ওম – উল্লাস মল্লিক

ওম

দাম্পত্য আর লেপের মধ্যে মিলটা কোথায়? ম্যাক্সিমাম লোক মাথা চুলকোবে! আদিরসাত্মক ইঙ্গিত ভেবে তোবা তোবা করে উঠতে পারে কেউ। এটা কিন্তু নিপাট পবিত্র প্রশ্ন। উত্তর—দুটোই পুরোনো হলে গুটলি পাকিয়ে যায়। এই ফিলজফিকাল তত্বটির উদগাতা আমাদের পাড়ার গদাকাকা। গদাকাকির সঙ্গে খিটিমিটি চেঁচামেচি শাপ-শাপান্তর স্টেজ পেরিয়ে এখন হাতা-খুন্তি-চটি (অবশ্যই হাওয়াই, কারণ, কাকির মতে সোয়ামিকে রবারের জুতো ছুড়ে মারলে দোষ নেই) ছোড়াছুড়ির পর্ব চলছে। কাকপক্ষী তো বহু দিন এড়িয়ে চলে, ইদানীং যুদ্ধ লাগলে কুকুর-বেড়ালও ঘেঁষে না ও দিকে।

তো সে দিন দেখলাম বাইরের রকে বসে আছে গদাকাকা। সামনে ধুনুরি। পুরোনো লেপটা ভেঙে টঙ্কার তুলে তুলো ধুনছে। কাকা বোধহয় আগের দিন একটু বেশি চড়িয়ে ফেলেছিল। চোখগুলো লাল। আমাকে ডেকে পাশে বসাল। বলল, বিয়ের সময় তোর কাকির সঙ্গে লেপটাকেও পেয়েছিলুম বুঝলি। ভেতরের তুলোটুলো সব ড্যালা পাকিয়ে গেছে।

একটা সময় মধ্যবিত্ত বাঙালির বিয়ের দানে অবধারিত ছিল লেপ। বিশেষত, বিয়েটা যদি শীতকালে হত। এক বাঙালি যুবার কথা জানি। খাট তোশক বালিশের সঙ্গে লেপ নেই দেখে প্রশ্ন করেছিল, লেপ কোথায়? শ্বশুর বললেন, বাবা, এখন তো গরমকাল, তুমি লেপ নিয়ে কী করবে? জামাই বলল, কিন্তু শীতকাল তো আসবে। বিচক্ষণ শ্বশুর জামাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন, তা তো আসবে, কিন্তু আমার মেয়েকে তো আমি চিনি। তুমি নিশ্চিত থাকো, বিয়েটা তত দিন টিকবে না।

আমাদের গরমের দেশেও লেপ যথেষ্ট আদর-কদর পেয়ে এসেছে। উত্তম-সুচিত্রার ছবি, অনুরোধের আসর, নলেন গুড়ের সন্দেশ, গড়ের মাঠের ফুটবল, খিচুড়ি-ডিমভাজা, রবীন্দ্রনাথ-নেতাজি আর গরম লেপে চিরকাল বাঙালি বুঁদ। এসব ছাড়া বাঙালি ভাবাই যায় না।

এত রং থাকতে লেপের খোল কেন লাল, তা নিয়ে তাগড়াই একটা থিসিস লেখা যেতে পারে। আগে ছিল বাঁদিপোতার ডোরাকাটা খোল, তাকে হাটিয়ে লাল শালু ক্রমশ গেড়ে বসেছে। আর, পিছু হটতে হটতে বাঁদিপোতা এখন টিমটিমে। চিত্রটা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মতো। লাল ২৩৫, ডোরাকাটা বিরোধী ৩০।

শীতের শুরুতে সবজি বাজারে রঙের হুটোপাটি। সকাল-সন্ধে ঘরে ঘরে হাঁচি আর নাক টানার হিড়িক। পাড়ায় তখন ধুনুরি হাজির। এক জনের পিঠে তুলোর বস্তা, অন্য জনের কাঁধে ধনুকের মতো দেখতে তুলো ধোনার যন্ত্র। ছবিতে রামচন্দ্রকে দেখা ছিল, এই লোকটাকেও তেমনই বীর মনে হত। আমার শৈশবের সেই আইডল বিড়ি ধরিয়ে শালুর স্থায়িত্ব এবং তুলোর মাহাত্ম্য বলে যেত গড়গড় করে।

বাবা-কাকার সঙ্গে মা-ঠাকুমাও হাজির। দরদাম, তুলোর মান যাচাই। কোন তুলো ভালো, শিমুল না কার্পাস, সেরা ক্রিকেটার গাওস্কর না কপিলের মতো আজও বাঙালি ফয়সালা করে উঠতে পারেনি। দরদামে পোষালে ওজন। গোড়া থেকেই বড়জ্যাঠা হুঁশিয়ার—আগে পাষাণ ভাঙো ঠিক করে, উঁহু, হচ্ছে না, হাতটা সরাও, কোথায় সরালে বাবা, তোমার আঙুল ঠেকে রইল যে, তুলো ওজন করা কি মুখের কথা? সোনা মাপার চেয়েও সূক্ষ্ম ব্যাপার।

এ দিকে আমাদের তো আর তর সইছে না, কখন ধুনবে রে বাবা। তা বললে চলে? এক গ্রাম তুলো মানে কতটা জানিস? কতটা? তা ধর সলতে পাকালে সন্ধে দেওয়া যাবে মাসখানেক। আর একশো গ্রাম তুলো ঠিকমতো বিলি-বাটোয়ারা করতে পারলে ভারতের সব নেতা মন্ত্রী ইজিলি কানে দিতে পারবে।

‘ভ্যাচচা-ভ্যাচাং, ভ্যাচচা-ভ্যাচাং’ টঙ্কার তুলে ধুনুরি ধুনতে শুরু করলেই মোচ্ছব। পাড়ার কচিকাঁচা ভেঙে পড়ল গোল হয়ে। তুলোর আঁশ উড়ছে। ওরে নাকে চাপা দে। হাঁচি হবে। আর হবে! সেন্টুর শুরু হয়ে গেছে। সেন্টু আবার হাঁচি শুরু করলে মিনিমাম একুশটা। ওর ষোলো নম্বরের মাথায় তমাল শুরু করে দিল। ভিড়ের মধ্যে কখন যেন টুনি এসে দাঁড়িয়েছে। উল্টো দিকে চন্দন। চন্দনকে দেখলেই টুনির বুকের ভেতরটা আজকাল ধড়াস ধড়াস করে। চন্দনদা আবার চোখে গগলস পরেছে। কী সুন্দর দেখাচ্ছে।

কিন্তু কালো কাচে চোখগুলো ঢাকা বলে কোন দিকে তাকাচ্ছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এ দিকে বাসন্তীটা আবার এসে দাঁড়িয়েছে। মহা ঢঙি মেয়ে। কেমন হ্যাংলার মতো চন্দনদার দিকে তাকাচ্ছে। চন্দনদা আর বাসন্তী দুজনের ওপর নজরদারি করতে গিয়ে ছিঁক ছিঁক করে টুনির শুরু হয়ে গেল। চন্দনদার সামনে কী লজ্জা! চন্দন আবার ফান্ডা ঝেড়েছে—এ তো মনে হচ্ছে শ্মশানের তুলো।

মানে!

আরে জানো না? শ্মশানের মড়ার লেপ-তোশক ফের দোকানে চলে যায়। ব্যস, শুরু হয়ে গেল—কী গো ভাই মড়ার তুলো দিলে! ধুনুরি ধোনা থামিয়ে মাথা নাড়ে, না বাবু, এ গিরিন্টি মাল। নবা ফিসফিস করে বলে, আমি ভাই পালাই। সে কী রে! এক্ষুনি? নবার গলায় মাদুলি, কোমরে ঘুনসি, হাতে কবচ। নবা বলে, যদি মড়ার জিনিস হয়, ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যাবে। রাখালদাদু মষ্করা ছোড়ে, কী রে টুনি, তোর বিয়ের লেপ নাকি? লজ্জায় মরে যায় টুনি। চকিতে চন্দনদার দিকে তাকিয়েই মাটিতে চোখ নামায়। ওর গণ্ডদেশ শালুর মতো লাল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অতটুকু তুলো ফুলে ফেঁপে ছোটখাটো পাহাড়। আর, ধুনুরিদের চুল-ভুরু আটা-চাকির মদনদার মতো সাদা। তুলোর ওই তাগড়টা খোলের মধ্যে ঢুকবে কী করে রে বাবা। দেখতেই হবে সেটা। তাই সে দিন আমাদের হঠাৎ পেটব্যথা। কিছুতেই ইস্কুলে যাব না। কোনওরকমে পুকুরে টপাং করে একটা ডুব দিয়ে গোটা গোটা ভাত গিলে ফের দৌড়। শালুর পেটে তুলো ঢুকে গেলেই আমাদের উৎসাহ হেমন্তের সন্ধে নামার মতো ঝপ করে পড়ে যায়। যতই নকশা করে সেলাইফোঁড় করুক, আর ভালো লাগছে না। ব্যাট-উইকেট নিয়ে সোজা মাঠে। হিরুদা বলল, ওই যন্ত্রের দড়িটা কী দিয়ে তৈরি জানিস? গরুর চামড়া দিয়ে। সব্বোনাশ! চুপ চুপ ঠাকমা শুনলে গোবরজল ছড়া দিয়ে বিদেয় করবে।

ঈশ্বর-দর্শন, ঘিয়ের স্বাদ, প্রেমের মজা আর লেপের ওম—এগুলো অনির্বচনীয়। বিশেষণের পর বিশেষণ তারপর অব্যয় ক্রিয়া যা-ই লাগাও না কেন, ভোকাবুলারি শেষ হয়ে যাবে, তবু কব্জা করা যাবে না। লেপের ওম আবার গাধার সামনে গাজরের মতো। শীতের রাতে সেই ওম কল্পনা করে অনেকেই হি-হি করতে করতে কাজ সেরে নেয়।

রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা ছুট্টে লেপের তলায়। ঠাকুমা দুপুরবেলায় লেপ রোদে দিয়ে পাট করে তুলে রাখত। ঠাকুমার সঙ্গে লেপের তলায় কুণ্ডলী পাকিয়ে পাঁচ-সাত ভাইবোন। একটা লেপের ভেতর কেমন স্বচ্ছন্দে এঁটে যায় সবাই! রাজা আমাকে চিমটি কাটে, টুম্পা রাজার চুল ধরে টানে।

বাইরে টুপুস, টুপুস হিম পড়ার শব্দ, মাঝে মাঝে রাতচরা পাখির ডাক। ঠাকুমা গল্প বলে—রাজপুত্র, রাক্ষস, খোক্কস, ব্যাঙ্গমা, ব্যাঙ্গমী, রাজকন্যা, সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি…দেখতে দেখতে কখন যেন চোখে ঘুম নেমে আসে!

লেপ চিড়-খাওয়া দাম্পত্যে প্রলেপ দিতে ওস্তাদ। কর্তা-গিন্নি খেচামেচি। ‘চা দেওয়া হয়েছে,’ ‘বাজার যেতে হবে,’ ‘ফিরতে রাত হবে, খেয়ে নেওয়া হয় যেন’—ভাববাচ্যে কথা ছোড়াছুড়ি চলছে। খাটেও যুদ্ধ জারি। গরমকালে ঠিক আছে। দুজনে দুমুখো হয়ে নাইটল্যাম্পের আলোয় নিরেট দেওয়াল দেখতে দেখতে ঘুম।

শীতকালেই ফ্যাসাদ। লেপ তো একটাই। এক লেপের তলায় ঢুকলে বেশি দূরে সরে থাকা যায় না। হাত-পা লেপ-ছাড়া হলেই ঠান্ডা কামড় বসায়। খুব হিসেব করে দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। তারপর এক জন লেপ পাকিয়ে পাশ ফিরতেই অন্য জন উদোম। সেও তখন দিল হ্যাঁচকা টান। টানা-হ্যাঁচড়া করতে করতেই কখন যেন দুটো মুখ এক দিকে। এর গরম নি:শ্বাস ওর মুখে। লেপের ওম আর শরীরের ওম মিলে অভিমানের মেল্টিং পয়েন্টে পৌঁছে গেল চড়চড় করে। তারপর কী হল লেপের তলায় সেটা চেপে যাওয়াই ভালো।

শহর কলকাতায় এখন সাবেক লেপের দিন গেছে। কিছু দিন পরে কলকাতায় লেপ খুঁজতে গেলে মিউজিয়ামে যেতে হবে। শীত এখানে বুড়ি-ছোঁওয়া করেই পালায়। বছরভর দুটো ঋতু—গরম এবং আরও গরম। ওই গন্ধমাদন নাড়াচাড়া করা পোষায় না। তাই বালাপোশ—লেপের সুন্দরী ছোট বোন।

হালকা, ছিমছাম এবং শৌখিন। রংচঙে নকশাদার সিল্ক বা সিনথেটিক কাপড়ে তৈরি। বিছানার ইজ্জত বাড়ায়। তা ছাড়া, খেস আছে, লাইসেমপি আছে। তুলো নিয়ে কচকচানির দিন শেষ। এসে গেছে সিনথেটিক তুলো, গাছপাকা তুলোকে টেক্কা দেবে গরমে। তবে, কলকাতায় শীতের যা দশা, এসব মশা মারতে কামান দাগা।

আর একটা ব্যাপারে ঝাড় খেয়ে গেছে কলকাতা। এখানে রোদ্দুর তেমন ঢালাও নয়, স্কোয়ার ইঞ্চির মাপে রোদ পায় লোকে। সুরায় বরফ দিলে আর রোদে লেপ দিলে দুটোরই দ্রব্যগুণ লাফিয়ে বেড়ে যায়। বরফ দেওয়া সুরার মতন রোদ-খাওয়া লেপের এমন আমেজ যে, মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে—আহ।

তবে দিন দিন দেশ-গাঁয়েও শীত যেভাবে নখদন্তহীন হয়ে পড়ছে, খুব শিগগির লাল শালু শুধুমাত্র কঞ্চির মাথায় ঝান্ডা হয়ে উড়বে।

আর, যারা ফুটপাতে থাকে বা রেললাইন-খালপাড়ের ঝুপড়িতে অথবা ছিটেবেড়া বা মাটির ঘরে, শীত তাদের মনের সুখে ছোবল মারে। সেই সব মানুষ বোধহয় ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে শুধু একটা লেপের স্বপ্ন দেখে।

শীত ফুরোলে লেপ বালাই। অমন ঢাউস বস্তুটা শান্টিং করা মস্ত সমস্যা। সহজ পন্থা, বিছানায় পেতে দাও। তবে, দু-তিন বছর পর লেপ এমন চিটকে হয়ে যাবে যে কাঁথার সঙ্গে তফাত করা মুশকিল। কেউ পাটে পাটে ন্যাপথলিন দিয়ে লফটে তুলে রাখে, কেউ আবার কড়িকাঠ থেকে বাঁশ ঝুলিয়ে টঙে তুলে দেয়। বক্স খাট থাকলে অবশ্য চিন্তা নেই— অফ সিজনে লেপকে গিলে নেবে পেটের মধ্যে।

লেপ বরাবরই কাব্যে উপেক্ষিতা। বাংলা সাহিত্যে লেপের দেখা কদাচিৎ মেলে। বাংলা গল্প-উপন্যাসে প্রলোতারিয়েত নায়কের গায়ে লেপের চেয়ে ছেঁড়া কাঁথা অনেক জুতসই। সিনেমাতেও তাই। ভাঙাচোরা ঘরে দুস্থ নায়ক কাঁথা মুড়ি দিয়ে কাশছে, এই দৃশ্য থাকলে সেই ছবি এক লাফে আর্ট ফিল্ম।

কাঁথার গতিবিধি আবার গলি থেকে রাজপথ। তবে, সে কাঁথা ধুলধুলি কাঁথা নয়, নকশি কাঁথা। সৌখিন সংগ্রহকদের কাছে নকশি কাঁথা শালের সঙ্গে একাসনে বসেছে। একখানা নকশি কাঁথার যা দাম, ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েও লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা পড়তায় আসবে না, কমপক্ষে কোটির ঘরে যেতে হবে।

বাঙালির শয়নে-স্বপনে লেপ। কিন্তু জিনিসটা খাঁটি দিশি জিনিস নয়। শব্দটা ফার্সি। বাংলা প্রবাদ-প্রবচন-বাগধারায় লেপের দেখা মেলা ভার। সেখানে কম্বল আর কাঁথার ছড়াছড়ি। ‘অর্ধেক মাঘে কম্বল কাঁধে,’ ‘লোটাকম্বল’, ‘কম্বল-সম্বল’, ‘কম্বলের লোম বাছা’, ‘ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন’ বা ‘অমুকের কাঁথায় আগুন।’ কোথাও লেপের কোনও হদিস নেই।

‘সেলাই ফোঁড়ে’-র কোর্সে ‘কাঁথা স্টিচ’ থাকলে ‘লেপ স্টিচ’ পাওয়া যাবে না। মারকুটে পুলিশের খুব ফেভারিট জিনিস ‘কম্বল ধোলাই।’ কিন্তু ‘লেপ ধোলাই’ আছে বলে কেউ কোনও দিন শোনেনি।

লেপ নিয়ে আমারও বিস্তর হয়রানি। একটাই লেপ আমাদের। গিন্নির সঙ্গে শেয়ার করতে গিয়ে মহা হাঙ্গামা। মাঝে মাঝে লেপের মধ্যে মশা ঢুকে যায়। আজকাল মশাগুলো খুব সেয়ানা। যৌথ লেপের মধ্যে হুড়ো খেয়ে এলাকা বদল করে। আমি মারার চেষ্টা করলে গিন্নির কাছে আশ্রয় নেয়। আর গিন্নি মারার চেষ্টা করলে আমার পোরশনে চলে আসে।

লেপ-চাপা অবস্থায় হাত-পা খেলিয়ে মারাও বেশ সমস্যা। আন্দাজে চালাতে হয়। আমার হাতের কোঁতকা খেয়ে গিন্নি ককিয়ে ওঠে। পরক্ষণেই ওর হাতের থাপ্পড় এসে পড়ে আমার পাঁজরে। আমার ধারণা, গিন্নি বুঝেশুনেই থাপ্পড়-টাপ্পড়গুলো কষায়। রসিক মশা নিরাপদ দূরত্বে বসে মজা দেখে।

শেষে অঘোরবাবুর কথা। অঘোরবাবু অবসর নিয়েছেন বছর দশেক। দু-ছেলে এক মেয়ে। সবাই প্রতিষ্ঠিত। এক জন নিউ ইয়র্কে, এক জন দিল্লিতে। অন্য জন কলকাতায়। অঘোরবাবু আর গিন্নি গ্রামের বাড়ি আগলে পড়ে আছেন। ছেলেরা বার বার বলে বাড়ি বিক্রি করে চলে আসতে। কিন্তু, মন চায় না, জন্মাবধি এই বাড়িতে।

এই ঠাকুরদালানের গোল থাম, বাঁকানো খিলেন, শ্যাওলা-ধরা পাঁচিল, বুড়ো নিম গাছটার ছাল-ওঠা গুঁড়ি, বড় পুকুরে ঝুঁকে-পড়া নারকোল গাছের ছায়া, বাড়ির পেছনে বাঁশবনে আলোছায়ার ঝিরিমিরি নকশা—এ সব ছেড়ে চলে যেতে হবে ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়। নাতি-নাতনি পাঁচ জন। বড্ড মায়ার জিনিস। ফোনে কথা হয়।

খুব দীর্ঘ মনে হয় শীতকালের রাতগুলো। মস্ত লেপের তলায় দুই বুড়োবুড়ি। এই লেপটার মধ্যে অনায়াসে আরও পাঁচ জন কুলিয়ে যেত।

বাইরের মাঠে পাকা ধান হিম মাখে, চাঁদ শীতল জ্যোৎস্না ঝরায় উঠোনে, আম গাছটার উঁচু ডালে উড়ে এসে বসে একটা লক্ষ্মী পেঁচা। আর এর মধ্যেই পৃথিবী একটা পাক খেয়ে নেয়। আধো ঘুমের মধ্যে অঘোরবাবু শুনতে পান লেপের তলায় কারা যেন খুনসুটি করছে—দাদান টুকি, দাদুই টুকি…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *