে একটু আনরোম্যান্টিক বটে। হনুমানটুপির মতোই প্রেমের আঙিনায় ব্রাত্য। ঝকঝকে যুবক বৃষ্টির ভয়ে ছাতা বগলদাবা করলে বায়োডাটা কমজোরি হতে বাধ্য। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজবে, প্রবল বজ্রাঘাতের মধ্যে নির্ভয়ে হেঁটে যাবে, তবেই না সর্দি-কাশিজয়ী কমপ্টি ম্যান। তবেই না সবপেয়েছির দেশের নবীন যুবরাজ।
এখানেই জোর কম্পিটিশনে ফেলে দিয়েছে রেনকোট। ভীষণ একটা মাচো ইমেজ তার। গায়ে চাপালে কখনও মনে হবে না আনস্মার্ট—। বরং হি-ম্যানত্ব ঠিকরে পড়বে ব্যক্তিত্ব থেকে। গোয়েন্দারা যেমন রেসপেক্টই পায় না রেনকোট আর গগলস ছাড়া।
একটা জায়গায় শুধু টেক্কা দিয়েছে ছাতা। গ্রীষ্মের দাবদাহেও ভরসা দেয় সে। তখন ভারি অসহায় রেনকোট।
ছাতা বৃষ্টি আটকায়। রোদ রুখে দেয়। আর কাটিয়ে দেয় কুদৃষ্টি। ইট-কাঠ-পাথরের শহরে বিচরণভুমির বড় টানাটানি। এক ছটাক সবুজের সন্ধান পেলেই কাতারে কাতারে যুগল ধাবমান হয় সেদিকে। সেখানে মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো হয়তো কোনওমতে দখল হল সিট। কিন্তু তাকে নিয়ে দু-দণ্ড শান্তিতে বসিবার জো-নাই। ভিখিরি হাত পাতবে, বাদাম ঝালমুড়ি ঘ্যানোর ঘ্যানোর করবে, ছিঁচকে লোকজন ভ্যাবাগঙ্গারাম মুখ করে সামনে দিয়ে অনাবশ্যক হেঁটে যাবে উনিশবার। যাবে, আর আড়চোখে পুং হাতের পজিশন সেন্সার সীমা লঙ্ঘন করল কি না মাপবে। তারপর বলা-কওয়া নেই বিশুকাকা, রতনমামা, কিংবা শনির কোপে পড়লে খোদ পিতৃদেব অকুস্থলে কী করে যেন সেই কালবেলাতেই উদয় হবে। তখন বর্ম ছাতা। ফটাস করে খুলে মেলে দাও সামনে। অন্তরালে আমি তোমার, তুমি আমার। বাইরে শুধু দুজোড়া পা দৃশ্যমান। গুরুমশাই শিষ্য সমভিব্যাহারে যাচ্ছিলেন। শিষ্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিগ্যেস করল, ওটা কী গুরুমশাই? গুরুমশাই দেখেই তোবা তোবা করে উঠলেন। বললেন, উহার নাম চতুষ্পদ আতপত্র, ক্লিন্ন জীব বিশেষ, ওদিকে দৃষ্টি দিলে নরকগমন অনিবার্য।
আমাদের হেডস্যার ছিলেন হলধরবাবু। হলধরবাবুর হাতে কেউ কোনওদিন হাল দেখেনি; কিন্তু ছাতা দেখা যেত সর্বদা। বাউলের যেমন একতারা, পুলিশের যেমন ডান্ডা, ক্যাডারের যেমন ঝান্ডা, হলধরবাবুর তেমনি ছাতা। শীত-গ্রীষ্ম, শরৎ-বসন্ত, বর্ষা-বাদলা সবসময় সঙ্গে একখানা ঢাউস ছাতা। হয় মাথায় নয় হাতে, অথবা বগলে। জনান্তিকে হলধরবাবুকে আমরা ছত্রধরবাবু বলতাম। তখনও অবশ্য মাহাতো পাদপ্রদীপের আলোয় আসেনি। গুরুগম্ভীর হেডস্যার স্কুলে এসে নিজের ঘরের এক কোণে দাঁড় করিয়ে রাখতেন ছাতাখানা। এ হেন হলধরবাবুকে এক বৃষ্টির দিনে দেখা গেল ভিজতে ভিজতে আসছেন। এবং কিমাশ্চর্য বগলে তাঁর ছাতা। তবে কি বিকল হয়ে পড়েছে স্যারের ছাতা—ইস্কুল সরগরম হয়ে গেল আলোচনায়। রাশভারী হেডস্যারকে জিগ্যেস করার সাহস ছিল না আমাদের। অগত্যা গিয়ে পড়লাম প্রদীপ স্যারের কাছে। প্রদীপ স্যার ছিলেন মাস্টারমশাইদের মধ্যে বয়:কনিষ্ঠ। ভূগোল পড়াতেন, ইন করে জামা পড়তেন। আর আমাদের সঙ্গে মিশতেন বন্ধুর মতো। তাঁর কাছ থেকে জানলাম, ওটা নাকি স্যারের গরমের ছাতা; স্যার ভুল করে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন সেদিন।
ব্যাপার-স্যাপার মাথায় ঢুকল না আমাদের। ছাতার আবার ঠান্ডা-গরম কী!
আজব তথ্য জানালেন প্রদীপ স্যার। হেডস্যারের নাকি এক-একটা ঋতুর আলাদা আলাদা ছাতা। শীতের ছাতা, বর্ষার ছাতা, বসন্তের ছাতা…। প্রবল ছাতানিষ্ঠ হেডস্যার শত অসুবিধেতেও ছত্রভঙ্গ করতেন না।
সত্যি-মিথ্যে আজও ঠিক জানি না। তবে আমাদের সহপাঠী কুশল একটা তথ্য দিয়েছিল আমাদের। এ হচ্ছে সেই কুশল, যে আমাদের চাইতে দু-ক্লাস নীচে পড়া কাজরীকে প্রায়ই প্রেমপত্র দিত। কাজরী মানে সেই কাজরী যার বাবা হলেন আমাদের হেডস্যার—দোর্দণ্ডপ্রতাপ হলধরবাবু। ধরা পড়ে কুশলকে মাঝে মাঝেই হাজিরা দিতে হত স্যারের ঘরে। কিল-চড় দিয়ে শুরু হত ধোলাই পর্ব, শেষ হত ছাতাপেটায়। সেই কুশল কিন্তু বলেছিল, সব ছাতাপেটার স্বাদ একইরকম—সেখানে শীত-গ্রীষ্মে কোনও তারতম্য নেই।
যাই-হোক, বছরভর বিস্তর ছাতাপেটা খেয়েও নিবৃত্ত হয়নি কুশল। প্রেমটাকে ছাতনা-তলা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল। হেডস্যারও মেনে নিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। বিয়ে দিয়েছিলেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। ফুলশয্যার দিন নিমন্ত্রিত ছিলাম আমরা। দান সামগ্রীতে অনেক কিছুর সঙ্গে একটা ছাতাও দেখেছিলাম। কুশলকে জিগ্যেস করেছিলাম, এটা কোন সিজনের? কুশল বলেছিল, জানি না রে, আজ রাতে কাজরীকে জিগ্যেস করে নেব।
এবার নকুলকাকার কথা। আমাদের পাড়ার নকুলকাকা।
নকুলকাকা মাঝে-মাঝেই চিৎকার করত—ছাতা-মাথা জীবন লাথি মেরে চলে যাব শালা!
নকুলকাকার তিনটে অবিবাহিত মেয়ে, দুটো অকালকুষ্মাণ্ড ছেলে, একটা নোনাধরা বাড়ি, রুগ্ন বউ, বিধবা পিসি, একটা নেড়ি কুকুর, বিস্তর দেনা আর লকআউট কারখানা। আর ছিল নকুলকাকার ছাতা। কালো কাপড়ের লম্বা ছাতা। নকুলকাকার সর্বক্ষণের সঙ্গী। গর্বের দৃষ্টি ফেলে কাকা বলত—কতকালের জিনিস জানিস; এসব এখন আর পাওয়া যায় না। রং জ্বলে যাওয়া কাপড়ে ছোট ছোট ফুটো। মাথায় মেলে দিয়ে ঊর্ধ্বমুখে তাকালে ফুটোগুলো ঝিকিমিকি তারার মতো দেখাত।
ছাতা-মাথা জীবনে লাথি মারা হয়নি নকুলকাকার। যাওয়াও হয়নি কোথাও। ছাতাটাও ছেড়ে যায়নি কাকাকে।
দুজনেই প্রাচীন হয়েছে শুধু। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে গেছে কাকা। ছাতাটার লোহার শিকে জং; ফুটোগুলো বড় হয়েছে একটু।
ওগুলো দিয়ে এখন আকাশ দেখা যায়।
