জামাইয়ের ষষ্ঠীপুজো – উল্লাস মল্লিক

জামাইয়ের ষষ্ঠীপুজো

আশপাশের লোকজন সব রে-রে করে বেরিয়ে পড়ল। চোর বেচারি ধরাও পড়ে গেল। ধরা পড়ে যাওয়া চোর সব দেশে সব কালেই দুর্লভ জিনিস। কাতারে কাতারে লোক ছুটল চোর দেখতে। একটা নারকেল গাছে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে চোরকে। ইয়ং ছেলেদের দল সব রেডি। সবার চোর দেখা হয়ে গেলে শুরু হবে ধোলাই। কে দাঁত ভাঙবে, কে নাক ফাটিয়ে দেবে, কে হাত মুচড়ে দেবে—সেইসব ভাগ-বাটোয়ারা চলছে। বিনিপিসিও এসেছে চোর দেখতে। চোর দেখে হঠাৎ বিনিপিসি ডুকরে উঠল—ওরে এ তো তোদের জামাইবাবু রে!

স্বামী পরিত্যক্তা বিনিপিসির বিয়ে হয়েছিল বহু দিন আগে। দিন সাতেক মাত্র শ্বশুরঘর করেছিল। তারপর কী সব কারণে যেন শ্বশুরবাড়ির পাট চুকিয়ে বাপের বাড়িতেই থিতু। সাতদিনের সংসার মাত্র, তাও বুক ভরা মধু বঙ্গের বধূ চিনতে পেরেছে ঠিক।

তার পরের কাহিনি অন্যরকম। জেরা-তল্লাশ করে দেখা গেল—হ্যাঁ বটে, বিনিপিসির সেই বর-ই। সেও তো এসেছিল একবার মাত্র বহুকাল আগে, তাই ভুল করে ঢুকে পড়েছে শ্বশুরবাড়ির দেশে।

ফের বিচারসভা বসল। চোর না জামাই—কোন পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে আপ্যায়ন করা হবে তাকে, এই নিয়ে কিছু মতবিরোধ দেখা গেল। তখনই কে যেন স্মরণ করিয়ে দিল আজ জামাইষষ্ঠী—ভোর চারটে দশ গতে পড়ে গেছে। ব্যস, রায় বেরিয়ে গেল। জামাইষষ্ঠী যখন কিছুতেই মারধোর চলবে না, অন্যদিন হলেও না হয় কথা ছিল। তাই সঙ্গে সঙ্গে দড়িটড়ি খুলে মুক্তি দেওয়া হল জামাইকে। যে নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল সেই গাছেরই ডাব পেড়ে খাওয়ানো হল তাকে।

রঙ্গে ভরা বঙ্গদেশে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিটি জামাইপুজোর তিথি। শ্বশুরবাড়িতে জামাই এমনিতেই ভিআইপি মানুষ, এ দিন তাদের জন্য ভিভিআইপি ট্রিটমেন্ট, কোলাঘাটের কানাই থেকে বসিরহাটের বলাই, যাদবপুরের যদু থেকে মেমরির মধু—হোলসেল জামাই মুখিয়ে থাকে পূজিত হবার জন্য। দেবতার সেবায় শ্বশুর-শাশুড়ি থেকে কাজের মাসি—সবাই সদা সতর্ক। চানে নতুন সাবান, বিছানায় কাচা বেড কভার, পাতে জাম্বো সাইজের মুড়ো। তৎসহ দইয়ের আগা ঘোলের গোড়া, ইলিশের পেটি মুরগির ঠ্যাং। ফাউ হিসেবে এদিন চায়ে মেশে শাশুড়ির একস্ট্রা স্নেহ, হাতপাখার বাতাসে শ্যালিকার কাঁচামিঠে প্রেম। এই জন্যেই বোধহয় কোনও এক মহাজ্ঞানী বলেছেন—স্বর্গের আগের স্টেশন শ্বশুরবাড়ি। সকাল থেকেই এদিন শুরু হয় ভক্তদের অত্যাচার। সক্কাল-সক্কাল ফুলকো লুচি, মন্ডা-মেঠাই দিয়ে বউনি। দুপুরে ভাতের থালা বেড় দিয়ে একুশ রকমের আইটেম। দেখে মনে হয় সেনাপতিকে ঘিরে সৈন্যসামন্ত। রে-রে করে ঝাঁপিয়ে পড়ল বলে। মাছই তিন রকমের, মাংস দুই। ভজহরি মান্না ভর করে শাশুড়ির ওপর। বকরাক্ষসের লিভার না হলে সবকিছুকে জব্দ করা অসম্ভব। একটু তফাতে দাঁড়িয়ে শ্বশুর হেঁ-হেঁ করছে—খাসিটা কিন্তু রেওয়াজি, মাছ…রুইমাছটা একেবারে টাটকা, আনছিলাম। মুখে যুদ্ধ জয়ের হাসি নিয়ে শাশুড়ি বলছে—মুড়িঘণ্টটা কিন্তু ফেলে রেখো না বাবা…পটলের দোলমাটা খেয়ে দেখো, আমার মায়ের কাছে শেখা, ও মা, মাংস তো খেলেই না…।

এই মওকায় বাজারদরটা পোল ভল্টারের মতো তুড়ি লাফ দেয়। ফলমূল, আনাজপাতি, মাছ, মাংস—সব হাই ভোল্টেজ—অসাবধানে হাত দিলেই ঝড়াৎ। হার্টরোগা শ্বশুর মুখে সরবিট্রেট ফেলে বাজারে ঢোকে। অনেকে তিনদিন আগে বাজার সেরে ঠেসে রাখে ফ্রিজে। শ্বশুর একটু মালদার হলে আবার বেপরোয়া, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের ভঙ্গিতে বাজার থেকে তুলে আনে সেরা জিনিস।

বঙ্গদেশে নানা আকৃতি-প্রকৃতির জামাইয়ের দেখা মেলে। তার মধ্যে থেকে বিশেষ কয়েকটা স্যাম্পেল নিয়ে আলোচনা করব এখানে।

বৈষ্ণব জামাই

শ্বশুর-শাশুড়িকে এরা ঈশ্বরতুল্য ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। তাঁদের যে কোনও আজ্ঞা ক্যাসাবিয়াঙ্কাতুল্য আনুগত্যে পালন করে ফেলে। তাঁরা একবার স্মরণ করলেই (কখনও-সখনও না করলেও) দৌড়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ায় এবং ল্যাজ নেই বলে মনে মনে দু:খ করে। এদের বোধ হয় শ্বশুরবাড়ির বাতাসে অক্সিজেন আর জলে মিনারেল বেশি, চালে কাঁকর, ইলিশে কাঁটা আর কাঁঠালে আঠা কম, এবং চায়ে লিকার, ফ্লেভার সমান সমান। মোদ্দা কথা, শ্বশুরবাড়ির আমড়া নিজের বাড়ির ল্যাংড়ার চাইতে মিষ্টি। এদের কাছে জামাইষষ্ঠী দুর্গাপুজোর চেয়ে বড় উৎসব। গেলে চারদিনের আগে ফেরে না।

শাক্তজামাই

বৈষ্ণব জামাইয়ের ঠিক উলটো। শ্বশুরবাড়ির সব কিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখে। এরা মনে করে, শ্বশুরালয়ের বাতাসে বিষ, দুধে জল আর জলে আর্সেনিক। জামাইষষ্ঠীর একমাস পরে পেট খারাপ হলেও সেই খাওয়াদাওয়াকেই ভিলেন বানায়। এদের কাছে শাশুড়ি মানে মন্থরা, শ্বশুর মানে শকুনি, শালাটা এক নম্বরের ধাপ্পাবাজ। শালিটা কেবল চলনসই। ছেলেমেয়েকে সব সময় মামার বাড়ির সংস্রব থেকে দূরে রাখতে চায়। লিপ-ইয়ারের মতো তিন বছর ছাড়া প্রচুর সাধ্যসাধনার পর একবার হয়তো শ্বশুরবাড়ি আসে। অনেক বেলা করে আসে, সন্ধের পরেই রাতের খাবার খেয়ে কেটে পড়ে। ওই সময়টুকু গোটা বাড়ি এমন সন্ত্রস্ত থাকে যে কুকুরটা পর্যন্ত ডাকতে ভুলে যায়, বেড়ালটা বাড়ি ছাড়া হয়।

ভিআইপি জামাই

এরাও ফি বছর আসতে পারে না। মুশকিল হল, যে বছর আসবে-আসবে রটে যায় সে বছর ফেল করে, আবার যে বছর আসার কোনও চান্স নেই, সেই বছরেই অতর্কিতে হাজির হয়। আর হলে, পাড়ার অন্য জামাইদের বিস্তর অভিসম্পাত কুড়োয়। কেউ হয়তো শালির সঙ্গে জমিয়ে রসিকতা করছিল, মাঝপথেই শালি ছুটল কারণ ‘তুমি বধু সুন্দরী’ সিরিয়ালের সেজোছেলে মুজমদার বাড়িতে জামাইষষ্ঠী করতে এসেছে, একটা অটোগ্রাফ চাই তার। মাংস কষছিল শাশুড়ি, আধকষা মাংস নামিয়েই ছুটল, মজুমদার গিন্নিকে বলা আছে, জামাই এলে কথা বলিয়ে দেবে। চিংড়ি কিনে ফিরছিল শালা, রাস্তায় শুনল পল্টুর জামাইবাবু এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে মোড় ঘুরিয়ে পল্টুদের বাড়ি, জামাইবাবুকে বলে-কয়ে যদি একটা সাইড রোল জোটাতে পারে।

সৎ-জামাই

মানে এই নয় যে, অফিসে ঘুষ নেয় না, খদ্দেরকে ওজনে মারে না (দোকানদার হলে) রাস্তাঘাটে অন্য মেয়ের দিকে তাকায় না। এসব করেও দিব্যি সৎ-জামাই হয়। যেমন সৎ-ছেলে সৎ-মেয়ে, সৎ-মা। মানে জামাই হয়েও জামাই নয়। আমাদের বিল্টু যেমন। পাশের পাড়ার মধুরিমাকে নিয়ে ভেগে গিয়েছিল। তাই শ্বশুরবাড়ির দরজা বন্ধ। গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহও সম্পর্কের বরফ গলাতে ব্যর্থ। অন্য দু-জামাই নেমন্তন্ন পায়, বাদ কেবল বেচারা বিল্টু। ষষ্ঠীর দিন সকালে কখনও হয়তো দেখা হয়ে যায় শ্বশুর-জামাতার। শ্বশুরের ব্যাগ উপচে পড়া রুইমাছের ল্যাজের দিকে আড়চোখে প্রবল দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে চুনো মাছ আর ঘুসো চিংড়ি কেনে বিল্টু।

ঘরজামাই

বেচারা এ হেন আনন্দযজ্ঞের উত্তাপ তেমন পায় না। জামাই মানেই উচ্চাঙ্গের খাতির। কিন্তু (শ্বশুর) ঘর কা মুরগি (জামাই) ডাল বরাবর। মুরগি বলে মুরগি! বছরভর শাশুড়ির রাত্রে মলম শ্বশুরের ইউরিন টেস্ট ট্যাঙ্ক সাফাই বা কমোড ধোয়ার মতো কাজ করে জামাইত্ব বলে তাদের কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, শ্বশুরবাড়ির দেশে তার পরিচয় ঠেকে একটি মাত্র শব্দে—জামাই। হতভাগার পিতৃদত্ত নাম আর বংশবিত্ত পদবি খোয়া যায়। ডাকপিয়ন ছাড়া বিশ্বনাথ হাজরা বা মুকুন্দ অধিকারীকে কেউ চেনে না।—সে আবার কে? এ নামে তো কেউ থাকে না এখানে। শেষে বুঝতে পারলে বলে, ও বুঁচির বর! আমাদের জামাই, বলবে তো!

এক পাড়ায় একাধিক ঘরজামাই থাকলে পরিত্রাতা সেই শ্বশুর—ও হচ্ছে ধনুদাসের জামাই আর এ হচ্ছে বিহারীলালের।

পোষ্য-বৎসল জামাই

যেমন হরিহরবাবুর জামাই। ষষ্ঠীতে আসে, কিন্তু একটাই শর্ত, তার পোষ্য জিমকেও বলতে হবে। বিলিতি কুকুর, সুখী জীব, গোদের ওপরই তাই বিষফোড়া। তার তোয়াজেই সবাই ব্যস্ত। জিমের আদর-আপ্যায়নে এতটুকু বিচ্যুতি দেখলে জামাই খেপে লাল। হরিহরবাবুকে ডবল করে বাজার করতে হয়—একদফা জামাইয়ের জন্যে আর এক দফা জিমের জন্যে। মাংসের টেংরি, ডগ-বিস্কুট, ডগ-সোপ। ভুল করে শাশুড়ি একবার জামাইকে কুত্তা-বিস্কুট আর জিমকে নোনতা-বিস্কুট দিয়ে ফেলল। জামাইয়ের সে কী রাগ। ওই বিস্কুট খেয়ে জিমের যদি কিছু হয়? সেই মুহূর্তে শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ করে আর কী! অনেক বাবা-বাছা করে শান্ত করতে হল তাকে। সেদিন এসবই দু:খ করে হরিহরবাবু বলছিলেন হরনাথবাবুর কাছে। হরনাথবাবু শুনছিলেন আর বুক শুকিয়ে যাচ্ছিল তাঁর। তাঁর মেয়েরও বিয়ে ঠিক হয়ে আছে শ্রাবণ মাসে। জামাই যে মাহুত—সার্কাসে হাতির খেলা দেখায়।

আধুনিক জামাইষষ্ঠী

জামাইষষ্ঠী এখন অন্য ফরম্যাটে চলে এসেছে। সাইবার এজ। গ্লোবাল গ্রাম। কর্পোরেট জামাই। সময় ছাড়া এদের সব আছে। তবু বাঙালি ঐতিহ্যরক্ষক। পয়লা বৈশাখ ধুতি-পাঞ্জাবি পরে ডাবের জলের সঙ্গে হুইস্কি খায়, বিজয়ার দিন বারমুডা পরে কোলাকুলি করে। সে কি ভুলতে পারে জামাইষষ্ঠীকে! কিন্তু শাশুড়ি গলদঘর্ম হয়ে হাতে ছাঁকা খেয়ে পঞ্চব্যঞ্জন রাঁধবে, শ্বশুর চাঁদিফাটা রোদে খাসির দোকানে লাইন দেবে—এসব ভাবা যায় না। ব্যস্ত জামাইয়ের ডেট পাওয়া মুশকিল। জামাইকে যদি বা পাওয়া গেল, শ্বশুর সেদিন বিজি। জামাই-শ্বশুর অ্যাভেলেবল তো শাশুড়ি ফাঁকা নেই। এই করতে গিয়ে তিথি-নক্ষত্রকে চুলোয় পাঠিয়ে সবাই একত্র হল আশ্বিন মাসে। টেবিল বুক করে সদলবলে রেস্তোরাঁয়। ভোজনের শেষে পান। শাশুড়ির সঙ্গে গ্লাস ঠুকে জামাইয়ের চিয়ার্স।

উত্তর আধুনিক জামাইষষ্ঠী

স্থান—ওই একই। পাত্র-পাত্রীও এক। খাওয়াদাওয়ার পর অতিরিক্ত পানে বেটাল শাশুড়ি। নিজের পায়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে জামাই শাশুড়িকে ধরে ধরে গাড়িতে তুলছে। জামাইয়ের শরীরে এলিয়ে আছেন শাশুড়ি। পিছন থেকে মেয়ে জড়ানো গলায় বলছে,—মা ন্যাকামি কোরো না তো; মাত্র চারটেতে আউট হয়ে যাওয়ার মাল তুমি নও। ছি: ছি: লজ্জা করে না, মেয়ের সামনে জামাইকে অমন জড়িয়ে ধরতে…দেখলে গা জ্বলে যায়…।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *