ওপেন-গোপেন – উল্লাস মল্লিক

ওপেন-গোপেন

সেবার লাটাই গেল আন্ডার-নাইনটিন চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে আর ভোলা খুব পড়াশোনা করল। রাত জেগে সাজেশন বাছা, নোটস বানানো। তারপর মুখস্থ। জান লড়িয়ে দিল একেবারে। এবার পাশ করতেই হবে! অনেকদিন ক্লাস নাইনে নট-নড়নচড়ন হয়ে রয়েছে। লাটাই, ভোলা—দু’জনেই দুরন্ত ফুটবলার। আমাদের স্কুলটিমের হৃৎপিণ্ড। ওদের জন্যই বছর বছর ট্রফি-কাপ আসে স্কুলে। স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে ওদের সুনাম দিকদিগন্তে ভাসমান। ভোলা স্ট্রাইকার আর লাটাই লিঙ্কম্যান। লাটাই বল বাড়িয়ে দেয় আর ভোলা গোল করে আসে। আন্ডার-নাইনটিনে ভোলাও চান্স পেয়েছিল। কিন্তু ইনজুরির জন্য যেতে পারেনি। অগত্যা পড়াশোনায় আত্মনিয়োগ করেছে।

পরীক্ষার ঠিক আগের দিন টুর্নামেন্ট খেলে ফিরল লাটাই। মনে চিন্তা—কাল পরীক্ষা কী করব। ভোলা বরাভয় দেখাল—’চিন্তা নেই, আমি আছি।’ লাটাই তাই অকুতোভয়ে গেল পরীক্ষা দিতে।

মাঠে ওদের বোঝাপড়া চমৎকার। বল পায়ে দৌড়োতে দৌড়োতে লাটাই জানে, ভোলা কোথায় আছে। বিপক্ষের পেনাল্টি-বক্সে পৌঁছে ভোলা বুঝতে পারে, লাটাই গড়িয়ে পাশ দেবে, না কি হেডের বল। সেই বোঝাপড়া হলেও দেখা গেল, ভোলা যা যা লিখল, দাঁড়ি-কমা সমেত হুবহু নামিয়ে গেল লাটাই। চ্যাম্পিয়নের মতো বুক ফুলিয়ে বেরোল তারা।

শূন্য আবিষ্কার

কিন্তু মার্কশিট হাতে পেয়ে হতবাক দুজনেই। ফেল! লাটাই সাকুল্যে পেয়েছে এক। এবং তাজ্জবের ব্যাপার ভোলা শূন্য।

পরীক্ষায় পাশ-ফেলকে কোনওদিন পরোয়া করে না তারা। কিন্তু এবার ভয়ানক মর্মাহত হল ভোলা। লাটাই যদি এক পায়, তবে তার শূন্য হয় কী করে! আরে তার খাতা থেকেই তো লাটাই লাইন-বাই-লাইন…!

সে গেল হেডস্যারের কাছে। একটাই দাবি—সে বঞ্চনার শিকার। একটা নম্বর অন্তত তার পাওয়া উচিত। হেডস্যার বার বার জিগ্যেস করলেন, কেন এমন মনে হচ্ছে তার? দুই বা তিন নয়, এক কেন? মুশকিল হল, ভোলা বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যেতে পারছে না। কারণ, তা হলে তো ফেঁসে যায় লাটাই। আর লিঙ্কম্যান লাটাই কুপিত হলে মাঠে বলের সাপ্লাইলাইন কেটে যাবার প্রবল আশঙ্কা। গোল করবে কী করে!

শেষ পর্যন্ত ভোলা হেডস্যারের কাছে অভিযোগের সারবত্তা প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে শূন্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাকে।

ব্যাপার এটাই। এই চক্রে উপকারী এবং উপকৃতকে অনেক কিছু মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। মেনে নিতে হয় উপরওলাদের অনেক অন্যায় কুযুক্তি। কিন্তু প্রতিবাদের উপায় থাকে না। যেমন হয়েছিল ভোলার বেলায়। ‘ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ রচনাটা রাম শ্যামের খাতা থেকে টো-টো ঝেড়ে দিল। নম্বরের বেলায় শ্যাম দশে সাত, রাম তিন। কিংবা ক্লাসে স্যারের দেওয়া নোটই কার্বন-কপি হল যদুর খাতায়, অথচ দশে দেড়। প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষকদের একটা উদ্ভট যুক্তি থাকে—বোঝাই যাচ্ছে, এটা টোকা উত্তর। বোঝো! কাউকে দেখে কি বোঝা যায়, এ ছোটলোক! না কি গায়ে লেখা থাকে! উত্তরের গায়ে কি লেখা থাকে—আমি টুকিত হইয়াছি?—তা হলে! প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্ত নয়তো কী!

এই অন্যায় জুলুম, এই নির্মম দমনপীড়ন যুগ যুগ ধরে চলেছে। একবারই প্রতিবাদ হয়েছিল। গর্জে উঠেছিল নিপীড়িতের দল! উত্তাল হয়েছিল শিক্ষাঙ্গণ। ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়ে’র ভাইপোরা ‘এ পড়ালিখা ঝুটা হ্যায়’ শ্লোগান তুলে শিক্ষাব্যবস্থাকে ডিগবাজি খাওয়ানোর ডাক দিয়েছিল। শিক্ষাদেবতার মুণ্ডুচ্ছেদ করে তারা হা-রে-রে-রে করে ঢুকে পড়ল শিক্ষাসত্রে। টেবিলে ছুরি গেঁথে ঘোষণা করল তাদের বিজয়বার্তা।

বসে আঁকো

তখন পরীক্ষা ব্যাপারটা জলভাত হয়ে গেল সবার কাছে। রাত জেগে চোতা (শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। তবে সাবধানে উচ্চারণ করতে হয়। টাং স্লিপ করলেই মুশকিল!) বানানোর পরিশ্রম নেইঃ হলে লুকোচুরি খেলার টেনশন নেই, ইম্পর্ট্যান্ট বাছার হ্যাপা নেই। পাশে বই খুলে লাইন-বাই-লাইন ছবি আঁকো। হাতের লেখা খারাপ বলে অনেকে নাকি সেই সময় সঙ্গে করে ‘কপিরাইটার’ নিয়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনাও শুরু করেছিল। অন্দোলনটা আরও কিছুদিন টিকলে হয়তো বাস্তবায়িত হত। ইনভিজিলেটর থাকলে তাঁকে বলা হত, ‘স্যার আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি।’ এতেও ঠিক শান্তি না-হলে বাড়িতে চলে যাও তাঁর। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে বলো, ‘স্যার খাতা দেখছেন? দেখুন স্যার ভালো করে দেখুন; আমরা কাছাকাছিই আছি।’

ওহ, সেদিন ছিল বড় সুখের সময়। ছুরির ফলাই ছিল নম্বরের উৎস। কিন্তু হিংসুটেদের সহ্য হল না। পাতি বুর্জোয়ারা ‘তোবা-তোবা’ করে উঠল। নির্মম রাষ্ট্রশক্তি কঠোর দমনপীড়ন চালাল। ফিরে এল শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবল অরাজকতা। পরীক্ষকের অন্যায় গা-জোয়ারি, ভুলভাল কুযুক্তি। তবু বিপ্লব কখনও পুরোপুরি ব্যর্থ হয় না। আরও পাঁচটা বিপ্লবের মতো সেই বিপ্লবও জনমানসে ছাপ রেখে গেল। আজও নিরক্ষর ডিগ্রিধারী চোখে পড়লে অনেকেই নিশ্চিন্ত হয়ে যায়—এ ব্যাটা নিশ্চয়ই অমুক সালের প্রাোডাকশন!

…পিছে কেয়া হ্যায়

অতএব, ফিরে এল ফের চোর-পুলিশ খেলা। নব নব সজ্জায় নিজেদের সজ্জিত করতে হল পড়ুয়াদের। শিক্ষকেরাও দু-চারবার বোকা বনে কৌশল বদলালেন। এই খেলার সব চেয়ে আদর্শ ইউনিফর্ম ধুতি-পাঞ্জাবি। এই পোশাকে বিস্তর খাঁজ-খোঁজ খানাখন্দর। চোতা ঠিকমতো লুকিয়ে ফেলতে পারলে শার্লক হোমসও খেই হারিয়ে ফেলবেন। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার কুফল তো কম নয়। তার মধ্যে পোশাক হিসেবে ধুতি-পাঞ্জাবি বাতিল হওয়া অন্যতম। এই সময় কেউ সে পোশাক পরে পরীক্ষা দিতে গেলে অনেক আগেই নজরবন্দি হয়ে যাবে। তবে কেউ ব্যতিক্রমী হয়ে ভাবতেই পারেন! ছাত্র প্রাগৈতিহাসিক পোশাকে এসেছে মানে চৈতন্যে সুমহান আদর্শ একেবারে মাখামাখি হয়ে আছে। পরীক্ষকের চোখেমুখে সম্ভ্রম উপচে পড়ে। তার দিকে ঘেঁষেন না আর। আর সেই সুযোগে চৈতন্যদেব গভীর সাধনায় ডুব দেয়।

দুর্বল ছাত্রেরাই শুধু টোকে—এর চেয়ে কাঁচা মিথ্যে আর হতে পারে না। সব পাখিতে মাছ ধরে খায়, মাছরাঙাটাই কলঙ্কিনী! উজ্জ্বল মেধাবীরাও সুযোগ পেলে ছাড়ে না। আরও সত্যি, নিজেদের অভিনব বুদ্ধিবলে নব নব পন্থাও আবিষ্কার করে নেয় তারা।

ছেলেদের যেমন ধুতি-পাঞ্জাবি, মেয়েদের তেমন শাড়ি। প্রখর নারীবাদী, শাড়িকে শৃঙ্খলের প্রতীক বলে গণ্য করা জিনস-টপের গনগনে আগুনও পরীক্ষাকেন্দ্রে কিন্তু সনাতন ভারতীয় নারী। এগারো হাত বস্ত্রখণ্ডে শরীর জড়িয়ে পরীক্ষা দেয়। আর গার্ড যদি পুরুষ হন তো নারীজন্ম সার্থক। তিনি বেচারা পবিষ্কার বুঝতে পারছেন, পরীক্ষার্থীর আঁচলের তলায়, কোমরের ভাঁজে, ব্লাউজের খাঁজে গজগজ করছে চোতা! কিন্তু ধরার উপায় নেই! সেন্সর বোর্ড আটকে দেবে। পরদিনই সংবাদপত্রে শিরোনাম—’পরীক্ষা চলাকালীন গার্ডের হাতে ছাত্রীর শৃলতাহানি! অভিযুক্তের জামিন না-মঞ্জুর। তিনদিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ। মামলার পরবর্তী শুনানি…।’

যদিদং টুকিতং ধরিতং তব…

দু’একটা কেস অবশ্য আদালতের বদলে ছাদনাতলায় চলে যায়। যেমন হয়েছিল আমাদের শৈবালদার বেলায়। শৈবালদা দেখতে সুন্দর। পড়াশোনায় তুখড়। আর প্রেমে মাস্টার। স্থানে-অস্থানে, বেলা-অবেলায় প্রেমে পড়ে যেত শৈবালদা। অবশ্য শৈবালদার যুক্তি ছিল। তার মন নাকি বড় নরম। নারীজাতির দু:খ দেখলে বিদ্যাসাগরের মতো সেও স্থির থাকতে পারে না।

শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে শৈবালদা পরীক্ষার হলে গার্ড দিচ্ছে। তার আগের দিনই একটা প্রেম কেঁচে গিয়েছে তার। মেজাজ ঈষৎ খাট্টা। অজান্তেই বোধ হয় নজরদারি খুব কড়া হয়ে যাচ্ছিল। এক ছাত্রী বেশ কিছুক্ষণ চুলবুল করার পর ব্যর্থ হয়ে গার্ডের কাছে স্বীকার করল তার অসহায়তার কাহিনি। তারও প্রেম সদ্য ভেঙে গিয়েছে। দু:খে কাতর হয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়ে উঠতে পারেনি। এদিকে, বাড়িতে ঠিক করেছে, ফেল করলেই বিয়ে দিয়ে দেবে। তার একেবারেই ইচ্ছে নেই। অগত্যা স্যারের কাছে তার সনির্বন্ধ অনুরোধ, তাকে যেন তিনি একটু সুযোগ করে দেন।

স্বভাবকোমল শৈবালদা অনুরোধ ফেলতে পারেনি। পরীক্ষা মিটে যাওয়ার পর দু’টো ভাঙা মন জুড়ে এক হয়ে গেল। কিন্তু শৈবালদা এখন পস্তায়। বিয়ের পর সেদিনের সেই পরীক্ষা এখন অষ্টপ্রহর গার্ড দেয় শৈবালদাকে। স্বভাবপ্রেমিক শৈবালদা বিবাহোত্তর সম্পর্কে হামেশাই ফাঁসে। একদিন দু:খ করছিল—’জানিস, বাড়ি ফিরলেই পকেট হাতড়ায়। বডি সার্চ করে! যদি কিছু গোপন চিরকুট পাওয়া যায়। অথচ সেদিন আমি সার্চ করলে ও কিন্তু ফেঁসে যেত! অকৃতজ্ঞ আর কাকে বলে!’

সুপারনকলিম্যান

আমাদের টকাইয়ের কথা বলি। টকাই ছিল খ্যাতনামা টুকলিবাজ। টুকলির নিত্যনতুন কৌশল আবিষ্কারেই ছিল তার আনন্দ। শিক্ষকদের বোকা বানানোতেই তার তৃপ্তি। সব লেখা হয়ে গেলে অতিরিক্ত প্রশ্নের উত্তরও লিখে দিয়ে আসত। মনে প্রবল আত্মবিশ্বাস—কেউ ধরতে পারবে না। হাতের তালুতে পায়ের ডিমে, স্যান্ডউইচের মাঝখানে, পরোটার পাটে (পরীক্ষা দিতে বসলেই তার নাকি ভয়ানক খিদে পেত। তাই টিফিনবক্সে থরে-বিথরে খাবার নিয়ে আসত) জলের বোতলের তলদেশে, স্কেলের পৃষ্ঠদেশে—সর্বত্রই উত্তর লেখা অথবা চোতা সাঁটা। আয়ত্ত করেছিল ম্যাজিশিয়ানের নিপুণতা। গার্ড হদিস পাওয়ার আগেই কাজ সারা হয়ে যেত। দূরদূরান্ত থেকে ছেলেরা টিপস নিতে আসত তার কাছে। শোনা যায়, পাশ করার পর তাদের অনেকেই মিষ্টি খাইয়ে যেত তাকে। গুরুদক্ষিণা।

সেই টকাই ফেঁসে গেল মার্তণ্ড স্যারের কাছে। আমাদের ক্লাস টেনে মার্তণ্ড স্যার এলেন। নাম শুনেছিলাম আমরা। ইনি নাকি টোকার যম। আগে যে যে স্কুলে ছিলেন, সেগুলিকে টুকলিবাজদের শ্মশান বানিয়ে ছেড়েছিলেন। প্রখর কান, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, অভ্রান্ত অনুমান ক্ষমতা। একাধারে ব্যোমকেশ-ফেলুদা-দময়ন্তী সেন! পরীক্ষার প্রথম দিনই হাহাকার উঠল ছাত্রদের মধ্যে। এগারো জন ধরা পড়ল। আমরা যেমন স্যারের নাম (না কি বদনাম!) শুনেছিলাম, তেমন স্যারও জানতেন টকাইয়ের কথা। তাই বিশেষ দৃষ্টি ছিল টকাইয়ের ওপর। এই উইকেটটা তাঁর চাই।

প্রথম দিন পরীক্ষার পর বিমর্ষ টকাই জানাল—পাসমার্কস উঠলে হয়!

দ্বিতীয় দিন পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর টকাই আমায় ফিসফিস করে বলল, ‘স্যারকে বলে দে, আমি টুকছি।’

আমি তো অবাক!

—কী বলছিস টকাই!

—প্লিজ, বল।

বুঝলাম মাথা খারাপ হয়ে গেছে টকাইয়ের। কালকের ধাক্কা। অতবড় পরাজয়টা হজম করতে পারেনি।

টকাই তখন তাড়া দিচ্ছে, ‘পায়ে পড়ি তোর! প্লিজ বলে দে। যা খেতে চাইবি খাওয়াব।’

কিছুটা টকাইয়ের প্রতি করুণায় আর কিছুটা খাবারের লোভে বলে দিলাম—স্যার, এখানে টকাই টুকছে।

ফুলটস বলে উইকেট পাওয়া বোলারের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে স্যার দৌড়ে এলেন। ‘টুকছে! কে? টকাই? অ্যাই, বার কর বলছি, কী আছে?’

আনাড়ি টুকলিবাজের মতো টকাইয়ের খাতার তলা থেকে চোতা পাওয়া গেল। কিন্তু উনি যে মার্তণ্ড স্যার। আর শিকার যে টকাই! ওইটুকুতে থামবেন কেন? স্যার গর্জন করলেন, ‘আর কী আছে বার কর। বার কর বলছি।’

তা, সত্যিই বেরোল। জামার পকেট, প্যান্টের পকেট, হাতার ভাঁজ থেকে আরও উদ্ধার হল। এক-একটা চোতা উদ্ধার হচ্ছে আর স্যারের মুখটা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে, জয়ের আনন্দে। অন্য দিকে হেরো খেলোয়াড়ের মতো করুণ মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে টকাই।

এখানেই থামলেন না মার্তণ্ড স্যার। টকাইকে তুলে নিয়ে গেলেন তিনতলার চিলেকোঠায়। খাতা-পেন দিয়ে বসিয়ে বাইরে থেকে চাবি দিয়ে গেলেন।

—নে, এবার পরীক্ষা দে! একা বসে বসে! ঘণ্টা পড়লে তালা খুলব।

পরীক্ষার পরে টকাই দেখলাম খোশ মেজাজে। পরীক্ষা নাকি দুর্দান্ত হয়েছে। বুঝলাম, ওর মাথাটা সত্যি গিয়েছে! একা-একা বসে পরীক্ষা দিল। চোতা ছাড়া ওর পরীক্ষা ভালো হয় কী করে!

টকাই বোধ হয় বুঝতে পারল। বলল, ‘ঘাবড়ে গেলি তো! দেখবি একটা জিনিস?’

টকাই দেখিয়েছিল আমায়। অবশ্য তার জন্য বাথরুমে যেতে হল। জাঙিয়ার ভেতর ছোট ছোট চোরা পকেট। ভেতরে ঠাসা চোতা!

টকাই বলল, ‘পরীক্ষার আগের দিন দেখলাম, স্যার ছুতোর মিস্তিরি নিয়ে স্কুলে ঢুকছেন। মিস্তিরিটাকে ধরলাম পরে। বলল, চিলেকোঠার দরজার কবজা-কড়া ভেঙে গিয়েছিল। স্যার সারাতে বলেছেন। অনেকদিন এই লাইনে আছি। মনের মধ্যে সন্দেহ টিকটিক করে উঠল। বুঝলাম, ওটা আমার জেলখানা। আমিও গেলাম বাসু দরজির কাছে। জাঙিয়ার চোরা পকেট চাই। তোকে খাওয়াব বলেছিলাম। কী খাবি বল?’ টকাই টুকলিবাজ হতে পারে, বেইমান নয়।

পকেট-বিপ্লব

চোরা পকেটওয়ালা জাঙিয়া পরে টকাই উতরে গিয়েছিল সেদিন। আর জাঙিয়া না-পরে রাঘব স্যারের টোকা-বিরোধী অভিযান থামিয়ে দিয়েছিল বিনোদ। রাঘব স্যার টোকা ধরতেন খুব। আর বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াতেন, ‘আজ সাতটাকে ধরেছি। আজ ন’টা!’ বিনোদের খুব আপত্তি ছিল এখানে। রাঘব স্যার কোন মুখে টোকা ধরেন! বিনোদের ছোটকাকার সহপাঠী ছিলেন রাঘব স্যার। কাকার মুখে শুনেছে, স্যার নাকি তুখড় ছিলেন টোকাটুকিতে। তা হলে? রাগে ফুঁসত বিনোদ।

একবার সেই বিনোদ ধরা পড়ল রাঘব স্যারের হাতে। ভাবসম্প্রসারণ টুকছিল—’অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন…।’

স্যার বললেন, ‘কী আছে বার কর।’

বিনোদ বলল, ‘স্যার, চেক করতে গেলে কিন্তু কেলেংকারি হয়ে যাবে!’

স্যার ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠলেন, ‘কী! আমায় হুমকি দিচ্ছিস তুই! এত বড় স্পর্ধা!’

বিনোদ তখনও বলছে, ‘সত্যি বলছি স্যার কেলেংকারি হয়ে যাবে।’

স্যার আরও রেগে বিনোদকে বেঞ্চ থেকে টেনে বার করলেন। তারপর স্যার সটান হাত ঢুকিয়ে দিলেন বিনোদের পকেটে।

আর তারপর? সবাই দেখল, স্যার ‘এ-হেঁ-হেঁ…ছি-ছি মাগো’। বলতে বলতে দৌড়ে গিয়ে কলে হাত ধুচ্ছেন। আর কাঁচুমাচু মুখ করে বিনোদ বলছে, ‘বললাম না, স্যার। কেলেংকারি হয়ে যাবে। আপনি শুনলেন না। পকেটটা ছেঁড়া। আমার কী দোষ বলুন।’

অনেকে ভুরু কোঁচকাবে। শিক্ষকের নামে এ কী অপবাদ। তারা কখনও ওসব করতে পারেন! কী মুশকিল! তাঁরাও তো মানুষ। তাঁদের খিদে-তেষ্টা আছে। ছোট বাইরে, বড় বাইরে আছে। তাঁদেরও সন্তানসন্ততি হয়।

 পেটে মারিতং জগৎ

প্রশ্ন হল, ছাত্রেরা নিজেদের অধিকার বুঝে নেবে না কেন? আমাদের যা শিক্ষাব্যবস্থা, সেখানে টোকাটুকি আমাদের বার্থ-রাইট!

নকাইয়ের কথা বলি। নকাইয়ের গোটা ছাত্রজীবন ছিল চোতানির্ভর। পরীক্ষা হল-এ যখন দেখত বিপদ, চোতা সমেত গ্রেফতার হওয়ার প্রবল আশঙ্কা, চোতা স্রেফ গিলে নিত সে। এইভাবে যে কত চোতা সাবাড় করেছে নকাই! সব পরীক্ষা যখন শেষ হত, তখন তার পেটে গজগজ করত ব্যাঙের রেচনতন্ত্র, অক্সিজেন প্রস্তুত প্রণালী, ভূমধ্যসাগরের জলবায়ু, নীলবিদ্রোহের কাহিনি।

পেটে এত বিদ্যা ছিল বলেই হয়তো কালক্রমে নকাই শিক্ষক হয়ে গেল। সেদিন দু:খ করে বলছিল, ‘টোকার জন্য কত মেহনত করতাম বল আমরা! রাত জেগে চোতা বানানো, ধরা পড়লে খেয়ে নেওয়া। অথচ এখনকার ছেলেরা অত ঝামেলা পোহাতে চায় না। টেকনোলজিই ওদের পরিশ্রমবিমুখ করে তুলেছে।’

—কীরকম?

নকাই বলল, ‘এই তো আজ একটাকে ধরলাম। তার নাকি ধুম জ্বর। মাফলার জড়িয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছে। আমার দেখেই কেমন সন্দেহ হল। তারপর চেক করতেই বেরিয়ে পড়ল কানে ব্লু-টুথ। বাইরে থেকে উত্তর সাপ্লাই হচ্ছে। আর আমার কথা ভাব! কম কাগজ খেতে হয়েছে। কাগজের মতো অমন বিস্বাদ জিনিস আর হয় না রে!’

বাবরের সংবহনতন্ত্র

এবার বলি গণেশবাবুর কথা। তাঁর বড় আক্ষেপ, কোনওদিন টোকা ধরতে পারেননি। বহু চেষ্টা করেছেন। অন্য শিক্ষকদের পরামর্শ মতো ক্লাসের বাইরে গিয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে নজরদারি চালিয়েছেন। খবরের কাগজ ফুটো করে মুখের সামনে ধরে পড়ার ভান করেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি। সহকর্মীদের কাছে এই কারণে তিনি কিছুটা উপহাসের পাত্র। এমনই হয়েছে, তিনি গার্ড দিচ্ছেন আর তার সামনের ছেলেটাই টুকছে। তিনি টেরও পাননি। পাশের ঘর থেকে অন্য শিক্ষক এসে ধরেছেন।

লজ্জায় আধোবদন হয়েছেন গণেশবাবু! ছি! ছি! সামনেই টুকছিল, অথচ ধরতে পারলেন না! খুবই মনোকষ্টে ভোগেন। তিনি কি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নন? তিনি কি সরকারকে ফাঁকি দিয়ে বেতন নিচ্ছেন? এই সব প্রশ্ন তাঁকে কুরে কুরে খায়। হতাশ হয়ে চোখের ডাক্তারও দেখিয়েছেন কয়েকবার। ডাক্তার বলেছে, চোখ ঠিক রয়েছে। এই করতে করতে রিটায়ার করার বয়স এসে গেল। গণেশবাবু বুঝে গিয়েছেন, কর্মজীবনের এই কলঙ্ক মাথায় নিয়েই তাঁকে চলে যেতে হবে।

রিটায়ারমেন্টের মাত্র ক’দিন বাকি। গণেশবাবু টোকা ধরলেন। খাতা কেড়ে নিলেন তিনি। তারপর চোতায় চোখ বুলিয়ে থমকে গেলেন। থমথমে হয়ে উঠল চোখ-মুখ। রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন, ”হতভাগা! অকম্মার ঢেঁকি! এ কী করেছিস তুই! ইতিহাস পরীক্ষায় জীবনবিজ্ঞান টুকছিস! এসেছে বাবরের শাসনব্যবস্থা আর টুকছিস চিংড়ির রক্তসংবহনতন্ত্র! আমার শেষ আশাটাও শেষ করে দিলি!”

সত্যমঙ্গলপ্রেমময়

টোকাটুকির বৃত্ত যাদের ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না, তারা হল সাপ্লাইকারী। পরের জন্য এরা বলিপ্রদত্ত। কখনও কারনিশে উঠে, কখনও ল্যাম্পপোস্ট বেয়ে, কখনও টারজানের মতো গাছের ডালে ঝুলে এরা মেটিরিয়াল সাপ্লাই দেয়। কখনও বন্ধুকৃত্য করতে। কখনও স্রেফ স্বার্থশূন্য হয়ে। ‘মোটো’ একটাই—আহা, বেচারা পাশ করুক! বহু উজ্জ্বল মার্কশিটের পিছনে নি:স্বার্থ অবদান থাকে এই সব কাব্যে উপেক্ষিতদের।

যেমন আমাদের সত্যদা। গ্র্যজুয়েট হয়ে বেকার বসেছিল। চোতা সাপ্লাইয়ের কাজটা শুরু করেছিল বয়সোচিত বাহাদুরি দেখাতে। কেমন নেশার মতো লেগে গেল। দেখল, চাহিদা বাড়ছে। পরীক্ষার সিজনে অনেকেই হত্যে দিয়ে পড়ছে—’সত্যদা, ভূগোলের শর্ট কোশ্চেনগুলো একটু সাপ্লাই দিও…সত্যদা, আমায় ইতিহাসের টীকা,… সত্যদা, কেমিস্ট্রির ইক্যুয়েশনের জন্য কিন্তু তোমার ওপর ভরসা করে আছি!’

প্রসন্নচিত্তে সব অনুরোধ রক্ষা করত সত্যদা। একবার পুলিশের তাড়া খেয়ে দোতলা থেকে পড়ে পা ভাঙল। মাসখানেক নার্সিংহোমে থেকে ফের বাড়ি।

তারপর থেকেই রোখ চেপে গেল আরও। কিছু ছেলেপুলে জোগাড় করে পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করে দিল। দিনে দিনে আরও বড় হয়ে উঠল সংগঠন। এখন বিশাল অফিস। প্রচুর ডিমান্ড ওদের। আগে থেকে নাম লিখিয়ে রিক্যুইজিশন জমা দিতে হয়। সেই মতো চোতা পৌঁছে যায় হলে।

সত্যদাকে বলেছিলাম—কী পাও এসব করে?

সত্যদা বলেছিল, ”আমার চোতা নিয়ে পাশ করে এখন সমাজে কতজন প্রতিষ্ঠিত জানিস? কত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার-নেতা, লেখক-কবি! কতজনকে প্রায়ই টেলিভিশনে দেখি। তখন গর্বে বুকটা ভরে যায়! আবার যখন দেখি এদের মধ্যেই কেউ কেউ টোকাটুকির বিরুদ্ধে লেকচার দিচ্ছে, তখন আরও আনন্দ হয়।

খুব স্বাভাবিক! মানুষটা তো সারাজীবন পরের জন্যই ভেবে এসেছে। বিশ্বাস করেছে—উইদাউট চোতা লাইফ ইজ ভোঁতা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *