ভোজনং যত্রতত্র
সেদিন খুব নাকাল হয়ে ফিরে এলুম। তমাল ওর ফ্ল্যাটে ডেকেছিল। খাওয়াবে। তমাল আমার ছোটবেলার বন্ধু; এখন বড় চাকরি করে। চাকরি পেয়েই তমাল বিয়ে করেছে। আর বিয়ে করেই একটা বড় ফ্ল্যাট আর ছোট কুকুর কিনেছে। সাদা রঙের বড় বড় লোমে ঢাকা ভারি ফুটফুটে কুকুর। তমাল, তমালের বউ মোনালি আর কুকুর নিয়ে ওদের সুখের সংসার।
একটু তাড়াতাড়ি তমালের ফ্ল্যাটে চলে গেলাম। মোনালিকে একা পেলে দুটো অসভ্য জোকস শোনাব। দেখি মোনালি খুব ব্যস্ত—ঘামে ভিজে সপসপে। এক হাতে খুন্তি আর অন্য হাতে একটা কাগজের টুকরো। উঁকি দিয়ে কাগজটা দেখলুম—সাংকেতিক ভাষায় নতুন রেসিপির প্যাঁচ।
মোনালি বলল, একটু বসুন—হয়ে গেছে প্রায়।
মোনালি প্টে সাজাল, জমকালো করে পরিবেশন করল যে জিনিসটা তার নাম—মুচকি চিকেন চাউচাউ। মোনালির ব্রেন-চাইল্ড। চিন-ভারতের মেলবন্ধন। প্রধান উপকরণ মোচা—তাই নাম মুচকি; সঙ্গে চিকেন আর চাউমিন। তার সঙ্গে ধনেপাতা, ব্যাঙের ছাতা, খই, টকদই, ভেলি গুড়, আমচুর, আলুর খোসা, পটলের বিচি এবং বিলিতি আমড়া। গন্ধটা খুব রহস্যময় লাগছিল। মুখে দেওয়া উচিত হবে কি না ভাবছিলুম। শেষে ভাবলুম, সুন্দরীর হাতে মৃত্যু সম্মানজনক। মোনালিকে শেষ দেখা দেখে নিয়ে নাক টিপে চোখ বন্ধ করে এক চামচ মুখে দিলাম। মনে হল, কেউ পেটের ভেতর ছুঁচো বাজি ছেড়ে দিয়েছে। শুধু মনে আছে, মাথা ঘুরে পড়ে যাবার আগে মোনালিকে জড়িয়ে ধরেছিলুম।
তমালের ফ্ল্যাটে সেই শেষ। তারপর থেকে আর ওদিক মাড়াইনি। শেষ খবর—সেই পদ ওরা খেতে দিয়েছিল ওদের কুকুরকে। কুকুরের মনে তো আর পাপ নেই—সে সরল বিশ্বাসে খেয়ে নিয়েছে। খেয়ে নাকি ডাকতে ভুলে গেছে টমি—তার স্পিচ থেরাপি চলছে এখন।
তো এই হচ্ছে হাওয়া। পোশাক প্রসাধান কলম কন্ডোমের মতো ভিনদেশি খাদ্যসম্ভার সাগর পেরিয়ে পাহাড় টপকে বিশ্বময় চষে বেড়াচ্ছে। মোনালির মতো কেউ কেউ আবার শক হূণ দল পাঠান মোঘল সবাইকে এক থালায় আনার চেষ্টা চালাচ্ছে—বানাচ্ছে দোআঁশলা খাবার। যা কখনও-সখনও হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রাণঘাতী।
কেক বোধহয় খাদ্যের ভাস্কো-দা-গামা—প্রথম বিলিতি খাবার যা এই উপমহাদেশে পা রাখে। কেক এখন মনেপ্রাণে ভারতীয়—এলিট থেকে আম-পাবলিক সবার আপনজন। বহু গ্রাম আছে যেখানে বিদ্যুৎ নেই, ডাক্তার নেই কিন্তু কেক পাওয়া যায়। জন্মদিনে পায়েস পাত্তা পাচ্ছে না। স্টিলের থালায় জং ধরা ছুরি দিয়ে কেক কাটছে বাঙালি-শাবক।
কেকের পরেই সবচেয়ে হিট চাউমিন—বাঙালির আদরের চাউ। আগে অসময়ে অতিথি এলে মুশকিল আসান ছিল ডিমভাজা। সেই জায়গাটা এখন নিয়েছে চাউ। দেখতে সুদর্শন নয়, কেঁচোর মতো, হাত দিয়ে ধরতে গেলে পিছলে যায়—ফলে বাঙালির হাতে চামচ ধরিয়েছে চাউ। তবে এই চাউ চৈনিক নয়—বাংলা চাউ—পিঁয়াজ হলুদ ধনেপাতা মরিচগুড়ো সহযোগে। খোদ চিনাদের এ চাউ অচিন লাগবে।
পিৎজা। মাঝখানে ‘ৎ’ দেখেই বোঝা যায় জিনিসটা মিস্টিরিয়াস। ‘ৎ’ দেখে রাশিয়া মনে হলেও আদতে ইতালিয়ান। ইতালিয়ান ফুটবল টিমের ডিফেন্ডারদের মতনই তাগড়াই চেহারা। পাঁউরুটির ওপর চিজের আস্তরণ। সঙ্গে মাংসের কুচো বা সবজি। পেটে একখানা ঠেসে দিতে পারলে বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চিন্ত।
আর একটা ইতালিয়ান খাবার স্প্যাগোটি। তবে এ এখনও এলিটিস্ট—আম জনতার অধরা।
জার্মানির আবার বার্গার। বারবেলের মতো গোল দুটো পাঁউরুটির মধ্যে মাংসের প্রিপারেশন। ওখানে লেবার ক্লাসের পেয়ারের খাবার। অনেকটা মাংস থাকে। কাজের বিরতিতে ঝটপট একটা সাঁটিয়ে ফের কাজে লেগে পড়া যায়। তবে প্রেমিক বাঙালি এখানে বার্গার সামনে রেখে দিব্যি প্রেম করে।
জার্মানির সঙ্গে আমেরিকার আদ্যিকালের খাড়াখাড়ি। বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছে ব্যাপারটা। আমেরিকা বার্গারের জবাব দিল হট-ডগ দিয়ে। এটাও দুটুকরো পাউরুটির মধ্যে মাংস। তবে পাঁউরুটিটা গোল নয়, লম্বাটে এবং নামে ডগ থাকলেও মাংসটা কুকুরের নয়।
হালে বাঙালি হামলে পড়েছে মোমোর ওপর। নামটা বাঙালিসুলভ। কে একজন নাকি গবেষণা করে বের করেছে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি মোমোর ভক্ত ছিলেন। তাই গান বেঁধেছেন—মম চিত্তে নিতি নৃত্যে তাতা থই থই। অবিশ্বাস করার কিছু নেই—কারণ এটা তিব্বতি পিঠে এবং বিশ্বকবি গোটা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন। আমিষ, নিরামিষ দুরকম মোমোই দেখতে চমৎকার। পিঠের ভেতর পেঁয়াজ-মাংস। শুনে আমাদের মেনদা পিসি মুচ্ছো যায় আর কী। বলে, পিঠেতে মাংস পেঁয়াজ, কী দিনকাল এল রে!
ইদানীং আবার বর্গির মতো রে রে করে ঢুকে পড়েছে থাই ফুড। পাবলিক এটা সত্যিই খাচ্ছে। যেদিকে তাকাও থাই ফুড ফেস্টিভ্যাল। আর কী সব নাম! খানম জিপ, পোহ-পিয়া, খানম-প্যাঙ, নাহ-গুঙ, শুনলে বস্তুটা চুলে মাখে না জুতোয় লাগায় বোঝা মুশকিল। একটা আছে লাট-মে কই। আমার কই মাছ ভক্ত দিদি খেয়ে যথেষ্ট হতাশ। চিকেন অথবা মাটনের প্রিপারেশন—কই মাছের নামগন্ধ নেই।
খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ফরাসিরা ঝাড় খেয়ে গেছে একটু। সাহিত্য সুগন্ধী আর সুরায় বাজিমাত করলেও ফ্রেঞ্চ-কিচেন জিভে জল আনার মতো তেমন কিছু পয়দা করতে পারেনি। ফ্রেঞ্চড-টোস্ট নামে ডিমের যে টোস্টটা এখানে চলে, ফরাসি দেশের সঙ্গে তার কস্মিনকালেও কোনও সম্পর্ক নেই। ফরাসি সাহেবরা নামটা শোনেনি পর্যন্ত। এটা আপাদমস্তক বাঙালি সন্তান।
এ তো গেল ওয়ান ওয়ে ট্র্যাফিক। কিন্তু এদিকের খাবার ওদিকে গেছে কতটা সেটাই কথা। মধ্যপ্রাচ্যের বিরিয়ানি অনেকদিন সারা দুনিয়ায় সুবাস ছড়িয়েছে। কিছু টিক্কা আর তন্দুরি খানারও আদর-কদর আছে। ভারতীয় সিঙাড়া ‘সামোসা’ ছদ্মনামে আন্তর্জাতিক। বাকিংহাম প্যালেসের স্পেশাল ডিসেও সামোসা থাকছে আজকাল। নামঘটিত গ্যাঁড়াকল আরও কিছু পাওয়া যায়। যেমন ইতালিয়ান ‘রিসোও’ আসলে পোলাও ছাড়া কিছু নয়। আর প্যারিসের রেস্তোরাঁর ‘হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ’ হল সিম্পল মাংসের ঝোল।
বাংলার সন্দেশ আর টিনড রসগোল্লা অনেকদিন ধরেই উড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। সাহেব-সুবোরা তারিফ করছে। ভাবতে ভালো লাগে এঁচোড়ের ডালনা বা মোচার ঘণ্ট দিয়ে ভাত মেখে সাপটে খাচ্ছে টেনিসন সাহেব। আমেরিকার সাত-তারা হোটেলের মেনু কার্ডে স্পেশাল আইটেম—বক ফুল ভাজা। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব মুখে দিয়ে বলছেন—ওয়াও। নিউইয়র্কের ঘরে ঘরে নিমপাতা ভাজা আলুভাতের সঙ্গে অথবা সজনে ডাটা সামনে নিয়ে গলদঘর্ম রোবসন সাহেব—চুষবে না চিবোবে ঠিক করতে পারছে না। কুঁচো চিংড়ি সহযোগে পুঁইশাকের ঘ্যাঁট দেখেই চিনাম্যান ওয়াং লাঙের জিভে জল।
যাই হোক, আশা করতে তো আর ট্যাক্স লাগে না। আশা করব আমরাও। ভারতীয় শ্রমিক সুলভ ছিল এতদিন—নিয়েছে গোটা বিশ্ব। এখন শোনা যাচ্ছে, সুলভ মোটরগাড়ি দখল করবে বিশ্ববাজার। কেমন হয় যদি মেনদা পিসি, মোক্ষদা, মাসিদের খুন্তির কারিকুরি ছড়িয়ে পড়ে ভুবনময়? তখন হয়তো ডুমুর বা ঢেঁকিশাক জাতে উঠবে। অবশ্য যদি, মোটর গাড়ির চাকা দলে দেওয়া থেকে রেহাই দেয় তাদের।
