একটি গরম রচনা – উল্লাস মল্লিক

একটি গরম রচনা

ছেলেবেলায় শিক্ষকমশাই রচনা লিখতে দিয়েছিলেন—তোমার প্রিয় ঋতু। আমার বেশিরভাগ সহপাঠী লিখল বসন্ত। কিছু শরৎ; গুটিকতক শীত। একজন মাত্র লিখল গ্রীষ্ম। সেই ছেলেটির বাবা ছিল ছিঁচকে চোর। সে লিখল—ইহা আমাদের বড় সুখের সময়। বাবার রোজগার বহুগুণ বাড়িয়া যায়। গ্রামের লোকজন গরমে সারারাত হাঁসফাঁস করিয়া ভোর রাতে গভীর নিদ্রামগ্ন হইয়া পড়ে। জানলা-দরজা খোলা। বাবা তখন আঁকশি মাত্র সম্বল করিয়া অক্লেশেই ঘরের পর ঘর সাফ করিয়া দিতে পারে। মায়ের পরনে নতুন কাপড় ওঠে, আমি নতুন জামা, গেঞ্জি পাই। দুবেলা পেট পুরিয়া ভাত খাই আমরা।

এসব অনেককাল আগেকার কথা। সে গ্রাম আর নেই। ছিঁচকে চোরও আজ বিরল প্রজাতি। এখন চারদিকে পুকুর চোরেদের দৌরাত্ম্য। কিন্তু গ্রীষ্মকাল আজও ফি বছর ঠিক হাজিরা দেয়। তখন গরম পড়ে; এবং বেশ দুনো হয়েই পড়ে। সাহেবরা তো কবে বলে দিয়েছে, এদেশে দুটো ঋতু—গরম আর অতি গরম। কথাটা ফেলে দেবার মতো নয়। এই দুই ঋতুর মাঝখানে ছোট্ট হাইফেনের মতো লেগে থাকে শীত। পোড়া দেশে ক্ষমা ঘেন্না করে শীত একবার ঘুরে যায়। সে নেহাতই নিয়মরক্ষার জন্য। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই মধ্যবিত্তের মাস মাইনের মতো কখন যেন ফুস করে গলে যায়। ফেব্রুয়ারি পড়তে না পড়তেই ফ্যান ফুল স্পিডে। দিনের বেলা বাইরে বেরোলেই রোদের আঁচড়। উদোম রোদে আধঘণ্টা থাকলেই মৌরিপোড়া। দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদে কুকুর-বেড়ালের সঙ্গে গাছ-পালাগুলোও ঝিমোয়। ছেলেবেলায় দেখতাম গরম পড়লে আইসক্রিমওলা কুঁজোওলা হাতপাখাওলাদের সঙ্গে আমাদের বুড়ি ঠাকুমা মহাখুশি। এমনিতে বুড়ির কোনও কাজ নেই। সারাদিন বেকার বসে থাকে। এইসময় বাড়ির কাচ্চাবাচ্চাগুলোর ঘামাচি মেরে তবু কিছুটা সময় কাটবে। গরমকালে আমাদের সারা গায়ে ঘামাচি বেরোত চাক বেঁধে। গায়ে রোদ লাগলেই বিড়বিড়িনি। চানের সময় ঘরে ফটকিরি ঘষতে হত। প্রথম বর্ষার জলে নাকি ঘামাচি-ঘাতক উপাদান আছে। তাই বৃষ্টি নামলে চুপচাপ হয়ে ভিজতুম আমরা।

হাতপাখাওয়ালা কুঁজোওলাদের মতন আর একজনের গরমকালে পৌষমাস হত। সে নাপিত। গরম পড়লেই নরসুন্দর হাতে কাঠের বাক্স ঝুলিয়ে পাড়ায় হাজির। বাচ্চাদের ইটে বসিয়ে পাইকিরি রেটে ন্যাড়া করে দিত। নাম ছিল ইটালিয়ান সেলুন। সব যুগেই কিছু ফ্যাশন সচেতন বাচ্চা থাকে। তারা ঠিক পিছলে বেরিয়ে যেত। সঙ্গে সঙ্গে হুলিয়া জারি। খোঁজ, খোঁজ কোথায় গেল! ইতিমধ্যেই যারা মুণ্ডিত তাদের উৎসাহই বেশি। ফ্যাশানবাবুর জাত না মারা পর্যন্ত শান্তি নেই। ছাদ, গোয়ালঘর বা খড়ের গাদার পেছন থেকে ঠিক টেনে বের করত তাকে। তবে ন্যাড়া একবার হয়ে গেলে বেশ ফুরফুরে মুক্ত পুরুষ মনে হত নিজেকে। একটু হাওয়া দিলেই মাথায় সুরসুরি আসত। ফুটবল মাঠেই শুধু বিপত্তি। মাঠে গিজগিজ করছে ন্যাড়ামুণ্ডিরা। রামকে বল পাস দিয়ে দেখি শ্যাম পেয়ে গেছে। আজকাল বাচ্চাদের এই সিজিনাল মুণ্ডনের রেওয়াজটা উঠে গেছে। এখন গোটা পৃথিবীটাকেই ন্যাড়া করে ছেড়ে দিয়েছে বাচ্চাদের অভিভাবকরা। মেয়েদের যেমন তেঁতুল দেখলেই জিভে জল আসে, কিছু মানুষের তেমনি সবুজ দেখলেই নোলা সপসপ করে। ধ্বংস না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। প্রতিবাদ করলেই আপনি প্রতিক্রিয়াশীল, উন্নয়নবিরোধী। অতি দ্রুত সবুজ মুছে যাচ্ছে চারপাশ থেকে। গরমের চোখ রাঙানি বাড়ছে দিন দিন। মার্চ পড়তে না পড়তেই দম ফোট অবস্থা। রাস্তার পিচ গলছে, হিমালয়ের বরফ গলছে, আর আমাদের গা থেকে গলে পড়ছে ঘাম। বাইরে বেরোলেই গলা শুকিয়ে চচ্চড়ি। ঘন ঘন কোল্ড ড্রিংকস, লস্যি, আইসক্রিম। রেডিয়ো-টিভি-কাগজে আবার বিশেষজ্ঞদের সাবধানবাণী—কাটা ফল, রাস্তার শরবত ত্যাজ্য, তেতেপুড়ে এসে ঠান্ডা বর্জনীয়, জল ফুটিয়ে ক্লোরিন মিশিয়ে ইত্যাদি। মেনে চলতে পারলে ভালো, না হলে আন্ত্রিক ওত পেতে আছে। গরমের দাপে জলের মাছ থেকে ডাঙার কুকুর সবাই ঘায়েল। পুকুরের জল একহাঁটু। টগবগে জলে খাবি খায় কাতলা। কুকুরগুলো আধহাত জিভ বের করে ঝিমোয়—সামনে দিয়ে বেড়াল হেঁটে গেলে তাড়া করার উৎসাহ পায় না—কেমন ক্ষমাসুন্দর চোখে তাকিয়ে থাকে। আবার বেড়ালের গায়ে ইঁদুর উঠলে সে বিরক্ত। ওদেরও বোধহয় প্রচণ্ড গরমে অরুচি হয় মানুষের মতন। গ্রামে গ্রামে চাষের মাঠ ফুটিফাটা। আকাশের দিকে তাকিয়ে ‘ম্যাঘ-পানি’ চায় চাষি। টাইম কলের জলে তেষ্টা মেটায় শহুরে কাক। তবে ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যেই। আমাদের গরিবগুর্বো দেশ। গরিবের সম্বল বলতে আপনি আর কোপনি। গরমের দিনে কোপনিই হচ্ছে আইডিয়াল পোশাক। এ ব্যাপারে অবস্থাপন্নরা ঈর্ষা করে হাভাতেদের। তবে চিন্তা নেই। ধনীরাও যেভাবে পোষাক কাটছাঁট করছে অচিরে কোপনিও লজ্জায় জিভ কাটবে।

এসব তো গেল দাবদাহ—জলে স্থলে অন্তরীক্ষে। আরও বহু প্রকার গরম আছে। যেমন—যাদের মটকা গরম বা মাথা গরম। বাসে-ট্রামে গায়ে গা লাগলে, কেউ কাজে ভুল ধরিয়ে দিলে বা তরকারিতে নুন কম হলে এঁরা ভয়ঙ্কর কুপিত হন। এঁরা তোপ দাগেন ভিন্ন ভিন্ন পন্থায়। কেউ শীতল চোখে তাকান, কেউ গলার শির ফুলিয়ে চিৎকার করেন আবার কেউ থমথমে গলায় কচুকাটা করেন প্রতিপক্ষকে। গরমকাল তাদের কাছে বেশ বিপজ্জনক। প্রেসার মাথায় চড়ে যেতে পারে। এ রোগের দাওয়াই আছে। তেরোর ঘরের নামতা উলটো দিক থেকে আওড়ালে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে এ রোগ থেকে।

তারপর ধরুন যাদের পকেট গরম। এঁরা সচরাচর পছন্দসই জিনিস ব্যাগে ঢুকিয়ে দাম জিগ্যেস করেন, পাড়ার রবীন্দ্রজয়ন্তীর ফাংশানে সভাপতি হওয়ার জন্যে মোটা চাঁদা দেন, চামচা পরিবৃত হয়ে ঘোরাফেরা করেন এবং মান্য ব্যক্তিদের অকারণে অপমান করে আমোদ পান। আপনি যদি এমন ব্যক্তির সামনে পড়েন তবে হেঁ হেঁ করে হাত কচলান আর পেছন ফিরলেই পিণ্ডি চটকান।

মাঝে মাঝে দেখবেন বাজার গরম। পুজোর আগে ভোটের পরে রমজান মাসে, জামাইষষ্ঠী-ভাইফোঁটার দিনে বাজার ভয়ংকর তেতে থাকে, জিনিসে হাত দিলেই ছ্যাঁকা। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন কিছু নয়। সকালবেলা মস্ত দুটো ব্যাগ ঝুলিয়ে বাজারে যান। খুব স্মার্টলি বাজারে ঢুকবেন। গুনগুন করে একটা সুরও ভাজতে পারেন। মনে মনে প্রস্তুতি নিন, যে দামই শুনি চমকাব না। হার্ট যদি নেহাতই খুব দুর্বল হয় মুখে একটা সরবিট্রেট ফেলে দিন। গম্ভীর মুখে দাম জিগ্যেস করুন। এমন একটা ভঙ্গি করে সরে আসুন যেন দামটা ফ্যাক্টর নয়, আপনি আরও সরেস মাল খুঁজছেন। বাজারের এ মুড়ো থেকে ও মুড়ো পর্যন্ত পাক মারুন। প্রতিবেশী ক বাবু বা বাসের সহযাত্রী খ বাবুর সঙ্গে দুর্নীতি, মিলিটারি শাসন বা নেতাজির প্রত্যাবর্তন বিষয়ে গরম আলোচনা করুন। তারপর আর একটা সরবিট্রেট মুখে ফেলে মালগুলো কিনে নিয়ে ভাবুন আজ আপনার পকেটমার হয়ে গেছে।

এলাকা গরমের ব্যাপারটা সবাই জানে। এটা এখন খুব জলভাত ব্যাপার। ভোটের আগে আর পরে দাদাদের চ্যালারা পেটো ছুড়ে ভোজালি ঘুরিয়ে, ওয়ানশটার নাচিয়ে, ড্যাম্প খেয়ে যাওয়া এলাকা গরম করে দেয়। অ্যাকশন শেষে দু-একটা বডি ড্রেনের পাশে মুখ গুঁজরে পড়ে থাকে। সব মিটে গেলে পুলিশ আসে। তারপর কয়েকটা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চাকে তুলে নিয়ে যায়। পুলিশ যদি আপনাকে কিছু জিগ্যেস করে তবে বলবেন, কিছু দেখিনি, কিছু শুনিনি, কিছু জানি না। তবে আপনার যদি মনে হয় পচা ড্রেনে মুখ গুঁজে পড়ে থাকায় অপার সুখ এবং টিভি চ্যানেল আড়াই সেকেন্ড ভ্যানে শায়িত প্লাসটিকাবৃত আপনাকে দেখালে আপনার আত্মার শান্তি তবে পুলিশকে কিছু বলতে পারেন, আমরা বাধা দেব না।

শুরু করেছিলাম কৈশোরের সহপাঠী আর তার পিতৃদেবকে নিয়ে। কথাটা হল, সুবিধে কুবিধে বা অসুবিধে যাই হোক না কেন, গরম আসবেই। পেট থাকলে যেমন খিদে পাবে। গ্রীষ্মের উত্তাপ আকাশ-বাতাসকে ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রগুলোকেও ছুঁয়ে যায়। কাগজ উপচে পড়ে আইসক্রিম, সানস্ক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস আর এসি-র বিজ্ঞাপনে। তার পাশে মাঝে মাঝে থাকে বাঁকুড়া পুরুলিয়া বীরভুমে জলের সন্ধানে মাইলের পর মাইল পথ ভেঙে চলা ক্লান্ত মানুষের ছবি। এসব দেখলে আবার অনেকের মাথা গরম হয়ে ওঠে। আপনার হয় না?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *