মেলাবেন তিনি মেলাবেন – উল্লাস মল্লিক

মেলাবেন তিনি মেলাবেন

পাড়ার সবচাইতে বনেদি দরজি ছিলেন অভয় পোদ্দার। আমরা অভয়দাদু বলতাম। ফরসা রোগা-ভোগা চেহারার বয়স্ক মানুষ; একমাথা সাদা চুল, সাদা ভুরু, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, গলায় ঝোলানো মাপন-ফিতে। অভয়দাদু নিজে কিন্তু সবসময় ছেঁড়া জামাকাপড় পরতেন। আস্ত পোশাক আমরা অন্তত কোনওদিন ওকে পড়তে দেখিনি। হয় কাঁধের কাছটা ছেঁড়া, নয় পকেট খুলে ঝুলছে। অথবা বুকের দুটো বোতাম নেই। দরজি হিসেবে এটা যে মারাত্মক খারাপ বিজ্ঞাপন সে হুঁশ সম্ভবত তাঁর ছিল না। তিনি ছিলেন আসলে আপদমস্তক কবি। সময় পেলেই কাব্যচর্চা করতেন। মাপ লেখবার লম্বা খাতাগুলো ভরে উঠত বিভিন্ন সাইজের কবিতায়; এবং আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখতাম কবিতা শেষ করার পরেই গলায় ঝোলানো মাপন-ফিতে দিয়ে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপছেন। আমি এর আগে বা পরে কোনও কবিকেই কবিতার মাপ নিতে দেখিনি। কোনওদিন দেখতাম দাদু বেশ উৎফুল্ল। বলতেন, আজ দুটো উনিশ-বাই-সাত আর তিনটে সতেরো বাই-নয় কবিতা শেষ করেছি। কোনওদিন দেখতাম খুব মনমরা। সেদিন হয়তো কোনও প্রকারে একটা মাত্র পাঁচ-বাই-তিন লিখতে পেরেছেন। মোটের ওপর তাঁর দরজি সত্তাকে ছাপিয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছিল কবিসত্তা আর কবি-কাম-দরজি হবার দরুন কাস্টমাররা পড়তেন ঘোর বিপদে। দরজিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য কথার খেলাপ অর্থাৎ ডেট ফেল। দরজি মাত্রই ভোগাবে। নির্দিষ্ট দিনে গেলে বলবে ‘এক সপ্তা পরে আসুন’ আপনি এক সপ্তা পরে গেলেন, তখন আশ্বাসবাণী শোনাল—’তিনদিন পরে আসুন দাদা, ঠিক দিয়ে দেব!’ তিনদিন পর ‘কাল আসুন’, তারপর—’ওবেলা সিওর পাবেন’; আর ওবেলা গেলে—’একটু বসুন, চা খান ততক্ষণ, হয়েই গেছে প্রায়, একটা সেলাই বাকি, করেই দিয়ে দিচ্ছি…।’ এমন কাহিনিও শোনা যায়—জনৈক ব্যক্তি একটা জামা অর্ডার দেবার পর ঘটনাক্রমে খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়ে এবং বারো বছরের কারাদণ্ড হয়। মেয়াদ শেষে বাড়ি ফিরে দৈবাৎ সে পুরোনো রসিদটি খুঁজে পায় এবং দরজির কাছে গিয়ে জামাটি দাবি করে। রসিদ দেখে দরজি তাকে মোলায়েম হেসে আশ্বাস দিয়েছিল, ‘হয়েই এসেছে প্রায়, সপ্তাখানেক পরে আসুন, পেয়ে যাবেন।’

এক দরজি একবার আমাকে গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, যে দরজি দিনের দিন ডেলিভারি দেয় সে দরজি-কুলের কলঙ্ক। হয়তো ঠিকই বলেছিলেন। কারণ আমি অন্তত আজ পর্যন্ত কোনও পাংচুয়্যাল দরজি দেখিনি।

যে কথা বলছিলাম। অভয়দাদু। কবি-কাম-দরজি। মানে গোদের ওপর বিষফোঁড়া। ডেট ফেল যেমন দরজিদের বৈশিষ্ট্য, বিভ্রম তেমনই কবিদের ইউএসপি। অভয়দাদুর দোকানে গিয়ে নিজের সঠিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে কাস্টমারের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যেত। স্কুলশিক্ষক রামবাবুকে দেখে অভয়দাদু খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতেন, তারপর রহিমবাবু, কী খবর, আপনার পাটের ব্যবসা নাকি এবার খুব মার খেয়েছে…? কিংবা সেলিম ডাক্তারকে বলতেন, শ্যামবাবু আপনার হোটেলে গিয়ে একদিন বেশ করে মাংস-ভাত খাব, বুঝলেন…। যাই হোক, সঠিক পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর তার কাছ থেকে আদৌ কোনও অর্ডার নিয়েছিলেন কি না মনে করতে পারতেন না। দোকানে অনেক খাতা; কিন্তু সবগুলোই কবিতা বোঝাই। সঠিক খাতা খোঁজার জন্যে তিনি একটা ডেট দিতেন। সেই ডেটে গিয়ে দেখা গেল মাঝে খাতাটি খুঁজে পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু ফের হারিয়ে ফেলেছেন। সুতরাং ফের একটা ডেট। এত ডেটের গেরো টপকে কাস্টমার যখন উদ্দিষ্ট জিনিসটি হাতে পেলেন তখন বেশিরভাগ সময়ই দেখা যেত তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

মেকানিক হিসেবেও যে তিনি খুব উৎকৃষ্ট ছিলেন তা নয়; বরং বেশ খারাপ বলা চলে। কিন্তু আমার পিতৃদেবের অটল আস্থা ছিল অভয়দাদুর ওপর। ফলে আমাদের—মানে আমার আর দাদার—নিস্তার ছিল না তাঁর হাত থেকে। জামা কোনওদিন ঠিকঠাক ফিট হত না। গায়ে ঝুল বেঢপ বড় বা অস্বাভাবিক ছোট, পুট নেমে এসেছে কনুইয়ের কাছে, কলার এত টাইট যে বুকের বোতাম দিলে মনে হত ফাঁসির দড়ি পরিয়েছে। অভিযোগ করলে অভয়দাদু খুব মোলায়েম হেসে বলতেন, কেন ভাই, বেশ তো দেখাচ্ছে, একদম জহরলাল নেহেরু, শুধু মাথায় একটা টুপি চাই…। এইভাবে দিনের পর দিন আমাদের মাথায় গান্ধীটুপি পরিয়ে এসেছেন দাদু।

এমনই চলছিল। কিন্তু একদিন দৈবাৎ আমরা একটা জিনিস আবিষ্কার করে ভারি অবাক হয়ে গেলাম। দাদার জামা আমার গায়ে সুন্দর ফিট করছে, আর আমারটা দাদার। পাঠক ভাবতেই পারেন, তাহলে আর কী, সমস্যা তো মিটেই গেল—বদলা-বদলি করে নিলেই তো হয়, বিশেষ করে একই লংক্লথ থেকেই যখন দুটো জামা তৈরি। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়—দাদা পছন্দ করত ফুল-কলার হাফ-হাতা, আর আমি হাফ-কলার ফুল-হাতা। শেষে ভেবেচিন্তে এই সমস্যার সমাধান করে ফেললাম আমরা; অর্ডার দেবার সময় আমি দাদার পছন্দ বললাম আর দাদা আমারটা। নিয়তির এমনই পরিহাস, সেবারই প্রথম অভয়দাদু মাপমতো ঠিকঠাক জামা করলেন দুজনের।

অভয় দাদুর ওপর বাবার অচল ভক্তির একটা কারণ ছিল সততা। দরজি মাত্রই কাপড় মারবে—এরকম একটা লোকবিশ্বাস আমাদের দেশে আছে। সেই কাহিনি হয়তো সবারই জানা—কাপড় নিয়ে একজন জামা করাতে গেল এক দরজির কাছে। সে মেপেটেপে বলল, হবে না। কাপড় কম পড়বে। আশ্চর্যের ব্যাপার, রাস্তার উলটো দিকের অন্য একজন কিন্তু রাজি হয়ে গেল। জামাটা হাতে পাবার পর সেই ব্যক্তি প্রথম দরজিকে বলল, ‘আপনি বললেন হবে না, এই দেখুন…। প্রথম দরজি খুব বিরক্তির সঙ্গে বলল, ও করবে না কেন; ওর ছেলের বয়েস পাঁচ আর আমার ছেলে উনিশ পেরিয়ে কুড়িতে পড়েছে, ওর তো অসুবিধে হবার কথা নয়।

এই ব্যাপারটায় অভয়দাদুকে চোখ বুজে ক্লিন-চিট দেওয়া যায়। এক ইঞ্চি কাপড়ও দাদু নিজে নেবে না। বরং যদি দেখত অনেকটা কাপড়, অতিরিক্ত সবটাই লাগিয়ে দিত। ফলে জামা-প্যান্ট হয়ে যেত উৎকট সাইজের। দাদু হেসে বলতেন, এতটা কাপড় নষ্ট হবে, তাই লাগিয়ে দিয়েছি। কাচলেকুচলে কিছুদিন পর ফিট হয়ে যাবে, তখন একবারে জহরলাল…।

এটা ছিল অভয়দাদুর বাঁধা ম্যানেজমন্ত্র। ফিটিং নিয়ে অভিযোগ করলেই আওড়াতেন—ও কিছু নয়, কাচলেকুচলে ঠিক হয়ে যাবে।

যাই হোক, যে কথা বলছিলাম—আমার পিতৃদেবের অন্ধবিশ্বাস। এর পেছনে সত্যতা ব্যতিরেকে আরও একটা কারণ ছিল যেটা আমরা পরে জেনেছি। বাবাকে একবার ঘোর বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিলেন অভয়দাদু। বাঁচিয়েছিলেন একেবারে খোদ বিয়ের দিন। বিয়ের দিনে বরবেশ ধারণ করতে গিয়ে বাবা দেখলেন পাঞ্জাবি নেই। কলকাতার নামি দোকান থেকে পাঞ্জাবি আনা হয়েছে বহু-দিন আগে, কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ-খোঁজ। সারা বাড়ি ওলট-পালট, এদিকে লগ্ন এগিয়ে আসছে। সবার মাথায় হাত। পাঞ্জাবির জন্যে বিয়েটাই না ভন্ডুল হয়ে যায়! নানা জন নানা উপদেশ। এবং নিজের নিজের পাঞ্জাবি এগিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পিতৃদেবের দশাসই চেহারা, ছ’ফুটের ওপর লম্বা, বিয়াল্লিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি। ফলে কোনও পাঞ্জাবিই গায়ে আঁটছে না তাঁর। এমত দক্ষযজ্ঞকালে ঠাকুরদা হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। এবং কিছুক্ষণ পর ফিরলেন হাতে নতুন একটা পাঞ্জাবি নিয়ে। দেখা গেল, বাবার গায়ে সেটা একেবারে মাপের মাপ। পরে রহস্যটা ভেঙেছিলেন ঠাকুরদা। ঠাকুরদা নিজের বিয়ের আগে পাঞ্জাবিটা করতে দিয়েছিলেন অভয়দাদুকে। যথারীতি সময়ে পাননি সেটা। সেদিন হঠাৎ মনে পড়ায় সেই পাঞ্জাবি গিয়ে উদ্ধার করে আনেন। তখনও নাকি সামান্য একটু কাজ বাকি ছিল—তবে সেটা সামান্যই। ঠাকুরদা বসে থেকে সেটুকু করিয়ে আনেন। আর ঠাকুরদার চেহারার সঙ্গে বাবার হুবহু সাদৃশ্য থাকায় ফিটও করে যায় বাবার গায়ে।

অভয়দাদুর এই অসমান্য ঋণ ভুলতে পারেননি আমার পিতৃদেব। এবং সেই পিতৃঋণ বহুদিন শোধ করেছি আমরাও। অনেক পরে বাবার এই ভক্তি টাল খায়। আর আমরাও মুক্তি পাই সেইসব ভয়াবহ পোশাক-আসাক থেকে। কিন্তু সে অনেক পরে বড়দির বিয়ের দিন। বাবা নিজের জন্যে পাঞ্জাবি করতে দিলেন অভয়দাদুর কাছে; একান্ত বাসনা বড় মেয়ের বিয়ের দিন পরবেন। সবাই পইপই করে নিষেধ করল, ওখানে দিও না অবিনাশ, পরে পস্তাতে হবে। বাবারও কেমন জেদ চেপে গেল। বললেন, ওখানেই দেব এবং বিয়ের আগেই আদায় করব পাঞ্জাবি। মুখে বললেও বাবারও ভেতর ভেতর উদ্বেগ কাজ করছিল একটু। ফলে একটা বিশেষ কৌশল নিলেন বাবা। রোজ সকালে অভয়দাদুর দোকানে গিয়ে বলতেন, আজই বিয়ে। অভয়দাদু বরাভয় দেখিয়ে বলতেন, কোনও চিন্তা নেই, বিকেলে দিয়ে দেব। বলা বাহুল্য, কোনও বিকেলেই দিতে পারতেন না। এই ভাবে দিদির কুড়ি-বাইশটা বিয়ের ডেট ফেল হবার পর সত্যি বিয়ের মোক্ষম দিনটি হাজির হল; এবং কিমাশ্চর্যম সেদিন সকালেই অভয়দাদু শেষ করলেন পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি বগলদাবা করে বাড়ি ঢুকলেন বাবা, মুখে বিজয়ীর হাসি—হুঁ হুঁ, বাবা, তোমরা বলেছিলে হবে না, এই দ্যাখো…।

গর্বিত মুখে বাবা এবার পাঞ্জাবিটা পরলেন। মুখের হাসি স্পিরিটের মতো দ্রুত ভ্যানিশ। একখানা পাঞ্জাবি যে একজনের চেহারা চরিত্র এতখানি বদলে দিতে পারে না-দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। চেনাই যাচ্ছে না বাবাকে! ছোটকাকা বাড়িতে উটকো লোক ঢুকে পড়েছে ভেবে তাড়াতে গেল। বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে মেজপিসি ঢুকছিলেন, ভাইয়ের রূপ দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন—ওরে মেয়ের বিয়ের চিন্তায় তোর এ কী হাল হয়েছে রে, মেয়ে তো একদিন না-একদিন পরের বাড়ি যাবেই…ইত্যাদি।

গোলমালটা সম্যক অনুধাবন করে বাবা ছুটলেন অভয়দাদুর দোকানে। রাস্তার কুকুরগুলো ঘেউ-ঘেউ করতে করতে পেছন পেছন ছুটল। অভয়দাদু তখন সদ্য একটা পঁচিশ-বাই-নয় কবিতা শেষ করে দুরন্ত মেজাজে। তাঁরও বাবাকে চিনতে কিছু সময় গেল। এবং চিনতে পেলে বললেন—বাহ অবিনাশ, খাসা দেখাচ্ছে কিন্তু তোমাকে! নতুন বেয়ান থেকে সাবধান—বলে কাঁচা রসিকতারও চেষ্টা করলেন একটু।

বাবার তখন সেসব শোনার ধৈর্য নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, এ কেমন পাঞ্জাবি করেছেন…?

কেন, সুন্দর পাঞ্জাবি তো!

ঝুল কোথায় গিয়ে ঠেকেছে দেখুন!

ভুরু কুঁচকে একটু দেখলেন অভয়দাদু। বাস্তবিকই পাঞ্জাবির ঝুল একটু বেয়াড়া দেখাচ্ছে—সামনের দিকে ঝুল গোড়ালি ছুঁই-ছুঁই; পেছনের দিকে আবার হাঁটুর আগে শেষ। কোঁচকানো ভুরু সোজা করে কবিসুলভ একটা হাসি হাসলেন অভয়দাদু। বললেন, ও কিছু নয়; কাচলেকুচলে ঠিক হয়ে যাবে।

আর হাতা! হাতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে; এ তো কাকতাড়ুয়ার হাতা হয়ে গেছে! বাবা আরও উত্তেজিত।

কবিসুলভ সেই হাসি রিপিট করে অভয়দাদু বললেন, ওটা নিয়ে চিন্তা কোরো না, কাচলেকুচলে ঠিক হয়ে যাবে।

আর বুক-পকেট!

কেন, বুক-পকেট তো করেছি; নতুন বেয়ান গোলাপ ফুল গুঁজে দেবে—হেঁ: হেঁ:…।

বাবা এবার ভেঙে পড়া গলায় বললেন, কিন্তু পকেট যে উলটোদিকে হয়ে গেছে—ডান দিকে কি বুক-পকেট থাকে!

কবিসুলভ হাসিটা দার্শনিকসুলভ করে অভয়দাদু বললেন, ভেব না অবিনাশ, কাচলেকুচলে স-অ-ব ঠিক হয়ে যাবে।

উত্তর শুনে সেদিন সেখানেই মূর্ছা যান বাবা। চারদিকে হইচই, জল-বাতাস-ডাক্তার। সবাই ভেবেছিল মেয়ের বিয়ের চিন্তায় সাময়িক মাথা-টাথা ঘুরে পড়ে গেছেন।

যাই হোক, জল-বাতাস পেয়ে প্রকৃতই জ্ঞানোদয় হয় আমার পিতৃদেবের। আমরাও রেহাই পাই অভয়দাদুর হাত থেকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *